অনু কুমার । অনুবাদ: শওকত হোসেন

পাল তোলা জাহাজের আমলে ভ্রমণ ছিল শ্লথ, ব্যস্ততাহীন, বিপদ ও আশঙ্কায় ভরা। ব্রিটেন থেকে ভারতের উদ্দেশে যাত্রায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগত। বোম্বে পৌঁছার আগে পশ্চিম আটলান্টিকের সেইন্ট হেলেনা, উত্তমাশা অন্তরীপ, অডেন বা সোকোর্তায় (ইয়েমেন) যাত্রাবিরতি করত জাহাজ। অপ্রত্যাশিত ব্যাপারস্যাপারও ছিল বৈকি এবং জাহাজের বুকে রোমান্সের সম্ভাবনাও কম ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে দ্বিতীয় দফা চাকরিতে যোগ দেয়ার পথে ওয়ারেন হেস্টিংস ডিউক অব গ্র্যাফটন জাহাজের বুকেই তার আজীবনের ভালোবাসা ওলন্দাজ বংশোদ্ভূত ব্যারোনেস ইমহফের দেখা পেয়েছিলেন।

উনিশ শতকের শেষ নাগাদ অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের এবং দ্রুতগামী স্টিমশিপগুলো ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগর হয়ে পুবে যাত্রা করত। সুয়েজ খাল ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সময় আরো কমিয়ে দেয়, ফলে পর্যটকের সংখ্যাও ছিল বেশি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে চাকরির উদ্দেশে আসেন পুরুষ এবং পরবর্তীতে উনিশ শতকের শেষ নাগাদ আরো বেশি হারে আসেন নারী পর্যটক। শেষের এরা মূলত স্বামীদের সঙ্গে রওনা হলেও বেশির ভাগই অ্যান দে কাউর্সি তার গ্রন্থ হাজবেন্ডস-হান্টিং ইন দ্য রাজে যেমন লিখেছেন, ‘ফিশিং ফ্লিট’ গঠন করে স্বামীর সন্ধানে এসেছিলেন।

ইতিহাসবিদ অ্যালিসন ব্লান্ট লিখেছেন, ১৬২০-এর দশকে গোয়ায় মাত্র অল্প কয়েকজন ইউরোপীয় নারী ছিলেন, ১৮১০ সাল নাগাদ ভারতে ইউরোপীয় নারী ছিলেন প্রায় ২৫০ জন। ১৮৭২ সালে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশগুলোয় (আজকের উত্তর প্রদেশ) প্রায় পাঁচ হাজার ব্রিটিশ নারী ছিলেন এবং ১৯০১ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯১ জন ব্রিটিশ নাগরিকের ভেতর ব্রিটিশ নারী ছিলেন ৪২ হাজার ৪ জন। এ সময়ে ভারতে এক ধরনের সামাজিক বিভাজন ও রাজকীয় দূরত্ব সৃষ্টি ক্রিয়াশীল ছিল এবং ব্রিটিশ পুরুষদের স্বজাতির ভেতর থেকেই বিয়ে করতে উৎসাহিত করা হতো।

১৮৭০-এর দশকে আরামদায়ক ভ্রমণ থেকে সংসার সামলানোর মতো বিচিত্র বিষয়বস্তু সম্পর্কিত পরামর্শবিষয়ক গ্রন্থ জনপ্রিয় ঘরানার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মনোলোভা নামে উৎসর্গ করা স্রেফ পাণ্ডিত্যময় থেকে শুরু করে গল্পগুজব এবং আমোদময় বিভিন্ন স্টাইলের ছিল সেসব বই। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লোরা অ্যানি স্টিল ও গ্রেস গার্ডিনারের সংসার পরিচালনা সম্পর্কিত বই উৎসর্গ করা হয়েছে ‘আমাদের পুবের সাম্রাজ্যের হবু মায়েদের প্রতি’।

১৮৮০-এর দশক থেকে এ-জাতীয় বেশির ভাগ বইয়ের প্রকাশনা শুরু হয় এবং অনেক কয়টিই বেশ কয়েক দফা পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। ১৮৭৮ সালে এইচএমএলএস রচিত আ ফিউ ওয়ার্ডস অব অ্যাডভাইস অন ট্রাভেলিং অ্যান্ড ইটস রিকোয়ারমেন্টস অ্যাড্রেসড টু লেডিজ চতুর্থ সংস্করণ প্রত্যক্ষ করে। অন্যান্য নজির হচ্ছে: জনৈক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রচিত (বাজার নামে পরিচিত একটা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধের সংকলন) ইন্ডিয়ান আউটফিটস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্টস: প্র্যাক্টিক্যাল গাইড ফর পারসন্স অ্যাবাউট টু রিসাইড ইন ইন্ডিয়া (১৮৮২), ১৯০৯ সালের মড ডাইভারের দ্য ইংলিশ উইম্যান ইন ইন্ডিয়া। এ বইটির উপসংহারে ভারতে ব্রিটিশ নারীদের প্রশংসা করা হয়েছে, যাদের ছাড়া সাম্রাজ্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। ছদ্মনামে লেখা ছোটা মেমের দ্য ইংলিশ ব্রাইড ইন ইন্ডিয়া এবং মেজর লেই হান্ট ও আলেক্সান্দার কেনি রচিত টপিক্যাল ট্রায়ালস: আ হ্যান্ডবুক ফর উইমেন ইন দ্য ট্রপিক্স। ক্রমবর্ধমান একাকী নারী পর্যটকদের একটি দলের চাহিদা মিটিয়েছে লিল্লিয়াস ক্যাম্পবেল ডেভিডসনের হিন্টস ফর দ্য উইম্যান ট্রাভেলার অ্যাট হোম অ্যান্ড অ্যাব্রড (১৮৮৯)।

পুবে যাত্রার জন্য&dquote;&dquote;

উনিশ শতকের শেষ দিকে বোম্বেগামী বেশির ভাগ জাহাজ লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাউদাম্পটন থেকে রওনা হতো। বিভিন্ন যাত্রাবিরতিসহ তাতে সময় লাগত আনুমানিক ২৮ দিন। চারদিন পর উত্তর মিসরের পোর্ট সাইদে পৌঁছার আগে এসব জাহাজ জিব্রাল্টার থেকে মাল্টা হয়ে যেত। বেশির ভাগ পরামর্শ বইতে লোহিত সাগর থেকে এডেন অবধি যাত্রাকে কঠিন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমন লোকজনও ছিল, যারা প্রথমে ডোভার থেকে ক্যালাইস অবধি স্টিমারে এসে তারপর ট্রেনে প্যারিস, ম্যাকোন হয়ে স্টিমারে সিসিলির ব্রিন্দিসি থেকে আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে তুরিন পৌঁছতে ইউরোপ হয়ে স্থলপথে ভ্রমণের পক্ষপাতী ছিল। 

বিদেশে যাওয়ার পক্ষে শরত্কাল ছিল সবচেয়ে সেরা মৌসুম, তাহলে কারো পক্ষে শীতের মাঝামাঝি বোম্বেতে পৌঁছানো সম্ভব ছিল। প্রয়োজনে এটা ভারতের অভ্যন্তরে পরবর্তী ট্রেন যাত্রা গ্রীষ্মের তুলনায় সহনীয় করে তুলত—গ্রীষ্মকাল ভীষণ গরম।

যাত্রাপথে কী পরা উচিত তার পরামর্শ দিয়েছে এইচএমএলএস

‘... রাজকন্যার ঢঙে বানানো কোমল উষ্ণ টুইডের সাধারণ গাঢ় ধূসর রঙের গলা থেকে নিচ পর্যন্ত বোতাম আঁটা পোশাক বেছে নিন; স্কার্টের দুপাশে অবশ্যই পকেট থাকতে হবে, বার্থে শুয়ে থাকার সময় দরকার হতে পারে এমন জিনিস রাখার মতো যথেষ্ট গভীর হতে হবে সেটা, যেমন গোটা কয় পকেট-রুমাল, স্মেলিং বটল, অভিকোলন, ছোট ব্রাশ, চিরুনি, কাঁচি ইত্যাদি। নামার সময় অবশ্যই আরো কেতাদুরস্ত পোশাক পরতে হবে...বেশ পুরনো অন্তর্বাস ব্যবহারই ভালো বুদ্ধি, যাতে নোংরা হলে ফেলে দেয়া যায়।’

একাকী ভ্রমণ&dquote;&dquote;

লিল্লিয়াস ক্যাম্পবেল ডেভিডসন তার হিন্টস টু লেডি ট্রাভেলার্স বইতে একাকী ভ্রমণকারী সাহসী নারীদের জন্য বেশকিছু বিশেষ পরামর্শ জুগিয়েছেন।

বাথ ও বাথ টাওয়েল, ওষুধপত্র, একটা রিডিং ল্যাম্প, হালকা পাঠ উপকরণ (মালপত্রের ওজন না বাড়াতে) ইত্যাদি জরুরি জিনিস ছাড়াও বেশকিছু নিরাপত্তা কৌশলেরও পরামর্শ দিয়েছেন ডেভিডসন: ‘একটা দরজার কীলক খুবই সুবিধাজনক,’ ট্রেনের বিভিন্ন কম্পার্টমেন্টের ভেতর দিয়ে চলাফেরার সুযোগ জোগানো রেলওয়ে কি এবং একটা কম্পাস ‘নিজেই নিজের গাইড’ এমন পর্যটকের পক্ষে ভীষণ জরুরি। এছাড়া চোখ থেকে ধূলিকণা দূর করার জন্য একটা আইস্টোন সঙ্গে রাখার মতো কবিরাজি স্বাস্থ্যবিষয়ক জরুরি পরামর্শও আছে। পাথরটা চোখের পাঁপড়ির নিচে ঢুকিয়ে ওটার সঙ্গে সঙ্গে অক্ষিগোলক ঘোরাতে হয়। ফলে ধূলিকণা পাথরে সেঁটে যায় আর অনায়াসেই বের করা যায়।

সব পরামর্শ গ্রন্থই হ্যান্ড ব্যাগেজ হিসেবে বা ভারতে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত জিনিসপত্রের সঙ্গে না নেয়ার বেলায় একমত ছিল। পার্সেল পোস্ট অথবা প্রায়ই সফরে থাকা বন্ধুরা ইংল্যান্ড থেকে পাঠানো জিনিসপত্র দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছেন।

দর্জির প্রশংসা

মেমসাহেবদের পোশাক-আশাক সম্পর্কে ইন্ডিয়ান আউটফিটস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্ট বইয়ে বলা হয়েছে, ‘এক বছর কিংবা এমনকি দুই বছরের হিসাবে যথেষ্ট পরিমাণ নিতে হবে। কারণ ভারতে দেশের মতো ফ্যাশন অতটা দ্রুত একে অন্যকে ছাড়িয়ে যায় না। এমনকি গত বছরের বনেট কিংবা হ্যাট পরেও আপনার নিজেকে সেকেলে মনে হবে না।’

এইচএমএলএস যোগ করেছে, ভারতে কাপড়চোপড় সেলাই করানোও সম্ভব। বেশকিছু পরামর্শ গ্রন্থ দর্জিদের সতর্ক তারিফ করেছে। আউটফিটস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্টে আরো বিশদ বিবরণ ছিল:

‘দর্জি নির্ভরযোগ্য অনুকরণকারী, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বাস করার মতো নয়। ভারতীয় দর্জি ভীষণ চতুর কর্মী, নকলের বেলায় নিপুণ কিন্তু নতুন কিছু সৃৃষ্টিতে আনাড়ি। তাকে ভালো একটা নকশা দিন (এবং) ডাকযোগে দেশ থেকে নতুন নতুন যত খুশি নকশা আনাতে পারেন আপনি, তখন সে নিখুঁত দক্ষতায় দারুণ পোশাক তৈরি করে দেবে।’

পরামর্শ বইগুলো কিছু অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়ের তালিকা করেছে। আনুষ্ঠানিক পোশাকের ব্যাপারে বিশেষ সুপারিশ করেছে এইচএমএলএস:

‘কালো রেশমি পোশাকটিকে অবশ্যই ভালো কিছু হতে হবে। দুটো বডিজ ও দুটো স্কার্টেরও পরামর্শ দেব আমি...আসলে আপনাকে কিন্তু একটা পোশাক থেকে দুটো জামা বানাতে জানতে হবে। আপনার সান্ধ্য পোশাকগুলোকে ফুল, ফিতে ইত্যাদি সংযোজন করে পাল্টে নিতে পারবেন। লেসের পোশাক আপনার সাধ্যের ভেতর থাকলে (আমি সাদাই পছন্দ করব) খুবই ভালো; এটা আরো বহু সান্ধ্য পোশাকের চেয়ে বেশি টেকসই হবে। লেস দামি না হলেও সবসময় কাজে লাগে বিভিন্ন রঙে স্লিপে বারবার লাগানো যায়।’

ধোয়ার জন্যে কাপড় দেয়ার সময় মেমসাহেবকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে&dquote;&dquote;

‘আপনার লিনেনে নকশা থাকা চলবে না; ধোবি কর্কশ হাতের একজন মানুষ, সূক্ষ্ম লেস ও নকশায় সে ইচ্ছামতো কাজ করবে; বোতাম আর সেলাই ছিঁড়ে ফেলায় দৃশ্যত বৈরী পুলক পায় সে এবং প্রথম দফা ধোয়াতেই চমত্কার লিনেনকে অগোছালো জীর্ণ পোশাকে পরিণত করে।’

পুরুষদের জন্যও ভ্রমণ নির্দেশনা ছিল। তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল গরমের জন্য আদর্শ সাদা স্যুট এবং তারপর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সহজেই কেনা সম্ভব চওড়া কিনারা আর মজবুত ‘শোলার টুপি’।

অভ্যন্তরীণ সজ্জা

স্বামীরা কয়েক বছর পর পরই বদলি হওয়ায় ভারতে আসবাব ভাড়া করাই সবচেয়ে ভালো। সস্তা হওয়ায় ভারতে বেতের আসবাব কেনা যেতে পারে। এগুলোর অনেকগুলোই ‘এনামেল পেইন্ট ও ক্রিটোন কুশনের সাহায্যে’ সুন্দর করে তোলা যায়।

পিয়ানো কেনা অনেক বেশি কাজের বলেছে। ইতিহাসবিদ অ্যালিসন ব্লান্ট ইংল্যান্ডে বাবার কাছে লেখা জনৈকা ব্রিটিশ নারী ফ্রান্সেস ওয়েলসের চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। ভারতে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পিয়ানো তৈরি হতো। ফ্রান্সেস ওয়েলস লিখেছেন, তার পিয়ানো ‘সম্পূর্ণ তামায় মোড়ানো’ ছিল, ‘যাতে আবহাওয়া মোকাবেলা করতে পারে, ভারতে যেটা দরকার, টিন আর লাল নরম আবরণ ছিল প্যাকিং কেসে এবং সাদা পিঁপড়েকে দূরে রাখতে চারটা কাঁচের ইনস্যুলেটর।’

আউটফিটস অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্ট কম্বলের বদলে রাযাই বা ‘রেসাই’ নেয়ার সুপারিশ করেছে

‘সেনাবাহিনীর নামে বরাদ্দ খুব কাজের এক ধরনের হালকা তক্তপোশ আছে ভারতে, শোয়ার জন্য কিংবা গায়ে দিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। একে বলে রেসাই এবং প্রায় যেকোনো স্টেশনে এমনকি যেখানে কোনো সৈনিক নেই, সেখানেও সস্তায় কেনা সম্ভব। অনেক বছর টিকে থাকবে এটা।’