জিল ম্যাকডোনাল্ড। ভাষান্তর : শানজিদ অর্ণব
এখানে আমি হাবিবের স্মৃতিকথার আরেকটি সমালোচনা লিখতে বসিনি, বরং আমার উদ্দেশ্য হাবিবের সঙ্গে আমার সম্পর্কের বিবরণীতে কিছু সংশোধনী দেয়া।
এটা বলা দরকার, হাবিবের বইটা কোনো সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে লিখিত স্মৃতিকথা নয়। এতে হাবিব জীবনের স্মরণীয় ব্যক্তি ও ঘটনার চিত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছে। এর সঙ্গে মিশেছে থিয়েটারের বিকাশ নিয়ে তার ভাবনা, প্রেম; তবে কোনো কিছুতেই কালক্রম নেই। কিছু বিবরণ অসম্পূর্ণ এবং অতি অবশ্যই একটি বিবরণী নিশ্চিতভাবেই সঠিক নয়।
হাবিবের বইয়ের যে বিবরণীটি নিয়ে আমার মাথাব্যথা, সেটা আমাকে নিয়েই; বইয়ের ৩০২ নম্বর পাতায় এর দেখা মিলবে। কথাগুলোর জন্য মনে হয় কেউই প্রস্তুত ছিল না, আমি নিজেও না। সেই অংশটি শুরু হয়েছে এভাবে: ‘একদিকে মনিকা, অন্যদিকে জিল— এদের মধ্যে কে আমার সন্তান গর্ভে নিয়ে ভারতে আসতে চলেছে।’
দুই বছর হাবিবের সঙ্গে আমার সরাসরি দেখাসাক্ষাৎ ছিল না, তবে এ সময় মাঝে মাঝেই যোগাযোগ হতো— হাবিব যখন ইংল্যান্ড ছেড়ে যায় তখন আমার বয়স ১৯ এবং আমি শেষমেশ ভারতে গিয়েছিলাম ২১ বছর বয়সে। খবরটা অস্বস্তিকর ছিল। সে সময় মনিকা হাবিবের প্রতি ‘ব্যর্থ প্রেম’ অনুভব করলেও বিষয়টা সমাধান হয় না। এরপর আরো অনেক নাটকীয় ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেগুলো হাবিবের মেমোয়ারসে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তেমন নয়।
এ রকম প্রেক্ষাপটে আমি নিজের গল্পটা লেখার সুযোগ পেয়ে খুশি। এ গল্প অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে গুজব আর ভুল বোঝাবুঝির কুয়াশায় ঢেকে আছে।
হাবিবের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে, আমার বয়স তখন ১৬ আর হাবিবের ৩২। এডিনবরায় আমরা একই গেস্ট হাউজে উঠেছিলাম, আমার বোন কার্লি সেখানেই লজিং থাকত। কার্লি আমাকে এডিনবরা উৎসবে তার সঙ্গে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অনেক উত্তেজনা নিয়ে আমি সেখানে গিয়েছিলাম।
চিঠিতে আমার বোন লিখেছিল, তার ওখানে একজন মজার ভারতীয় উঠেছেন, যার সঙ্গে আমি হয়তো দেখা করে আনন্দ পাব। সে জানত আমি তার দেশ নিয়ে রোমাঞ্চিত ছিলাম। হ্যাঁ, আমি বোনের কথামতো কাজ করেছিলাম এবং হতাশ হইনি। তত্ক্ষণাৎই আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল। আমি সেখানে যাওয়ার তৃতীয় দিনে প্রাতঃরাশে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো, প্রথম দুদিন তাকে নাশতার টেবিলে না পেয়ে হতাশ হয়েছিলাম। সে ঘুম থেকে অনেক দেরি করে উঠত। তো সেদিন দুপুরের খাবারের সময় হওয়া পর্যন্ত আমরা কথা বলতে থাকলাম, এই প্রগাঢ় আগ্রহ পুরো সপ্তাহ অব্যাহত ছিল। আমি তখন হাবিবে মুগ্ধ। আমার যখন ১৬, জীবনে প্রথমবারের মতো কারো প্রেমে পড়লাম। সে কতটা এক্সট্রা-অর্ডিনারি মানুষ ছিল!
৬০ বছর পর সেদিনের স্মৃতি ঘাঁটলে এখনো দেখতে পাই, হাবিবকে আমি সেভাবেই ভালবেসেছিলাম, যেমনটা কোনো তরুণী কাউকে ভালোবাসে, যে ভালোবাসার জন্য সে নরকে যেতে কিংবা পানিতে ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকে। আর সে আমার মতোই কবিতা, গান ভালোবাসত। সেই সপ্তাহে আমরা প্রায় সারাক্ষণই একজন আরেকজনের পাশে ছিলাম। আমার বোন তো এতে মহাবিরক্ত হয়েছিল। তারপর বোনের সঙ্গে স্ট্যানফোর্ডে গিয়ে কিছু অনুষ্ঠান দেখলাম, যার মধ্যে ছিল জোন লিটলউডের ওহ! হোয়াট আ লাভলি ওয়ার। থিয়েটার নিয়ে আমার চেয়ে অনেক বেশি জানত। আর এটা নিয়ে আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম। কিন্তু সে অনেক জ্ঞানী হলেও ছিল খুব নম্র, আমার যেকোনো মন্তব্য সে মনোযোগ দিয়ে শুনত।
এর মধ্যে সে রয়াল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট থেকে ওল্ড ভিস ড্রামা স্কুলে চলে গেল। সেখানে একটি কোর্স করবে। আমি তখন একটা ‘ফিনিশিং স্কুল’-এ; এখানে আমাকে বিয়ের বাজারের জন্য যোগ্য গৃহবধূ বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছিল।
বছরখানেক পরে ইউরোপের থিয়েটারগুলো ঘুরে দেখার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেল হাবিব। সে খুশি হলেও আমি বেদনার্ত ছিলাম, কারণ অনেকটা সময় তাকে ছেড়ে থাকতে হবে।
১৯৫৬ সালের ২৬ জুন হাবিব যাত্রা শুরু করে, তার প্রথম গন্তব্য ছিল প্যারিস। হাবিব কথা দিয়েছিল, সে তার ভ্রমণবৃত্তান্ত আমাকে লিখে পাঠাবে। হাবিবের সেই যাত্রার কথা ভাবলে আজ মনে হয়, ওটা ছিল দারুণ সাহসী এক পদক্ষেপ। কারণ সামান্য টাকা-পয়সা দিয়ে কতদিন ঘোরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এর মধ্যে আমি ডেভনের ডারিংটন হলের সুন্দর পরিবেশে গান শেখা শুরু করলাম। এ প্রতিষ্ঠানটির ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল, এর অনেকটাই রবি ঠাকুরের মাধ্যমে।
পরবর্তী দুই বছর হাবিব দূরেই রইল; বিভিন্ন দেশ থেকে চিঠি পাঠাত। বেশির ভাগ চিঠিই ছিল অমুক খানে পৌঁছলাম ধরনের, তবে খাম আর ডাকটিকিটগুলো ছিল নানা রঙের, নানা নকশার। চিঠিতে মাঝে মাঝে সে তার কঠিন পরিস্থিতির কথা লিখত, আরো থাকত বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তার রোমাঞ্চকর নানা অভিযানের বিবরণ। আর সবকিছুর পর সে টিকে আছে।
তার ফিরে আসাটা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। চিঠিতে সে লিখেছিল যে অনেকটা ওজন হারিয়েছে এবং তাকে চেনাটা বেশ কষ্টকর হবে। আমি আমার গান শেখা থেকে কয়েক দিনের ছুটি নিলাম এবং যে ফার্মে আমি বড় হয়েছিলাম, সেখানে দারুণ সময় কাটালাম। এখানে আমার মা-বাবাও তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। এটা বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল, কারণ আমার বাবা ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান এবং তিনি কালেভদ্রে কোনো অতিথি, আগন্তুককে স্বাগত জানাতেন। আরো আশঙ্কা ছিল, তিনি না কোনো বর্ণবাদী মন্তব্য করে বসেন!
এরপর আমরা ব্রিস্টল গেলাম, হাবিব এ এলাকা খুব ভালোভাবে চিনত। বেশ খোঁজাখুঁজির পর সে একটা গেস্ট হাউজ খুুঁজে বের করল, যার মালকিন অমায়িক, যিনি বর্ণবাদী (সে সময় প্রায় সবাই বর্ণবাদে আক্রান্ত ছিলেন) নন। অবশেষে আমরা একত্রে মিলিত হতে পারলাম। তবে আমার ছুটিও তখন শেষ হয়ে আসছে, আমাকে আবার ডারিংটনে ফিরতে হলো। আমি তখন স্বর্গসুখে ভাসছি। সঙ্গে এটাও ভাবতে হচ্ছিল, হাবিবকে ভারতে ফিরতে হবে এবং কঠিন সময় সামনে আসছে।
হাবিব ভারতে ফেরার পর থেকেই দিল্লি থেকে হাবিবের মর্মস্পর্শী চিঠি একের পর এক আসতে শুরু করল। দিল্লির পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার অনেক কষ্ট হচ্ছিল; আরো ছিল কাজের খোঁজ, অর্থাভাব এবং আমাদের প্রেমের বিরহ। আজকের দিনেও এসব চিঠি পড়তে গেলে আবেগতাড়িত হতে হয়।
বেশ কয়েকবার আমি তার কাছে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, কিন্তু অর্থাভাব এবং মা-বাবার অনুমতি না পাওয়ায় আর সম্ভব হলো না। শেষমেশ আমার নানী এগিয়ে এলেন, তিনি একজন সম্মানিত এবং নরম মানুষ ছিলেন, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কও খুব ভালো ছিল। তিনি আমার হাতে ভারতে যাওয়ার খরচ দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে এ প্রেমের পরিণতি টানতে হবে, নয়তো কখনো শান্তিতে থাকতে পারবে না।’ আমার বয়স তখন ২১।
ভারতে আমার প্রথম সফর হয়ে গেল গোলমেলে। হাবিব যুক্তরাজ্য ছাড়ার কয়েক দিন পরেই চিঠিতে লিখেছিল, সে এক মেয়ের সঙ্গে একত্রে থাকা শুরু করেছে। সে সেই মেয়েকে ভালোবাসে না, কিন্তু পছন্দ করে। তা সত্ত্বেও সে আমার জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় আছে। তার এ চিঠি ১৯৬০ সালের ২৮ মে’র। এ চিঠি হাবিব রায়পুরে তার বাবার বাড়ি থেকে পোস্ট করেছিল। চিঠি পড়ে মনে হচ্ছিল হাবিব অবসন্ন এবং বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। মনে হচ্ছিল সে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেটা সে কীভাবে সামলাতে হবে বুঝতে পারছে না। হাবিবের এই নতুন সম্পর্কের খবরটা মনে হলো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো; তখন পরিকল্পনা বদলেরও সময় হাতে ছিল না। আমি বুঝছিলাম না, ভারতে আমি কী পাব।
ভারতে পৌঁছে আমি উঠলাম কার্জন রোডে লেখক বলবন্ত গার্গীর বাসায়, তার সঙ্গে লন্ডনে আমার পরিচয় হয়েছিল। হাবিব দারুণ আকুলতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। মনে হচ্ছিল আমার ভারতে চলে আসায় সে দারুণ রোমাঞ্চিত।
একদিন মনিকা, মানে হাবিব যার সঙ্গে থাকত, হাবিবের পিছু পিছু চলে আসে। তখন গভীর রাত। সে দরজায় কলিং বেলটা এতক্ষণ ধরে চেপে রেখেছিল যেন মনে হচ্ছে কয়েক যুগ কেটে গেল। তারপর বাড়ির উঠানে অনেক নাটক হলো, কিন্তু মনিকা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেনি। বলবন্ত এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। পরদিন হাবিব যখন রিহার্সেলে যায়, তখন মনিকা বলবন্তের বাসায় আসে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। সে তখন বিধ্বস্ত। মনিকা তার হাতের ব্যাগের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ব্যাগে ছিল অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ। মনিকা বলল, যদি সে হাবিবকে হারায় তাহলে সব পিল খেয়ে নেবে।
মনিকার সঙ্গে এ সাক্ষাৎ আমার মন পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল; একই সঙ্গে আমি বুঝতে পারছিলাম না যে এখানে আমার আর থাকা ঠিক হবে কিনা।
বলবন্তের বাসায় পাঁচ মাস থাকার পর আমি চলে গেলাম চণ্ডীগড়ে, সেখানে তারাচাঁদ গুপ্তের পরিবারে গিয়ে উঠলাম। এখানে আমার মিসক্যারিজ হলো। সম্ভবত ৬ ঘণ্টার ঝাঁকুনিযুক্ত বাস যাত্রা এবং নানা অশান্তিতেই এটা হয়েছিল। হাবিব মেমোয়ারসে যে রকম ‘ডেলিভারি’র কথা বলা হয়েছে, তেমন কিছুই ঘটেনি।
ভারত ছেড়ে যাওয়াটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। আমি হাবিবকে বললাম, তাকে আমি আর কখনো দেখতে চাই না, আমাকে চিঠি লিখতেও মানা করলাম। সবসময় মনে ছিল একটা হারানোর অনুভূতি, একটা বিরাট শূন্যতা, যেখানে সব আশা নিঃশেষ হয়ে গেছে। হাবিব লিখেছে, বিমানবন্দরে আমার চলে যাওয়ার দৃশ্য সে কখনো ভুলতে পারেনি। সেই ভারত ত্যাগ আমার জীবনেও এক চরম বেদনার অভিজ্ঞতা হয়েই রয়ে গেছে।
লন্ডনে ফিরে গিয়ে আমি একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠলাম কয়েকজন ইহুদি মেয়ের সঙ্গে। ওরা সবাই খুব সাপোর্টিভ ছিল। অনেক কেঁদেছিলাম, তারপর ধীরে ধীরে গান ও কাজের মধ্যে ডুবে গেলাম। অন্যদের পাণ্ডুলিপি টাইপ করে দিয়ে কিছু রোজগার শুরু হলো। দুই বছর পর জীবন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন অফিস থেকে ফিরে একটা নীল এয়ার মেইল পেলাম। দরজার সামনে পড়ে থাকা সেই খামের গায়ে আমার অতিপরিচিত হাতের লেখা। আমি এতটা চমকে গিয়েছিলাম যে খামটা আমার হতে থেকে পড়ে গেল, মনে হলো যেন গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছে। অতি অবশ্যই হাবিবের চিঠি। সে লিখেছে, ভারত থেকে তার কিছুদিনের জন্য নিষ্কৃতি দরকার, আমেরিকার পথে সে লন্ডন হয়ে যাবে। আমি যেন হিথরো বিমানবন্দরে তার সঙ্গে দেখা করি। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম।
ফ্ল্যাটের সঙ্গীরা বলল, ‘ওকে নরকে যেতে বলো।’ কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাদের মধ্যে কৌতূহল জেগে উঠল, একই সঙ্গে আমার মধ্যেও। তখন সবাই বলল, ‘মনে হয় ওর সঙ্গে তোমার দেখা করাই উচিত। তা না হলে তুমি কখনই জানতে পারবে না যে ওর কী হয়েছে এবং ওর প্রতি তোমার অনুভূতি এখন কেমন।’
আমার সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ থেকে হাবিব আমেরিকার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। যাওয়ার আগে আমাকে নির্দেশনা দিয়ে গেল আমেরিকায় কোথায় আমি তাকে খুঁজে পাব, যদি আমি সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে থাকতে চাই। তার সঙ্গে আমি আর ‘ছায়ার মতো’ লেগে ছিলাম না। আমিও আমেরিকায় গেলাম। নিউ অরলিন্সে আমরা কিছু সময় একসঙ্গে কাটালাম, এটা ছিল জাদুময়। হাবিব তার স্মৃতিকথার এই অংশে এসে একটা ফালতু মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে— ‘জিল একটা সন্তান চাইছিল।’ মনে হচ্ছে আমি যেন এ কারণেই আমেরিকায় গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা মোটেই এমন ছিল না। আমি হাবিবের সঙ্গে একত্রে থাকতে গিয়েছিলাম। হাবিবের সঙ্গে আমার পরিচয়ের তখন নয় বছর কেটে গেছে এবং আমি তাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এবং ঈশ্বর জানেন, বিচ্ছেদের সেই দীর্ঘ সময়ে আমরা দুজন দুজনের জন্য যথেষ্ট ব্যাকুল হয়ে ছিলাম।
ছয় সপ্তাহ পর নিউইয়র্ক থেকে আমাকে গানের একটা অনুষ্ঠানের জন্য লন্ডনে ফিরতে হলো। নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে আমি মার্কেটে গিয়েছিলাম হাবিবের জন্য একটা উপহার কিনতে, তাকে বিশেষ কিছু একটা দিতে চাইছিলাম। একটা দোকানের জানালায় কাপড়ের তৈরি একটা সবুজ সাপ দেখতে পেলাম, পেঁচিয়ে আছে, জেল্লা ছড়াচ্ছে। লন্ডনে ফেরার পর পরই আমি একটা কবিতা পেলাম। কবিতার কোনো কপি কোথাও আছে কিনা জানি না। তবে হাবিবের স্মৃতিকথার ৩০৮ নম্বর পাতায় কবিতাটি হুবহু দেয়া আছে।
কবিতাটার নাম দ্য গ্রিন স্নেক টুয়েন্টি ফিফথ মে ১৯৬৩
কবিতাটার সঙ্গে হাবিব যে চিঠিটি পাঠিয়েছিল, সেটা আবেগময় এবং প্রেমপূর্ণ। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে হাবিবের পাঠানো সব চিঠিই আমি সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম। হাবিবের স্মৃতিকথার চেয়ে তার চিঠিগুলোই তাকে প্রকৃতভাবে প্রকাশ করে, অন্তত আমার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। মেমোয়ারসে আমাদের নিয়ে হাবিব যা লিখেছে, সেটা প্রকৃত অনেক পরিস্থিতিকে প্রকাশ করেনি।
লেখার এ জায়গায় আমি সমালোচক দীপা গালোতের কাছে যেতে চাই। হাবিব যে নারীদের সঙ্গে মিশেছে, তাদের কথা লিখতে গিয়ে সে কতটা সম্মান ও ভদ্রতা বজায় রেখেছে, সেটা নিয়ে দীপা প্রশ্ন তোলার সাহস দেখিয়েছেন। দিনা পাঠকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিবরণীতে হাবিব যা লিখেছে, সেটা আমি পড়েছি। পড়ার পর নিজেকে দিনার জায়গায় বসিয়ে আমি চমকে উঠেছি, বিব্রত হয়েছি। নিজের পক্ষে বলার জন্য দিনা এখন বেঁচে নেই। আমার মনে হয় দিনা বেঁচে থাকলে হয়তো হাবিব এগুলো প্রকাশ করত না, কিন্তু তার পরও বলতে হয় দিনার পরিবার তো এখনো আছে।
আমেরিকায় সাময়িক বাস ছেড়ে হাবিব লন্ডনে ফিরল। কয়েক মাস আমরা একসঙ্গে কাটালাম, এ সময়টা খুব আনন্দ ও ছন্দময় ছিল। হাবিব তার চিঠিতেও এটা স্বীকার করেছে। আমাদের সম্পর্কের এ পর্যায়ে আমাদের কন্যা অ্যানা আমার গর্ভে আসে। আমার পরিবার এবং আমি উভয়ই বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। তারপর পরিবার থেকে মেনে নিলে সবাই বেশ উত্ফুল্ল চিত্তে অ্যানাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নেয়। অ্যানার জন্মের সময় হাবিব চলে যায়। এরপর পূর্ণ নীরবতা। পরের দুই বছর আমি তার কোনো খোঁজ পাইনি। আমি ভেঙেচুরে গিয়েছিলাম, আমি জানতে পারিনি সে কোথায় আছে, কী করছে। আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে মেয়েটা সুন্দর, স্বাস্থ্যবান আর হাসিখুশি হয়েছিল। তবে তার বাবার প্রতি আমি আর কোনো দিন আগের সেই ভালোবাসা অনুভব করিনি, এতদিন যা বহু ঝড়-বাদল উপেক্ষা করেও টিকে ছিল। এরপর পরবর্তী জীবনে হাবিবের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। এবং সেখানে ভালোলাগাও ছিল। মনে হয় সবকিছু এমন কঠিন যদি না হতো। মাঝে মাঝেই হাবিব সবকিছু মেরামত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে সফল হয়নি। শেষ দিকে যে সব মানুষের জীবন সে এলোমেলো করেছে, সেই পাপবোধ তাকে গ্রাস করেছিল। এ ব্যাপারে সে লিখেছে এবং মুখেও বলেছে। কিন্তু কোনো সমাধান করতে পারেনি।
নিজেকে সে আবার হাসিখুশি জীবনে ফেরাতে চাইছিল। তাই সে মনিকার গর্ভে জন্মানো তার মেয়ে নাগিনকে ফ্রান্সে নিয়ে এসেছিল তার তিন নাতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং অ্যানাকে ভালোভাবে জানতে-বুঝতে। এটা হাবিবের মৃত্যুর দুুই বছর আগের ঘটনা। আমাদের বড় নাতি মুক্তি তার দাদা সম্পর্কে লিখেছে, ‘সত্যি বলতে নানাকে আমি চিনতে পেরেছি এমনটা কখনো মনে হয়নি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর নানী আমাকে তার চিঠি পড়তে দিয়েছিল। এ চিঠিগুলো আমাকে তার কাছে এনে দেয়। আমি অভিনয় করতে ও দুনিয়া ঘুরতে চাই। আমি এক জায়গায় আটকে থাকতে চাই না। এবং আমার এ বৈশিষ্ট্যগুলো এসেছে নানার কাছ থেকেই।’
হাবিবের মেমোয়ারসের বিভিন্ন অংশ আমাদের স্মৃতিতে কত ভিন্ন ভিন্ন গল্প বলে। নিজেদের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে আমরা নিজের পছন্দমতো সবকিছু বেছে নিই।
মূল ইংরেজি লেখাটি দ্য কারাভানে প্রকাশিত






