সময়টা শুনতে বড় কম, দিল্লি থেকে মাত্র ৯০ মিনিট। অথচ ৯০ মিনিটে যেন একটা জগৎ থেকে, একটা টপোগ্রাফি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অচেনা কোনো মানচিত্রের রাস্তা বরাবর চলে আসা। পাহাড়ের রঙ বলতে ছোটবেলা থেকে সবুজ জেনে আসলেও প্রথম বরফের চাদরে মোড়া বাদামি পাহাড় দেখা। ধূসর মাটি-পাথরের রূপও যে এমন নেশাজাগানিয়া, তা বুঝে ওঠার আগেই শ্বাসবায়ু বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কেবিন ক্রুর ঘোষণা, প্রথমে স্পষ্ট হতে হতে অস্পষ্ট— We are about to arrive ¦ Leh International Airport. We are ¦ the height of 11480ft. Please do not sleep during the day time. If you feel uncomfortable....

এর বেশি আর কিছু দময়ন্তীর মাথায় ঢুকল না, একটু একটু করে কোথায় যেন ডুবে যাচ্ছে? বাতাসে কি আর একটুও অক্সিজেন অবশিষ্ট নেই? পাশ থেকে যেন ভেসে এল কয়েকটা শব্দ। এক্লেমাটাইজেশন- হাই অল্টিটিউড সিকনেস।

আর্মি বেসক্যাম্পে যখন দময়ন্তীর জ্ঞান ফিরল, প্রথমেই পপাইকে খুঁজছিল। নাড়ির টান যে সবচেয়ে বড় টান। তাঁবু-হাসপাতালের বিছানা থেকেই ও দেখতে পেল পাঞ্জাব, বিহার, বাংলা, হিমাচল প্রদেশ, গোর্খা, তেলেঙ্গানা— বিভিন্ন রেজিমেন্টের সেনাদের ভিড়। সবার মুখেই হাসি। নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-মশকরায় মশগুল। আর কয়েক দিনের মধ্যেই এরা যাবে সেই দুর্গম সিয়াচেন ক্যাম্পে। তাই মেডিকেল ফিটনেস পরীক্ষা দিতে সবাই একের পর এক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন অল্পবয়সী ডাক্তার প্রেশার ইত্যাদি চেক করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ভেতরে। সেখানে আরেকজন মেডিকেল অফিসার ফিটনেস সার্টিফিকেট ইস্যু করছেন। মোবাইলের টাওয়ার নেই, দীর্ঘদিন প্রিয়জনদের থেকে বহু বহু দূরে বাইরের পৃথিবী থেকে একেবারে যোগাযোগহীন দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতিও যে এ রকম নির্বিকার সহজভাবে নেয়া যায়, তা সেদিন অসুস্থ হয়ে বেসক্যাম্পে না গেলে ও বুঝতেই পারত না। বুঝতেই পারত না কত মিথ্যে অহমিকায়, কলহ-বিবাদে কেটে যাচ্ছে দিন।

-পাহাড় আমাদের নম্র হতে শেখায়, নত হতে শেখায়। পপাইকে কথাগুলো বলার চেষ্টা করল দময়ন্তী।

আর মনে মনে নিজেকে বলল, মরুপাহাড়ের ওই ধূসর ভার্জিন শাদার কাছে আজ যে ঋণ জমা হচ্ছে, সেই পুরনো ঋণের মতোই বহুদূর থেকে ভেসে এসেছিল কোনো স্বর্গীয় এক সুর—

জয় শঙ্খ গদাধর নীল কলেবর পীত পটাম্বর দেহি পদম।

জয় চন্দনচর্চিত কুণ্ডলমুণ্ডিত কৌস্তভলাঞ্ছিত দেহি পদম।

...... একজন্মে বহু ঋণ জমা হয়ে যায়, সব কি শোধ করা যায়?

 

শাইলু নদীর দুই ধারে ছড়ানো নুড়িপাথরের মাঝে প্লাস্টিকের বোতল। ইশ! দময়ন্তীর নিজেকেও অপরাধী মনে হচ্ছে। কী দরকার ছিল সব দুর্গম অঞ্চলগুলোকেই ট্যুরিস্ট স্পট বানানোর? সুদীপ্ত স্যারের কথা মনে পড়ল ওর।

স্যার বলতেন, কী দরকার ছিল বল তো? মানুষের এভারেস্টের চূড়ায় উঠে, কী এমন লাভ হয়েছে মানব সভ্যতার? অথচ যদি অনাবিষ্কৃত থাকত এভারেস্টের পথ, তাহলে এত পর্যটনপ্রিয় মানুষের ভিড়ের চাপ সহ্য করতে হতো না দেবতাত্মা নগাধিরাজকে। এত দূষণ বাড়ত না। পৃথিবীর কোথায়ই বা একটা ভার্জিন বিউটি আছে বলতে পারবি?

-কালিদাসের একটা শ্লোক মনে আসছে। হিমালয়কে দেবতাত্মা ও নগাধিরাজ বলে কালিদাসই বোধহয় প্রথম সম্বোধন করেছেন। কিন্তু তোমার ‘ভার্জিন বিউটি’ শব্দবন্ধটায় একটা পিউরিটান গন্ধ আছে। আই অবজেক্ট।

-আচ্ছা রাখ তোর পিউরিটান, ফেমিনিস্ট সব গন্ধমার্কা কথাবার্তা। তোরা কি কার্গিল যাচ্ছিস? ট্যুর প্ল্যানটা তুই জানিস তো? না সেসব তোর লিবারেল হাজব্যান্ডই জানে শুধু।

স্যারের এই হালকা বিদ্রূপটা দময়ন্তী গায়ে মাখেনি। সত্যি বলতে ও জানেই না ওরা কার্গিল যাচ্ছে কিনা? সবটাই শান্তনুর ঠিক করা। দময়ন্তী নানা কাজে সময়ও পাইনি এই নিয়ে ডিটেলে আলোচনা করার। যা আলোচনা একেবারে প্লেনে উঠেই করবে ভেবে রেখেছে। অথবা এয়ারপোর্টের পথে।

দময়ন্তীকে চুপ করে থাকতে দেখে ব্যাপারটা টের পায় সুদীপ্ত স্যার। আসলে সেই ছোটবেলা থেকে চেনেন তার ছাত্রীটিকে। সবটা বলে দেয়ারও প্রয়োজন হয় না।

-কার্গিল থেকে আরো ১০ কিমি ওপরে একটা গ্রাম আছে। সীমান্তগ্রাম। হুন্দারমেন। পারলে যাস। স্টোরি করতে পারবি।

-একটু হিন্টস দিন না স্যার?

-নাহ! নিজে রিসার্চ কর। হিন্টস যা দিয়েছি যথেষ্ট। এত বড় সাংবাদিক বা গল্পকার হয়ে যাসনি তুই যে রিসার্চ টিম লাগবে!

দময়ন্তী জানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আর কিচ্ছু বলবেন না স্যার।

দময়ন্তীর ফোনের রিংটোনে কৃষ্ণস্তোত্র স্যারই সেট করেছিলেন। আর গানটাও তার নিজেরই গাওয়া। তাই ফোন বাজতেই- ‘দেহিপদম দেহিপদম।’

-ম্যাডামজি আভি আপ ঠিক হো? ম্যায় গাড়ি লেকর আ রাহ্যা হুঁ। আগর ঠিক হো তো হোটেল পে চলতে। আজ রেস্ট লেকর কাল প্যাংগং যায়েঙ্গে?

-ওকে হাসান ভাই প্লিজ আইয়ে।

হোটেলে যেতে হবে, রেস্ট নিতে হবে সকলকে। বিশেষ করে পপাইকে। নবছরের পপাই এই গোটা জার্নিতে একবারও কোনো আবদার করেনি। একবারও বলেনি, ‘মা, টায়ার্ড লাগছে বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’ দময়ন্তী মনে মনে স্বস্তি বোধ করে।

হোটেলের বিছানায় গা এলিয়ে দময়ন্তী টের পায় খুব খিদে পেয়েছে ওর। এই কদিন ধরে শুধু ম্যাগি খেয়ে খেয়ে বিস্বাদ লাগছে। অবশ্য শাইলু নদীর এক ধারে ছোট্ট একটা আর্মি ক্যান্টিনে চিলি ফ্লেভারের এক রকম নুডলস আর কফি খেয়ে খুব ভালো লেগেছিল ওদের সবারই।

দময়ন্তী হাসান ভাইকে ঘরে ডাকে।

-নমস্তে ম্যাডাম। অব ক্যায়সে হো?

একরাশ উজ্জ্বল হাসি উপহার দিয়ে হাসান ভাই কথা বলে। মিষ্টি স্বভাবের এ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দময়ন্তীর শরীরটাও বেশ চনমনে হয়ে ওঠে। শান্তনুর মতো চুপচাপ মানুষও হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দেয়। কফি পাকোড়া সহযোগে আড্ডা চলে। ডিনারে ওরা ভাত খাবে জানিয়ে দেয় হোটেলের ছেলেটিকে। ভাত আর আণ্ডাকারি।

-হাসান ভাই হুন্দারমেন কার্গিলসে কিতনা দূর হ্যায়? হামহে উধর জানা হ্যায়।

শান্তনু একটু বিরক্ত হয়। প্যাংগং থেকে কার্গিল জাসকর যাওয়ার পরিকল্পনা। তুমি আবার কোন গ্রামে যাবে বলছ?

-না না একটু দরকার আছে গো। গেলে ভালো হতো। একটু প্রোগ্রামটা ওভাবেই সেট করি?

-আশ্চর্য! বেড়াতে এসেও তোমার কাজ! আমি আগেই বলেছিলাম, লাদাখ ট্রিপ আমার ফটোগ্রাফিক এক্সপিডিশন। এখন হুন্দারমেনটেন যেতে পারব না। এমনিতেই তোমার শরীর খারাপে দুদিন নষ্ট হয়েছে।

এবার শান্তনুর কথায় দময়ন্তী আহত হয়। তবে আহত হওয়ার মতো খুব একটা নরমসরম ও নয়। তাই আহত হতে গিয়ে ও বরং রেগে যায়।

-কী যে বলো? নষ্ট হওয়া কাকে বলে? বোঝো তুমি? কোথাও কি একমুহূর্ত দাঁড়িয়েছ তুমি আমার জন্য। খারদুংলা পাসে আমার ও রকম শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তুমি তো গরম খাবার খেতে আর ছবি তুলতেই ব্যস্ত ছিলে। পপাই শুধু মা মা করছিল। আর এই হাসান ভাই ছিলেন বলে।

দময়ন্তীর কথা শেষ না করতে দিয়েই শান্তনু প্রায় চিত্কার করে বলে ওঠে,

-সারা বছর অত্যন্ত পরিশ্রম করে কোনোমতে ছুটি বাঁচিয়ে এতদিন বাদে বেড়াতে এসেছি। তো ছবি তুলব না? তুমি অ্যাডজাস্ট করতে পারছ না বলে কি আমি আমার বেড়ানোটা নষ্ট করব?

হাসান ভাই বোধহয় গল্পের মাঝে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় একটু অস্বস্তিবোধ করছিলেন। হাসান ভাই বললেন, আরে আপলোক বেফিকর রহ্যে। পহেলে প্যাংগং আচ্ছে সে দেখকে কার্গিল, হুন্দারমেন, জাসকর সব যায়েঙ্গে। আওর সাহব একবার আপ হুন্দারমেন চলিয়ে তো আপ লাদাখকে গাঁও দেখেঙ্গে। এ ভি গাঁও হ্যায়। লেকিন ইধার ট্যুরিস্ট বহুত আতা হ্যায়। উধার লেকিন লাদাখ কাশ্মীর কি হি লোগ র্যাহতে হ্যায়। আপকো জরুর আচ্ছে লাগেঙ্গে।

এরপর আর শান্তনু কিচ্ছু বলে না। রাতের খাওয়াটা দময়ন্তী ভালো করে খেতে পারে না। শান্তনুর এ একগুঁয়ে স্বভাব আর অদ্ভুত এক আত্মমগ্নতা ওর স্বার্থপরতাই মনে হয় মাঝেমাঝে। আবার অন্যভাবে ও নিজেও তো ওর কাজ নিয়ে, ভাবনা নিয়ে বড় বেশি একমুখী। তাই ওভাবে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। একটা কথা খুব মনে হয় আজকাল। সম্পর্ক বা বন্ধন মানেই একটা চুক্তি। আর সেই চুক্তি মেনে চলতে চলতে ক্রমে একা হয়ে যাওয়া।

সামনে নীল জলরাশি আর পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য তারা দেখতে দেখতে ও কিছুটা আত্মমগ্নই ছিল। পপাই আর শান্তনু একটা ছোট টেলিস্কোপ দিয়ে ধ্রুবতারা লোকেট করছে। ওই তো অত্রি, পুলহ, পুলস্ত্য, অঙ্গিরা। বাবা আর ছেলে মিলে কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল নিয়ে আলোচনাও হচ্ছে কিছুক্ষণ ধরে।

-পপাইয়ের এবার ঘুম পেয়েছে। হাই তুলছে।

শান্তনুর কথায় চমক ভাঙে। দময়ন্তী পপাইকে নিয়ে তাঁবুর ভেতর চলে যায়। বিছানায় শোওয়ামাত্রই ঘুমে ঢলে পড়ে পপাই।

-ম্যাডাম, আপকে লিয়ে কাওয়া টি। অন্দর আয়ে?

-হ্যাঁ। শিওর।

প্যাংগংয়ে ওদের হোস্ট বৃদ্ধ আংকেল তাশি চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকলেন তাঁবুর ভেতর। দময়ন্তীর কথা বলতে ইচ্ছা করছিল আংকেলের সঙ্গে। চায়ের কাপটা তাশি নামিয়ে রাখলে দময়ন্তী জিজ্ঞেস করে, ‘কাওয়া টি সে সর্দি কম হো যাতা?’

-হ্যাঁ, ম্যাডাম। বিলকুল কম হয়ে যাবে।

-আরে আপনি বাংলা জানেন?

-হ্যাঁ, এত বাঙালি ট্যুরিস্ট আসে। জানি তাই। কুছকুছ। হিন্দি ভি। আমার ভাষা অবশ্য লাদাখি।

-আমাকে কয়েকটা লাদাখি শব্দ শিখিয়ে দেবেন?

-জি।

-লাদাখি ভাষায় পাহাড়কে কী বলে?

-রি।

-লাদাখি ভাষায় রি মানে পাহাড়।

-জি।

-আচ্ছা ডিনার একটু তাড়াতাড়ি লাগবে। ছেলে ঘুমিয়ে পড়ছে প্রায়।

-জি। আভি হো যায়গা।

-কী আছে ডিনারে?

-দেশি মুরগা আছে। রোটি আর চিকেন কারি?

-ঠিক আছে।

বৃদ্ধ আংকেলের নাম সোনম তাশি। দময়ন্তীর জানার ইচ্ছা ছিল আরো কিছু। তাশি কী বৌদ্ধ? হাসান ভাই বলেছিল লাদাখি। তিব্বতি আর লাদাখি ভাষায় বেশ মিল। থিক সে মোনাস্ট্রি-র থিক মানে এক লাদাখি ভাষায়। হয়তো কখনো এই একটাই মোনাস্ট্রি ছিল এখানে।

রাতে খেতে খেতে তাশির সঙ্গে গল্প হলো আরো। হুন্দারমেন, ব্রোলমো— এই দুটো গ্রামকে ওরা বরবাদি গ্রাম বলে।

-কার্গিল ওয়ারকে বাদ তো ইয়ে দো গাঁওকে জিন্দেগিহি চলি গ্যায়ি।

রুটি বেলতে বেলতে তাশি কথাগুলো বলল। একটা চুলায় রুটি সেঁকতে সেঁকতে কাঠের স্প্যাচুলা দিয়ে পাশের চুলায় মাংসের হাঁড়িতে একটু নাড়া দিয়ে তাশির বউ কমলা আন্টি দময়ন্তীকে বলল, ‘ম্যাডাম, আপ কাল হুন্দারমেন যা রহ্যে হোঁ। হামরা সহেলি জাঈনা উধারই যায়েগি। উসে ভি গাড়ি মে লে লোগে?’

এসইউভিতে আরো একজন যেতে পারবে কিনা, এটা হাসান ভাই বলতে পারবে। মুম্বাইতে বৃষ্টি পড়লে একটা ট্যাক্সিতে ১০-১২ জনও একসঙ্গে বাড়ি ফেরে। তার পরও পথে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের সহযাত্রীরা বলেন, ‘আইয়ে হো যায়গা।’

দময়ন্তী মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

-জাঈনা বাঈ আপকে সহেলি হ্যায়? হুন্দারমেন গাঁও সে ইধার আপসে মিলনে আয়ে হ্যায়?

প্রশ্নটা কমলা আন্টিকেই করে দময়ন্তী।

-জি। মেরে সে মিলকর যাতি হ্যায়। লেকিন ও তো আপনে বেটে সে মিলনে আয়ি হ্যায়।

-ম্যাডাম, জাঈনার ছেলে নুব্রাতে সিয়াচেন বেসক্যাম্পে পোর্টারের কাজ করে। ও ছেলের সঙ্গে দেখা করতে আসে। আউর হাম সে ভি মিল কর যাতে হ্যায়।

তাশির কথায় দময়ন্তীর প্রশ্ন জাগল। ছেলে কি মায়ের কাছে যায় না? মাকে আসতে হয়? তাশি বোধহয় বুঝতে পারল দময়ন্তীর কথাগুলো।

-জাঈনার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যে ও একটু অন্য রকম। এমনি খুব চুপচাপ। তবে খোশদিল। কিন্তু দুই মাস ছেলে বাড়ি না গেলেই ও অস্থির হয়ে যায়। নিজেই চলে আসে। আর ছেলেও তো বেসক্যাম্প শেষ হলে লে-তে চলে যায়। সেখানেও আর্মি ক্যাম্পে কাজ থাকে। এত হুট বলতে বাড়ি যেতে পারে না। আবার ছুটি পেলে তো যায়ই। ওসব কোনো প্রবলেম নয়। লেকিন প্রবলেম আছে ম্যাডামজি।

দময়ন্তীর জানতে ইচ্ছা করছে জাঈনার কথা। এখনো অবশ্য দেখাই হয়নি তার সঙ্গে। তবুও আগ্রহ হলো। তাশি যেন ইচ্ছা করেই একটা গল্প শোনার আগ্রহ বাড়িয়ে দিল। খাবার খুব তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যায় এখানে। তাই দময়ন্তী চাইছিল পপাই গরম খাবারটা খেয়ে নিক আগে। গল্প শোনার দারুণ লোভও হচ্ছে।

-আন্টি চিকেন হো গিয়া?

-হ্যাঁ। আভি সার্ভ করতে হ্যায়।

-ঠিক হ্যায়। বেটা কো বুলাকে লাতি হুঁ।

পপাই আর শান্তনুকে নিয়ে ওরা খেতে বসেছে। খাওয়ার সার্ভ করতে যে লাদাখি মহিলা এলেন দময়ন্তী বুঝতে পারল, ইনি নিশ্চয়ই জাঈনা। তাশিও এসেছে সঙ্গে। কী যেন বলল। লাদাখি ভাষায়।

দময়ন্তীর আগ্রহ যেন তাশি পড়তে পারে।

-ম্যাডাম, কাল সফর হ্যায়। জাঈনাকে বললাম, এটুকু আমি আর কমলাই করে নিতে পারব। তুমি রেস্ট নাও। তা ও শুনবে না। আমরা তো রোজই করি এই কাজ। এখন ট্যুরিস্ট সিজন না বলে ভিড় নেই। নাহলে তো ফুরসতই মিলত না। রুম ভি ইধার মিলনা মুশকিল হ্যায়। আভি তো রুম হ্যায়। লেকিন আপলোগ টেন্ট পসন্দ করতে হো।

-হ্যাঁ, আংকেল হামরা বেটা কো ফার্স্ট চয়েস টেন্ট।

গরম মাংসের টুকরোয় একটা কামড় দিয়ে বেশ পরিতৃপ্তির সঙ্গেই শান্তনু কথাগুলো বলল।

দময়ন্তীর জাঈনার কথা জানতে ইচ্ছা করছে। রান্না করতে করতে কী একটা যেন অর্ধেক বলল তাশি আংকেল। কিসের প্রবলেম? দেখে তো আংকেলের সমবয়স্কই মনে হচ্ছে। গল্পটা কী?

-আংকেল কাল জাঈনা আন্টি হামারে সাথ যায়েঙ্গে। কিধার হ্যায় উনকা ঘর?

-ইয়েস ম্যাডাম। কাইন্ডলি, ডু দ্য ফেভার।

-আপ তো সব ল্যাংগুয়েজ জানতে হো। হিন্দি, বাংলা, ইংলিশ আউর আপকা লাদাখি তো হ্যায়হি।

-ম্যাডাম, আপ ভি তো বাঙালি হো কে কিতনা ফ্লুয়েন্ট হিন্দি বোলতে হো।

ওরা যেখানে খেতে বসেছে, সেটাও একটা টেন্ট। বেশ একটা হাসি আর ফুরফুরে ভাব খেলা করে গেল টেন্টের ভেতর। বেশ কয়েকবার রুটি সার্ভ করতে এল জাঈনা। কমলা আন্টি বোধহয় কিচেনেই রয়েছে। ডাইনিং স্পেসে আর আসেনি একবারও।

খাওয়া শেষ হলে তাশিকে দুটো গরম জলের বোতল দিতে বলে নিজেদের টেন্টে চলে গেল ওরা। পপাই বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। প্যাংগংয়ে আকাশটা বড় বেশি নীল। লেকের জলও বোধহয় এই কারণে ঘন নীল। তাঁবুর ভেতরটা বড় আরামের। বাইরে বেরোলে এখনো দময়ন্তীর শ্বাসকষ্ট হয়। তবুও বাহিরটা যেন টানছে ওকে। হাসান ভাই বলে গেছে রাত্রে এখানে পাহাড়ি কুকুর ছাড়া থাকে। তাই না বেরোনোই ভালো। বেরোলে হাতে স্টিক থাকে যেন।

-ম্যাডাম, গরম পানি।&dquote;&dquote;

-হ্যাঁ। আসুন আংকেল।

দময়ন্তী ভেবেছিল সারা দিনের কাজ সেরে ক্লান্ত তাশি জলের বোতলগুলো দিয়েই চলে যাবে। কিন্তু তাশি গল্পের মেজাজে। পাহাড়ি মানুষেরা প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে পারে। ক্লান্তি সহজে ওদের বশ করতে পারে না।

-ম্যাডাম আপকো জাঈনার স্টোরি বলছিলাম না? লেকিন জাঈনার কোয়ি আলগ স্টোরি নেই। এ স্টোরি তো হামাদের দেশের পলিটিকসের স্টোরি আছে।

দেশ, পলিটিকস শব্দগুলো শুনে দময়ন্তীর মনে প্রশ্ন জাগল কাশ্মীরের মতো এখানেও কি কোনো ক্ষোভ-অভিমান রয়েছে মানুষের মনে? অথচ লাদাখ তো খুব শান্ত, নিরীহ। তাশির পরের কথায় অবশ্য ওর ভুল ভাঙল।

-কার্গিল ওয়ারের আগে ব্রোলমো আর হুন্দারমেনের মধ্যে কোনো কাঁটাতার ছিল না। সিল্করুট জানেন তো ম্যাডাম?

-হ্যাঁ, সিল্করুট তো হিস্টরিক্যালি সিগনিফিকেন্ট।

শান্তনুও মন দিয়ে গল্প শুনছে।

-স্কার্দু, ব্রোলমো, হুন্দারমেন—সব কাছাকাছি ভিলেজ। এগুলো পাকিস্তান কাশ্মীরের পার্ট ছিল। যুদ্ধের পর হুন্দারমেন ইন্ডিয়ার দখলে চলে আসে। খুব ভালোই হয়। কিন্তু এই ইতনাদিন ধরে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই তিন গ্রামে থাকত, সে মানুষরা হঠাৎ সব পরদেশী হয়ে পড়ে। জাঈনার মা ও সব আপনজনরাই থাকত ব্রোলমোতে। হুন্দারমেনে কেবল ওর শ্বশুরালয় ছিল। ওয়ারের সময় তো আলাদা ক্যাম্পে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল গাঁওয়ের লোকদের। ওয়ার শেষে ফিরে এসে জাঈনা জানতে পারে ব্রোলমো যেতে গেলে বহুত খরচ।

-আচ্ছা, আগে কি তাহলে সড়কপথেই যেত ওরা?

-হ্যাঁ, স্যার। মোস্টলি।

-জাঈনার মা তখন খুব অসুস্থ। ওদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়। তবুও ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করে বহুত কষ্ট করে পারমিট নিয়ে ওয়াগা বর্ডার দিয়ে গিয়েছিল ও। মায়ের সেবা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারমিটের মেয়াদ বেশি দিনের ছিল না। হাতেপায়ে ধরে তো আর মেয়াদ বাড়ানো যায় না। আর বর্ডারের সববিষয়ই ন্যাশনাল সিকিউরিটির আন্ডারে। জাঈনার অ্যাপ্লিকেশন খারিজ হয়। এ রকম অ্যাপ্লিকেশন অনেক লোক বুঢ়া উদ্দেশ্যেও নেয়।

-তার মানে টেররিস্টরাও দেয়?

-হ্যাঁ, এভাবেই থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়। কিন্তু আম-আদমি আর টেররিস্ট আলাদা হওয়ারই বা উপায় কী? জাঈনার অ্যাপ্লিকেশন যে সাচ্চা ছিল, তা বোঝার মতো কী আইন আছে বাবুজি?

একটা দীর্ঘশ্বাস যেন ওদের তিনজনেরই একসঙ্গে পড়ে। জাঈনা হুন্দারে ফিরে এসেই খবর পেল যেদিন ও চলে গেল, সেদিনই রাত্রে ওর মা মারা গেছে। নিজের আম্মির ইন্তেকালের সময় থাকতে পারল না। আর একদিন বেশি মায়ের কাছে থাকার মেয়াদ ওর হলো না। খুবই আঘাত পেয়েছিল ও। তারপর থেকেই কেমন যেন অস্থির থাকে। গাঁওতে বেশি দিন মন টেকে না। ছেলের কাছে আমাদের কাছে চলে আসে মাঝেমাঝে। বলে, ‘কব ফির সরকার বোলেগা ইয়ে তুমহারা মুলুক নেহি হ্যায়। কব ফির বিছর যায়েঙ্গে? খোদাই জানে।’

-রাত বহুত হুয়া ম্যাডামজি। কাল ফির সফর। আপলোক রেস্ট লিজিয়ে। গুডনাইট।

সেদিন ঘুমের মধ্যে দময়ন্তী কয়েকটা টুকরো ছবি দেখল। যেগুলো আসলে সেই কবেকার ফেলে আসা স্পর্শাতীত শূন্যতা। অথচ ছবিটা যেন জাঈনাবাঈয়ের গল্পেই ডুব দিয়ে উঠে এল এইমাত্র।

আকাশে ধুলোয় ঢাকা চাঁদ। লোডশেডিংয়ের কারণে জানালা দিয়ে গলে আসা আলোটুকু বোঝা যাচ্ছে। হ্যারিকেনের আলোয় পড়ার বইয়ের ফাঁকে ঝিমুনি এসে যাচ্ছে ওদের দুই বোনের। তারই মাঝে সুর করে রামায়ণ পড়ছে ওদের ঠাকুমা। শেষ হলে গুরুদেবের অষ্টোত্তর শতনাম। ঝিমুনি কেটে গিয়ে ইতিহাস ভূগোলের বইয়ের থেকে মন সরিয়ে কান খাড়া করে সে সুর যেন ভরে নিচ্ছে দুজনই। হয়তো পড়ায় ফাঁকি দেয়ার বয়সে এই সুরগুলোই অজুহাত। আর সেই সুরে মিশে রয়েছে অনেক কিছু। ইতিহাস, স্মৃতি, ক্ষত, হারিয়ে যাওয়া আত্মগৌরবের জন্য বিলাপ ও কিছু বেদনা। সেসব কি বুঝতে পারছে বালিকাযুগল?

‘জিলা বরিশালে আছে বাখরগঞ্জ থানা।

তার অন্তর্গত রাজাপুর গ্রামখানা।’

এই অব্ধি পড়ে থেমে গেল ঠাকুমা। ঠাকুমার তোবড়ানো গালে হাসি ফুটে উঠল।  কোঁচকানো চোখ দুটো বইয়ের মধ্যে থাকলেও ঠাকুমা ঠিক বুঝতে পারল। ওরা দুই বোন হা করে তাকিয়ে আছি তারই দিকে। এবার বুড়ি শুরু করল গল্প। ‘আমাগো বরিশাল কী সুন্দর দ্যাশ আছিল। যেদিকে তাকাই শুধু নদী আর নদী। খাল, বিল, বাওড় আর সবুজ চারিদিক।’

চাঁদের বুড়ি গল্প বলার ফাঁকে এক ঢোক জল খেয়ে নিল। বোধহয় নদীর কথা মনে পড়ায় তৃষ্ণা জেগে উঠল।

-নদীগুলোর নাম শুনবি? ভারি সুন্দর নাম। মধুমতী, পানগুছি, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, ধানসিঁড়ি, কালিজিরা, কীর্তনখোলা, কালাবদর আর পায়রা নদী। কীর্তনখোলা তো আমাগো বাখরগঞ্জ দিয়া যাইত। পায়রা নদীতে বুঝি এসে মিশত।

নদীর কথা থেকে মাটির দোতলা বাড়ির কথায় চলে এল ঠাকুমা।

-সে মাটির বাড়ি কী শীতল! সারা দিন একটা শিরশির ভাব থাকত।

দময়ন্তীর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যে পপাই লেপ ছুড়ে ফেলে দেয়। এটা ওর স্বভাব। ছেলেকে ভালো করে লেপে মুড়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল ও। ইশ! সেই চাঁদের বুড়ির গল্পগুলো যদি আবার শুনতে পারত? না, আর কোনো স্বপ্ন দেখেনি সে রাতে ও। ঠাকুমাকে আদর করে চাঁদের বুড়িই ডাকত ওরা দুই বোন। চরকা-টরকা বইয়ের পাতায় পড়েছে ওরা। চাঁদের বুড়ির গল্প- বিষয়টায় একটা রূপকথা মিশে আছে যেন। ঠাকুমার বরিশালের স্মৃতিগুলো তো রূপকথার গল্পই। আর এসব মনে করতে করতেই উত্তর কলকাতার দুই কামড়ার ভাড়া বাড়িতে কীভাবে যেন বাকি জীবনটুকু কেটে গেল বুড়ির। বরিশালে আরো একবার যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল ঠাকুমার। কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

পরদিন গাড়িতে জাঈনাকেও তুলে নিয়ে ওরা হুন্দারমেনের পথে রওনা হলো। হুন্দারমেন গোটা লাদাখের তুলনায় সবুজ। একটা গেস্ট হাউজের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়ালে জাঈনা ওদের থেকে বিদায় চায়। যাওয়ার আগে অবশ্য ওর বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণও জানিয়ে যায়।

দুপুরে গেস্ট হাউজে রেস্ট নিয়ে ওরা হুন্দারমেন ঘুরতে বেরোয়। জাঈনার বাড়িতে গেলে দেখে বাড়ির সামনেই একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে কোথাও যাচ্ছে ও। ওদের দেখে খুব খুশি হয় বৃদ্ধা।

-আইয়ে।

-কাঁহা যা রহ্যেথে আপ? কাম পে?

-হাঁ। নদীকে পাশ। সূর্যাস্তকে সময়ে হাম যাতে হ্যায়।

এখান দিয়ে শিঙ্গ নদী বয়ে যায়। দময়ন্তীরাও জাঈনার সঙ্গে শিঙ্গ নদী দেখতে যেতে চাইল। সূর্যাস্তের পরেই নাহয় জাঈনার বাড়িতে জমিয়ে বসবে ওরা।

মাটি-পাথরের পাহাড়ের আড়ালে সূর্যটা একটু একটু করে আড়াল হচ্ছে। দূরের বরফ চূড়ার ওপার থেকে তেরছাভাবে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। শিঙ্গ নদীর উত্তাল শব্দের মধ্যে দিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- “লা ইলাহা ইলাল্লাহ/মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ...।”

জাইনাবাঈ আর তার ১০ বছরের নাতি তাড়াতাড়ি মাটিতে বসে পড়ল। সূর্যাস্তের হলুদ আলোর বিষণ্নতা লেগে আছে অশীতিপর এই বৃদ্ধার গালে। নামাজ পাঠ শেষ হলে জাঈনা বলল, হয়তো নিজেকেই, “ইয়া আল্লাহ, আপকে দুনিয়ামে ইয়ে নদীও কা কোঈ বর্ডার নেহি হ্যায়। লেকিন হাম ইনসানোকে বিচ বহত দুরিয়া হ্যায়।”