ফলের রাজা আম। সুস্বাদু এই ফলের সঙ্গে নাড়ির যোগ রাজশাহীর। আমের প্রসঙ্গ এলেই সবার আগে রাজশাহীর নাম আসে। রাজশাহীর প্রসঙ্গ এলে আম আসবেই। এক কথায় আমের রাজশাহী, রাজশাহীর আম।

মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ফল এটি। প্রায় ৬৫০ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতীয় উপমহাদেশে রাজত্ব করছে আম। আমের যেমন জাতের ভিন্নতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বাদ-গন্ধের ভিন্নতাও। সুতরাং কোন অঞ্চলের আম শ্রেষ্ঠ তা বিচার করা সত্যিই কঠিন।

বরেন্দ্র অঞ্চল খ্যাত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ আমের জন্য বিখ্যাত। এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসলও এটি। রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়ায় উৎপাদিত ফজলির খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে বহু আগেই। ১৫২৩ সালে নির্মিত বাঘা শাহী মসজিদের পোড়ামাটির টেরাকোটায় শোভা ছড়াচ্ছে ফজলি আম। এই ফজলির ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহী।

তবে অর্জনে ভাগ বসিয়েছে পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সেখানকার শিবগঞ্জ ও ভোলাহাটে উৎপাদিত ফজলির রাজত্ব যুগ যুগ ধরেই। ১৮০০ সালের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তসংলগ্ন গৌড়ে ফজল বিবির নামেই এ আমের নামকরণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ওপারে ভারতের মালদাহ। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের আগেই ফজলির জিআই স্বীকৃতি নিজেদের অধিকারে নিয়েছে মালদাহ।

কথিত আছে, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে মালদহের কালেক্টর র্যাভেন সাহেব ঘোড়ার গাড়ি চেপে গৌড় অর্থাৎ এখনকার সোনামসজিদ যাচ্ছিলেন। পথে তিনি স্থানীয় বাসিন্দা ফজলি বিবির কাছে পানি পান করতে চান। ওই সময় জেলা কালেক্টরকে বাড়ির আঙিনার আম গাছ থেকে আম পেড়ে খাওয়ান ফজলি বিবি। সেই আমে বুঁদ কালেক্টর। ইংরেজিতে জানতে চান আমের নাম। বুঝতে না পেরে ফজলি বিবি বলেন নিজের নাম। সেই থেকে ফজলি নামে প্রচার পায় এই আম।

কেবল ফজলি নয়, ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর আমের জিআই স্বীকৃতিও রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের। এ আমের খ্যাতিও গগনচুম্বী। ফজলির আরেক জাত নাক ফজলি। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা থেকে এ জাতের আমের বিস্তার আশপাশের এলাকায়। নাক ফজলিরও রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস।

ইতিহাস বলছে, ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা বা দেশে প্রচলিত আমের আদি নিবাস বাংলাদেশেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বুনো জাতের আমগাছ প্রথম দেখা যায়। তবে সুস্বাদু আম উৎপাদন হয় পদ্মা-মহানন্দা অববাহিকায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ (অংশবিশেষ) এবং নাটোরের অংশবিশেষ, কুষ্টিয়ার অংশবিশেষ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়ার অংশবিশেষ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এখানকার মাটি ও জলবায়ু আমকে এনে দিয়েছে বিশেষ স্বাদ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আম উৎপাদন এলাকাও এটি।

আমের আদি বাস নিয়ে মতভেদ থাকলেও ইতিহাসবিদরা একমত, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময় থেকেই আমের বিস্তার মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে।

চীন পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে বাংলাদেশের আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেন। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আফ্রিকায় আম চাষ শুরু হয়।

এরপর ১৬ শতাব্দীতে পারস্য উপসাগরে, ১৬৯০ সালে ইংল্যান্ডের কাচের ঘরে, ১৭ শতাব্দীতে ইয়েমেনে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আম চাষের খবর জানা যায়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আমের আঁটি থেকে গাছ হয়। জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ভারতের শাহবাগের দাঁড়ভাঙায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করে উপমহাদেশে প্রথম উন্নত জাতের আমবাগান গড়ে তোলেন।

 

আলী মুহাম্মদ: সাংবাদিক