প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চ প্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
(১২শ কিস্তি)
দ্বিতীয় অধ্যায়
‘অনুবাদক এবং জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ’
‘ফরাসি ভাষার বন্ধনমুক্তি’
‘অনুবাদকদের রাজপুত্র’ নামে পরিচিত জ্যাক আমিওট-ও (Jacques Amyot, ১৫১৩-৯৩) ফরাসি ভাষার উত্কর্ষ সাধনে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর অনুবাদগুলো তো বটেই, সেসঙ্গে তাঁর Projet d’éloquence royale (১৫৭৪) পরিপূর্ণ প্রাঞ্জলতার ব্যাপারে অতিসতর্কতার ‘étre le plus clair possible’ পরিচায়ক। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি অস্বস্তিকর নতুন নতুন শব্দ নির্মাণ ও প্রয়োগ পরিহার করার পরামর্শ দিলেন। এবং এর মাধ্যমে তিনি আসলে বাক্য ও অনুচ্ছেদের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক, সহজ, স্বাভাবিক শৈলী ব্যবহার, এবং সুঙ্গতিপূর্ণ শব্দবন্ধ বা অভিব্যক্তি তৈরির ক্ষেত্রে নিজের কানের ওপর ভরসা রাখার কথাই বলেছিলেন। ফরাসি ভাষায় তাঁর অবদানের জন্য আমিওট প্রশংসিত হয়েছেন। মঁতে (Montaigne) তাঁকে সেরা ফরাসি লেখক হিসেবে গণ্য করতেন; সাহিত্য সমালোচক গুস্তাভ লান্সন (Gustav Lanson) লিখেছেন, আমিওট অনূদিত প্লুটার্কের রচনাবলি প্রাচীন যুগের ভাষাগুলোর সমকক্ষতা অর্জনের জন্য ফরাসি ভাষার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার নিদর্শন। ‘Larousse’ অভিধান তাঁকে ‘ধ্রুপদী গদ্য-স্রষ্টাদের অন্যতম’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
রেনেসাঁর সময়ের অনুবাদকরা দারুণ চৌকস ছিলেন। একাধারে তাঁরা লেখক, অনুবাদক তো ছিলেনই, কেউ কেউ আবার অভিধান রচয়িতা, প্রুফরিডার, মুদ্রক এবং বই বিক্রেতাও ছিলেন। সে হিসেবে তাঁরা ভাষার প্রতিটি ক্ষেত্র-বিষয়ক কাজের প্রসারে অবদান রেখে গেছেন: কাব্যতত্ত্ব, অলঙ্কারশাস্ত্র, ব্যাকরণ, বানান, উচ্চারণ ইত্যাদি। এ অনুবাদকরাই প্রথম অভিধান প্রণয়নের কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন, যে ব্যাপারে অষ্টম অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে।
ষোড়শ শতকের অনুবাদ সম্পর্কে কোনো জরিপই রিফর্মেশন বা ধর্মসংস্কার আন্দোলনের উল্লেখ ছাড়া সম্পূর্ণ হবে না, যে আন্দোলনের ফলে ভাষার ওপর সুস্পষ্ট প্রভাব রেখে যাওয়া বহু অনুবাদকর্ম প্রণীত হয়েছিল। ধর্মদ্রোহিতার ভয়ে এবং কেবল লাতিনই খ্রিস্টীয় ধর্মবিশ্বাসের একমাত্র ভাষা— এ মত পোষণ করে ক্যাথলিক চার্চ সব সময়ই ধর্মীয় রচনাবলি অনুবাদের বিরোধিতা করে গিয়েছিল। মধ্যযুগে দেশীয় ভাষায় সর্বপ্রথম বাইবেলের যে অনুবাদ হয়েছিল, তা যাজক সম্প্রদায়ের পাঠের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। সপ্তম শতকের শেষ পর্যন্ত, বেশির ভাগ বাইবেল অনুবাদককেই নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, ঠিক যেমন মারোকে করা হয়েছিল স্তোত্রগুলোর (the Psalms) অনুবাদ প্রকাশের পর। কিন্তু ধর্মসংস্কারক বা রিফর্মারদের জন্য এটি আবশ্যিক ছিল যে বাইবেলকে ‘দেশের ভাষায়’ লভ্য করতে হবে। ইরাসমাসও একই কথা মনে করতেন: ধর্মগ্রন্থগুলো অনুবাদের কাজ অনুবাদকদের, ধর্মতাত্ত্বিকদের নয়।। জাঁ কেলভিনও (Jean Calvin ১৫০৯-৬৪) একই মত পোষণ করতেন। College royal-এ গ্রিক, হিব্রু এবং ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নের পর কেলভিন সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নেন, সেখানে তিনি তাঁর প্রধান কাজ l’Institution de la religion chrestienne (১৫৪১) প্রথমে লাতিন ভাষায়, তার পর ফরাসিতে প্রকাশ করেন। কেলভিন তাঁর নিজের কাজ ফরাসিতে অনুবাদ করেছিলেন তাঁর দেশের প্রতি সেবার নিদর্শন হিসেবে: à notre nation françoise। ধর্মতত্ত্বের ওপর লেখা প্রথম রচনা হিসেবে এটি দেশী ভাষায় এমন একটি বিষয় সম্পর্কে লেখালেখি করার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, যে বিষয়ে তার আগ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা বা লেখালেখির এখতিয়ার কেবল লাতিনের জন্যই সংরক্ষিত ছিল।
ফরাসি ভাষার অসংখ্য ঐতিহাসিকই ভাষাটির বন্ধনমুক্তিতে ধর্মসংস্কার আন্দোলন-কালের লেখক ও অনুবাদকের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। অলিভেতঁ (Olivétan) এবং ইসে্চন রবের (Robert Estienne)-এর বাইবেলের তুলনায় এবং জেনেভায় রচিত অসংখ্য পুস্তিকা, যা ফেরিঅলারা গোটা ফরাসি গ্রামাঞ্চলে বিলি করে বেড়িয়েছে, সেগুলোর তুলনায় কেলভিনের রচনাবলি বেশি উল্লেখযোগ্য। তাঁকে ফরাসি বাক্কুশলতার সূচনাকারী বলা যেতে পারে। এবং র্যাবেলের পান্তাগ্রুয়েল এবং (আরেকটি অনুবাদ) আমিওটের প্লুটার্কের পাশাপাশি কেলভিনের Institution আধুনিক ফরাসির পত্তনকারী অন্যতম টেক্সট। কেলভিনের Institution-কে ‘দেশীয় (ভার্নাকুলার) ফরাসিতে যথেষ্ট প্রাঞ্জলভাবে রচিত বিশুদ্ধ ধর্মীয় এবং নীতিদর্শন-ভিত্তিক প্রথম মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করা হয়।’
সপ্তদশ শতকের অনুবাদকদের ভূমিকায় ভাষার বিবর্তনের ওপর অনুবাদের প্রভাব-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ধরা পড়ে। মূল লক্ষ্যটি একই ছিল: প্রাচীন যুগের লেখকদের ভাষা অনুকরণের মাধ্যমে ফরাসিকে একটি সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে গড়ে তোলা। তবে অনুকরণের পদ্ধতিটি নির্বাচনাত্মক হয়ে পড়েছিল: এ সময় লক্ষ্য ছিল ভাষাটিকে প্রাচীন যুগের সবচাইতে রমণীয় গুণগুলোয় গুণান্বিত করা। অনুবাদকরা এমনকি প্রকাশ্যেই সমালোচনামুখর হয়ে উঠলেন। একজন লিভির ধোঁয়াশা, অস্পষ্ট ব্যাপারগুলো শুধরে দিলেন তো আরেকজন তাসিতাসের রচনায় যুক্তির অভাব নিয়ে গালমন্দ পাড়লেন; অন্যদিকে আরেকজন আবার কবুল করলেন যে, তিনি সিসেরোর ত্রুটিযুক্ত প্রসঙ্গান্তর (transition) আর পুনরাবৃত্তির কারণে বিরক্তি বোধ করেছেন। এ সংশোধনীগুলো এই বিচারে যুক্তিযুক্ত বলে মেনে নেয়া হয়েছিল যে, শৈলীর ক্ষেত্রে প্রতিটি জাতিরই ভিন্ন রুচির অধিকার রয়েছে এবং ফরাসি ভাষা ‘লাতিনের চাইতে অনেক বেশি কঠোর আর খুঁতখুঁতে।’ মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁর অনুবাদকদের সাদামাটা অভিযোগগুলোর তুলনায় এটা ছিল একেবারে ভিন্ন একটি বিষয়।
চতুর্দশ লুইয়ের শতাব্দীটি শুরু হয়েছিল ভাষা বিশুদ্ধকরণ এবং বিধিবদ্ধ করার একটি বড় প্রকল্প দিয়ে। মালহার্বে (Malherbe), ভজেলা (Vaugelas), চ্যাপলাঁ (Chapelain)-এর মতো লেখক ও বৈয়াকরণ-অনুবাদকরা, সেসঙ্গে সাহিত্যিক আড্ডাখানা (salon) এবং নবপ্রতিষ্ঠিত ‘একাদেমি ফ্রাঁসেজ’ (Académie française), এ-ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিগত শতাব্দীর মতো, এবারো অনুবাদকরা এ কাজে এগিয়ে এলেন। তাঁদের অনেকেই Académie-র সদস্য ছিলেন।
{কার্ডিনাল রিশেল্যু (Cardinal Richelieu) ১৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘একাদেমি ফ্রাঁসেজ’ (Académie française) প্রতিষ্ঠা করেন, এবং রাজা ত্রয়োদশ লুইয়ের কাছ থেকে ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে সনদ লাভ করেন। রিশেল্যু ‘একাদেমি’কে ফরাসি ভাষা বিকাশ এবং বিশুদ্ধ করার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন, যে কাজটি মালহার্বে শুরু করেছিলেন। এখনো এ সংস্থা ফরাসি ভাষার দাপ্তরিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে এবং সেটার দাপ্তরিক অভিধান পরিমার্জনা ও সেটা প্রকাশ করার কাজ করে যাচ্ছে।}
প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সচিব কনট্রাট অনুবাদকে ফরাসি লেখকদের জন্য গদ্যের নমুনা জোগান দেয়ার একটি দুর্দান্ত উপায় বলে মনে করতেন। তাঁদের অনুবাদগুলো প্রথম দিকের অভিধানগুলোর (রিশেলের Richelet- Dictionnaire française, ১৬৮০; Dictionnaire de l’Académie, ১৬৯৪) করপাস (corpus)-এর অংশ ছিল। ভাষাসংক্রান্ত সব ধরনের বিতর্কে তাঁরা অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অনুবাদকর্মের ভূমিকায় তাঁরা শব্দভাণ্ডার, বানান ও উচ্চারণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। আর সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা প্রচুর অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন, যার সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে ষাটের মতো, যেসবের বেশির ভাগেই শৈলীর প্রতি তাঁদের আগ্রহ প্রতিফলিত। নিকোলা পেরো দবলাংকো (Nicolas Perrot d’Ablancourt, ১৬০৬-৬৪) তিনটি মৌলিক গুণের প্রবক্তা ছিলেন: প্রাঞ্জলতা, মিতভাষিতা, আর সৌকর্য বা চারুতা। বিশেষ কিছু প্রসঙ্গ প্রাঞ্জল করার জন্য তিনি ব্যাখ্যা জুড়ে দিতেন, যেমনটা তিনি তাঁর অনুবাদগুলোর সঙ্গে জুড়ে দেয়া নানা পর্যবেক্ষণে বারবার উল্লেখ করেছেন: ‘pour l’éclaircissenment’, ‘pour éviter l’obscurité’, বা ‘pour la clarté du raisonnement’। অন্যদিকে তাঁর শৈলীর অভিঘাত শক্তিশালী করার জন্য তিনি সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রগাঢ় অর্থবহতার সঙ্গে লিখতে চাইতেন; আর এটা তিনি অর্জন করেছিলেন ভাবব্যঞ্জক নানা শব্দ ব্যবহার করে, শব্দ আর বাক্য সতর্কতার সঙ্গে বিন্যস্ত করে এবং ভারী, দুর্বহ এবং অপ্রয়োজনীয় যেকোনো কিছু লেখা থেকে ছাঁটাই করে দিয়ে। লেখার সৌকর্যের কথা মাথায় রেখে তিনি তাঁর বাক্য সাজাতেন। এ ব্যাপারটিকে তখন অলঙ্করণ বলা হতো (embellishment), সুসঙ্গতি ও বৈপরীত্যের সাহায্যে প্রবাদসদৃশ শব্দবন্ধ সৃষ্টি করতেন এবং ছন্দ ও সামঞ্জস্যের ওপর প্রখর দৃষ্টি রাখতেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, আলঙ্কারিক উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন শব্দ যোগ করতেন: ‘pour mieux lier le discours’, ‘pour la commodité de l’expression’। পেরো দবলাংকোকে ‘belles infidèles’-এর জনক বলে অভিহিত করা হয়।
{‘belles infidèles’ কথাটা গিলে মেনায-এর (Gilles Ménage, ১৬১৩-৯২) উদ্ভাবন বলে মনে করা হয়। নিকোলা পেরো দবলাংকো (Nicolas Perrot d’Ablancourt, ১৬০৬-৬৪)-এর একটি অনুবাদ সম্পর্কে তিনি এ মর্মে মন্তব্য করেছিলেন বলে কথিত আছে: ‘আমি এটিকে la belles infidèle (সুন্দর ও অবিশ্বস্ত) বলেছিলাম, যে কথাটা আমি এখন আমার তরুণ বয়সের রক্ষিতাদের একজনের ক্ষেত্রে বলি।’ সপ্তদশ শতক হতে ‘belles infidèles’ কথাটা একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা অভিমুখ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, যেখানে আক্ষরিক অনুবাদের চাইতে একটি মুক্ত বা অবাধ অনুবাদকেই শ্রেয় বলে মনে করা হয়}
যেভাবে তিনি অনুবাদ করেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমালোচিত হয়েছে, কিন্তু বল্যু (Boileau) থেকে ভ্যালেরি লাখবো (Vallery Larbaud) পর্যন্ত অসংখ্য বিখ্যাত লেখক তাঁকে তাঁর ‘দুর্দান্ত ফরাসি’-এর জন্য প্রশংসা করেছেন।
সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘একাদেমি’-এর অনুবাদকদের প্রাধান্য থাকলেও ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘পোর্ট-রয়্যাল’-এর অনুবাদকরা বিচক্ষণতার সঙ্গে এ দায়িত্বভার নিজেদের হাতে তুলে নেন। ‘পোর্ট-রয়্যাল’ ছিল ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে স্থাপিত একটি মঠ এবং জ্যানসেনিজম (Jansenism) মতবাদের শক্ত ঘাঁটি। সেসঙ্গে এটি ছিল বিভিন্ন বিখ্যাত লেখক এবং ব্লেইয প্যাসকেলের মতো দার্শনিকদের একটা মিলন কেন্দ্র: তাঁরা সেখানে যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ এবং ধর্মতত্ত্ব পড়ানোর পাশাপাশি ধর্মীয় নানা টেক্সট অনুবাদ করতেন। সম্ভবত এই ‘Messieurs de Port-Royal’-রা তাঁদের Grammaire générale এবং Logique-এর জন্যই বেশি পরিচিত, কিন্তু সেসঙ্গে তাঁরা মতবাদভিত্তিক আর শিক্ষণপ্রণালি-সংক্রান্ত নানা লেখা ও অনুবাদেরও রচয়িতা ছিলেন। (রাসিন তাঁর যুবা বয়েসে তাঁদের Petites écoles-এ যোগ দিয়েছিলেন; সেখানে পাঠ্যক্রমে, অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল।) মুখ্যত Le Maître de Sacy-অনূদিত এবং ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে Elsevier কর্তৃক প্রকাশিত Bible de Port-Royal দীর্ঘকালব্যাপী সুনাম কুড়িয়েছিল এবং এই ১৯৯০ সালেও সেটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। এসব অনুবাদকর্ম ভাষাসংক্রান্ত প্রশ্নের ব্যাপারে যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আর তার ফলে বহু শব্দ ও অভিব্যক্তির যথার্থ মানে ও ব্যবহার-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করা গিয়েছিল, যা ফরাসি ভাষার প্রভূত উপকারে এসেছিল। ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে Antoine Le Maistre ১০টি ‘ফরাসি অনুবাদের রীতি’ তৈরি করেন; সেগুলোর মধ্যে মূলত চারটি অনুবাদ-সংক্রান্ত, বাকি ছয়টি অন্ত্যমিল, সুসঙ্গতি, পুনরাবৃত্তি, সামঞ্জস্য, ছন্দ ও বাক্যের দৈর্ঘ্য-সংক্রান্ত।
এসব অনুবাদক এবং তাদের সমসাময়িকরা অনুবাদ এবং লেখালেখি একই সঙ্গে চালিয়েছিলেন। ফরাসি ভাষার ওপর সেসবের প্রভাব অনস্বীকার্য, যদিও সচরাচর সেটাকে ততটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি, বা এমনকি উপেক্ষাও করা হয়েছিল। Roger Zuber তাঁর বই Les “Belles Infidèles” et la formation du goût classique-এ মন্তব্য করেছেন যে, সপ্তদশ শতাব্দীর অনুবাদকরা সাহিত্য সমালোচকও ছিলেন, যাঁরা Guez de Balzac এবং বল্যুর কাছ থেকে শেখা সৃজনশীল রচনার নিয়মরীতি প্রয়োগ করেছিলেন। এখন যেহেতু তাঁরা তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন, সেহেতু তাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে ‘ধ্রুপদী সাহিত্যের নির্মাতা’ বলে গণ্য বালজাক, দেকার্তে, চ্যাপলাঁ ও ভজেলা (যাঁরা অনুবাদকও ছিলেন) প্রমুখের কাতারে ঠাঁই পেতে পারেন।
আলোকপ্রাপ্তি (Enlightenment) কালের ঊষালগ্নে ফরাসি অনুবাদকরা বৈধভাবেই তাঁদের মিশনগুলোর অন্তত একটি বেশ সম্মানের সঙ্গেই সম্পাদন করতে পেরেছেন বলে দাবি করতে পারেন: পরিচিত প্রতিটি অভিব্যক্তির রেজিস্টার
(register) প্রদান করে এবং মানব জ্ঞানকাণ্ডের প্রতিটি এলাকায় তা পৌঁছে দিয়ে তাঁরা ভাষাটির বিকাশে অবদান রেখেছিলেন।
পরবর্তী পর্ব: ‘মার্টিন লুথার: জার্মান ভাষার কারিগর’






