বয়েস আশি হয়ে গেলেও বড় মামাকে এতটা বয়েসী মানুষ মনে হয় না। তার বয়স এখনো যেন পঞ্চাশ-ষাট বছর। খাওয়া-দাওয়া আগের মতোই চলছে। গরম ভাতে এক চামচ খাঁটি গাওয়া ঘি মিশিয়ে ভাত খাওয়া, রাতের বেলা বিরইন ভাতের সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটা এখনো হরহামেশাই ঘটে। মামার ছেলেবেলাও নাকি গ্রামের আরো দশটা ছেলের মতো হইচই আর
দস্যিপনায় কেটেছে। গাছ থেকে লাফ দিয়ে খালের পানিতে পড়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতরে কাটিয়ে দেয়া, কাবাডি আর ফুটবলের লড়াই করতে গিয়ে কত আঘাত আর হোঁচট খাওয়া হয়েছে, সেইসবের কোনো হিসেবনিকেশ নেই মামার। আর ছিল মালজোড়া গান শোনার শখ। মালজোড়া গান হচ্ছে, গানে গানে শিল্পীদের লড়াই। গানে গানে একজন শিল্পী অন্য শিল্পীকে জটিল একটা প্রশ্ন করবে, তখন সেই শিল্পী গানে গানে উত্তর দিয়ে প্রশ্নকারী শিল্পীকে জব্দ করার চেষ্টা করবেন। দর্শকরা খুব উপভোগ করেন এইসব মালজোড়া গান। সাধারণত এসব গানের আসর হয় শীতে। কোথাও মালজোড়া গানের খবর পেলে দশ-পনেরো মাইল হেঁটে হলেও মামা সেই গান শুনতে যেতেন। মামার তরুণ বয়স মানে ষাট বছর আগে সেই উনিশ’শ পঞ্চান্ন-ষাট সালের কায়কারবার। তখন তো আর আজকের মতো এত রাস্তাঘাট ছিল না, গাড়িঘোড়া ছিল না। এজন্য পা-টাই ছিল সম্বল। মামা দল বেঁধে গান শুনতে যেতেন। কখনো সঙ্গী-সাথী না পেলে একাই ছুটতেন। নানা আবার এইসব গানবাজনা পছন্দ করতেন না। এজন্য মামাকে খুব চোখে চোখে রাখতেন। নানার চোখ ফাঁকি দিতে মামাও আঁটতেন নানা ফন্দি। তার বিছানায় লেপকে গোল করে বালিশের সাথে লাগিয়ে গোল লেপটা আরেকটি কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিতেন। রুমের আধো অন্ধকারে মনে হতো কেউ বিছানায় ঘুমিয়ে আছে।
মামা একবার শুনলেন তালতলা গ্রামে হবে মালজোড়া গান। খুব বড় শিল্পী আসবেন। সেই সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী শাহ আবদুল করিম, কামাল উদ্দিন, জালাল উদ্দিন খানের মতো বড় বড় শিল্পী গান গাইবেন। সাধারণত একসাথে এত বড় শিল্পীকে পাওয়া যায় না। শিল্পীদের নাম শুনেই মামার যেন মাথা খারাপ, তাও আবার মালজোড়া গান হবে। তালতলা গ্রামটা মামাদের বাড়ি থেকে প্রায় আট মাইল দূরে। মালজোড়া গানে যেতে সবসময় মামার পার্টনার তার চাচাতো ভাই সেবু মিয়া। সেইবার একটা পচা শামুকে তার পা কেটে গেছে। তিনি এত দূর হেঁটে যেতে পারবেন না। শিল্পীদের নাম শুনে শুধু আফসোস করলেন। কি আর করা, কাউকে না পেয়ে বড় মামা সেইবার সিদ্ধান্ত নেন একাই যাবেন। দুপুরে খেয়েই বেরিয়ে পড়েন। একটি পুঁটলিতে মোজা, মাফলার আর চাদর নেন। খুব শীত পড়েছে। বাড়িতে এগুলো পরলে নানার চোখে ধরা পড়ে যাবেন।
বাড়ি ছেড়ে কিছু দূর গিয়েই একটি গোপাট (গোচারণ ভূমি)। গোপাটের মধ্যিখানে একটি বটের গাছ। মামা গাছতলায় বসে মোজা পরেন, মাফলারটা গলায় প্যাঁচান, চাদরটা ঘাড় থেকে কাঁধ দিয়ে দুই পাশে ঝুলিয়ে রাখেন। তেল জবজবে চুল, দুই কাঁধ বেয়ে কোমর পর্যন্ত ঝোলানো চাদর, গায়ে পাঞ্জাবি, লুঙ্গির সাথে প্লাস্টিকের নাগরা সু আর লাল টকটকে মোজা পরে মামা তালতলার পথে একা একা হাঁটছিলেন আর ভাবছিলেন ইশ, চুলটা যদি একটু বাবরি হতো, তাইলে তো তাকেও বাউল শিল্পী মনে হতো। মামার বড় শখ ছিল বাউল শিল্পীদের মতো কাঁধ পর্যন্ত বাবরি চুল রাখবেন। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি নানার জন্য। চুল একটু লম্বা হলেই কেটে ফেলার জন্য নানা জ্বালাতন শুরু করেন।
আট-দশ মাইল পথচলা মামার জন্য কিছুই না। ভালো একটা গানের আয়োজন থাকলে পায়ের গতিই থাকে আলাদা। সন্ধ্যের বেশকিছু সময় পর পরই মামা পৌঁছে যান তালতলায়। গ্রামের একপাশের গোপাটে গানের আয়োজন। তখন তো আর আজকের মতো ডেকোরেটার্স ছিল না। গ্রামের লোকজনই বাঁশটাশ কেটে নৌকার পাল দিয়ে প্যান্ডেল বানাত। তার পর হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা।
গান শুনতে প্রচুর লোকজন এসেছে। দুয়েকটা চায়ের দোকান, পান-সিগ্রেটের দোকানও বসেছে। রাত ৮টা-৯টার দিকে গান শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু রাত ১১টা বেজে গেলেও অনুষ্ঠান শুরু হয় না। শেষমেশ শোনা গেল মালজোড়া গানে এক পক্ষের শিল্পীকে দাওয়াত দিতে ত্রুটি হয়েছে, এজন্য তিনি আসছেন না। গানের আসর বাতিল করা হয়েছে। কি আর করা, সেই রাত ১১টা-১২টার দিকে মামা ফিরে চললেন বাড়ির পথে।
তালতলা থেকে মামাদের গ্রাম পর্যন্ত দুই গ্রামের মধ্যিখানটা পুরো হাওড়। মাঝে মাঝে সার বাঁধা হিজল গাছ। করচ গাছের দুয়েকটা বড় ঝোপ ছাড়া আর কিছুই নেই। হাওড়টার নাম মাইজআইল হাওড়। বর্ষায় হাওড়জুড়ে পানি। মনে হয় বিশাল সাগর। হাওড়ের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে দূরের বাড়িঘরকে ধোঁয়াটে কালচে সবুজের মতো মনে হয়। মাইজআইল হাওড়টায় সারাক্ষণ ঢেউ লেগে থাকে। মাঝে মাঝে সাগরের মতো বিশাল বিশাল ঢেউ ওঠে। এইসব ঢেউকে লোকে আফাল বলে। আফালের সময় দক্ষ মাঝিরাও মাইজআইল হাওড় নৌকা নিয়ে পাড়ি দিতে সাহস পায় না। শীত এলে পুরো হাওড় শুকিয়ে বিলের মধ্যিখানে কিছু পানি জমে রয়। আর হাওড়জুড়ে লোকজন বোরো চাষ করে। এই হাওড়ে বছরে একটাই ফসল হয়, সেটা বোরো ধান।
মামা তালতলা গ্রাম ছেড়ে মাইল দুয়েক এগিয়েছেন। কুয়াশায় পেছনে ফেলে আসা তালতলা গ্রামটা আর দেখা যাচ্ছে না। মাইজআইল হাওড়ের আরেক প্রান্তে নিজেদের গ্রামটা তো দেখাই যাচ্ছে না। কুচিমুচি খেয়ে মামা হাঁটছিলেন জমির আল ধরে। চারপাশের জমিতে ধান বোনা হয়েছে। কিছুদিন আগেও কৃষকদের দিন কেটেছে প্রচণ্ড ব্যস্ততায়। বোরো চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা, কোথাও জমিতে হাল চাষ দেয়া, হালিতলা প্রস্তুত করা, ধান রোপণ করা। কোথাও কোথাও জমিতে সেচ দেয়া। এখন ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে। কাজ তেমন একটা নেই। ধান কাটার আগ পর্যন্ত মাঝে মাঝে জমিতে পানি দেয়া আর ঘাস-আগাছা বাছাই করা। জমির আলের ঘাস-আগাছায় কুয়াশা জমেছে। মামার পায়ে প্লাস্টিকের নাগরা সু। মনে হচ্ছে জুতার প্লাস্টিক গলিয়ে কুয়াশা পায়ের ভেতরের হাড়ে ঢুকে পড়েছে। শীতের রাত তো, সবাই কাঁথা মুড়ে ঘুমাচ্ছে। চারপাশে কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকজন তো নেই-ই দূরে কোথায় একটি মিম পাখি ডাকছে। এই পাখিটা বড় অলক্ষুনে। কারো বাড়ির পাশে ডাক পাড়লে বুঝতে হবে সেই বাড়িতে বিপদ আছে। সেই বাড়ির কেউ একজন মারা পড়বে। চোখ যত দূরে যাচ্ছে কোথাও কেউ নেই। দূরের আর পেছনে ফেলে আসা গ্রামগুলোকে চেনাই যাচ্ছে না। এখন চারপাশে শুধুই কুয়াশা, আশপাশে কোনো গ্রাম আছে বলে মনে হচ্ছে না। হাজার সাহস থাকলেও একা একা তো, কিছুটা ভয়ও করছিল। ভয় কাটাতে মামা উচ্চ স্বরে গান শুরু করেন। কিন্তু কণ্ঠটা খুব বেশি দূরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। এইভাবে কিছু দূর হাঁটার পর একটি মাঠ। মাঠের পাশে বিল। মাঠটা গরু চরানোর সরকারি জমি। তার মানে মামা এখন মাইজআইল হাওড়ের ঠিক মধ্যিখানে। হঠাত্ মামার মনে হলো সামনের কুয়াশার অন্ধকারে লোকজনের সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মামা ভয় পান, বাবা ডাকাতটাকাত হলে বিপদ। অবশ্য মামার কাছে পান-সিগ্রেটের জন্য আনা দুটো আধুলি ছাড়া আর কিছু নেই। তবুও ভয় লাগে গায়ের চাদরটা যদি নিয়ে যায়। এটি একটি শাল। দাম কম না। আর এই হাওড়ে চাদর না থাকলে তো বাড়িতে যাওয়ার আগেই ঠাণ্ডায় মরতে হবে।
মামা সামনে যতই এগোচ্ছিলেন লোকজনের সাড়াশব্দটাও বাড়ছিল। মনে হচ্ছে অনেক লোকজন জমেছে। লোকজনের কথাবার্তা বোঝা না গেলেও বোঝা যাচ্ছিল মানুষজনের স্বাভাবিক জটলা। মামার ভয় কেটে যায়। গান বন্ধ করে পা চালিয়ে হাঁটেন। দূরে লোকজনের জটলা চোখে পড়ে। যতই সামনে এগোচ্ছিলেন, আস্তে আস্তে লোকজনের চেহারা আরো ফুটে উঠছিল। অনেক লোক। মামা একটু দ্রুত পা চালিয়ে লোকগুলোর কাছে চলে আসেন। চারপাশে একনজর চোখ বুলিয়েই বুঝে ফেলেন এখানেও মালজোড়া গানের আয়োজন। তালতলা গ্রামের মতোই নৌকার পাল দিয়ে প্যান্ডেল বানানো হয়েছে। বেহালা, দোতারা আর ঢোল হাতে শিল্পীরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে। একজন শিল্পী কাঁধের সাথে বেহালার গোড়া ঠেকিয়ে করুণ সুরে কি একটা সুর তুলছিলেন। গান তাহলে শুরু হয়ে যাবে। যাক তালতলায় গান না শোনার শখটা এখানে মিটে যাবে। লোকজনও কম না। লোকগুলোকে বড়ই সুশৃঙ্খল মনে হচ্ছে। তবে সবাই শীতের জন্য মাথা-কানটান ঢেকে বসেছে। বসার জন্য মাটিতে ঘন করে খড় বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। লোকজন খুব আরামসে খড়ের ওপর বসেছে। প্যান্ডেল থেকে কিছু দূরে কিছু লোক রুট পিঠা স্যাঁকছে। প্রচণ্ড শীত, তার পর মালজোড়া গান আবার রুট পিঠার খুশবো— মামাকে ক্যামন উন্মাতাল করে তোলে। রুট নামের পিঠা মামার ভীষণ প্রিয় খাবার। ঢেঁকিছাঁটা চালের গুঁড়োর সাথে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ মিশিয়ে সাধারণ রুটির মতো গোল করে রুট পিঠা বানানো হয়। সাধারণ রুটি আর রুট পিঠার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে রুট পিঠা প্রায় ১ ইঞ্চি পুরু থাকে, এতে চালের গুঁড়ির সাথে পেঁয়াজ-আদা এগুলোও দেয়া হয়। রুটিগুলো বানানোর পর খড়ের আগুনে ফেলে বিশেষ কায়দায় রুট পিঠা সেকতে হয়। স্যাঁকতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রুট পিঠার কিছু অংশ পুড়ে যায়। রুট পিঠার চালের গুঁড়ি, পেঁয়াজ-রসুন-আদার খুশবো, পুড়ে যাওয়া রুটি আর খড়ের ধোঁয়ার গন্ধ— সব মিলিয়ে একটা অসাধারণ খুশবো। মামা লোকজনের ভিড়ের কাছে যেতেই পেছনে দাঁড়ানো একজন ভলান্টিয়ার মামাকে খুব যত্ন করে খড়ের ওপর বসিয়ে দেয়।
লোকজনের ভিড়ের মধ্যে বসায় শীত খানিকটা কমই লাগছিল। মঞ্চে দাঁড়ানো পাঁচ-ছ’জন বাউলশিল্পীর মধ্যে বয়সে প্রবীণ একজন শিল্পী— কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো বাবরি চুল, মাথায় ছোট্ট একটি টাক, তিনিই গান শুরু করেন। গানে গানে তিনি সবাইকে সালাম জানিয়ে আল্লাহ-রসুলের বন্দনা করছিলেন। তার পর ধীরে ধীরে একজনের পর আরেকজন শিল্পী। গানগুলো খুব পরিচিত নয়, আবার শিল্পীদেরও চেনাজানা মনে হচ্ছে না। তবে গানের সুরটা চমত্কার, কথাগুলোও খুব সুন্দর আর মূল্যবান। একজন শিল্পী আরেকজন শিল্পীকে প্রশ্ন করছে। প্রশ্নগুলোও ভালো। মাইক ছাড়াই গান হচ্ছে, কিন্তু শুনতে অসুবিধা হচ্ছে না। খোলা মাঠে শিল্পীরা দরাজ গলায় গাইছিলেন। ৩-৪ ঘণ্টা গান চলল। ওদিকে যারা রুট-পিঠা বানাচ্ছিল, তাদের কাজও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তখন একটা লোক স্টেজে উঠে সবাইকে সার বেঁধে বসে রুট পিঠা খেতে বলে। এও বলল, রাত অনেক হয়েছে, এত শীতের মধ্যে এখন আর বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই। রুট-পিঠা খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ুন। আরামে ঘুমোবার সব ব্যবস্থা আছে।
সবাই সুন্দরভাবে সার বেঁধে বসল। মামা তার কাছাকাছি থাকা লোকজনকে দেখেন। কাউকেই চেনাজানা মনে হচ্ছে না। কি আশ্চর্য এত লোকের মধ্যে একটি লোকও চেনাজানা নেই। লোকগুলোর মধ্যে কেউ কথাটথাও তেমন বলছে না। হঠাত্ একজন-দুজন নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছিল, তাও ফিসফিস করে। সবাইকে একটি করে পিঠা দেয়া হয়েছে। পিঠাগুলো ছুরি দিয়ে কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয়েছে। বড় পিঠা কামড়ে খেতে অসুবিধা। খোলা হাওড়ে গান শুনতে শুনতে মামার প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে, এর মধ্যে আবার রুট পিঠার ক্ষিধে জাগানিয়া সুবাস। চুলো থেকে সদ্য নামানো পিঠার টুকরোগুলো হাতে নিতে খুব ওম লাগছিল। মামা ঝটপট পিঠাগুলো খেয়ে ফেলেন। একটা লোক জগ আর গ্লাস দিয়ে সবাইকে পানি দিচ্ছিল। মামা বড় গ্লাস দিয়ে দুই গ্লাস পানি খান।
মজলিশের দুই পাশে দুটো করে চারটে হুক্কা রাখা। হুক্কার লম্বা নলে টান দিচ্ছিল লোকজন। একপাশে কমবয়েসী আর অন্যপাশে বয়স্করা হুক্কা টানছিলেন। তামাকের এক অজানা সুবাসে চারপাশে ম ম গন্ধ। মামার মাথা যেন ঘুরে যাচ্ছে। গানের আসরে এভাবে তামাক পানের ব্যবস্থা মামা কোথাও দেখেননি। মামা জওয়ানদের পাশে যান। একজন তামুক টানছিল। কয়েকটা টান দিয়ে নলটা সে মামার হাতে ধরিয়ে দেয়। মামা নলের মুখটা হাত দিয়ে মুছেই টান লাগান। মুখ ভরে যায় ধোঁয়ায়। নল থেকে মুখ সরিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়তেই চমত্কার এক সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। মামা অনেক দিন থেকে তামাক টানছেন, কিন্তু এ ধরনের সুবাস পাননি জীবনে।
তামাক টেনে টেনেই সবাই শুয়ে পড়ছিল খড়ের ওপর। ঘন করে খড় বিছানো। ভারী কাঁথার কাজ দিচ্ছিল। সবাইকে একটি করে বালিশও দেয়া হয়েছে। মামার পাশে আরেকজন দাঁড়িয়ে হুক্কা টানার জন্য। মামা হুক্কায় জোরে আরো কয়েকটি টান দিয়ে সেই লোকটার হাতে নল ধরিয়ে দেন। তার পর চুপচাপ এসে শুয়ে পড়েন খড়ের বিছানায়। গায়ের ওপর পরনের শালটা একটু টেনে বালিশে মাথা রাখতেই একটি লোক এসে তার গায়ের ওপর একটি নকশিকাঁথা জড়িয়ে দেয়। মামা বেশ অবাক হন জীবনে গান শুনতে অনেক জায়গায় গিয়েছেন। কিন্তু এমন আয়োজন কোথাও দেখেননি। বেশ উম লাগছিল। চোখ জুড়ে আসছে ঘুম। আর এইভাবে কখন যে মামা ঘুম সাগরে ডুব দেন...।
মামার ঘুম ভাঙলে লোকজনের ফিসফিস কথা আর খড়ের খস খস শব্দে। কিন্তু নিজের শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছেন না। হাত-পা নাড়াতে পারছেন না। অনেক কষ্টে চোখের পাতা মাত্র মেলেছেন। প্রথমে কিছু দেখতে পাননি। অনেকক্ষণ তাকানোর পর আস্তে আস্তে তার চারপাশের দৃশ্য কিছুটা দেখতে পান। তার চারপাশে ছ-সাতজন লোক দাঁড়িয়ে। আর মামা শুয়ে আছেন খড়ের পাঁজায়। বুঝতে পারছেন তার সারা শরীর খড় দিয়ে ঢাকা। ব্যাপার কী। তিনি খোলা মাঠে কেন শুয়ে। মাথার নিচের বালিশটা এত শক্ত কেন। ভালো করে তাকাতেই দেখেন, মাথার নিচে বালিশ নয় বিশাল আকারের কচ্ছপের একটি খোলস রাখা। মামা কথা বলতে চান, উঠে বসতে চান। কিন্তু শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছেন না। নড়তে পারছেন না। দু-একজন মামাকে টেনে তোলে। মামা শুধু মিটমিট করে তাকাচ্ছিলেন। সবাই চিত্কার শুরু করে, এই বেঁচে আছে। আগুন জ্বালাও আগুন জ্বালাও।
তার পর কে একজন খড়ের গায়ে আগুন লাগায়। দুজন মামাকে উঁচু করে তুলে আগুনের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল। মামা ভয় পেয়ে যান, ওরা কি তাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলবে। তাদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শরীরটা মোটেই নাড়াতে পারছিলেন না। মামাকে আগুনের পাশে নিয়ে দুজন কোলে তুলে ধরে আগুনের শিখার ওপর তার পা ঝুলিয়ে দেয়। এভাবে অনেকক্ষণ পর মামা বুঝতে পারেন শরীরে উত্তাপ পাচ্ছেন। তার পর সেখানেই পাটি বিছিয়ে তারা মামাকে শোয়ায়। ঘণ্টা ২ ঘণ্টা সেই লোকগুলো তার শরীরে সরিষার তেল ঘষে। তেল মালিশ আর আগুনে স্যাঁকার পর মামার শরীরে কিছুটা শক্তি ফিরে আসে। গত রাতের কথাগুলো আস্তে আস্তে মামার মনে পড়ছিল। মাইজআইল হাওড় পাড়ি দেয়ার সময় গানের আসরে বসা। রুট পিঠা খাওয়া, বালিশ পেতে কাঁথা গায়ে শোয়া— সব মনে পড়তে থাকে। মামা লোকজনকে জিগ্যেস করেন, তার কী হয়েছিল। লোকজনের কাছ থেকে শোনেন, তিনি যেখানে শুয়ে আছেন, সেটি একটি হালঘরা। হালঘরা হচ্ছে ধান কাটার মৌসুমে হাওড়ে অস্থায়ীভাবে বানানো ঘরবাড়ি। যাদের বেশি জমিজমা আছে, তারা এইভাবে হাওড়ে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে কামলাদের থাকার ব্যবস্থা করে। কামলারা ধান কেটে এনে অস্থায়ী ঘরের সামনে স্তূপ করে রাখে। তার পর ধান মাড়াই, ধান ঝাড়া, ধান শুকানো সব কাজ সেরে ধান বস্তায় ভরে গরুর গাড়ি দিয়ে গৃহস্থের বাড়িতে নিয়ে যায়। হালঘরার মূল সুবিধে হচ্ছে— ক্ষেত থেকে ধান কেটে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় ও শ্রমটা বাঁচানো। এই হালঘরার মালিক সমুজ মিয়া নামের এক গৃহস্থ। তার প্রচুর জমিজমা। ধান চাষের শুরু থেকেই তার হালঘরায় সবসময় পাঁচ-সাতজন লোক থাকে। ঘাস বাছাই, পানি সেচ দেয়া এইসব টুকটাক কাজ করে। আর ধান কাটার মৌসুমে তো পঞ্চাশ-ষাটজন লোক থাকবেই। ভোরে সমুজ মোল্লার প্রধান কামলা তেরার আলি হাওড়ের একটি গর্তে অজু সেরে ফেরার পথে দেখে হালঘরার সামনের খড়ের পাঁজার মধ্যে একটি লোক শুয়ে। শরীরের একটু দেখা যাচ্ছে। লোকটার সারা শরীরই খড়ে ঢাকা। সে ভেবেছিল কেউ খুন করে লাশ তাদের হালঘরার সামনের খড়ে পাঁজায় ফেলে গেছে। তেরাব আলীই হালঘরার অন্য কামলাদের ডেকে আনে। সবাই ভয় পেয়ে যায়। এখন কি হবে, কিছু হোক আর না হোক পুলিশ তো প্রথমে তাদেরকেই অ্যারেস্ট করবে। যারা এই বাড়িতে রাত কাটিয়েছে। এর পর কত বছর যে জেলের পানি খেতে হবে। হালঘরাতে ওরা লোক পাঁচজন। লোকজন জেগে ওঠার আগেই কিছু করা দরকার। কারণ পালিয়ে গিয়ে লাভ নেই। লাশ দেখার পর মাঠের চাষাভুষারাই বলবে, রাতে কারা ছিল ঘরটায়। তারা ছাড়া বাইরের লোক আসবে নাকি খুন করতে। হালঘরার কামলাগুলো কী করবে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল। একজন তো ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করে, ওর কী হবে। ওদের মধ্যে ফিরোজটা একটু সাহসী আবার বোকাও। ও বলল— চলো গাত (গর্ত) খুঁড়িয়া লাশ গাড়িলাই (মাটি চাপা)। ই কাম হকলে মিলিয়া করতে অইব। মরলে হকল মরমু। মানুষ এব (এখানো) বার অইছে না। আর আমরারও কেউ ইতা মাতিও না (বলবে না)।
ফিরোজ কারো জবাব শোনার আগেই হাঁক দেয়— মন্তই ভাইসাব, কোদাল আনো। অখানো (এখানে) গাত কুড়মু।
কে কি করছে, এইসব না দেখেই ফিরোজ খড়ের গাদায় উঠে খড় সরাতে শুরু করে। আর তখনি মামার ঘুম ভেঙে যায়। মামা চোখ মেলে তাকান। ফিরোজ বুঝতে পারে লোকটা বেঁচে আছে। তখন সে গর্তে লাশ পোঁতার পরিকল্পনা বাদ দেয়। সারা রাতের কুয়াশায় মামার শরীরের উপরে বিছানো খড়গুলো ভিজে গেছে। তার মানে কেউ যদি শরীরের ওপর খড় বিছিয়ে না দিত ঠাণ্ডায় মামা মরেই যেত। কেউ একজন মামাকে এক গ্লাস দুধ খেতে দেয়। মামার শরীরটা চাঙা হওয়ার পর মামা রাতের ঘটনাটা সবাইকে বলে। সবাই অবাক— যাউক ভাইসাব, মা-বাপর দোয়া আছলো, এর লাগি ভালা ভুতোর আতো (হাতে) পড়ছিল। শয়তান ভূত অইলে কড় কড় করিয়া মাথাটা চিবাইয়া খাইয়া মাইজআইলের বিলো গিয়া খাইল অনে।
সেই থেকে আর কখনো রাতবিরাতে মামা কোথাও একা গান শুনতে যাননি।






