সংস্কৃত গল্পসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি শাখা। নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি বিষয় গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে এ সাহিত্যের সৃষ্টি। শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষই এ থেকে শিক্ষালাভ করতে পারে।
সংস্কৃত গল্পসাহিত্যে মানুষের পাশাপাশি মনুষ্যেতর প্রাণী, এমনকি জড়বস্তুও চরিত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। সহজ-সরল ভাষায় এমন আশ্চর্য ভঙ্গিতে গল্পগুলো রচিত যে, অতি সহজেই সেগুলো পাঠকচিত্তকে আকর্ষণ করে।
সংস্কৃত গল্পসাহিত্যের অমর সৃষ্টি পঞ্চতন্ত্র। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক কিংবা তার কিছু পরে বিষ্ণুশর্মা এটি রচনা করেন। একে অবলম্বন করে খ্রিস্টীয় দশম শতকে বাঙালি কবি নারায়ণ শর্মা রচনা করেন বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ হিতোপদেশ। এছাড়া আরো কয়েকখানা উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হলো: কালিদাসের দ্বাত্রিংশত্পুত্তলিকা (বা সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা কিংবা বিক্রমচরিত), গুণাঢ্যের বৃহত্কথা, বুদ্ধস্বামীর বৃহত্কথাশ্লোকসংগ্রহ, ক্ষেমেন্দ্রর বৃহত্কথামঞ্জরী, শিবদাসের বেতালপঞ্চবিংশতি, দণ্ডীর দশকুমারচরিত ও সোমদেব ভট্টের কথাসরিত্সাগর।
নারায়ণ তাঁর হিতোপদেশ রচনায় মুখ্যত অনুসরণ করেছেন বিষ্ণুশর্মার পঞ্চতন্ত্রকে। এছাড়া তখনকার প্রচলিত অন্যান্য গ্রন্থ থেকেও তিনি উপাদান নিয়েছেন। গ্রন্থের শুরুতে তিনি স্বয়ং এ কথা স্বীকার করেছেন:
মিত্রলাভঃ সুহূদ্ভেদো বিগ্রহঃ সন্ধিরেব চ।
পঞ্চতন্ত্রাত্তথান্যস্মাদ্ গ্রন্থাদাকৃষ্য লিখ্যতে
পঞ্চতন্ত্র এবং অন্যান্য গ্রন্থ থেকে উপাদান নিয়ে আমি মিত্রলাভ, সুহূদ্ভেদ, বিগ্রহ ও সন্ধি— এই চার ভাগে বিভক্ত আমার গ্রন্থ হিতোপদেশ রচনা করছি।
গন্থের আরম্ভে কবি নিজেই তাঁর গ্রন্থের প্রশংসা করেছেন। এ গ্রন্থ কেন পাঠ করা উচিত, পাঠ করলে কী হবে— এসব সম্পর্কে তিনি বলেছেন: হিতোপদেশ পাঠ করলে বিশুদ্ধ বাক্য প্রয়োগে দক্ষতা বাড়বে, বক্তব্য উপস্থাপনে বৈচিত্র্য আসবে এবং নীতিশাস্ত্রে জ্ঞান জন্মিবে। বিদ্যা অর্জনের সময় পণ্ডিত ব্যক্তি নিজেকে অমর মনে করবে, অর্থাত্ অগাধ শাস্ত্র অধ্যয়নে অফুরন্ত সময় প্রয়োজন এরূপ মনে করে নিষ্ঠার সঙ্গে বিদ্যার্জন করবে, আর মৃত্যু তার পেছন থেকে চুল ধরে টানছে এরূপ মনে করে দ্রুত ধর্ম অর্জন করবে। বিদ্যা সকল সম্পদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও অমূল্য সম্পদ, যা চোরেও চুরি করতে পারে না। নদী যেমন তার আশ্রিত সামান্য তৃণকেও বৃহত্ সমুদ্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, তেমনি বিদ্যাও মানুষকে বড়র সঙ্গে, সৌভাগ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। বিদ্যা মানুষকে বিনয় দান করে। বিনয় থেকে যোগ্য ব্যক্তি হওয়া যায়। যোগ্য ব্যক্তি ধন অর্জন করতে পারে। ধন থাকলে ধর্ম হয়। আর ধনে সুখ আসে। বিদ্যা দুই রকম— শস্ত্রবিদ্যা ও শাস্ত্রবিদ্যা। দুই-ই প্রতিপত্তির কারণ। তবে শস্ত্রবিদ্যা বার্ধক্যে হাসির কারণ হয়। আর শাস্ত্রবিদ্যা সবসময়ই অর্জন করা যায়। তবে কাঁচা পাত্রে সহজেই দাগ পড়ে এবং তা স্থায়ী হয়। তাই বালক বয়সই জ্ঞানার্জনের উত্তম সময়। হিতোপদেশে তাই বালকদের উপযোগী করে গল্পের মাধ্যমে সমস্ত শাস্ত্র, বিশেষত নীতিশাস্ত্র শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
হিতোপদেশ রচনার প্রেক্ষাপট হিসেবে কবি বলেছেন: ভাগীরথী নদীর তীরে পাটলীপুত্র নামে এক নগর ছিল। সেখানে সকল রাজগুণে গুণান্বিত এক রাজা ছিলেন। তাঁর নাম সুদর্শন। তিনি একদিন দুটি শ্লোক শুনলেন:
অনেকসংশয়চ্ছেদি পরোক্ষার্থস্য দর্শকম্।
সর্বস্য লোচন্যং শাস্ত্রং যস্য নস্ত্যন্ধ এব সঃ
যৌবনং ধনসম্পত্তিঃ প্রভুত্বমবিবেকিতা।
একৈকমপ্যনর্থায় কিমু যত্র চতুষ্টয়ম্
শাস্ত্র বহুবিধ সংশয় দূর করে। অজানা বিষয়ের জ্ঞান জন্মায়। যার শাস্ত্রজ্ঞান নেই, সে প্রকৃতপক্ষে অন্ধই। যৌবন, ধন-সম্পত্তি, প্রভুত্ব ও বিবেকহীনতা— এগুলোর একটাই অনর্থ ঘটাতে সক্ষম। যেখানে চারটিই থাকে, সেখানে আর কথা কি?
এ শ্লোক দুটি শুনে রাজা মনে মনে ভাবলেন: আমার পুত্ররাও তো শাস্ত্রজ্ঞানহীন। মূর্খ। বিলাসী। এদের দিয়ে কী হবে?
কো ্থর্থঃ পুত্রেণ জাতেন যো ন বিদ্বান্ ন ধার্মিকঃ।
কাণেন চক্ষুষা কিংবা চক্ষুঃপীড়ৈব কেবলম্
অজাতমৃতমূর্খাণাং বরমাদ্যৌ ন চান্তিমঃ।
সকৃদ্দুঃখকরাবাদ্যাবন্তিমস্তু পদে পদে
যে বিদ্বানও নয় ধার্মিকও নয়, তেমন পুত্রে কী লাভ? কানা চোখে কী কাজ? তা তো কেবল চোখের পীড়া। যে পুত্র জন্মেনি, যে পুত্র জন্মে মারা গেছে এবং যে পুত্র মূর্খ— এই তিনের মধ্যে প্রথম দুটি তবু মন্দের ভালো, কিন্তু শেষেরটি কখনো নয়। কেননা প্রথম দুটি একবার মাত্র দুঃখ দেয়, কিন্তু শেষেরটি অনন্তকাল দুঃখ দেয়। পরিবর্তনশীল এ জগত্সংসারে মৃত কে-ই বা না জন্মে, কিন্তু তার জন্মই সার্থক, যার জন্মের দ্বারা তার বংশের উন্নতি হয়। গুণীজনদের গণনার সময় যার নামে দাগ না পড়ে, তার জন্মের দ্বারাও যদি মাতা পুত্রবতী হন, তাহলে আর বন্ধ্যা কাকে বলে?
বরমেকো গুণী পুত্রো ন চ মূর্খশতান্যপি।
একশ্চন্দ্রস্তমো হন্তি ন চ তারাগণো ্থপি চ
শত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একটিমাত্র গুণী পুত্রও ভালো। কারণ একটিমাত্র চন্দ্রই রাতের অন্ধকার দূর করতে পারে, যা শত শত তারাও পারে না।
যে ব্যক্তি কোনো এক পুণ্যতীর্থে গিয়ে দুষ্কর কোনো তপস্যা করে, তার পুত্রই বশীভূত হয়— সম্পদশালী, ধার্মিক ও পণ্ডিত হয়। মানুষের সুখী হওয়ার কারণ হচ্ছে ছয়টি— নিয়ত অর্থাগম, নীরোগ দেহ, প্রিয়া ভার্যা, মিষ্টভাষিণী স্ত্রী, বশীভূত পুত্র ও অর্থকরী বিদ্যা। নির্গুণ শতপুত্রের চেয়ে গুণবান একটি পুত্রও ভালো। কারণ তার দ্বারা পিতা জগতে খ্যাতিমান হন। তবে এমন পুত্রের জন্য পিতা-মাতারও কর্তব্য আছে। শিশু পিতা-মাতার দ্বারা বিদ্যার্জনে অভ্যস্ত হলেই সে গুণী হয়। কেবল মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হলেই পুত্র পণ্ডিত হয় না। পিতা-মাতা যদি সন্তানকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করেন, তাহলে সন্তানের কাছে তারা হন শত্রুতুল্য। সেই সন্তানরা পণ্ডিত সমাজে শোভা পায় না, যেমন পায় না হংসমধ্যে বক:
মাতা শত্রু পিতা বৈরী যেন বালো ন পাঠিতঃ।
ন শোভতে সভামধ্যে হংসমধ্যে বকো যথা
নিয়মিত বিদ্যাভ্যাস না করলে বিদ্যা বিষতুল্য হয়। অজীর্ণ রোগে ভোজন বিষতুল্য হয়। দরিদ্রের কাছে বিলাসিতা বিষময় হয়। আর বৃদ্ধের কাছে তরুণী ভার্যাও বিষতুল্য হয়। ভালো বংশে জন্ম হলেও যদি নিজের গুণ না থাকে, তাহলে তাকে কোনো কাজে লাগে না। যেমন ভালো ঝাড়ের বাঁশ দিয়ে ধনুক বানালেও যদি তাতে গুণ (ছিলা) না থাকে, তাহলে সে ধনু দিয়ে লাভ কী?
এরূপ চিন্তা করে রাজা এবার মনে মনে পুত্রদের উদ্দেশে বললেন: হায় পুত্ররা আমার! তোমরা শুধু আরাম-আয়েসেই দিন কাটালে। শাস্ত্রজ্ঞান অর্জন করলে না। তাই গরু যেমন কাদায় পড়ে কষ্ট পায়, তেমনি তোমরাও পণ্ডিতদের মধ্যে পড়ে আজীবন কষ্ট পাবে। আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন— এ চারটিই মানুষ ও পশুর সমানই। পার্থক্য শুধু ধর্মে। ধর্মহীন মানুষ পশুর সমান। চেষ্টা না থাকলে শুধু দৈবে কিছু হয় না। দৈববশে তিলে তৈল জন্মে, কিন্তু তাকে পেতে হলে চেষ্টা লাগে। তিলকে পেষণ করলে তবেই তৈল পাওয়া যায়। তাই তো শাস্ত্র বলছে:
উদ্যোগিনং পুরুষসিংহমুপৈতি লক্ষ্মী-
র্দৈবেন দেয়মিতি কাপুরুষা বদন্তি
যথা হ্যেকেন চক্রেণ ন রথস্য গতির্ভবেত্।
এবং পুরুষকারেণ বিনা দৈবং ন সিধ্যতি
যারা বীর ও কর্মঠ, কেবল তারাই সম্পদ অর্জন করতে পারে। আর যারা কাপুরুষ, তারা কেবল বলে দৈব দেবে, দৈব দেবে। কিন্তু এক চাকায় যেমন রথ চলে না, তেমনি পরিশ্রম ছাড়া দৈবেরও কিছু করার থাকে না।
কুম্ভকার যেমন নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে একদলা মাটি থেকে নানা রকম পাত্র লাভ করে, তেমনি পণ্ডিত ব্যক্তিও নিজের বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে পারেন:
যথা মৃিপণ্ডতঃ কর্তা কুরুতে যদ্যদিচ্ছতি।
এবমাত্মকৃতং কর্ম মানবং প্রতিপদ্যতে
উদ্যম ছাড়া কেবল ইচ্ছার দ্বারা এ জগতে কোনো কাজ সিদ্ধ হয় না, যেমন ক্ষুধার্ত সিংহের মুখে আপনি কোনো হরিণ এসে ঢোকে না:
উদ্যমেন হি সিধ্যন্তি কার্যাণি ন মনোরথৈঃ।
ন হি সুপ্তস্য সিংহস্য প্রবিশন্তি মুখে মৃগাঃ
মূর্খ উচ্চবংশজাত হলেও, দেখতে সুন্দর হলেও নির্গন্ধ পলাশ ফুলের মতো সে কারো সমাদর পায় না। মূর্খ ব্যক্তি সুন্দর পোশাকে ভূষিত হয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে ততক্ষণই শোভা পায়, যতক্ষণ সে কিছু না বলে;
রূপযৌবনসম্পন্না বিশালকুলসম্ভবাঃ।
বিদ্যাহীনা না শোভন্তে নির্গন্ধা ইব কিংশুকাঃ
মূর্খো ্থপি শোভতে তাবত্ সভায়াং বস্ত্রবেষ্টিতঃ।
তাবচ্চ শোভতে মূর্খো যাবত্ কিঞ্চিন্ন ভাষতে
এরূপ চিন্তা করে রাজা একদিন পণ্ডিতদের সভা ডাকলেন। তিনি তাঁদের উদ্দেশে সবিনয়ে বললেন: হে আচার্যগণ, আমার মনে বড় দুঃখ! কারণ আমার পুত্ররা শাস্ত্রজ্ঞানে অন্ধ। এজন্য এত বড় সাম্রাজ্যও আমার মনে কোনো শান্তি দিতে পারছে না। আপনাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছেন, যিনি দয়া করে আমার পুত্রদের অল্প সময়ের মধ্যে নীতিশাস্ত্রে পণ্ডিত করে তুলতে পারেন?
রাজার কথা শুনে সকলে অনেকক্ষণ নীরব রইলেন। তার পর বিষ্ণুশর্মা নামে এক পণ্ডিত বললেন: মহারাজ, আমি পারব। যেহেতু রাজপুত্রদের উচ্চকুলে জন্ম, সেহেতু আমি নিশ্চয়ই তাদের নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী করে তুলতে পারব। কারণ অযোগ্য পাত্রে ন্যস্ত হলে কোনো ক্রিয়াই ফলবতী হয় না। শত চেষ্টায়ও বককে শুকপাখির মতো কথা শেখানো যায় না। আপনার মতো বংশে কখনো নির্গুণ পুত্রের জন্ম হতে পারে না। কারণ পদ্মরাগ মণির খনিতে কখনো কাচের উত্পত্তি হয় না:
নাদ্রব্যে নিহিতা কাচিত্ ক্রিয়া ফলবতী ভবেত্।
ন ব্যাপারশতেনাপি শুকবত্ পাঠ্যতে বকঃ
অস্মিংস্তু নির্গুণং গোত্রে নাপত্যমুপজায়তে।
আকরে পদ্মরাগাণাং জন্ম কাচমণেঃ কৃতঃ।
অতএব, আমি কথা দিলাম— ছয় মাসের মধ্যে রাজপুত্রদের আমি সর্বশাস্ত্রে শিক্ষিত করে তুলব।
বিষ্ণুশর্মার কথা শুনে রাজা সুদর্শন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তিনি ওইদিনই সকলের সামনে রাজপুত্রদের বিষ্ণুশর্মার হাতে তুলে দিলেন। বিষ্ণুশর্মাও তাদের নিয়ে নিজ আশ্রমে চলে দেলেন। শুরু হলো তাঁর অসাধ্য সাধন। মূর্খ রাজপুত্রদের শাস্ত্রচর্চা।
হিতোপদেশের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু
হিতোপদেশ চারটি ভাগে বিভক্ত— মিত্রলাভ, সুহূদ্ভেদ, বিগ্রহ ও সন্ধি। প্রত্যেক ভাগে একটি করে মূল গল্প আছে। প্রত্যেকটি মূল গল্পকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে একাধিক ছোট গল্প। এই ছোট গল্পগুলো পরস্পর নির্ভরশীল। একটি আরেকটির সঙ্গে অন্বিত। মালার মতো। একটির পর একটি ফুল গেঁথে যেমন মালা তৈরি করা হয়, তেমনি একটির পর একটি ছোট গল্প দিয়ে একটি মূল গল্প রচনা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি মূল গল্প যেমন একটি মালা, তার ছোট গল্পগুলো তেমনি ফুল। মালা থেকে একটি ফুলও ঝরে পড়লে যেমন মালার অঙ্গহানি ঘটে, তেমনি একটি ছোট গল্পও খসে পড়লে মূল গল্পের অঙ্গহানি ঘটবে। চারটি ভাগে ৪টি মূল গল্প ছাড়া মিত্রলাভে আছে ৮টি ছোট গল্প, সুহূদ্ভেদে ৯টি, বিগ্রহে ৯টি ও সন্ধিতে
১২টি। সব মিলিয়ে গল্প হলো: ৪ + ৮ + ৯ + ৯ + ১২ = ৪২টি।
মিত্রলাভের মূল গল্পের নাম ‘কাক-কচ্ছপ-হরিণ-ইঁদুর’। কাকের নাম লঘুপতনক, কচ্ছপের নাম মন্থর, হরিণের নাম চিত্রাঙ্গ ও ইঁদুরের নাম হিরণ্যক। এরা চার বন্ধু। এদের মধ্যে কীভাবে বন্ধুত্ব হলো এবং এদের কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা কীভাবে তাকে উদ্ধার করল— সে কথাই এখানে আটটি গল্পের মাধ্যমে বলা হয়েছে।
সুহূদ্ভেদের মূল গল্পের নাম ‘সিংহ-বৃষ-শেয়াল’। সিংহের নাম পিঙ্গলক, বৃষের নাম সঞ্জীবক এবং দুটি শেয়ালের নাম দমনমক ও করটক। দুষ্টবুদ্ধি দমনক কৌশলে প্রথমে পিঙ্গলক ও সঞ্জীবকের মধ্যে সৌহার্দ্য (বন্ধুত্ব) সৃষ্টি করে, পরে উভয়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে পিঙ্গলককে দিয়ে সঞ্জীবককে হত্যা করায় এবং তার মাংস খায়। কূটনীতির এ ব্যাপারটি অতি চমত্কারভাবে নয়টি ছোট গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বিগ্রহের মূল গল্পের নাম ‘হংস ও ময়ূর’। হংসের নাম হিরণ্যগর্ভ ও ময়ূরের নাম চিত্রবর্ণ। এরা দুই দেশের রাজা। সুখেই ছিল। কিন্তু কাকের বিশ্বাসঘাতকতায় এদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে এবং যুদ্ধে হংস পরাজিত হয়। এ কাহিনী নয়টি গল্পের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।
সন্ধির মূল গল্পের নাম ‘গৃধ্র ও চক্রবাক’। এরা দুই রাজার দুই সান্ধিবিগ্রহিক (মধ্যস্থ)। একবার দুই রাজার মধ্যে মহাযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে উভয় পক্ষের সব সৈন্য নিহত হয়। তখন গৃধ্র ও চক্রবাক মুহূর্তেই দুই রাজার মধ্যে সন্ধি স্থাপন করে। কীভাবে করল, সে কাহিনীই ১২টি গল্পের মাধ্যমে বলা হয়েছে।
মিত্রলাভ
কাক ও কপোত
গোদাবরী নদীর তীরে ছিল এক বিশাল শিমুল গাছ। সেখানে নানা জাতের পাখিরা বাস করত। একদল কাকও ছিল। তাদের নেতা ছিল লঘুপতনক। খুব দ্রুত উড়তে পারত। তাই এ নাম।
একদিন ভোরবেলা লঘুপতনক দেখল— যমের মতো দেখতে এক ব্যাধ পাখি ধরার জাল নিয়ে এদিকেই আসছে। অজানা এক বিপদের আশঙ্কায় তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে সাহস সঞ্চয় করে মনে মনে বলল: মূর্খরাই বিপদ দেখলে ভয় পায়, পণ্ডিতেরা নন। তাঁরা সাহসে ভর করে বিপদ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
এরূপ চিন্তা করে লঘুপতনক ব্যাধের পেছনে পেছনে উড়তে লাগল। ব্যাধ কিছু দূর এগিয়ে এসে এক ঝোপের পাশে সাদা চাল বিছিয়ে জাল পেতে দিল। তার পর আড়ালে গিয়ে ওঁত্ পেতে থাকল। চাল খেতে পাখি এসে জালে পড়লেই ধরে ফেলবে। লঘুপতনক দূর থেকে সব দেখতে লাগল।
এমনি সময় আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল এক ঝাঁক পায়রা। মানে কপোত। কবুতর। তাদের দলপতি চিত্রগ্রীব। গ্রীবায় (ঘাড়ে) সুন্দর চিত্র আঁকা। তাই এ নাম। সে নিচের দিকে তাকিয়ে সাদা সাদা চাল দেখতে পেল। পায়রারা আনন্দে বলে উঠল: মহাভোজ! চলো!!
চিত্রগ্রীব হুঙ্কার দিয়ে বলল: দাঁড়াও! ব্যাপারটা আগে বুঝে নিই।
পায়রারা বলল: এতে আর বোঝার কী আছে?
চিত্রগ্রীব: আছে। এই নির্জনে হঠাত্ করে চাল এল কোত্থেকে? কোনো বিপদের পূর্বাভাস নয়তো? ভেবেচিন্তে কাজ করতে হয়। নতুবা — চুড়ির লোভে মরেছিল যেমন বোকা পথিক।
চালের লোভে তোমাদেরও মরতে হবে ঠিক
পায়রারা: সে কী রকম?
চিত্রগ্রীব: তবে শোনো...
সোনার চুড়ি ও লোভী পথিক
এক বনে ছিল এক বৃদ্ধ বাঘ। বয়সের কারণে শরীর দুর্বল। শিকার ধরার শক্তি নেই। তাই আহারও জোটে না। মরণাপন্ন অবস্থা। তাই একদিন সে ভাবল: না খেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে চেষ্টা করে দেখা যাক। চেষ্টায় কি না হয়?
এরূপ চিন্তা করতে করতে সে একটা উপায় বের করল। বহুদিন আগে সে একজন রমণীকে খেয়েছিল। তার হাতে ছিল একজোড়া সোনার চুড়ি। বাঘটি চুড়ি দুটি হাতে নিয়ে পথের পাশে এসে বসল। এমন সময় সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক দরিদ্র পথিক। দূর থেকে চকচকে চুড়ি দুটি দেখে তার লোভ হলো। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল: বৃদ্ধ বাঘটার কাছ থেকে চুড়ি দুটি উদ্ধার করতে পারলে তার দারিদ্র্য ঘুচবে। কিন্তু বৃদ্ধ হলেও বাঘ তো! তাই কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে।
দূর থেকে তাকে দেখে বাঘ মনে মনে ভাবল: ভাগ্যদেবতা বুঝি সুপ্রসন্ন! খাবার মিললে মিলতেও পারে। প্রকাশ্যে বিনয়ের সঙ্গে ক্ষীণ কণ্ঠে সে বলল: আমাকে ভয় পাচ্ছ? পাবেই তো! জীবনে তো কম প্রাণী হত্যা করিনি! তার ফল এখন ভোগ করছি! প্রাণী হত্যার অভিশাপে আমার স্ত্রী-পুত্র সবাই গেছে! আছি আমি একা! তাই বনদেবতার নির্দেশে এখন দান-ধ্যান করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি! তুমি যদি এ দুটি গ্রহণ করো, তাহলে কৃতার্থ হই।
পথিক বলল: তোমাকে বিশ্বাস কি?
বাঘ বলল: তা বটে। আমাদের মতো হিংস্র প্রাণীকে বিশ্বাস কি? কিন্তু দেখো আমার দাঁত, নখ সব নড়ছে। গায়েও শক্তি নেই। আগের মতো হলে এতক্ষণে তোমার ঘাড় মটকাতাম। কিন্তু সে দিন আর নেই। তুমি নিশ্চিন্তে এ দুটি নিতে পারো।
বাঘের কথায় পথিকের মন অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেল। সে বলল: তবে ছুড়ে দাও।
বাঘ বলল: সে কি বলছ! দান কি কখনো ছুড়ে দেয়া যায়? সে তো হয় তাচ্ছিল্যভরা দয়া।
পথিক: তবে আসছি।
বাঘ আবার বলল: না! না! দানধর্ম সবচেয়ে বড় ধর্ম। পবিত্রতার সঙ্গে তা করতে হয়। আমি কেবল স্নান করে এসেছি। তুমিও ওই নদীতে নেমে স্নান করে এসো।
পথিক যেই স্নান করতে গেল, অমনি কাদায় পড়ে আটকে গেল। তখন বাঘ ছুটে গিয়ে তাকে খেয়ে ফেলল।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
লেখক: অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাবি






