এশিয়া মহাদেশের
ইতিহাসে অনেক
গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন
স্থলজ পরিমণ্ডলের
পরিবর্তে সামুদ্রিক
পরিমণ্ডলে সংঘটিত
হয়েছে। যেখানে
কৃষি, ধাতুবিদ্যা,
নগরায়ণ, সামুদ্রিক
প্রযুক্তি ও
ধর্মীয় জ্ঞানের
প্রসার স্থলমাধ্যমে
যা হতো
তার চেয়ে
বেশি হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে নগরায়ণ,
ধাতুবিদ্যা ও
ধর্মীয় সম্প্রসারণের
মতো ঘটনাগুলো
ভারত মহাসাগর
অঞ্চলে একই
সঙ্গে সংঘটিত
হয়েছিল। ফলে
পণ্য, চিন্তা
এবং মানুষ
দক্ষিণ এশিয়া
থেকে দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া ও
তার বাইরে
ছড়িয়ে পড়েছিল।
এটা পরিষ্কার
যে দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার মানুষ
এসব সামাজিক
পরিবর্তনে নিষ্ক্রিয়
ভূমিকা পালন
করেনি। আধুনিক
প্রত্নতত্ত্বের এ
বিষয়ে সন্দেহ
নেই যে
‘ভারতীয়করণ’
যুগের আগে
থেকেই এ
অঞ্চলে ধাতুবিদ্যা,
কৃষি এবং
আধা নগরায়ণে
সামাজিক জটিলতা
ও দেশীয়
ঐতিহ্য বিদ্যমান
ছিল। মোট
কথা দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া তথা
বর্তমান মালয়েশিয়া,
ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর,
ব্রুনাই দারুসসালাম
এবং পূর্ব
তিমুরের অধিবাসী
সম্প্রদায় প্রাচীন
আঞ্চলিক বাণিজ্যবলয়ে
সক্রিয়ভাবে যুক্ত
ছিল, যা
ভারত মহাসাগরকে
আজকের রূপ
দিয়েছে।
মালয়-পলিনেশিয়ান
ভাষাগুলোর কিছু
ঋণশব্দ পাওয়া
যায় নিকোবার
দ্বীপপুঞ্জ, ভারত,
শ্রীলংকা, পূর্ব
আফ্রিকা এবং
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের
ভাষায়। এ
শব্দগুলো সামুদ্রিক
প্রযুক্তি, কৃষি,
মসলা এবং
অন্যান্য বাণিজ্যিক
পণ্যের সঙ্গে
সম্পর্কযুক্ত। এ
পণ্যগুলোর জন্য
ব্যবহূত শব্দগুলো
বিশ্লেষণ করলে
দেখা যায়,
এগুলো দূর-দূরান্তে
ছড়িয়ে পড়া
নৃ-ভাষাতাত্ত্বিক
সম্প্রদায়ের পরিচয়
প্রকাশ করে,
যা শুধু
প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের
ওপর নির্ভর
করে নির্ধারণ
করা যায়
না। মালয়
ভাষা এখনকার
মতো তখনো
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার যোগাযোগের
গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম
ছিল। অনেক
সাংস্কৃতিক বিষয়
মালয়ভাষী লোকদের
মাধ্যমে ছড়িয়ে
পড়েছিল। অন্য
ভাষাভাষীরা এক্ষেত্রে
কম ভূমিকা
পালন করেছে।
তারা মূলত
মালয়ভাষীদের পৃষ্ঠপোষকতায়
সমুদ্র বাণিজ্য
করত। এভাবে
মালয়রা তাদের
নিকট ও
দূর প্রতিবেশীদের
ওপর প্রভাব
বিস্তার করতে
শুরু করে।
বলা হয়
যে উন্নত
প্রযুক্তিগত জ্ঞান,
নৃতাত্ত্বিক সংস্কৃতি
এবং সমুদ্র
বাণিজ্যে দক্ষতা
তাদের স্থলজ
প্রতিবেশীদের তুলনায়
সুবিধা প্রদান
করেছিল। ভাষাতাত্ত্বিক
উপাত্ত অনুসারে
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া ও
ওশেনিয়ায় নতুন
চিন্তা, কৌশল
ও ভাবনার
পরিচয় ঘটেছিল
মালয়ভাষী নাবিকদের
প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
বিশেষত দক্ষিণ
এশিয়া, চীন
ও অন্যান্য
অঞ্চলের সঙ্গে
যোগাযোগের ফলে
প্রাথমিক মালয়
রাষ্ট্রগুলো যথেষ্ট
পরিমাণে অর্থনৈতিক
উদ্বৃত্ততা অর্জন,
আরো ভালো
জাহাজ তৈরি,
প্রযুক্তিগত উন্নতি
এবং দক্ষ
কাঠামোগত বাণিজ্যভিত্তিক
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
করতে সক্ষম
হয়েছিল। তাদের
নতুন পাওয়া
আধিপত্য বৌদ্ধধর্ম
বা হিন্দুধর্মের
মাধ্যমে সংহত
হয়েছিল।
এ প্রাথমিক আঞ্চলিক বলয়ের বিপরীতে বিশ্বাস করা হয় যে প্রাচীন যুগে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ গাছ ও উদ্ভিদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে পরিচিত করা হয়েছিল এবং সেখান থেকে তা মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন চন্দন, সুপারি, গোলমরিচ, কলা, কমলালেবু, আদা ইত্যাদি। এ গাছগুলো ভারত মহাসাগর অঞ্চলের কৃষি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃশ্য পরিবর্তন করে দিয়েছিল। লাভজনক মসলা বাণিজ্যও এ অঞ্চলে ব্যাপক সক্রিয় ছিল। জনপ্রিয় কিছু মসলা ও সুগন্ধি যেমন লবঙ্গ, জায়ফল ও সুমাত্রার কর্পূর বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার বিচ্ছিন্ন কিছু জায়গায় একচেটিয়াভাবে উৎপাদন হতো। ফলস্বরূপ প্রয়োজন অনুপাতে এসব পণ্য পাওয়ার জন্য ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এক্ষেত্রেও মালয়ভাষী উপকূলের লোকজন কাজটি করত। এটা শুধু তাদের অর্থ, অবস্থান ও ভূস্বামীদের প্রতিপত্তিরই উন্নয়ন ঘটায়নি, আঞ্চলিক রাজ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিতেও ভূমিকা রেখেছে। মধ্যভাগে বাস করা মসলা ও রজনচাষীদেরও তাদের পণ্য পরিবহন ও বিদেশে রফতানির জন্য এসব উপকূলবাসী মালয় ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে হতো। শাসন ব্যবস্থা, ধর্ম ও অন্যান্য অভিজাত সংস্কৃতির ভারতীয় ধারণা এ অঞ্চলের মানুষ গ্রহণ করে নেয়ায় সাংস্কৃতিক অভিযোজনও সমানতালে হচ্ছিল। ইসলামের আগমনের পর এটি আরো বেশি গতিশীল হয়।
কর্পূরের ব্যবসা (মালয় ভাষায় যাকে কাপুর বলা হয়) এবং সুমাত্রার রজনের ব্যবসা ছিল ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে মূল্যবান সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবসা। ভাষাগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে রজনের মালয় প্রতিশব্দ ‘কামানিয়ান’ খামের ভাষায় আত্তীকৃত হয়েছে ‘কামনান’ হিসেবে, নিকোবারিজ ভাষায় হয়েছে ‘কামিনান’, তামিলে হয়েছে ‘কুমানচান’, দিভেহিতে হয়েছে ‘কুমানজানি’। এভাবেই আরো অনেক ভাষায় আত্তীকৃত হয়েছে। কখনো কখনো ভাষাগত পরিবর্তনের দিক স্পষ্ট থাকে না। আদার একটি সংস্কৃত প্রতিশব্দ ‘আর্দ্রাক’, যা এর মূল ‘আর্দ্রা’ থেকে এসেছে। শব্দটির মালয় উৎস জানা যায় না। এক্ষেত্রে আমরা দুটি বিষয় লক্ষ করতে পারি। ১. আদা একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্ভিদ। ২. সংস্কৃতের একটি অভ্যাস হলো অন্য ভাষার শব্দকে ভুল উচ্চারণ ধরে নিয়ে নিজের মতো উচ্চারণ ঠিক করা। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর এ সম্ভাবনা বের হয়ে আসে যে আদা অর্থে মধ্য ইন্দো-আর্য শব্দ ‘আলায়া’ মালয় শব্দ ‘হালিয়া’ থেকে এসেছে। এসব উদাহরণ ভাষার ধ্বনিগত ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণার গুরুত্ব তুলে ধরে। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব শব্দের গাঠনিক সাযুজ্য না দেখে ধ্বনিগত সাযুজ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। ভাষাগত অভিযোজন দানকারী ও গ্রহণকারী ভাষার মধ্যে সামাজিক-ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্কের কথা প্রকাশ করে। যদি একটি সম্প্রদায় নতুন একটি ধারণার জন্য একটি ঋণশব্দ গ্রহণ করে, তাহলে সেটি তাদের ভাষা থেকেই নেয়া হয়, যারা এটা তাদের কাছে পরিচিত করেছে। আরেকটি উদাহরণ দেখা যাক। মালয় ‘মাতারাই’ শব্দটি খুব সম্ভবত তামিল ‘মুত্তিরাই’ শব্দ থেকে এসেছে, যা আবার সংস্কৃত ‘মুদ্রা’ থেকে উদ্ভূত। এখানেও প্রত্যাশিত ধ্বনিগত পরিবর্তনই দেখা যাচ্ছে। ধাতুবিদ্যা, সামুদ্রিক প্রযুক্তির মতো বিশেষ ক্ষেত্রের শব্দে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অভিযোজন সম্ভবত এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে সাধারণ নিয়মে শিক্ষাদানের মতো হয়নি। ভারত মহাসাগরের মতো একটি আন্তঃসম্পর্কের জায়গায় মানুষ নিজেদের দক্ষতার উন্নয়নের জন্য তাদের প্রতিবেশী, পৃষ্ঠপোষক বা অনুগামীদের কাছ থেকে শিখেছে। এটা মনে রাখা দরকার যে মানুষ বহিরাগত সংস্কৃতি অনুকরণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, ফলে ভিন্ন সম্প্রদায় থেকে ঋণশব্দ গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
কিছু
ক্ষেত্রে ভাষাগত উপাত্ত সুসংহত করার জন্য অন্য ক্ষেত্র যথা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান প্রমাণ হিসেবে আলোচনা করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ফসল ও মসলার উপস্থিতির প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে এটা বোঝা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে মানুষ নিয়মিতভাবে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে সফলভাবে মসলা ও বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য করত। উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রভাবের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে। ভারতে মিয়ানমার ও থাই-মালয় উপদ্বীপ থেকে প্রাপ্ত টিনের প্রচুর চাহিদা ছিল। ভারতের দক্ষিণ উপকূল ও শ্রীলংকায় টিন মিশ্রিত ব্রোঞ্জের যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে। টিনের মালয় প্রতিশব্দ ‘তিমাহ’ সম্ভবত পরে সংস্কৃত ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় ‘তীব্র’ হিসেবে আত্মীকৃত হয়েছিল, যার অর্থ শক্তিশালী। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয় ভাষীদের বাণিজ্যিক মিথস্ক্রিয়ার কথা প্রমাণ করে। রফতানীকৃত আরেকটি পণ্য ছিল স্বর্ণ। এজন্য ভারতীয় আধা পৌরাণিক সাহিত্যে সুমাত্রাকে সুবর্ণভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কথা হলো সংস্কৃত সাহিত্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্ণনা অস্পষ্ট ও ভাসাভাসা আকারে রয়েছে। তাই প্রমাণাদির জন্য আমাদের আরো কিছু উপাত্ত খুঁজে বের করতে হয়। যদিও কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাক-আধুনিক ইতিহাস ও ভারত মহাসাগরে এর অবস্থান নিয়ে আমাদের সামগ্রিক ধারণার উন্নতি হয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্যে লবঙ্গ ও চন্দনের উপস্থিতি এবং একটি মিসরীয় মমিতে সুমাত্রার কর্পূরের অস্তিত্ব এদিকেই ইঙ্গিত করছে যে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের পর পশ্চিম অভিমুখে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছিল। আর যা-ই হোক, দক্ষিণ এশিয়াই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাবিকদের একমাত্র গন্তব্য ছিল না। অন্য কোনো পরিচিত সভ্য জাতি পৌঁছার বহু আগেই তারা মাদাগাস্কার দ্বীপে পৌঁছেছিল এবং সেখানে বাসস্থান গড়েছিল।
মাদাগাস্কার
ও মায়ট ছাড়া সব জায়গা থেকেই মালয়-পলিনেশিয়ান ভাষাভাষীরা হারিয়ে গিয়েছিল। এটা পরিষ্কার নয় যে প্রাচীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাবিকরা মালদ্বীপে নোঙর করে সজীব দ্রব্য নিয়ে মাদাগাস্কার যাত্রা করতেন নাকি মৌসুমি বাতাসের সাহায্য নিয়ে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূল দিয়ে যাত্রা করতেন। সমুদ্র উপকূল দিয়ে যাত্রা করার সুবিধা ও দক্ষিণ ভারতে মালয়-পলিনেশিয়ান ভাষাগত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও এটা ভাবা অবাস্তব যে প্রথম সরাসরি সমুদ্রযাত্রা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু হয়েছিল।
টম
হুগারভর্স্টের গবেষণা
অবলম্বনে
হাসান তানভীর: অনুবাদক





