স্মৃতিতে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট
আজ থেকে ৮০ বছর আগে আকাশে ওড়ার পর অদৃশ্য হয়ে যান খ্যাতিমান নারী বিমানচালক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। এতদিন পর নতুন তথ্য-উপাত্ত আবার সামনে নিয়ে এসেছে অতীতের ঘটনাকে। কী ঘটেছিল তার ভাগ্যে? কী ছিল তার শেষ পরিণতি?
১৯৩৭ সালে জুনের এক বর্ষা-সকাল। অগ্রদূত নারী বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট কলকাতা বিমানবন্দর থেকে আকাশে উড্ডয়ন করেন তার বিশ্বভ্রমণের ফিরতি যাত্রায়। সেটাই ছিল লোকচক্ষুর কাছে তার সর্বশেষ দেখা। দুই সপ্তাহ পর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় তার এয়ারক্রাফট। সেদিন প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, আজ অব্দি তা সবার অজানা! এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রমূলক বিভিন্ন ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। কিন্তু আজ ৮০ বছর পর চাঞ্চল্যকর নতুন কিছু তথ্য উদ্ঘাটন হয়েছে। বলা হচ্ছে, গুপ্তচর হিসেবে তাকে জাপানিরা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, আর তাদের তত্ত্বাবধানে থাকাকালেই তার মৃত্যু হয়েছে।
চলচ্চিত্রের নায়িকাদের মতো চেহারা আর সাহসী মনোভাবের জন্য ইয়ারহার্ট ছিলেন সে সময়ের একজন গ্ল্যামার আইকন। তার ঝুড়িতে রয়েছে বিমান চালনার অসংখ্য রেকর্ড। বিমানচালক হিসেবে নারীদের নিয়োজিত হওয়ার ক্ষেত্রে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
সেই সময়ে বিমান চালনা ছিল বিপজ্জনক একটি প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে দেয়া মন্তব্যে বিমান চালানোকে মজার একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। কলকাতা থেকে উড়ার সময় তার সঙ্গে সহযাত্রী হিসেবে ছিলেন ফ্রেড নোনান নামের আরেক নৌ-নাবিক। প্রশান্ত মহাসাগর সম্পর্কে যার ছিল ভালো ধারণা। কিন্তু অতিমাত্রার মদ্যপায়ী ছিলেন তিনি। মদ্যপায়ী পরিচয়টা তাই ভালোই রটে গিয়েছিল সবখানে। স্বাভাবিক সময় তো বটেই, ককপিটে থাকা অবস্থায়ও নাকি মদ্যপান করতেন তিনি।
ভারতের মাটি স্পর্শ
আফ্রিকা থেকে ভ্রমণকারী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ভ্রমণের উল্লেখযোগ্য ২৬তম দিনে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সৌদি আরব ও ভারতের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে সব আকাশপথে উড়ে উড়ে। ‘ভারত ভ্রমণের প্রথম সকালটি ছিল আমার জন্য বেশ চাঞ্চল্যকর! সেদিন আমি উটের পিঠে চড়েছিলাম। উটটি কুঁজো হয়ে বসেছিল, আর আমি তার লাগাম ধরে পা ছড়িয়ে তাতে উঠে বসলাম’— আমেরিকার একটি সংবাদপত্রের কলামে অ্যামেলিয়া লিখেছিলেন।
ফুয়েল গেজ রিপেয়ার শেষ করে ওভারহোলিংয়ের পর এয়ারক্রাফট কলকাতার উদ্দেশে থর মরুভূমি পার হয়ে পরবর্তী ১ হাজার ৪০০ মাইল ওড়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। তিনি লেখেন, ‘দখিনা হাওয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে সমস্ত বালি বাতাসে মিশে গিয়েছিল, ফলে নিচের সমতল ভূমিও দেখা যাচ্ছিল না। কোনো কিছু স্পষ্ট দেখতে না পেলেও আমরা পাহাড় আর পর্বতের ওপর দিয়ে উড়তে থাকি। মনে হচ্ছিল হলুদ সমুদ্রের মধ্যে পাহাড়গুলো হাঙ্গরের মতো মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অল্প কিছু সময় পর আবহাওয়া আবার পরিষ্কার হতে লাগল। ঠিক কোন জায়গা দিয়ে আমরা উড়ছিলাম তা দেখতে পেলাম। শুকিয়ে যাওয়া নদী, কিছু রাস্তা, গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রাম আর রেললাইন। ভারতের মূল ভূখণ্ডে আসার পর রেললাইনগুলো আমাদের দিক নির্ণয়ে বেশ সাহায্য করছিল। যদিও কিছু ঈগল মাঝে মাঝে এয়ারক্রাফটের সঙ্গে এসে ধাক্কা খাচ্ছিল।’
আগ্রার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি সহযাত্রী নোনানকে ল্যান্ড করার কথা বলছিলেন, যাতে তাজমহল দেখে যেতে পারেন। সেদিন বিকালে তারা বৃষ্টির মধ্যে কলকাতায় অবতরণ করেন। যদিও সে বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের টি ব্রেকের অনুমতি দেয়। এয়ার মেকানিক তাদের এয়ারক্রাফটের সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখছিলেন। রাত্রিতে নোনান অতিরিক্ত মদ্যপান করে গোঙাতে থাকে। ভ্রমণপথে দিক নির্ণয়ের বিষয় নিয়ে অ্যামেলিয়া বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। এছাড়া এয়ারক্রাফটের কিছু যন্ত্রপাতি সমস্যা করছিল। যদিও তা সেই এয়ারপোর্ট থেকে ঠিকঠাক করে নেয়া হয়েছিল।
কলকাতা থেকে ফেরার পথে
পরদিন সকালে ইয়ারহার্ট রেঙ্গুনের (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) উদ্দেশে তাদের পরবর্তী যাত্রার পরিকল্পনা করেন। ভারি বৃষ্টির জন্য তাদের ওড়া বিলম্বিত হচ্ছিল। আবহাওয়াবিদরা তাদের জানালেন, আরো ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে, তাই চলমান বৃষ্টি কিছুটা কমে গেলে যাত্রা করা হবে তাদের জন্য উত্তম। পরিশেষে যখন তারা বৃষ্টিভেজা রানওয়ে দিয়ে টেকঅফ করেন, মনে হচ্ছিল যেন ভারী কিছু পেছন থেকে এয়ারক্রাফটের চাকা আটকে দিচ্ছিল। রানওয়ের শেষ প্রান্তে এসে অ্যামেলিয়া অল্পের জন্য গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগা থেকে নিজেদের সামলে নেন।
তিনি সুন্দরবনের দক্ষিণ পাশ দিয়ে উড়ছিলেন। তিনি তার লেখায় উল্লেখ করেন, ‘কিছু সময় আমরা মেঘের ভেতর দিয়ে ধূসর আকাশে উড়তে থাকি আর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অতিক্রম করতে থাকি। কলকাতা থেকে আকিয়াব পর্যন্ত বেশ পথ জুড়ে আমরা ধানক্ষেত দেখতে পাচ্ছিলাম। তীব্র বৃষ্টিতে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বৃষ্টির ছাঁট এসে এয়ারক্রাফটে লাগছিল।’ অ্যামেলিয়া যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন, তখনো আবহাওয়া ছিল বেশ ঝঞ্ঝাপূর্ণ।
অদৃশ্য হয়ে যাওয়া
১৯৩৭ সালের ২ জুলাই, সন্ধ্যা ৬টায় অ্যামেলিয়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে নিউগিনি থেকে হাওল্যান্ড আইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন ২ হাজার ৫০০ মাইল পথ ১৮ ঘণ্টায় অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে। তিনি তখন প্রায় তার অভিযানের প্রায় শেষ প্রান্তে। সেখান থেকে হনলুলু যাত্রা করবেন, তারপর ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে বিজয়ীর বেশে নিজ বাড়িতে ফিরবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তিনি কখনো আর তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। গ্লানিময় কণ্ঠে অ্যামেরিকান কোস্টগার্ডের উদ্দেশে তার সর্বশেষ রেডিও মেসেজটি ছিল— ‘আমরা ১৫৭ ৩৩৭ লাইন বরাবর আছি।’ ইউএস গভর্নমেন্টের এ-যাবত্কালের সবচেয়ে বৃহৎ ও দীর্ঘতম অনুসন্ধান ছিল অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট এবং তার এয়ারক্রাফট অনুসন্ধানের ঘটনা। কিন্তু এত কিছুর পরও অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট ও তার এয়ারক্রাফটের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন সূত্রে তাদের নিখোঁজের নিম্নোক্ত ব্যাখ্যাগুলো বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়:
ব্যাখ্যা ১# এয়ারক্রাফটের জ্বালানি শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং এটি প্রশান্ত মহাসাগরে পতিত হয়ে গভীর জলে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। অনেকের মতে, এটাই খুব স্বাভাবিক আর বিশ্বাসযোগ্য পরিণতি অ্যামেলিয়া ও নোনানের।
ব্যাখ্যা ২# এয়ারক্রাফটের জ্বালানি তলানিতে এসে ঠেকেছিল। অ্যামেলিয়া ও নোনান প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপে অবতরণ করেছিলেন এবং সেখানে তারা কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। খাদ্যাভাব ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে টিকতে না পেরে কিছুদিন পর তাদের মৃত্যু হয়।
ব্যাখ্যা ৩# মার্কিন নৌবাহিনী অ্যামেলিয়াকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের ক্ষুদ্র বিমানের ফটোগ্রাফির কাজে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োজিত করেছিল, যা জাপানিরা টের পেয়ে যায় এবং তারা অ্যামেলিয়া ও নোনানকে ধরে নিয়ে যায়। জাপানে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় অথবা বন্দিদশায় তাদের মৃত্যু ঘটে। এটি একটি ধারাবাহিক তত্ত্ব, যদিও এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে।
মার্কিন জাতীয় আর্কাইভগুলোয় কাজ করে এমন একদল গবেষকের মতে, ১৯৩৭ সালের একটি ছবি দেখে তারা শনাক্ত করেন যে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ সে সময় জাপানি প্রশাসনের অধীনে ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে জাপানি কর্মকর্তাদের মত, তাদের হেফাজতে কোনো বৈমানিক বন্দি থাকার রেকর্ড নেই।
মার্কিন আর্কাইভের আবিষ্কার সম্প্রতি বেশ উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। হিস্ট্রি চ্যানেল এ বিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। তবু প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো নিঃসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে না। হয়তো কেউ কখনো আর জানতে পারবে না, আসলে কী ঘটেছিল সেদিন? কী ঘটেছিল দুঃসাহসী এ নারী বৈমানিকের ভাগ্যে?






