মেডেলেইন গোবেইল। অনুবাদ: শওকত হোসেন
‘নারীবেষ্টিত থাকার সহজ কারণ পুরুষদের চেয়ে ওদেরই আমি পছন্দ করি। ওদের রয়েছে বিশেষ ধরনের সংবেদনশীলতা এবং ওরা কাজের কথা বলে।’
‘আমরা যেসব জিনিসের মালিক, সেগুলোর দখলে চলে যাই। কোনো জিনিস আমার ভালো লাগলে সেটা সবসময় কাউকে দিয়ে দিই। এটা উদারতা নয়, এর কারণ স্রেফ আমি চাই যে অন্যরা বস্তুর দাস হয়ে পড়ুক।’
‘বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমার দায়িত্ব চিন্তা করা, বাধাবিঘ্নহীন চিন্তা করা এমনকি ভুল করার ঝুঁকি নিয়ে হলেও। নিজের ভেতর কোনো সীমা আরোপ করতে পারব না এবং আমার জন্য কোনো সীমা আরোপ করতে দেয়া যাবে না।’
ফরাসি লেখকদের বরাবরই আত্মার যুদ্ধ উসকে দেয়ার সহজাত গুণ ছিল। তবে ভলতেয়ারের পর মনে হয় আর কোনো ফরাসি লেখকই সভ্য দুনিয়াকে ৫৯ বছর বয়সী স্থূলকায়, বস্ফািরিত চোখের জাঁ-পল সার্ত্রের সৃষ্টি করা ভীতাবস্থার সঙ্গে তুলনার মতো কিছু দেননি। দার্শনিক (বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস, হোয়াট ইজ এক্সিসটেনশালিজম?), ঔপন্যাসিক (নঅসা, দি এজ অব রিজন), নাট্যকার (দ্য ফ্লাইজ, নো এক্সিট, দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট), প্রবন্ধকার (সিচুয়েশনস, সেইন্ট জেনে), আত্মজীবনীকার (দ্য ওয়ার্ডস), প্যামফ্লেট রচয়িতা, সম্পাদক, বিশেষ আবেদন ও দাবির মুসাবিদাকারী, এমনকি জনপ্রিয় গীতিকার হিসেবেও তিনি এক কাতর আর্তনাদ করে চলা কিন্তু সংবেদনশীল জনগণের সামনে শব্দের ধারা উন্মুক্ত করেছেন। একজন প্রতিরোধকারী, অস্বীকারকারী, ভয়ংকর ও নিরাপস দূরদর্শী হিসেবে তিনি দুটো যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ফ্রান্সের গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের সুলুক সন্ধানের ভেতর দিয়ে নিজের ভূমিকা পালন শুরু করেন। ফরাসি চরিত্রের সবচেয়ে জঘন্য এবং সবচেয়ে বীরত্বব্যঞ্জক গুণাবলিকে সামনে নিয়ে আসা জার্মানদের কাছে ফ্রান্সের পরাজয় ও দখলদারি ছিল তার জীবনের প্রথম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে আলবেয়ার কামু, ফ্রাঁসোয়া মরিসের পাশে রেনেসাঁর অন্যতম নায়ক হিসেবে অবস্থান নিয়েছিলেন সার্ত্রে; নািসদের হাতে কারারুদ্ধ হন তিনি। পরে নাস্তিক সার্ত্রে ক্যাথলিক মরিস ও সর্বেশ্বরবাদী কামুর সঙ্গে প্রবলভাবে সম্পর্কচ্ছেদ করে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নেতা হিসেবে লেখকের ভূমিকা নিতে এগিয়ে আসেন—বিভিন্ন দলের প্রতিষ্ঠাতা, প্রচারবিদ, বিভিন্ন আদর্শের যোদ্ধা, চিরন্তন বিদ্রোহী। কমিউনিস্ট, যৌন অরাজকতাবাদী, আত্মকেন্দ্রিক এবং হতাশ ও নাস্তিকবাদীদের সঙ্গে তার অস্পষ্ট সম্পর্ক অস্তিত্ববাদের সার্ত্রীয় ভাষ্যকে এক ধরনের সর্বজনীন ছাপ দিয়েছে; যা কোমলতর এবং আরো বিশ্ববিদ্যালয়মুখী ধরনগুলো কখনই পায়নি। ক্রিশ্চান অস্তিত্ববাদ ইউরোপের যুদ্ধ-পরবর্তী শোরগোল ও সংস্কারের বুনো বুদ্ধিবৃত্তিক অ্যক্টিভিস্টদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারেনি। সার্ত্রের ব্যক্তিগত পরিবর্তন এ প্রতিযোগিতাকে পেছনে ফেলেছে, অন্ততপক্ষে তরুণ মনের পক্ষে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। ঠিক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েই বহু আমেরিকান প্যারিসের সেইসব উদ্বেগাকুল, বিপজ্জনক ও ক্রুদ্ধ দিনগুলোয় লেখাপড়া, লেখালেখি বা নিজেদের আবিষ্কার করতে এসেছিল। তাদের অনেকের কাছেই সিমন দে ব্যুভেয়ারের সঙ্গে সার্ত্রের বিখ্যাত প্রেম, তার হাতে জুলিয়েট গ্রেকো এবং জাঁ গেনেটের আবিষ্কার, ক্যাফে দ্য ফ্লোরে, ওদিউক্স ম্যাগোট এবং টাব্যু ও রোজ রুগের মতো বিভিন্ন নাইট ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতা—সবই তিনি যে জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তারই অংশ। সার্ত্রে চীন থেকে শুরু করে যৌনতা পর্যন্ত সব ব্যাপারে তার প্রথাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে লেস টেম্পস মডার্নস নামে একটি মাসিক পত্রিকাও বের করেছিলেন। এদিকে অস্তিত্ববাদী বুলি—যন্ত্রণা, পরিত্যাগ, হতাশা ও বিষণ্নতা বোধের মতো শব্দ—বৈপরীত্যমূলকভাবে একাধারে জীবনের জন্য তার ভালোবাসা এবং পুলকের এক ধরনের তীব্র বোধের কথা বুঝিয়ে তার উপচানো হূদয় থেকে উৎসারিত হয়েছে।//// দার্শনিকের নৈরাশ্যবাদ যেন প্রফুল্ল ও তত্পর পুরুষকে মুক্তি দিয়েছে।
অ্যালবেয়ার কামুর সঙ্গে বন্ধুত্বের অবসানের ফলে দেখা দেয়া তিক্ত পাল্টা সমালোচনার প্রেক্ষাপটে অনেকেই সার্ত্রের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফ্রান্সের বিভিন্ন উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার প্রয়াসের বিরুদ্ধে অটল অবস্থান নেন তিনি এবং সম্ভবত তার বিশ্বখ্যাতিই আলজেরিয়া প্রশ্নে কারাগারে যাওয়া ঠেকিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতক বলা হয়েছে তাকে। তার অ্যাপার্টমেন্টে বোমা মারা হয়েছে। তিনি সরে গেলেও লেখা চালিয়ে গেছেন। তখন প্যারিসের অন্যতম প্রধান তরুণ বুদ্ধিজীবী তার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সার্ত্রে? তার কথা মনে আছে। খুবই মজার মানুষ। বেশি সিরিয়াস।’ এবং তারপর যেন কবরে নামানোর আগে কোনো লেখককে মৃত ভাবা যায় না, প্রমাণ করতেই আপাত নিঃশেষিত বিস্ফোরক ফের বিস্ফোরিত হলেন। আত্মজীবনী দ্য ওয়ার্ডসের প্রথম পর্বের প্রকাশনার ভেতর দিয়ে সার্ত্রে আরো একবার ফরাসি সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরুত হিসেবে প্রশংসিত হলেন। আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ব্যক্তিগত শত্রুরা এক ধরনের বিরল এবং অফরাসিসুলভ উদারতার সঙ্গে মেনে নিয়েছে যে ধূর্ত বুড়ো ফের বাজিমাত করেছেন কিংবা সম্ভবত অবশেষে কথা রেখেছেন। বীরোচিত শক্তির একটি রচনা নির্মাণ করেছেন তিনি, যে রচনাকে ভবিষ্যৎ হয়তো মেধাবীর কাজ হিসেবেই উল্লেখ করবে। ফরাসি সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরেই আত্মজীবনীমূলক স্বীকারোক্তির অতিমার্জিত ঘরানা হয়ে আছে—সেইন্ট অগাস্টিন, মিশেল মুতেগনিয়ে থেকে জিদ এবং জেনে পর্যন্ত—কিন্তু দ্য ওয়ার্ডসের মাধ্যমে সার্ত্রে এতে এক নতুন শক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছেন। স্রেফ নিজের কাহিনী বলছেন না, বরং নিজের যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করছেন এবং সেটা করছেন আন্তরিকতা, রসবোধ ও সাবলীলতার সঙ্গে। কথা ও ধারণা বাস্তব কিছু নয় বলছেন তিনি, তবু বাস্তবতার প্রকৃতি বুঝতে মানুষ কেবল এগুলোর কাছেই পৌঁছতে পেরেছে। গত নভেম্বরে নোবেল পুরস্কার কমিটির সার্ত্রেকে প্রায় ৫৩ হাজার ডলার মূল্যের পুরস্কার দেয়ার প্রয়াসকে এর গ্রহীতার সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে এক ধরনের উেকাচ বলে বর্ণনা করাও পুরোপুরি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পড়ে। তিনি তাদের তাকে পুরস্কার না দিতে বলে দিয়েছেন কিন্তু যেভাবেই হোক ওরা সেটা দিয়েছে। সোভিয়েত সরকারের চাপে বোরিস পাস্তারনাক ১৯৫৮ সালের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কিন্তু সার্ত্রেই স্বেচ্ছায় এই পরম পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে ইতিহাসের প্রথম লেখক হয়েছেন।
নিজের গোপনীয়তার প্রবল অভিভাবক সার্ত্রে দ্য ওয়ার্ডস বেরোনোর পর থেকেই সরাসরি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকার করে এসেছেন এবং নোবেল প্রাইজ কমিটি তাকে আবার বিশ্ববাপী খ্যাতি আর ফ্যাশনে ফিরিয়ে এনেছে। পুরস্কার লাভ এবং কয়েক মাসের ভেতর প্রচারণার শোরগোলের কথা আঁচ করেই প্লেবয় এই নিভৃতচারী লেখককে তার ৩৬ বছরের বন্ধু ও সহযোগী সিমোন দে ব্যুভোরের/////// সদয় মধ্যস্থতায় একটি দীর্ঘ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে সম্মত করাতে পেরেছে। বছরখানেক বেশি সময়ের ভেতর এটা তার তৃতীয় এবং একমাত্র আমেরিকান পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকার। চশমাধারী খর্বাকৃতি (মাত্র ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি) মানুষটি আন্তরিকভাবেই তার প্যারিসের একটা সাদামাটা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের ১০ম তলায় দুই কামরার ছিমছাম ব্যাচেলরস অ্যাপার্টমেন্টে স্বাগত জানালেন আমাদের। জানালার সামনে ক্রমাগত ধূমপান করার সময় প্রথমে আমাদের ঘূর্ণি খাওয়া টেপ রেকর্ডারের কারণে খোলামেলা কথা বলতে কিছুটা অনীহ মনে হচ্ছিল তাকে। কিন্তু আমরা কথোপকথনে ডুবে যাওয়ায় সেটার কথা আর মনে ছিল না।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আপনি বিভিন্ন প্রবন্ধ, উপন্যাস ও নাটকে অস্তিত্ববাদের নিপাট দর্শন প্রচার করার সময় বলা হতো যে আপনি প্যারিসে বোহেমিয়ান গায়ক, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, নর্তক, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং সব ধরনেরর একটি বড়সড়, পার্থিব—এবং কেউ কেউ বলেন আনন্দবাদী—আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আপনাকে নিয়ে এই স্ববিরোধী গল্পগুলো কীভাকে ব্যাখ্যা করেন?
জাঁ পল সার্ত্রে: আসল কথা হলো, অর্কেস্ট্রাবাদক কিছু ছেলেপেলে আমার বইও পছন্দ করত এবং সবাই হুট করে ধরে নেয় যে এর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত দর্শনের কোনো সম্পর্ক আছে। ওরা বলত, আমি নাকি আমেরিকান পিএক্সের নোংরা চেক শার্ট পরা একটা গোটা তরুণ প্রজন্মের জন্য দায়ী। কী অদ্ভুত কথা!
প্রশ্ন: আপনার ‘যন্ত্রণা’ ও ‘হতাশা’র দর্শনকেই কি এ বছরগুলোয় ফ্রান্সে ঘটা বহু আত্মহত্যার জন্য দায়ী করা হয়নি?
জাঁ পল সার্ত্রে: হ্যাঁ, তা ঠিক। সামেদি সোয়ের নামে একটা পত্রিকা তো আমার সম্পর্কে রাজ্যের অসম্ভব কাহিনীতে ভরপুর ছিল। যেমন একটা ছিল এ রকম: একটা মেয়ে বলেছে, রীতিমতো পেশাদার প্রতারকের কায়দায় ওকে আমার শোওয়ার ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়েছি আমি। একটা কাবার্ড খুলে ঠসঠসে ক্যামেম্বার্ট পনির বের করে ওর নাকের নিচে ধরে বলেছি, ‘শোঁকো!’ ওর কথামতো, এরপর ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলেছি, ‘এবার যেতে পারো।’ কিন্তু আপনি কি জানেন, আসলে কেন আমাকে ‘অপমানকর’ মনে করা হয়? তার কারণ, ১৯৪৫ সাল থেকেই পত্রিকাগুলো আমাকে মৃত এবং ধ্বংস হয়ে গেছি বলে বর্ণনা করাকেই মূল লক্ষ্য ধরে নিয়েছিল। প্রত্যেকটা পত্রিকা একই কথা বলেছে। ফলে গুজব ছড়িয়েছে। আমি লেখালেখি শুরুর পর থেকেই ওরা আমার মৃত্যুর ঘোষণা থামায়নি। আমি শেষ হয়ে কবরস্থ হয়ে গেছি বলা থামায়নি। মানুষকে যেটা ক্ষিপ্ত করছে তা হলো, আমি ডাবল ‘বিশ্বাসঘাতক’। আমি একজন বুর্জোয়া ও কর্কশ সুরে বুর্জোয়াবাদের কথা বলি। আমি প্রবীণ কিন্তু মূলত তরুণদের সঙ্গেই আমার বেশি সখ্য। ওদের সঙ্গেই আমার ভালো যায়। ওরাই আমার মূল জনতা। এমনকি তরুণ বয়সে পছন্দ করে থাকলেও চল্লিশের কোটার লোকজন সবসময় আমাকে বাতিল করে। তো আমি দুই দফা বিশ্বাসঘাতক—প্রজন্মের সংঘাতের ক্ষেত্রে একজন বিশ্বাসঘাতক এবং শ্রেণীসংগ্রামের বেলায়ও বিশ্বাসঘাতক। আমাকে নো এক্সিট আর নঅসার মাধ্যমে জানতে হওয়ায় ১৯৪৫-এর প্রজন্ম মনে করে যে আমি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। সেগুলো এমন এক সময়ে লেখা, যখন আমি আমার ধারণাগুলোর মার্ক্সবাদী তাত্পর্য উদ্ঘাটন করতে পারিনি। ওই সময় পর্যন্ত মার্ক্সবাদ স্রেফ আমার আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারেনি। ভালো পরিবারের ছেলে ছিলাম, আমার ধারণা ছিল অভাব আর কাজের বাধ্যবাধকতার ভেতর দিয়ে না গিয়েই দুনিয়াটা আমার হতে পারে। ফলে সাধ্যমতো সংগ্রাম করেছি আমি।
প্রশ্ন: আপনার জীবন নিয়ে কী করতে চেয়েছিলেন, সেটা কি এখনো জানতে পেরেছেন?
সার্ত্রে: জানতে শুরু করেছি। কি জানেন, ১৬ বছর বয়সে আমি ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইকোলে নোরমালে সুপিরিয়উরেতে নাম লেখায় দর্শন পড়তে বাধ্য হই। আমার লক্ষ্য ছিল সাহিত্যের প্রফেসর হওয়া। তারপর হেনরি বার্গসেনের লেখা একটা বই হাতে আসে আমার, যেখানে তিনি পরিষ্কারভাবে কারো মনের ভেতর সময় কীভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়, তার বর্ণনা দিয়েছেন। নিজের ভেতর এর সত্যতা আবিষ্কার করি আমি। কিছু কাল পরে ‘প্রপ্রঞ্চবিজ্ঞান’ আবিষ্কার করি আমি। অর্থাৎ যে কেউ যেকোনো বিষয়ে স্পষ্ট কায়দায় কথা বলতে পারে। এছাড়া যে কেউ দর্শনের বইয়ের চেয়েও ঢের বিশদ ও বৈজ্ঞানিক কায়দায় দার্শনিক কথা বলতে পারে। আমার মনে সাহিত্য ও দর্শনকে স্পষ্ট প্রকাশের কৌশলে একীভূত করার একটা ধারণা আসে—দর্শন পদ্ধতি ও শৃঙ্খলার জোগান দেবে আর সাহিত্য ভাষা জোগাবে। বস্তু ও মানুষ এবং পরে মানুষের নিজেদের সঙ্গে বিচিত্র ও নিরেট সম্পর্কের উন্মোচনই আগ্রহী করে তুলেছিল আমাকে।
প্রশ্ন: এসব সম্পর্কের সুলুক সন্ধান করতে গিয়ে আপনি লিখেছেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগারে প্রভাবিত হন।
সার্ত্রে: ঠিক। আমি যুদ্ধবন্দি ছিলাম। কারাগারে আমার সঙ্গে থাকা কয়েকজন যাজক ওদের দর্শন সম্পর্কে বলতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। হেইডেগারই ছিলেন একমাত্র লেখক, জার্মানরা//////////////// যার লেখা পড়ার অনুমতি ছিল আমাদের। শেষ বিচারে তিনি মত দিয়েছেন যে বস্তু হলো বাসনকোসন। আমার প্রথম উপন্যাস নঅসায় গাছপালার দিকে তাকিয়ে মূল দ্যোতনায় পৌঁছানোর জন্যই শব্দের মাধ্যমে ওগুলো কী তার সংজ্ঞা দিতে চেয়েছি। অন্য কথায়, সবকিছু আসলে সেসব কী নিরূপণের প্রয়াসে সবকিছুকে প্রশ্ন করার এক চিরস্থায়ী দায়িত্ব হাতে নিয়ে বসেছি আমি। বস্তু কী? আমরা এখানে কেন এবং কী করতে চলেছি? হেইডেগার যেমন মনে করেছেন, গাছ এমন কিছু, যাকে আগুন বা দালান বানাতে কেটে ফেলা হয়; গাছ যে কাজে ব্যবহার হয় তাই—মানুষের মতো। কিন্তু একজন মানুষ নিজেকে উপলব্ধির ক্ষেত্রে, নিজের এবং অন্যদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীন। মানুষের জীবনের কাঠামোর অভ্যন্তরে সব কাঠামোর দিকে নজর না দিয়ে আমি সেটাকে পরখ করতে পারি না, যা আমাদের মানবীয় চাহিদার কাছে ফিরিয়ে আনে—কাজ, সরঞ্জাম। এমনকি এক কাপ কফি বানানোর সময়ও বিশ্বকে পাল্টে দিই। এক্সিটেনশনালিজম অ্যান্ড হিউম্যানিজমে আমি ব্যাখ্যা দিয়েছি যে মানুষের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্রতম ও বৃহত্তম অর্থে, গোটা মানবজাতির পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাকে একজন বিধানদাতায় পরিণত করছে। একটা পূর্ণাঙ্গ ও গভীর দায়িত্ব থাকতেই হবে।
প্রশ্ন: আপনি লিখেছেন, ‘মুক্তিই মানুষের নিয়তি।’ এ কথা বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
সার্ত্রে: দুর্ভাগ্য, কারণ কোনো অজুহাত ছাড়াই দায়িত্বশীল বিশ্বে তাকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। চিরন্তন মূল্যবোধের কাছ থেকে পরিত্যক্ত হয়ে আমাদের অবশ্যই নিজেদের মূল্যবোধ নির্মাণ করতে হবে।
প্রশ্ন: কীভাবে?
সার্ত্রে: এ মুহূর্তের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি ‘আদি সিদ্ধান্ত’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছি—একটা নির্দিষ্ট ব্যাপ্তির সময়কে ধারণ করা একটা প্রলম্বিত মুহূর্ত—যেখানে কেউ নিজেকে একটা কিছুতে পরিণত করে, এ-যাবৎ যে সত্তাটিকে অন্যরা নির্মাণ করেছিল তাকে। আমরা অন্যদের হাতে তৈরি সত্তা হয়ে শুরু করি এবং তারপর অন্যরা আমাদের যেভাবে তৈরি করেছে, সেটা থেকে শুরু করে নিজেদের নতুন করে নির্মাণ করি। কিন্তু নিজেদের নতুন করে তৈরির এ মুহূর্তে এক ধরনের দ্বৈততা ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে: আমরা যা প্রত্যাশা করেছিলাম এবং অন্যরা আমাদের কাছ থেকে যা প্রত্যাশা করেছিল, সেটা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আমাদের আবিষ্কার করি আমরা। এটাই মুুক্তি কিন্তু তা প্রীতিকর কিছু নয়। সে কারণেই ‘মুক্তিই মানুষের নিয়তি’ পরিভাষা ব্যবহার করেছি।
প্রশ্ন: এ ভাষাতেই জাঁ জেনেকে বর্ণনা করেছেন আপনি। কীভাবে তিনি ‘মুক্তি নিয়তির অধিকারী’?
সার্ত্রে: শিশু জেনের শাস্তিতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গিয়েছিলেন।/////// কিন্তু বালকের নিজেকে পুনর্নির্মাণের যথেষ্ট শক্তি, ইচ্ছা ও মেধা ছিল। অবশ্য অনিবার্যভাবে হাতের কাছের উপকরণ দিয়েই নিজেকে পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি: তার বিকৃত সত্তা। আবার তিনি যা-ই করে থাকুন, তার ইচ্ছাগুলোর আবশ্যিকভাবেই তিনি আসলে যা চেয়েছিলেন, তার থেকে ভিন্ন পরিণতি থাকতে বাধ্য। তা সত্ত্বেও আমাদের সবার মতো তিনি আপন জীবনকে দেয়া নির্দেশনার জন্য পুরোপুরি দায়ী এবং জেনে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি। সত্যি বলতে কি, কেবল সমাজ তাকে যেমন চোর বানিয়েছে, তাকেই আবার নির্মাণ করা ছাড়া তার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ছিল না। ‘কবি জেনে’ হওয়ার বাস্তবতা ‘চোর জেনের’ প্রেসিডেন্টের ক্ষমা লাভ এবং সেই সঙ্গে কারাগার ও অপমানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তার কবিতার উৎস শুকিয়ে যাওয়ার দিকেও নিয়ে গেছে। তার মহান সৃষ্টিশীল মুহূর্ত—যখন তার লেখায় গভীর তাত্পর্য ছিল—তার সংগ্রামের সময়ই এসেছিল; কারাজীবন ও অপমানের বিরুদ্ধে তার মিথকে ভাষা দিয়েছে। প্রয়াস তাকে সমাজে এক ধরনের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে, এক ধরনের পাতি বুর্জোয়ায় পরিণত করতে সফল হলে—যদিও সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে তার কোনো মোহ ছিল না—তার পক্ষে লেখালেখির ভূমিকা গভীর তাত্পর্য হারিয়ে ফেলে। তিনি আর মিথের অধিকারী না থাকলেও এবং এই অর্থে তিনি নিখুঁতভাবেই মুক্ত হলেও পরিণাম বরং ভয়ানকই ছিল। এখন তিনি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ।
প্রশ্ন: তার সমকামী ছেলে বন্ধুদের কী অবস্থা?
সার্ত্রে: সামান্যই স্বস্তি জুুগিয়েছে ওরা। তার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মিরাকল অব দ্য রোজ তার সমকামিতার পক্ষে প্রয়োজনীয় বিভ্রম এবং এসব হতভাগা মানুষের ব্যাপারে তার সত্যিকার উপলব্ধির ভেতর এক ধরনের সংঘাতের দলিল ধারণ করছে। এটাই তার দ্বিধা। জেনের ভালোবাসার পুরুষদের তার কাছে একাধারে অনন্য এবং করুণাযোগ্য ঠেকেছে। ঠিক এখন করুণার বৈশিষ্ট্যগুলোই বেশি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি। জেনে তার ভালোবাসার বস্তুকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেছেন। এখন পেশাদার ঝুঁকিগ্রহণকারীদের দিকে নজর দিয়েছেন তিনি: অ্যাক্রোব্যাট, অটোমোবাইল রেসার। আগে ‘নিচু শ্রেণীর’ লোকদের পছন্দ করতেন তিনি, যারা অস্তিত্ব না থাকলেও শক্তির একটা বিভ্রম তুলে ধরত। বুঝতেই পারছেন, স্বভাবের কারণেই জেনে সমকামী। এটা আর তার সমগ্র সত্তাকে নিয়ে কল্পনার যৌন বিকার নয়। এটা আর এখন তাকে আমোদ দেয় না। আমার ধারণা, তিনি যে তরুণদের করুণা দেখাবেন, সেটা জায়েজ করতেই তাদের সঙ্গে ঘুমাতে বাধ্য মনে করেন নিজেকে।
প্রশ্ন: তার এ পক্ষপাতের প্রেক্ষাপটে কেন তাকে ‘সাধু জেনে’ খেতাব দিলেন?
সার্ত্রে: আমি দিইনি। এ খেতাব তিনি নিজেই দিয়েছেন। আমি সাধু জেনে বলার সময় অবশ্যই ঠাট্টা করেই বলি। এককালে সত্যিকারের একজন সাধু জেনে ছিলেন। অভিনেতা থেকে খ্রিস্টান হয়েছিলেন তিনি, রোমানরা তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। কিন্তু লেখক জেনে সবসময় তার বইয়ে বলেন, ‘আমি একজন সাধু’ কিংবা ‘আমি একজন নারী সাধু।’ এটা তিনি কী চান, কী তার লক্ষ্য, সেটা তুলে ধরে। কিন্তু তিনি তা নন, কারণ কেউ তা হয় না। আমরা হতে চাই কিন্তু আমরা আমাদের ইচ্ছা অর্জন করি না।
প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিগত তত্ত্বকে আরেক কদম সামনে নিয়ে আপনি কি নো এক্সিটের ‘নরক হচ্ছে অন্য লোকজন!’ কথাটা ব্যাখ্যা করবেন?
সার্ত্রে: আপনাকে জন্ম থেকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যেখানে নিজেকে সঁপে দিতে আপনি বাধ্য হওয়ার প্রেক্ষাপটেই অন্য লোকজন নরক। আপনি ধনী কিংবা একজন আলজেরীয় কিংবা একজন ডাক্তার অথবা কোনো আমেরিকানের ছেলে হয়ে জন্মেছেন। তারপর আপনার জন্য ভবিষ্যতের একটা বিরস মানচিত্র খাড়া করা হয়েছে, অন্যদের হাতে আপনার জন্য তৈরি ভবিষ্যৎ। ওরা এটা সরাসরি তৈরি করেনি, বরং একটা সামাজিক ব্যবস্থার অংশ; ওরা আপনি যা, সেই হিসাবে আপনাকে তৈরি করেছে। আপনি কৃষকের ছেলে হলে সামাজিক ব্যবস্থা আপনাকে শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য করছে, যেখানে মেশিন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে; যে মেশিন আপনার মতো লোকদের টিকে থাকার জন্য দরকার। তো বিশেষ এক ধরনের শ্রমিক, কোনো নির্দিষ্ট ধরনের পুুঁজিবাদী চাপে গ্রাম থেকে বিতাড়িত গ্রাম্য কিশোর হওয়াই আপনার নিয়তি। এখন কারখানা আপনার সত্তার একটি ফাংকশন/////////। আপনার ‘সত্তা’ আসলে কী? আপনি যে কাজ করছেন, যে কাজ আপনাকে ক্ষয় করে দেয়ার কারণেই আপনাকে সম্পূর্ণ বশীভূত করে—আপনার ঠিক জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী আপনাকে শ্রেণীবদ্ধকারী মজুরিসহ—এসবই অন্য লোকদের হাতে আপনার ওপর চাপিয়ে দেয়া নরক। তাই এ ধরনের অস্তিত্বের জন্য নরকই জুৎসই অভিধা। কিংবা ১৯৩০ বা ১৯৩৫ সালে আলজেরিয়ায় জন্ম নেয়া কোনো শিশুর কথা ধরুন। বিস্ফোরণে মৃত্যুবরণ করতে সে বাধ্য এবং নিপীড়ন হচ্ছে তার ভাগ্য। এটাও কিন্তু নরক।
প্রশ্ন: এ নিয়তি থেকে কি কোনো পরিত্রাণ, কোনো আশা নেই?
সার্ত্রে: নিশ্চয়ই আছে। আপনি লোকে আপনাকে যা বানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠে নিজেকে পাল্টে ফেলতে পারেন। আলজেরীয় শিশুটি মৃত্যু বা নিপীড়নের নিয়তি নিয়ে এলেও আজ নিজের বিদ্রোহে বেঁচে আছে। ওই সেই বিদ্রোহ করছে।////// জেনেও।///////////
প্রশ্ন: আপনি শিল্পী ও বিপ্লবীদের কথা বলেন। আপনি কি মনে করেন যে পৃথিবীতে আরো অনেকে আছেন, যারা তাদের নিয়তি পাল্টাতে সক্ষম?
সার্ত্রে: নিয়তি পাল্টানো বিশাল ব্যাপার। সেটাকে অসহনীয় হতে হবে। এটা সহনীয় অবস্থায় আসলেই সবচেয়ে খারাপ। একেই আমি বলি ‘বিচ্ছিন্নতা’। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন মানুষ সবসময়ই বস্তুগত জিনিসের বশ এবং খোদ এসব জিনিস অন্যদের হাতে উত্পন্ন, সৃষ্টি ও ব্যবহার হয়ে থাকে। এই অন্যরা তার মুখোমুখি হয় না। না। বিভিন্ন বস্তুর ভেতর দিয়ে ওরা তার ওপর চড়াও হয়। যেমন ধরুন, আপনি আমার কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন—আমাকে বিচ্ছিন্ন করেছেন—এ টেপ রেকর্ডারের মাধ্যমে। আমরা আমাদের গোটা আধুনিক সভ্যতাকে আমাদের মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছি। এভাবে খোদ আমরা জিনিসে পরিণত হয়েছি। আপনার এ যন্ত্রের প্রস্তুতকারী থেকে শুরু করে আপনি যে সাময়িকীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, এমনই হাজারো জিনিস বাদ সাধছে।
প্রশ্ন: আপনার সমালোচকরা আধুনিক জীবনের ‘বিচ্ছিন্নতা’, ‘যন্ত্রণা’ আর ‘হতাশা’র মতো বিভিন্ন ধারণা নিয়ে অদৃষ্টবাদী কায়দায় কাজ করার দায়ে আপনার সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে একই সময়ে মুক্তিকে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছেন কিন্তু সেটা অর্জনের কোনো নিরেট বা নিশ্চিত উপায়ের প্রস্তাবনা ছাড়াই।
সার্ত্রে: লোকে ভাবে হঠাৎ এক চমৎকার সকালে মোজা পরার সময় কেউ স্থির করতে পারে: ‘হুম, আমি একটা নৈতিক বিধান আবিষ্কার করে ফেলব।’ কিন্তু নৈতিক বিধান ‘উদ্ভাবন’ করা যায় না। একে অবশ্যই আগে থেকেই কোনোভাবে অস্তিত্ববান কিছু হতে হবে। আমাদের অবশ্যই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে নীতিবাদীকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না...একজন সত্যিকারের নীতিবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। অস্তিত্ববান নৈতিক বিধিবিধানকে বিবেচনায় না নিয়েই নিজস্ব আইন জারি করা নীতিকথার একটি ব্যবস্থা—অবশ্যই সেগুলোকে শুধরে নিয়েই—আদৌ সত্যিকারের নৈতিকতার ব্যবস্থা হতে পারবে না। এটা স্রেফ যে মানুষটি এর প্রচার করছেন, তিনি যে সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য, সেটারই ধ্যান-ধারণা তুলে ধরবে। এখানে একটা উদাহরণ দেয়া যাক: আন্দ্রে জিদ বলেছেন, ‘সর্বত্রের বদলে অন্যত্র ঈশ্বরের খোঁজ করো না।’ এবং ‘ঐকান্তিকতা’, ‘তৃষ্ণা’, ‘ইন্দ্রিয় সুখের কাছে আত্মসমর্পণ’-এর কথা বলে গেছেন তিনি। আপনি কি মনে করেন, জিদের বিধিগুলো একজন কারাখানা শ্রমিকের পক্ষে অর্থ ধারণ করে কিংবা এমনকি একজন ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে কিংবা একজন ডাক্তারের জন্য, যার ওয়েটিং রুম রোগীতে গিজগিজ করছে? এটা স্রেফ এটাই বোঝায় যে ‘আমি, জিদ, উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর সদস্য এবং ওই শ্রেণীতে চর্চিত বিশেষ সংবেদনশীলতার অধিকারী। সে কারণেই আমি সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিবেদন করতে পেরেছি। এ সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড দেখাচ্ছে যে অভিজ্ঞতার সব ধরনের রূপের সঙ্গে অভিযোজনযোগ্য সংবেদনশীলতা আমার আছে।’ এখানে আমরা একজন উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখকের নৈতিক বিধি পাচ্ছি। এটা একই শ্রেণীর অন্যান্য লেখকের কাছে গ্রহণযোগ্য। জন্মসূত্রে ওই শ্রেণীর না হলেও এটা আমি বুঝতে পারি। জিদের চরিত্রের মতো আচরণ করা উপকারী হবে ভাবতে পারি। কিন্তু এ ধরনের উপদেশ কোনো অ্যাসেম্বলি লাইনে ৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে এমন কোনো শ্রমিকের কাজে আসবে না। সে হতক্লান্ত হয়ে পড়ে। কীভাবে তাকে কেউ বাইরে গিয়ে শিহরণের জন্য গোটা দুনিয়াকে ওলটপালট করার কথা বলতে পারবে, যেখানে সারা দিন মগজ ঘোলা করা অমানুষিক খাটুনিতে বিবশ হয়ে গেছে?
প্রশ্ন: কিন্তু আপনার কাছে কি এ শ্রমিকের জন্য একটা অর্থপূর্ণ নৈতিক বিধি, মুক্তি অর্জনের কোনো বোধগম্য উপায় আছে?
সার্ত্রে: স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা নয়, ওর সমস্যা হলো সেটা জয় করা। আমাদের অবশ্যই এখানে তাকে সাহায্য করতে হবে। আজকের দিনে সত্যিকারের কোনো নৈতিক বিধির অস্তিত্ব নেই, কারণ নৈতিক বিধি নাম পাওয়ার মতো কোনো অবস্থা উপস্থিত নেই। মানুষ পরস্পরের কাছে দৃশ্যমান নয়। যেমন বলছিলাম, অসংখ্য মেশিন ও সামাজিক কাঠামো দৃষ্টি রুদ্ধ করে রেখেছে। আজ কোনো সত্যিকার নৈতিক বিধির কথা বলা অসম্ভব; কেবল বিশেষ শ্রেণীর প্রতি প্রযোজ্য এবং সুনির্দিষ্ট স্বভাব ও স্বার্থ তুলে ধরা নৈতিক বিধিমালা। আমাদের মতো সমাজে এটা অনিবার্য যে সামাজিক কাঠামোর সমাবেশ—ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা, একান্ত নিয়তির কথা না হয় বাদই থাকল—পারস্পরিক বোঝাপড়ায় প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে। এভাবে আপনি আপনার ব্যক্তিগত নিয়তি নিয়ে ছোটেন এবং যার যার নিজস্ব নিয়তি নিয়ে একজন নিগ্রো, একজন আরব, একজন কিউবানের সঙ্গে আপনার দেখা হয় এবং যেকোনো সত্যিকারের সম্পর্ক ভীষণ কঠিন প্রমাণিত হয়। কিংবা আপনাকে অবশ্যই কোনো ‘আন্দোলনের’ অংশ হতে হবে, যেখানে আপনি এর বাইরের সবকিছুর সঙ্গে সামগ্রিক বিচ্ছেদ ঘটান এবং নিজেকে ধরুন কিউবান সংগ্রাম বা আলজেরীয় সংগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। কিন্তু তার পরেও—সর্বোচ্চ সদিচ্ছা সত্ত্বেও—আপনি সম্পূর্ণ সংহতি অর্জন করতে পারবেন না। আপনি যার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবেন, সে আপনার পক্ষে সম্পূর্ণ মানুষ হবে না; সে হবে একটা ‘বস্তু’। যেমন আমেরিকানের পক্ষে কিউবার ‘চিনি’—চিনি নিয়ে গোলমালের একটি স্মারক।
প্রশ্ন: কিংবা কমিউনিজম।
সার্ত্রে: হ্যাঁ, কিংবা কোনো ধরনের প্রপাগান্ডা। আজ মানুষের ভেতর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে আমাদের অবশ্যই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। এটাই উপযুক্ত নৈতিক দায়িত্ব। মানুষ যদি মুক্তি পায়, তখন মুক্তি নিয়ে কী করবে, সেটা অনুমান করা আমাদের মতো যারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, তাদের বিষয় নয়। কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে, একজন মানবীয় সত্তা হিসেবে দেখা নীতিগত একটি ব্যাপার, যে নীতিকে কখনই বাদ দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: অপিনি মার্ক্সবাদী হলেও কখনো কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেননি এবং বহুবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে গেলেও ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি আপনাকে অনুমোদন দেয়নি। আপনি বুর্জোয়াদের পক্ষে নন কিন্তু সর্বান্তকরণে কমিউনিস্টদের সঙ্গেও নেই। আসলে আদর্শিকভাবে ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন আপনি?
সার্ত্রে: আমি একজন বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক নই। তবে একজন নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপে//////// যোগ দিতে পারি। এ থেকেই বোঝা যায় আমি কেন সর্বান্তকরণে আলজেরীয়দের সঙ্গে ছিলাম। এগুলোই তো নাগরিকের দায়িত্ব। আমার নৈপুণ্য যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক, আমি লেখার মাধ্যমে নাগরিকের দায়িত্ব পালন করতে পারি। বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমার দায়িত্ব চিন্তা করা, বাধাহীনভাবে চিন্তা করা, এমনকি ভুলের ঝুঁকি থাকলেও। আমার ভেতরে অবশ্যই কোনো বাধা আরোপ করতে পারব না এবং আমার প্রতি কাউকে সীমা আরোপ করতেও দেয়া যাবে না। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আমার সম্পর্কের বেলায়, মার্ক্সবাদ কেবল ‘সহযাত্রী’ থাকলেই পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে পারে—মানে কমিউনিস্টদের বন্ধু, যারা নিজেদের রাজনৈতিকভাবে শৃঙ্খলিত করে না এবং ভেতর থেকে মার্ক্সবাদকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠ করার চেষ্টা করে।
প্রশ্ন: কমিউনিস্টরা কি আদৌ ভেতর থেকে মার্ক্সবাদের বস্তুনিষ্ঠ পাঠের অনুমতি দেয়?
সার্ত্রে: এ মুহূর্তে পূর্ব ইউরোপের প্রায় সর্বত্র প্রকাশ্যে মার্ক্সবাদের মোকাবেলা করা একটা সমস্যা। এটা রাজনীতি বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের চাহিদার সম্পর্কের সমস্যা—নির্জনে যাপিত বৃদ্ধিবৃত্তিক জীবন নয়, বরং বিপ্লবী বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন। পূর্বের বুদ্ধিজীবীদের দাবি মুক্তি মানে এক ধরনের বুর্জোয়া ঔদার্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার জন্য মুক্তি।
প্রশ্ন: আপনি বিপ্লবের জন্য বিক্ষোভের কথা বলেন—অনুমানযোগ্যভাবে পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতদের। কিন্তু এটা কি সত্যি নয় যে ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের শ্রমিকশ্রেণী নিশ্চিত করে এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি ভোগ করছে, বিপ্লবের জন্ম দেয়া অর্থনৈতিক নিপীড়ন স্রেফ অস্তিত্বহীন? আপনার সমালোচকরা আপনাকে বিপ্লবী দেশ কিউবা, আলজেরিয়া, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর বাদ দিয়ে ফ্রান্সকে এর বাস্তব অবস্থায় দেখতে বলেন।
সার্ত্রে: আজ আমি যে ফ্রান্সকে দেখি, সেটা এত সুন্দর নয় যে তাকে পবিত্র করে তোলার পেছনে আমার প্রচুর সময় খরচ করা উচিত। এ ফ্রান্স মিথ্যায় ঝাঁঝরা। আমি ‘সচ্ছল সমাজের’ কথা যখন শুনি, আমার মনে হয় আমাদের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক মানুষ স্রেফ সাবসিস্ট্যান্স লেভেলে বাস করছে। সরকার বাস্তবতা আড়াল করছে। ঠিক এ মুহূর্তে ফ্রান্সে এক ধরনের কৃত্রিম আশাবাদ বিরাজ করছে। ওরা আমাদের ভোক্তা সমাজে পরিণত করতে চায়। প্রাচুর্যের এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরে ওরা আমাদের মনে ধারণা জন্মাতে চায় যে মজুরি বাড়ানোর দাবি এখন আর শ্রমিক শোষণের কারণে নয়; বাস্তবতার এক দানবীয় বিকৃতি! এরপর প্রাচুর্যের এ ধারণা থেকে শুরু করে আমাদের ক্রয়কে শর্তাধীন করে আমাদের নির্মাণের চেষ্টা করছে ওরা। ওরা সংগঠন মানুষ সৃষ্টি করতে চায়—অন্য কথায় এক ধরনের দ্বিমুখী টেকনোক্রেটিক দাসত্ব এবং একই সময়ে ভোক্তামনা মানুষ; অর্থাৎ যে মানুষের আকাঙ্ক্ষাগুলো অন্যদের আকাঙ্ক্ষার ছাঁচে তৈরি। এসবই আজ ঘটছে এবং এগুলো পুঁজিবাদের অবস্থান ধরে রাখার বিভিন্ন প্রয়াসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা ফরাসিরা যেখানে পারছি—যেমন ফ্রেঞ্চ কঙ্গোয়—পুঁজিবাদকে নব্য পুঁজিবাদে রূপান্তর করার চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের সহচর হিসেবে এক ধরনের কালো বুর্জোয়াশ্রেণীকে ক্ষমতায় রেখে দিয়েছি, এখনো বিনিয়োগ করা যাচ্ছে বলে তাদের ধন্যবাদ। এভাবে আমরা নিপীড়নের মাধ্যমে শাসন করা বাদ দেয়া একটা দেশের ওপর অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেছি। অন্যদিকে আলজেরিয়ায় ফরাসি আর্থিক সহযোগিতা শ্রমিকদের সঙ্গে এ সাহায্য ভাগাভাগি করতে সক্ষম একটি সমাজতান্ত্রিক সরকারকে দেয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন: আপনি কি বেশকিছু দেশের হাতে পারমাণবিক বোমা থাকা নিয়ে বেশির ভাগ আমেরিকানের উদ্বেগের অংশীদার?
সার্ত্রে: না, কারণ আমি ফরাসি এবং ফরাসিদের বোমার বেলায় সম্পূর্ণ হালকা মনোভাব রয়েছে বলে মনে হয়। একটা কার্টুনের কথা মনে পড়ছে, আমেরিকান, ব্রিটিশ ও ফরাসিরা একটা ক্যাফেতে বসে আছে। অ্যাংলো-আমেরিকানরা ‘বোমা’ শিরোনামঅলা পত্রিকা পড়ছে কিন্তু ফরাসিরা পড়ছে ‘দুধের দাম চড়া’ শিরোনামের পত্রিকা। আমরা ফরাসিরা বোমার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর নিস্পৃহতা দেখাই এবং এমনকি মনে করি, আমাদের নিরাসক্তি এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব। ঔপনিবেশিক যুদ্ধের গত ১২টি বছর এ বিষয়ে আমাদের কৌতূহলের ক্ষমতা ভোঁতা করে দিয়েছে। আমরা আলজেরীয় যুদ্ধ নিয়ে এতই ব্যতিব্যস্ত ছিলাম যে পারমাণবিক বোমা তৈরি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার ফুরসত ছিল না। ফরাসিরা ভয় পায় ফ্যাসিবাদকে। কিন্তু আসলে আমাদের যা হুমকি দিচ্ছে, সেটার বেলায় সে অন্ধ: আগেই যেমন বলেছি, মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতাকে দুর্বল করে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের দাসত্বের পর্যায়ে নামিয়ে দেয়া এক ধরনের টেকনোক্রেটিক সংগঠন।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে এটা ফরাসি সাহিত্যের মতো ফরাসি সমাজের ক্ষেত্রেও সত্যি?
সার্ত্রে: আমার সে রকমই মনে হয়। আজ ফ্রান্সে কোনো মহান লেখক নেই। ‘নতুন উপন্যাসের’ চর্চাকারীরা মেধাবী এবং প্রকরণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের বইগুলো আগ্রহোদ্দীপক। কিন্তু ওরা স্রেফ আমাদের টেকনোক্রেটিক, রাজনৈতিকভাবে বন্ধ্যা ফরাসি সামাজিক ব্যবস্থার যৌক্তিকতা ছাড়া আর কিছুই দিচ্ছে না। সাহিত্যকে হতে হবে স্পষ্টদৃষ্টি মানুষের কাজ, যারা গোটা মানবজাতির সমগ্রতাকে বিবেচনায় নেবে। সাহিত্যকে অবশ্যই অনুভব করতে হবে যে এটা এমন বিশ্বে অস্তিত্ববান, যেখানে শিশু অনাহারে মারা যায়। সাহিত্যকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে লেখক ও মানুষ হিসেবে অন্যের জন্য কিছু করার জন্য এটা আমাদের ক্ষমতার ভেতরই অবস্থান করে। আর অন্যরাও আমাদের জন্য কিছু করতে পারে।
প্রশ্ন: তবু আপনি আপনার শেষ বই দ্য ওয়ার্ডসে লিখেছেন, ‘আমি বিভ্রমমুক্ত...আমি আর এখন জানি না আমার জীবন নিয়ে কী করব।’
সার্ত্রে: এ কথা বলার সময় আমি বুঝিয়েছি যে তারুণ্যের বিভ্রম থেকে নিজেকে সারিয়ে তুলেছি।
প্রশ্ন: কী ধরনের বিভ্রম?
সার্ত্রে: যেমন বুর্জোয়া লেখককে নৈরাশ্যবাদীই হতে হবে, সমাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার কারণেই তিনি নিঃসঙ্গতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। দ্য ওয়ার্ডসে আমি দেখিয়েছি কীভাবে আমিই একটা সমাজের, একটা চলমান সমাজের সদস্য হওয়ার কথা বুঝতে পেরেছিলাম এবং এখন তারুণ্যের বিভ্রম থেকে মুক্ত বলেই আশাবাদীতে পরিণত হয়েছি বলে বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন: তাই যদি হয় তাহলে কেন লিখলেন যে এখন আর জানেন না, আপনার জীবনের কী অর্থ করবেন?
সার্ত্রে: এ কথা বলার সময় আমি বুঝিয়েছি যে বিভ্রম থেকে কারো মুক্তির ফলে বিচ্যুতির এক বিচিত্র অনুভূতি দেখা দেয়, ছিন্ন প্রান্তে থাকার বোধ—আমার ক্ষেত্রে করার মতো মূল্যবান কিছু ভাবতে না পারায় নয়, বরং সম্ভবত এমনকি কামুর ‘ইন্দ্রিয়জ পুলক’সহ হাতে নেয়ার মতো বহু কাজ রয়ে গিয়েছিল বলে। কিন্তু জীবনের কী অর্থ করব জানি না বলে কী বুঝিয়েছি, সেটা আরেকটু বিশদ করতে দিন। যে কেউ সহসা বিরাট কোনো আবেগ—ধরুন কোনো নারীর প্রতি—থেকে সেরে উঠলেই এমন বোধ করে। সেটা যখন ফুরিয়ে যায়, নিজেকে কেউ প্রশ্ন করে, ‘ওই নারীকে কেন ভালোবেসেছিলাম?’ এবং তাকে এমনকি মনেও করতে পারে না। একটা সময় এ নারীকে দেখার, তার কণ্ঠ শোনার, তার কথা ভাবার, তার ওপর নজর রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল আপনার। সে সবই ফুরিয়ে গেছে। আপনি এক ধরনের বাতিক কাটিয়ে উঠেছেন এবং স্বস্তি বোধ করছেন, কারণ নারীর জন্য এ ধরনের আবেগ কোনো আদর্শ অবস্থা নয়; তবু নিজেকে ছিন্ন প্রান্তে, বিচ্যুত অবস্থায় আছেন বলে অনুভব করেন।
প্রশ্ন: নারীর সঙ্গে আবেগীয় সম্পর্কের ব্যাপারে অবশ্যই অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলছেন, তবু নিজের বইয়ে ক্বচিৎ এটা নিয়ে লেখেন, কেন?
সার্ত্রে: আসলে স্রেফ লেখার মতো অন্য বিষয় আছে আমার। তার মানে এই নয় যে আমার কোনো আবেগীয় সম্পর্ক নেই বা ছিল না। সত্যি বলতে, নারীরা আমার জীবনে বরং বিশাল ভূমিকা রাখে, তবে আমার বইয়ে ছোটখাটো। সেসব পরমানন্দের কথা ভালো করেই জানা আছে কিন্তু সেসব নিয়ে লিখতে বিতৃষ্ণা বোধ করি। কারণ সেসবের আড়ালে রয়েছে আজকের দিনে কারো সত্যি পুরুষ হতে পারার ধারণা, যা কিনা বাস্তবে অসম্ভব। কামু বলতে পারেন, ‘আমাদের অবশ্যই পুরুষের সুখী হওয়ার অধিকার রক্ষা করতে হবে।’ এটা খুবই ঠিক কিন্তু তিনি মনে করেন, এটা এখনই রক্ষা করা সম্ভব, করতে হবে। অন্য কথায়, সুখের পরিস্থিতি আজকের দিনে অর্জন করা সম্ভব। কারো ইন্দ্রিয়জ সুখের কথা লিখে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করা সম্ভব হলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু সেসব একাকী উপভোগ করার মানে আমাদের সতীর্থ মানুষের সঙ্গে কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে রুদ্ধ করে রাখা। আমি আলজেরিয়ায় থাকতে এ ধরনের আনন্দে যোগ দেয়া কঠিন ছিল, যখন ঠিক আমার পাশেই একটা শিশু ছিল, যার চোখজোড়া মাছি খেয়ে ফেলেছে। আমি বলছি না এটা অসম্ভব কিন্তু আমাকে তা বিব্রত করে তুলত। তবে লেখক হিসেবে আমি মনে করি, আমার পক্ষে যেটা সবচেয়ে বেশি মানায় সেটাই করা উচিত; অন্যরা যেটা আমার চেয়ে ভালো করে বলতে পারেন না। আমি প্রায়ই ভাবি কোনো একদিন আমি আমার আনন্দ নিয়ে লিখব কিন্তু তার পরই নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে আমার জীবনের এদিকটা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার যোগ্য নয়।
প্রশ্ন: আপনি কি বিনয় করছেন না? আমাদের বলা হয়েছে যে আপনি প্রকাশ্যে প্রায় অব্যাহতভাবে ভক্ত ও আকর্ষণীয় নারীবেষ্টিত থাকেন।
সার্ত্রে: এটা সত্যি যে আমি সবসময়ই অন্তত সুদর্শনা নারীবেষ্টিত থাকার চেষ্টা করি। নারীর কুিসত রূপ আমার কাছে অপমানকর। এটা আমি স্বীকার করছি এবং এজন্য আমি লজ্জিত। তবে কারণটা সহজ। এমনকি নিরেট আনুষ্ঠানিক পর্যায়েও, এমনকি যখন সম্পূর্ণ নিরাসক্তি থাকে, তখনো নারীর সঙ্গে একজন পুরুষের সংযোগের ভেতর সবসময়ই যৌন তাত্পর্য থাকে। সব নারীর মতো একজন কুিসত নারী—আমরা নারীর সংস্পর্শে থাকলে যে ধরনের বিশেষ আনন্দ পাই, সেটাই তৈরি করে কিন্তু তার কদর্যতা দিয়ে সেই আনন্দ বরবাদ করে দেয় সে—জাগিয়ে দেয়া এবং অস্বীকার করা, বেশ, খুবই বিব্রতকর ব্যাপার। কিন্তু আমার নিজেকে নারীবেষ্টিত রাখার মূল কারণ স্রেফ পুরুষের চেয়ে নারীসঙ্গই আমি বেশি পছন্দ করি। আমার কাছে পুরুষদের সাধারণত একঘেয়ে লাগে। নারীদের রয়েছে বিশেষ ধরনের সংবেদনশীলতা এবং তারা কাজের কথা বলে। তবে তাদের মাঝে এমন বৈশিষ্ট্য আছে, যা নারীর দুর্ভাগ্য থেকে, তার একাধারে দাসী ও সহযোগী হওয়ার বাস্তবতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই তার সংবেদনশীলতা পুরুষের তুলনায় এত ব্যাপক। সে নাগালের ভেতর। যেমন একজন পুরুষ ক্যাফেয় বসে আরেক পুরুষের সঙ্গে চারপাশের লোকজন নিয়ে কথা বলতে পারে না। এসবে ক্লান্ত হয়ে ব্যক্তিগত উদ্বেগে কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ফিরে যায় সে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এমন কিছু, যাতে আমি একাই মগ্ন হতে পারি। আসলে কারো কথা আর সমস্যা নিয়ে একাকী যুদ্ধ করাই বেশি লাভজনক। পুরুষের সঙ্গে আলোচনা কখনই আমাকে খুব আনন্দ দেয়নি। আলাপ সবসময়ই চুপসে যায়। কিন্তু একজন নারীর কাছ থেকে আপনি ভিন্ন এক সত্তার সংবেদনশীলতা পান, সম্ভবত পুরুষের চেয়ে শ্রেয় এক ধরনের মেধা এবং একই ধরনের পূর্বভাবনায় বাধাগ্রস্ত হন না। একইভাবে আমার ইহুদি বন্ধুদের মাঝে বিশেষ করে যেটা উপলব্ধি করি তা হলো সৌজন্য ও সূক্ষ্মতা, নিশ্চিতভাবেই অ্যান্টিসেমেটিজমেরই ফল সেটা। এ কারণেই আমরা সবসময় জাতিসচেতন, এমনকি জাতিবাদকে স্বীকার না করলেও। নিপীড়নের ভেতর দিয়ে ওরা যেভাবে নির্মিত হয়েছে, সেভাবেই ইহুদিদের আমি পছন্দ করি। আমার মতে, স্রেফ নিপীড়নের কারণে ওরা যেভাবে আকার পেয়েছিল, তার ফলেই বর্তমান কালের পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। নারী প্রসঙ্গে ফেরা যাক, আমার মনে হয় নিশ্চয়ই আমার মনের নারীসুলভ একটা বৈশিষ্ট্য আছে, যেটা ওদের সুখী করে। এবং সিমন দে ব্যুভেয়ারের////////////// মতো আমি পূর্ণাঙ্গ নারী মুক্তির পক্ষে। কিন্তু ////////দিন যখন আসে যে বিশেষ সংবেদনশীলতার কারণে আমি নারীসঙ্গ পছন্দ করি, সেটা সম্পূর্ণ সুযোগের ওপর নির্ভর করবে; অনেক সময় একজন নারীর সেসব থাকবে, অনেক সময় থাকবে পুরুষের। সেসব নারীসুলভ বিশেষ ক্ষমতা হারাবে।
প্রশ্ন: এবার সাহিত্যে আপনার পছন্দের প্রসঙ্গে আসা যাক। কয়েক বছর আগে আপনি বলেছিলেন যে আপনি জন দোস প্যাসোসকে ‘আমাদের কালের সেরা লেখক’ মনে করেন। কেন সেটা মনে করেন? এখনো কি তাই ভাবেন?
সার্ত্রে: আমি তার ও ফকনারের বইগুলোকে দারুণ কৌতূহলোদ্দীপকভাবে আবিষ্কার করেছি। তিনি নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিকসুলভ কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, বিশেষ কিছু সিনেমাটিক কৌশল এবং যুগপত্তা। তখন এটা নতুন ছিল। বিশেষ করে তার ম্যানহাটন ট্রান্সফার এবং দ্য ফর্টিসেকেন্ড প্যারালেল//////////// আমার পছন্দ ছিল। কিন্তু তিনি অব্যাহত রাখেননি।
প্রশ্ন: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আপনার কি আর কোনো আমেরিকান বই পড়ে ভালো লেগেছে?
সার্ত্রে: খুবই কম।
প্রশ্ন: যেমন?
সার্ত্রে: বেশ, আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল হোয়াইটের দি অর্গানাইজেশন, স্পেকটোরস্কির দ্যি এক্সারব্যানাইটস এবং সি. রাইট মিলসের বই। আমার পরলোকগত এবং প্রিয় বন্ধু।
প্রশ্ন: আপনার নিজের লেখা নিয়ে কথা বলা যাক। আপনার বেশ কয়েকটি নাটক চলচ্চিত্রের জন্য অভিযোজিত হয়েছে। সেগুলোর কোনোটা কি আপনার ভালো লেগেছে?
সার্ত্রে: কেবল দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট বাদে আমার নাটকের চিত্ররূপগুলো খুবই খারাপ হয়েছে।
প্রশ্ন: তবু এ চলচ্চিত্রগুলো থেকে কি ভালো সম্মানি পাননি? তাছাড়া আপনি একজন সার্বক্ষণিক বেস্ট সেলার লেখক।
সার্ত্রে: ঠিক। সত্যি বলতে কি, খরচ করার মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ আছে আমার এবং সত্যি কথা হলো, আমি ধরে রাখতে অপছন্দ করি। আমার মনে হয়, আমাদের মালিকানায় থাকা জিনিসে বাঁধা পড়ে আছি—সেটা যাই হোক, টাকা কিংবা এটা দিয়ে কেনা জিনিস। আমি কোনো একটা জিনিস পছন্দ করলে সবসময়ই কাউকে দিয়ে দিতে চাই। এটা উদারতা নয়, এর একমাত্র কারণ আমি চাই অন্যরাও বস্তুর দাসে পরিণত হোক, আমি নই। এবং আমার দেয়া কোনো জিনিস কেউ পছন্দ করবে ভেবে আনন্দ পাই আমি।
প্রশ্ন: আপনি সম্পদ এড়িয়ে যান কিন্তু খ্যাতির বেলায়? আপনি কি দুনিয়াজুড়ে পাওয়া সম্মান কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফের/////////////////পাওয়ায় খুশি?
সার্ত্রে: কোনোভাবে, হয়তো কিন্তু আমি আমার খ্যাতির বন্দি হতে চাই না। এ মুহূর্তে সেটা যা-ই হয়ে থাকুক। আমি সবসময় বর্তমান এমন একটা অবস্থা, যাকে সাময়িক ভেবে পেছনে ফেলে যেতে চাই। আমি এক ধরনের ছেলেমানুষি বিভ্রমে অবস্থান করি: মানুষের সবসময় নিজেকে উন্নত করে তুলতে পারার বিভ্রম। নিজেকে আমি সতর্ক করে বলি, কয়েকটা বই লিখেছি আমি কিন্তু যদি ভাবি যে ওসব বইয়ে প্রকাশিত ধারণার সাফাই গাওয়া আমার দায়িত্ব, এমনকি অবস্থা পাল্টালেও, তাহলে আমি আর আমার মতো থাকব না। আমি নিজের বইয়ের শিকারে পরিণত হব। আমি মনে করি না জিদের মতো পদ্ধতিগতভাবে অতীতের সম্পর্কচ্ছেদের ওপর জোর দেয়া উচিত। তবে আমি সবসময় পরিবর্তনের প্রতি গম্য হতে চাই। আমি আমার লেখা কোনো কিছুতে আবদ্ধ ভাবি না। তা সত্ত্বেও আমি তার একটা শব্দও অস্বীকার করি না।
[নিচের কথোপকথন বেশ কয়েক মাস পরে হয়েছিল। সার্ত্রের ১৯৬৪ সালের নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের পরপর।]
শেষ একটা প্রশ্ন: আপনি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন কেন?
সার্ত্রে: আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাই না।
প্রশ্ন: কেন নয়?
সার্ত্রে: কারণ কোনো একাডেমি বা পুরস্কারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। আমি মনে করি, আমাকে যে পড়া হচ্ছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্মান।
[প্লেবয় সাময়িকীর ১২শ বর্ষ, ৫ম সংখ্যা, মে ১৯৬৫-তে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭৬; ঈষৎ সংক্ষেপিত]






