শাহজাদা আজমের দরবারে

আলিবর্দি খানের বাবা শাহ কুলি খান মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজমের স্বর্ণালংকারসংক্রান্ত দপ্তরের দেখভাল করার দায়িত্বে ছিলেন। শাহজাদা আজমের ঘরেই আলিবর্দির জন্ম। অধীনস্থ রাজকর্মচারীর সন্তানের মধ্যে যে বিশেষ কিছু গুণ রয়েছে, তা শাহজাদা আজম আলিবর্দির শিশুবয়সেই খেয়াল করেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘এই শিশু একদিন প্রশাসক হবে।’ শাহজাদার ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার জন্য আলিবর্দিকে পাড়ি দিতে হয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রামের পথ।

আলিবর্দি খানের জীবনে এক সন্ধিক্ষণ নেমে আসে শাহজাদা আজমের মৃত্যুর কারণে। আজমের জীবদ্দশায় শাহ কুলি খান রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বলে পরিবারের ব্যয়নির্বাহ করতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। অল্প বয়সেই আলিবর্দি খান শাহজাদা আজমের দরবারের সেলাইঘর ও পিলখানার দেখভালের দায়িত্বও পেয়েছিলেন। সে সময় রাজদরবারের তরুণ অভিজাত সদস্যদের সঙ্গেও আলাপ ও সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। কিন্তু বড় ভাই শাহজাদা মোয়াজ্জেম বা সম্রাট বাহাদুর শাহর হাতে শাহজাদা আজম নিহত হওয়ার পর তার সমুদয় সম্পদও চলে যায় শত্রুপক্ষের হাতে। আগের সেই আভিজাত্য ধুলোয় লুটাল, নিয়মিত পেটে অন্ন পাওয়াটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। আলিবর্দি খান ও তার পিতা উভয়েই ছিলেন ছিলেন আজমের প্রতি বিশস্ত ও তার একান্ত অনুগত। সুতরাং তার অনুপস্থিতি তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের দিন ডেকে আনল। পরে আলিবর্দি খান কিছুদিন একাধিক অভিজাত রাজন্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীতে অশ্বারোহী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু এ ধরনের ‘মার্সেনারি’ বা ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর কাজে যাওয়াটা তার জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিল না। অতএব তিনি নিজেকে খানিক গুটিয়ে নিয়ে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে দিনযাপন করতে থাকেন।

উড়িষ্যায় এসে থানাদার হলেন

বাংলার সুবাদার নবাব মুর্শিদ কুলি খানের জামাই সুজা খানের সঙ্গে আলিবর্দি খানের পারিবারিক একটা যোগাযোগ ছিল। লতায়-পাতায় তারা বস্তুত একই বংশের লোক। সুজা খানের বিরুদ্ধে লাখ খানেক মোহর হাতিয়ে নেয়ার একটা অভিযোগ ওঠায় তাকে দিল্লি থেকে উড়িষ্যায় সুবেদার হিসেবে পাঠানো হয়। সুজা খান উড়িষ্যায় যখন যান, তখন আলিবর্দির বাবা তার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। পরে শাহ কুলি খানের অনুরোধের কারণে নবাব অনুগ্রহ করে আলিবর্দিকে উড়িষ্যায় আসার জন্য একটি আদেশপত্র পাঠান। কিন্তু তখন দেখা গেল আরেক মুশকিল, উড়িষ্যায় যে যাবেন, তার জন্য তো আলিবর্দির হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই। অগত্যা উপায় না দেখে আলিবর্দি তার বিবির গয়নাগাটি বিক্রি করে ৯০০ টাকা জোগাড় করেন। এর মধ্যে ৬০০ টাকা দিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করেন, বাকি ৩০০ টাকা ব্যায় করেন নিজের জন্য একটা ঘোড়া কিনতে।

নিজের হাতে প্রায় সর্বস্ব খরচ করে উড়িষ্যায় আসার পর আলিবর্দির হাত ছিল একদমই ফাঁকা। সুজা খানের আশীর্বাদ না পেলে তাকে না খেয়েই মরতে হতে পারে, এমন শঙ্কাও ছিল। কিন্তু ভাগ্যদেবী আলিবর্দির প্রতি অপ্রসন্ন হননি। আলিবর্দির প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তা সুবাদার সুজাকে আকর্ষণ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই আলিবর্দি তার প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। অবিলম্বে তাকে ১০০ টাকা মাসিক বেতনে সাতান্দ্রাপুর এলাকার থানাদার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সাতান্দ্রাপুর থানাটি কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই এলাকার সীমান্তবর্তী তিন রাজ্যের স্বাধীন রাজারা ছিলেন সুবাদারের বিরুদ্ধে। ফলে তাদের সঙ্গে আলিবর্দি নিজের ঘাড়ে পড়া দায়িত্ব মসৃণভাবে চালিয়ে নিতে আদৌ পারেন কিনা তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় ছিল। কিন্তু ভালো ব্যবহার ও দক্ষ শাসকসুলভ বিনয়ী আচরণের মাধ্যমে ওই তিন রাজ্যের রাজার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চাইছিলেন আলিবর্দি। এতে তিনি সফলও হলেন। তিন রাজা বুঝতে পারলেন, স্বয়ং সুবেদার ও সুবেদারের এই প্রতিনিধি তাদের শত্রু নন, বরং সময় এলে তিনি পরম বান্ধবও হয়ে উঠতে পারেন। অতএব তারা আলিবর্দির সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে তার আজ্ঞানুবর্তী হওয়াকেই শ্রেয় বলে মেনে নিলেন।

কিন্তু সবসময় মুখের কথায় চিঁড়া ভেজাবেন, এমন পুরোদস্তুর শান্তিবাদীও আলিবর্দি খান ছিলেন না। যারা সুবাদারদের বিরুদ্ধে নানা রকম তত্পরতা চালাচ্ছিল পুরো উড়িষ্যাজুড়ে, তিনি যেন তাদের প্রায় সবাইকেই শায়েস্তা করবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। উড়িষ্যার আনাচে-কানাচে যত বিদ্রোহী ও নাশকতাকারীর হদিস মিলেছিল, তাদের সবাইকে হয় আলিবর্দি উত্খাত করেন, নয়তো সোজা নিকেশ। খালিকোট ও থানা মালুদ এলাকার যুদ্ধে তার পারদর্শিতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। এ রকম সাফল্য লাভে উৎসাহিত হয়ে সুজা খান আলিবর্দিকে নির্দেশ দেন, এবার আক্রমণ করতে হবে কুজঙ্গ দুর্গ। যে দুর্গ কিনা সমুদ্রের এক দ্বীপপুঞ্জের মাঝখানে অবস্থিত। কাজেই ভেবেচিন্তে অভিযান না চালালে পরিস্থিতি ঘোরতর জটিল হওয়ার আশঙ্কা। এমনকি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ওই দুর্গ আক্রমণ করাটা শেষমেশ বোকামিতে পর্যবসিতও হতে পারে বৈকি। আলিবর্দি খান নানা হিসাব কষেই অভিযান পরিচালনা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। কুজঙ্গ দুর্গ তিন বছর ধরে অবরোধের পর তিনি তা দখল করতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রক্তপাত এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন আলিবর্দি। দুর্গাধিপতিকে তিনি এই মর্মে এত্তেলা পাঠান যে আত্মসমর্পণ করলে তিনি ও তার অধীনস্থ সবার প্রাণটুকু অন্তত রক্ষা পাবে। উপরন্তু তিনি নবাবের অনুগ্রহও পেতে সক্ষম হবেন। দুর্গাধিপতি এ প্রস্তাবে সাড়া দেন। আত্মসমপর্ণের খবর সুজা খানের কানে পৌঁছলে তিনি আলিবর্দির ওপর যারপরনাই খুশি হয়ে তাকে ওই দুর্গেই শাসক হিসেবে থেকে যেতে বলেন। কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ ওই দুর্গের দায়িত্ব অবশ্য আলিবর্দির মতো বিচক্ষণ ব্যক্তির হাতেই পড়া সঙ্গত ছিল।

অতঃপর বিহারের নায়েব সুবাদার

মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যু হলে সুজা খানের পুত্র সরফরাজ খান নিছক গায়ের জোরে বাংলার মসনদ দখল করেন ১৭২৭ সালে। পুত্রের এই অন্যায্য পদক্ষেপ তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। পরে তিনি বাংলায় ফিরে গিয়ে সুবাদারের পদে আসীন হন। তবে ওই আলিবর্দি সুজা খানের সঙ্গী হয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। ঐতিহাসিক করম আলী খানের মতে, ওই সময় আলিবর্দি খান দুর্গেই ছিলেন। সুজা খানের সঙ্গে বাংলায় আসতে পারেননি। আবার আরেক ইতিহাসকার ইউসুফ আলী খান এ বিষয়ে কিছুই লেখেননি।

পরে বিহার-বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকা রাজমহলের ফৌজদার হিসেবে আলিবর্দি নিয়োগ পান। কিছুদিন পর তাকে বিহারের নায়েব সুবেদার (সহকারী বা ডেপুটি) করে পাঠানো হয়। বিহারে আসার পর আলিবর্দি মূলত দুই বিষয়ে অধিকতর মনোযোগ দিয়েছিলেন। প্রথমত, তিনি রাজস্ব আদায়ের ওপর অধিক মাত্রায় জোর দেন এবং দ্বিতীয়ত, বিহারের সমস্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দমনের লক্ষ্যে তত্পরতা আরম্ভ করেন।

বিহারের ভোজপুরের জমিদাররা নবাবি প্রশাসনকে কর দিতে খুব একটা ইচ্ছুক ছিল না। প্রায়ই নানা অজুহাতে তারা কর প্রদান এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। তাছাড়া তাদের মধ্যে ছিল জুলুমবাজি করে ক্ষমতা বিস্তারের নেশা। এজন্য তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিতেও দ্বিধায় ভুগত না। আলিবর্দি খান বেশ প্রস্তুতি নিয়ে ভোজপুরে হামলা চালান। দাপুটে জমিদাররা পরে দ্রুতই পালাতে বাধ্য হয়। অনেকে নিহত হয়। কেউ কেউ নায়েব সুবাদারের বাহিনীর হাতে ধরাও পড়ে। আলিবর্দি তাদের বহু ঘাঁটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন। একইভাবে তিনি সেনা পাঠিয়ে বেত্তিয়া ও ভুনরা অঞ্চলের দুই রাজাকেও পরাস্ত করেন। পরে বেত্তিয়া এলাকার দস্যু বনজার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও তার নির্দেশনায় অভিযান পরিচালিত হয়। বেত্তিয়া ও ভুনরার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আলিবর্দির অন্যতম সেনাপতি আবদুল করিম আফগান। যুদ্ধে জয় পাওয়ায় আবদুল করিম আফগান সাধারণ সৈন্য ও জনতার মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। আবার তার নিজের মধ্যেও উচ্চাভিলাষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছিল। আলিবর্দিকেও তিনি বিশেষ তোয়াক্কা করছিলেন না। এমন অবস্থায় আলিবর্দি সাত-পাঁচ ভেবেই নিজের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল করিমকে হত্যা করেন।

এরপর টিকারির জমিদার সুন্দর সিংহ ও বীরভূমের রাজা আসাদ-উজ-জামান খানের বিরুদ্ধে তিনি আরো দুটি উল্লেখযোগ্য অভিযান পরিচালনা করেন। এর মাঝে ১৭৩৮ সালে সুজা খানের মৃত্যু হলো। মসনদে বসলেন সরফরাজ খান। সরফরাজ খান সম্ভবত কারো প্ররোচণায় আলিবর্দির বিরোধিতা করতে নেমেছিলেন তখন। বুদ্ধিমান আলিবর্দি সবকিছু দেখেও তখন চুপ ছিলেন। বরং তিনি কখন উপযুক্ত সময় আসে, এই ভেবে অপেক্ষা করতে থাকলেন। পাশাপাশি বহিরঙ্গে এমন ভাব ধরলেন, যেন তিনি সরফরাজ খানের একান্তই অনুগত। নয়া নবাবের প্রতি তার শ্রদ্ধা-ভক্তিও কম নেই। মাথা গরম সরফরাজ খান আলিবর্দির প্যাঁচ বুঝতে অক্ষম ছিলেন। সুতরাং আলিবর্দি তাকে হটিয়ে বাংলার মসনদ দখলে নেবেন, এটা ছিল তার ভাবনার অতীত। তার ওপর আলিবর্দির বিনয়ী ব্যবহারও তাকে বিভ্রান্ত করেছিল। যা হোক, দুই বছর অপেক্ষা করার পর ১৯৪০ সালে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আলিবর্দি রীতিমতো ছক কষে অতঃপর চললেন সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলা দখল করতে।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক