কঠোর পরিশ্রম
ও সুনির্দিষ্ট
কর্মসূচি ছাড়া
জগতে কেহই
বড় হইতে
পারে না।
আবার ইতিহাসে
দেখা যায়,
সমস্ত বড়
লোকই একটা
নির্দিষ্ট কর্মসূচী
অনুযায়ী কাজ
করিয়া গিয়াছেন।
নওয়াব আলীবর্দি
খাঁরও একটা
কার্যসূচী ছিল।
নতুবা তাঁহার
পক্ষে বাঙ্গালা,
বিহার ও
উড়িষ্যা একত্রে
এই তিনটি
প্রদেশের শাসনকার্য
সুষ্ঠুরূপে সম্পাদন
করা কিছুতেই
সম্ভবপর হইয়া
উঠিত না।
সৈয়দ গোলাম
হোসেন নামক
জনৈক সুপণ্ডিত
তাঁহার এবং
তদীয় জামাতা
ও দৌহিত্রের
অধীনে উপদেষ্টা
হিসাবে কাজ
করিতেন। তাঁহার
লিখিত ‘সিয়ারুল
মতাআখখেরীর’ (হাল
জামানার হালচাল)
১৭৩৫-৮৩
খৃস্টাব্দ পর্যন্ত
মোগল সাম্রাজ্য
ও পূর্ব
ভারতের নওয়াবী
আমলের একখানা
নির্ভরযোগ্য ইতিহাস
লিখিয়া গিয়াছেন।
তাহা হইতে
আলীবর্দি খাঁর
কার্যসূচী নিম্নে
সংকলিত হইল।
আলীবর্দি খাঁ
ছিলেন একজন
ধর্মনিষ্ঠা শিয়া
মুসলমান। তিনি
উন্নত নৈতিক
চরিত্রের অধিকারী
ছিলেন। তাহার
অবসর কাটিত
প্রধানতঃ নামায
পড়িয়া কিম্বা
কুরআন শরীফ
বা ঐতিহাসিক
গ্রন্থ পাঠ
শুনিয়া। তাঁহার
একমাত্র বিলাসিতা
ছিল সুখাদ্য;
কিন্তু তাহাও
তিনি খুব
অল্প পরিমাণে
খাইতেন। সূর্যোদয়ের
দুই ঘণ্টা
পূর্বে শয্যা
ত্যাগ করা
ছিল তাঁহার
অপরিহার্য নিয়ম।
প্রাতঃক্রিয়া সম্পাদনের
পর অযু
করিয়া তিনি
তাহাজ্জুদ নামায
আদায় করিতেন;
তত্পরে প্রত্যুষে
পড়িতেন ফজরের
নামায। অতঃপর
তিনি কয়েক
জন বন্ধুর
সহিত একত্রে
কফি পান
করিতেন। বেলা
৭টার সময়
তিনি অন্তঃপুর
ত্যাগ করিয়া
বাহিরে আসিতেন
এবং অত্যন্ত
জাঁকজমকের সহিত
দরবারে বসিতেন।
সভাসদবর্গ এবং
সামরিক ও
অন্যান্য কর্মচারী
এই সময়
তাঁহার নিকট
তাঁহাদের বক্তব্য
পেশ করিতেন।
যে কেহ
তাঁহার সহিত
সাক্ষাৎ করিতে
পারিত। তিনি
ধৈর্যের সহিত
তাহাদের অভিযোগ
শ্রবণ করিয়া
তাহার যথোপযুক্ত
প্রত্যুত্তর দিতেন।
উত্তরদানের বেলায়
তাহাদের ত্রুটি
সাধনের প্রতি
সর্বদা তাঁহার
লক্ষ্য থাকিত।
দুই ঘণ্টা
পরে তিনি
দরবার ভাঙ্গিয়া
একটি ক্ষুদ্র
কক্ষে গমন
করিতেন। সেখানে
তাঁহার কয়েকজন
বিশিষ্ট বন্ধু
জামাতা নওয়াজশ
মুহম্মদ খাঁ
ও সয়্যিদ
আহমদ খাঁ,
জয়নুদ্দীন আহমদ
খাঁ ও
দৌহিত্র সিরাজুদ্দৌলা
প্রমুখ কতিপয়
নিকটাত্মীয় হাজির
থাকিতেন। তাঁহাদের
সহিত কথোপকথন
করিয়া এবং
কোন কবিতা
পাঠ শুনিয়া
বা নিজে
কোন কবিতা
পাঠ করিয়া
অথবা কোন
আনন্দদায়ক গল্প
শ্রবণ করিয়া
পূর্ণ এক
ঘণ্টাকাল ধরিয়া
তিনি তাঁহার
চিত্তবিনোদন করিতেন।
এই সময়
কোন রন্ধন-নিপুণ
বাবুর্চি সেখানে
খানা পাক
করিত; পাককার্য
তাঁহার সাক্ষাতে
সম্পন্ন করা
ছিল অপরিহার্য।
ইহার কারণ
সহজেই অনুমেয়।
সময় সময়
তিনি গোশত,
মসলা ও
অন্যান্য প্রয়োজনীয়
দ্রব্য আনায়ন
করিয়া তাঁহার
ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
ও নির্দেশ
অনুযায়ী তদ্বারা
কোন বিশেষ
খাদ্য প্রস্তুত
করিবার আদেশ
দিতেন। অনেক
সময় তিনি
কোন নতুন
পাক-প্রণালী
উদ্ভাবন করিতেন।
যে সকল
আমীর, ভদ্রলোক
ও বিভাগীয়
কর্মকর্তা দরবারে
উপস্থিত হইতেন,
ও হাজির
থাকিতেন তাঁহাদের
কাহারও কোন
বক্তব্য থাকিলে
তাঁহাকে মধ্যে
মধ্যে তাঁহার
নিকট হাজির
করান হইত।
রন্ধনকার্য শেষ
হইয়া গেলে
খানসামা বিবিধ
খাদ্যদ্রব্য কয়েকখানা
বারকোশে মেঝের
উপর সাজাইয়া
রাখিত। মেঝের
খানা তাঁহার
বিশিষ্ট বন্ধুদের
নিকট প্রেরিত
হইত। উপস্থিত
ব্যক্তিবর্গের সকলেই
একখানা বৃহৎ
গালিচা পাতিয়া
খানা খাইতে
বসিতেন। এই
সময় কেবল
খাদ্য-দ্রব্যগুলির
স্বাদ ও
ঘ্রাণ লইয়া
আলোচনা চলিত।
নওয়াব প্রত্যেক
বারকোশ হইতে
এক গ্রাস
খাদ্যমাত্র গ্রহণ
করিতেন, আর
কিছুই ছুঁইতেন
না। আহারান্তে
মেহমানরা হাতমুখ
ধুইয়া বসিয়া
থাকিতেন। এইরূপে
বহুসংখ্যক লোকের
সহিত প্রত্যহ
আহার করা
ছিল তাঁহার
অভ্যাস; তবে
কখনও কখনও
তিনি অন্যকেও
আহার করাইতে
সমধিক পছন্দ
করিতেন। তখনও
তিনি একা
খাইতেন না,
একদল মহিলা
লইয়া আহারে
বসিতেন। ইহারা
ছিলেন তাহার
বেগম, দুহিতা,
দৌহিত্রা, ভ্রতুষ্পুত্রী
প্রভৃতি আত্মীয়া,
অপর কেহ
নহেন।
মধ্যাহ্ন ভোজনের
পরে তিনি
একটা ক্ষুদ্র
কক্ষে গমন
করিয়া অল্পক্ষণ
নিদ্রা যাইতেন।
অপরাহ্ন একটার
সময় তিনি
গাত্রোত্থান করিয়া,
নামায আদায়
করিতেন। অতঃপর
তিনি উচ্চস্বরে
এক সিপারা
কুরআন শরীফ
পাঠ করিয়া
আসরের নামায
পড়িতেন। ভৃত্যেরা
তখন তাঁহাকে
এক পেয়ালা
ঠান্ডা পানি
আনিয়া দিত;
ঋতু অনুযায়ী
তাহাতে সোরা
বা বরফ
মিশান হইত।
তিনি এক
ঢোকে তাহা
পান করিতেন;
ইহাতেই তাঁহার
সারা দিনের
পানি পানের
প্রয়োজন মিটিত।
অতঃপর ভৃত্যেরা
কক্ষদ্বারের পর্দ
গুটাইয়া ফেলিত।
তখন মীর
মুহম্মদ আলী
ফাযিল নকী
কুলি খাঁ,
হেকিম মৌলভী
হাদী খাঁ
ও মীর্জা
হুমায়ুন খাঁ
প্রভৃতি কতিপয়
ধার্মিক ও
শিক্ষিত ব্যক্তি
সেখানে আসিতেন।
সাধারণতঃ একটি
বহৎ স্বতন্ত্র
কক্ষে বিদ্বানমণ্ডলীর
অধিবেশন বসিত।
নওয়াবের নিজের
মসনদের সম্মুখে
মুহম্মদ আলী
ফাজিলের জন্য
আর একটি
পৃথক মসনদ
পাতা হইত।
উহার পিছনে
থাকিত একটা
বড় তাকিয়া।
তাঁহার পাল্কী
প্রাসাদের নিকটতম
দ্বার দিয়া
ভিতরে আসিত;
কেবল তিনজন
সম্পর্কিত শাহযাদারই
এই অধিকার
ছিল। তিনি
কক্ষে প্রবেশ
করিবামাত্র নওয়াব
মসনদ হইতে
উঠিয়া কয়েক
পদ অগ্রসর
হইয়া তাঁহাকে
সালাম দিতেন
এবং প্রত্যভিবাদনের
পর তিনি
আসন গ্রহণ
করিলে তবে
মসনদে গিয়া
বসিতেন। বিদায়
বেলায়ও তাঁহার
প্রতি এভাবে
সম্মান প্রদর্শন
করা হইত।
সেকালে এ
দেশে বিদ্বানের
স্থান ছিল
এতই উচ্চে।
সভায় প্রথমে
হুক্কা আনা
হইত। আলীবর্দি
নিজে ধূমপান
করিতেন না;
তিনি পান
করিতেন কফি;
তত্পরে উহা
সভাজনদের মধ্যে
বিতরিত হইত।
অতঃপর ভৃত্যেরা
একখানা কুরআন
আনিয়া তাহা
মুলতানী মৌলভী
সাহেবের সম্মুখে
বালিশের উপর
রাখিয়া দিত।
মৌলভী সাহেব
দুই একটা
সূরা পাঠ
করিয়া উহার
অনুবাদ করিতেন।
কোন দুর্বোধ্য
বিষয় থাকিলে
মৌলভী মুহম্মদ
আলী তাহা
বুঝাইয়া দিতেন।
আলীবর্দি খাঁ
মধ্যে মধ্যে
কোন আয়াত
সম্পর্কে প্রশ্ন
করিতেন, মৌলভী
মুহম্মদ আলী
তাহাও বুঝাইয়া
দিতেন। পূর্ণ
দুই ঘণ্টাকাল
ধরিয়া এই
পাঠকার্য চলিত।
তত্পরে বসিত
দরবার-ই-খাস।
বিভিন্ন দফতরের
কর্মকর্তা, সাধারণ
চর ও
ধনী মহাজন
জগত শেঠ
প্রভৃতি অল্প
কয়েকজন লোক
সেখানে সমবেত
হইয়া ভারতের
বিভিন্ন অংশের
কোথায় কি
ঘটিতেছে সেই
সম্পর্কে আলোচনা
করিতেন। প্রাতঃকালীন
সভায় রাজস্ব
বা অন্যান্য
বিষয় সংক্রান্ত
মুলতুবী বিষয়গুলি
এখানে আলোচিত
হইত। এই
সভাও দুই
ঘণ্টাকাল যাবৎ
তাহার চিত্ত
বিনোদন করিত।
এভাবে সন্ধ্যা
হইয়া আসিলে
বাতিওয়ালারা আসিয়া
বাতি ও
মোমবাতি জ্বালাইয়া
দিয়া যাইত;
উজ্জ্বল আলোক-মালায়
সমগ্র কক্ষ
ও প্রাসাদ
উদ্ভাসিত হইয়া
উঠিত। অতঃপর
তিনি মাগরিবের
নামায আদায়
করিতেন। নামায
শেষ হইলে
তাঁহার বেগম,
সিরাজদ্দৌলার পত্নী
ও পরিবারভুক্ত
অপর কয়েকজন
শাহযাদী সেখানে
আসিতেন। তিনি
রাত্রে ভাত
খাইতেন না
বলিয়া তাঁহার
জন্য কিছু
ফলমূল ও
মিঠাই-এর
ব্যবস্থা থাকিত।
তিনি সামান্য
কিছু আহার
করিয়া অবশিষ্ট
উপস্থিত মহিলাদের
মধ্যে বিতরণ
করিয়া দিতেন।
খাওয়া শেষ
হইলে তাহারা
চলিয়া যাইতেন।
তখন তাঁহার
দেহরক্ষী, নৈশ
প্রহরী ও
গল্প-কথকেরা
আসিয়া কক্ষটি
ভর্তি করিয়া
ফেলিত। গল্প-কথকেরা
নানা প্রকার
অজগুবি গল্প
বলিতে পারিত।
তাহা শুনিয়া
শুনিয়া তাঁহার
ঘুম আসিত।
কিন্তু তিনি
কখনও গাঢ়
নিদ্র যাইতেন
না; মধ্যে
মধ্যে জাগিয়া
উঠিয়া জিজ্ঞাসা
করিতেন, রাত্রি
কয়টা? রাত
দুইটা পর্যন্ত
এই অবস্থা
চলিত।
এম. আবদুল কাদের: ১৯০৮ সালের ১ এপ্রিল লক্ষ্মীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ছাত্রজীবন থেকেই ‘মাসিক মোহাম্মদী’সহ একাধিক সাময়িক পত্রে লেখালেখির শুরু। প্রথম বই ‘মুসলিম কীর্তি’ (প্রথম খণ্ড) প্রকাশ পায় ১৯৩০ সালে। তাঁর লেখার মূল ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম ইতিহাস। উল্লেখযোগ্য বই: মুসলিম কীর্তি (৫ খণ্ড), মুর সভ্যতা, তুরস্কের ইতিহাস, কামাল পাশা ও নবীন তুরস্ক, নোয়াখালীর কথ্য ভাষা ইত্যাদি। ১৯৯৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৮৪ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় প্রয়াত হন। ওপরের লেখাটি লেখকের ‘মুসলিম কীর্তি’ গ্রন্থের ‘নওয়াব আলীবর্দি খাঁর বীরত্ব’ শীর্ষক রচনার অংশবিশেষ।





