যখন ট্রেনের গতি কিছুটা ধীর, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। ভাবল, সামনের স্টেশনে হয়তো ট্রেনটা থামবে। থামল না। ধীরে এগিয়ে চলল। গতি ফিরতে শুরু করল ট্রেনের।

ট্রেন ছুটছে দ্রুতগতিতে।

গাছপালা পেছনের দিকে, ট্রেনটা সামনের দিকে। দুই ধারে বিস্তীর্ণ মাঠ। সুন্দরের হাহাকার। গাছগুলো সত্যি পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে, যেভাবে ট্রেনটা সামনের দিকে— এই দুটো বিষয়ের প্রতি সে আস্থা রাখল। ভাবল, গাছ পেছনের দিকে যাচ্ছেই, গতির বিভ্রম নয় এটা। নিজের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, সরাচ্ছে না। চোখের ওপর যখন চুলগুলো পড়ছে, তার মধ্যেও কিছুটা ফাঁক, সে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে বাইরের দৃশ্য।

‘আমি এমন এক জীবনকেই কামনা করতাম, যেখানে খুব বেশি কাজকর্ম নেই, ঘুরে বেড়ানো যাবে; আর টুকিটাকি কিছু কাজকর্ম করে দেবে অন্য কেউ’— এ রকমই ভাবল একবার। ভাবল, সে এমন জীবনকেই কামনা করত— যেখানে যা হচ্ছে না, তাকেও হবে মনে হবে। গাছের পেছনে যাওয়াও তাই। সে যা চাইত, জীবন এখানে যেন তেমনই হতে শুরু করেছে। ভালো লাগল তার।

কিছুক্ষণ পর খসখস আওয়াজ। ছেলেটি দেখল, ওপরে ব্যাগ রাখার যে জায়গাটি, সেখান থেকে একটু আগে ট্রেনেই পরিচিত হওয়া লোকটি তার ব্যাগ নিচে নামাচ্ছে। নামানোর শব্দে পাশের সিটে বসা শিশুটি বিরক্ত হচ্ছে। শিশুটির মা ব্যাগ নামানো লোকটির দিকে তাকাচ্ছে। সবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে তার। সে বুঝতে পারল, নিজে বিরক্ত হচ্ছে না। শিশুটির বিরক্তি তার খারাপ লাগছে না, ভালোও লাগছে না। শিশুটির মায়ের দৃষ্টি কোনো অর্থ বহন করছে না। কিন্তু এ সবকিছুই ঘটছে তার চোখের সামনে। ভাবল, তবে এ রকম ঘটনার কাছে সে নিরর্থক। সে সফল, কেননা এটাও তার চাওয়া ছিল— এ রকম মুহূর্তে তার এমনই হোক। ‘সব চাওয়া যদি এভাবে পূরণ হয়ে যেতে থাকে, তবে কেমন করে কী হবে!’ ভাবল সে। এবার শান্ত করল নিজেকে— ‘চাওয়া তো পূরণের জন্যই।’

পরিচিত হওয়া লোকটি ব্যাগ নামাল, এরপর সিটে বসল।

তোমার নাম কী? 

[ছেলেটির বুঝতে সময় লাগল, তাকেই জিজ্ঞেস করছে]

নাম তো একটু আগেই বলেছিলাম— পরিচিত হওয়ার সময়। ‘ভুলে গেছি’ এইটুকু বলে লোকটি হাসল। ফ্যাকাসে হাসি।

অন্ত।

পুরো নাম কী?

পুরো নাম বললে পুরোটাই ভুলে যাবেন। এইটুকু ছোট, মনে রাখতে সহজ হবে।

লোকটি বিরক্ত হলো। 

চুপচাপ দুজনেই। কিছু সময় পার হলো। নীরবতা ভাঙল লোকটি।

কোথায় যাচ্ছ?

বলেছি একটু আগে।

ভুলে গেছি।

[ছেলেটি মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাতে চাইল, সে কোন দিকে যাচ্ছে]

শব্দ করে বলো। বুঝতে পারছি না।

শব্দ করে বললে ভুলে যাবেন। তাই ইশারা করলাম, যেন দৃশ্যটা আপনি মনে রাখতে পারেন।

তবু বলো।

সামনে।

এবার লোকটি হাসল না, বিরক্ত হলো কিনা বোঝা গেল না। কোনো ভাবান্তর নেই। ছেলেটি ভাবল, এমনটি চেয়েছিল সে; এ রকম মুহূর্তে আসলে তার কথার ভেতর দিয়ে কেউ ভাবলেশহীন হয়ে পড়ুক। যখন ছেলেটি বুঝতে পারছে, ট্রেনের এই বগিতে একেকটি ঘটনা ঘটার পর যে ফলাফল আসছে, সে রকমই চেয়েছিল; তখন তার মনে হলো, কামনার সেই জীবনের ভেতর দিয়েই সে যাচ্ছে।

তুমি সামনে যাচ্ছ, কিন্তু কীভাবে? লোকটার এ রকম প্রশ্ন ছেলেটি শুনল এবং চুপ থাকল। লোকটি আবার বলল— মানুষ কিন্তু সামনে যেতে পারে না, পেছনে যায়।

আমি সামনেই যাচ্ছি, ছেলেটি বলল।

তুমি মানুষ, কীভাবে সামনে যাচ্ছ! এটা সম্ভব না।

মানুষ তো ভুলও করে, করে না?

লোকটি বলল, ভুল করে, তাই বলে সামনে যাবে? ভুল এত বড় রকমের অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে না।

পারে।

কীভাবে পারে?

এই যে আমি যাচ্ছি।

মানুষ সামনে যেতে পারে না, তবুও তুমি কীভাবে যাচ্ছ?

ট্রেনে করে যাচ্ছি।

লোকটি আবার বিরক্ত হলো। ছেলেটি বুঝতে পারল তা। সে ভাবল, এরই মধ্যে দুবার বিরক্ত হয়েছে লোকটি; কিন্তু সে নিজে একবারও হয়নি, আবার ভালোও লাগেনি। এমনটি সে চেয়েছিল— এ রকম পরিস্থিতি আসলে এমন হোক।

ছেলেটি বলল, মানুষ সামনে যেতে পারে না, পারে। লোকটি বলল পারে না, পারে না। এরপর আরো বেশি ভাবলেশহীন মনে হলো লোকটিকে। ছেলেটির মনে হলো, লোকটিকে শান্ত দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে ভেতরে প্রবলভাবে অস্থির, দিকহারা, উদভ্রান্ত মানুষ।

লোকটি বলল, মানুষ যখন সামনে যায়, তখন তা পেছনের দিকেই। কারণ তার গন্তব্য স্মৃতি, নির্দেশনা বা প্রয়োজনের অংশ, যেখানে পেছন জড়িত। যে সামনে যায়, তার মানে সে কোনো না কোনোভাবে পেছনের দিকেই যায়।

ছেলেটি বলল, কেউ যখন সামনের দিকে যায়, তখন সেখানে ভালো লাগা, মন্দ লাগা কিংবা যা কিছুই থাকুক, তা দৃশ্যমান না; বরং রূপকল্প থাকে, যে রূপকল্প তার পেছনের চিন্তা থেকে কেবল জন্ম নিতে পারে কিন্তু বেড়ে ওঠে ভবিষ্যতে। আর এর বাইরে থাকে ভয়। এই ভয় কিংবা পেছনের বিষয়গুলোকে অতিক্রম করে সামনে যেতে পারলে সেটা সামনে যাওয়া। আর সামনে তারাই যেতে পারে, যারা সবকিছুকেই ফেলে দিতে পারে।

লোকটি বলল, তুমি কি ফেলে দেয়া বলতে এড়ানো বোঝাতে চাইছ? ছেলেটি চুপ, কোনো ভাবান্তর নেই। লোকটি বিরক্ত হলো। কিছুক্ষণ পর আবার বলল, তুমি কি সবকিছুকে ফেলে দিয়েছ?

ছেলেটি বলল, না।

তবে সামনে যাচ্ছ কী করে?

ভাগ্য।

ভাগ্য!

হ্যাঁ, কারণ সামনে যেতে হলে যা কিছু ফেলে দিতে হয়, তা আমার ছিলই না। সুপ্রসন্ন ভাগ্য আমার।

চিপস খাবে?

না।

তবে সামনে যেতে পারবে না।

কেন?

সামনে গেলে সবকিছু ফেলে দিয়ে যেতে হয় বললে কিন্তু খাবার জিনিস নয়। এই চিপস না খেলে অন্য কোনো খাবার খাও।

খাব আরো পরে। এখন ক্ষুধা নেই।

যারা পেছনের দিকে যায়, তারা পরে খাওয়ার চিন্তা করে। তুমি তো সামনের দিকে যেতে চাও।

যেতে চাই এ রকম না, যাচ্ছি।

তবে খাও?

যারা যেতে চায়, তারা খায়।

লোকটি আবার বিরক্ত হলো। ছেলেটির মনে হলো, এমনটি সে চেয়েছিল। তার ভালো লাগল না, খারাপ লাগল না।

লোকটি এবার বলে উঠল— সামনে যাওয়া মানুষের কি দুঃখ থাকে?

দুঃখ থাকার বিষয়টির সঙ্গে সামনে-পেছনের সম্পর্ক নেই।

তবে?

সুখ হলো কেবল একটা দুঃখের পূর্বাভাস, সময় অতিক্রান্ত হলে সুখও দুঃখ হয়ে যায়। সামনে যাওয়া আর পেছনে যাওয়া দুই রকম মানুষের সঙ্গেই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার বিষয় আছে।

তবে এটা বলো, সামনে যাওয়া মানুষকে কি তার প্রিয়জন ছেড়ে যেতে পারে?

পারে।

তবে সামনে গিয়ে লাভ কী?

প্রিয়জন ছেড়ে গেলে তার আবার প্রিয়জন আসে, অন্য কেউ।

ছেড়ে যাওয়া প্রিয়জন কি ফিরে আসে?

নিশ্চিত না।

‘তবে আমি যাব না’— এইটুকু বলার পরেই লোকটির অস্থিরতা বাড়ল।

কেন?

যে প্রিয়জন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, ও তো আসবে না, তবে কেন যাব!

এবার তার মনে হলো, লোকটি শুধু এখনই অস্থির এমন নয়, সে নিজেকে কোথাও স্থির করতে পারেনি। না সামনে, না পেছনে; কিন্তু স্থির হতে চেয়েছে।

ছেলেটির এবার এও মনে হলো— সে এ রকম চায়নি, কেউ প্রিয়জনের বিরহে বিগড়ে যাক তার কথায়। ছেলেটি বিরক্ত হলো নিজের প্রতি। উসখুস করা ছোট্ট শিশুটা তখন লোকটির শার্টের একটা অংশ চেপে ধরে আছে। শিশুটির মা লোকটিকে বলছে— ‘এর বাবার চেহারার সাথে আপনার চেহারার অনেক মিল আছে।’ লোকটি বলছে, ছেলের বাবা কী করে? শিশুটির মা বলছে, মারা গেছে।

ছেলেটি বাইরে তাকাল। দেখল, জানালার বাইরে গাছ পেছনের দিকে ছুটছেই আর ট্রেনটা সামনে। তার আবারো মনে হলো, গতির বিভ্রম নয় এটা। গাছ পেছনের দিকে ছুটছেই। আবারো খসখস আওয়াজ, ছেলেটি দৃষ্টি ফেরাল। শিশুটি তখন ঘুমাচ্ছে আর ঘুমের ঘোরে সিটের এক পাশে রাখা ব্যাগটির সাথে তার মাঝে মাঝে মৃদু ধাক্কা লাগছে। লোকটি শিশুটির মায়ের কাঁধ ঘেঁষে সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে, নির্বিকার। চোখ বন্ধ।

ছেলেটি বুঝতে পারছে তার ভালো লাগছে না। কেউ বিরহে বিগড়ে যাক, তার কথায় এটা যেমন সে চায়নি, তেমনি কেউ গেলেও তার এমন হোক এটাও না। আকস্মিকভাবে সে জোরে শব্দ করে লোকটিকে ডেকে উঠল।

লোকটির কোনো বিকার নেই। একটুও নড়ল না সে। শুধু মৃদুভাবে চোখটা খুলল, তারপর ছেলেটির দিকে তাকাল। শান্ত চোখ। ছেলেটির মনে হলো, লোকটির সেই অস্থিরতা এখন নেই।

ছেলেটি বলল— আপনি কোথায় যাচ্ছেন, সামনে না পেছনে?

লোকটি বলল, স্বপ্নে।