রিচার্ড এম.
ইটন তার
প্রভাবশালী গ্রন্থ
দ্য
রাইজ অব
ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল
ফ্রন্টিয়ার ১৩০৪-১৭৬০-এ রাজা
গণেশ ও
তার পুত্র
যদু বা
পরবর্তীকালে জালালুদ্দিন
মেহাম্মদ শাহকে
নিয়ে বেশ
কয়েক পাতাজুড়ে
আলোচনা করেছেন।
ইটন লিখেছেন,
সিংহাসনে বসেই
এক জটিল
পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন।
একদিকে ছিলেন
বিদ্রোহী হিন্দুদের
কয়েকটি গোষ্ঠী,
অন্যদিকে শঙ্কাগ্রস্ত
মুসলিম অভিজাতরা।
এমন পরিস্থিতিতে
সিংহাসনে নিজের
অধিকারকে পোক্ত
করাটা তার
জন্য জরুরি
ছিল। এজন্য
তিনি শুরুতেই
পিতার ঐতিহ্যের
উল্টো দিকে
হাঁটতে শুরু
করেন। চিশতী
সুফিদের প্রভাবশালী
মহলের সঙ্গে
জালালুদ্দিন সুসম্পর্ক
গড়ে তোলেন।
পাণ্ডুয়ার চিশতী
তরিকার নেতৃস্থানীয়
সুফি শেখ
নূর কুতুব
আলমের অভিভাবকত্বে
নিজেকে সমর্পণ
করেন তিনি।
ইটন এখানে
একটি বিষয়
জোর দিয়েছেন
যে সেকালে
বাংলার ইসলামী
শাসকদের বৈধতা
তৈরির অন্যতম
উপাদান ছিল
কোনো বুজুর্গ
চিশতী সুফির
অনুমোদন। এ
রীতি সুলতানি
আমল থেকে
মোগল যুগের
বাংলায়ও অব্যাহত
ছিল।
অন্যদিকে গণেশের
পুত্র হিসেবে
জালালুদ্দিনের দায়
ছিল নিজেকে
খাঁটি মুসলমান
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করার। মুসলিম
অভিজাত ও
জনগণের মধ্যে
নিজের গ্রহণযোগ্যতা
নিশ্চিত করতে
প্রয়োজন ছিল
তাদের আস্থায়
আনা। জালালুদ্দিন
গ্রহণ করলেন
হানাফি মাযহাব।
পিতার ধ্বংস
করা মসজিদ
পুনর্নির্মাণ করলেন।
এ পর্যায়ে
অবশ্য এক
ফাঁকে স্মরণ
করা যায়
বাংলার ঐতিহাসিক
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র
মতামতকে। তিনি
যুক্তি দিয়েছেন
রাজা গণেশ
যদি মসজিদ
ধ্বংসের নীতি
গ্রহণ করতেন,
তাহলে পাণ্ডুয়ার
বিখ্যাত আদিনা
মসজিদ অবশ্যই
ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
কিন্তু তেমনটা
হয়নি এবং
অক্ষয়কুমারের মতে,
রাজা গণেশ
এসব কীর্তি
ধ্বংসে অগ্রসর
হননি।
ইটন জানাচ্ছেন,
১৪২৮-৩১
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে
জালালুদ্দিন পবিত্র
নগরী মক্কায়
একটি ধর্মীয়
শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণে
সহায়তা করেছিলেন।
একই সঙ্গে
মিসরের মামলুক
শাসক সুলতান
আশরাফ বারসবার
সঙ্গে সুসম্পর্ক
গড়ে তোলেন।
তাকে প্রচুর
উপহার পাঠিয়ে
জালালুদ্দিন মিসরের
সুলতানের তরফ
থেকে স্বীকৃতির
একটি পত্র
চেয়ে অনুরোধ
করেছিলেন। আব্বাসীয়
বংশের ধারা
বহনকারী মিসরীয়
সুলতান তখন
ইসলামী দুনিয়ার
একজন অন্যতম
শাসক। তাই
তার কাছ
থেকে কোনো
স্বীকৃতি মিললে
তা জালালুদ্দিনের
জন্য একটি
বড় সহায়ক
শক্তি হবে।
মামলুক সুলতান
বাংলার শাসকের
অনুরোধে সাড়া
দিয়ে তাকে
একটি সম্মানসূচক
আলখাল্লা ও
স্বীকৃতিপত্র পাঠিয়েছিলেন।
জালালুদ্দিন ধীরে
ধীরে নিজেকে
ইসলামী শাসন
ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ
করে তুলতে
চাইছিলেন। নিজের
মুদ্রায় তিনি
কলেমার বাণী
খোদাই করেন।
একসময় নিজেকে
‘খলিফাতুল্লাহ’
হিসেবে ঘোষণা
করেন। এমন
উপাধি ধারণ
যে রীতিমতো
চমকে দেয়ার
মতো ঘটনা
তা বলাই
বাহুল্য। ইটনও
তাই মনে
করেন, বিশেষত
একজন ধর্মান্তরিত
মুসলমানের জন্য
এমন পদক্ষেপকে
তিনি ‘মনুমেন্টাল
লিপ’ হিসেবে
উল্লেখ করেছেন।
শাসক হিসেবে
জালালুদ্দিন যে
দক্ষ, কৌশলী
ছিলেন তা
বোঝা যায়
ইটনের আলোচনা
থেকে। সুলতান
জালালুদ্দিন তার
রাজ্যের বিভিন্ন
অংশে বিভিন্ন
বার্তা দিতে
চেষ্টা করেছেন।
মুসলমানদের সামনে
তিনি আদর্শ
মুসলিম ব্যক্তিত্ব।
আবার সরাসরি
না হলেও
পরোক্ষভাবে হিন্দু
সংস্কৃতির উপাদান
কিছু মুদ্রায়
যোগ করে
তাদের সঙ্গেও
সম্পর্ককে ধরে
রাখতে সচেষ্ট
ছিলেন। অনেক
হিন্দু পণ্ডিতকে
তিনি সম্মানিত
করেছেন। এখানে
ইটন একটি
সূত্রের ইঙ্গিত
করেছেন, যা
গুরুত্ব বহন
করে। নিজের
কিছু মুদ্রায়
জালালুদ্দিন নিজেকে
‘বিন
কন্স রাও’
বা রাজা
গণেশের পুত্র
হিসেবে তুলে
ধরেছেন। এ
ঘটনার মূল্যায়ন
করে ইটন
বলেছেন, গণেশ
অজনপ্রিয় বা
খলচরিত্র হলে
এ রকমটা
করতে জালালুদ্দিন
সাহস পেতেন
না। জনগণের
একটি বড়
অংশের মধ্যে
যে রাজা
গণেশের গ্রহণযোগ্যতা
ছিল সেটা
এ থেকে
ধরে নেয়া
যায়।
জালালুদ্দিনের শাসনকালে
বাংলাই ছিল
সর্বজনের ভাষা।
এ থেকে
বোঝা যায়,
তখনকার মুসলিম
শাসকরা স্থানীয়
সংস্কৃতির সঙ্গে
ভালোই মিশে
গেছেন।
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
ও রাধাকুমুদ
মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষক
কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
তার
মধ্যযুগে বাঙ্গলা গ্রন্থে
জালালুদ্দিনের শাসনের
প্রশংসা করেছেন।
তিনি উল্লেখ
করেছেন, ‘যদুর
ধর্মান্তর যেরূপ
হউক, তিনি
আনুষ্ঠানিক ভক্ত-মুসলমান
হইয়াছিলেন। পাঁচ
সন্ধ্যা নামাজ
ও পীর
ফকিরকে দান
করা তাঁহার
নিত্যকর্ম ছিল।
তিনি অনেক
মসজিদ, সরাই,
স্নানাগার ও
আস্তানা নির্মাণ
করিয়া গৌড়
নগরীর সমৃদ্ধি
বর্দ্ধন করেন।
জালালী নামে
অভিহিত এই
সমস্ত কীর্তির
ধ্বংসাবশেষ অদ্যাপি
বর্তমান।’ জালালুদ্দিনের
শাসন ব্যবস্থার
প্রশংসা করেছেন
তিনি। লিখেছেন,
‘বলা
বাহুল্য, জালালুদ্দিন,
যদুনারায়ণ রাজা
গণেশের ন্যায়
হিন্দু-মুসলমান
প্রজাবর্গকে সমান
দেখিতেন, তাহার
রাজ্যকালে শান্তির
মধ্যে বাঙ্গলাদেশের
সর্বাঙ্গীণ উন্নতি
হইয়াছিল।’
রাজা গণেশ
ও জালালুদ্দিনকে
নিয়ে দুর্গাচন্দ্র
সান্যালের বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস
গ্রন্থে বেশ
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
পাওয়া যায়।
দুর্গাচন্দ্রের বইটি
প্রকাশিত হয়েছিল
১৩১৭ বঙ্গাব্দে।
বলে রাখা
ভালো, এটি
কোনো পেশাদার
ঐতিহাসিকের রচনা
নয়। গ্রন্থের
সব তথ্যের
প্রামাণিকতা নিয়েও
আছে সংশয়।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ
আবদুল করিম
তার বাংলার ইতিহাস:
সুলতানী আমল-এ
রাজা গণেশ
ও জালালুদ্দিনকে
নিয়ে আলোচনায়
দুর্গাচন্দ্রের গ্রন্থটির
কথা উল্লেখ
করেছেন। গ্রন্থের
অনেক তথ্য
যে প্রামাণ্য
নয় সে
বিষয়ে তিনি
আরেক প্রখ্যাত
প্রত্নতত্ত্ব ও
ইতিহাসবিদ আহমদ
হাসান দানীর
মন্তব্যও উদ্ধৃত
করেছেন। তবে
সেসবের সঙ্গে
আবদুল করিম
এটাও লিখেছেন
যে ‘সান্যালের
অপ্রামাণ্য কাহিনীর
ওপর নির্ভর
করিয়া কোনো
সিদ্ধান্তে আসা
যায় না।
তবে আমরা
শুধু বলিতে
চাই যে,
সান্যালের কাহিনীর
সঙ্গে রাজনৈতিক
ঘটনাবলীর আশ্চর্য
মিল আছে।
এমনও হইতে
পারে যে
রিয়াজ-উস-সলাতীনের
বিবরণের সঙ্গে
সান্যাল একটু
কল্পনা মিশ্রিত
করিয়া এই
কাহিনী রচনা
করিয়াছেন।’
দুর্গাচন্দ্র সান্যালের
সীমাবদ্ধতার বিষয়টি
মাথায় রেখেও
জালালুদ্দিনের জীবন
নিয়ে তার
উল্লেখ করা
কিছু তথ্য
কৌতূহল জাগায়।
বিশেষত তার
ব্যক্তিজীবন নিয়ে,
যা আবার
অন্য ঐতিহাসিকদের
রচনায় খুব
আলোচিত হয়
না। আমরা
এখানে নজর
দিতে চাই
জালালুদ্দিনের স্ত্রী
আসমানতারার বিষয়ে।
আবদুল করিম
অবশ্য জানাচ্ছেন,
এ নারীর
বিষয়ে দুর্গাচন্দ্র
ছাড়া আর
কোনো সূত্রে
উল্লেখ পাওয়া
যায় না।
একটু পেছনে
ফিরে জলালুদ্দিনের
পিতা রাজা
গণেশের সম্পর্কে
একটু শোনা
যাক। দুর্গাচন্দ্র
জানাচ্ছেন, যৌবনে
যদু মল্লযুদ্ধে
বেশ নাম
কামিয়েছিলেন এবং
তিনি ‘যদু
মল্ল’ নামে
পরিচিতি পান।
‘সেই
যদুমল্ল (যদ্মাল)
শব্দের অপভ্রংশে
ফিরিশতা তাহার
নাম চেত্মল
লিখিয়াছেন।’ তিনি
লিখেছেন, জালালুদ্দিনের
পিতা রাজা
গণেশ বিয়ে
করেছিলেন আজিম
শাহ ও
নসেরিৎ শাহর
বেগমদের। তারা
থাকতেন গৌড়ের
প্রাসাদে। রাজা
গণেশ যখন
এ গৌড়ে
অবস্থান করতেন
তখন তার
চালচলন ছিল
মুসলমান সংস্কৃতি
অনুসরণে। আবার
যখন পাণ্ডুয়ায়
যেতেন তখন
তিনি পরিবার
ও সমাজে
নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের
প্রতিরূপ। সঙ্গে
দুর্গাচরণ জানিয়েছেন,
‘গৌড়ে
বেগমদের নামে
অনেক দরগা
ও মসজিদ
দিয়াছিলেন এবং
পাণ্ডুয়া প্রভৃতি
স্থানে বহুতর
দেবমন্দির প্রতিষ্ঠা
করিয়াছিলেন; উভয়
ধর্মেরই উৎসাহ
দিতেন।’
রাজা গণেশ
যে নানা
রকম সমঝোতার
মাধ্যমে শাসন
টিকিয়ে রাখার
চেষ্টা করেছিলেন
এসব ঘটনা
কিংবা হয়তো
সে ইঙ্গিতই
বহন করে।
এমনকি মুসলিম
প্রভাবশালীদের সুনজর
পেতে তিনি
পুত্র যদুকে
ইসলাম ধর্মে
দীক্ষিত হতে
দিয়েছিলেন। অবশ্য
জৌনপুর থেকে
আক্রমণের আশঙ্কা
কমলে জালালুদ্দিনকে
আবার যদুতে
ফিরিয়ে আনার
চেষ্টা করেছিলেন।
এসব অতি
অবশ্যই ঐতিহাসিক
সত্য। জালালুদ্দিন
অবশ্য ইসলাম
ধর্ম ত্যাগে
সম্মত হননি।
এ জটিল
ইতিহাসে আবার
একটি বিশেষ
উপাদান যোগ
করেছেন দুর্গাচন্দ্র
সান্যাল। তার
মতে, জালালুদ্দিন
যে ইসলাম
ধর্ম ছেড়ে
আর হিন্দু
সমাজে ফিরলেন
না, তার
একটি কারণ
গৌড়ের রাজকুমারী,
আজিম শাহর
কন্যা আসমানতারা।
পিতা গণেশের
জীবদ্দশাতেই আসমানতারার
প্রতি আকর্ষিত
হয়েছিলেন যদু।
আসমানতারার মা
ছিলেন আবার
গণেশের উপপত্নী।
তাই গণেশ
নিজেও আসমানতারার
সঙ্গে মিশতে
যদুকে বাধা
দিতে পারেননি।
যদু শাসনভার
নেয়ার তিন
বছর পর
আসমানতারা গর্ভবতী
হন। এবার
তারা যদুকে
বিয়ে করার
জন্য চাপ
দিলেন। বললেন,
বিয়ে না
হলে তিনি
আত্মহত্যা করবেন।
প্রথমে যদু
চেষ্টা করেন
হিন্দুশাস্ত্র মেনে
তারাকে বিয়ে
করতে। কিন্তু
উপযুক্ত কোনো
পদ্ধতি খুঁজে
না পেয়ে
নিজেই ইসলাম
ধর্ম গ্রহণ
করেন এবং
জালালুদ্দিন নাম
নেন। পরবর্তী
সময়ে জালালুদ্দিন
ও আসমানতারার
জ্যেষ্ঠ পুত্র
আহমেদ শাহ
পিতার উত্তরাধিকারী
হয়েছিলেন।
আসমানতারাকে বিয়ে
করার আগে
জালালুদ্দিন তথা
যদুর এক
স্ত্রী ছিল
যার নাম
নবকিশোরী এবং
এ ঘরে
তার এক
পুত্রসন্তান ছিল
অনুপনারায়ণ। স্বামীর
নতুন বিয়ের
খবরে ভেঙে
পড়েছিলেন নবকিশোরী।
অনুপের ১৬
বছর বয়সে
তিনি তার
বিয়ে দেন
এবং সেই
বিয়েতে জালালুদ্দিনকে
নিমন্ত্রণও করেছিলেন।
তবে এ
নিমন্ত্রণের চিঠির
যে বিবরণ
দুর্গাচন্দ্র দিয়েছেন
তা যে
বেশ কল্পনামিশ্রিত
সেটা সাধারণ
চোখেই বোঝা
যায় এবং
এ চিঠির
কোনো সূত্রও
তিনি হাজির
করেননি।
শেষ জীবনে
স্বামীর বিরহে
নবকিশোরী কঠোর
ব্রত পালন
শুরু করেন
এবং এতেই
তিনি ইহজগত
ত্যাগ করেন।
পুত্রদের উত্তরাধিকারী
করা বিষয়ে
দুর্গাচরণ লিখেছেন,
‘জালালুদ্দিন
দেখিলেন যে,
অনুপ সাম্রাজ্যের
প্রকৃত উত্তরাধিকারী,
কিন্তু সে
নির্বিবাদে দখল
পাইবে না
এবং বিবাদ
করিলেও কৃতকার্য
হইবে না।
ভাবী গোলযোগ
নিবারণের জন্য
তিনি অসমানতারার
জ্যেষ্ঠ পুত্র
আহমেদ শাহকে
নিজ জীবমানে
সাম্রাজ্য দিলেন।
কিন্তু যাবতীয়
প্রধান সেনাপতি
ও কর্মচারীদিগকে
প্রতিজ্ঞা করাইলেন
যে, তাহারা
অনুপকে তাহার
দখলী আট
পরগণা হইতে
বঞ্চিত না
করে।’
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক





