বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়-তুফান, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় নতুন কোনো ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এ সন্ধিক্ষণের শত শত বছর আগেও বাংলায় প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা গেছে, বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলে, যার একটি বিরাট অংশ একসময় বাখরগঞ্জ বলেই পরিচিত ছিল। এ বাখরগঞ্জ মানে আজকের বরিশাল, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুর জেলা। দালিলিক ইতিহাসে ১৫৮৪ সালে বাখরগঞ্জে এক গুরুতর ঝড়ের কথা জানা যায়। আবুল ফজল তার বিখ্যাত আইন-ই-আকবরিতে এ ঝড়ের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই ঝড় প্রবল জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছিল। আবুল ফজলের বিবরণী থেকে জানা যায়, আকবরের শাসনামলের ২৯তম বর্ষের কোনো একদিন বেলা ৩টার দিকে ঝড়টি আঘাত হেনেছিল। আসলে ঝড় না বলে সাইক্লোন বলাই শ্রেয়। কারণ সেই ঝড়ে পুরো জেলা জলোচ্ছ্বাসে ডুবে গিয়েছিল। বাকলা সরকারের তখনকার রাজা জ্ঞানদানন্দ রায় সেই ঝড়ের সময় কোনো আনন্দ-উৎসবে মত্ত ছিলেন। এরা চন্দ্রদ্বীপের রাজা নামে পরিচিত। মোগল আমলে তারাই ছিল বাখরগঞ্জের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবার। তিনি একটি নৌকায় আশ্রয় নেন। তার ছেলে পরমানন্দ রায় আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি মন্দিরের চূড়ায় উঠে যান। অনেক ব্যবসায়ীও উঁচু স্থানে সরে যান। বৃষ্টি ও বজ্রপাতসহ এ সাইক্লোন চলে ৫ ঘণ্টা ধরে। জলোচ্ছ্বাসে মন্দিরের উঁচু ভাগ বাদে সবকিছু তলিয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, এ ঝড়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৫৮৪ সালের ঝড় নিয়ে আমাদের জানা তথ্য এতটুকুই। এ ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে চন্দ্রদ্বীপের রাজাকে কচুয়া ছেড়ে আরো নিরাপদ অঞ্চল উত্তর দিকে গিয়ে আবাস তৈরি করতে হয়।

১৭৮৭ সালে এ অঞ্চলে এক ভয়ানক বন্যা হয়েছিল। সেই বন্যায় ফসলহানি হয়েছিল। ঢাকার তত্কালীন কালেক্টরের মতে, স্মরণকালে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাখরগঞ্জে দেখা যায়নি। বন্যার পরে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

এরপর ১৮২২ সালে বাখরগঞ্জ ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলকে ভাসিয়ে দিয়েছিল এক জলোচ্ছ্বাস। এ প্লাবন বাংলা ‘১২২৯ সনের বন্যা’ নামে পরিচিত। হাতিয়া দ্বীপ প্লাবিত হয়ে এর সব মানুষ ও প্রাণীকে চিরতরে দুনিয়া থেকে মুছে দেয়। বাখরগঞ্জের তত্কালীন জেলা প্রশাসক মি. কার্ডির দেয়া বিবরণ থেকে জানা যায়, তার দপ্তর কয়েক ফুট পানির তলায় ডুবে গিয়েছিল এবং অনেক দাপ্তরিক রেকর্ড, ফাইল ভেসে যায়। সন্ধ্যায় পূর্ব দিক থেকে ১২০ মাইল বেগে সামুদ্রিক ঝড় শুরু হয়। নদীর পানি বেড়ে গিয়ে সবকিছু ভেসে যায়।

এরপর বাখরগঞ্জ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুর্যোগটি এসেছিল ১৮৭৬ সালে এবং এটিই আমাদের আজকের মনোযোগের বিষয়। ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর যে সাইক্লোন তত্কালীন পূর্ব বাংলার বাখরগঞ্জ অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল, তার সমতুল্য ঘটনা ইতিহাসে আর নেই। ৪০ ফুটেরও বেশি উঁচু জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আড়াই লাখ মানুষকে। বঙ্গোপসাগরের কোনো সাইক্লোন থেকে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ হয়েছিল এবারই—৪৪ দশমিক ৬ ফুট। দুর্যোগের পর কলেরা, মহামারী ও দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিল আরো লক্ষাধিক মানুষ। সে সময়ের জনসংখ্যার বিপরীতে এই মৃত মানুষের অনুপাত কত বেশি ছিল তা সময়ে নিয়ে হিসাব করা যেতে পারে। ১৮৭৬ সালের সাইক্লোন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বেঞ্জামিন কিংসবারি তার অ্যান ইম্পেরিয়াল ডিজাস্টার: দ্য বেঙ্গল সাইক্লোন অব ১৮৭৬  গ্রন্থে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরেছেন।&dquote;&dquote;

১৮৭৬ সালে অক্টোবরের শেষের দিনগুলোয় বঙ্গোপসাগরে এক অদ্ভুত রকমের নীরবতা নেমে এসেছিল। যেন শিকারকে গিলে নেয়ার আগে মৃতের মতো পড়ে থাকা কোনো শিকারি জীব। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মৌসুমি বায়ু শেষ হয়ে এসেছে ততদিন। এবার অপেক্ষা উত্তর-পূর্ব মৌসুমি প্রবাহের। উপকূলে থাকা আবহাওয়া স্টেশনগুলো উচ্চ বায়ুচাপ, কম তাপমাত্রা ও হালকা বাতাস রেকর্ড করছিল। আকাশ অবশ্য মেঘমুক্ত।

এটা তখনকার বাংলায় ঝড়ের মৌসুম। জীবনবিনাশী সেই ঝড়ের উৎসস্থল ছিল বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ দিকে, নিকোবর দ্বীপের কাছে। ৩০ অক্টোবর ঝড়টি উত্তর দিকে এগোতে শুরু করে। ব্রিটিশ স্কেপট্রে জাহাজের কমান্ডার খারাপ আবহাওয়া টের পেয়েছিলেন, ৩০ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনি বুঝতে পারলেন ঝড় আসছে। মেঘও বড় বড় চাদরের মতো জমতে শুরু করেছে। চাঁদ থেকে কেমন লালচে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল, মেঘগুলো সেই রঙকে আত্মসাৎ করে আরো বেশি বেশি জমেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে বড় বড় ঢেউ ভেসে আসতে লাগল। রাত নাগাদ এসে গেল কালঝড়। সকাল নাগাদ সাগরের ঢেউ পাহাড়ের আকার ধারণ করল। আকাশে বিদ্যুতের চমক, বাতাসের ঝাপটা আর বৃষ্টি, যেন কেয়ামতের ছোট সংস্করণ মঞ্চস্থ হচ্ছিল। এরপর বাতাসের শব্দ একটা ধারাবাহিক অবিচ্ছিন্ন গর্জনে পরিণত হলো। ব্রিটিশ স্কেপট্রে তখন উত্তাল সাগরে খাবি খাচ্ছে। মনে হচ্ছিল জাহাজের মাস্তুল যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। তারপর হঠাৎ পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেল। মানে জাহাজ ঝড়ের কেন্দ্র থেকে সরে আসতে পেরেছে। ‘ধন্যবাদ ঈশ্বর!’ বলে হাঁফ ছাড়লেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। এরপর ঝড়ের মুখে গেল টেনিসন, তার ডেকে থাকা সবকিছু স্রেফ চোখের পলকে উড়ে গেল। কয়েক ঘণ্টা পর পালা এল লাইটনিংয়ের। এর ক্যাপ্টেন লিখেছেন, ‘বাতাস বইছে যেন প্রচণ্ড ক্রোধে, এ বাতাসের সামনে দাঁড়ানো অসম্ভব। বৃষ্টি পড়ছিল ফায়ার পাম্পের পাইপ দিয়ে ছিটকে বেরোনো প্রবাহের মতো, পালগুলো সরে গিয়েছিল। কিন্তু কেউই মাস্তুলে উঠে পাল ঠিক করতে রাজি হয়নি। পুরো পরিবেশ একেবারে কুয়াশার মতো ধোঁয়াশা হয়ে গিয়েছিল। শুধু নিজের জান বাঁচানোর চেষ্টা করা ছাড়া কারো আর কিছুই করার ছিল না।’&dquote;&dquote;

ক্যাপ্টেন নিজে যখন কোয়ার্টার বোটকে নিরাপদে রাখতে গেলেন, তখন বাতাসের এক দমকে তিনি ডেক থেকে ১০ ফুট শূন্যে উঠে গিয়েছিলেন। ডেকে পড়ার পর তিনি জ্ঞান হারালেন। একটা দড়ির সঙ্গে বাঁধা থাকায় তার জীবন রক্ষা হয়। বঙ্গোপসাগর থেকে স্থলভাগের দিকে আসতে আসতে শেষ যে নৌযানের সঙ্গে সাইক্লোনের মোলাকাত হয়েছিল, তার নাম মোলমেন; এটা একটা স্টিমার। এটা চট্টগ্রাম হয়ে কলকাতা যাচ্ছিল।    

৩১ তারিখ সকালে ঝড় বঙ্গোপসাগরের উপকূলে পৌঁছে গিয়েছিল। বিকাল ৫টায় মোলমেনের সবচেয়ে উঁচু মাস্তুলটা ভেঙে পড়ল। সন্ধ্যা ৭টায় একেবারে সামনের মাস্তুলটাও ভেঙে পড়ল। রাত ৮টায় ব্যারোমিটারে সর্বনিম্ন মান রেকর্ড করা হয়। ঝড় তখন স্থলভাগে পূর্ব দিকে এগোচ্ছে। তখনো সে মেঘনার মোহনায় পৌঁছেনি।

৩১ অক্টোবর রাতে উপকূলের নিম্নভাগ ও ছোট ছোট দ্বীপ অস্বাভাবিক উঁচু প্লাবনে ডুবে গিয়েছিল। তবে এই প্রথম প্লাবন তেমন ক্ষতি বয়ে আনেনি। এটা ছিল মূল জলোচ্ছ্বাসের অগ্রবর্তী নিশান। ঘূর্ণি বাতাস ও বাতাসের নিম্নচাপ সাগর থেকে পানি তুলে এনেছিল। এ পানি গিয়ে যখন মোহনার অগভীর নদীগর্ভে আছড়ে পড়ল, তখন বিরাট ঢেউ উঠল। এ ঢেউ সাগরমুখী মেঘনার স্রোতের মুখোমুখি হলো। আর এ ধাক্কাধাক্কিতে ঢেউগুলো কেবলই বড় আর উঁচু হতে লাগল। পরের দিন সাগরে থাকা জাহাজগুলো থেকে একটা সাধারণ প্রতিবেদন পাওয়া গেল—তারা সবাই অস্বাভাবিক কিছু নমুনা স্থলভাগ থেকে সাগরে ভেসে আসতে দেখছে, যার মধ্যে আছে উপড়ে যাওয়া গাছ, গবাদি পশুর মৃতদেহ, বাড়ির ছাদ, আসবাব ও অসংখ্য মানবের মরদেহ। 

৩১ অক্টোবর রাতে ঢাকার ওপর দিয়ে বেশ ঝড়ো বাতাস বয়ে গিয়েছিল। উপকূলবিনাশী সেই সাইক্লোনেরই লেজ ছিল এ হাওয়া। ৪ নভেম্বর নিয়মিত প্রতিবেদনে ঢাকার এ সংবাদ দিয়েছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ফ্রেডরিখ পিকক। কোনো জেলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির কোনো সংবাদ তখনো ঢাকায় &dquote;&dquote;আসেনি, এমনকি বাখরগঞ্জ থেকেও নয়। বাখরগঞ্জের সদর শহর বরিশাল থেকে কোনো চিঠি তখন ঢাকায় আসতে সময় লাগত। কিন্তু এবার সময় বেশি লাগছিল। ১ নভেম্বর কালেক্টর এবেনেজার বার্টন লেখেন, ‘গতকাল সারা দিন আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। আবহাওয়া যে খারাপ, তার পরিষ্কার ইঙ্গিত।’ সেদিন বেলা ৩টায় বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হলো। রাত ১১টায় বাতাস ঝড়ের চেহারা নিল। বার্টন রাত ১টায় বিছানা থেকে উঠে পড়েন, সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঝড় পর্যবেক্ষণ করেন। সকালে তিনি শহরে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা দেখতে বের হলেন। অনেক বাড়িঘর ও গাছপালা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তবে মৃতের কোনো সংবাদ ছিল না। তখন প্রশ্ন ছিল দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর কী অবস্থা? বার্টন আগের রাতে খেয়াল করেছিলেন যে বাতাস বইছে উত্তর দিক থেকে। তাই তার মনে হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চল হয়তো এ যাত্রা রক্ষা পেয়েছে। তবে তার মধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করছিল, নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। ২ নভেম্বর তিনি প্রথম দক্ষিণের পরিস্থিতির ইঙ্গিত পেলেন। তার একজন সহকারী ছিলেন তোজাম্মেল আলী। তোজাম্মেলের সরকারি দায়িত্ব ছিল বরিশালের উত্তর-পূর্বদিকে চর ফেনা বাহেরে। সাইক্লোন আঘাত হানার সময় তিনি নৌকায় ঘুমিয়ে ছিলেন। নৌকাটি ডুবে যায়। তোজাম্মেল একটা গাছে উঠে কোনোমতে রক্ষা পান। সারা রাত তিনি গাছেই ছিলেন। সকালে পানিতে অনেক মরদেহ ভাসতে দেখেন। জলোচ্ছ্বাসের কথা বার্টন এই প্রথমবারের মতো শুনলেন। বার্টন এবার দক্ষিণাঞ্চল থেকে কোনো খবর না আসার কারণ বুঝতে পারলেন। পরদিন সকালে দীননাথ সরকার ছোট এক নৌকায় করে বরিশালে পৌঁছলেন। দীননাথ ছিলেন দক্ষিণ শাহবাজপুরের সাবডিভিশনাল সদর দপ্তর দৌলতখানের পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর। দীননাথ বার্টনকে যে গল্প শুনিয়েছিলেন, তা অবিশ্বাস্য। অবশ্য সেই সাইক্লোনের ঢেউ স্বাভাবিক, চেনাজানা গল্প বলার সুযোগটি রাখেনি। দীননাথের বিবরণ ছিল এ রকম—&dquote;&dquote;

‘আমি ৩১ অক্টোবর রাতে যখন ঝড় শুরু হলো তখন স্টেশনেই ছিলাম। রাত ১১টার দিকে এক মোক্তারের বাড়িতে আগুন লাগে। আমরা সবাই সেদিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হলো আমাদের পায়ের নিচে পানি বাড়ছে। তারপর দেখলাম পানির প্রবল স্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। সেই ঢেউ দেখে আমরা বেঁচে থাকার সব আশা ছেড়ে দিই। আমি গার্ড হাউজের ছাদে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্রোতের তোড়ে আমরা সেখানে যেতে পারলাম না। আমরা কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে বন্দিদের ওয়ার্কশেডের ওপর উঠে গেলাম। কিন্তু পানি এত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছিল যে কিছুক্ষণ পরই সেই ছাদসহ আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমরা ছয়-সাতজন ছিলাম।’ কিছুক্ষণ ভেসে যাওয়ার পর তারা পানি উঠে থাকা একটি ছোট নৌকা পেলেন কিন্তু এ আশ্রয়ও বেশিক্ষণ টিকল না। এরপর ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলেন একটা ভাসমান শিমুল গাছ। একসময় ভাসতে ভাসতে গাছটি ফলের বাগানে আটকে যায়। তখন দীননাথ একটি আম গাছে উঠে পড়েন এবং সেখানেই পুরো রাত কেটে যায়। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে পানি অনেকটা নেমে যায়, দীননাথ তখন নেমে আসেন। আশেপাশে খোঁজ শুরু করেন আর কেউ বেঁচে আছেন কিনা জানতে। হেড কনস্টেবল গোবিন্দ দাসসহ আরো কয়েকজনকে পাওয়া গেল আশেপাশে। তারা সবাই সাবডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারের দিকে রওনা হলেন। কারো গায়ে তখন কোনো কাপড় ছিল না। ভাসমান কিছু পাতা, ছেঁড়া কাপড় দিয়ে নিজেদের ঢেকে নিয়ে তারা পথ চলতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর তারা দৌলতখান পৌঁছেন। ‘আমি জায়গাটা চিনতে পারছিলাম না।’ অন্তত ৩০ ফুট জলোচ্ছ্বাসে এ এলাকা আগের রাতে তলিয়ে গিয়েছিল। ঘরবাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল। মানুষজন যেন স্রেফ গায়েব হয়ে গিয়েছিল। বাজারের দিকে কোনোমতে একটা নৌকা পেয়ে সেটা নিয়ে দীননাথ বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। দীননাথ বরিশাল পৌঁছলেন ৩ নভেম্বর।&dquote;&dquote;

পরের দিন বার্টন দক্ষিণ শাহবাজপুরের সাবডিভিশনাল অফিসার উমাচরণ ব্যানার্জির প্রতিবেদনও পেলেন। উমাচরণের অভিজ্ঞতাও দীননাথের মতোই, ঝড়ের রাতে তার ওপর দিয়ে কী ঝড় যে গেছে, সেটা তিনিও ভালোভাবে স্মরণ করতে পারছিলেন না। ‘কীভাবে ভেসে গিয়েছিলাম আর কীভাবেই যে বেঁচে গেলাম, সেটা আমার স্পষ্ট মনে নেই।’ উমাচরণের হিসাবে, তার সাবডিভিশনে ১০ হাজার মানুষ ও ৫০ হাজার গবাদি পশু ভেসে গেছে। তার নিজের অভিজ্ঞতা ছিল, ‘আমার ঘরের গহনা-অলংকার, নগদ টাকা, আসবাবপত্র, বই, কাপড়চোপড় সবকিছু ভেসে গেছে।’ সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার ছিল, তাদের কাছে কোনো চাল-ডালও ছিল না।

এখন প্রতি ঘণ্টায় দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞের খবর আসতে শুরু করল। বার্টনের মনে হচ্ছিল, পটুয়াখালী সাবডিভিশনের উপকূল তলিয়ে গেছে। বাউফলের সাব-রেজিস্ট্রার ডি সিলভা তার অফিস চত্বরের একটা কাঁঠাল গাছে চড়েছিলেন, সঙ্গে আরো আটজন জীবন বাঁচাতে সেই গাছে উঠেছিলেন। গলাচিপায় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জ্যাকসন তার স্ত্রী ও সন্তানসহ ঝড়ের সময় মারা গিয়েছিলেন।  

২ নভেম্বর তোজাম্মেল আলীর কাছে ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির কথা প্রথমবারের মতো জানতে পেরেই বার্টন তাকে কিছু চাল-ডাল ও নগদ অর্থসহ উপদ্রুত এলাকার মানুষকে সহায়তার জন্য পাঠান। ডেপুটি কালেক্টরদের কিছু ত্রাণসহ মনপুরা, গলাচিপা, বাউফল পাঠানো হয়। দক্ষিণ শাহবাজপুরে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট এইচ. এন. হ্যারিস।&dquote;&dquote;

২ নভেম্বর বার্টন হিসাব করে দেখলেন দক্ষিণ শাহবাজপুরে ৪৬০ টাকার বেশি প্রয়োজন এবং এ টাকা দিয়ে হ্যারিসকে সেখানে পাঠানো হলো। বরিশালের এক ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি জর্জ কেরি তত্ক্ষণাৎ নৌকা বোঝাই করে চাল ও ৫০০ টাকা নিয়ে ত্রাণ দিতে রওনা হলেন। দুজন ডাক্তারকে পাঠানো হলো। কালেক্টরেট অফিসের ছোটখাটো কর্মচারীকে ত্রাণ ও নগদসহ বিভিন্ন দ্বীপে ত্রাণকেন্দ্র খোলার জন্য পাঠানো হয়। বার্টন এসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঢাকায় অবস্থানরত বিভাগীয় কমিশনার ফ্রেডরিখ পিকককে না জানিয়েই, কারণ তখন বার্টনের পক্ষে তাকে জানানো সম্ভবপর ছিল না, বরিশালে টেলিগ্রাফ কিংবা রেল যোগাযোগ কোনোটাই ছিল না। ঢাকায় চিঠি পাঠানো এবং তার জবাব পেতে সময় লাগবে কমপক্ষে এক সপ্তাহ। আর সেক্ষেত্রে ত্রাণের অভাবে বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে অনেকেই যে মারা যাবে তা বার্টন স্পষ্টই বুঝেছিলেন। সাহায্য যদি দিতে হয় তাহলে সেটা এখনই দিতে হবে—এটা বার্টন বুঝেছিলেন এবং সেই মতোই কাজ করেছিলেন উপরের নির্দেশনার বা অনুমোদনের অপেক্ষায় না থেকে। বার্টনের মনে হয়েছিল, উপরের নির্দেশনার অপেক্ষায় বসে থাকলে সেটা হতো ‘দায়িত্বকে অবহেলা করা...এবং এতে খুব সম্ভবত অনেক মানুষের জীবন ক্ষয় হতো...এবং সময়মতো সামান্য কিছু ত্রাণ তাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে।’

কিন্তু ইচ্ছা থাকা আর সেটা বাস্তবায়ন করার মধ্যে চিরকালই পার্থক্য দেখা যায়। এক্ষেত্রেও তাই দেখা গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছিল। ত্রাণ পাঠানোর একমাত্র উপায় ছিল জলপথ। কিন্তু বরিশালের বেশির ভাগ নৌযানই ঝড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আর অনেক ক্ষেত্রে নৌকা পেলেও মাঝি পাওয়া যাচ্ছিল না; তাদের অনেকেই ঝড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন, আবার অনেকে নিজের পরিবার বাঁচাতে ব্যস্ত। তবে সবচেয়ে যেটা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল তা হলো, তথ্যের অভাব। উপকূলীয় জেলাগুলোয় ঠিক কী অবস্থা হয়েছে, সেই ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বার্টনের কাছে বিশদ ও নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। দক্ষিণ শাহবাজপুরের দক্ষিণ দিকে কী পরিমাণ ক।সতি হয়েছে, সে সম্পর্কে তখনো বার্টনের কাছে কোনো খবর আসেনি। যা কিছু খবর পেয়েছিলেন তা মূলত মফস্বলের কর্মীদের কাছ থেকে. তাদের বিবরণেই ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির খবর বার্টনের কাছে পৌঁছেছিল।&dquote;&dquote;

শিগগিরই ত্রাণ দিতে যাওয়া কর্মীরা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠাতে শুরু করলেন। এদের মধ্যে হ্যারিসই ছিলেন সর্বোচ্চ পদধারী কর্মকর্তা। তার তৈরি করা পরিস্থিতির বিবরণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দৌলতখান যেতে যেতে তিনি চারপাশে মানুষ ও গবাদি পশুর অসংখ্য মৃতদেহ ভাসতে দেখেছেন। আরো দেখেছেন নৌকায় ভেসে থাকা গৃহহারা মানুষদের, যাদের জীবন বাঁচাতে দরকার ছিল খাবার ও পোশাকের। দৌলতখানে মরদেহ পচে বেরোনো গন্ধে সেখানে অবস্থান করাটাই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। আশেপাশের গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ সেখানে জড়ো হচ্ছিল খাবারের সন্ধানে কিন্তু কোথাও বিক্রির মতো চাল নেই। যা আছে তা কেবল সামান্য কিছু ত্রাণ। হ্যারিস তার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে অবশ্যই সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

বার্টন বিভাগীয় কমিশনার ফ্রেডরিখ পিকককে লিখলেন, ‘আমরা এ উপসংহারে পৌঁছেছি যে দুর্গতদের জীবন রক্ষার জন্য অতিসত্বর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা দরকার।’ বার্টন উপকূলীয় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোয় ৫০ হাজার মণ চাল, ১২ হাজার মণ ডাল, এক হাজার মণ সরিষার তেল, এক হাজার মণ লবণ ত্রাণসহায়তা দেয়ার প্রস্তাব করেন। আর রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ, পুকুর খনন, বাঁধ নির্মাণ করতে নগদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ চান। বার্টন তার সাধ্যমতো যা ছিল তাই নিয়ে ত্রাণসহায়তা দিতে নেমে পড়েছিলেন এবং তার চাহিদামতো ত্রাণ পেলে সেগুলো দিয়ে কী করবেন, তা নিয়েও পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি পিককের কাছ থেকে কোনো জবাব পাচ্ছিলেন না। পরিস্থিতি বার্টনকে উদ্বিগ্ন করে তুলছিল, ‘আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। বিতরণের জন্য সামান্য ত্রাণ ছিল আমার হাতে, আর এটাই আমার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছিল।’

জর্জ কেরির প্রতিবেদন থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি ৪ নভেম্বর দৌলতখান যাত্রা করেন। বরিশাল ছাড়ার পরই তিনি সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু পরের দিন সকালে দেখলেন আরেক ধরনের সংকট। নদীর তীর, চরে অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করছে। কয়েক জায়গায় কেরি তার সাধ্যমতো চাল-ডাল বিতরণ করেন। আর দেখছিলেন মরদেহ। ‘এ মুহূর্তে যখন আমি লেখা বন্ধ করছি, তখন আমার চোখের সামনে শত শত গবাদি পশুর মৃতদেহ। আর সেগুলোর মধ্যে এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে নারী-পুরুষের মরদেহ।’ কেরি তার যাত্রার শেষে দক্ষিণ শাহবাজপুরের দক্ষিণে অবস্থিত তজুমদ্দিনে পৌঁছলেন। এটা ছিল বিচ্ছিন্ন এক জেলার দুর্গমতম এলাকা। কেরি দেখলেন ঝড়ের পরে যারা বেঁচে গেছেন, তারা কোনোমতে পচা চাল, কাঁচা ফল, কলা গাছের কাণ্ড খেয়ে টিকে আছে। তাদের জন্য লবণ ছিল খুব দরকারি। পচা চাল খেতেও লবণ দরকার ছিল। বার্টনের কাছে পাঠানো কেরির প্রতিবেদনের ভাষা ছিল সুস্পষ্ট—‘সর্বোচ্চ দ্রুততায় এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী পাঠাতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, পাল তোলা বা দাঁড় টানা নৌকা এজন্য যথেষ্ট নয়, স্টিমারে করে ত্রাণ পাঠাতে হবে।&dquote;&dquote;

এবার একটি বিষয় উল্লেখ করার আছে, যা সুখকর কোনো ইতিহাস নয়। ব্রিটিশ কর্মকর্তা কেরি ও বার্টন যখন তাদের উপরওয়ালাদের অনুমতি ছাড়াই দুর্গতদের ত্রাণ দিতে চেষ্টা করছিলেন, তখন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দেন। সাইক্লোনের ধ্বংসযজ্ঞকে তারা অধিক মুনাফা অর্জনের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কালেক্টরেট অফিসের এক কেরানি ওহিদউদ্দিন মোহাম্মদকে পাঠানো হয়েছিল দক্ষিণ শাহবাজপুরে ত্রাণ বিতরণের কাজে। তিনি দেখতে পান দোকানদাররা অতি উচ্চমূল্যে চাল ও লবণ বিক্রি করছেন। তাদের সঙ্গে তিনি এ নিয়ে তর্ক করেন কিন্তু ফলাফল যথারীতি শূন্য। ওহিদউদ্দিন তখন বার্টনকে অনুরোধ করেন যেন অন্য জেলার চাল ব্যবসায়ীরা সেই চরাঞ্চলে চাল পাঠান সে ব্যবস্থা নিতে। বার্টনও এ প্রক্রিয়ায় বাজারে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তেমন সফল হতে পারেননি। বরিশালের বাজারের চাল সরবরাহকারীরা সবাই মিলে দাম বাড়াতে ঐকমত্য হয়েছিলেন। এমনকি লুটের ভয়ে তারা বেশি দক্ষিণে চাল পাঠাতেও অস্বীকৃতি জানান।

পিককের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের সাইক্লোনের খবর প্রথম পৌঁছে ৬ নভেম্বর। সাইক্লোনের চেয়ে তিনি বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন বার্টনের ত্রাণ তত্পরতা ও ত্রাণ চাহিদার হিসাব শোনে। পিকক মত দেন, বার্টন অতিরিক্ত ত্রাণের দাবি করেছেন। বার্টন যেখানে ৫০ হাজার মণ চাল চেয়েছিলেন, সেখানে পিকক ছাড় করেন মাত্র ৪ হাজার মণ। বার্টন, কেরির মতো কর্মকর্তারা ত্রাণ দিতে আগ্রহী হলেও উপরওয়ালারা তেমনটা ছিলেন না। এক্ষেত্রে বার্টন মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছিলেন। বেঞ্জামিন কিংসবারির অ্যান ইম্পেরিয়াল ডিজাস্টার: দ্য বেঙ্গল সাইক্লোন অব ১৮৭৬ গ্রন্থের সূত্রে এ সুযোগে বার্টনের কীর্তি আমাদের জানা হলো। তবে সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশ প্রশাসনের উপরওয়ালারা ত্রাণের পরিমাণ যতটা কম রাখা যায়, সে চেষ্টাই করেছিলেন।&dquote;&dquote;

১৮৭৬ সালে চট্টগ্রামের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন নবীণ সেন। ঝড়ের পরদিন সকালে নবীণ তার কমিশনারের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর তীরে গেলেন পরিস্থিতি দেখতে। কয়েক ঘণ্টা আগে এখানেই অনেক মানুষ পানিতে তাদের জীবন বাঁচাতে লড়াই করছিল কিন্তু নবীণরা যখন গিয়েছিলেন তখন সেখানে মরদেহ ছাড়া আর কিছু ছিল না। ‘চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। অনেক মরদেহ পশুর কঙ্কালের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল।’ নবীণ সেখানে এমন একটি দৃশ্য দেখেছিলেন, যেখানে মায়ের কোলের মধ্যে আঁকড়ে থাকা একটি শিশু, আবার আরেক জায়গায় দেখেন বাবা তার ছেলেমেয়েকে বাঁচাতে ধুতি দিয়ে নিজের শরীরের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন; আরেকখানে স্বামী তার স্ত্রীকে নিজের শরীরে বেঁধে রেখেছিলেন। সব দেখেশুনে নবীণের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, ‘হে ঈশ্বর, যা দেখলাম তা কি তোমারই ইচ্ছা?’

১৮৭৬ সালের সাইক্লোনের পর একটি গুরুতর বিষয় সামনে আসে, মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। দুর্যোগ-পরবর্তী পরিসংখ্যানে এটি স্পষ্ট হয়ে যায়। পটুয়াখালীতে ৮০ শতাংশ নারী মারা গিয়েছিলেন অথচ এখানে পুরুষের মৃত্যুর হার ছিল ৩৮ শতাংশ। দক্ষিণ শাহবাজপুরের দক্ষিণে ভুটা চরে ২৭৬ জন নারী মার যান, এর বিপরীতে নিহত পুরুষের সংখ্যা ছিল ১৯৬। তবে নারী ও পুরুষের মৃত্যুর সংখ্যায় যে পার্থক্য, তা এসব পরিসংখ্যানে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এ ঝড়ের পর পুরো বাখরগঞ্জে পুরুষ ও নারীর সংখ্যার অনুপাতে বিরাট ফারাক তৈরি হয়েছিল। পটুয়াখালীতে এ অনুপাত দাঁড়ায় ৫৩ : ৪৭ এবং গলাচিপায় ৫৬ : ৪৪।  

ঝড়ের পরে আইন-শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা দেখা দেয়। সাইক্লোনের পরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে লুটপাটের খবর আসতে থাকে। দৌলতখানে সোনাদানা ও চাল আছে এমন বাড়িতে লুটের ঘটনার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারিস। শহরের বাজারে লুটপাট ঠেকাতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন এক হেড কনস্টেবল। সাবডিভিশনাল ট্রেজারি সিন্দুক কাচারির ধ্বংসাবশেষের নিচে সুরকি, মর্টার দিয়ে চাপা দেয়া হয়। চট্টগ্রাম শহরে অবশ্য লুটপাটের কোনো খবর শোনা যায়নি। কিন্তু সীতাকুণ্ডে এমনকি মরদেহের শরীর থেকে কাপড়চোপড় ও অলংকার খুলে নেয়া হয়। পানিতে ভেসে আসা সম্পদও লুট হয় দেদার। নোয়াখালীতে চরম অরাজকতার খবর পাওয়া যায়। ছোট ছোট দল কুঠার, কাঁচি, মুগুর নিয়ে বাড়িঘরে হামলা চালাত এবং যা পেত তাই লুটে নিত। হাত-পাহীন অনেক মরদেহ পাওয়ার গুজব উঠেছিল। ধারণা করা হয়, অলংকার লুট করার জন্যই এ বীভৎসতা দেখা দিয়েছিল।  &dquote;&dquote;

উল্লেখ্য, ব্রিটিশরা বাংলার উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর মানুষকে অন্য জায়গার তুলনায় অধিক অপরাধপ্রবণ বলে আগেই মূল্যায়ন করেছিল। শুরুর দিকে বাখরগঞ্জের একজন ম্যাজিস্ট্রেট লিখেছিলেন, ‘এখানকার অধিবাসীদের সাধারণ চারিত্রিক নৈতিকতার মান নীচু...উঁচু শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে প্রতারণা ও খারাপ কাজের এমন কোনো নিদর্শন নেই, যা দেখা যায় না। আর নিম্নশ্রেণীর মানুষ এসব অপরাধের সঙ্গে খুন-জখম, ডাকাতি, চুরির সঙ্গে জড়িত। সামান্য কারণেই এরা মারামারি শুরু করে দেয়। একটু বেশি হলেও এটা বলা যায় যে, এ জেলার সব মানুষই ডাকাত।’ অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান সময়েও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন চর ও দুর্গম অঞ্চলে নারীর প্রতি সহিংসতা, ডাকাতি, খুনের ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা যায়। বোর্ড অব কাস্টমস, সল্ট অ্যান্ড আফিমের সচিব হেনরি পার্কার মনে করতেন, যেকোনো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই এ রকম অপরাধ প্রবণতা দেখা যায়। তার কথায়, ‘...যেসব স্থানে মানুষ বনের পাশে বাস করে কিংবা সাগরতীরে কিংবা ভয়াল নদী দিয়ে ঘেরা দ্বীপে (চর) বাস করে, তারা কর্কশ, রুক্ষ প্রকৃতির হয়।’

পূর্ব বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রশাসনিক স্থাপনার বিকাশ হয়েছিল এ অঞ্চলের অপরাধ প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বাণিজ্য স্বার্থকে নিরাপদ রাখতে। বাখরগঞ্জে প্রথম পুলিশ স্টেশন স্থাপিত হয়েছিল নদীর তীরে কোম্পানির বাণিজ্যিক নৌযানকে ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। নোয়াখালীতে প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সেখানকার নতুন চরগুলোয় ডাকাতি প্রতিরোধ করার জন্য। ১৮৭৬ সালের সাইক্লোন-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের কাজে রাষ্ট্রশক্তির যে প্রাধান্য বিস্তারকারী ভূমিকা দেখা গিয়েছিল, তা হয়েছিল মূলত এ অঞ্চলের অপরাধ প্রবণতার অতীত ঐতিহ্য ও সাইক্লোন-পরবর্তী ডাকাতির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। সব কর্মকর্তা একমত হয়েছিলেন, এ অঞ্চলে পুলিশি শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। সাইক্লোনের পর পরই যেসব ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল, তার বড় অংশটিই করেছিল পেশাদার ডাকাত দলগুলো; যারা উপকূলীয় অঞ্চলে সক্রিয় ছিল। কিছু স্থানীয় পুলিশ সদস্যও ডাকাতিতে যোগ দিয়েছিলেন। অনেক স্থানে অবশ্য মানুষ খাবার ও ত্রাণের অভাবে লুটপাট করেছিল। এক্ষেত্রে লুটপাট হয়েছিল মূলত খাদ্যসামগ্রী। দৌলতখানে মানুষ বাজারের দোকানে হামলা করেছিল। ভোলার তজুমদ্দিনে এক চাল ব্যাবসায়ীকে ক্ষুধার্ত মানুষ দলবেঁধে কিছু চাল দিয়ে দিতে বাধ্য করেছিল। ১২ নভেম্বর হাতিয়ায় একদল স্থানীয় লোক এক বণিকের নৌকায় থাকা পণ্য লুটে নেয়। উল্লেখ্য, হাতিয়ায় তখনো মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি।      

সাইক্লোনে জীবনহানি, এরপর খাদ্যাভাবের মধ্যেই হাজির হয়ে যায় কলেরার মহামারী। নোয়াখালীর কালেক্টর রেজিনাল্ড পর্চ ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দেন, তার জেলায় কলেরা ছড়িয়ে পড়েছে। কলেরায় সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সন্দ্বীপ। ১৮৭৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে কলেরার প্রকোপ অব্যাহত ছিল। চট্টগ্রামে কলেরায় মারা গিয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আর নোয়াখালীতে প্রায় ৫০ হাজার। আনুষ্ঠানিক হিসাবে ১৮৭৬ সালের সাইক্লোন-পরবর্তী কলেরার মহামারীতে ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। তবে গবেষকরা মনে করেন, এ সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছিল।

সূত্র :

বেঞ্জামিন কিংসবারি, অ্যান ইম্পেরিয়াল ডিজাস্টার : দ্য বেঙ্গল সাইক্লোন অব ১৮৭৬

বাখরগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার