তিনি বলেছিলেন, ‘রাফায়েলের মতো নিপুণ করে আঁকতে আমার সময় লেগেছে চার বছর, আর একটি শিশুর মতো করে আঁকতে আমার লেগেছে সমগ্র জীবন।’ বলেছিলেন, ‘শিল্প এমন এক অসত্য, যা আমাদের সত্যকে হূদয়ঙ্গম করতে শেখায়।’ তার জীবনও ছিল তার ছবির মতো বর্ণাঢ্য, অন্তর্ঘাতে চূর্ণ সব অধ্যায়ে বিভাজিত, ব্যক্তি তিনিও তার ছবির মতোই— নির্ভুল, নিষ্ঠুর কিছু দাগে আঁকা— অন্তর্গত কোমল চিহ্নে-ইন্ধনে আর ইঙ্গিতে ভরপুর। এল গ্রেকো-মুরিল্লো-গোইয়্যা-অঁরি রুশোর ছবি থেকে দু’হাত ভরে নিয়েছিলেন তিনি, আর ৭০ বছর বয়সে ঘোষণা করেছিলেন, মানুষ চিরদিন শুধুই তার মাতৃভূমির... নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে সে আসলে এক সম্মিলিত সত্তা। তিনি পাবলো রুইজ পিকাসো। শিল্পকলার ইতিহাসে তাকে অগ্রাহ্য করবার কোনো উপায় নেই।

অল্প বয়সে আমাদের কে চিনিয়েছিলেন পিকাসো? হয়তো সত্যজিতের ফেলুদা, কোথাও বলেছিলেন ‘ল্যাপিস লাজুলি’র নাম, পিকাসোর প্রিয় রঙ হিসেবে। স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে আমাদের কিছুটা সময় ‘আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন’ নামের একটি বিষয় পড়তে হতো, শিল্পের ইতিহাস। সেখানে এক্সপ্রেশনিস্টদের পড়ানোর পরেই কী যেন হতো, দর্শনের সাথে-সাহিত্য ভাবনার সাথে-বিপ্লব এবং মনোজাগতিক প্রলয়ের সাথে এত ঠোকাঠুকি এরপর থেকে শুরু হয়ে গেছে... দিশেহারা শিক্ষকরা কিছু নামধাম পড়িয়ে ছেড়ে দিতেন। সে নামগুলোর একটি হতো অবশ্যম্ভাবীভাবে পিকাসো। চিত্রকলার ইতিহাসে লিওনার্দোর পরে আরেক ভার্সেটাইল জিনিয়াস। আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনে আমরা কবীর চৌধুরীর ছবি-বিশ্লেষণী প্রবন্ধ থেকে ইংরেজি করে ভ্যান গখের ছবির পেছনকার দর্শন লিখতাম, সেখানে আমাদের শিক্ষিকা দশে শূন্য দিতেন আর আমরা তা নিয়ে হো হো করে হাসতাম। হাসবার কথাই তো, ছবির পেছনের যা দর্শন, তার বিচার তো একেক মানুষের কাছে একেক রকম... অ্যাপ্রিসিয়েশন তো গোল্লা হতে পারে না। অবশেষে আমরা ফিরে যেতাম রঁদ্যার সেই কথাটিতে, প্রকৃতিতে আর প্রাণিজগতের সর্বত্র আর্ট আছে, শুধু আর্ট নেই যেখানে আর্ট শেখানো হচ্ছে সেই স্টুডিওতে। পিকাসোর ছবি কেমন লাগে, এমন প্রশ্নে আমরা নিশ্চিন্তে জবাব দিতাম— “পিকাসোকে একজন নির্লজ্জ নিষ্ঠুর ভাঙতে পটু ব্রাদার-ইন-ল’র মতো লাগে।” আমরা যেভাবে পিকাসোকে চিনতাম, সে অন্ধের হস্তিদর্শন; ‘ব্লু পিরিয়ড’- ‘পিংক পিরিয়ড/রোজ পিরিয়ড’ এবং ‘কিউবিজম’-এর মতো কিছু মোটা মোটা কালির আঁচড়ে পিকাসোর একটা পরিচয় ফুটে উঠত আমাদের চোখে। আর পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝে পড়তাম একটি খেয়ালি প্রেমিকের কথা, যিনি প্রেমিকাদের একই বেলায় আসতে বলে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়ে মজা দেখতেন। আজীবন এবং আমৃত্যু ছবি এঁকে যাওয়া লোকটাকে, সারা জীবন নিজেকে উত্তীর্ণ করে যাওয়ার বিকাশমানতাকে তেমন করে চিনতে পারতাম কই!

যদিও ভার্সেটাইল জিনিয়াস হিসেবে লিওনার্দোর মতো করে পিকাসোকে স্মরণ করা যায়, পিকাসো কিন্তু লিওনার্দোর মতো পলিম্যাথ ছিলেন না, পিকাসোর প্রতিভা সীমিত ছিল আর্টিস্টিক ক্রিয়েশনে। একটু আধটু নাটক আর কবিতা লিখেছেন বটে, সেগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে চিত্রকলার নানান শাখায় অবলীলায় বৃক্ষমানবের মতো খেলে বেড়িয়েছেন পিকাসো— পেন্টিং, ড্রইং, এচিং, লিথোগ্রাফ, ভাস্কর্য, কোলাজ, সেরামিকস, লাইনোকাটস, স্টেজসিনারি, জুয়েলারি, ফটোগ্রাফি... কী নয়! প্রতিটিতে এনেছেন নতুন মাত্রা, যোগ করেছেন নতুন ভাবনা এবং স্টাইল।

জিনিয়াসদের বুঝবার ব্যাকরণ হয় না আসলে। ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে বরং ভাবা যায়, নিরীক্ষা চলে। ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ক্রিস্টিন টেম্পল কিছু কাজ করেছিলেন পিকাসোর মনোজগৎ নিয়ে। সেই আদি প্রশ্ন থেকে শুরু— মুসাফির গাটুরিয়া নিয়ে জন্মায় না জন্মে কাঁধে তোলে... কে কী নিয়ে আসে, কে কিসে কী ঘষে ধার দেয় বা খুইয়ে ফেলে, খোয়ালেও পরে আর কী বাকি থাকে। শিশু জিনে করে প্রচুর ধনসম্পদ আমদানি করে নিয়ে আসে, সেটা শুধু মা-বাবার নয়, মামা-খালা-চাচা-ফুপু-দাদী-নানী সব মিলিয়ে ঝিলিয়ে...‘বিবিধ বরণছটায়ে’। ঠাকুর পরিবারের অজস্র মানুষের বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিস্তারের কতটা রবীন্দ্রনাথের জিনে ছাপ ফেলেছিল, তা আন্দাজ করা যায়। আন্দাজ করা যায় ফ্রয়েড থেকে চিত্রকর লুসিয়ান ফ্রয়েডের যাত্রা দেখলে। পিকাসোও তেমনি জন্মেছিলেন অনেক শিল্পানুরাগী আত্মীয়ের জিন রক্তে নিয়ে। দাদা ডন দিয়েগো স্থানীয় অর্কেস্ট্রাতে বাজাতেন, রুবেন্স আর ভেলাস্কুয়েজের ছবি নকল করতেন, চাচা পাবলো ছিলেন শিল্পী ও ভাস্কর, চাচা সালভাদর আর ফুপু মাতিল্ড ছিলেন শিল্পরসিক। পিকাসোর বাবা ছিলেন চিত্রশিল্পী ও চিত্রকলার শিক্ষক, তার হাতেই পিকাসো ড্রইং এবং তেলরঙের শিক্ষা পান। পিকাসো বলতেন, ইহজীবনে যত পুরুষের ছবি তিনি এঁকেছেন, তা বাপের আদলে এঁকেছেন। মায়ের সুকুমারবৃত্তির চর্চা এবং মায়ের পদবি গ্রহণ করেছিলেন পিকাসো, মায়ের কারণেই পেয়েছিলেন আশাবাদী-প্রাণবন্ত তারুণ্যের প্রতি চিরদিনের দুর্বলতা। মা-বাবার বয়েসের তফাত থেকে প্রভাবিত হয়েই পিকাসো চিরদিন ধরা দিয়েছেন বয়েসের বিশাল পার্থক্য রয়েছে এমন সব প্রেমিকাদের বাহুবন্ধনে। পিকাসোর আঁকা মায়ের পোর্ট্রেট কোমল, আলোর আভায় উছলে ওঠা। বিপরীতে ব্ল্যাক পেন্সিলে হ্যান্ডমেড পেপারের ওপর আঁকা বাবার পূর্ণদৈর্ঘ্য ড্রয়িংয়ে বাপের মুখে-চোখে-চিরুনিতে ফেরানো চুলে চকচক করছে বিপরীতমুখী কিছু অনুভব, সংশয়, স্নেহ, অধিকারবোধ, দৃঢ়তা আর অহংকার।&dquote;&dquote;

পিকাসোর বিকাশের সঙ্গে আন্দালুসিয়ান প্রকৃতি এবং স্প্যানিশ সংস্কৃতির গভীর যোগ রয়েছে। আগেই লিখেছি পিকাসো মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন মানুষ এবং তার জন্মভূমি অচ্ছেদ্য। যেমন— চিড়িয়াখানায় যেসব পশু জন্মায়, তাদের মস্তিষ্কের আকার বন্যপ্রাণীর চেয়ে ২০-৩০ শতাংশ ছোট, যেমন প্রচণ্ড অনাদরে-অত্যাচারে বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের মাথাও... তেমনি করে মানুষের প্রতিভার বিকাশমানতার জন্য নিজ ভূমই তার মাতৃকা, পরিবার তার প্রতিভার সূতিকাগার। বাঁধাধরা নিয়মের কারাগার প্রতিভাকে শ্বাসরোধ করে মারে। পিকাসো বলতেন, ‘সব বাচ্চাই শিল্পী হিসেবে জন্মায়। কথা হচ্ছে, বড় হয়ে সে শিল্পী থাকবে কিনা।’ তাদের মনোজাগতিক ফুলকিগুলোকে জ্বলতে দেয়াই সৃজনশীলতার প্রকৃত উদ্বোধন।

শৈশব-কৈশোরে প্রতিভাবানরা কেমন ছিলেন, এ নিয়ে বলতে গেলেই আমার মনে পড়ে কিশোর বয়সে দেখা একটি মুভির কথা— ‘ইয়ুথ অব আ জিনিয়াস’, শেষ দৃশ্যে তরুণ ইবনে সিনা পাহাড়ের খাড়াই থেকে ঘোড়সওয়ার হয়েই সমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছেন! মোজার্ট সুর কম্পোজ করা শুরু করেছিলেন পাঁচ বছর বয়েসে, প্যাস্কাল বারো বছর বয়সে জটিল জ্যামিতি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন, ষোলোতে নিজের উপপাদ্য আবিষ্কার করে ফেলেছেন তিনি। প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঠিক কোন বয়স থেকে পিকাসোকে আলাদা করে দিয়েছিল? পিকাসোর জন্ম আন্দালুসিয়ার মালাগায়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে; বেড়ে উঠেছেন ধূলিধূসরিত বার্সেলোনার পথে অ্যারাবেস্ক এবং মুরিশ ডেকোরেটিভ প্যাটার্ন দেখে দেখে আর সেইসব প্যাটার্নের রেখা অনুসরণ করে ভাঙা ডাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এঁকে। এ ছবি আঁকার খেলার শর্ত থাকত ছড়িখানা না তুলে একটানে কে পুরো প্যাটার্নটা আঁকতে পারে। পরিণত বয়সে পিকাসো যখন একটানে একটি রেখায় ষাঁড় এঁকেছেন, তখনো নিশ্চয়ই অন্তরালে সেই শিশুর হাতে আঁকা প্যাটার্ন খেলা করছিল। একটি নিটোল ফলকে খোসা ছাড়ানো যায় ছুরিতে চেঁছে, আবার ছুরিতে এমন করে সম্পূর্ণ খোসাটুকু ছাড়ানো যায় যেন খোসাটাই হয়ে ওঠে ফলের আকার। পিকাসোর কালিতে আঁকা ছবিগুলো সেই সব খোসাটুকু একবারে ছাড়ানোর কারিগরি। মা মারিয়া পিকাসো লোপেজ বলতেন, ছোট্ট পিকাসোর প্রথম শব্দ ছিল ‘পিজ/লা পিজ’ (পেন্সিল), পিকাসো নাকি ছবি আঁকতে শুরু করেছিলেন ভাষা ফুটবার আগে, পেইন্টিং শুরু করেছিলেন পড়তে শিখবার আগে। শুনতে চমক লাগলেও মনে রাখতে হবে পিকাসো ছিলেন ডিসলেক্সিক, পড়তে শিখতে দেরি হয়েছিল তার। দুঃখের বিষয়, শিশু পিকাসোর কোনো ছবিই সংরক্ষিত নেই। নয় বছরের পিকাসোর একটি ড্রইং আছে, হারকিউলিসের মূর্তি এঁকেছিলেন তিনি। নয় বছরের হিসেবে ভালোই, কিন্তু চমকপ্রদ কিছু নয়। পিকাসোর সবচেয়ে বিশদ করে জীবনীটি লেখা জন রিচার্ডসনের, সেই রিচার্ডসন বলেছিলেন, নয় বছরের তুলনায় বেশ ভালো ছবি, কিন্তু প্রতিভার ঝলক দেখা যায়নি তখনো। কয়েক বছর পরে পিকাসো কাস্ট থেকে আঁকছেন শরীর, বয়স বারো কি তেরো; রিয়ালিস্টিক ড্রইং, কিন্তু সেই ড্রইংয়ে এক রকমের সপ্রাণ বিমূর্ততা আছে, যেন ড্রইংয়ে প্রাণ দিয়েছেন তিনি, প্রতিমায় প্রাণ স্থাপনের মতো করে... সেই হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে চিত্ত। আর্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় বসলেন পিকাসো ১৪ বছর বয়সে, সে স্কুলে ভর্তি হতে হলে ২০ বছর বয়স হওয়া চাই। আকারে নাতিদীর্ঘ পিকাসো, সেকালে তো আরো ছোটখাটো, অদম্য কিশোর বসলেন পরীক্ষায়, যা আঁকলেন তাতে তাকে লুফে নিল আর্ট স্কুল। সারা জীবন নিভৃতে পিকাসো ক্ল্যাসিক্যাল ড্রইংয়ের চর্চা রেখেছিলেন, তার রিয়্যালিস্টিক ড্রইং ছিল তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো। কিন্তু আর্টিস্টের কাজ তো ফটোগ্রাফারের মতো নয়, সে বাস্তবের বাইরের আরো কিছু ধরতে চায়, ধরিয়ে দেয়। ফলে পিকাসো সরে এসেছিলেন সেই স্টাইল থেকে।&dquote;&dquote;

পিকাসো প্রতিভার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘শিল্পপ্রতিভার সঙ্গে তীব্র বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক আছে, মোনের তুলির আঁচড় বুদ্ধিমান, মাতিসের রেখা বুদ্ধিমান। আন্তরিক বুদ্ধিমত্তার বাহ্যিক প্রকাশ হচ্ছে এ শিল্পকলা।’ তবে শুধু বুদ্ধিমত্তা সৃজনশীলতাকে উসকে দেয় মাত্র, প্রতিভা চেনা যায় কী করে? পিকাসোকে নিয়ে ক্লাইভ বেল (শিল্প সমালোচক, শিল্পী ভেনেসা বেলের স্বামী) বলেছিলেন, ইহজীবনে তিনি দুজন মানুষের অস্তিত্ব থেকে প্রতিভা প্রায় বিকীর্ণ হতে দেখেছেন, তাদের একজন পিকাসো, আরেকজন ভার্জিনিয়া উলফ (ভেনেসার বোন), তারা শুধু বুদ্ধিমত্তায় আলাদা নন, তাদের জাত আলাদা, জগৎ আলাদা, চিন্তার প্রক্রিয়া আলাদা। ক্লাইভ বেল ছিলেন ব্লুমজবেরি গ্রুপের সদস্য, এ গ্রুপের আর্টিস্টরা পিকাসোর রীতি অনুসরণ করতেন, ভালোবাসতেন।

নিভৃতি ভালোবাসতেন পিকাসো, শেষ জীবনে যখন তিনি দেখছিলেন তাকে উলঙ্গ করে দিয়ে বই লিখছেন তার ভূতপূর্ব প্রেমিকারা, তখন খুব ব্যথা পেয়েছিলেন তিনি। নিজের একান্ত জীবনকে সরিয়ে নিতে গিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন সেই প্রেমিকাদের সাথে জাত তার সন্তানদের, যদিও সন্তান ছিল তার আজীবন দুর্বলতা। শিশুর মনে খেলতেন বাচ্চাদের সাথে, শিশুর চোখে দেখতেন। যদিও বলতেন, ‘শিশুর মতো আঁকা’র কথা, তার ছবি শিশুদের আঁকা ছবি থেকে ভীষণ আলাদা। অসামান্য স্মৃতিধর ছিলেন পিকাসো, মানুষের আদল তো বটেই— কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে বা জনসমাগমে গেলেও তিনি অবিকল বলে দিতে পারতেন কে কোথায় ছিল, কোথায় কোন আলোকসম্পাত করা হয়েছিল, কবে কী ঘটেছিল। স্মৃতিশক্তি শিল্পীর জন্য অসম্ভব জরুরি বলে মানতেন পিকাসো। এই চোখ, এই দৃষ্টিশক্তির গভীরতাকে বারবার আবিষ্কার করেছিলেন তার প্রেমিকারা, গারট্রুড স্টাইন বলতেন, গাঢ়-গভীর-তীব্র চঞ্চল-টলমলে চৌবাচ্চার মতো চোখ ছিল পিকাসোর, তেমনি তীক্ষ চাহনি। দক্ষিণ স্পেনের স্থানীয় লোকদের এক রকমের ড্যাবডেবিয়ে তাকাবার অভ্যাস থাকে, পিকাসোরও ছিল। ল্যুভে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো গ্র্যান্ডমাস্টারের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন পরে সেটা নিজের মতো করে আঁকবেন বলে বা স্টাইনের ভাষায় পিকাসো হজম হয়ে যাওয়া ছবিটাকে নিষ্কাশন করবেন। কাতালান মডার্নিজম ও ইমপ্রেশনিজম থেকে, রুশোর প্রিমিটিভিজম থেকে বহু উপাদান নিয়ে এই দেখবার জোরেই সংশ্লেষণ ঘটিয়েছিলেন তিনি। লোকের মনঃসংযোগের ক্ষমতা এত কম, বলতেন পিকাসো, আরে সেজানকে সেজান বানিয়েছে তার মনোযোগ! সেজানকে ডাকতেন তার একমাত্র শিক্ষক বলে। চাহনিই বটে, পিকাসোর আঁকা মালাগার লাল পাহাড়ের নিঝুম জঙ্গলে সকালের রোদ উপচে পড়ছে... সেই রোদ যেন দেখা যায় এমন, তাপ পাওয়া যায় এমন। একেবারে শুরুর দিককার ছবিতেও সেই দেখবার ক্ষমতা ভীষণভাবে উপস্থিত (যেমন বার্সেলোনার গথিক চার্চ, ক্যালের রাস্তা, রোদের দিনে ঘরের ভেতর থেকে দেখা চটের পর্দা টাঙানো জানালা)। মানুষ হয় দ্যাখে, নয় তাকায়, পিকাসো বলেছিলেন। যখন সে দ্যাখে, সে নিরিখ করে দ্যাখে, ফর্ম তখন জ্যান্ত হয়ে আসে, তার সত্তা তৈরি হয়, সে বিশ্লিষ্ট হয়ে যায়।&dquote;&dquote;

প্যারিসজীবনের প্রাথমিক উন্মাদনা কাটিয়ে উঠবার পর ফরাসি সিম্বলিজমের ছোঁয়া পেয়ে পিকাসোর ক্যানভাস ভরে উঠেছিল নীলের নির্বেদে। এই নীল বিমর্ষতার, ভোগালস্যের, জনান্তিকের নিঃসঙ্গতার, কখনো সম্ভ্রমের। প্রথম দিকে ব্লু পিরিয়ডের ক্যানভাসে পিকাসোর তুলি ছিল ভ্যান গখের তুলির মতো রঙের ভারে ভারী, পরে সেটা বদলে দেন তিনি। বোদলেয়ার, র্যাবোঁ ও ভেরলেইনের সাহিত্য পিকাসোকে প্রভাবিত করেছিল, প্রভাবিত করেছিল এদভার্দ মুঙ্কের মতো চিত্রশিল্পীরা। সাঁলাজারের কয়েদি আঁকলেন পিকাসো, উল্লাসে ফেটে পড়া বারবনিতাদের বদলে আঁকলেন নীরক্ত-শোকার্ত মায়েদের। স্বভাব-প্রাণবন্ত পিকাসোর এ ব্লু পিরিয়ড বা বিমর্ষতাবাদ স্থায়ী হয়নি, একটু একটু করে রক্তসঞ্চারের মতো ফোঁটায় ফোঁটায় এসেছে গোলাপি, সপ্রাণ বস্তুর প্রথম চিহ্ন। রোজ পিরিয়ড। অ্যাপোলিনেয়ার এলেন, এলো ফার্নান্দে অলিভিয়েরের প্রেম আর স্থিতি, পিকাসো সরে এলেন সার্কাসের সং আর বাজিকরদের গোলাপি চরিত্রচিত্রণে। এ অ্যাপোলিনেয়ারই তার স্টুডিওতে আমন্ত্রিত হয়ে এসে দেখেছিলেন পেইন্টিং ‘অ্যাভিনঁর মহিলারা’, বারাঙ্গনারা আছেন কিন্তু কাম নেই, সৌন্দর্যনির্মিতি নেই, এ ছবি বিকৃত, কুশ্রী এবং তীব্রভাবে স্বতন্ত্র। মানুষের মুখ সামনে থেকে এবং পাশ থেকে যুগপত্ভাবে দেখা, যেন তার সামাজিক মুখোশ আর অন্তরালের মুখকে একত্র করে কলহ উৎপাদনের উল্লাস। কিউবিজমের শুরু এবং উত্থান। যা নিয়ে পিকাসো বলেছিলেন, কিউবিজম না বীজ না ভ্রূণ— এ কেবল ফর্মকে প্রাণদান, এ ফর্ম জীবন্ত হয়ে উঠবে। কিউবিজমের সাথে পিকাসো অতঃপর মেলালেন ন্যাচারেলিজমকে। কিউবিজমের পরে পিকাসো আবার একটু ফিরে গেলেন রিয়্যালিস্টিক ড্রইংয়ে, মিথলজিক্যাল বিষয়বস্তুর কাছে। এরপর সুররিয়ালিজমের থিওরিস্ট আদ্রেঁ ব্রেতোঁর সাথে মিশলেন, যোগ দিলেন প্রথম সুররিয়ালিস্ট প্রদর্শনীতে, এবার তার ক্যানভাসে বস্তুর আকারগুলো আরো নরম হয়ে এল। ওই যে শিশুর মতো ক্রীড়ামগ্ন আর উৎসুক মন তার।

১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্পেন তখন জেনারেল ফ্রাংকোর স্বৈরশাসনাধীন, জার্মান সৈন্যরা দলে দলে ঢুকছে ফ্রান্সে, পিকাসোর শিল্পী বন্ধুরা পালিয়েছেন, পিকাসো সরে গেলেন জনবিরলে, লাতিন কোয়ার্টারে তার স্টুডিওতে পড়ে রইলেন। ফিগারেটিভ ড্রইংয়ের সাথে কিউবিস্ট উপাদান মিলিয়ে তিনি একটি স্বতন্ত্র স্টাইলের জন্ম দিলেন, পরে ‘গুয়ের্নিকা’-তে যা স্পষ্ট। বোধহয় গুয়ের্নিকা নিয়েই একটা ছোট্ট ঘটনার কথা পড়েছিলাম, স্পষ্ট মনে পড়ছে না, কোনো এক যোদ্ধা এ ছবির বিধ্বংসী নিষ্ঠুরতা এবং যন্ত্রণায় পীড়িত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল— ‘এ তুমি কী করেছ?’ পিকাসো জবাব করেছিলেন, ‘এ আমি করিনি, তোমরা করেছ।’ গুয়ের্নিকার ষাঁড়টা আর ঘোড়াটা আসলে কী, এ প্রশ্নের জবাবে নাকি তিনি বলতেন, ষাঁড়টা ষাঁড় আর ঘোড়াটা ঘোড়া। তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্পীর কাজ সিম্বলিজমকে ব্যাখ্যা করে বলা নয়। ও রকম বলবার পরেও বিশ্বজোড়া গুয়ের্নিকা হয়ে উঠেছিল যুদ্ধ বিরোধিতার প্রতীক, যুদ্ধের নির্বিবাদ হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ।

বিশ্বযুদ্ধের পর পিকাসো হাত দিলেন সেরামিকসের কাজে। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাগুলোর ক্ল্যাসিক্যাল মিথলজি থেকে উঠে আসা প্যাঁচা, পাখি, ষাঁড় জ্যান্ত হয়ে উঠল তার স্টুডিওর নিবিড় পরিচর্যায়। জীবনের শেষের দিকে ইলাস্ট্রেশনে হাত বাড়ালেন তিনি। নিভবার আগে সলতে যেমন তীব্র হয়ে জ্বলে, পিকাসোর শিল্পীজীবন তেমন একটি গৌরীশিখায় জ্বলে উঠেছিল শেষ বছরগুলোয়। ব্যক্তি হিসেবে তিনি তখন সবার কৌতূহলের অন্বিষ্ট বস্তু, তার ব্যক্তিগত জীবনের তামাম খুঁটিনাটি জনতার খাদ্য, সেলিব্রিটি হিসেবে লোকে তাকে এক নামে চেনে। এ সময়টিতে পিকাসো যা চর্চা করেছিলেন, তা হচ্ছে মুক্তি। শিল্পীর স্বাধীনতাকে একেবারে আকাশে ১০০ ফানুস উড়াবার মতো নির্লজ্জ সাধে উদযাপন করেছিলেন তিনি। আকাঙ্ক্ষাকে ছুটিয়েছেন বন্যার বেগে বিপুল ভবিষ্যতের দিকে। না ছিল নিয়ম, না গণ্ডি, না মানবার মন, একেবারে জগৎ এবং তাবৎ সামাজিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে যে শিল্পযজ্ঞের শেষ হোম জ্বালায়, তিনি ছিলেন সেই শিল্পী। তার শেষদিককার কাজগুলো তা-ই বলে। আহা, রক্তে তোমার দুলছে না কি প্রাণ...গাইছে না মন মরণজয়ী গান?&dquote;&dquote;

পিকাসোর জীবন তার প্রেমিকাদের গল্প ছাড়া অসম্পূর্ণ, এ সাতজন মহিলার প্রত্যেকে তার শিল্পীজীবনের একেকটি মাইলফলক, একেকটি বাঁকের চিহ্ন। এ সাতজনের ভেতর দুজন আত্মহত্যা করেছিলেন, দুজন পাগল হয়ে গেছিলেন। কখনো পিকাসো ছিলেন এদের প্রতি বিশ্বস্ত-স্নেহকাতর, কখনো অস্বাভাবিক রকমের নিষ্ঠুর... পিকাসোর প্রেম সবসময়ই একটি আপাত সত্য বস্তু। রেমব্রাঁ কিংবা গোইয়্যার মতোই পিকাসোও তার জীবনে নারীকে নিংড়ে নিয়ে নির্মাণ করেছেন শিল্পের স্তম্ভ, শিল্পীর উদ্যমে সাময়িক ইন্ধন জোগাতে আহুতি দিয়েছেন এরা। এদের প্রত্যেকের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন পিকাসো। প্রেমিকা ডোরা মারকে পিকাসো ব্যবহূত সামগ্রীর মতো ত্যাগ করবার পরে সন্ত হয়ে যাবার বাসনা ছিল ডোরার, শেষ সময় কাটিয়েছিলেন ধূলিধূসর স্মৃতিভরা কিছু জিনিসপত্রের মাঝে, তিনি বলতেন, পিকাসোর পরে শুধু ঈশ্বরই হতে পারে (আমার জীবনে)। ডোরা মারকে নিয়ে প্রেমের কবিতা আছে পূর্ণেন্দু পত্রীর, যে কালে পড়েছিলাম তখন প্রেমই মনে হয়েছিল, এখন উত্পীড়কের অন্যায় আব্দার মনে হয়। তবে এত একরৈখিকভাবে হয়তো পিকাসোকে ধরা যাবে না, জটিল চরিত্র, জটিলতর শিল্প সাধনা তার, এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে এক ইজম থেকে আরেক ইজমে যিনি এত অবলীলায় চলে যেতেন— তার যাত্রাটাই রূপান্তরের।

যাই হোক, প্রসঙ্গান্তরে যাই। স্কুল-কলেজে এক রকমের শিল্পের সান্নিধ্যবিহীন সিলেবাস আমরা সাঁতার দিয়ে পার হই, ব্যক্তিগত আগ্রহ ছাড়া শিল্পানুসন্ধানের দিকে খুব কম বাঙালিই যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে ‘আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন’ ক্লাসে আমি প্রথম দিন ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করতাম প্রিয় চিত্রশিল্পীর নাম। দুঃখের বিষয়, জয়নুল থেকে শুরু হয়ে ক্যালেন্ডারের কামরুল হাসান এমনকি স্কুলের বইয়ের হাশেম খানের নামও তারা বলত না। অবিশ্বাস্যভাবে হাত তুলে তারা প্রিয় চিত্রশিল্পীর নাম বলত ‘মোনালিসা’। এ ছাত্রছাত্রীদের টার্ম শেষে শিল্পকলার ইতিহাস কতটা তরল করে খাওয়ালে চিত্তের পুষ্টি এবং বিকাশসাধন সম্ভব, তা নিয়ে ভাববার আছে বৈকি। ভাববার আছে, শিল্পী হিসেবে যে জন্মায় বলে পিকাসো বিশ্বাস করতেন, আকাঙ্ক্ষার রথ ছুটিয়ে দিতে পারে যে অসীম ভবিষ্যতের পানে, সৌন্দর্য এবং স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে যে জন্মেছে, সেই শিশুরা কি আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অতিক্রম করতে করতে শিল্পী থাকছে?

০৫ নভেম্বর ২০১৮