১২ বছর বয়সের এক বালক রাজপুত্র দেহরক্ষীদের পাহারায় ভয়ার্ত চোখে হেঁটে গৌড়ের রাজদরবারে প্রবেশ করলেন। তাকে মায়ের কাছ থেকে কেড়ে আনা হয়েছে। মা চোখের জলে বিদায় দিয়েছেন। অন্তঃপুরের মেয়েরা বিলাপ করেছে। মন্দিরের পুরোহিতরা তার দিকে করুণার চোখে তাকিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত যে ছিল গৌড়ের আদরের ছোটো রাজপুত্র, আজ তাকে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য উৎসর্গ করে দেয়া হয়েছে।

সেটা ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাস। পাণ্ডুয়ায় খুব গরম পড়েছে। রাজদরবারের পাথরের মেঝেও উত্তপ্ত হয়ে আছে মানুষের শরীরের তাপে, রাজনৈতিক সংঘাতের উত্তাপে। বালক রাজপুত্র যদু ঘামতে ঘামতে এসে তার জন্যে নির্দিষ্ট আসনের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর তার বাবার দিকে তাকালেন।

বালক রাজপুত্রের বাবা গণেশ এক লহমার জন্যে দ্বিধা করলেন। বাংলার রাজা গণেশের সামনে তারই সিংহাসনে বসে আছেন জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কি। তার আশপাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার দেহরক্ষীরা, আছেন গৌড়ের বিশিষ্ট আলেমরা। এ দলের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন গৌড়ের সভাসদেরা। হিন্দু সভাসদেরা বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে আছেন, মুসলমান সভাসদেরা গম্ভীর। গণেশের নিজের দেহরক্ষীদের চোখে নীরব তিরস্কার।

গণেশ নিজেকে সংযত করে হাত তুললেন। তার হাতের ইশারায় রাজপুত্র যদু গিয়ে নির্ধারিত আসনে বসলেন। রাজদরবার নিস্তব্ধ। যদুর পাশে বসে ইব্রাহিম শর্কির মনোনীত আলেমের কাছে রাজপুত্র যদু কলেমা উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তিনি কি জানতে পারলেন, তার জীবনে কী বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেল?

সুলতান ইব্রাহিম শর্কি ও তার সঙ্গীরা আনন্দ প্রকাশ করলেন। বাংলা সালতানাতের ২০০ বছর ধরে চলে আসা মুসলিম শাসনের ধারায় যে সাময়িক ছেদ পড়েছিল, তা তারা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। সুলতান ইব্রাহিম এখন নিশ্চিন্ত মনে জৌনপুরে ফিরে যেতে পারবেন। বালক সুলতান জালালুদ্দিন তার প্রতিনিধি হিসেবে গৌড়ের সিংহাসনে বসবেন।

ভূতপূর্ব রাজা গণেশ মাথা নিচু করলেন। তার চোখে এখন যে তীব্র ক্রোধ, সেটা তিনি সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে দেখতে দিতে চান না। দাবা খেলায় জিততে ভালো খেলোয়াড় কখনো কখনো মন্ত্রী খুইয়ে ফেলে। গণেশ তার একটি ছেলে খুইয়েছেন। যদু এখন আর কেবল তার ছেলে নয়—সে এখন ম্লেচ্ছ সুলতান, বেনামে গণেশের ক্ষমতা রক্ষার শেষ জুয়ার দান। যদুকে এখন তার মা আর স্পর্শ করতে পারবেন না, ভাইয়েরা তার সঙ্গে একাসনে বসে খেতে পারবে না, বাবা হয়েও তিনি যদুকে আর বুকে টেনে নিতে পারবেন না। একবার তার মনে হলো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষায় তিনি কি ছেলেকে মেরে ফেললেন?

গণেশ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, ক্ষমতা ফিরে এলে তিনি জালালুদ্দিনকে নিশ্চিহ্ন করে যদুকে ফিরিয়ে আনবেন।

ওপরের এ দৃশ্য আমার কল্পনা হতে পারে, কিন্তু মধ্যযুগে বাংলার রাজা গণেশের ছেলে যদু যে ধর্মান্তরিত হয়ে জালালুদ্দিন হয়েছিলেন, ইতিহাসে তার অকাট্য প্রমাণ আছে, মুদ্রার সাক্ষ্য আছে।

রাজা গণেশ ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দের আগে রাজা হয়ে ওঠেননি, তিনি ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের ভাতুড়িয়ার জমিদার পরিবারের সন্তান। সুলতান সিকান্দর শাহের সভায় তিনি সভাসদ ছিলেন, সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সভায় তার প্রতিপত্তি আরো বেড়েছিল। তিনি বিপুল রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ দিকে এসে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মন্ত্রিসভা এবং রাজপ্রশাসন থেকে হিন্দু জমিদার ও কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন গণেশ দেখলেন, এটি বাংলার সিংহাসন দখল করার সুবর্ণ সুযোগ। কুশলী গণেশ ঠিক করলেন, তিনি ধাপে ধাপে এগোবেন।

গণেশ প্রথমে উেকাচ দিয়ে সুলতানের কিছু সেনাকে বশ করলেন, তাদের দিয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিনকে হত্যা করালেন। গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার ছেলে সাইফউদ্দিন সিংহাসনে বসলেন, রাজা গণেশ তখন হাত করলেন সাইফউদ্দিনের সেনাপতি শিহাবউদ্দিনকে। রাজা গণেশের প্রশ্রয়ে শিহাবউদ্দিন সুলতান সাইফউদ্দিনকে খুন করলেন, শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ্ নামে গৌড়ের সিংহাসনে বসলেন।

শিহাবউদ্দিন ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানকে খুন করে ক্ষমতায় এসেছেন। ইলিয়াস শাহী বংশের অনুগত সভাসদেরা এই ‘নিমকহারামি’ মেনে নিতে পারেননি। গণেশ এবার তাদের সঙ্গেই ঐক্য করলেন। শিহাবউদ্দিনের বিরুদ্ধে সেনাবিদ্রোহ হলো, তিনি নিহত হলেন। তার শিশুপুত্রকে নামেমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে গণেশই পেছন থেকে রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন। ক্ষমতা সংহত হয়ে গেলে ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে গণেশ নিজেকেই বাংলার রাজা হিসেবে ঘোষণা করলেন। ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি লক্ষণাবতী দখল করে নেয়ার পর থেকে আর কখনই বাংলার সিংহাসনে কোনো হিন্দু রাজা বসতে পারেননি, এত বছর পর রাজা গণেশ সে ধারায় ছেদ আনলেন।

রাজা গণেশের ক্ষমতাদখলে বাংলার ইসলাম প্রচারকরা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশে একবার হিন্দু রাজার শাসন জেকে বসলে সে শাসন অপসারণ করা কঠিন হবে, এটা তারা বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের নেতা দরবেশ নূর কুতুব আলম জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে চিঠি লিখে ‘অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী কাফের গণেশকে’ উত্খাতের আহ্বান জানালেন। সুলতান ইব্রাহিম শর্কি বাংলার ধনসম্পদ দখল করার এ সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে বিরাট এক বাহিনী নিয়ে পাণ্ডুয়ায় এসে উপস্থিত হলেন।

রাজা গণেশ জানতেন, অন্তর্কলহে জর্জরিত বাংলার সেনাবাহিনী জৌনপুরের সুলতানের বাহিনীকে যুদ্ধে হারাতে পারবে না। তিনি যুদ্ধ করলেন না, সুলতান ইব্রাহিম শর্কিকে স্বাগত জানিয়ে তার কাছে আনুগত্য স্বীকার করলেন। তারপর সুলতানকে এক লোভনীয় প্রস্তাব দিলেন। সুলতান ইব্রাহিম শর্কি যদি বাংলার সিংহাসনে গণেশের অধিকার স্বীকার করে নেন, তাহলে গণেশ তাকে বিপুল পরিমাণ সোনা-রূপা-মণি-মাণিক্য দেবেন। সুলতান ইব্রাহিম শর্কির আপত্তি ছিল না, কিন্তু বাংলার মুসলিম আলেমরা আপত্তি তুললেন। বাংলায় হিন্দু শাসন চলতে দেয়া যাবে না।

তখনই গণেশ তার বেপরোয়া চালটি চাললেন। নামে হিন্দু শাসনের অবসান হয় তো হোক, বাংলার রাজপাট তিনি ছাড়বেন না। তার ছোটো ছেলে যদু (মতান্তরে যদুসেন) ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করবেন। নাবালক ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে গণেশই বাংলা শাসন করবেন, আর ‘উপহারের মাল’ নিয়ে সুলতান ইব্রাহিম শর্কি জৌনপুরে ফিরে যাবেন।

মুসলিম আলেমদের মধ্যে দ্বিধা-সংশয় ছিল। কিন্তু সুলতান ইব্রাহিম শর্কি ততক্ষণে রাজি হয়ে গিয়েছেন। দুনিয়ায় ধনরত্ন পাবেন, আখেরাতে একটি হিন্দু রাজপুত্রকে ইসলাম গ্রহণ করানোর জন্যে সওয়াব পাবেন—ইব্রাহিম এ যুগপৎ লাভের আশা ছাড়তে পারেননি।

মুসলিম আলেমদের সন্দিগ্ধ চোখের সামনে ধর্মান্তরিত বালক সুলতান জালালুদ্দিন বাংলার সিংহাসনে বসলেন। সুলতান ইব্রাহিম শর্কি কয়েক গাড়ি ধনরত্ন নিয়ে জৌনপুরে ফেরত চলে গেলেন। দরবেশ নূর কুতুব আলম রেগে গিয়ে লিখলেন, ‘এই ব্যক্তি (ইব্রাহিম শর্কি) পশুর চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত।’ তার আশঙ্কা ছিল, গণেশ আবার ক্ষমতা দখল করবেন।


নূর কুতুব আলমের আশঙ্কা সত্যি হয়েছিল। বালক সুলতান জালালুদ্দিন সিংহাসনে ছিলেন মোটে এক বছর। পরের বছর গণেশ যখন বুঝলেন, তিনি আবার শক্তি সংহত করতে পেরেছেন, জৌনপুরের সুলতান বা অন্য যে কেউ বাংলা আক্রমণ করতে এলে তাদের প্রতিরোধ করতে পারবেন, তখন আর বালক জালালুদ্দিনের নামমাত্র সুলতান হয়ে থাকার প্রয়োজনটুকুও রইল না। ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে গণেশ আবার নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করলেন। ১৪১৭ খ্রিস্টাব্দে নিজের নামে মুদ্রাও বের করলেন। ততদিনে দরবেশ নূর কুতুব আলম মারা গিয়েছেন, সুলতান ইব্রাহিম শর্কির শক্তিও কমেছে। রাজা হয়ে গণেশ ঠিক করলেন, তিনি ছেলেকে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনবেন।

‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’ নামের বইয়ে ইতিহাসবেত্তা গুলাম হুসেন সালিম জালালুদ্দিনের ‘শুদ্ধীকরণ’ অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়েছেন। ছেলের শুদ্ধীকরণের জন্যে গণেশ পুরোহিতদের কাছ থেকে বিধান নিয়েছিলেন। বিধান অনুযায়ী বিরাট এক স্বর্ণের তৈরি গাভী বানানো হলো। গাভীর পেছনে ও সামনে বিরাট গহ্বর। জালালুদ্দিন গাভীর পেছনের গহ্বর দিয়ে ঢুকলেন, সামনের গহ্বর দিয়ে বেরিয়ে এলেন। পুরোহিতরা ঘোষণা করলেন, রাজপুত্র শুদ্ধ হয়েছেন। তাকে আবার ‘যদু’ নামে ডাকা যাবে, তিনি হিন্দু বলে গণ্য হবেন। স্বর্ণের তৈরি গাভী ভেঙে টুকরো করে সেই স্বর্ণের টুকরো পুরোহিত আর ব্রাহ্মণদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হলো।

গণেশ রাজা হলেন, দোর্দাণ্ডপ্রতাপে আরো দুই বছর রাজত্ব করলেন। ১ লাখ টাকা খরচ করে পাণ্ডুয়ায় বিরাট প্রাসাদ বানালেন, সে প্রাসাদের নাম হয়ে গেল এক লাখী প্রাসাদ। রাজা গণেশ স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন, পাণ্ডুয়ার এক লাখী প্রাসাদ থেকেই বাংলায় হিন্দু রাজত্বের পুনরুত্থান হবে।

কিন্তু ক্ষমতা থেকে অপসারিত রাজপুত্রের কী হলো? ইতিহাস সে বিষয়ে নীরব। কিন্তু আমি কল্পনার চোখে দেখি, রাজপুত্র প্রাসাদের বাইরে এক বাড়িতে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছেন। তিনি ইসলাম ত্যাগ করেছেন, কিন্তু হিন্দুসমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। শুদ্ধীকরণের পরেও তিনি নিঃসঙ্গ, অবহেলিত, ব্রাত্য। মা-বাবা-ভাইয়েরা ধর্মরক্ষার তাগিদে তার স্পর্শ বাঁচিয়ে চলেন। কিশোর রাজপুত্র জানেন, তিনি এখন যদুও নন, জালালুদ্দিনও নন। ১৪ বছর বয়সের এক রাজপুত্রের মনে এ সময়ে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠবে, সে তো খুব স্বাভাবিক।

১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা গণেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠল। বিদ্রোহে গণেশ নিহত হলেন, তার বড় ছেলে মহেন্দ্র সিংহাসনে বসলেও দু-তিন মাসের বেশি রাজত্ব করতে পারেননি। তাকে উত্খাত করে হিন্দু-মুসলমান সভাসদেরা এক জোট হয়ে ব্রাত্য ছোটো রাজপুত্রকেই সিংহাসনে বসাতে চাইলেন।

বাংলার ইতিহাসে মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাজপুত্রের সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। তিনি রাজা যদু হয়ে গণেশের উত্তরাধিকার বহন করতে পারতেন। অথবা তিনি সুলতান জালালুদ্দিন হয়ে রাজ্যশাসন করতে পারতেন। তিনি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিলেন।

আমার ধারণা, দ্বিতীয় পথ বেছে না নিয়ে সুলতান জালালুদ্দিনের উপায় ছিল না। শুদ্ধীকরণ যতই হোক, মধ্যযুগের সেই সময়ে ধর্মান্তরিত ‘পতিত’ কোনো হিন্দুর পক্ষে স্বমর্যাদায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। তাকে সমাজে অপাঙেক্তয় হতেই হতো। সে তুলনায় ইসলাম ছিল ধর্মান্তরিতের পক্ষে অনেক বেশি সুবিধাজনক—কারণ মুসলমানদের মধ্যে বর্ণ-ভেদ, জাতি-ভেদ ছিল না।

যদু আবার জালালুদ্দিন হলেন। বাংলার ইতিহাসেও দীর্ঘদিনের জন্যে হিন্দু শাসনের যবনিকা পড়ল। সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ্ নও-মুসলমান হিসেবে নিজের আন্তরিকতা প্রমাণের জন্যে উদ্যোগী হলেন। তিনি ইমাম আবু হানিফার প্রবর্তিত হানাফি তরিকার অনুসারী হলেন, রাজা গণেশের আমলে ভেঙে ফেলা মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো নতুন করে তৈরি করালেন, আরবে ও মিসরে মুসলমানদের জন্যে টাকা পাঠালেন। যে ব্রাহ্মণরা তার শুদ্ধীকরণ করে স্বর্ণের গাভীর ভাগ পেয়েছিলেন, সুলতান জালালুদ্দিন তাদের গ্রেফতার করেছিলেন, জোর করে গরুর মাংস খাইয়ে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, ইতিহাসে এমন বিবরণও পাওয়া যায়। অসম্ভব নয়, শুদ্ধীকরণের পরেও যাকে একঘরে হয়ে থাকতে হয়েছে, পরিবার বঞ্চিত হতে হয়েছে, ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠলে অবাক হওয়া চলে না।

তবে সুলতান জালালুদ্দিন অবিবেচক বা অদূরদর্শী ছিলেন না। তিনি বুদ্ধিমানের মতো রাজধানী পাণ্ডুয়া থেকে গৌড়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, পাণ্ডুয়ার রাজনৈতিক হানাহানি আর গুপ্তহত্যার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। কূটনীতি ও শাসন পরিচালনার কাজে তার দক্ষতা ছিল, ১৭ বছরের রাজত্বে তিনি বাংলায় শান্তি বজায় রেখেছিলেন। নিজে নিষ্ঠাবান মুসলমান হয়েও সভাসদ কিংবা সেনাপতি হিসেবে যোগ্য কোনো হিন্দুকে নিয়োগ দিতে তিনি দ্বিধা করেননি।

পারিবারিক জীবনেও তিনি মধ্যযুগের এক অনন্য উদাহরণ— সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের বংশের এক রাজকন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, সারা জীবন তার সঙ্গেই ছিলেন, দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।

মাত্র ৩১ বছর বয়সে সম্ভবত রোগাক্রান্ত হয়ে সুলতান জালালুদ্দিনের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে সুলতান শামসউদ্দিন আহমদ শাহ্ তিন বছরের বেশি রাজত্ব করতে পারেননি, দুই সভাসদ চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করেন।

সুলতান জালালুদ্দিন, তার স্ত্রী, আর তার ছেলে সুলতান শামসউদ্দিনের সমাধি আছে রাজা গণেশের অনেক সাধের এক লাখী প্রাসাদে। ওই প্রাসাদেই বাংলায় হিন্দু রাজত্বের স্বপ্নের সমাধিও হয়েছিল।

রাজপুত্র যদুর সুলতান জালালুদ্দিনে পরিণত হওয়ার ঘটনাটা যেন মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতীক। হিন্দু ধর্ম থেকে পতিত হওয়ার রাস্তা অনেক, কিন্তু ফিরে যাওয়ার রাস্তা খোলা নেই। ওদিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অবারিত সুযোগ আছে, সেই সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করলে আছে রাজশক্তির আনুকূল্য। এ অবস্থায় ধর্মান্তর একচেটিয়াভাবে মুসলমানের সংখ্যা আর রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করবে, তাতে আর সন্দেহ কী? পরের ৩৫০ বছরে বাংলার জনগণের এক বিরাট অংশ ক্রমে হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বাংলায় সুলতান জালালুদ্দিনের আমলেও মুসলমান ছিল বিপুলভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। কিন্তু ৪৫০ বছর পরে, ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারিতে দেখা গেল বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা ৫০ দশমিক ২ শতাংশ, আর হিন্দুর সংখ্যা ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ধর্মের ভিত্তিতে যে বাংলা ভাগ হতে পারে, সে কথা তখনো কেউ ভাবেনি।

যদু থেকে জালালুদ্দিন হওয়ার পথে এক কিশোর রাজপুত্রের যে যাত্রা, সে যাত্রার মধ্যেই বেজে উঠেছিল কালের যাত্রার ধ্বনি। রাজা গণেশ কালের স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যদু কিংবা জালালুদ্দিনের রূপ ধরে সময়ের অমোঘ ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে রাজা গণেশের প্রতিরোধ।

যদু/জালালুদ্দিন, যে নামেই আমরা তাকে মনে রাখি, সেসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার—রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলার শিকার এক অবহেলিত, অপাঙেক্তয়, ব্রাত্য কিশোরের রূপ ধরে বাংলার সমাজ ও রাজনীতি তার ভবিষ্যতের পথ ঠিক করে নিয়েছে।

 

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার: গবেষক ও মধ্যযুগের বাংলা: বখতিয়ার খলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা গ্রন্থের প্রণেতা