মধ্যযুগের বাংলার প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসবিদ আবদুল করিম সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘জালাল-উদ-দীন একজন বিচক্ষণ শাসক ছিলেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া তাঁহার প্রথম জীবন অতিবাহিত হয় এবং রাজনৈতিক কোন্দলের শিকার হইয়া তিনি বারবার ধর্ম পরিবর্তন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। কিন্তু প্রথমবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে তিনি ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হইয়া পড়েন এবং ইসলামের প্রতি সেই অনুরাগ তাঁহার জীবনের শেষ পর্যন্ত বহাল ছিল। শাসক হিসেবে তিনি হিন্দু-মুসলমানের প্রতি সমভাবে ব্যবহার করিতেন, নিষ্ঠাবান মুসলমান হইলেও হিন্দু-ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তিনি অত্যাচার করিতেন না। শাসক হিসেবে তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার পরিচয় দেন, রাজ্য বিস্তার করিয়া তিনি শৌর্য্য-বীর্যের পরিচয় দেন এবং শাহরুখ, চীন সম্রাট, মিসরের খলিফা প্রমুখ রাজন্যবর্গের সহিত তিনি সদ্ভাব বজায় রাখেন।...নিঃসন্দেহে জালাল-উদ-দীন মোহাম্মদ শাহ একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনীতজ্ঞ এবং সুশাসক ছিলেন।’ এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি পাঠকের সামনে সুলতান জালালুদ্দিনের শাসনকালের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।

বাংলার ইতিহাসে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম চার দশক হলো রাজা গণেশের উত্থান-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং তদ্বীয় পুত্র যদু তথা জালালুদ্দিনের (দুই দফা: ৮১৮-১৯; ৮২১-৩৬ হিজরি/১৪১৫-১৬; ১৪১৮-৩২ খ্রিস্টাব্দ) সঙ্গে মহেন্দ্রদেব/দনুজমর্দ্দনদেবের ক্ষমতার অদল-বদলের ইতিহাস। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও জালালুদ্দিন কালক্রমে অবস্থান সুসংহত করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বর্তমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য সমসাময়িক দেশীয়-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা সাপেক্ষে জালালুদ্দিনের বহিঃরাষ্ট্রীয় নীতির ইতিহাস তুলে ধরা। এ সময়ের ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য আকর সূত্র হিসেবে মুদ্রা ও লেখমালা ব্যবহার করা হয়। লিখিত সূত্রাদির মধ্যে সমসাময়িক সুফিদের মাকতুবাত; পরবর্তী সময়ে রচিত মোল্লা তাকিয়ার বয়াজ, আবদুর রাজ্জাকের মতলা-ই-সাদাইন ও গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সালাতিনে এ-বিষয়ক তথ্যাদি রয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই মিং রাজবংশের নেতৃত্বে বাংলা ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উপকূলবর্তী রাজ্যগুলোতে চীন তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল। ফলে সমসাময়িক চৈনিক দরবারি দলিলাদি ও ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে বাংলার রাজদরবার, রীতিনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ছাড়াও চীন-বাংলা কূটনৈতিক সম্পর্কের নানা বিষয় জানা যায়। বাংলার সঙ্গে চীনের যোগাযোগ অতি সুপ্রাচীন হলেও পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম চার দশকে তা আন্তঃরাষ্ট্রীয় চরিত্র লাভ করে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় কূটনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। নিবন্ধের পরবর্তী অংশে সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদের একটি বিশেষ রীতির মুদ্রা—যা সিংহরীতির মুদ্রা হিসেবে পরিচিত—বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ সম্পর্কের প্রেক্ষাপট ও প্রকৃতি তুলে ধরা হবে। এক্ষেত্রে নতুন কোনো আকর সূত্র আবিষ্কার করা হয়নি; অধিকন্তু বিদ্যমান গবেষণার আলোকে অদ্যাবধি জানা সূত্রাদি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বিখ্যাত মুদ্রাতত্ত্ববিদ ঢাকা জাদুঘরের (বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর) কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী Coins and Chronology of the Early Independent Sultans of Bengal (১৯২১ সাল) জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহর একটি মুদ্রার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,

‘সর্বশেষ বর্ণনার জন্য একটি অসাধারণ মুদ্রা রেখেছি। এই মুদ্রার গৌণদিকে একটি বাঘ বা সিংহের আকৃতি অঙ্কিত হয়েছে। এটি কেবল ভারতের সমগ্র মুসলিম মুদ্রা সিরিজের নয় বরং এতে অতিরিক্ত হচ্ছে শাসকের পিতৃ পরিচয় যা আজ পর্যন্ত প্রাপ্ত জালালউদ্দিনের অন্য মুদ্রায় সতর্কভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।’

 ১.০৮ ইঞ্চি পরিমাপের এবং ১৫৯ গ্রেন ওজনের মুদ্রাটিতে কোনো টাঁকশালের নাম বা তারিখ উল্লেখ নেই। মুদ্রাটির মুখ্যদিকে রশ্মিযুক্ত বৃত্তের মাঝে মুদ্রগৎ যা অন্য একটি বৃত্তবেষ্টিত। রশ্মিসৃষ্ট প্রতিটি ত্রিকোণের কেন্দ্রস্থলে একটি লিপি। ভট্টশালী মুদ্রাটির মুখ্যদিকের লিপির পাঠোদ্ধার করেছিলেন: ‘জালাল আল-দুনিয়া ওয়াল দিন আবু আল-মুজাফ্ফর মোহাম্মদ শাহ আল-সুলতান’। গৌণদিকের রৈখিক এবং বাকসহযোগে তৈরি ধাবমান সিংহের প্রতিকৃতির উপরে থাকা লিপির পাঠ ‘বিন কান্স শাহ’ সম্পর্কে তিনি নিজেই সন্দিহান ছিলেন এবং মন্তব্য করেন: ‘পাঠটি খুব একটা সন্তোষজনক নয়...এ বিষয়ে আরো ভালো কোনো পরামর্শ পেলে আমি খুব খুশি হবো।’ তার অনুমান ছিল ত্রিপুরার মুদ্রার অনুকরণে জালালুদ্দিন এই ‘সিংহ প্রতীক’ সংবলিত মুদ্রা জারি করেন। আবদুল করিম ১৯৬০ সালে প্রকাশিত Corpus of the Muslim Coins of Bengal (Down to A.D. 1538) গ্রন্থেও মুদ্রাটির উল্লেখ করেন এবং ভট্টশালীর পাঠকেই গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে ভারতীয় মুদ্রাবিদ জিএস ফরিদ তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অনুরূপ একটি মুদ্রা প্রকাশ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি একই শাসকের সিংহ প্রতিকৃতি সংবলিত ১০৫ গ্রাম ওজন ও ৬.৭ সেন্টিমিটার প্রশস্ত একটি স্মারক রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে জার্নাল অব দ্য নিউমিসম্যাটিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ায় একটি নিবন্ধ লেখেন। ১৪২১ সালে পাণ্ডুয়ার টাঁকশাল থেকে জারীকৃত দশ টঙ্কার (রৌপ্যমুদ্রা) এ মুদ্রার গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং সিংহ প্রতিকৃতি বিশ্লেষণ করে ফরিদের ব্যাখ্যা হলো ভারতীয় সুলতানি যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী ও বড় এ মুদ্রা চৈনিক কূটনীতিকদের মাধ্যমে চীন সম্রাটকে উপহার দেয়ার জন্য বানানো হয়েছিল। এ বিশেষ ধরনের মুদ্রাগুলো পরবর্তী সময়ে জালালুদ্দিনের ‘সিংহরীতির মুদ্রা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।


জালালুদ্দিনের মুদ্রায় উপস্থাপিত সিংহের প্রতিকৃতির বিশ্লেষণপূর্বক দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ আহমদ হাসান দানীর ব্যাখ্যাটিও অনেকটা ভট্টশালীর মতামতের কাছাকাছি। দানীর মতে, ত্রিপুরা রাজ্যের মুদ্রায় সিংহ প্রতিকৃতি ব্যবহূত হতো। সম্ভবত জালালুদ্দিন ত্রিপুরা রাজ্য বা এর কিয়দংশ জয় করেছিলেন এবং সেখানকার জনগণের সমর্থন আদায়ের জন্য অনুরূপ মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ত্রিপুরা রাজ্যের স্বাধীন শাসকদের মুদ্রায় সিংহের প্রতীকের ব্যবহার ১৪৬৪ সালের পর থেকে; অন্য কথায় জালালুদ্দিনের মৃত্যুর তিন দশক পরে। ফলে নলিনীকান্ত ভট্টশালী ও আহমদ হাসান দানীর ব্যাখ্যার চেয়ে জিএস ফরিদের ব্যাখ্যাই আমাদের কাছে অধিক গ্রহণীয়।

বাংলার সুলতান কর্তৃক চৈনিক কূটনৈতিক মিশনের সদস্য এবং চীন সম্রাটের জন্য বিভিন্ন উপহার প্রদানের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় চৈনিক রাষ্ট্রদূত ফেইসিনের লেখা শিং-ছা-শ্যং-লান গ্রন্থে। তিনি বাংলার রাজদরবারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখেন:

‘রাজা (চীন) সম্রাটের প্রতিনিধিদের এক ভোজসভায় আপ্যায়িত করলেন এবং আমাদের সৈন্যদের অনেক জিনিস উপহার দিলেন।...ভোজসভা শেষ হতে রাজা (চীনা) রাজপ্রতিনিধিদের সোনার বাটি, সোনার কোটিবন্ধ, সোনার কুঁজো আর সোনার পেয়ালা উপহার দিলেন। প্রতিনিধিদের যাঁরা সহকারী, তাঁরা সবাই ঐ সমস্ত জিনিসই পেলেন, তবে সেগুলি রূপার তৈরি। নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা প্রত্যেকে পেল একটি সোনার ঘণ্টা এবং এক ধরনের লম্বা সাদা রেশমী পোশাক। সৈন্যরা সবাই রূপার টাকা পেল।...এরপর রাজা সোনার তৈরী একটি আধারে রক্ষিত এক স্মারক লিপি (চীন) সম্রাটকে দেবার জন্য সমর্পণ করলেন। স্মারকলিপিটি সোনার পাতের উপর লেখা হয়েছিল। চীনা রাজপ্রতিনিধিরা যথোচিত সম্মানের সঙ্গে তাঁর কাছ থেকে (চীন) সম্রাটের উদ্দেশ্যে প্রেরিত আরো অনেক উপহার সামগ্রী সমেত এই স্মারকলিপি গ্রহণ করলেন।’

চীন সম্রাট য়ুং-লো (১৪০৩-২৪) তার রাজত্বের চতুর্দশ বর্ষে একটি কূটনৈতিক মিশন বাংলার সুলতানের দরবারে পাঠিয়েছিলেন। হৌ-শিয়েনের নেতৃত্বাধীন এ দলের অন্যতম সদস্য ছিল ফেইসিন। দলটি ১৪১৬ সালের মে-জুনে বাংলার রাজধানী পাণ্ডুয়ায় পৌঁছেছিল। আমরা নিশ্চিত সে সময় বাংলার সুলতান ছিলেন জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ। সম্রাট য়ুং-লোর সময়ে মিং রাজবংশের কূটনৈতিক কর্মপরিধির চূড়ান্ত বিস্তৃতি ঘটে এবং ১৪৩৯ সালের পর চৈনিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড হঠাৎ স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৪০৪-৩৯ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছরে বাংলা থেকে ১৪টি মিশন চীনে এবং চীন থেকে চারটি মিশন বাংলায় এসেছিল। চৈনিক সূত্রাদির বর্ণনা অনুযায়ী ১৪২০ সালের তৃতীয় মিশনটি পাঠানো হয়েছিল বাংলার সুলতানের ক্রমাগত অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। বাংলার সুলতানের অভিযোগটি ছিল পার্শ্ববর্তী জৌনপুর রাজ্যের সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে নিয়ে। মিং রাজবংশীয় দরবারি ইতিহাস সিং-শর্-এর ৩২৬তম অধ্যায়ে বাংলার সুলতানের অভিযোগটি সম্পর্কে বলা হয়েছে:

‘সেস-ন-পু-আড় (জৌনপুর) বাংলার পশ্চিমে অবস্থিত। একে মধ্য ভারতও বলা হয়। প্রাচীন যুগে এখানে বুদ্ধ থাকতেন। য়ুং-লোর রাজত্বের দশম বর্ষে (১৪১২ খ্রীঃ) তাদের রাজা য়ি-পু-লা (ইব্রা-ইব্রাহীম শর্কী)-র কাছে...একজন দূত পাঠানো হয়। য়ুং-লোর রাজত্বের অষ্টাদশ বর্ষে (১৪২০ খ্রীঃ) বাংলার রাজদূত (চীনের) সম্রাটকে জানান যে, তাদের (জৌনপুরের) রাজা কয়েকবার বাংলা আক্রমণ করেছেন।...হৌ-শিয়েনকে তখন (চীন)-সম্রাটের আদেশ দিয়ে পাঠানো হল তাঁকে (জৌনপুরের রাজাকে) বলবার জন্য যে, প্রতিবেশীর প্রতি ভাল ব্যবহার করেই তিনি নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে পারেন। তাঁকে রেশম ও টাকাকড়ি উপহার দেওয়া হলো।’

ইতিহাসবিদ সুখময় মুখোপাধ্যায়ের অনুমান, ‘সম্ভবত ১৪১৫ ও ১৪২০ খ্রীষ্টাব্দ এই দুবারের আক্রমণের কথাই বোঝাচ্ছে।’ মিং ইতিহাসের ৩৪০ নং অধ্যায়ে বিষয়টি অন্যভাবে বলা হয়েছে:

‘য়ুং-লোর রাজত্বের অষ্টাদশ বর্ষের (১৪২০ খ্রীঃ) নবম মাসে (চীন)-সম্রাট হৌ-শিয়েনকে আদেশ দিলেন, (জৌনপুরে) গিয়ে তাঁদের (জৌনপুর ও বাংলার) রাজাদের শান্ত করতে। (জৌনপুরের রাজাকে) সোনা এবং টাককড়ি দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করা হলো।’

ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্য হলো, ১৪২০ সালে জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কি পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেছিলেন। বাংলা ও জৈনপুরের মধ্যকার এ ক্রমাগত যুদ্ধ অথবা জৌনপুর থেকে বাংলা অভিমুখে সামরিক অভিযানের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল জালালুদ্দিনের পিতা রাজা গণেশের সময় থেকে। বাংলার সুফি শেখ নূর কুতুব আলম এবং জৌনপুরের দরবেশ সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গির সিমনানির একাধিক মাকতুবে হিন্দু রাজা কানেসর (গণেশ) বাংলা সালতানাত দখলের প্রতিক্রিয়ায় সুফিদের অনুরোধে জৌনপুরের সুলতানের বাংলা আক্রমণের জন্য রওনা হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়।

নূর কুতুব আলম বাংলায় হিন্দু জমিদারের ক্ষমতা দখলের বেদনা তার জনৈক প্রিয় ব্যক্তিকে জানিয়ে চিঠিতে লেখেন,

‘হাজার হাজার ধার্মিক শ্রেষ্ঠ ও পণ্ডিত শ্রেষ্ঠ এবং দরবেশ ও ভক্ত আজ একজন বিধর্মীর অধীনস্থ হয়েছে।...ইসলামের রাজত্ব আজ তাদের হাতে গিয়ে পড়েছে যারা অন্যদের ভগবানের সঙ্গে একাসনে বসায়।...কাফেরী প্রাধান্য লাভ করেছে এবং ইসলামের রাজ্য ধ্বংস হয়েছে।...হায়! ও! কি যন্ত্রণাদায়ক-হায় কি দুঃখ। ইসলামের সূর্য আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে এবং ধর্মের চাঁদ রাহুগ্রস্ত হয়েছে।’

নূর কুতুব আলমের চিঠিতে রণিত হাহাকার মূলত বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে রাজা গণেশের অধিপত্যের ফলে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিমের দুঃখভারাক্রান্ত মনেরই প্রতিক্রিয়া। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে বাংলা-জৌনপুরের সামরিক উত্তেজনার সংবাদ পাওয়া যায় সুফি সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গির সিমনানির তিনটি মাকতুবে। একটি চিঠির ভাষ্যে স্পষ্ট যে নূর কুতুব আলমের চিঠি পেয়ে আশরাফ জাহাঙ্গির সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে বাংলা আক্রমণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আরেকটি চিঠিতে তিনি বাংলার আরেকজন সুফি শেখ হোসেন ধোক্করপোশকে ইব্রাহিম শর্কির আসন্ন বাংলা আক্রমণের সংবাদ জানিয়ে লেখেন, ‘আপনাদের সাহায্য করার জন্য রাজার সৈন্যবাহিনী এখান থেকে যাচ্ছে; এর ফল শীঘ্রই বোঝা যাবে।’ স্বয়ং নূর কুতুব আলমকে লেখা তৃতীয় চিঠিটির ভাষ্য ছিল:

‘সুলতানের ধ্বজা এবং তার সৈন্যবাহিনী ইতিমধ্যেই ঐ প্রিয়জনের দেশের [বাংলা] দিকে রওনা হয়েছে। সুলতান তাঁর অসংখ্য সৈন্যবাহিনী দ্বারা কাফেরদের তাড়াতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আশা করা যাচ্ছে যে, মুসলমানরা কান্স রায় এবং তার লোকদের কবল থেকে মুক্তি পাবে।’

এ ঘটনার প্রায় তিন শতাব্দী পরে লেখা রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ইব্রাহিমের আক্রমণে ভয় পেয়ে রাজা গণেশ ছেলে যদুকে নূর কুতুব আলমের কাছে নিয়ে যান এবং সুফি যদুকে ইসলাম ধর্মে দিক্ষীত করেন। সুফির মধ্যস্থতায় জৌনপুরের বাহিনী ফিরে যাওয়ার পর পরই গণেশ তার ছেলেকে পুনরায় হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করেন। উপর্যুক্ত বর্ণনায় এটি স্পষ্ট যে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে একাধিকবার জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কি বাংলা আক্রমণ করেছিলেন এবং জালালুদ্দিন সেটিই চীন সম্রাটকে জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, আন্নাম (১৪০৪-২৮), পালেম্ব (১৪০৫-০৭), শ্রীলংকা (১৪১১) ও সেমুদেরায় (১৪১৫) যে ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ চীন করেছিল বাংলায় সে রকম কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের তথ্য বা উল্লেখ সমসাময়িক নথিতে নেই। ইতিহাসবিদ হরপ্রসাদ রায় Trade and Trade Routes Between India and China c. 140 B.C.-A.D. 500 (২০০৩) গ্রন্থে এর পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেন। প্রথমত, বাংলা ও জৌনপুর ছিল চীন সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমার বাইরের দুটি রাজ্য; দ্বিতীয়ত, বিশাল চৈনিক জাঙ্ক (নৌকা) চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করত এবং সেখান থেকে ছোট ছোট নৌকায় বাংলার অভ্যন্তরে যেতে হতো। তৃতীয়ত, বাংলা-চীন বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলার আগ্রহই বেশি ছিল। কেননা বাংলা থেকে চীনে প্রেরিত মিশন সংখ্যা ছিল ১৪ এবং অন্যদিকে চীনের প্রেরিত কূটনৈতিক দলের সংখ্যা মাত্র চার। তবে চৈনিক সম্রাটের কূটনৈতিক চালে দেয়া ধমকে জৌনপুরের সুলতান ক্ষান্ত হননি। এর প্রমাণ পাওয়া যায় মতলা-ই-সাদাইন গ্রন্থে। পরবর্তী সময়ে পারস্যের সমরখন্দের শাসক তৈমুর লঙের ছেলে শাহ রুখ বাহাদুরের কাছেও বাংলার কূটনৈতিক মিশন অনুরূপ আরজি নিয়ে গিয়েছিল। রায়ের গবেষণা অনুযায়ী জালালুদ্দিনের রাজত্বকালে ১৪১৮, ১৪২০, ১৪২১, ১৪২৩ ও ১৪২৯ সালে মোট পাঁচটি দল বাংলা থেকে চীনে গিয়েছিল। ১৪২০ সালে বাংলার মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সিদি মোহাম্মদ এবং ১৪২১ সালে উসমান।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর মহকুমার প্রধান শহরের কাছাকাছি একটি গ্রামে ১৯৮১ সালে বাংলার সুলতানদের একটি মুদ্রাভাণ্ডারে প্রাপ্ত ১৩৫টির মধ্যে ৬৬টি ছিল জালালুদ্দিনের মুদ্রা। মুদ্রাবিদ সুতপা সিনহা এ ভাণ্ডারে প্রাপ্ত সিংহরীতির একমাত্র মুদ্রাটির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ মুদ্রাটিতেও সিংহের উপরে তুগরা রীতিতে বিন কান্স শাহ কথাটি লেখা রয়েছে। সিনহার বক্তব্য হলো, ইসলামের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জালালুদ্দিনের মতো ধর্মপ্রাণ মুসলিম (যিনি খলিফতুল্লাহর মতো সম্মানজনক উপাধি গ্রহণ করেছিলেন) কর্তৃক মুদ্রায় সিংহ প্রতীক ব্যবহার পণ্ডিতদের মধ্যে মতভিন্নতার জন্ম দিয়েছে। জালালুদ্দিনের মুদ্রায় বিশেষ ভঙ্গিমায় সিংহের উপস্থাপন খুব সম্ভবত চৈনিক সম্রাট ও তার মধ্যকার সম্পর্কের ফসল। চৈনিক প্রতিনিধি দলের বাংলায় আগমণের তারিখ এবং এ বিশেষ স্মারক মুদ্রাটির তারিখ একই হওয়ায় প্রস্তাবনাটি ফেলে দেয়া যায় না।

রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন সিংহরীতির মুদ্রা প্রচলনের কারণ হিসেবে বাংলার সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কর চেয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্ম-সাংস্কৃতিক মানসিকতার প্রতি সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, ১৪১৬-১৮ সালে দনুজমর্দ্দনদেব ও মহেন্দ্রদেবের সময় চণ্ডী দেবীর পূজার পুনঃপ্রবর্তন বাংলায় হয়। তাই পরবর্তী সময়ে জালালুদ্দিন সিংহবাহন সংবলিত এই দেবীর পূজারিদের আকৃষ্ট করার জন্য সিংহের প্রতিকৃতি সংবলিত মুদ্রা জারি করেছিলেন। মুদ্রায় পরিচয় তাকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর কাছে সার্বভৌম রাজা হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করে। অন্যদিকে দেবী চণ্ডী বা দুর্গার নাম না নিয়ে কেবল বাহনের চিত্র দিয়ে দেবীর পূজারিদের সঙ্গে তিনি সংযোগ স্থাপন পথকে সুগম করেন। কিন্তু ইটন তার প্রস্তাবনার পক্ষে মুদ্রায় উপস্থাপিত সিংহচিত্র এবং দেবী দুর্গার বাহন সিংহের সাযুজ্যের কোনো মূর্তিতাত্ত্বিক আলোচনা করেননি।

স্ট্যান গোরন ও জেপি গোয়েনকা তাদের The Coins of the Indian Sultanates, Covering the Area of Present-day India, Pakistan and Bangladesh (২০০১) গ্রন্থে জালালুদ্দিনের সিংহ প্রতীক সংবলিত ছয়টি মুদ্রা উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে প্রথমটি (বি-৩৪০) জিএস ফরিদের প্রকাশিত স্মারক মুদ্রা। দ্বিতীয়টি (বি-৩৪১) দুই তঙ্কা কিন্তু তারিখ ও টাঁকশাল উল্লেখ নেই। মুদ্রাটির মুখ্যদিকে জালাল আল-দুনিয়া ওয়াল দিন আবুল মোজাফ্ফর মোহাম্মদ শাহ আল সুলতান এবং গৌণদিকে সিংহের প্রতিকৃতির উপরে সংক্ষিপ্ত লিপি। নকশা ও আকার বিবেচনায় চতুর্থ মুদ্রাটি (বি-৩৪১) ব্যতিক্রমী। তারিখ ও টাঁকশাল উল্লেখ না থাকা ষড়ভুজাকৃতির এ মুদ্রার মুখ্যদিকে ষড়ভুজ সীমান্ত রেখার মধ্যে শাসকের নাম এবং গৌণদিকের সিংহ মূর্তিটি ২৪টি অর্ধবৃত্তাকার শেকলের রেখাচিত্রের মধ্যে উপস্থাপিত। মুদ্রাবিদ জন এস ডয়েল সিংহের পায়ের নিচের লিপির পাঠ প্রস্তাবনা করেছেন আরবি হরফে ‘জুলুস ৮’ বা জালালুদ্দিনের অষ্টম রাজ্যাঙ্ক তথা ৮২৪ হিজরি। মো. শরিফুল ইসলাম ও মো. আব্দুর রহিম রচিত The Sultanate Period Coins of Bengal Focus on the Epigraphic Studies, Calligraphy and History (২০১৯) গ্রন্থে জালালুদ্দিনের মুদ্রায় সিংহের উপরের লিপিটির পাঠ করেন: নর কিসান অবতার (নর কৃষ্ণ অবতার)। ইসলামের মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগণের সমর্থন অর্জনের জন্যই এ ধরনের মুদ্রা জারি করা হয়েছিল। জালালুদ্দিনের সিংহরীতির মুদ্রার সংখ্যা অন্যান্য রীতির মুদ্রার তুলনায় অনেক কম এবং অধিকাংশই তারিখ বিহীন। ১৯ তঙ্কাটির তারিখ ৮২৪ হিজরি এবং এটি জালালুদ্দিনের দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আরোহণের প্রথমদিকের মুদ্রা। উল্লেখ্য, রাজা গণেশ বাংলা সালতানাতে নিজ প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য যদুকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন এবং জালালুদ্দিন আর হিন্দু ধর্মে ফিরে যাননি। পরবর্তী সময়ে রাজা গণেশ কিংবা তদীয় পুত্র মহেন্দ্রদেব/দনুজমর্দ্দনদেব জালালুদ্দিনকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ৮২১ হিজরিতে জালালুদ্দিন আবার নিজেকে বাংলার সুলতান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ইসলামের প্রস্তাবনা হলো, বাবা রাজা গণেশ/ভাই মহেন্দ্রদেব ও দনুজমর্দ্দনদেবের বিবাদ এবং হিন্দু ধর্মে ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে পরিবারের হিন্দু সদস্যরা, আত্মীয়স্বজন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে জালালুদ্দিনের সম্পর্কের পতন হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর জালালুদ্দিনের রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বিদ্রোহী মনোভাব ছিল এবং রাজধানীতে অভিজাত মুসলিমরা ছিল সতর্ক অবস্থানে। এমতাবস্থায় উভয় গোষ্ঠীর সমর্থনই তার দরকার ছিল। ফলে জালালুদ্দিন রাজধানীর অভিজাত মুসলিমদের সমর্থন আদায়ের জন্য তত্কালীন মামলুক খলিফা মিশরের সুলতান আশরাফ বারসবারের কাছে খিলাত লাভের জন্য দূত পাঠিয়েছিলেন। জবাবে সুলতান আশরাফ জালালুদ্দিনের শাসন অনুমোদন দিয়ে চিঠি লেখেন এবং খিলাত প্রেরণ করেন। অন্যদিকে জালালুদ্দিন বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন হিন্দু আত্মীয় এবং জনগণের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে মুদ্রায় নিজেকে ‘নরকৃষ্ণ অবতার’ পরিচয় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবী দুর্গার বাহন সিংহ প্রতিকৃতি রাখেন।

আমাদের অনুমান, জালালুদ্দিনের এ মুদ্রাগুলো ছিল বহির্বিশ্বের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি উপাদান বা মাধ্যম। নিজ পরিচয় সত্তার সব উপাদানকে একসঙ্গে করে জালালুদ্দিন চৈনিক সম্রাট ও চৈনিক কূটনৈতিক মিশনের সদস্যদের উপহার হিসেবে এ স্মারক মুদ্রাগুলো বানিয়েছিলেন। চৈনিক কূটনৈতিক দলের সদস্যরা যেন বাংলার অভ্যন্তরে এবং বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা এলাকাগুলোতে মুদ্রাগুলো ব্যবহার করতে পারেন সেজন্য হিন্দু-মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মানসজগতে পরিচিত উপাদান ও প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। চৈনিক দলের আসার সুনির্ধারিত তারিখ না থাকায় কিছু মুদ্রা বানানো হয়েছিল তারিখ ছাড়া আর কিছু বানানো হয়েছিল নির্দিষ্ট ঘটনাকে সামনে রেখে। তবে ১০ টঙ্কার মুদ্রাটিতে বিশেষভাবে তারিখ উল্লেখের কারণ হলো সম্ভবত সে বছরই জালালুদ্দিন জৌনপুরের সুলতানের আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন এবং চৈনিক কূটনৈতিক মিশনটি একই বছরে তার দরাবরে এসে পৌঁছেছিলেন। জালালুদ্দিনের সিংহরীতির মুদ্রার সংখ্যা প্রাপ্ত অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় অত্যন্ত কম। যেমন ভট্টশালী রূপগঞ্জ মুদ্রাভাণ্ডারে ২৬ মুদ্রার মধ্যে একটি মাত্র সিংহরীতির মুদ্রার উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মুদ্রাটির অস্বাভাবিক ওজন ও আকার এবং মুদ্রামান ১০—বিষয়গুলো আমাদের অনুমানকে আরো জোরালো করে তুলেছে।

জালালুদ্দিন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে চীনের পাশাপাশি সমকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। মিসরীয় খলিফার খিলাত লাভ এবং সমরখন্দের শাহ রুখের দরবারে সাহায্য চেয়ে মিশন পাঠানোর উল্লেখ আমরা আগেই করেছি। তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রাণের শহর মক্কা নগরীতে মাদ্রাসা স্থাপন করেন। এ মাদ্রাসার ব্যয় নির্বাহ ও মক্কার জনসাধারণকে দান করার জন্য প্রচুর অর্থও দিয়েছিলেন।

পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রাজা গণেশের উত্থান এবং বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজবংশকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল, পরবর্তীতে পুত্র যদুকে ধর্মান্তরিত করে জৌনপুরের আক্রমণকে সাময়িক রুখে দেয়া, মহেন্দ্রদেব ও দনুজমর্দ্দনদেবের সংক্ষিপ্ত শাসন এবং পুনরায় জালালুদ্দিনের ক্ষমতা দখল বাংলার স্থানীয় রাজনীতির বহুমাত্রিকতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। ইলিয়াস শাহি বংশের সময় থেকেই বাংলার সঙ্গে বহির্বিশ্বের কূটনৈতিক আদান-প্রদান শুরু হয়। জালালুদ্দিনের সময়েও পারস্য, মিসর বা আরবের পাশাপাশি চৈনিক রাজদরবারের সঙ্গেও বাংলার সুলতানদের যোগাযোগ চলমান থাকে। প্রজ্ঞাবান জালালুদ্দিন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে পরিচয়ের বহুমাত্রিক উপাদান ও জনগণের সমর্থন—এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় করেন স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতিতে—এরই বহিঃপ্রকাশ সিংহরীতির মুদ্রা ।

 

*(চৈনিক দরবারি দলিলাদি ও ইতিহাস অধ্যায়গুলোর অনুবাদ সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস ১২০৪-১৫৭৬ গ্রন্থ থেকে নেয়া)।

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

করিম, আবদুল, বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৭৭।

ভট্টশালী, নলিনীকান্ত, বাংলার প্রাথমিক যুগের স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রা ও কালানুক্রম, (মো. রেজাউল করিম অনূদিত), ঢাকা: ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ, ১৯৯৭।

মুখোপাধ্যায়, সুখময়, বাংলার ইতিহাস ১২০৪-১৫৭৬, ঢাকা: খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ২০০০।

Bhattasali, N. K., Coins and Chronology of the Early Independent Sultans of Bengal, Cambridge: W. Heffers and Sons, 1922, reprinted in New Delhi: Indological Book Corporation, 1976.

Eaton, Richard M., The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1204-1760), Berkeley, Los Angeles and London: University of California Press, 1993.

Goron, Stan and J.P. Goenka, The Coins of the Indian Sultanates, New Delhi: Munshiram and Monoharlal, 2001.

Islam Md. Shariful and Muhammad Abdur Rahman, The Sultanate Period Coins of Bengal Focus on the Epigraphic Studies, Calligraphy and History, Dhaka: Black N Orange, 2020.

Ray, Haraprashad, Trade and Trade Routes Between India and China c. 140 B.C.-A.D. 1500, Kolkata: Progressive Publishers, 2003.

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

sahidul.hasan@du.ac.bd