জালালউদ্দীন আবুল মুজঃফর মহম্মদ শাহ

রাজা গণেশের মৃত্যুর পর তত্পুত্র যদু সিংহাসনে আরোহণ করেন। ফিরিস্তা লিখিয়াছেন, ‘‘ইহার নাম জিতমল্ল” (জাঠমল)। দিনাজপুরের কিছু পূর্ব্বে জিতমলপুর নামক স্থান দেখা যায়, তাহাতে বোধ হয়, জিতমল্লই ইহার প্রকৃত নাম। ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ট বলেন, জিতমল্ল, রাজা গণেশের এক মুসলমান পত্নী বা উপপত্নীর গর্ভজাত; তজ্জন্য মুসলমানেরা জিতমল্লের পক্ষ অবলম্বন করে। রাজা গণেশের হিন্দু-পত্নী-গর্ভজাত সন্তানেরা সাহায্যের অভাবে রাজ্যাধিকার করিতে পারেন নাই। জিতমল্ল পিতার জীবদ্দশায়, “রিয়াজ-উস-সলাতিন’’ কার বলেন, রাজা গণেশের অনুমত্যানুসারে তাহার দ্বাদশ বর্ষ বয়স্ক পুত্র, যদু নুর কুতুব-আলম কর্তৃক মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হন।*

গণেশের যাদুমণি (যদু) বোধ হয় মধ্যে মধ্যে মুসলমান হইতে যাইত। একালেও কেহ কেহ বাপ-মার নিকট হইতে পলাইয়া গিয়া খৃষ্টান হইয়া থাকে। তিনি পুত্রকে ধরিয়া আনিতেন। দুই-একবার প্রায়শ্চিত্ত করাইয়াছিলেন,—একবার নাকি সোণার ধেনু প্রস্তুত করিয়া, যদু বা যাদুমণিকে তাহার মধ্য দিয়া টানিয়া বাহির করেন। স্বর্ণ-ধেনু ব্রাহ্মণদিগকে দান করা হয়। রাজা গণেশের জীবন সুখের ছিল না—পুত্রটিকে মুসলমান হওয়ার জন্য নগরের মুসলমান-প্রধানেরা উত্তেজিত করিত। পুত্রটিও মধ্যে মধ্যে মুসলমানদের আড্ডায় যাইত; বাধ্য হইয়া গণেশকে উত্তেজনাকারী মুসলমানদের সঙ্গে বিবাদ করিতে হইত। যাহা হউক, বোধ হয় যাদুমণি, পিতার মৃত্যুর পর, বিনাবাধায় মুসলমান হইলেন, এবং জালালউদ্দিন নাম ধারণ করিলেন। নূর কুতুব-আলম, যদুকে মুসলমানধর্মে দীক্ষিত করেন। অনেক হিন্দু, রাজার অনুকরণে মুসলমান হইল। কুতুব-আলমের পুত্র, সেখ আনোয়ার, যদুকে মুসলমান হইতে উত্তেজনাকারীদের মধ্যে প্রধান ছিলেন; রাজা গণেশ তজ্জন্য তাহাকে নিজের পুত্র হইতে পৃথক করিবার জন্য নির্বাসিত করেন, এমনকি পরিশেষে তাঁহাকে হত্যা করিতেও কুণ্ঠিত হন নাই।

জালালউদ্দিন, সুবর্ণগ্রাম হইতে সেখ জাহিদকে আনাইয়া, তাহার উপদেশানুসারে রাজকার্য্য নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। সচরাচর যেমন হইয়া থাকে নবধর্মাবলম্বী জালালউদ্দিন গোঁড়া মুসলমান হইয়া উঠিলেন এবং বলপূর্বক অনেককে মুসলমান করিলেন। জালালউদ্দিন পূর্ব্ববাঙ্গালায় মুসলমান ধর্ম্ম বিস্তারের জন্য ঘোষণা করিলেন যে, হয় মুসলমান হইতে হইবে নতুবা খড়্গ-মুখে প্রাণ দিতে হইবে। এই ঘোষণা হওয়ার পর প্রাণভয়ে অনেকে কামরূপ রাজ্যে এবং আসাম ও কাছাড়ের জঙ্গলে পলায়ন করে। যে সকল অনার্য্যজাতি আর্যসমাজের নিম্নস্তরে বাস করিত, তাহাদের অনেকে মুসলমান হইয়া গেল; এইজন্য পূর্ব্বাঙ্গালায় মুসলমানের সংখ্যা এত বেশী।

জালালউদ্দিনের সময় পাণ্ডুয়ার পূর্ণ উন্নতি হইয়াছিল। পাণ্ডুয়ার যে সকল অট্টালিকা ও গৌড়ের যে সকল পুষ্করিণী ‘জালালী’ নামে পরিচিত, তাহা জালালউদ্দিনের সময়ে নির্ম্মিত। গৌড়ের সরাই জালালউদ্দিন নির্ম্মাণ করেন। এই সময়ে মালদহ, বালিয়া নবাবগঞ্জ, রায়খা-দীঘী ও পীরগঞ্জ পাণ্ডুয়ার বহির্বাণিজ্যস্থান ছিল। পীরগঞ্জে মহানন্দার উপর যে পুল ছিল, তাহা রক্ষার্থ রায়খা-দীঘীতে সৈন্য থাকিত। রায়খ দীঘী মহান্দার তীরবর্তী। পাণ্ডুয়ার পশ্চিদিগের উপনগরগুলি পীরগঞ্জ পর্য্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

জালালউদ্দিন গৌড়েও থাকিতেন। ৮২২ হিজরিতে নিজের জন্য গৌড়ে এক রাজপ্রাসাদ নির্ম্মাণ করেন। জালালউদ্দিনের নামাঙ্কিত ৮১৮, ৮২১, ৮২৩ ও ৮৩১ হিজরীর মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। পাণ্ডুয়ায় জালালউদ্দিনের সমাধিমন্দির আছে। তাঁহার সমাাধির পার্শ্বে তাঁহার স্ত্রী-পুত্রেরও সমাধি দৃষ্ট হয়।

 জয়ন্-উল আয়ুদিন নামে জালালউদ্দিনের এক ভ্রাতার নাম পাওয়া যায়। তিনি জালালউদ্দিনের সহোদর কিনা জানা যায় নাই।

 মুসলমান ঐতিহাসিকেরা বলেন—জালালউদ্দিন সুখ্যাতি ও ন্যায়পরতার সঙ্গে ১৭ বৎসর রাজত্ব করেন। তাঁহারা গণেশকে নরকে পাঠাইতেও কুণ্ঠিত হন নাই। জালালউদ্দিন কোন স্থানে পিতার নাম করেন নাই। তিনি বাল্যকালে পিতাকে নিতান্ত উত্যক্ত করিয়াছিলেন। পিতা মধ্যে মধ্যে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিতে বাধ্য হইতেন। 

জালালউদ্দিনের রাজত্বকালে মাহুয়ান নামক চীনপর্য্যটক, বঙ্গদেশে আগমন করেন। চীনের প্রতাপ দেখাইয়া জালালউদ্দিনকে ভয় দেখান তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। জালালউদ্দিন ভয় পাইয়াছিলেন কিনা, তাহা জানা যায় না।

মুসলমানেরা গৌড় অধিকার করিলে সেন রাজগণের সঙ্গে বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ পূর্ব্ববঙ্গে আশ্রয় করেন।

 

*He (Kans) took his boy, who was twelve years old, and had the name or Jadu, 10 the saint and said, “I Have got old and wish to renounce the world; make this boy a Mohammadan and give him the kingdom of Bengal.’ Qutub Alam, thereupon, pur some pan, which he was chewing, into Jadu’s mouth taught him the creed, and thus made him a Mohammadan getting the name of Jalaluddin. (J.A.S.B. p.965 for 1873.)