ভারতীয় উপমহাদেশে
মোগল শাসনের
কালপর্বে ব্যবসা-বাণিজ্যের
ক্ষেত্রে ‘আইকন’
হয়ে উঠেছিল
যে কয়টি
বাজার, তার
মধ্যে পাঞ্জাব
এলাকার লাহোর
শহরের আনারকলি
বাজারের কথা
বিশেষভাবে বলতেই
হবে। নিছক
ব্যবসাদারির জায়গার
সীমা ছাড়িয়ে
আনারকলি যেন
আজও মোগল
সাম্রাজ্যের রোমান্স
ও সামাজিক
ইতিহাসের এক রঙিন
অনুষঙ্গ হিসেবে
বিরাজমান।
কিন্তু এ
বাজারের নামটি
এল কোথা
থেকে? এ
নিয়ে নানা
মুনির নানা
মত। যদিও
সব মতই
শেষ পর্যন্ত
ঘুরপাক খায়
বাজারের মধ্যে
অবস্থিত মোগল
আমলের বৃহদাকৃতির
গম্বুজধারী একটি
সমাধিকে ঘিরে।
জনপ্রিয় ধারণা
হলো, মোগল
যুবরাজ সালিমের
(বা পরবর্তীকালের
সম্রাট জাহাঙ্গীর)
সঙ্গে প্রেমের
সম্পর্কে জড়ানোর
‘অপরাধে’
যে অপরূপ
সুন্দরী রাজনর্তকী
বা স্বয়ং
সম্রাটের রক্ষিতা
আনারকলি ওরফে
শরফ-উন-নিসাকে
দরবার থেকে
তাড়িয়ে দেয়ার
পরও ক্ষান্ত
না হয়ে
রীতিমতো হত্যার
বন্দোবস্ত করেছিলেন
সম্রাট আকবর—সেই
আনারকলির নামেই
এ বাজারের
নাম রাখা
হয়েছিল। কথিত
আছে, দরবারে
নাচিয়ে যুবরাজের
প্রেমে পড়েছে
শুনে আকবর
ক্ষিপ্ত হয়ে
আনারকলিকে লাহোরের
একটি এলাকার
দেয়ালের মধ্যে
জ্যান্ত কবর
দেয়ার হুকুম
দেন। যেমন
কথা তেমন
(নৃশংস) কাজ।
পরে জাহাঙ্গীর
যখন ময়ূর
সিংহাসনে বসেন,
তখন তরুণকালের
ভালোবাসাকে চিরস্মরণীয়
করে রাখার
জন্য আনারকলিকে
কবর দেয়া
হয়েছিল যে
দেয়ালে—তা
ঘিরে একটি
দৃষ্টিনন্দন ও
বৃহদাকৃতির সমাধিভবন
বানানোর আদেশ
দেন। পরে
সেই সমাধিটি
ঘিরে বাজার
বসতে আরম্ভ
করে। তবে
এ কাহিনীর
একটি ভিন্নতর
ও আমাদের
কাছে একেবারেই
অপরিচিত ভাষ্য
মেলে উনিশ
শতকের লাহোরের
এক ইতিহাস-লেখক
নূর আহমেদ
চিশতির বয়ানে।
১৮৪৯ সালে
প্রকাশিত তার
তেহকিকাত-ই-চিশতিয়া গ্রন্থে চিশতি
লিখেছেন, আনারকলি
বা শরফ-উন-নিসা
ছিলেন আকবরের
প্রিয় উপপত্নীদের
একজন। আকবর
যখন দাক্ষিণাত্যে
অবস্থান করছিলেন
তখন আনারকলির
মৃত্যু হয়।
ওই সময়খণ্ডে
পিতার প্রতি
বিদ্রোহী হয়ে
ওঠা জাহাঙ্গীরের
সঙ্গে আনারকলির
বিশেষ সখ্য
ছিল বলে
খবর মেলে
না। পরে
আকবর দাক্ষিণাত্য
থেকে ফিরে
এসে তার
এ প্রিয়তমার
স্মরণে লাহোরে
তার সমাধিটি
যত্নসহকারে নির্মাণের
বন্দোবস্ত করেন।
প্রকৃতপক্ষে সমাধির
গম্বুজে খোদিত
একটি ফারসি
দ্বিপদী আনারকলি-জাহাঙ্গীরের
এ জনপ্রিয়
প্রেমোখ্যানের সঙ্গে
বাজারটির সংযোগ
থাকার গুঞ্জন
আরো বাড়িয়ে
দিয়েছে। ওই
কবিতাটি ভাষান্তরে
নিম্নরূপ: ‘আহা,
যদি পারতাম
ছুঁতে প্রিয়তমার
মুখটি ফের
একবার/কেয়ামত
তক খোদার
সমীপে শুকরিয়া
জানাতাম বেশুমার।’
কবিতাটিতে প্রেমভাবের
ছোঁয়া থাকায়
জনমনে এমন
ধারণাও বিরাজমান
যে ওই
দুই লাইন
আদতে আনারকলির
শোকে মুহ্যমান
জাহাঙ্গীরের কলমের
কীর্তি। আবার
কারো কারো
মত এমন,
আনারকলি বাজারের
সঙ্গে নর্তকী
আনারকলির কোনো
সম্পর্ক আদৌ
নেই। ওই
সমাধিটি আসলে
জাহাঙ্গীরের তৃতীয়
স্ত্রী সাহিব-ই-জামালের।
তার সমাধির
কাছে একটি
বড় আকৃতির
ডালিম বা
আনারের গাছ
ছিল দেখে
লোকে জায়গাটিকে
‘আনারকলির
সমাধি’ কি
আনার ফুলের
সমাধি বলতে
আরম্ভ করেছিল।
সেই থেকে
ওই এলাকার
নাম হয়ে
যায় আনারকলি
বাজার। উপরোক্ত
ভাষ্যের কাছাকাছি
বয়ান আবার
রেখেছেন প্রাসাদ
ষড়যন্ত্রে অকালে
নিহত মোগল
যুবরাজ দারাশুকোও।
সাকিনাত-উল-আউলিয়া
গ্রন্থে দারা
জানান, লাহোরে
একটি ডালিম
গাছ ছিল,
যেখানে কিনা
সুফি সাধক
মিয়া মীর
এসে নিয়মিত
বসতেন। সম্ভবত,
ওই এলাকাটিই
আজকের আনারকলি
বাজার। একালের
গবেষক হারুন
খালিদের মন্তব্য
এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য
হতে পারে,
তিনি লিখেছেন:
‘যেকোনো
ক্ষেত্রেই কোনো
রক্ষিতার বিদ্রোহী
যুবরাজের প্রেমে
পড়াটা ঘোরতর
অসম্ভব ব্যাপার।
এমনকি জাহাঙ্গীরের
নিজের রচনাতেও
আনারকলি বা
শরফ-উন-নিসার
কোনো উল্লেখ
মেলে না।
কিন্তু গল্পের
আড়ালে সত্য
যা-ই
হোক না
কেন, আজকের
জনপ্রিয় ধারণা
হলো ওই
সমাধিটি সেই
আনারকলিরই, যিনি
কিনা এক
রাজপুত্রের প্রেমে
পড়ার ‘অপরাধের’
দাম চুকিয়েছিলেন
নিজের জান
দিয়ে।’
এ তো
গেল নামবিচারের
কথা, কিন্তু
আনারকলি বাজারের
বয়স ঠিক
কত? কেউ
কেউ বলেন,
আনুমানিক ১৫৯৯
খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের
কথিত প্রেমাষ্পদ
আনারকলির মৃত্যু
হয়—আর
তার স্মরণে
ওই সমাধিভবন
তৈরি হয়
১৬০৬ থেকে
১৬১০ সালের
মধ্যে। ততদিনে
দিল্লির মসনদে
জাহাঙ্গীর বসতে
সক্ষম হয়েছেন।
এর পর
থেকেই তা
ঘিরে সেখানে
বাজার বসতে
শুরু করে।
এখন এ
প্রশ্ন ওঠা
অস্বাভাবিক নয়,
কথিত প্রেমাষ্পদের
স্মরণে সমাধির
চারপাশে বাজার
বসার অনুমতি
কেনই বা
দিতে যাবেন
ভালোবাসামগ্ন নতুন
সম্রাট? এ
বিষয়ে জবাব
দিতে গিয়ে
লাহোরের স্থানীয়
ব্যক্তিরা শতাব্দীর
পর শতাব্দী
ধরে চলে
আসা একটি
‘আরবান
মিথ’-এর
কথাই বারবার
বলে আসছেন।
সেটি আনারকলি
নামকরণের কাহিনীর
অনেকটাই অনুরূপ—সম্রাট
জাহাঙ্গীর চাইতেন
নির্মমভাবে মোগলশাহির
রোষানলে পড়ে
প্রাণ হারানো
তার এ
প্রিয়তমার নাম
যেন গোটা
ভারতবাসীর মুখে
মুখে ফেরে।
তাই আনারকলির
সমাধিকে ঘিরে
বাজার বসার
ব্যবস্থা তিনিই
করে দেন।
তারই কোষাগার
থেকে অর্থ
নিয়ে বাজারের
প্রাথমিক অবকাঠামোও
তৈরি করা
হয়েছিল। ঘটনা
সত্যি হলে
বলতে হয়,
ইতিহাসে এর
আগে কোনো
রাজপুরুষ নিজের
প্রেমিকার নাম
অমর ও
তার মৃত্যুর
কাহিনী চিরস্থায়ী
করে রাখতে
বাজার বসানোর
ব্যবস্থা করেছেন
কিনা সন্দেহ।
এক্ষেত্রে তাহলে
জাহাঙ্গীরই পথিকৃৎ!
এ উপমহাদেশের
বহু মানুষের
কাছে বস্তুত
আনারকলি বাজার
এক ফেলে
আসা দীর্ঘশ্বাসের
নাম। জনমনে
গেঁথে যাওয়া
গল্পটি সত্যি
বলে ধরে
নিলে মোগল
সম্রাট জাহাঙ্গীরের
ভালোবাসার স্বীকৃতিদানের
উদ্দেশ্যেই এ
বাজারের জন্ম,
আর তা
পরে পৃষ্ঠপোষকতা
পেয়েছে উদারপন্থী
শাহজাদা দারাশুকোরও।
এমন দুই
ঘটনার মেলবন্ধন
থেকেই আনারকলির
বৈচিত্র্যময় ও
প্রাণবন্ত চরিত্রকে
অনুভব করা
যায়। এমনকি
ঔপনিবেশিক আমলেও
আনারকলি ছিল
এমন এক
ব্যতিক্রমীয় জায়গা,
যেখানে বহু
মতে বহু
ভাষায় বিভক্ত
ভারতীয় মানবসমাজ
এসে একসঙ্গে
মিলতে কসুর
করত না।
আনারকলি বলে
ইতিহাসের নিরেট
বাস্তবে কেউ
থাকুন বা
না থাকুন—একটি
নাম বা
ব্যক্তিত্বকে স্মরণীয়
করে রাখার
জন্য এমন
একটি স্মৃতিবিধুর
জায়গাই যথেষ্ট।
শাকের আনোয়ার: প্রাবন্ধিক
[বিষয়ের
প্রাসঙ্গিকতার
জন্য
সিল্করুট-এর
‘মোগল
বাজার’
সংখ্যায়
(৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০) পূর্বপ্রকাশিত এ লেখাটি ঈষৎ পরিমার্জিত আকারে এখানে পুনর্মুদ্রণ করা হলো। শিরোনাম পরিবর্তিত]





