দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বলে পরিচিত অঞ্চলটি দারুণ বৈচিত্র্যপূর্ণ। এর ভৌগোলিক সীমানায় এখন আছে ১১টি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র। এ অঞ্চলের মানুষ কথা বলে এক হাজারের বেশি স্বতন্ত্র ভাষায়। এখানে বাস করে অনেক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, তাদের বিশ্বাস-প্রথাও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু এ বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যেও তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য দেখা যায়। মিয়ানমার থেকে পাপুয়া—মানুষ খাম্বা বা পোলের ওপর কাঠের ঘর বানায়, তা তারা জলে ভাষা উপকূলীয় সমতল কিংবা উঁচু ভূমি যেখানেই বাস করুক না কেন। পান-সুপারি দিয়ে ঘরে অতিথিদের স্বাগত জানানো কিংবা বিয়েতেও অতিথিদের পান-সুপারি পরিবেশন করাটা এ অঞ্চলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
বিভিন্ন শহরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রচলিত আছে বিভিন্ন গল্প, যেগুলো মূলত একই ধরনের। এসব গল্পে পাওয়া যায় শক্তিশালী প্রাণীর সঙ্গে লড়াই করে দুর্বলের জয়। যেমন মেলাকায় (মালাক্কা) প্রচলিত আছে কুকুরকে পরাজিত করা এক মাউসডিয়ারের কথা। সিঙ্গাপুরা (সিংহনগর) নামটি শুধু সিঙ্গাপুর নয় বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক ছোট-বড় শহরের নাম।
বঙ্গোপসাগর ও জাভা সাগরের মধ্যবর্তী এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও গল্পগাছার মধ্যে যে সাদৃশ্য-বিনিময়, তা অনেকটাই ঘটেছে প্রাচীনকাল থেকে বাণিজ্য সম্পর্কের সূত্রে। এখানে জল ও স্থলপথের একাধিক বাণিজ্য রুট পরস্পরকে ছেদ করে গেছে। এর মাধ্যমে সুযোগ হয়েছে পণ্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও বিস্তৃতির। এর প্রমাণও পাওয়া যায় জলজ্যান্ত; ভিয়েতনামের দুই প্রাচীন জনপ্রিয় জিনিস—ডং সন ঢাক ও সা হুইন তৈজসপত্র পাওয়া গেছে পশ্চিম দিকে সুদূর সুমাত্রায় এবং পূর্বদিকে পশ্চিম পাপুয়ার সেই বার্ডস হেড উপসাগরে। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-৩০০ অব্দের ইন্দোনেশিয়ার জায়ফল পাওয়া গেছে উত্তর ভারতে। এ আবিষ্কার থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়—এক অঞ্চলের বাণিজ্য সম্পর্কের প্রাচীনত্ব এবং স্থানীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মূলত দ্বীপ দিয়ে গঠিত। এখানকার বাণিজ্য সম্পর্ক প্রাচীনকাল থেকেই জলপথে, বিভিন্ন বন্দরের সংযোগে। নৌ-বাণিজ্যে মধ্যযুগে ইউরোপী নাবিকদের যে জয়যাত্রা ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়, তার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ নৌ-বাণিজ্যের সম্পর্ক পাশাপাশি রেখে পাঠ করা যেতে পারে। এ অঞ্চলে সাগরে বসবাসকারী যাযাবর গোষ্ঠী ছিল, যারা মূলত এসব পণ্যসম্ভার নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে নিয়ে যেত। এ জল যাযাবররা ছিলেন দক্ষ নাবিক। তারা সাগরে পথ চলতেন আকাশ আর জলের দিকে তাকিয়ে। নক্ষত্র, বাতাস, মেঘ, সামুদ্রিক পাখি ও প্রাণীদের গতিবিধি থেকেই তারা ভারত সাগরের মাদাগাস্কার থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার আইল্যান্ডের মধ্যবর্তী জলসীমায় পথ চলতেন। তাদের এ দক্ষতা প্রশংসা কুড়িয়েছিল গ্রিক দার্শনিক প্লিনি দি এল্ডারের। তার কথায়, সেই যাযাবর নাবিকরা ‘পুরুষের প্রেরণা ও মানুষের সাহস’ ধারণ করত। নৌবিদ্যায় তাদের এ দক্ষতা পরে চীনা ও পর্তুগিজরা গ্রহণ করতে চেয়েছে।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য বেড়েছিল। কারণ এ সময় ভারতীয় বণিকরা পূর্বদিকে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক বাণিজ্য গন্তব্য ছিল রোম। কিন্তু রোমানরা চীনের দিকে মনোযোগ দেয়ায় ভারতীয় বণিকরা বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেন। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ ভেঙে তারা যাত্রা করেন ফুনানে। মেকংয়ের বদ্বীপে ফুনানের অবস্থান। এখানে চীনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্য দূতরা জড়ো হতেন। ফুনান ছিল চীনের দ্বার। এর প্রধান বন্দর ওক-ইয়ো হয়ে ওঠে বাণিজ্যের জমজমাট কেন্দ্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন ও ভারতের পণ্যের বিকিকিনি চলত এ বন্দরে। ওক-ইয়োতে এমনকি রোমান মুদ্রায় পাওয়া গেছে। ভারতীয় বণিকরা মধ্য এশিয়ার ঘোড়া বাংলার মধ্য দিয়ে ওক-ইয়োতে নিয়ে আসত। এরপর সেগুলোকে চালান করা হতো চীনে। ফুনান থেকে এসব ঘোড়া যেত জাভা ও বালিতে।
মালয় উপদ্বীপ ছড়িয়ে আছে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারজুড়ে— মিয়ানমারের দক্ষিণের ডায়োই থেকে দক্ষিণে জোহর বাহরু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে জাভা ও সুমাত্রার তীর ধরে বন্দর-রাজ্য গড়ে উঠতে থাকে। এসব বন্দরে স্থানীয় পণ্য কর্পূর, ঘারুউড. চন্দন, জায়ফল ও লবঙ্গের বাণিজ্য হতো। বণিকরা এসব বন্দর থেকে পণ্য ফুনানেও নিয়ে যেতেন। এসব পণ্যের পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভূমিকা রেখেছিল। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দূরের বিছিন্ন দ্বীপের মানুষের দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল।
এ অঞ্চলে বাণিজ্য গতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক রাজ্য, শাসনকেন্দ্র ভারতীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদান—লিপি, ভাষা, ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। গড়ে ওঠে একটি সাধারণ সংস্কৃতি, যার মাধ্যমে যোগাযোগ ও সহযোগিতা সহজ, ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পেরেছিল। এ পরিস্থিতি বাণিজ্যকে আরো শক্তিশালী করেছিল। স্থানীয় ধর্মের সঙ্গে এ অঞ্চলে ভারতীয় শৈব্য, বৈষ্ণব মতবাদ ও বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা শুরু হয়। বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষার বিস্তৃতি হয়। এর মাধ্যমে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব চীন ও জাপানের পণ্ডিতদের মধ্যে আদান-প্রদান শুরু হয়। প্রথম ৬০০ বছরে কোনো ঘষামাজা ছাড়াই বা সামান্য ঘষামাজার মধ্য দিয়ে ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকের বিস্তৃতি দেখা যায়।
এসএম রশিদ: লেখক





