ভাবুন আপনি একজন পর্যটক আর যদি মধ্যযুগীয় সময়ে আজকের আধুনিক পর্যটক হিসেবে বিশ্বব্যাপী আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর রাজধানীগুলো দর্শনের সুযোগ লাভ করতেন। অধিকন্তু এসবের মধ্যে একটিকে আবার বলা হতো সব নগরের রানী: কনস্ট্যান্টিনোপল, যা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী (৩৩০-১২০৪) ও (১২৬১-১৪৫৩)। ইতিহাসজুড়ে নানা বিপর্যয়, অনুষ্ঠানমালা, অগ্নিকাণ্ড, ক্রীড়া ও যুদ্ধের নীরব সাক্ষী এই বাইজেন্টাইন। নগরটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভাষাভাষী লাখ লাখ মানুষকে স্বাগত জানাত।

ক্রেমোনার লিউতপ্রান্ড ও রুই গঞ্জালেজ ডি ক্লাভিজোর মতো রাষ্ট্রদূত, নিকোলাস ও বলদেনসেলের মতো তীর্থযাত্রী এবং লুডলফের মতো জার্মান পাদ্রি আর রবার্ট ডি কারির মতো ফরাসি নাইট ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশে ‘কুইন অব সিটি’ পরিদর্শন করেছেন এবং স্বকীয় সাহিত্যিক ঢঙে তাদের সাময়িকী, বই, চিঠি ও স্মৃতিকথায় নগরটির সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।

কনস্ট্যান্টিনোপলের দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে প্রথমেই দেখতে পেতেন নগরের দেয়াল। এরপর তারা উপভোগ করতেন বিখ্যাত বাইজেন্টাইন প্রাসাদ, দ্য হিপ্পোড্রোম (মল্লভূমি), জাস্টিনিয়ান কলাম, বুকোলিওনের প্রাসাদ, মেসে নামে নগরের প্রধান রাস্তাসহ অনেক কিছু। যদিও নগরের অন্য সব ভবন কিংবা স্মৃতিস্তম্ভের চেয়ে খুব ভিন্ন ছিল হায়া সোফিয়া, যা ছিল সবার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান আর আকাঙ্ক্ষিত নাম। আজকের মতোই শত শত বছর ধরে এটি ছিল দর্শনার্থীদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের; যার নির্মাণশৈলী, ঐশ্বর্য আর পবিত্রতা মুগ্ধ করত সবাইকে।

কনস্ট্যান্টিনোপলের বিস্ময় হায়া সোফিয়া ছিল নান্দনিকতার সঙ্গে গণিত-জ্যামিতির এক অপূর্ব সন্নিবেশ। গির্জাটির সজ্জা, আকার ও ঐশ্বর্যের কথা বহু লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে আছে কিংবদন্তিও। বারো শতকে ইংলিশ ইতিহাসবিদ রাদুলফাস ডি ডিসেটো ও রাদুলফাস নিগারের লেখা কল্পকাহিনী মতে, হায়া সোফিয়া নির্মাণের সময় অলৌকিক কিছু ঘটেছিল এবং গির্জার পাহারায় নিযুক্ত থাকত বিশেষ এক দেবদূত। এছাড়া বহু দর্শনার্থী পরবর্তী সময়ে এর ভেতরের কারুকার্য ও নকশা, দরজা ও থামের সৌন্দর্যের সুবিশদ বর্ণনা করেছেন, যা পড়ে অনেকে এর স্বর্গীয় সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছেন, এমনকি যারা কখনো এটি দর্শনও করতে পারেননি।


যেসব দর্শনার্থী বিশ্বের নানা প্রান্তের বিভিন্ন অপূর্ব সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন তাদের লেখনীতেই হায়া সোফিয়ার কথা সবচেয়ে উত্কৃষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম মধ্যযুগীয় ইহুদি পর্যটক বেঞ্জামিন তুদেলা, যিনি কনস্ট্যান্টিনোপল দর্শন করেছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন ব্লাচেরনা প্রাসাদের নিখাদ স্বর্ণে ঢাকা থাম ও দেয়ালের কথা, রেশমি পোশাক ও কাপড়ের কথা এবং কনস্ট্যান্টিনোপলবাসীর বিনোদনস্থল হিপ্পোড্রোমের কথা, যেখানে ঘোড়দৌড় হতো। সবশেষে বলেছেন প্রার্থনাস্থল হায়া সোফিয়ার কথা। তিনি লিখছেন, ‘ঐশ্বর্যের বিচারে বিশ্বের অন্য কোনো প্রার্থনাঘরই হায়া সোফিয়ার সমতুল্য হবে না। স্বর্ণ ও রৌপ্যের থাম এবং একই ধরনের অসংখ্য মূল্যবান বাতি দ্বারা এর অলংকৃত করা হয়েছে।’

মধ্যযুগের বিখ্যাত মরোক্কান পর্যটক ইবনে বতুতার লেখনীতেও ফুটে উঠেছে হায়া সোফিয়ার ঈর্ষণীয় আকার ও ঐশ্বর্যের কথা। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এর ভেতরের দৃশ্য অবলোকন না করেই বাইরের দৃশ্যের বর্ণনা করব। এটা তৈরি করেছেন সলোমনের (নবী) চাচাতো ভাইয়েরা...এটা রোমানদের অন্যতম সেরা গির্জা। চারদিকে দেয়ালে ঘেরা, যেন এটিও একটি শহর। এর রয়েছে ১৩টি দরজা এবং এটি একটি পবিত্র চত্বর। এই চত্বরে প্রবেশে কারোরই বাধা নেই...এটা যেন কোনো দর্শক হল, যা মার্বেল পাথরে বাঁধানো এবং প্রবেশমুখেই রয়েছে পানির ঝর্না, যা দুটি দেয়ালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এবং যে দেয়াল বিভিন্ন রঙের মার্বেল ও কারুকার্যে শোভিত।’

বারো ও তেরো শতকের প্রখ্যাত পার্সিয়ান পর্যটক আলী ইবন বকর আল-হারাবি তার ‘বুক অব ওয়ান্ডার্স’-এ লিখেছেন, ‘হায়া সোফিয়া তাদের সবচেয়ে নামি গির্জা। বাইজেন্টাইনরা বলে থাকেন এর ভেতরে একজন দেবদূত থাকেন এবং তার থাকার স্থানের চারপাশে সোনার রেলিং তৈরি করে দেয়া হয়েছে, যা নিয়ে রয়েছে বিস্ময়কর এক ইতিহাস এবং আমরা যার কথা উল্লেখ করেছি তিনি যথার্থ জায়গাতেই রয়েছেন। এই গির্জার নকশা, এর উপাসনাগার, উচ্চতা, দরজা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং থামসহ যা কিছু আছে...এই নগরটি এর নামের চেয়েও বেশি কিছু!’

আজ দামি ও নান্দনিক মার্বেল পাথরের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হায়া সোফিয়া এবং চারপাশের অন্য সব দালানের চেয়ে এটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণই। ২০১৮ সালে কনস্ট্যান্টিনোপলের/ইস্তাম্বুল অধিবাসীরা হায়া সোফিয়ার ১৪৮১তম জন্মদিন পালন করেন। এটি এখন আর অর্থোডক্স চার্চ নয় কিংবা মুসলিম বিশ্বের কাছে মসজিদও নয়, যা ইস্তাম্বুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর এবং ইউনেসকো কর্তৃক ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্য (যদিও সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এটিকে পুনরায় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের আইন জারি করেছেন।)

টিকে থাকা বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের মধ্যে শিল্পকর্মের বিচারে হায়া সোফিয়াই সবচেয়ে সেরা। দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলোর সহাবস্থানের অপূর্ব এক স্মৃতিস্তম্ভ এটি।