গাড়ির দরজা খুলে মেয়েটি বেরিয়ে আসে। তারপর ইতি-উতি চায়। ঠিক এ সময়েই তার পেছনে গাড়ির অন্য দরজাটি খোলা ও বন্ধ করার আওয়াজ শুনে মেয়েটি ফিরে তাকায়। মেয়েটির মুখে একটি মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে। গাড়ির ও পাশ দিয়ে যে সুদর্শন তরুণটি বেরিয়ে আসে, সেই মেয়েটির মনের মানুষ। ঐ মানুষটির সঙ্গে সে গাঁট-ছড়া বাঁধবে আগামী মাসের শেষের দিকে - তার আয়োজন চলছে দ্রত গতিতে। ল্যারি নামীয় তরুণটি মেয়েটির পাশে এসে বড় নরম করে তার হাত ধরে - ঘটে চার চোখের মিলন। তারপর দু'জনেই পূর্ণদৃষ্টিতে সামনের বাড়িটির দিকে তাকায়।
না, আহামরি কোন হর্ম নয়, নয় কোন সুরম্য প্রাসাদ। আমেরিকার যে কোন শহরতলীর আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত গৃহস্থালী বাড়ির মতো সামনের বাড়িটি। এই আরিজোনা অঙ্গরাজ্যে এমন বাড়ি আকচারই দেখা যায়। মেয়েটি তার দয়িতের দিকে তাকায়। তার কেমন যেন ভয় ভয় করছে, সে টের পায় যে একটা অজানা শির শিরে অনুভূতি তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। হাতের তালু ঘেমে ওঠে তার। সে শক্ত করে ছেলেটির হাত ধরে, তারপর দু'জনেই এগিয়ে নিয়ে যায় বাড়িটির সদর দরজার দিকে।
বাড়ির বৈদ্যুতিক ঘন্টির ওপর হাত রাখতেই ভেতরে একটি মিষ্টি পাখীর ডাক বেজে ওঠে। তারপরই দরজা খুলে যায়। আর যে প্রৌঢ়টি তাদের সামনে বেরিয়ে এলেন, তাকে মেয়েটি নিশ্চিতভাবে চেনে। ‘কাকে খুঁজছেন?’, ভারী ভদ্র গলায় প্রৌঢ়টি বলেন। ‘আমরা উত্তর ক্যারিলোনা থেকে আসছি। আমার নাম লিন্ডা স্মিথ।’ নরম গলায় মেয়েটি তার পরিচয় দেয়। তারপর তরুণটির ফিরে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রৌঢ়টির চোখে মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না। বোঝাই যায় যে তরুণী-তরুণটিকে তিনি চেনেন না।
‘আমার বাবার নাম স্যামুয়েল স্মিথ। পাঁচ বছর আগে তিনি একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তার হৃৎপিণ্ড ...’, মেয়েটি কথা শেষ করতে পারে না, তার আগেই সামনের প্রৌঢ়টি সব ভব্যতা ভুলে মেয়েটিকে উঞ্চ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন। মেয়েটির দু’চোখ ছাপিয়ে জলধারা নামে। বোঝা যায় প্রৌঢ়টিও তার আবেগ আটকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। নিজেকে কিছুটা সামলে তিনি মেয়েটির হাত ধরেন পরম মমতায়। মৃদু স্বরে বলেন, ‘এসো, ভেতরে এসো’।
মেয়েটি ঘরে ঢুকেই বুঝতে পারে, এ ঘরে কোন নারীর মায়াময় স্পর্শ পড়েনি। সবকিছু অগোছালো, নানান জিনিষ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রৌঢ়টি মেয়েটির মনোভাব বুঝতে পারেন। একটু বিষণ্ণ হেসে বলেন, ‘আমি তো একাই থাকি। তাই গুছিয়ে উঠতে পারি না - আর সবসময়ে ইচ্ছেও করে না’।
তারপর যেন হঠাৎই তার মনে পড়ে, তরুণটির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দ্যাখো দেখি, তোমাকেই তো আমার পরিচয় দেয়া হয়নি, ল্যারি। আমার নাম পল ল্যাড। লিন্ডার বাবার ...’, তার কথা শেষ করার আগেই ল্যারি তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাতে প্রৌঢ়টির দু’হাত নিজের হাতে নিয়ে মোলায়েম স্বরে বলে, ‘আমি সব জানি। লিন্ডা আমাকে সব বলেছে।’
প্রৌঢ়টির দৃষ্টি ততক্ষণে চলে গিয়েছে জানালা গলিয়ে বাইরের আরিজোনার মরুভূমি ছাড়িয়ে দূরে কোন এক নাম না দেশে। একটু উদাস স্বরে তিনি বলেন, ‘লিন্ডার বাবার জন্যই আমি বেঁচে আছি। উনি আমাকে দ্বিতীয় জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন’, ভদ্রলোকের গলা ধরে আসে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে কেন এসেছো, লিন্ডা?’
পলের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে যেন দূরে কোথায় কিছু একটা দেখছে, তেমন একটি মায়াময় স্বরে লিন্ডা বলে, ‘আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন বাবা আর আমার মধ্যে একটা খেলা ছিল। আমি দুষ্টুমী করে প্রায়ই বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘আমি তোমার কে বাবা? একটু হেসে বাবা আদর করে আমার ছোট্ট হাতটা তার বুকের ওপরে রেখে বলতেন, ‘সোনা মানিক আমার, তুমি হচ্ছ গিয়ে আমার হৃদয়। আজ বাবার হৃৎপিণ্ডটি আপনার বুকের মধ্যে ধুকধুক করছে। বাবা চলে গিয়েছেন, কিন্তু তিনি তো হৃদয়টি দিয়ে গেছেন আপনাকে,’ টলটল জলে ভরে ওঠে লিন্ডার চোখ, কণ্ঠ তার রুদ্ধ হয়ে আসে।
কথার শেষটুকু শেষ করে ল্যারি। পলের তাকিয়ে বলে, ‘আগামী মাসের শেষাশেষি আমরা বিয়ে করছি। লিন্ডার ভারী ইচ্ছে, আপনিই ওকে সম্প্রদান করুন। আমারও তাই। লিন্ডার বাবা বেঁচে থাকলে তিনিই ও কাজটি করতেন। আজ তিনি নেই ঠিকই, কিন্ত এক অর্থে তিনি তো বেঁচে আছেন আপনার মাঝে - আপনার প্রতিটি হৃদস্পন্দনের মধ্যে’, ল্যারির কন্ঠও স্হির থাকল না - কেঁপে উঠল আবেগে।
ধীরে ধীরে পল উঠে দাঁড়ালেন। দু’হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন ল্যারি আর লিন্ডাকে পিতার মমতায়। শক্ত করে ধরে রইলেন দু’জনকেই। তিনজনের কারো চোখই শুকনো রইল না। একটি ছোট্ট মেয়ের মতো লিন্ডার মুখ লুকিয়ে থাকল পলের বুকে - ঠিক ছোটবেলায় যেমন সে বাবার বুকে মুখ লুকাত। এবং তার অশ্রুধারায় ভিজে যাচ্ছিল পলের জামা।
পরের মাসে বিয়ের অনুষ্ঠানে গির্জায় যখন বাজনা বেজে উঠল, তখন পলের বাহুতে হাত রেখে লিন্ডা আর পল পরস্পরের দিকে তাকালেন স্মিতহাস্যে। তারপর বাজনার তালে তালে মৃদু পদক্ষেপে পা বাড়ালেন অভ্যাগতদের মাঝ দিয়ে মঞ্চের দিকে যেখানে ল্যারি আর যাজক অপেক্ষা করছেন। সাদা কনের পোশাকে লিন্ডাকে এক অপ্সরার মতো লাগছিল। ল্যারির পাশে লিন্ডাকে পৌঁছে দিয়ে পল লিন্ডার অবগুণ্ঠন সরিয়ে দিলেন, তার গালে নরম করে চুম্বন করলেন পিতার স্নেহে।
তারপর অভ্রান্তভাবে বড় মমতায় লিন্ডার ডান হাতটি তুলে তার বুকের বাঁ পাশে আস্তে করে রাখলেন - যেখানে লিন্ডার পিতার হৃদপিন্ডটি ধুক ধুক করছে। ঝাপসা চোখে পলের মুখে তাকাতে তাকাতে লিন্ডা দেখল, পল কোথায় - সেখানে স্থির হয়ে আছে তার পিতার মুখ।
সেলিম জাহান
ভূতপূর্ব পরিচালক
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং
দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র





