নগর ও নগরায়ণ
‘নগর বাহিরিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ।/ ছই ছোই যাই সো ব্রাহ্মণ নাড়িয়া।।’ চর্যাপদের এ শ্লোক যেমন নগরের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তেমনি বিভিন্ন স্থানের রেডিও কার্বন সময়। নির্ণায়ক পদ্ধতির মাধ্যমেও জানা গেছে, ভারতবর্ষের আদি ঐতিহাসিক দ্বিতীয় নগরায়ণ প্রক্রিয়ার প্রথম বাস্তবায়ন হয় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলি অঞ্চলে। আর নগরায়ণ প্রক্রিয়ার প্রধান উপাদানগুলো ছিল অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন, জনসংখ্যার পর্যাপ্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, ধাতু বিদ্যার উন্নতি, দক্ষ শিল্পকলার আবির্ভাব, নতুন আর্থসামাজিক-ধর্মীয় চেতনাবোধ ও রাজতন্ত্রের সূত্রপাত। অর্থাৎ সাগর ও নদনদীময় বাংলায় স্বাভাবিক কারণেই দ্বিতীয় নগরায়ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু নগর কাকে বলে?
স্থায়ী ঘনবসতিসম্পন্ন এমন স্থান, যেখানে কিছু দোকান বা বাজার, কিছু বাণিজ্যিক কাণ্ড চলা ও গরিষ্ঠ অধিবাসীগণের অকৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকা, এমন এলাকাই নগর। আর নগরায়ণ হচ্ছে জনগোষ্ঠীর পেশা কৃষি থেকে ক্রমেই অকৃষিতে পরিবর্তিত হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। The Metropolis: Its People, Politics and Economic Life গ্রন্থে জন বোটেনস বলছেন, ‘সীমিত ভৌগোলিক এলাকা, বিরাটসংখ্যক লোকের ঘনবসতি, বহুবিধ সাধারণ স্বার্থের অবস্থিতি এবং রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত স্থানীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত বহুবিধ প্রথার অস্তিত্বেই এ নগর।’ আর নাগরিক মন নিয়ে The Urban Community: A World Perspective, Holl Rinehart and Winston পুস্তকে নেলস আন্ডারসন বলছেন, ‘নগরায়ণ হচ্ছে মানুষের চিন্তা, ব্যবহার ও মূল্যবোধে ব্যাপক বদল। এটা শুধু কোনো ব্যক্তি বা দলের পেশাগত পরিবর্তন নয়, কাজের প্রতি মানুষের মনোবৃত্তির রূপান্তর ও শ্রমবিভাগেরও বদল ঘটায়।’ অর্থাৎ নগর হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক গুরুত্বসম্পন্ন নির্দিষ্ট এলাকা, যেখানে গ্রাম বসতির তুলনায় অধিক জনঘনত্ব, পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট, কৃষির সঙ্গে সম্পর্কহীন চাকরি ও ব্যবসানির্ভর অধিকাংশ অধিবাসী, নাগরিক সুবিধাদি এবং জনমানসের বৈচিত্র্যময়তা ও প্রসারতা; এক কথায় নগরায়ণ হলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে নগরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তর।
নগর কীভাবে গড়ে
কর্কটক্রান্তীয় রেখা ধরে যেমন প্রাচীন মানববসতিগুলো গড়ে উঠেছে, তেমনি নগর গড়ে ওঠার পেছনেও ভূগোলের প্রধান ভূমিকা। ভূগোল যদি বুঝি দেখব নিরাপত্তা লাভের সহজলভ্যতা ও পারস্পরিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে নদনদী বা সমুদ্রতীর এবং বিভিন্ন পথের সংযোগস্থলে নগরগুলো গড়ে উঠেছে। কারণ নগরের প্রথম ও প্রধান পরিচয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও আদান-প্রদান কেন্দ্র হিসেবে। তাছাড়া নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, পানীয়জলের সুবিধা ও মাল পরিবহনের কারণে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলোর প্রতিষ্ঠা হয়েছে নদ-নদীর তীরেই। বাংলার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম থেকে চিলমারী আর বিশ্বের বেলায় কায়রো থেকে করাচি।
সব নগরই শাসনতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্র হয় না, গুরুত্ব বিচারে প্রধান নগরেই তা হয়। মধ্যযুগীয় বাংলার ভৌগোলিক এলাকা বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করা হয়েছিল। যেমন— ইকলিম, আরসা, শহর, কসবা ও খিট্টা। ইকলিম হচ্ছে বড় এলাকা আর আরসা হচ্ছে তারই অন্তর্ভুক্ত ছোট এলাকা। কেউ কেউ ইকলিমকে বিভাগ আর আরসাকে জেলা ধরেন। আর শহর মানে ব্যবসা কেন্দ্র। কসবা হচ্ছে অস্থায়ী সেনানিবাস আর খিট্টা হচ্ছে স্থায়ী সেনানিবাস। কসবা ও খিট্টা হচ্ছে উজির ও সেনাপতির অধীন এলাকা আর গোটা দেশ যে নগরকে কেন্দ্রকে আবর্তিত হতো, তা হচ্ছে রাজধানী।
নগরের উত্থানের পেছনে বাণিজ্যিক সুবিধা অপরিহার্য ছিল। বাণিজ্যলব্ধ ধন থেকে সুলতানি আমলের নগরগুলো প্রধানত গড়ে ওঠে। এই নগরগুলোর শহরতলি ছিল শিল্প-বাণিজ্যসমৃদ্ধ, যা পশ্চাত্ভূমির মতো ভূমিকায়। তাছাড়া ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যের ভূমিকা। ছোট নগরগুলো স্থানীয় বাণিজ্যের কেন্দ্র, যার নাম মফস্বল আর বৃহৎ নগরগুলো বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে রূপ নেয়। বাংলার গৌড়, সোনারগাঁ, চট্টগ্রাম, সপ্তগ্রাম, বাকলা ও মুর্শিদাবাদ একেকটি বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে বললে একটুও কম বলা হবে না।
সমাজের মানুষজন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ধর্মীয় স্থান মসজিদ, মন্দির, মাজার ও দরগায় সমবেত হতেন। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হতো। এসব পুণ্যভূমিতে ধীরে ধীরে নগরের অন্যান্য সুবিধাও বিকশিত হতে থাকে, বৃহৎ নগরের রূপও লাভ করে। এমনকি এসব নগরে ধর্মীয় শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে বহুছাত্রের আগমনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে ওঠে। সংস্কৃত চর্চার জন্য নবদ্বীপ ও আরবি-ফারসি শিক্ষার জন্য সোনারগাঁর খ্যাতি সর্বব্যাপী ছিল। খানজাহান আলী বাগেরহাটের মতো অনেকগুলো মসজিদ সমৃদ্ধ গড়ে ওঠে। মসজিদ স্থাপত্যের বেষ্টনী, প্রাচীর, মোটা বুরুজ ও দেয়াল দেখলেই তা বোঝা যায়। সিলেটের শাহজালালের মাজারও একটি উদাহরণ।
মুদ্রা আর টাঁকশালের সম্পর্কের মাত্রা না বললেও সকলে জানেন। মুদ্রার বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণ, জাল মুদ্রা প্রতিরোধ, টাঁকশালের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক জনগণের প্রয়োজন। তাই টাঁকশালকে কেন্দ্র করে মানুষ কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে এবং কেন্দ্রীভূত জনগণের মাধ্যমে টাঁকশাল নগর গড়ে ওঠে। আবার আগে প্রতিষ্ঠিত নগরে টাঁকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে টাঁকশালের পরিচয়ই প্রধান হয়ে ওঠা নগরেও টাঁকশাল নগরী বলা হয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, মুদ্রার সহজলভ্যতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান, যুদ্ধ ও রাজধানী স্থানান্তর ইত্যাদি কারণে ব্রিটিশ আমলের আগ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক টাঁকশাল নগর গড়ে উঠেছিল। ‘সুলতানি বাংলার নগরায়ণ ও তার কার্যকলাপের অনুসন্ধান’ গ্রন্থে আসিফ জামাল লস্কর ২৭টি টাঁকশাল নগরের কথা উল্লেখ করেছেন।
নগরের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো পরিকল্পিত নগরটির সামরিক প্রতিরক্ষার বিষয়টি। সোনারগাঁ, বাগেরহাট, বাখরাবাদ, দেবকোএ ও কুসুম্বা নগরগুলো মধ্যযুগে সামরিক ঘাঁটিকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে। এসব স্থান প্রাকার ও পরিখা বেষ্টিত ছিল বলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল দৃঢ়। সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহূত নৌঘাঁটিকে কেন্দ্র করে বাংলায় নগর গড়ে ওঠার দৃষ্টান্তও আছে মধ্যযুগে। সুলতানি আমলে বাংলায় দুর্গনগরী হিসেবে গৌড়-লখনৌতি, একডালা, দেবকোএ ও মহাস্থান গড়ের নাম করা যায়। গড় জরিফা দুর্গ ছিল ময়মনসিংহের শেরপুরে। সে সময় দুর্গ নগরকে বলা হতো খিট্টা আর দুর্গহীন নগরকে বলা হতো কসবা। দুর্গ নগরের গঠনরীতি ছিল দুর্গ, প্রাকার, পরিখা, পরিদর্শন স্তম্ভ ও পণ্য বিক্রয়ের কাটরা বাজার। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে দুর্গের বাইরে নগরের বিস্তার লাভ ঘটেছিল। কুমুদ রঞ্জন দাস তার ‘সুলতানি আমলে বাংলার অর্থনৈতিক বিকাশ’ প্রবন্ধে চীনা ভ্রমণকারী মাহুয়ানের উদ্ধৃতিতে আছে, এই রাজ্যের নগরগুলো দেয়াল দিয়ে ঘেরা। আরেকজন চীনা ভ্রমণকারী লিখেছেন, ‘সোনারগাঁও নগরটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানে পুকুর, রাস্তাঘাট ও বাজার আছে। সেখানে সব রকমের জিনিসের বেচাকেনা চলে... পাণ্ডুয়া নগরের দেয়ালটি খুবই চমত্কার, বাজারগুলোর ব্যবস্থা খুবই ভালো, দোকানগুলো পাশাপাশি অবস্থিত।’
নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে কানিংহামের উদ্ধৃতিতে আছে, লখনৌতি নগরের এই দুর্গ ছিল পুরনো গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। তার বিবরণে আরো জানা যায়, ওই নগর বিশাল উচ্চ রক্ষা প্রাচীর; যার প্রতি কোণে একটি করে গোলাকার বুরুজ ও তোরণ এবং চারদিক ঘিরে গভীর পরিখা।
ইতিহাসের ধারাবাহিক নিয়মেই নগরায়ণের মধ্য দিয়ে বাংলার সভ্যতা আদিম গ্রাম সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। নগরের উত্পত্তির কারণ, গঠন, বিকাশ, বিন্যাস ও নগরায়ণের ধারা সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির বৃহত্তর পটভূমিতে বিবেচনা করতে হবে। প্রাক-মুসলিম যুগে নগর অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষিজ উৎপাদনের উদ্বৃত্ত আর মুসলিম আমলে কৃষিজ উদ্বৃত্তের সঙ্গে বাণিজ্যলব্ধ ধনই ছিল নগর অর্থনীতির প্রধান উপাদান।
পলাশী পূর্বে বাংলার নগরের হাল
১৩ শতক থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত নগর সভ্যতা বলতে গৌড়, সপ্তগ্রাম, চট্টগ্রাম, সোনারগাঁ, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি বঙ্গীয় শহরের কথা পুনর্বার উচ্চারিত হয়েছে। বাংলার কারিগর ও এর কুটির শিল্প প্রভৃতির ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের যে কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছিল, পলাশীর যুদ্ধের এক ধাক্কায় সেগুলো শোচনীয় হয়ে পড়ে। অথচ রবার্ট ক্লাইভ নিজে বাংলাকে ‘পৃথিবীর স্বর্গভূমি’ বলে বর্ণনা করেছেন। এ দেশের অতিপ্রাচুর্য, সেসঙ্গে দেশীয় রমণীদের প্রীতিকর সৌন্দর্য পর্তুগিজ ওলন্দাজ ও ইংরেজদের মুখে একটা প্রবাদ বাক্য বসিয়ে দিয়েছিল, বাংলায় প্রবেশের শত পথ আছে কিন্তু প্রস্থানের একটা পথও নেই।
আর পলাশীর যুদ্ধের পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলা ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৭৭০ সালের জুন মাসে মুর্শিদাবাদের রেসিডেন্ট ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছিলেন, মানুষ মানুষের মৃতদেহ ভক্ষণ করছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার কৃষির উন্নয়ন ও অর্থনেতিক কাঠামো উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার মনে করেনি। যে কোম্পানি নবাবের সাধারণ মানের আক্রমণ সামাল দিতে পারেনি, সেই ব্রিটিশ কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধলব্ধ আয় দিয়ে পুরো ভারত কব্জা করে ফেলে। এলএইচ জেংসের মতে, ভারতে ইংরেজ শাসনের প্রথম ১০০ বছরের নিট ফল ছিল বস্ত্র-কৃষি-শিল্প প্রভৃতির সর্বনাশ, রাজস্ব ও করের অত্যধিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ধ্বংস। নগরগুলোয় বণিক শ্রেণী মূলধনের অভাবে কোনো প্রকার শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কারখানা স্থাপন তো দূরের কথা রক্ষাই করতে পারেনি। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানদারি, দালালি, মহাজনি প্রভৃতিই তখন উপার্জনের পথ। মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলতে উকিল, মোক্তার, শিক্ষকদেরই বোঝাত। উৎপাদক মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলতে কিছু ছিল না।
মোগল যুগের শেষের দিকে ঢাকা, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি শহর ছিল বাংলার উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধ শহর। সুশীল চৌধুরী তার ‘পৃথিবীর তাঁত ঘর: বাংলার বস্ত্রশিল্প ও বাণিজ্য’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘বস্ত্রশিল্প বাংলার সনাতন ঐতিহ্যের অন্যতম। বহুদিন ধরে, বিশেষ করে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র বাংলার কাপড়ের ছিল বিপুল চাহিদা। বাংলা তখন শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত বস্ত্র রফতানি করত। বস্তুত এ সময় বাংলা পৃথিবীর তাঁতঘরে পরিণত হয়।’ একই সময়ে পৃথিবীর মোট জিডিপির ৩০ ভাগ ভারতের ভাগে ছিল আর বাংলা ছিল সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ।
সপ্তদশ শতকে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে বড় রকমের পুনর্বিন্যাস হয়। এতে পশ্চিম এশিয়া, ষোড়শ শতকের মতো শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নয়, ভারতীয় বাণিজ্যের প্রধান অভিমুখ হয়ে দাঁড়ায়। পুরো সপ্তদশ শতকেই পশ্চিম এশিয়ায় গুজরাটি বাণিজ্যের ‘চির বসন্ত’ দেখা দেয়। কিন্তু অষ্টাদশ শতকেই তা পরিবর্তিত হয়ে পশ্চিম ভারত মহাসাগরে গুজরাটি বাণিজ্যের অবনতি হয়। অন্যদিকে কোম্পানির কর্মচারী ও কলকাতার স্বাধীন ইংরেজ ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যতরী পূর্ব ভারতে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুই দশকের মধ্যেই পশ্চিম ভারত মহাসাগর থেকে ভারতীয়দের বাণিজ্য বহর অন্তর্হিত হয়ে যায়। মোটামুটি এটা বলা যায় যে, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা মোগল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দর সুরাটের পতন। সমুদ্র বাণিজ্যে পতনের পরও মোট ব্যবসায় ভারতীয়রা দ্বিগুণ এগিয়ে থাকে। সুশীল রায় চৌধুরী তার “সমুদ্র বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে স্থলবাণিজ্য’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন, ‘অথচ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগেও কোম্পানিগুলোর কর্মচারীরা ইউরোপে তাদের কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখে পাঠাচ্ছে যে, ‘বাংলার কাপড় এবং রেশমের বাজারে তারা কোনো পাত্তাই পাচ্ছে না -এশীয়/ভারতীয় বণিকরাই এসব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে; এরা দামের কোনো তেয়াক্কা না করে সবচেয়ে উত্কৃষ্ট সব পণ্য কিনে নেয়। ফলে এশীয়/ভারতীয়রা যেখানে কাপড় এবং রেশম মিলিয়ে বছরে ১৬০-১৬৫ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য রফতানি করছে, সেখানে সব ইউরোপীয় কোম্পানির সম্মিলিত কাপড় ও রেশম রফতানির মূল্য খুব বেশি ধরলেও বছরে ৭০-৮০ লাখ টাকার বেশি নয়।’ তার অর্থ অষ্টাদশ শতকেও এশীয়/ভারতীয়দের স্থলপথে রফতানি ইউরোপীয়দের সমুদ্রপথে রফতানির চেয়ে অনেক বেশিই ছিল।”
কারণ কোম্পানিগুলোর পক্ষে কাপড় সংগ্রহ করার কয়েকটি বড় অসুবিধা ছিল। তার একটি হচ্ছে এশীয় বণিকদের গোমস্তারা প্রায় সবাই তাদের নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোকই হতো। অন্য কাউকে তারা এ কাজে নিয়োগ দিত না। ফলে তারা অনেক সস্তায় কাপড় কিনতে পারত, এতে ওভারহেড কস্ট ইউরোপীয়দের থেকে কম হতো। আরেকটি হচ্ছে বাংলায় কাপড়সহ অন্যান্য উৎপাদনকেন্দ্র সারা দেশেই ছড়িয়ে থাকত। ফলে ভাষাগত কারণে কোম্পানির কর্মচারীরা স্থানীয় ভাষায় কারিগরদের নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করতে পারত না। অন্যদিকে সমুদ্রবাণিজ্যের কারণে সারা বছর জাহাজ চলাচল করত না। ফলে বিশেষ মৌসুমে পণ্য সংগ্রহ করা বা দেশীয় সওদাগরদের নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করা ছাড়া উপায় ছিল না। এই রকম নানা কারণে মফস্বল শহরগুলো টিকে ছিল যত দিন না এসব বাধা অপসারণ করা না হয়। সম্ভবত এসব কারণেই বড় বড় নগর (সিটি) ধ্বংসের পরও ছোট ছোট শহরগুলো (টাউন) টিকে থাকে, এখানেই মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল।
নগর ও শহরের ফলন্ত দেহ শুষে কলকাতা-লন্ডন
একটি শহরকে শহর হয়ে উঠতে হয় প্রধানত যেসব কারণে, সেগুলো হচ্ছে উন্নত ও সুলভ যোগাযোগ ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শহরটি পরিচালনার এক ধরনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বা আইনি প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে মহানগর (সিটি) ও মফস্বল (টাউন) অনেকটা পিরামডের মতো সম্পর্কে জড়িয়ে ছিল। শহর যেসব উপাদানে গড়ে ওঠে, তার প্রায় সব উপাদানই কমবেশি মফস্বলে ছিল। অখণ্ড বাংলায় এ রকম মফস্বল শহরের সংখ্যা ছিল নগরপ্রতি তিন-পাঁচটি। ব্রিটিশ আমলে এককেন্দ্রিক পরাধীন রাজধানী কলকাতা গড়ে উঠেছিল শুধু একটি কোম্পানির একচেটিয়া দখল বাণিজ্যের কারণে। কিন্তু কোম্পানি-পূর্ব আমলে বাংলার সঙ্গে বিশ্বের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল বহুমাত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক। বিশ্বের নানা প্রান্তের ব্যবসায়ীরা বাংলার প্রত্যন্ত মফস্বলে গিয়েছেন। এভাবে বাংলাজুড়ে মফস্বলগুলোয় বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মিশেল ঘটেছে। যেমন— কুড়িগ্রামের চিলমারী ও বর্ধমানের কালনার মতো শহরগুলো ছিল নদীবন্দর ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বীরভূম জেলা পালঙ্ক, আসবাবপত্র ও পালকি; বাঁকুরার সোনামুখী ছিল তাঁতের কাপড়ের বড় শিল্পকেন্দ্র; কাঁসা ও পিতলের জন্য বিখ্যাত ছিল পাত্রসায়র। শুধু মেদিনীপুর জেলায়ই শিল্প-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল তিনটি শহর— ঘাটালবন্দর, চন্দ্রকোনা ও খড়ার। একই রকম শহর ছিল চাকদহ, শান্তিপুর, জঙ্গিপুর ও মালদহ। আজকের বাংলাদেশের দরিদ্রতম জেলা কুড়িগ্রামেই চিলমারী নদীবন্দর ছাড়াও মোগলবাসা, বাহারবন্দ পরগণা ও সোনাহাট বন্দর বিখ্যাত শহর ছিল। এখন একটু বোঝা দরকার, কোন কারণে এসব দূরবর্তী শহরগুলোয় বিচিত্র সংস্কৃতির মানুষের মিশেল ঘটেছিল।
ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় আসা পর্তুগিজ পর্যটক ডুয়ার্ট বারবোসা ও ভেনিসের পর্যটক লুডোভিকো দ্য ভারথেমার দলিল এবং পঞ্চদশ শতকের চীনা পর্যটক মাহুয়ানের দি অ্যাকাউন্ট অব মাহুয়ান, ভেনিসের পর্যটক সিজার ফেডেরিসি, পিরার্ড দ্য লাভাল, সেবাস্টিয়ান মানরিক প্রমুখের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলার ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্য দেখে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্বে মালাক্কা, সুমাত্রা, পেগু ও ক্যাম্বে থেকে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে তুরস্ক-সিরিয়া-ইথিওপিয়া পর্যন্ত থেকে বণিকরা দলে দলে আসতেন। আর স্থানীয় যারা সমুদ্রবাণিজ্য করতেন, তারা ছিলেন নবাবের নিকটবর্তী সওদাগর। কিন্তু বাঙালি বণিকদের বাইরে কোথাও যেতে হয়নি। সুশীল চৌধুরী বলছেন, ‘বাংলার সুপ্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ বন্দর থেকে বাঙালি বণিকরা সমুদ্রবাণিজ্য করতে কোথাও কোথাও যাচ্ছেন না, কারণ বাইরের বণিকরাই এসব শহর-বন্দরে বাণিজ্য করতে আসছেন, বাঙালিরা ঘরে বসেই প্রচুর সম্পদ আহরণ করতে পারছেন।’
ফ্রান্সিসকো বার্নিয়ে নামের ফরাসি এক পর্যটক যথার্থই বলেছেন, পৃথিবীর প্রায় সব সোনার খনি থেকে সোনা তুলে নিয়ে আসা হয় ভারতবর্ষে এবং সেগুলো সেখানেই অন্তর্হিত, বাইরে আর কোথাও যেত না। রোমান যুগের শেষ দিকে ইউরোপের পণ্ডিতরা তাদের মহাদেশের সব সোনা ভারতবর্ষে চলে যাচ্ছে বলে প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।
তাছাড়া আমাদের বাংলা ভাষায় পর্তুগিজসহ নানা ভাষার ঢুকে পড়া দেখেও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার হওয়ার কথা— কত বেশি পরিমাণে প্রত্যন্ত শহরগুলোয় তাদের আগমন ঘটেছিল।
মফস্বলের মুমূর্ষু দশা
এক ঢাকা নগরীতেই গোটা দেশের ১২ ভাগের এক ভাগ লোক বাস করে। বাকি মেট্রোপলিটনগুলোতেও একই অবস্থা। আর জেলা শহরগুলোর নগরায়ণ হয়েছে গ্রামের পথে। চিলমারীর মতো প্রাচীন বন্দরগুলো এখন গ্রামে পরিণত। লালমনিরহাট ছিল আসাম-বাংলার রেলওয়ে সদর দপ্তর, একটি বিমানবন্দরও ছিল; এখন সেটি শ্মশানের শব দেহের ভস্ম বহ্নির মতো ধিকে ধিকে জ্বলছে।
দেখা যাবে, প্রাচীন বাংলার মফস্বলগুলো ১৮৪৮ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও কোনো মতে টিকে ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার এত বছরে সেগুলো নাই হয়ে গেছে। রেনেলের মানচিত্রের শহরগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টা পরিষ্কার হবে।
মফস্বলের মুখাগ্নি, না মফস্বলের মাথা ঊর্ধ্বে তোলা
নগর পরিকল্পনার ভাষায়, একটি দেশে এককভাবে নানা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠা একটি শহর, যার ওপর নির্ভরশীল থাকে পুরো দেশ— এ রকম শহরকে বলা হয় প্রাইমেট সিটি। একটি দেশে প্রাইমেট শহরের অস্তিত্ব সেই দেশের বিপুল অসাম্যকে নির্দেশ করে। এ রকম শহর রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। রাজধানী ঢাকা আজ এ রকম একটি শহর। এর সঙ্গে সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোও। এ রকম শহরের উল্টো পাশে, ঠিক বিপরীতে বাকি শহরগুলো থাকে। যেমন— কুড়িগ্রাম। উন্নত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা ও যা ছিল তা ধ্বংস করে ফেলায়, দেশ ভাগ এবং শিল্প-বাণিজ্য না থাকায় তা আজ প্রায় গ্রাম। অথচ ১৯০১ ও ১৯১১ আদমশুমারি অনুসারে অখণ্ড বাংলায় সর্বাধিক অভিবাসীর আগমন ঘটেছিল এ জেলায়ই। আর স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ৭০ দশমিক ৮৭ ভাগ গরিব মানুষের বাস এ জেলায়। এখানে কোনো উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নেই, পাশের জেলার সরবরাহকৃত বিদ্যুতে এখানে আলো জ্বলে, কৃষি ছাড়া আর কোনো কর্মক্ষেত্র নেই, একটি নদীবন্দর ও দুটি স্থলবন্দর অকার্যকর, চারটি উপজেলার সঙ্গেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণ হয়নি, চরের জনগণ শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ উন্নত জীবন থেকে বঞ্চিত। জেলা শহরের অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি, যার ফলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বিনোদন কার্যক্রমের সুযোগ নেই— এই হচ্ছে মফস্বলগুলোর গড় পরিস্থিতি।






