আবারো প্রিজকার এশিয়ায় রইল, গতবার ছিল ভারতে, এবার জাপানে। ৮৭ বছর বয়সী আরাতা ইসোজাকি ২০১৯ সালের প্রিজকার লরিয়েট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পারমাণবিক হামলার শিকার হিরোশিমা নাগাসাকির ধ্বংসাবশেষ তার মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, তখন তিনি ছিলেন ১২ বছরের বালক। বসতবাড়ি কীভাবে নাই হয়ে যায় চোখের পলকে কিংবা বাসস্থানের স্থায়িত্ব, এসব ইসোজাকিকে পেয়ে বসে বাল্যকালে।
৩০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে অন্তত ১০বার বিশ্বভ্রমণ করেন তিনি। আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য সবই ঘুরেন এবং তখন থেকেই একটা প্রশ্ন জারি ছিল, ‘স্থাপত্যকলা কী?’
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যকলায় পাট চুকিয়ে ৫০ দশকের শেষের দিকে জাপানের আরেক স্থাপত্যের গুরু কেনজো ট্যাংয়ের অধীনে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৭ সালে কেনজো ট্যাংও প্রিজকার পান। ১৯৬৩ সালে নিজের ফার্ম শুরু করেন ইসোজাকি। মজার বিষয় হলো, প্রিজকার প্রাইজ যখন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে, তখন যেসব জুরি ছিলেন, ইসোজাকিও তাদের একজন ছিলেন, পরবর্তী পাঁচ বছর ছিলেন বোর্ডে।
ইসোজাকির কর্মজীবন ৬০ বছরের, এ সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশে শতাধিক কাজ করেছেন। স্পেন, আমেরিকা, চীন, ইতালি, কাতার এসব দেশের কাজগুলো বেশ আলোচিত হয়।
ধনী পরিবারে জন্ম নেয়া ইসোজাকি স্নাতক শেষ করে কেনজো ট্যাংয়ের ফার্মে কাজ করেন নয় বছর, পরে নিজের ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। সেটা ষাটের দশক, তখন স্থাপত্যকলার দুনিয়ায় দুটি তত্ত্বের যাত্রা শুরু হয়—জাপানে মেটাবলিজম আর ইতালিতে র্যাডিক্যালিজম। মূলত কেনজো ট্যাংয়ের ফার্মে যেসব নবিশ স্থপতি কাজ করেন, তারাই এর ধারক-বাহক হন। স্বাভাবিকভাবে ইসোজাকিও তাদের একজন। কিন্তু আট-দশজনের সঙ্গে ইসোজাকির কিছু ফারাক তৈরি হতে থাকে।
স্থাপত্যকলা কী, কেন জরুরি, বসবাসের জায়গা তৈরির সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের মৈত্রী, একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার—এসব চিন্তায় সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন ইসোজাকি। আরেক জাপানি প্রিজকারজয়ী স্থপতি তাদাও আন্দো বলেন, ইসোজাকি হলেন জাপানে স্থপতিদের সম্রাট। তিনি নিজেকে একজন ভাস্করও মনে করেন।
মানুষের বাস (Dwelling) কীভাবে প্রতিবেশের সঙ্গে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে, এটি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ভাবনা। এজন্য যেসব চিন্তা স্থাপত্যকলায় প্রভাবক, সেসবের জন্মের ঊষালগ্নে যারা কাজ করে তত্ত্ব হিসেবে দাঁড় করান, তাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। মেটাবলিজম একান্ত জাপানি তত্ত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানি স্থাপত্যকলার নিদর্শন।
মেটাবলিজম কী? সাধারণত এ শব্দ জীববিজ্ঞানে জীবদেহের কোষের বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ক্রিয়া। স্থাপত্যকলায়ও এ বিষয়টিই এসেছে। ইসোজাকি বা তার সতীর্থরা মনে করেন, বাসস্থান নিশ্চল হয় না, প্রয়োজনের তাগিদে এর বিকাশও হয়। জীবদেহে যেমন নতুন কোষ জন্ম নেয়, আবার মরা কোষ ঝরে পড়ে, তদ্রূপ বিল্ডিংও।
মেটাবলিস্ট স্থপতিরা মেরুদণ্ডকে (Spine) কেন্দ্র করে ছোট ছোট খোপ ঘর সংযোজন বা বিয়োজন করে পুরো একটি স্থাপনাকে জান্তব করে তোলেন। স্থাপত্যকলায় মেগাস্ট্রাকচারের ধারণাকে বাতিল করে দেন মেটাবলিস্টরা। যেহেতু জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলায় যে শূন্য নগর তৈরি হয়, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তা প্রবল হয়ে ওঠে স্থপতিদের মাঝে। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিষয় তখন খুব বড় হয়ে ওঠে তাদের কাছে। এসব চিন্তা এত প্রকট হয় যে রাজনৈতিক ইশতেহারের মতো মেটাবলিস্টরাও ইশতেহার তৈরি করেন। ফুমিহিকো মাকি, কিশো কুরোকাওয়া, কিয়োনরি কিকুতাকেরা মিলে ইশতেহার তৈরি করেন।
১৯৭২ সালে মাত্র ৩০ দিনে গড়ে তোলা নাগাজিন ক্যাপসুল টাওয়ারকে মেটাবলিজমের আইকন ধরা হয়। ১৯৬২ সালে ইসোজাকির ‘সিটি ইন দ্য এয়ার’ খুব আলোড়ন তুলেছিল। এটা ছিল একটা শহরকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রস্তাবনা-নতুন মাত্রা।
সাধারণ এ রকম সৃজনকর্মে একটা পরিচিত ছাপ গড়ে ওঠে, যেমন জাহা হাদিদের কাজে ঢেউ, ফ্রাংক গেরির কাজে ভাস্কর্য প্রবলতা, লুইস বার্গানের কাজে রঙের খেলা। ইসোজাকির কাজে এ রকম কিছু গড়ে ওঠেনি। ১৯৬০-৭০-এর দশকের কাজ এক রকম, আর ১৯৮০-৯০-এর দশকে আরেক রকম এবং এরপর আবার পরিবর্তন। এমন নয় যে চিন্তায় তিনি উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরু ঘুরে গেছেন, বরং বিকশিত করেছেন নিজেকে।
সমাজতান্ত্রিক চিন্তার ছাপ তিনি স্থাপত্যকলায় নিয়ে গেছেন, ব্যক্তিগতভাবে চে গুয়েভারায় ভক্ত। ব্রুটালিজম স্থাপত্যকলার আরেক মতবাদ। গত শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে তার কাজে ব্রুটালিজম খুব প্রকট হয়ে ওঠে। এটি একই সঙ্গে আদর্শ এবং নন্দনতত্ত্ব। ব্রুটালিস্ট স্থপতিরা মনে করেন, বিল্ডিংয়ের উপাদানগুলো সহজ-সরল দৃশ্যমান হতে হবে। যেখানে দৃঢ়তা ও সারল্য পাশাপাশি অবস্থান করে। কোনো লুকাছাপার ব্যাপার নেই।
দ্য মিউজিয়াম অব কনটেম্পরি আর্ট লস অ্যাঞ্জেলস সংক্ষেপে এমওসিএ (১৯৮১-১৯৮৬) জাপানের বাইরে ইসোজাকির প্রথম কাজ এবং ব্রুটালিস্ট কাজের অন্যতম সেরা নিদর্শন। লাল বেলে পাথর আশেপাশের দৃশ্যমান উঁচু স্থাপনার সঙ্গে বেশ আলাদা করে তোলে একে।
স্থাপত্যকলা বা স্থাপনা মানে স্থির কোনো দৃঢ় নিশ্চল বিষয়, এমন একটি স্বাভাবিক ধারণা আমাদের মনের অবচেতনে কাজ করে। সে ধারণা থেকে বের হয়ে নতুন কাজ, তাকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেন ইসোজাকি। আর্ক নোভা প্রজেক্ট তেমনই একটি কাজ। ২০১১ সালে জাপান সুনামিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটাকে মাথায় রেখে নুহের কিস্তির কাহিনী থেকে প্রেরণা নেন ইসোজাকি। মহাপ্লাবনের সময় নুহের কিস্তি যেমন নবজীবনের আধার হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিত্রতা করে, তেমনি আর্ক নোভা নামের এ মোবাইল কনসার্ট হলও সংগীতের মাধ্যমে মানুষ ও প্রকৃতিকে সম্পৃক্ত করে পারিপার্শ্বিকতা ও পরস্পরের সঙ্গে। এটি ইট-পাথরের কোনো স্থায়ী কাঠামো নয়। বেলুনের মতো ফোলানো আবরণ আর কাঠের সমন্বয়ে তৈরি। ব্রিটিশ ভাস্কর অনিক কাপুরের সঙ্গে যৌথ কাজ এটি।
এখানে জাপানের বিখ্যাত তত্ত্ব মাকে (Maah) কাজে লাগানো হয়েছে। মা হচ্ছে এমন এক স্থানিক স্থবির শূন্যতা, যা পূর্ণ সম্ভাবনাময়। সময় ও স্থানের যৌথ জাপানি ধারণা এটি। এমন এক সাময়িক রীতি, যা সবসময় সবক্ষেত্রে বিরাজমান, এখানে সহজ-সরল প্রস্তাবনা বিদ্যমান, চাঁদকে এর চিহ্ন আকারে বিবেচনা করা হয়। জাপানের বসতঘরে চা পানের নির্দিষ্ট কক্ষের যে দার্শনিক ভিত্তি, সেটা হলো মা। স্থাপত্যকলায় মা ধারণার প্রবক্তা ইসোজাকি।
১৯৯৩-১৯৯৫ সালের Domus : la casa del hombre a coruna, spain সাগরকুলে অবস্থিত। বিশাল পাল বা সিনুকের খোল আগলে আছে যেন একে। যেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য চিন্তায় মিলনক্ষেত্র। আশির দশকে নিউইয়র্কের পুরনো একটি থিয়েটার হলকে নাইট ক্লাবে রূপান্তর করে বেশ সাড়া ফেলে দেন। বিল্ডিংয়ের ভেতর বিল্ডিং ধারণাকে মাথায় রেখে পুনরায় নকশা করেন ইসোজাকি। ১৯৮৫ সালের ২০ মে গোল্ড বার্জার এ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমে লেখেন। ইসোজাকি তখন আমেরিকায় বেশ পরিচিত মুখ বা বলা যায় সেলিব্রেটি। এ রকম একজন স্থপতি এমন ছোটখাটো কাজ করবেন, তা অনেকের কাছে বিস্ময়কর ছিল।
কারণ পুনর্নকশা বললেও এ রকম কাজ স্থপতিরা করেন না বলা যায়। এটা ইন্টেরীয় ডিজাইনারদের আওতায় চলে যায়। কিন্তু ইসোজাকির চিন্তার মাহাত্ম্য কাজকে কাজ এবং নতুন কিছু করা, নিজেকে উজাড় করে দেয়ার মাঝে মা বাস্তবায়ন করা যেন। তাই নিউইয়র্ক টাইমসের এক লেখায় উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘এ যেন ফিলিপ জনসনের জাপানে যাওয়া এবং সেটা কোনো বহুতল ভবনের জন্য নয়, গেইশা ঘরের নকশা করার জন্য!’ (ফিলিফ জনসন—২০১৫ মারা যান, বিখ্যাত মার্কিন স্থপতি, সমালোচক, প্রথম প্রিজকার লরিয়েট) একটা নাইট ক্লাব কি শুধু আলোর ঝলকানি বা আলো-আঁধারের খেলা? না, ইসোজাকি মনে করেন স্থাপত্যশৈলীর প্রয়োজনীয়তা এখানে আরো বেশি বাঙ্ময় করা জরুরি। পুরনো থিয়েটারকে পুনর্নকশা করার জন্য এর ভেতরের অংশের কোনো আমূল পরিবর্তন না করেই সাজানো হয়। এখানেই মা, অর্থাৎ একই আধারে বহমান অতীত অনিবার্যভাবে ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান হয়ে ধরা দেয়ার কথা বলে।
স্থাপত্যকলায় সিল্কস্ক্রিন ও থার্মাল প্রিন্টের জনক ইসোজাকি। সিল্কস্ক্রিন প্রথমে সবার নজরে আসে ১৯৮৬ সালে। এক প্রতিযোগিতায় ক্যানজো ট্যাং পুরস্কার জিতেছেন। কিন্তু সবার নজর ছিল তার ছাত্র ইসোজাকির দিকে। ১৪টি সিল্কস্ক্রিন প্রিন্ট তৈরি করে কাজের নতুন দ্বার খুলে দেন। তখনো কম্পিউটার প্রযুক্তি মাত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করছে এবং কম্পিউটার স্থাপত্যকলায় ব্যবহার প্রবলভাবে হতে পারে, সেটা দৃশ্যমান হয় দারুণভাবে। আজকে একজন স্থপতি কম্পিউটার ছাড়া কাজ করছেন যেমন ভাবা যায় না, তখন ঠিক তার উল্টোই ছিল।
আরাতা ইসোজাকি একজন সফল স্থপতি, তাত্ত্বিক, সমালোচক, বহু গ্রন্থ প্রণেতা। পশ্চিমা কৌশল আয়ত্ত করার নামে যিনি কখনো হারাননি জন্মভূমির চিন্তার ধারাবাহিকতাকে, বেড়ে ওঠা শৈশবের তিক্ত বাস্তবতাকে তিনি মানবকল্যাণে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থাপত্যকলার গত্বাঁধা ধারণাকেও দুমড়ে-মুচড়ে নতুন করে দাঁড় করিয়েছেন।
ইসোজাকি বলেন, ‘আমার স্থাপত্যকলার ধারণা হলো যে এটা অদৃশ্যমান, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এটা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়। ঠিক যেন এ জগতের মতো। স্থাপত্যকলা কোনো কিছু থেকে নিঃসৃত নয়, হয়ে ওঠে। অবশেষে আবারো না হওয়ার ব্যাপার হয়। জন্ম থেকে মৃত্যু—এ চক্রটাই আমি দেখাতে চেয়েছি।’






