প্রিসিলার বাবার নাম অবতার উপল আর মায়ের নাম টেরেসা ক্যাথেরিনা দে গোজ ক্যাম্পোস। বাবা ভারতীয়, মা ব্রাজিলিয়ান। মায়ের বাবা ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশে। কানাডার ব্রাজিলিয়ান দূতাবাস।

পৃথিবীর দুদিক থেকে আসা দুজনই কানাডায় অভিবাসী। বাবার দিকটা খানদানি, না মায়ের দিকটা— এসব জানার কোনো প্রয়োজনই হয়নি। এসবে ছেলেমেয়েদের কী দরকার!

প্রিসিলার বাবা লম্বা, শ্যামলা, হ্যান্ডসাম একজন পুরুষ। নিজের যোগ্যতায় কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) কনিষ্ঠ প্রকল্প ব্যবস্থাপক। তার কর্মক্ষেত্র ক্যারিবীয় অঞ্চলের এন্টিগা।

‘আমার বাবা কানাডিয়ান সরকারের হয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিতে কাজ করত, তখন আমার বয়স দুই বছর আর আমার ভাইয়ের তিন; আমার বাবা এন্টিগায়। সেখানেই বাবা পালতোলা নৌকার একটি দুর্ঘটনায় পড়ল, নৌকাটা উল্টে গেল। বাবাকে দূষিত পানি গিলতে হলো। এই পানি তার রোগ প্রতিরোধক পদ্ধতিতে আক্রমণ চালাল এবং আমার বাবাকে তখনই কোয়াড্রিপ্লেজিক করে ফেলল— চার হাত, পা-ই অবশ। কাজেই সেই মুহূর্তে তার পুরো জীবনটাই ছারখার হয়ে গেল।

যখন আমার বয়স আট বছর, আর আমার ভাইয়ের নয়, যে আতঙ্ক আমার মায়ের জন্মেছে, তার ওপর এমন একজন পঙ্গু মানুষের দেখভাল করা— তার ভার আর বইতে পারছিল না। বাবার আতঙ্কটা শারীরিক, মায়েরটা মানসিক। মা নিজের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারল তার স্বপ্নগুলো ছিন্নভিন্ন ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যেমন করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে আমার বাবার শরীর— আর এটা সামলে ওঠা তার জন্য অসম্ভব ব্যাপার।

তাই সে পালিয়ে গেল।’

প্রিসিলার জন্ম কানাডার অটোয়ায়, ৩০ অক্টোবর ১৯৭৪। অভিবাসী মা-বাবার সন্তান। ক্যারিবিয়ান মা, ভারতীয় বাবার অপত্যস্নেহের মূল প্রবণতাগুলো এক হলেও ব্যত্যয় তো কিছু ঘটতেই পারে। তাই ঘটেছে। নতুন সে বাস্তবতা ক্যাম্পোস, প্রিসিলার মা মেনে নেয়নি বা নিতে চায়নি।

রাতারাতি নির্মমতায় রচিত হলো তার ভূমিকা। অভিবাসী পরিবারের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন জাতির মধ্যে বিয়ের বন্ধন ও প্রতিশ্রুতি— সব মিলিয়ে গেল। দিন-রাত একজন পঙ্গুর সেবা আর কত করবে, তার জীবনের কি কোনো মানে নেই?

ছয় বছর পর একদিন ক্যাম্পোস ব্যাংকের সব টাকা তুলে নিল, এমনকি সন্তানদের খেলনা ব্যাংকে জমানো ক্ষুদ্র সঞ্চয়গুলোও। ক্যাম্পোস উড়োজাহাজের তিনটি টিকিট কিনে আনে। কানাডা থেকে ব্রাজিল— সাও পাওলো।

নয় বছর বয়সী ছেলেটির নাম অমরজিৎ, প্রিসিলা তখন আট। ক্যাম্পোস জিৎ ও প্রিসিলাকে নিয়ে ব্রাজিল চলে যাবে। অবতার উপলের যা হওয়ার হোক।

জিৎ মায়ের সঙ্গে যাবে না, প্রিসিলা বাবাকে ফেলে যাবে না। মায়ের জোরজবরদস্তিতে কাজ হলো না। ছেলে ও মেয়ে যার যার মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিছুতেই ব্রাজিল যাবে না। সুতরাং ক্যাম্পোস নিজেই অবতার, জিৎ ও প্রিসিলার জীবন থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের জীবন থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল সুন্দর ব্রাজিলিয়ান নারী। ক্যাম্পোস কোথায়, এ নিয়ে কথা বলতে রাজি নয় জিৎ কিংবা তার বাবা অবতার। রাগটা জিৎ ধরে রাখতে না পেরে নিজের জন্য এবং অনুসন্ধিত্সু অন্য সবার জন্য একটি উত্তর বের করে রেখেছে। সে বলতে শুরু করে, ‘মা তো মরে গেছে।’

প্রিসিলা মনে করে মায়ের চলে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি তার জীবনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।

বলা আবশ্যক, প্রিসিলা উপল খুব কম বয়সেই কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রফেসর, তার চেয়ে বড় প্রিসিলা বহুল আদৃত একজন কবি। তার একটি কবিতার নাম ‘মাদার্স ডেথ’। প্রিসিলা অপেক্ষা করছে: মায়ের প্রেতাত্মা উঠে আসবে বেইজমেন্ট থেকে।

ক্যাম্পোস কি মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল? তার কোনো ঠিকানাও কারো জানা নেই। কিন্তু প্রিসিলাদের ঠিকানা তো তার জানা। যোগাযোগ তাদের মা-ও করেনি; অবতারের স্ত্রী-ও না।

ততদিনে প্রিসিলার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ডিভাইন ইকোনমি অব স্যালভেশন’ প্রকাশিত হয়েছে, ২০০২ সালে। বেশ সমাদৃত হয়েছে, আলোচনা ছাপা হচ্ছে এদিক-ওদিক।

২০০২-এর সেপ্টেম্বরে প্রিসিলা ইন্টারনেট সার্ফ করছে, খোঁজ করছে তার বইটি সম্পর্কে কোথায়, কে, কী লিখেছে। সার্ফ করতে করতে হঠাৎ একটি লিংক পেয়ে গেল, বিস্মিত হয়ে দেখল তাতে তার নিজের নাম এবং ভাইয়ের নাম।

প্রিসিলা সার্চ চালাতে চালাতে পেয়ে গেল টেরেসা ক্যাথেরিনা দে গোজ ক্যাম্পোসের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট: ‘আমার পালিয়ে যাওয়া মায়ের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট, গত কুড়ি বছরে যাকে আমি একবারও দেখিনি, যার কণ্ঠ শুনিনি।’ ক্যাম্পোসের পরিচিতিতে লেখা আছে, সাংবাদিক, লেখক ও সাও পাওলোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার।

কিন্তু এ কি সত্যিই প্রিসিলা ও জিতের মা?

ইন্টারনেট বের করে দিয়েছে একজন ভার্চুয়াল মানুষ। কিন্তু সত্যিই সে প্রিসিলাদের মা কিনা, তা কে জানে? সত্যিকারের মানুষটা কেমন? ক্যাম্পোস দুই ও তিন বছর বয়সী দুটি শিশুর ছবি পোস্ট করে। প্রিসিলা চিনতে পারে একজন তার ভাই, অন্যজন সে নিজে— আর তাদের পরনের যে পোশাক, তা ক্যাম্পোসেরই তৈরি করে দেয়া। ছবিতে নিজেও আছে। সত্তরের দশকের ফ্যাশন অনুযায়ী ঘাড় পর্যন্ত কাটা কালো চুল এবং গোলাপি চুলের ব্যান্ড দেখে মাকে তার চিনতে অসুবিধে হয় না। ছবিতে একজনই নেই, তাদের বাবা অবতার উপল।

ক্যাম্পোসের ওয়েবসাইট তো পর্তুগিজ ভাষায়, এটা তো প্রিসিলার ভাষা নয়। সুতরাং ‘অটোমেটিক ট্রান্সলেটর’-এর সাহায্য নিল; কম্পিউটারের কাছে এমন সাহায্য আগে কখনো তাকে চাইতে হয়নি।

তখনই তাত্ক্ষণিকভাবেই মাউসের এক ক্লিকে তার জানা হয়ে গেল মা ক্যান্সারে ভুগছে। ‘ওহ্ মাই গড!’

খবরটিই তাকে বলে দিচ্ছে, যাও, মাকে দেখে এসো। ‘আমি যদি দেরি করি, তাহলে তার সঙ্গে দেখা না-ও হতে পারে।’

অবতার উপল হুইল চেয়ারবন্দি থেকেই সিঙ্গেল প্যারেন্ট হিসেবে দুই সন্তান লালন করেছে।

প্রিসিলা কার সঙ্গে কথা বলবে?

প্রিসিলা তার পার্টনার ক্রিস ডোডার সঙ্গে আলাপ করে, ওয়েবসাইট থেকে নেয়া ক্যাম্পোসের নাম্বারে ফোন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ক্যাম্পোস তাকে সাও পাওলোতে আসতে বলল। উড়োজাহাজের টিকিট কিনতে টাকা লাগবে। প্রিসিলা হারিয়ে যাওয়া মাকে দেখতে যেতে চায়, সেজন্য টাকা চেয়ে এখানে-ওখানে আবেদন করল। লেখক হিসেবে ততদিনে তার কিছু পরিচিতি হয়েছে, একজন প্রকাশক টাকা দিলেন এই শর্তে যে, পাগলাটে মাকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি তাকে দিতে হবে।

২০০৩-এর এপ্রিলে ভিসা পেতে দেরি হওয়ায় একটি ফ্লাইট মিস হলো। হারিয়ে যাওয়া ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে পরের ফ্লাইটে প্রিসিলা ব্রাজিল রওনা হলো।

মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রিসিলা যে বইটি লিখেছে, তার নাম ‘প্রজেকশন: এনকাউন্টার্স উইথ মাই রানাওয়ে মাদার’। প্রিসিলা ১০ দিন ব্রাজিলে কাটিয়ে এসেছে, শুরুটা সাও পাওলো বিমানবন্দরে অবতরণ থেকে।

প্রিসিলা যখন স্কুলে, সে যে মা-ছাড়া মেয়ে, এটি ছিল ভীষণ যাতনার। স্কুলে কেউ জানত না যে তার একজন মা ছিল, যে মা তাদের ছেড়ে চলে গেছে।

‘এতদিন তো আমি তার কাছে মেয়ে ছিলাম না। আমার মনে হয়েছে ওয়েবসাইটে দেখা একজন সেলিব্রিটি বা এমন কাউকে দেখতে যাচ্ছি, যার সম্পর্কে আমার ধারণা অস্পষ্ট, ছবি দেখে যাকে চিনব কিংবা আমি জানি না সেই মানুষ কারা, কী তাদের ভাবনা, কী তাদের স্বপ্ন। আমি তার মেয়ে এ কথার মানে কী আমি জানি না, সে কারণেই আমার এ ট্রিপ— আমি বের করতে চাই সে কে? সে কী চেয়েছে? কুড়ি বছর ধরে সে কী ভেবেছে?

ব্রাজিল নিয়ে প্রিসিলার আতঙ্ক। ব্রাজিল কি তার পালিয়ে যাওয়া মা?

ব্রাজিলে সহিংসতায় প্রতি ৭ ঘণ্টায় ৯১ জন মারা যায়। পুরো ইরাক যুদ্ধে ৯১ জন আমেরিকান মারা গেছে, তাহলে ব্রাজিলিয়ান হওয়ার বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকার সৈনিক হওয়া নিরাপদ। মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তার নিয়মিত ড্রাইভার সোরেসের কথা থেকে উঠে এসেছে: ওই যে নিষ্পাপ দেখতে শিশুগুলো, এরা মোটেও নিষ্পাপ নয়, এরা গ্যাংয়ের অংশ। এবং শুধু তোমার পার্স নিয়ে নেবে তা-ই নয়, তোমার জুতা-মোজা-প্যান্ট— যা কিছু নেয়ার সবই নেবে।

প্রিসিলার অদ্ভুত অনুভূতি তার মাকে নিয়ে। এ কেমন মা? একবারও জানতে চাইছে না এতদিন কেমন ছিল, তার শরীর কেমন, সে কী নিয়ে পিএইচডি করেছে, সে কি বিবাহিত?

মা কেবল তার নিজের কথা বলে যায়। সরলভাবে হলেও বন্ধুরা তাকে কী বলেছে, সেটাও মেয়েকে বলে: ‘তুই আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছিস।’

প্রিসিলার ভাষায়, ‘সকালের নাশতার সময় আমি টের পাই আমার ফ্লাইট কেমন ছিল, এ প্রশ্ন ছাড়া আমি এখানে অবতরণ করার পর মা আমার সম্পর্কে একটি প্রশ্নও করেনি। সে আমাকে আমার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে না কেন? আমি কোথায় কোথায় গিয়েছি? আমার পিএইচডির বিষয় কী? আমার কি কোনো অসুখ ধরা পড়েছে? আমি কি কখনো প্রেমে পড়েছি?&dquote;&dquote;

সম্ভবত ব্রাজিল এসে প্রিসিলা ভুলই করেছে, এ উপসংহারে পৌঁছতে গিয়ে বলছে, ‘এই মহিলার তার নিজের গল্প ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ নেই।’

‘আমি এখানে কি ঘাস কাটতে এসেছি? আমার তো জীবনে কখনো ব্রাজিল যাওয়ার তাড়না ছিল না। আমি স্বপ্ন দেখেছি প্যারিসের, আমি স্বপ্ন দেখেছি লন্ডনের; বার্লিন, স্টকহোম, মেলবোর্ন, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ভিয়েনা কিংবা অসলোর। কখনো তো সাও পাওলোর স্বপ্ন ছিল না, ব্রাসিলিয়া কিংবা রিওরও না।’

‘স্বামী ও দুই সন্তানকে ফেলে রেখে ব্রাজিলের জন্য যে চলে এসেছে, এ কি সেই নারী নয়?’

প্রিসিলা সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কথা লিখে: ‘আমি যত বড় হচ্ছি, ততই কি মায়ের মতো হচ্ছি? তাহলে বাবা তো আত্মগতভাবেই আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করবে?’

প্রিসিলার মা-ও লিখে। বাবা এ লেখালেখিটা পছন্দ করে না। তাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর করা হলো, তার বাবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘তাহলে এখন শেষ পর্যন্ত ওইসব বই লেখালেখিটা বন্ধ করবে!’

প্রিসিলা লিখছে, ‘আমার বয়স যখন ১৮, আমি ইউনিভার্সিটিতে গুরুত্ব দিয়ে লিখতে শুরু করেছি, আমি ভাবতাম আমার পালিয়ে যাওয়া মায়ের খোঁজে বের হব এবং এ নিয়ে বই লিখব, এমনকি যদি তাকে না-ও পাই। আমি বিশ্বাস করতাম কখনো তাকে খুঁজে পাব না।’

প্রিসিলা বিস্মিত হয়, মা তার সম্পর্কে কিছুই জানে না এবং কোনো কিছু জানতে আগ্রহও দেখায় না। বরং তাকে শুনিয়েছে, ‘গত ছয়দিনে তোকে অনেক বুঝতে পেরেছি। তোকে নিয়ে একটা বই লেখার জন্য এটাই যথেষ্ট।’

তবে প্রিসিলা সে যাত্রায় মায়ের পরিবার সম্পর্কে একটা ধারণা পায়। কূটনীতিবিদ হওয়ার আগে তার নানা ব্রাজিলিয়ান বিমান বাহিনীর পাইলট ছিলেন, তার মামা এয়ার ফোর্সের প্রধান, তার সন্তানরা সবাই পাইলট।

সেই গম্ভীর মামার সঙ্গে যখন দেখা করতে যায়, তিনিও তার প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে সরাসরি বলেন, ‘তুমি ক্যান্সারে মারা যাবে।’

একজন বলে, মায়ের দেশ ব্রাজিল হলে তুমিও ব্রাজিলিয়ান। বাবার কোনো ভূমিকা নেই। মাকে তার মনে হয় হিস্টিরিয়াগ্রস্ত নার্সিসিস্ট। তাকে মনে হয় লুনাটিক— উন্মত্ত। তার পৃথিবীতে সে ছাড়া আর কেউ নেই।

প্রিসিলার মা চিত্রসমালোচক। সিনেমার গল্প ছাড়া তার অন্য কোনো গল্প নেই। “আমার মা বাস করে ‘মুভিল্যান্ড’-এ।”

তার কোনো অনুতাপ নেই, দুঃখবোধ নেই, সে ভিন্ন এক মানুষ। একপর্যায়ে মেয়েকে বলে ফেলে, ‘আমার ক্যান্সার আছে। ক্যান্সার যদি আমাকে মারতে না পারে, তাহলে তুই-ই আমাকে মেরে ফেলবি— আমি জানি।’

ক্যান্সার তো প্রিসিলারও আছে, দুর্লভ সাইনোভিয়াল সারকোমা।

একটি মর্মান্তিক পাদটীকা

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ প্রিসিলা উপল মারা যান। তখন তার বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর। তিনি সাইনোভিয়াল সারকোমা নামের দুর্লভ ধরনের একটি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরনো কোনো অসুখ নয়। সফট টিস্যুর এ ক্যান্সারের সাইনোভিয়াল সারকোমা নামায়ন হয় বিশ শতকেই। কারো বয়স যখন তিরিশের কোটায়, তখনই এর প্রকোপ হতে পারে। আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা পুরুষের চেয়ে নারীরই বেশি। চিকিৎসা অন্য যেকোনো ঘাতক ক্যান্সারের মতোই বহুমুখী— সার্জারি করে টিউমার অপসারণ, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি।

প্রিসিলা লিখছেন: ‘আমরা অনেকেই জানি কেমন করে শরীর ফিট রাখতে হয়, এমনকি কেমন করে মনটাকে ফিট রাখতে হয়, তাও জানি... কিন্তু আমাদের যে সৃজনশীল সত্তা, তা ফিট রাখব কেমন করে?’

প্রিসিলা নিজের কথা লিখছেন: “সাইনোভিয়াল সারকোমা নামের একটি দুর্লভ ধরনের ক্যান্সার আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে। সম্প্রতি আতঙ্কের মধ্য দিয়ে এটি শনাক্ত হয়েছে। এ ক্যান্সারের ঝুঁকিগুলো কী, সে সম্পর্কে তেমন জানা যায়নি। তবে কম বয়সী, স্বাস্থ্যবান, ফিট মানুষরাই এতে আক্রান্ত হয়, অন্য ধরনের ক্যান্সারে যাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। আমি একে বলি ‘কিক ইন ইয়োর ফেস ক্যান্সার’। ১১ সেপ্টেম্বর তিনজন সার্জন মিলে ৮ ঘণ্টা ধরে আমার ওপর বিস্তৃত অপারেশন চালালেন। আমার পেটের ওয়াল অনেকটাই তুলে ফেলা হলো। আমার ডান ঊরুর মাংস কেটে এনে তা ভরাট করা হলো। আর আমি যেহেতু নিয়মিত দৌড়াই, আমার ঊরুতে কার্যত চর্বি থাকার কথা নয়, কাজেই গ্রাফটিংয়ের জন্য আমার পশ্চাৎ দিক থেকে কেটে আনা হলো।

ডা. ওন্ডারের নেতৃত্বাধীন আমার এ চমত্কার মেডিকেল টিমকে ধন্যবাদ, তারা বিশ্বাস করল যে অপারেশন সফল হয়েছে। এ ধরনের অপারেশনের পর সেরে ওঠার জন্য লম্বা সময় লাগার কথা। কিন্তু আমাকে জানানো হলো, আমার সেরে ওঠার প্রক্রিয়াটি বিস্ময়কর দ্রুত। কাজেই আমি ওয়াকার থেকে ক্রাচ, ক্রাচ থেকে ছড়িতে চলে এলাম মাত্র দুদিনে— আমার সপ্তাহ-মাস লাগল না। বলা হলো, এ সাফল্যের কারণ অপারেশনের আগে আমার অত্যন্ত উঁচু পর্যায়ের ফিটনেস।

আমি ভাবি এটাই যদি পুরো গল্পটা হতো। সত্যি বলতে কি, আমি তখন গল্পের কথাই ভেবেছি। আমার জীবনের অনেকটা সময় আমি অসুখ-বিসুখ ও স্বাস্থ্য নিয়ে লিখেছি। ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা নিয়ে আমি নন-ফিকশন, ফিকশন, কবিতা-নাটক পড়েছি। এ বিষয়ের ওপর আমি ডজন ডজন সিনেমা দেখেছি। অপারেশনের পর সার্জন মনস্তাত্ত্বিক, সমাজকর্মী, গবেষক আমাকে অসংখ্য প্রশ্ন করেছে— সবকিছুই যন্ত্রণা, ক্ষুধার অবস্থা থেকে আমার পরিবার কর্মক্ষেত্রে সহায়তা ইত্যাদি।...

আমি এখনো সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। আমি জানি আমার যা কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে, সবই আমার সৃজনশীল কাজের মধ্যে দেখা দেবে। কারণ সৃজনশীল স্বাস্থ্য আমার উপশম প্রক্রিয়ার একটি অবিভাজ্য অংশ, অন্যদেরও তাই। আমি একটি চিকিৎসা পদ্ধতি ও শিক্ষা পদ্ধতি দেখতে চাই, যা এই সেরে ওঠার প্রক্রিয়া সাহিত্য ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনুধাবন করবে।”

সেই অপারেশনটা কি সত্যিই সফল ছিল, সাইনোভিয়াল ক্যান্সারের সব বীজ কি উৎপাটিত হয়নি? নাকি ক্যান্সার আবার ফিরে এসেছে?

দুঃসংবাদ এটাই প্রিসিলা উপল মারা গেছেন, এই সাইনোভিয়াল ক্যান্সারেই। প্রিসিলা নেই।

প্রিসিলা উপলের বইপত্র

কবিতা: হাউ টু ড্র ব্লাড ফ্রম এ স্টোন (১৯১৮), কনফেশন অব এ ফার্টিলিটি এক্সপার্ট (১৯৯৯), প্রিটেন্ডিং টু ডাই (২০০১), লাইভ কাভারেজ (২০০৩), কাভার বিফোর স্ট্রাইকিং (২০০৪), হলোকস্ট ড্রিম (২০০৫), অনটোলজিক্যাল নেসেসিটিস (২০০৬), ট্রামাটোলজি (২০১০), উইন্টার স্পোর্টস: পোয়েমস (২০১০), সাকসেসফুল ট্র্যাজেডিজ (২০১০)।

উপন্যাস: দ্য ডিভাইন ইকোনমি অব স্যালভেশন (২০০২), টু হুম ইট মে কনসার্ন (২০০৯), কাভার বিফোর স্ট্রাইকিং (২০১৫)।

নন-ফিকশন: উই আর: হোয়াট উই মোর্ন (    ), প্রজেকশন: এনকাউন্টার্স উইথ মাই রানাওয়ে মাদার (২০১৩)।