মারাঠিরা ১৭৪২ সালে প্রথমবারের মতো বাংলা আক্রমণ করে। উড়িষ্যায় বিদ্রোহ দমন করে কটক থেকে হুগলির আরামবাগ মহকুমার মুবারক মঞ্জিলে পৌঁছেই আলিবর্দি মারাঠি সেনাবাহিনী কর্তৃক বর্ধমান আক্রমণের খবর পান।

বাধ্য হয়ে আলিবর্দি ছোটেন বর্ধমানের পথে, সেখানে পৌঁছেন ১৭৪২ সালের ১৫ এপ্রিল। পরদিন সকালেই তিনি দেখতে পান, মারাঠি অশ্বারোহী বাহিনী তাদের ঘিরে রেখেছে। আলিবর্দির কাছে তিন হাজার অশ্বারোহী ও হাজারখানেক পদাতিক বাহিনী ছিল। কেননা সেনাবাহিনীর একটি অংশ তিনি উড়িষ্যা থেকে সরাসরি মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

আলিবর্দির বাহিনীর খাদ্য সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয় মারাঠিরা। ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে তাদের একটি দল শহর আক্রমণ করে, আরেকটি দল বিচ্ছিন্নভাবে চতুর্দিকে ৪০ মাইল এলাকাজুড়ে লুটপাট চালাতে থাকে। এমন অবস্থায় গোলন্দাজ বাহিনী, বন্দুকধারী ও সাহসী আফগান অশ্বারোহী বাহিনীর সাহায্যে মারাঠিদের ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে যান আলিবর্দি।

আলিবর্দি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন, আর পেছনে অনুসরণ করছিল মারাঠিরা। আলিবর্দির কামান থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পার্শ্ববর্তী ১০ মাইলের মধ্যে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছিল মারাঠিরা। সৈন্যদল নিয়ে কাটোয়া পৌঁছে যান আলিবর্দি। সুজা-উদ-দিনের জামাতা ও রুস্তম জংয়ের ডেপুটি মীর হাবিবের সঙ্গে আলিবর্দির শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগালেন মীর হাবিব। মারাঠিদের আক্রমণের পরিকল্পনায় সাহায্য করেন তিনি। তার পরামর্শেই ভাস্কর পন্ডিত ৭০০ অশ্বারোহী সেনার বাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করেন। আলিবর্দি তখনো কাটোয়ায় অবস্থান করছিলেন। এই সুযোগে পুরো একদিন প্রায় বাধাহীন অবস্থায় মুর্শিদাবাদে লুটতরাজ চালায় মারাঠিরা। ‘ব্যাংকার’ খ্যাত জগত শেঠের বাড়ি থেকে ৩ লাখ রুপি নিয়ে মারাঠিরা কাটোয়ার দিকে ধাবিত হয়, যখন আলিবর্দি মাত্রই এ স্থান ছেড়ে মুর্শিদাবাদে চলে গেছেন। কাটোয়াকে নিজেদের সদর দপ্তর বানায় মারাঠিরা। মারাঠিদের প্রধান উপদেষ্টা ও এজেন্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করছিলেন মীর হাবিব। তিনি হুগলি শহরটি মারাঠিদের জন্য সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেন এবং এর বন্দরের কাছে মারাঠি সেনানিবাস স্থাপন করা হয়, যার প্রধান ছিলেন শেষ রাও।

তারা ধীরে ধীরে রাজমহল থেকে মেদিনীপুর ও জলেশ্বরসহ প্রায় পুরো দেশ দখল করে নেয়। জয় করা দেশের গভর্নর হন শেষ রাও। নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটি গড়ে তোলে মারাঠিরা। জনগণের প্রতি শেষ রাওয়ের সরকার ও তার কর্মকর্তাদের নম্রতা ও দয়াশীল আচরণ শিগগিরই জমিদারদের মন জয় করে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ইংরেজ বণিকদেরও পাশে পায় তারা।

মীর হাবিব দেওয়ান পদে আসীন হলে তিনি জমিদারদের নির্দেশ দেন খাজনা তার কাছেই জমা দিতে। গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে আলিবর্দির রাজত্ব কেড়ে নেয়া হলেও গঙ্গার পূর্ব দিকে তার শাসন ঠিকই চলছিল। যদিও এ অঞ্চলটিতে মাঝে মধ্যেই হানা দিত মারাঠিরা।

সব ধনী ও সম্ভ্রান্ত মানুষজন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে গঙ্গার পূর্বাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলেন। ১৭৪২ সালের শেষ কয়টি মাস মারাঠিরা বীরভূম ও বাংলার অন্যান্য অংশে লুটতরাজ চালায় ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। তারা রেশম ও কাপড়ের কারখানা লুট করে। মানুষ তখন জীবন নিয়ে পালাচ্ছিল। তারা সুন্দরী নারীদের টেনেহিঁচড়ে নিত এবং নির্বিচারে মানুষকে হত্যা ও বিকলাঙ্গ করত। বাংলায় মারাঠিদের লুটতরাজ এবং অমানবিক অত্যাচার ও কুকর্মের সাক্ষী ইংরেজ ব্যবসায়ী হলওয়েল ও প্রত্যক্ষদর্শী গঙ্গারাম ও সমসাময়িক লেখক সলিমউল্লাহ।

বাংলার মানুষজন মারাঠি সৈন্যদের বলত বর্গি এবং বর্গিদের আসার খবর মানে তাদের জন্য একটা দুঃস্বপ্ন। বর্ধমানের মহারাজার রাজকবি বানেশ্বর বিদ্যালঙ্কার মারাঠি অশ্বারোহীদের অমানবিক নির্মমতার বর্ণনা দিয়েছেন।

১৭৪২ সালের বর্ষার প্রারম্ভে কাটোয়ায় শক্তিবৃদ্ধির অপেক্ষায় ছিল মারাঠিরা। আলিবর্দিও পাটনা ও পুর্ণিয়া থেকে দুটি সৈন্যবহর নিয়ে আসেন।

সেপ্টেম্বরে মারাঠি নেতা ভাস্কর পণ্ডিত মহাধুমধামের সাথে দুর্গা পূজা উদযাপন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। জমিদারদের কল্যাণে প্রচুর অর্থও তোলেন তারা। নবমী পূজার দিন (২৭ সেপ্টেম্বর, ১৭৪২) ভোরের দিকে মারাঠিরা যখন ঘুমের ঘোরে, তখন আলিবর্দির বাছাইকৃত আড়াই হাজার সেনা তাদের ওপর আক্রমণ করে। মারাঠিরা তাদের সবকিছু ফেলে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়।

দুই পক্ষেই খুব সামান্য প্রাণহানি ঘটে। ভাস্কর পণ্ডিত তার সৈন্যদের একত্র করে মেদিনীপুর জেলার দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে তার বাহিনী লুটতরাজ চালায়, রাধানগরের বিখ্যাত রেশম তৈরির কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয়। এরপর কটক দখল করে নেয় মারাঠিরা। কিন্তু আলিবর্দি তত্ক্ষণাৎ কটক অভিমুখে গমন করে মাঠারিদের বিতাড়িত করেন এবং তাদের ধাওয়া করে চিল্কা হ্রদের ওপারে পাঠিয়ে দেন। ১৭৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয়ীর বেশে রাজধানীতে ফিরে আসেন আলিবর্দি।

শান্তিতে বসবাসের ভাগ্য হয়তো ছিল না আলিবর্দির। ভাস্কর পণ্ডিতকে সঙ্গে নিয়ে কাটোয়ায় হাজির নাগপুরের রাজা রঘুজি ভোঁসলে। রাজা শাহুকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার খাজনা তোলার অধিকারের অঙ্গীকার করেছিলেন মোগল সম্রাট। শাহু এই খাজনা তোলার দায়িত্ব অর্পণ করেন রঘুজি ভোঁসলের ওপর, যিনি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার খাজনা আদায় করতে কাটোয়ায় আসেন। মারাঠি কর্তৃক বাংলা আক্রমণ রুখতে ১৭৪২ সালের নভেম্বরে পেশওয়া বালাজি রাওকে অনুরোধ করেন দিল্লির সম্রাট। রঘুজিকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে রাজি হন পেশওয়া।

রঘুজি কাটোয়ায় যাওয়ার আগেই বিহারে পৌঁছেন পেশওয়া। তার বাহিনী এতটাই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে বেনারস থেকে বিহার হয়ে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত যাওয়ার সময় তাদের ধোঁকা দিয়ে কিংবা উপহারসামগ্রী দিয়ে খুশি করে মানুষকে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। পেশওয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আলিবর্দির। আনুগত্য ও বন্ধুত্ব বিনিময়ের পর দুজন সম্মত হন যে নবাব রাজা শাহুকে বাংলার চৌথ (খাজনা) প্রদান করবেন এবং পেশওয়ার সেনাবাহিনীর খরচ হিসেবে দেবেন ২২ লাখ রুপি। রঘুজির সঙ্গে পেশওয়া বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। রঘুজি অঙ্গীকার করেন, বাংলা আক্রমণ করবেন না।

কিন্তু ১৭৪৩ সালে ভবিষ্যতের জন্য কলকাতায় পরীখা খনন করে মারাঠিরা। তখন রঘুজিকে তাড়া করে বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন পেশওয়া।

আলিবর্দি ভেবেছিলেন, তিনি মারাঠা সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস পরই তিনি চমকে গেলেন। উড়িষ্যা ও মেদিনীপুর হয়ে আবারো বাংলা আক্রমণ করেন ভাস্কর পণ্ডিত। আগের দুই বছরের মিশন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। এছাড়া যখন শুনলেন সংক্ষিপ্ত এক মিশনের জন্য আলিবর্দির কাছ থেকে ২২ লাখ রুপি নিয়েছেন পেশওয়া, তখন ভাস্কর পণ্ডিত আরো ক্ষেপে যান। সঙ্গত কারণেই তিনি আগের চেয়ে নির্দয় হয়ে ওঠেন।

ভাস্কর পণ্ডিতের উপস্থিতির আরেকটি কারণ ছিল। শাহুর উপস্থিতিতে বৈঠকে মিলিত হন পেশওয়া ও রঘুজি এবং তাদের মধ্যে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ভেঙে শাসন করার একটি আপসরফা হয়। বিহার ছাড়াও শাহাবাদ ও তিকারিসহ পাটনার পশ্চিমাংশ উপভোগ করার কথা ছিল পেশওয়ার; আর বাংলা, উড়িষ্যা, বিহারের একাংশ ও পাটনার পূর্বাঞ্চল শাসন করার কথা ছিল রঘুজির। উভয় পক্ষকেই কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়, যেন কেউ অন্যের অংশে আক্রমণ কিংবা প্রবেশ না করেন।

এদিকে মারাঠিদের পুনরায় আগমনে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন আলিবর্দি। কয়েক বছরের ধারাবাহিক যুদ্ধ আর দিল্লির সম্রাটকে উপঢৌকন দিতে দিতে তার কোষাগারও শূন্য হয়ে পড়ে। তার সেনাবাহিনীর শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই মারাঠিদের সঙ্গে আরেকটি সামরিক যুদ্ধ মনেপ্রাণে এড়াতে চাইছিলেন আলিবর্দি। সংকটময় মুহূর্তে শীর্ষ অধিনায়ক গোলাম মুস্তফা খান পরামর্শ দেন, যেন বন্ধুত্বপূর্ণ মীমাংসার অজুহাতে ভাস্কর পণ্ডিতকে ডেকে তাকে শেষ করে দেয়া হয়।

বর্তমানে যেখানে বেরহামপুর সেনানিবাস সেখানকার এক তাঁবুতে সাক্ষাত্কারের জন্য ডাকা হয় ভাস্কর পণ্ডিতকে। মারাঠা সেনাপতি কোনো সন্দেহ পোষণ না করেই তার ২১ অধিনায়ককে নিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করার পর পর্দার আড়ালে থাকা ঘাতকরা তাদের নির্বিচারে হত্যা করে। শুধু রঘুজি গায়কোয়াড় একা পালিয়ে যেতে সমর্থ হন। ১৭৪৪ সালের ৩১ মার্চের ওই ঘটনার পর ১৫ মাস পর্যন্ত শান্তি বজায় থাকে এবং বাংলায় কোনো মারাঠি আক্রমণ হয়নি। সেনাপতি ও অধিনায়কদের হারিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হলেও রঘুজি ভোঁসলে তত্ক্ষণাৎ চুপ থাকেন, তিনি তহবিল সংগ্রহের চেষ্টায় থাকেন।

১৭৪৫ সালে আীীলবর্দীর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও সহযোগী আফগানদের সঙ্গে তার ঘোরতর শত্রুতা তৈরি হয়। ভাস্কর পণ্ডিত ও তার অধিনায়কদের হত্যা পরিকল্পনার স্থপতি গোলাম মুস্তফাকে বিহারের গর্ভনর করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণের কোনো তত্পরতা দেখাননি আলিবর্দি। তখন নবারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি অনুসারী সৈন্যদের নিয়ে বিহার চলে যান ও সেখানে গিয়ে বিদ্রোহ করেন। বিহারের ডেপুটি গভর্নর জয়েন-উদ-দিনের কাছে পরাজিত হলেও মুস্তফা কোনো দ্বিধা না করেই বাংলা আক্রমণের জন্য রঘুজি ভোঁসলের সঙ্গে আঁতাত করেন। আলিবর্দি তখন বিহার গিয়ে মুস্তফাকে তাড়া করে বর্তমান উত্তর প্রদেশের চুনার পাঠিয়ে দেন। কিন্তু বাংলা থেকে আলিবর্দির অনুপস্থিতির সুযোগে রঘুজি উড়িষ্যা আক্রমণ করে উড়িষ্যা থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত দখল করে নেন।


রঘুজি তখন বর্ধমানে প্রবেশ করে সাত লাখ রাজস্ব দখল করেন এবং বীরভূমের দিকে যান। আলিবর্দি দ্রুত মুর্শিদাবাদ ফিরে এসে সৈন্যবাহিনী তৈরি করতে থাকেন। এ সময় রঘুজি বিহারে ফিরে যান, যেখানে মুস্তফা চার হাজার আফগান সৈন্যসহ তার সঙ্গে যোগ দেন। ১০ হাজার মারাঠি অশ্বারোহী ও চার হাজার আফগান সেনা তখন বিহারের বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ চালায়। আলিবর্দি কালবিলম্ব না করেই বিহারের দিকে ছুটে যান। তখন রঘুজি পালিয়ে যেতে সমর্থ হন।

বেশকিছু যুদ্ধের কারণে আলিবর্দির সৈন্যদের বিশ্রাম দেয়ার প্রয়োজন পড়ে এবং যুুুুুুদ্ধ কয়েকদিন স্থগিত করা হয়। এ সুযোগটা কাজে লাগান আলিবর্দির শত্রু মীর হাবিব। তিনি মুর্শিদাবাদ গিয়ে অরক্ষিত শহরে লুটতরাজ চালান। হাবিবকে প্রায়ই ধরে ফেলেন আলিবর্দি, যদিও তার সব রসদ লুট করে নিয়ে নেয় মারাঠিরা। আলিবর্দি পৌঁছার আগেই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত পথে মুর্শিদাবাদ পৌঁছে যান রঘুজি।

মুর্শিদাবাদ পৌঁছার পরদিনই রঘুজিকে তাড়া করেন আলিবর্দি, যদিও মারাঠিরা তখন কাটোয়ায় চলে যেতে সমর্থ হয়। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধে আলিবর্দির কাছে পরাজিত হয়ে আড়াই হাজার মারাঠি সেনা ও চার হাজার আফগান সেনা মীর হাবিবের অধীনে রেখে রঘুজি চলে যান নাগপুরে। কাটোয়ায় রঘুজির রেখে যাওয়া সৈন্যদের সঙ্গে আরেক দফায় যুদ্ধে নামতে চাননি অবসন্ন আলিবর্দি এবং তিনি মুর্শিদাবাদ ফিরে যান। আলিবর্দি পরের বছর (১৭৪৬) আবারো শত্রুদের দিকে অগ্রসর হন এবং তাদের বিহার থেকে বিতাড়িত করেন।

১৭৪৬ সালের অক্টোবরে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন দিল্লির সম্রাট। তিনি এই নির্দেশ দিতে সম্মত হন যে বাংলা থেকে ২৫ লাখ ও বিহার থেকে ১০ লাখ চৌথ দেয়া হবে রাজা শাহুকে। যদিও এতে রাজি হননি আলিবর্দি। তার কথা ছিল, বাংলা ও বিহারে রঘুজির আক্রমণ প্রতিহত করতে শাহুর অপারগতার জন্য তাকে শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়োজিত রাখতে হয়েছে। নিজের সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য আলিবর্দি অপেক্ষাকৃত বিচক্ষণ ও সাহসী নীতিই গ্রহণ করেন।

রঘুজির ছেলে জানোজি ভোঁসলে ১৭৪৭ সালে কটক হয়ে এসে মীর হাবিবের সঙ্গে যোগ দেন। এদিকে মীর জাফর মেদিনীপুর থেকে পালিয়ে বর্ধমানে আশ্রয় নেন। ওই সময় রাজমহলের ফৌজদার আতাউল্লাহ তার আত্মীয় ও হিতাকাঙ্ক্ষী আলিবর্দিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে আতাউল্লাহ ও মীর জাফর দুজনকেই অপসারণ করা হয়। ৭১ বছর বয়সী আলিবর্দি তখন জানোজির মুখোমুখি হয়ে তাকে পরাজিতও করেন (১৭৪৭), যদিও উড়িষ্যা ও মেদিনীপুর থেকে মারাঠিদের বিতাড়িত করতে পারেননি।

১৭৪৮ সালে আহমাদ শাহ আবদালি ভারত আক্রমণ করলে আলিবর্দির অধীনস্থ সাবেক আফগান সৈন্যরা ভাবতে শুরু করে, ভারতে আফগান শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় বুঝি এসে গেছে। তখনই বিহারের ডেপুটি গভর্নর জয়েন-উদ-দিনকে হত্যা করে পাটনা দখল করে নেয় তারা। জয়েন-উদ-দিনের বাবা ও আলিবর্দির বড় ভাই হাজি আহমাদকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। বিহারে আফগান শাসন কায়েম হয়। ফলে আলিবর্দিকে আবারো বিহার অভিমুখে গমন করতে হয়।

১৭৪৯ সালে মারাঠিদের পরাজিত করে উড়িষ্যা পুনরুদ্ধার করেন আলিবর্দি, যদিও মারাঠিদের ভয়ে বাংলার কোনো সম্ভ্রান্ত লোক সেখানকার প্রাদেশিক শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে চাইছিলেন না। একজন অযোগ্য ব্যক্তিকে উড়িষ্যার দায়িত্ব দিয়ে আলিবর্দি চলে যান, যদিও এক সপ্তাহের মধ্যেই তার পতন ঘটায় মারাঠিরা। যা-ই হোক, বাংলায় মারাঠিদের প্রবেশ বন্ধে মেদিনীপুরে স্থায়ী সেনাশিবির স্থাপন করেন আলিবর্দি।

১৭৫০ সালে মারাঠিরা আবারো বাংলা আক্রমণ করে। তখন আলিবর্দি পিছু হটে মেদিনীপুর থেকে বর্ধমানে চলে যান। সেখানে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মারাঠিরা জঙ্গলে আশ্রয় নেয়।

১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত মারাঠিরা বারবার বাংলা আক্রমণ করে এবং প্রতিবারই আলিবর্দি তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন। তা সত্ত্বেও মারাঠিদের অবিরত আক্রমণের ফলে বাংলার জনসাধারণ ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। শেষ পর্যন্ত ১৭৫১ সালের মে মাসে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলায় মারাঠি আক্রমণের অবসান ঘটে।

এ চুক্তির ফলে উড়িষ্যা কার্যত মারাঠিদের হস্তগত হয় এবং আলিবর্দি মারাঠিদের বার্ষিক হারে চৌথ প্রদান করতে রাজি হন। বাংলা থেকে চৌথ হিসেবে তারা পায় ১২ লাখ রুপির মতো।

রঘুজির সেনাবাহিনীর খরচ বাবদ উড়িষ্যার প্রাদেশিক সরকারকে অতিরিক্ত রাজস্ব দিতে হয়েছিল। বিনিময়ে মারাঠিরা আর কখনই আলিবর্দির সাম্রাজ্যে পা রাখেনি।

মীর হাবিব উড়িষ্যার প্রাদেশিক শাসক হিসেবে নিয়োগ পান। যদিও ১৭৫২ সালে মারাঠি সৈন্যদের হাতে নিহত হন ও সেখানে মারাঠিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। উড়িষ্যা বাংলার নবাবী ও মোগল সাম্রাজ্য থেকে হারিয়ে যায়। বাংলায় মারাঠি আক্রমণের এটাই ছিল সর্বশেষ ফলাফল।

 

হিস্ট্রি ডিসকাশন থেকে অনূদিত