দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৫ মে ১৮১৭, মৃত্যু ১৯ জানুয়ারি ১৯০৫, কিন্তু তিনি তাঁর আত্মজীবনী ১৮৫৮’র নভেম্বর পর্যন্ত লিখে থেমে গেছেন। আত্মজীবনীর শেষ অধ্যায়ে তিনি স্টিমারে এলাহাবাদ থেকে কলকাতা যাত্রা করে ১৫ নভেম্বর ১৮৫৮ সোমবার নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছলেন। এ যাত্রায় কিছু বিপত্তি ঘটল, মর্মান্তিক সংবাদও তার কানে এল।
জাহাজেই সংবাদপত্রের পাতা উল্টে দেখলেন তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা দ্বারকানাথ ঠাকুর ও দিগম্বরী দেবীর সবচেয়ে ছোট সন্তান নগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়েছে। নগেন ঠাকুরের জন্ম ১৮১৯, মৃত্যু ২৪ অক্টোবর ১৮৫৮। আয়ুষ্কাল চল্লিশ বছরেরও কম। পিতা দ্বারকানাথের প্রথম বিলেত সফরে দেবেনও সঙ্গী হয়েছিলেন। এই ছোট ভাইটি সম্পর্কে দেবেন ঠাকুরের মধ্যে একটি মিশ্র অনুভূতি কাজ করত। তিনি আশা করেছিলেন, নগেন প্রতিমা পূজার বিরোধিতা করে তার পক্ষ সমর্থন করবেন, কিন্তু নগেন তাকে ভয়ঙ্কর নিরাশ করেন। দ্বারকানাথের নেয়া ঋণ পরিশোধে যখন দেবেন ঠাকুরের নাভিশ্বাস উঠছে, সে সময় বিলাসিতা-প্রিয় নগেন আরো ঋণ করে অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেন (নিঃসন্তান ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী ত্রিপুরাসুন্দরী যখন আরেক ভাইয়ের পুত্রকে দত্তক নিতে চাইলেন, দেবেন ঠাকুর তার বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে তাঁর মহর্ষি খেতাব কিছুটা হলেও কালিমালিপ্ত হয়ে পড়ে)। তবুও ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদে তিনি বিচলিত হলেন।
‘এই সংবাদে শোকাবিষ্ট হূদয়ে অন্যমনস্ক হইয়া একটা কী দ্রব্য আনিবার জন্য ডেক হইতে কেবিনে প্রবেশ করিলাম এবং সেই দ্রব্য লইয়া তাড়াতাড়ি সেই কেবিনের বাহিরে আসিয়া পা বাড়াইয়াছি, আমার পা আর প্রতিষ্ঠা-ভূমি পাইল না। আমি আচম্বিতে দ্বিতীয় পা না বাড়াইয়া পৃষ্ঠের দিকে একটা ঝোঁক দিয়া কেবিনের মধ্যে পড়িয়া গেলাম। খালাসিরা হাঁ হাঁ করিয়া দৌড়াইয়া আসিয়া দেখে যে, আমার এক পা খোলের মধ্যে ঝুলিতেছে, ও আমার সমস্ত শরীরটা কেবিনের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে। তাহারা বলিল, “জিনিস তুলিবার জন্য এই কেবিনের সম্মুখের রাস্তার পাটাসকল উঠাইয়া ফেলিয়াছিলাম, আপনি কি তাহা দেখেন নাই!’ ...আমি যদি দ্বিতীয় পা বাড়াইতাম, তবে পঞ্চাশ হাত নিচে খোলের মধ্যে পড়িয়া আমার মস্তক চূর্ণ হইয়া যাইত। সেদিনকার জন্য তো আমার প্রাণ বাঁচিল।’
দেবেন ঠাকুরের মানস গঠনে হাফিজের দিওয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আত্মজীবনীতে বহুবার এমনকি শেষ অধ্যায়ে এসেও দিওয়ান থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। আত্মজীবনী যখন শেষ হচ্ছে তাঁর বয়স কেবল ৪১ বছর। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ব্রহ্মসংগীত দিয়ে উপসংহার টানলেন:
কত যে তোমার করুণা, ভুলিব না জীবনে।
নিশিদিন রাখিব গাঁথি হূদয়ে, কত যে তোমার করুণা।
প্রিয়নাথ শাস্ত্রী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুগত প্রিয় সহচর। দেবেন ঠাকুরের দৌহিত্র সুরেন্দ্রনাথ (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর আইসিএস এবং জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর বড় ছেলে) প্রিয়নাথের কন্যা সংঙ্গা দেবীকে বিয়ে করেন।
দেবেন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীর গ্রন্থস্বত্ব প্রিয়নাথ শাস্ত্রীকে প্রদান করেন। একটি স্বত্ব-সমর্পণ পত্রও লেখেন:
স্নেহাস্পদ শ্রীমান প্রিয়নাথ,
১৮ বৎসর হইতে ৪১ বৎসর বয়ঃশ্রম পর্যন্ত আমার জীবন-কাহিনী ঊনচল্লিশ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত করিয়া তোমাকে দিলাম; ইহা তোমার সম্পত্তি হইল। ইহাতে কোনো নূতন শব্দ যোগ করিবে না, ইহার বিন্দুবিসর্গও পরিত্যাগ করিবে না। আমি এই পৃথিবীকে জীবিত থাকিতে ইহা মুদ্রিত করিয়া প্রকাশ করিবে না। তোমার প্রতি আমার এই আদেশ, ইহা সর্বতোভাবে পালন করিবে। তোমার মঙ্গল হোক। ইতি ১১ই মাঘ ১৮১৬ শক।
পুনশ্চঃ ইহার ইংরেজি অনুবাদের অধিকার শ্রীমান সত্যেন্দ্রনাথ ও শ্রীমান রবীন্দ্রনাথকে দিলাম। অন্যান্য ভাষার অনুবাদের অধিকার তোমারই রহিল।
ইতি ১১ মাঘ ১৮১৬ শক।
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর তার জামাতা সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (সংঙ্গা দেবীর স্বামী) স্বত্বাধিকার বিশ্বভারতীকে দান করেন। বিশ্বভারতীর অনুরোধে সতীশ্চন্দ্র চক্রবর্তী প্রয়োজনীয় টীকা সংযোজন করে গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন।
দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন রামলোচন ঠাকুর। তিনিই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠাতা নীলমণি ঠাকুরের পুত্র। দ্বারকানাথ মূলত রামলোচনের উইলকৃত সম্পত্তির মালিক। রামলোচন অপুত্রক ছিলেন বলে ছোট ভাই রামমণির এই পুত্রকে দত্তক নিয়েছিলেন। রামমণির স্ত্রী অলকা দেবীই হলেন দেবেন্দ্রনাথের আত্মজীবনীতে উল্লেখকৃত দিদিমা, যার চির অন্তর্ধান তাকে ভিন্ন মানুষে পরিণত করে, তিনি বদলে যান।
বৈদ্য যখন নিশ্চিত হলেন অলকা দেবীর মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, তাঁকে তখনকার শাস্ত্র মেনে গৃহ থেকে নিষ্ক্রমণের আয়োজন করার হুকুম দিলেন। গঙ্গাতীরে একটি খোলার চালাতে তাকে রাখা হলো। তিনি আরও তিন দিন জীবিত ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ এই সময় তার সঙ্গেই থাকতেন।
‘দিদিমার মৃত্যুর পূর্ব্বদিন রাত্রিতে আমি ঐ চালার নিকটবর্তী নিমতলার ঘাটে একখানা চাঁচের উপর বসিয়া আছি। ...এই অবসরে হঠাত্ আমার মনে এক আশ্চর্য্য উদাস ভাব উপস্থিত হইল। আমি যেন আর পূর্ব্বের মানুষ নই।
ঐশ্বর্য্যের উপর একেবারে বিরচনা জন্মিল। যে চাঁচের উপর বসিয়া আছি তাহাই আমার পক্ষে ঠিক বোধ হইল। গালিচা দুলিচা সকল হেয় বোধ হইল; মনের মধ্যে এক অভূতপূর্ব্ব আনন্দ উপস্থিত হইল। আমার বয়স তখন আঠারো বৎসর।’
তারও আগে তিনি জীবন বদলের পরোক্ষ দীক্ষা নিলেন রাজা রামমোহন রায়ের কাছে। দিদিমার মৃত্যুর পর নববধূজ্ঞানে তারে প্রতীতী জন্মালো যে, প্রতিমায় ঈশ্বর নেই। ‘আমার ভাইদের লইয়া একটা দল বাঁধিলাম। আমরা সকলে মিলিয়া সঙ্কল্প করিলাম যে পূজার সময়ে আমরা পূজার দালানে কেহই যাইব না, যদি কেহ যাই প্রতিমাকে প্রণাম করিব না।’
সেকালের প্রেক্ষাপটে এ যে কত বড় বিদ্রোহ তা আজ অনুমান করা কষ্টকর হবে। উল্লেখ করা আবশ্যক, এই ঘটনার ১৮৩৮ সালে, আরো চার বছর আগে থেকেই তিনি সারদাসুন্দরী দেবীর সঙ্গে বিবাহিত। সারদার বয়স তখন ছয় (দেবেন ঠাকুরের আত্মস্মৃতি অনুযায়ী), কারো মতে আট।
দিদিমার মৃত্যু, বিদ্রোহ, বৈরাগ্য— এসবের আগে একটি ভোগের জীবনও তার ছিল। ব্যবসার সুবিধার জন্য দ্বারকানাথ দেশীয় ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও পদস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে নাচ ও ভোজের আয়োজন করতেন। আত্মজীবনীর টীকাকার ও সম্পাদক সতীশ্চন্দ্র চক্রবর্তী লিখেছেন:
‘অনেক সময় সামাজিকতার খাতিরে পুত্রদিগকে এই সকল প্রমোদ-সভার খানা খাওয়া, বাইনাচ ও সুরাপানের সংস্রবে লইয়া যাইতে হইত। কিশোর দেবেন্দ্রনাথ এই রূপে প্রলোভনের অনলে নিক্ষিপ্ত হইলেন। ইহার ফলে সুরা, নাচ ও ধনী পুত্রদিগের কুসঙ্গ কিছুকালের জন্য তাঁহাকে অধিকার করিল।’
বৈরাগ্য, ধ্যানমগ্নতা সম্ভোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা— দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে একটি মিথ তৈরি হয়েছিল। স্ত্রীতে উপেক্ষিত ছিলেন আত্মস্মৃতিই সে কথা বলে। পঞ্চদশ সংখ্যক সন্তানের জন্মদান অবশ্য সম্ভোগহীনতাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। করলে আমরা রবীন্দ্রনাথকে কোথায় পেতাম?
পাদটীকা ১
রবিঠাকুরের পিতা
দেবেন ঠাকুর যে দ্বারকানাথের সমুদয় জমিদারি পুরোপুরি লাটে উঠাননি তাতে পিতা দ্বারকানাথ বিস্ময়ই প্রকাশ করেছেন। একজীবনের বৈরাগ্য ও নির্জনবাসের পরও দেবেন ঠাকুর পিতার সাম্রাজ্য রক্ষা করতে পেরেছিলেন। ‘আত্মজীবনী’র সমাপ্তিকালেরও আড়াই বছর পর রবির জন্ম। সুতরাং পঞ্চদশ সংখ্যক সন্তানের পিতা দেবেন ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আত্মজীবনীতে কিছু লেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু কিছু চিঠিতে দেবেন ঠাকুরের পিতৃত্বের অবয়বটি স্পষ্ট। ১৮৮৩তে রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন বাইশ বছর, বক্সার থেকে দেবেন ঠাকুর পুত্রকে লিখলেন:
প্রাণাধিক রবি
কারবার (কর্ণাটকের কারওয়ার) হইতে নির্বিঘ্নে বাটিতে ফিরিয়া আসিয়া আমাকে যে পত্র লিখিয়াছ, ইহাতে আমি অতিশয় সন্তুষ্ট হইলাম। এইক্ষণে তুমি জমিদারির কার্য পর্যবেক্ষণ করিবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিতরূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশিল বাকি ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি সকল দেখিয়া তার সারমর্ম নোট করিয়া রাখ। প্রতি সপ্তাহে আমাকে তাহার রিপোর্ট দিলে উপযুক্ত মতে তোমাকে আমি উপদেশ দিব এবং তোমার কার্যে তত্পরতা ও বিচক্ষণতা আমার প্রতীতী হইলে আমি তোমাকে মফঃস্বলে থাকিয়া কার্য করিবার ভার অর্পণ করিব। না জানিয়া শুনিয়া এবং কার্যের গতি বিশেষ অবগত না হইয়া কেবল মফঃস্বলে বসিয়া থাকিলে কিছুই উপকার হইবে না। আমার স্থানপরিবর্তনে শরীরের কিছুই উপকার বোধ হইতেছে না। সকল উপায়ই ব্যর্থ হইতেছে। আমার এই জীর্ণ শরীরে সুস্থতার আর আশা নাই। ঈশ্বর তোমাকে কুশলে কুশলে রক্ষা করুন এই আমার স্নেহের আশীর্বাদ।
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ শর্ম্মণ্যঃ
সে বছরই দেবেন ঠাকুর মসুরীতে। রবিকে তার কাছে আসতে বললেন:
‘তুমি সঙ্গে একটা বিছানা এবং একটা কম্বল আনিবে। তুমি এই পত্র জ্যোতিকে দেখাইয়া সরকারি তহবিল হইতে এখানে আসিবার ব্যয় লইবে। দ্বিতীয় শ্রেণীর রেলগাড়ির রিটার্ন টিকিট লইবে।’
পরের বছর বিবাহিত রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন: ‘ইংরেজি শিক্ষার জন্য ছোট বৌকে (অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে) লরেটো হৌসে পাঠাইয়া দিবে। ক্লাসে অন্যান্য ছাত্রীদিগের সহিত একত্র না পড়িয়া তাহার স্বতন্ত্র শিক্ষা দিবার বন্দোবস্ত উত্তম হইয়াছে। ...তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে অনেক ভুল হয়— বিদ্যারত্নকে এ বিষয়ে সাবধান করিয়া দিবে।’
দেবেন ঠাকুরের প্রাণাধিক রবির স্বাস্থ্যহানি ঘটেছে, মাথায় এক প্রকার কষ্ট এবং বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছে। পিতা ছেলেকে লিখছেন: তুমি একেবারে পুষ্টিকর আহার ছাড়িয়া দিয়াছ। তাহার জন্য তোমার এই দুর্বলতা ও পীড়া। মত্স্য মাংস আহার না করিলে তোমার শরীর পুষ্ট হইবে না। তুমি নীলমাধব ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করিয়া এ বিষয়ে যাহা বিধান পাও, তদনুসারে চল, এই আমার পরামর্শ এবং উপদেশ।
১৮৮৪-এর আরেকটি চিঠিতে রবিকে লিখছেন: ‘একটি ভালো হারমোনিয়াম ক্রয় করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছ— শাস্ত্রীর নিকট হইতে শুনিলাম— অতএব তাহা ক্রয় করিবে। কিন্তু যে হারমোনিয়াম মেরামত করিতে দিয়াছ তাহা তবে কী উপকারে আসিবে?’
রবীন্দ্রনাথ আট-নয় বছর বয়সে কিছু সময় পিতার সাথে গঙ্গার তীরে বসবাস করেছেন আর কয়েক বছর পর পিতা তাকে নিয়ে যান হিমালয় পর্বতে। ‘আমার পিতাকে এই প্রথম নিকটে দেখেছি, আর হিমালয় পর্বতকে। উভয়ের মধ্যে ভাবের মিল ছিল। হিমালয়ে এমন একটি চিরন্তন রূপ যা সমগ্র ভারতের, যা একদিকে দুর্গম আরেকদিকে সর্বজনীন। আমার পিতার মধ্যেও ভারতের সেই বিদ্যা চিন্তায় পূজায় কর্মে প্রত্যহ প্রাণময় হয়ে দেখা যাচ্ছিল যা সর্বকালীন, যার মধ্যে প্রাদেশিকতার কণামাত্র নেই।’
পাদটীকা ২:
তত্ত্ববোধিনী সভা
১৮১৫ সালে রাজা রামমোহন রায় স্থাপন করেছিলেন ‘আত্মীয় সভা’— বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষিতজনের ভাববিনিমিয়ের ক্ষেত্র হিসেবে এটিই হয়ে ওঠে সংস্কারবাদীদের একটি থিংক ট্যাংক। পেছন ফিরে আত্মীয় সভার ওপর চোখ রেখে দেবেন্দ্রেনাথ ঠাকুর মাত্র ১৫ বছর বয়সে ১৮৩২ সালে স্থাপন করেন ‘সর্বতত্ত্বদীপিকা সভা’, সেখানে স্বদেশীর বিদ্যার আলোচনা হতো। আত্মীয় সভার আঙ্গিকে ১৮৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তত্ত্বরজিনী সভা’— এটিই পরে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ হিসেবে দেবেন্দ্রনাথের সার্বিক আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার এবং খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরকরণ প্রতিহত করা এর অন্যতম লক্ষ্য। তত্ত্ববোধিনী সভা ১৮৩৯-৫৯ এই কুড়ি বছর সক্রিয় ছিল। এ সময় দেবেন ঠাকুরের অর্থে ত্রিমুখী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে: তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাদান, তত্ত্ববোদিনী পত্রিকা প্রকাশ ও অন্যান্য ব্রাহ্ম ধর্ম-বিষয়ক গ্রন্থের প্রকাশনা। ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের জন্য তরুণ ধর্মপাঠক সৃষ্টি ও তাদের প্রশিক্ষণ। রক্ষণশীল ও উদারমনা দুধরনের সুশিক্ষিত মানুষ এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এই সভার সঙ্গে যুক্ত হন। দেবেন ঠাকুরের ধর্মচিন্তার কিছুটা পরিবর্তন এবং সভার পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে মতানৈক্য এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানটির বেশকিছু কর্যক্রম, বিশেষ করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার প্রকাশনা এবং ধর্মবিস্তার অব্যাহত থাকে। ১৮৫৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিলুপ্তি ঘটে।
পাদটীকা ৩:
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা
পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৬ আগস্ট ১৮৪৩, সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত। অর্থের জোগান দিলেন এবং অন্যতম পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলায় মুক্তবুদ্ধি ও বিজ্ঞানচর্চার সূচনা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতেই। ‘হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিক প্রথা অবতার তত্ত্ব এবং ভাবাবেগকে নিন্দা করে ব্রাহ্ম ধর্মের মূল আদর্শ তুলে ধরা এবং অবশ্যই সেই সঙ্গে বিজ্ঞান ও স্ত্রী শিক্ষা-বিষয়ক বিবিধ রচনা প্রকাশ পত্রিকাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল’ (দীপক সেনগুপ্ত)। দেবেন ঠাকুর ধর্মীয় ও দার্শনিকী বিষয়গুলোয় পত্রিকাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলে অক্ষয়কুমার বিজ্ঞান, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ধরনের বৈশ্বিক বিষয়কে এর অন্তর্ভুক্ত করেন। কিছুটা দ্বিমত হওয়া সত্ত্বেও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিতই রাখেন।
নিম্নমানের বাংলা পত্রিকা ও প্রকাশনা থেকে যেসব শিক্ষিত বাঙালি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা তাদের অনেককে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। ১৮৪৩ থেকে একটানা ১৮৮৩— এই চল্লিশ বছর এবং পরে সাময়িক বিরতি দিয়ে ১৯৩২ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। প্রথম সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের প্রথম দিকে মাসিক বেতন ছিল ৩৯ টাকা এবং পর্যায়ক্রমে তা ৬০ টাকা পর্যন্ত উন্নীত হয়। তিনি ১৩ বছর সম্পাদনা করেছেন। তার পর যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি তত্ত্ববোধীনি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন তারা হচ্ছেন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮৫৬), নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৫৭), সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৫৯-৬০), তারকানাথ দত্ত (১৮৬১) আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ (১৮৬২), প্রতাপচন্দ্র মজুমদার (১৮৬৩), অযোধ্যানাথ পাকড়াশী (১৮৬৪-৬৬, ১৮৬৯, ১৮৭২-৭৭), হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন (১৮৬৭-৬৮, ১৮৭৮-৮৩, ১৯০২), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭০, ১৮৮৪-১৯০১, ১৯০৬), অযোধ্যানাথ পাকড়াশী ও আনন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭১), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন (১৯০৩-০৫), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও চিন্তামণি চট্টোপাধ্যায় (১৯০৯-১০), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১১-১৪), সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৫-২১)।
ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯২২-২৫, ১৯৩১) ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বনোয়ারী লাল চৌধুরী ও ক্ষেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯২৬-২৯), ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বনোয়ারী লাল চৌধুরী (১৯৩০)।
শুরুর দিকে ছাপার জন্য লেখা মনোয়ন কমিটিতে সক্রিয় সদস্য ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ।
কেদারনাথ মজুমদারের একটি প্রাথমিক উদ্ধৃতি:
‘তত্ত্ববোধিনীর প্রচার হইতেই প্রকৃত প্রস্তাবে বাঙ্গালা দেশে প্রকৃত প্রস্তাবে বাঙ্গালা সাহিত্যের আলোচনা আরম্ভ হয়। তত্ত্ববোধিনীর পূর্ব্বে যে সমস্ত পত্রপত্রিকায় সাহিত্যালোচনা হইত, প্রকৃতপক্ষে তাহাতে শিক্ষণীয় কিছুই থাকিত না... তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা বাঙ্গালা সাহিত্যের আসরে গুরুগম্ভীর আসন লইয়া উচ্চ দর্শন বিজ্ঞান ও নৈতিক আলোচনার সূত্রপাত করিলেন। অক্ষয়কুমারের সংগৃহীত প্রাচ্য ও প্রতীচ্য ভাবসমূহ তাঁহার তেজস্বিনী ও হূদয়গ্রাহিণী ভাষায় প্রচারিত হইতে লাগিল। অক্ষয়কুমারের সহিত বিদ্যাসাগর মিলিত হইলেন। ঈশ্বরচন্দ্রের মধুর লেখনী নিঃসৃত মহাভারতের অমৃত সমান কথা তত্ত্ববোধিনীর সঙ্গে সোনায় সোহাগার কার্য করিল।’
ব্রাহ্মসমাজ প্রায় ৯০ বছর ধরে তত্ত্ববোধিনীর প্রতিপালন করেছে। স্বীকার করতেই হবে, ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা মূলত দেবেন ঠাকুর ও ঠাকুর পরিবারের সহযোগিতায়ই বিকশিত হয়েছে এবং তার প্রকাশ ঘটেছে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতেই।






