মার্ডার মিস্ট্রির সঙ্গে আমাদের প্রাথমিক পরিচয় ছোট্টবেলার একটি খেলার মাধ্যমে, তার নাম ‘চোর-ডাকাত-পুলিশ’ (যদিও এই খেলায় খুনি লুকিয়ে থাকে না এবং তাকে খুঁজে বের করতে হয় না)। চারজন মিলে খেলত, দারোগা-পুলিশ-চোর আর ডাকাত হতো তারা, নাছোড়বান্দা কোনো ছোট ভাইবোন থাকলে তাদেরকে যোগ করে নেয়া হতো ‘পকেটমার’ হিসেবে। দারোগা হুকুম দিত পুলিশকে— চোরকে ধরে আন কিংবা ডাকাতকে পাকড়াও... ঠিকঠাক ধরতে পারলে পুলিশ তার ভাগের বেতন পেত (আহা! যদি এমনি হতো!) নইলে নয়। মার্ডার মিস্ট্রি গেমে লুকিয়ে থাকে ভয়ানক খুনি, সে নানাভাবে ক্লু ছেড়ে যায়, লোকে যুক্তি ফলিয়ে তাকে খুঁজে বের করে। ডিনার পার্টিগুলোয় এ গেম খেলার চল উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শুরু হয়। ষাটের দশকের ব্রিটেনে কুখ্যাত শিশুহন্তা মুর-মার্ডারারদের পুরুষ সদস্য ইয়ান ব্র্যাডি, সে বিশ্বাস করত— চাইলেই ‘পারফেক্ট মার্ডার’ করা সম্ভব, যেখানে কোনো ক্লু বা সমাধানসূত্র থাকবে না। ব্র্যাডি তা করেও দেখিয়েছিল একাধিকবার। তবে আর্থার কোনান ডয়েল তার অমর চরিত্র ‘শার্লক হোমস’কে দিয়ে বলিয়েছিলেন, সব অপরাধই রহস্যমোচনের জন্য সুতো রেখে যায়, ঠিকমতো টানটুকু দিতে পারলেই বাকি যবনিকা খুলে আসবে।

১৮৪২-এ এডগার অ্যালেন পো বাস্তবের মেরি সিসিলিয়া রজার্সের খুনের ওপর ভিত্তি করে লিখলেন ছোটগল্প ‘দ্য মিস্ট্রি অব মারি রজেট’ এবং আরো দুটি ছোটগল্প। গল্পগুলোয় তার সৃষ্টি করা শৌখিন গোয়েন্দা অগুস্ত দ্যুপা চেষ্টা করছিল খুনির মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করবে, সেভাবে ভাবার। দ্যুপার এক অনামা সহচর আছে, সে-ই গল্পগুলোর বিবরণ দেয়...। বুঝতেই পারছেন, এই দ্যুপা আর তার সহচরই ছিলেন সাহিত্যে শার্লক হোমস এবং তদীয় সহচর ওয়াটসনের পিতৃপুরুষ বা বলা ভালো সাহিত্যে ‘জেন্টলম্যান ডিটেকটিভ’দের প্রথমজন। ওয়াটসনের জবানিতে ডয়েল একই কলাকুশলে হোমসের গল্পগুলো বলেছেন, যেন এই অ্যামেচার গোয়েন্দাদের ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ দেখায়, পাঠক যেন বিপুল বিস্ময়ে ওয়াটসনের চোখ দিয়ে পরোক্ষভাবে আবিষ্কার করে শার্লক হোমসের অসামান্য মেধা, তার বিচিত্র সব শখ (শার্লক হোমসের বেলায় বেহালাবাদন, কোকেন সেবন, ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত, শবদেহ বেতিয়ে জানা কতটা আঘাত করলে কেমন চিহ্ন ফুটে উঠতে পারে ইত্যাদি; দ্যুপা ভালোবাসতেন হায়ারোগ্লিফ)। পার্শ্বচর মূল চরিত্রের সবটুকু জানতে পারে না, ধোঁয়াশা রয়ে যায় এবং তা সৃষ্টি করে নতুন চমক, হূদয়ের নতুন নতুন অভিবাদন— সহচরের হূদয়েও, পাঠকের হূদয়েও।

১৮৮৭ সালে এল শার্লক হোমসকে নিয়ে প্রথম উপন্যাস ‘আ স্টাডি ইন স্কার্লেট’, জেন্টলম্যান ডিটেকটিভদের ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রের জয়যাত্রা শুরু হলো। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো, শার্লক হোমসকে নিয়ে ডয়েলের লেখা গল্প বা উপন্যাসের প্রতিটিই মার্ডার মিস্ট্রি নয়। যেমন ‘দ্য রেডহেডেড লিগ’ বা ‘লালচুলো সমিতি’, কিংবা ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ব্লু কারবাঙ্কল’ বা ‘নীলমণি রহস্য’, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য সলিটারি সাইক্লিস্ট’, ‘দ্য কপার বিচ’, ‘দ্য সাসেক্স ভ্যাম্পায়ার’ ইত্যাদি। কখনো হত্যাকারীর চেয়ে কিছু কম নয় অপরাধের ভয়াবহতা, যেমন ‘দ্য ইঞ্জিনিয়ারস থাম্ব’। কিন্তু এসবে পরে আসছি। আগে লোকটিকে তো একটু জেনে নিই।

শার্লক হোমস দেখতে কেমন? আমার মতো পাঁড় ভক্তের কাছে সে দেখতে হুবহু জেরেমি ব্রেটের মতন, পর্দায় সবচেয়ে জনপ্রিয় হোমস। আ স্টাডি ইন স্কার্লেটে ডয়েল লিখছেন, হোমসের দৈর্ঘ্য ছ’ফুট ছাড়িয়ে, এত শীর্ণ যে তাকে আরো দীর্ঘ দেখায়। স্বভাবতই হোমসের চাউনি তীক্ষ এবং ছিদ্রান্বেষী, সরু নাক খানিকটা বাজপাখির মতো, পুরো মুখ-কপাল-চোয়ালে এক রকমের সতর্ক আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে অবতীর্ণ হওয়া ভাব। অ্যাসিডের ছিটেয় হলদে, কালির দাগে আচ্ছন্ন আর সিরিঞ্জের কারণে নানা জায়গায় ফুটো হওয়া তার হাত, এ হাতই কিন্তু আশ্চর্য কোমল হয়ে হাওয়ায় দাগ কেটে কেটে অদৃশ্য লেখনী লিখত, যখন সে বুঁদ হয়ে ভাবত। কখনো দিনের পর দিন সে কথা বলে না, চুপচাপ বসে থাকে বসার ঘরের কৌচে... চোখে বিভোর প্রায় নিদ্রালু একটি চাহনি, কখনো উন্মাদের মতো ক্রমাগত প্রলাপ বকতে থাকে। হোমসের চিরশত্রু মরিয়ার্টি, এ মরিয়ার্টিকে দেখে হোমস প্রথম উক্তি করেছিল, মরিয়ার্টির খুলির আকার নিয়ে, অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোকের খুলি আকারে বড় হয়, হোমসের যেমন ছিল।

হোমসের জ্ঞানের পাশাপাশি তার মূর্খতাও ছিল অসাধারণ। সাহিত্যের কিছুই সে জানত না (অবশ্য গ্যেটে ও শেক্সপিয়ার থেকে উদ্ধৃতি চিনত বা ক্লু বের করত, যাকে বলে ‘সেনসেশনাল লিটারেচার’ অর্থাৎ রহস্যগল্প— সে বিষয়ে অবশ্য তার জ্ঞান অগাধ), জানত না দর্শন বা অ্যাস্ট্রোনমি, সামান্য রাজনীতিজ্ঞান আর ক্ষেত্রবিশেষে ভালো উদ্ভিদবিদ্যা (কোন উদ্ভিদ বিষাক্ত, বেলেডোনা- আফিম ইত্যাদি)— এই ছিল তার দৌড়। ভূগোল বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল প্রখর, কোন এলাকার মাটি কেমন, কাদামাটির রঙ এবং আকরিক উপাদান— এসব নিয়ে সে বারবার মাথা ঘামিয়েছে। সে চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র নয়, কিন্তু সে শারীরবিদ্যা এবং রসায়নবিদ্যা খুব ভালোবাসে, ভস্ম কত প্রকার হতে পারে কিংবা বিষ কত রকম, তাই নিয়ে তার লেখা বই রয়েছে।

হোমসের সঙ্গী ওয়াটসন সেনাবাহিনীর ডাক্তার, স্বভাবতই নিয়মানুবর্তিতা সে ভালোবাসে, ভালোবাসে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে আর ঘুমোতে... কিন্তু হোমস প্রায়ই চেঁচিয়ে ওঠে যে সে খাদ্যগ্রহণ করে স্নায়বিক শক্তি ক্ষয় করতে চায় না, তবে সেটা হাতে কেস থাকলে। এমনিতে শার্লক হোমস রাত ১০টার পরে জেগে থাকে না, এবং ওয়াটসন উঠার আগেই নাশতা করে বের হয়ে যায়— কখনো ডিসেকশন রুমে, কখনো ক্যামিস্ট্রি ল্যাবে, কখনো কেবলই লন্ডনের দীর্ঘ দীর্ঘ পথে হেঁটে বেড়াত। নারীর বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে তার ধারণা বেশ ঋণাত্মক (যতদিন না ইরেন অ্যাডলারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়), খানিকটা অস্কার ওয়াইল্ড যেমন করে নারীদের ‘ডেকোরেটিভ সেক্স’ ভাবতেন তেমনই শুধু নয়, শার্লকের দৃষ্টিতে নারী অবিশ্বস্ত এবং সব অপরাধের হেতু। শার্লক হোমসের একমাত্র জ্ঞাতি বলে জানা যায় তার ভাই মাইক্রফট হোমসকে, শার্লকের মতে সে ধীমান (ক্ষেত্রবিশেষে শার্লকের চেয়েও), কিন্তু নিজের এ অসামান্য ধীশক্তি সে (শার্লকের মতে) অপব্যবহার করে চলেছে সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে, ‘ডায়োজিনিস ক্লাব’ নামের একটি সমিতিতে গিয়ে সে সময় কাটায় যে ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য কে কতক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে। হোমস আর ওয়াটসন লজিং থাকে বুড়ি মিসেস হাডসনের বাড়িতে, পাথরের সিঁড়িঘর, টানা করিডোরের শেষে উঁচু ছাদের দুটি ঘর আর একখানা বড়সড় আলো-বাতাসময় বসার ঘর, দেয়ালে অজস্র বোতল আর টেবিলে টেস্টটিউবের ছড়াছড়ি। এ বাড়ির নম্বর ২২১ বি, রাস্তার নাম ‘বেকার স্ট্রিট’। ২২১ বি, বেকার স্ট্রিটের বাইরে উনিশ শতকের লন্ডন কোলাহল করছে, কলহ আর বিবাদভঞ্জন করছে, মূর্ছা যাচ্ছে আর জেগে উঠছে একটি বিভ্রান্ত-কোন্দলরত সামাজিক নৈরাজ্যে। যেখানে বিবদমান বেশ্যা-দালাল-পথশিশু-মাতাল-আফিমখোর-চোর আর পকেটমারে গিজগিজ করছে শহরের রাজপথ, অথচ তার চেয়ে বেশি উর্বর অপরাধক্ষেত্র হয়ে আছে গ্রামের নিশ্চুপ-নির্লিপ্তি। অন্ধকার ওয়ার্কহাউজগুলোয় ডিকেন্সের ‘অলিভার টুইস্ট’-এর মতো এতিম শিশুশ্রমিকরা অনাহারে-অর্ধাহারে কাতর, পথে-প্রান্তরে-শুঁড়িখানায় ডিকেন্সের ‘ন্যান্সি’র মতো মেয়েরা অহরহ উত্পীড়িত হচ্ছে, গুম হচ্ছে বা খুন হয়ে যাচ্ছে।&dquote;&dquote;

হোমসের সঙ্গে ওয়াটসনের প্রথম সাক্ষাতে নাম জানার আগেই সে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমি পেয়েছি! কোন পদার্থ কেবল রক্তের সঙ্গে বিক্রিয়ায়ই অধঃক্ষিপ্ত হতে পারে, আমি সেটা বের করেছি!’ মুখে-চোখে স্বর্ণখনি আবিষ্কারের উন্মাদনা, হত্যাকাণ্ডের বহুদিন পরে যখন কাপড়ে দাগ পাওয়া যাবে, তখন এক মুহূর্তে বোঝা যাবে এটা রক্তের দাগ নাকি কাদামাটির নাকি মরচে নাকি ফলের রস। হাত মেলানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে অপরিচিতপ্রায় ওয়াটসনকে বলে, ‘তুমি আফগানিস্তানে কাজ করেছ, তাই না?’ বিস্ময়ে চেঁচিয়ে ওঠে ওয়াটসন, সেই শুরু।

এডগার অ্যালেন পোর দ্যুপা যেমন কেবল বলে ‘অবজারভেশন অ্যান্ড ইনফারেন্সেজ’, হোমসও তাই। হোমস বড়াই করে তার চিন্তার প্রক্রিয়াকে ডাকত ‘সায়েন্স অব ডিডাকশন’ তথা যুক্তিসঙ্গত অনুমিতি, ‘ইনফারেন্সেজ’ ছিল তার প্রিয়। জগতের কিছুই কারণ ছাড়া ঘটে না, একেবারে ইউক্লিডের উপপাদ্যের মতো করে মেপে মেপে ঘটে, এই ছিল তার বিশ্বাস। মানুষের অভ্যাস, তার বিশ্বাস, তার স্মৃতি, তার পেশা, তার অভিজ্ঞতা... এর সবটুকুই ধরা দেয় তীক্ষ্ম চোখে তাকাতে জানলে। হাতের লেখার দিকে তাকালে জানা যায় কত দ্রুত তা লিখিত হয়েছে, কেমন ছিল সেই লেখার কাল (সে ট্রেনে ছিল না স্টেশনে, গতি না স্থিতিতে?), কতটা তাড়া ছিল তার লেফাফায় চিঠি ভরার, কেন চিঠির কাগজটা এমন, কোন কোম্পানির এ কাগজ, লেফাফার কোনের ওই দাগটুকু কিসের? মানুষের নখের ফলকে, কোটের আস্তিনে, পায়ের বুট জুতোয়, ট্রাউজারের হাঁটুতে, শার্টের কাফে, তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলির চামড়ায়... তার পরিচয় লেখা আছে।

ম্যাগাজিনে হোমসের একটি ছাপা হওয়া প্রবন্ধ পড়ে ওয়াটসন, সেখানে সে লিখেছে— ‘এক ফোঁটা পানি থেকে একজন যুক্তিবিদ এ ইনফারেন্সে আসতে পারবে যে সেটা আটলান্টিকের জল নাকি নায়াগ্রার, এটা করতে তার এ দুইয়ের একটিও দেখতে যেতে হবে না। সারা জীবজগতের জীবন একটি অদৃশ্য শিকলে শৃঙ্খলাবদ্ধ।’ দৈবিক বা ঐশ্বরিক বলে কিছু নেই, জগৎ হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে কার্যকারণের বন্ধনহীন গ্রন্থিতে বাঁধা হয়ে।

এসব দেখার চোখ, সঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতা এবং অপরাধের ইতিহাসের সঙ্গে খতিয়ে দেখার অসামান্য স্মৃতিশক্তি... এই-ই হোমস। মাঝে মাঝে সে অদ্ভুত সব কথা বলে, এই যেমন ডাক্তাররা যখন অপরাধী হয়, তারা হয় শ্রেষ্ঠ অপরাধী, শারীরবিদ্যার জ্ঞান আছে তার, স্নায়ুর শক্তিও আছে (দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য স্পেকল্ড ব্যান্ড)। কিংবা ব্যক্তিগতভাবে যে প্রচণ্ড ভালো দাবাড়ু, তার মাথা যে ‘স্কিমিং হেড’ অর্থাৎ কুচক্রীর মাথা, সেটা সে ধরে নেয়। কিংবা নিজের স্ত্রীকে ভগ্নী পরিচয় দিয়ে যৌন টোপ হিসেবে ব্যবহার করা মানুষ যে ভয়ানক অপরাধী হতে পারে অবলীলায়, সেটা হোমস ধারণা করতে পারে অনায়াসে (দ্য হাউন্ড অব বাস্কারভিলজ)। হোমসের গল্প বা উপন্যাসে সাধারণত সবচেয়ে বড় ক্লু থাকে মানুষের অতীতে— সে কে ছিল (দ্য ম্যান উইথ টুইস্টেড লিপ, দ্য ব্রুস পারটিংটন প্ল্যান, দ্য মাসগ্রেভ রিচুয়াল)? কোথা থেকে সে জাহাজে চেপে বা জাহাজডুবি হয়ে এ মহাদেশে পৌঁছেছে (বসকম্ব ভ্যালি মিস্ট্রি, দ্য ডান্সিং মেন)? কেমন ছিল অন্য মহাদেশে তার জীবন (দ্য রেসিডেন্ট পেশেন্ট)? সেই জীবনে সে কাকে কাকে ঠকিয়েছিল (দ্য ফাইভ অরেঞ্জ পিপস)? কার জীবনে ভরাডুবি ঘটিয়ে সে তার আজকের জীবনে কীর্তিসৌধ নির্মাণ করেছে (দ্য সাইন অব ফোর)? পুরনো পাপের সূত্র ধরেই নতুন করে সংঘটিত অপরাধকে বোঝা যায়, অপরাধীকে চেনা যায়, শিউরে উঠতে হয় মানুষের আয়ুর সমান দীর্ঘ তার প্রতিশোধস্পৃহা জেনে। যারা সত্যজিৎ রায়ের ‘গোলকধাম রহস্য’ কিংবা ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই হোমসের এ গল্পগুলো চিনতে পারবেন, কিংবা উল্টো করে বললেই হয়তো সঠিক শোনাবে। প্রতিহিংসার এ তীব্রতাগুলোর সঙ্গে কেবল পাল্লা দিতে পারে প্রেম, তীব্র প্রেম, তাও হোমসের গল্পে উপস্থিত (দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ডেভিলস ফুট)।&dquote;&dquote;

যে কালের ঘটনা হোমসে আছে, সেখানে সিপাহি বিপ্লব বা মিউটিনির প্রসঙ্গ এসেছে কয়েকবার, এসেছে ভারতবর্ষে জীবন কাটানো শ্বেতাঙ্গদের নানা কাহিনী (দ্য স্পেকল্ড ব্যান্ড), ওয়াটসনের নিজেরই রয়েছে এশিয়ার অভিজ্ঞতা। লন্ডনে চীনাদের আফিমের ডেরা এসেছে, এসেছে মালয় এবং ভারতীয় লস্করদের কাহিনী। হোমস ওয়াটসনকে সতর্ক করে দিচ্ছে— ওয়াটসন যেন অল্ডগেট পার হয়ে কোথাও গেলে সঙ্গে সবসময় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। অল্ডগেট স্টেশনের পরে শুরু অভিবাসীদের পল্লী, বিজাতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের ঘৃণা-বিদ্বেষ-সন্দেহ বড় গভীর... শার্লক হোমসের গল্পগুলোতে তা বেশ স্পষ্ট। ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ হওয়ার তাড়না ছিল না সেকালে, ফলে এ সম্ভাষণগুলো বেশ খোলামেলা।

হোমসের গল্পগুলোকে শুধুই ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ হিসেবে জড়ো করলে আসলে অপরাধ হবে পাঠকের কাছে। এ শুধু রহস্যভেদের গল্প নয়, এসব গল্প পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল স্তন্যপায়ীর মানসচরিত। ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য টুইস্টেড লিপ’-এর নেভিল সেইন্টক্লেয়ারের কথা ভেবে দেখুন। সে অত্যন্ত শিক্ষিত এক যুবক, যে কিনা সাংবাদিকতা করত, ভিক্ষুকদের নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করার সময় সে আবিষ্কার করল, ভিখারি হয়ে সে বেশি রোজগার করতে পারবে, কাজ থেকে ছুটি নিয়ে সে ভিক্ষা করে রোজগার করে ফেলল। টাকার অংক এমন যে কাজ ছেড়ে দিয়ে সে মুখে মেকআপ করে ভিক্ষা করতে লাগল, সেই টাকায় সে বাড়ি কিনল শহরতলীতে, বিয়ে করল, স্ত্রীকে জানাল যে সে শহরে বাণিজ্য করে। শহর জানল এমন এক ভিক্ষুক আছে লন্ডনের পথে, যে অবিরল শেক্সপিয়ার বলতে পারে, খুব টাকা কামাই হতে লাগল। হারিয়ে গেল নেভিল সেইন্টক্লেয়ার নামের এক সুশিক্ষিত তরুণ। সবচেয়ে নিকটবর্তিনী স্ত্রীও হদিস পেল না তার রহস্যময় দ্বৈত জীবনের। কিংবা শার্লক হোমসের ‘ইলাস্ট্রাস ক্লায়েন্ট’কে মনে করুন, প্রেমিকাকে সে সব বিপর্যয়রোধকল্পে জীবনের সব ঘটনার আরেক ইন্টারপ্রেটেশন বা ব্যাখ্যা গিলিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে, জীবনের প্রতিটি অপরাধের এক রকমের সরল ও নিরপরাধ চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সে সেসব ব্যাখ্যায়। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সে সাংঘাতিক অপরাধী, পথের বেশ্যার সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়, তাদের ছবি তোলে, ভিট্রিয়লে দাগিয়ে দেয় তাদের মুখশ্রী। ‘দ্য স্পেকল্ড ব্যান্ড’-এ সত্বাবা বদরাগী, বিদঘুটে মেজাজের পাশাপাশি আরেকটি দিক আছে তার চরিত্রে, ভবঘুরে জিপসিদের সে দিব্যি নিজের জমিনে থাকতে দেয়, তার ঘর ভরে আছে ভারতবর্ষ থেকে আমদানি করা বিচিত্র সব পশুপাখি আর সরীসৃপে, রাতে চরে বেড়ায় তারা ঘরের চৌহদ্দিতে, বাবাকে আপাতদৃষ্টে খেয়ালি আর বদরাগীই দেখা যায়। কে জানত সে ঠিক করে রেখেছে সেময়েদের একে একে সে মেরে ফেলবে, তবেই সে পাবে সম্পত্তির অধিকার। সেই মারণপ্রক্রিয়াও কী সাংঘাতিক, অন্ধকারে মেয়েদের ঘরে অকেজো সার্ভিস বেলের দড়ি বেয়ে সে প্রতি রাতে নামিয়ে দেয় কালসাপ, সেই সাপকে আবার পাভলভের থিওরি মোতাবেক খাদ্যের আহ্বানে ফিরিয়েও আনে। সাপ নামে প্রতি রাতে, গভীর রাতে তার শিসের শব্দ বাজে, কোনো না কোনো দিন সে তো কাটবেই দুই বোনের একজনকে। ‘হাউন্ড অব বাস্কারভিলজ’-এ খুনি স্টেপলটন যে নিজের স্ত্রীকে বহিরঙ্গে বোন সাজিয়ে রাখে, সেটা আগেই লিখেছি। স্টেপলটন কিন্তু ভীষণ ধীমান, রৌদ্রের দিনে মাঠে মাঠে দুর্লভ প্রজাপতি ধরে বেড়ায়, কমপ্লেক্স ক্যারেক্টারের অসামান্য নমুনা। শুধু কি তাই! আমার কাছে ব্রিটিশ কান্ট্রিসাইডের সবচেয়ে ভাস্বর, সবচেয়ে মনোগ্রাহী বিবরণ হচ্ছে হাউন্ড অব বাস্কারভিলজ; এ নোনাধরা দেয়াল আর লিচেনবোঝাই টালির ছাদ, এ প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি-কাদাময় জলাভূমির পথ, এ নির্জন রুখু মুরল্যান্ডের রিক্ত সৌন্দর্য, এ বনের গাছপালার কাণ্ডে বৃষ্টির ঝাপটা আসার দিকটিতে ফলে ওঠা শ্যাওলার কিংখাব, এ নির্জনতা আর তার সিঞ্চনে ফলে ওঠা পাপ-তাপ-অপরাধ... আর কোথায় এমন করে ফুটে উঠেছে?&dquote;&dquote;

মার্ডার মিস্ট্রি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পরে ১৯২০-৩০-এর দশকে অনেকেই লিখেছেন গোয়েন্দা গল্প। এই লেখকদের বেশির ভাগই ব্রিটিশ, যেমন মার্জরি অ্যালিংহ্যাম, অ্যান্থনি বার্কলে, জি. কে. চেস্টারটন, আগাথা ক্রিস্টি, অ্যান হকিং। প্রখ্যাত লেখক জুলিয়ান বার্নস অল্প বয়সে হাত মকশো করেছিলেন ছদ্মনামে ক্রাইম থ্রিলার লিখে। গোয়েন্দা গল্পের সুবর্ণযুগের অবসান ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। যে সংকীর্ণ এলিটিস্ট পটভূমিকে এসব মার্ডার মিস্ট্রির জন্য ব্যবহার করা হতো, তা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে ত্রিশের দশকেই। আগাথা ক্রিস্টির সৃষ্ট চরিত্র ‘এরকুল পোয়ারো’ কিংবা ‘মিস মার্পল’কে নিয়ে অবশ্য আজও ব্যস্ত আছে বোকা-বাক্স, ব্যস্ত আছে চেস্টারটনের সৃষ্ট চরিত্র ‘ফাদার ব্রাউন’কে নিয়েও। কতবার সিনেমা হয়েছে ডয়েলের হাউন্ড অব বাস্কারভিলজ নিয়ে, ক্রিস্টির ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ নিয়ে। হিচককের ‘রোপ’, ‘ভার্টিগো’, ‘রিয়ার উইন্ডো’, ‘শ্যাডো অব আ ডাউট’ কিংবা ‘স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেন’-এর অনবদ্য সব মার্ডার মিস্ট্রি কে ভুলতে পারে? কে ভুলতে পারে ফিল্ম নোয়ার সেসব অবিস্মরণীয় নাম ‘দ্য থার্ড ম্যান’, ‘ডাবল ইনডেমনিটি’, ‘দ্য নাইট অব দ্য হান্টার’ (উত্তম এর বাংলা ভার্সনে অভিনয় করেছিলেন, সিনেমার নাম ‘কুহক’), ‘মল্টিজ ফ্যালকন’।

পর্দায় কোন হোমস ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয়? ব্যাসিল র্যাথবোন কিংবা পিটার কুশিংকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়ে অবশ্যই জেরেমি ব্রেট (গ্রানাডা টিভি সিরিজ)। ব্রেট যেন জ্যান্ত করে তুলে এনেছিলেন শার্লক হোমসকে, তার মাথা নাড়া, মুখ টিপে চুপ করে দেখা, আঙুল নেড়ে বাতাসে আঁক কষা থেকে শুরু করে বিরক্তি-উপহাস-আনন্দ-অতিশয়োক্তি-সামান্য সময়ের অট্টহাসি-ক্ষিপ্রভাবে দেয়া লাফ... এর সবকিছুই স্ট্র্যান্ডের সিডনি প্যাজেটের অলঙ্করণ করা হোমসকে বারংবার স্মরণ করিয়ে দিত, মন ভরে যেত ডয়েলপ্রেমীদের। এ সিরিজে পরপর দুজন অভিনেতা অভিনয় করেছিলেন ওয়াটসনের চরিত্রে, দুজনই চমত্কার। ব্রেট একসময় মানসিকভাবে বেশ জড়িয়ে গেছিলেন এ প্রচণ্ড বুদ্ধিমান অথচ মানবসম্পর্কে সংশয়বাদী একাকী এ গোয়েন্দার সঙ্গে, পর্দার চরিত্র অধিকার করে নিয়েছিল তার ব্যক্তিগত জীবনকে, এতই বেশি যে ব্রেট হোমসের নাম মুখে নিতেন না, বলতেন ‘জানোই তো কে’ কিংবা ‘উনি’ বলে। হোমসকে নিয়ে একেবারে নতুন ইন্টারপ্রেটেশন হয়েছে এখন, বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ অভিনয় করছেন হোমসের চরিত্রে (খুব করে ব্রেটকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তিনি), নতুনদের ভেতর এ একজনকেই আমার হোমস হিসেবে রুচলো দেখলাম, অবশ্য এ একেবারে ব্যক্তিগত বক্তব্য।

বাংলায় পাঁচকড়ি দে’র গোয়েন্দা সাহিত্য, দীনেন্দ্রকুমার রায়ের রহস্যলহরী সিরিজ, হেমেন্দ্রকুমার রায়, সৌরীন্দ্রমোহনের প্রহেলিকা সিরিজ, শশধর দত্তর মোহন, নীহাররঞ্জন গুপ্তর কিরীটী আর শরদিন্দুর ব্যোমকেশ বকশীকে নিয়ে এখানে আলাপ করা হলো না। বলা হলো না সত্যজিতের ‘ফেলুদা প্রদোষ মিত্তির’কে নিয়ে, সমরেশ বসুর ‘গোগোল’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাকাবাবু রাজা রায়চৌধুরী’, শীর্ষেন্দুর ‘বরদাচরণ’, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘কর্নেল নীলাদ্রি সরকার’— তাদের প্রত্যেককে নিয়ে আলাদা করে একটি রচনা হতে পারে। শার্লক হোমস এবং তার ডিডাকশনের প্রক্রিয়া বাঙালি গোয়েন্দারা কীভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন, দিশি গোয়েন্দা গল্পে কেমন করে উঠে এসেছে বাংলামুলক- তার পুরনো বাড়িঘর-সদর আর অন্দর-ঐতিহাসিক শত্রুতা-সমাজের রীতি, এসবের তুল্যমূল্য বিচারের জন্য একদিনের পরিসর যথেষ্ট নয়। এসব নিয়ে কাজ হচ্ছে এটা আশার কথা, সিনেমার গল্প হিসেবে দারুণভাবে ব্যবহূত হচ্ছে, সেটাও আশাপ্রদায়ক। ফেলুদা-শাড়ি নিয়ে এখানে না-ই বা লিখলাম।