যেকোনো রাজবংশের
ইতিহাসেই প্রেমোপাখ্যান
জড়িয়ে থাকে
এবং এক্ষেত্রে
মোগল রাজবংশও
পিছিয়ে নেই।
হুমায়ুনের সঙ্গে
হামিদা থেকে
আরম্ভ করে
দারার সঙ্গে
রাণাদিলের প্রেম
পেরিয়ে বাহাদুর
শাহ্ জাফরের
সঙ্গে বেগম
জিনাত মহলের
সম্পর্ক সম্বন্ধেও
বহু কথা
প্রচলিত। যদিও
এসব উপাখ্যানের
সত্য-মিথ্যা
যাচাই করা
অনেক ক্ষেত্রেই
সম্ভব হয়
না, কিন্তু
জনমানসে এদের
প্রভাবের কমতি
নেই। এদিক
থেকে মোগল
রাজবংশের ইতিহাস
এবং উপাখ্যানে
আনারকলিই হয়তো
সবচেয়ে বিখ্যাত
প্রেমিকা, আলোচিত
ও আজ
পর্যন্ত জনমানসে
জীবন্ত। এমনকি
শিল্পী-সাহিত্যিকদের
পর্যন্ত তিনি
অনুপ্রাণিত করেছেন।
কিন্তু অদ্ভুত
বিষয় হলো
আনারকলি সম্বন্ধে
ইতিহাস তেমন
প্রামাণিক-নিশ্চিত
তথ্য প্রদান
করতে পারে
না। আনারকলিকে
নিয়ে যা
পাওয়া যায়
তার প্রায়
সবটাই লোকমুখে
প্রচলিত ছিল
যুগ যুগ
ধরে। মধ্যযুগ
পেরিয়ে আধুনিককালে
সেলুলয়েড আর
ছাপা সাহিত্যকর্মে
আনারকলি আরো
বেশি জীবন্ত
হয়ে ওঠেন।
কে আসিফ
পরিচালিত ‘মুঘল-এ-আজম’
সিনেমায় দিলীপ
কুমার-মধুবালা
জুটির আগে-পরে
বহু সময়ে
সালিম-আনারকলির
প্রেম নিয়ে
বহু কথা
হয়েছে, লেখা
হয়েছে। বলা
চলে তারা
লোককথার অংশে
পরিণত হয়েছিলেন।
আর লোককথার
স্বাভাবিক রীতি
অনুসারে তাদের
গল্পের রয়েছে
একাধিক সংস্করণ।
আনারকলির কথা
প্রথম উল্লেখ
করেন ইংরেজ
ব্যবসায়ী-পর্যটক
উইলিয়াম ফিঞ্চ।
আকবরের এক
উপপত্নীর প্রতি
তার পুত্র
সালিমের আকর্ষণ
এবং সে
অপরাধে মেয়েটিকে
দেয়ালে গেঁথে
হত্যার বহুল
প্রচলিত গল্পটি
ফিঞ্চই প্রথম
চালু করেন।
আনারকলি নামটিও
তিনিই প্রথম
উল্লেখ করেন।
ফিঞ্চের কয়েক
বছর পর
এডওয়ার্ড টেরি
এ অঞ্চলে
আসেন এবং
তিনি লেখেন,
‘আনারকলির
সঙ্গে এই
অনৈতিক সম্পর্কের
কারণে আকবর
তাকে উত্তরাধিকার
বঞ্চিত করার
সিদ্ধান্ত নেন,
কিন্তু মৃত্যুশয্যায়
সে সিদ্ধান্ত
থেকে সরে
আসেন।’ ফিঞ্চ
আরো জানান,
পিতার মৃত্যুর
পর জাহাঙ্গীর
লাহোরে আনারকলির
সমাধি নির্মাণ
করান।
লক্ষ করার
মতো বিষয়,
কোম্পানির হয়ে
নীলের বায়না
নিতে উইলিয়াম
ফিঞ্চ ১৬১১
খ্রিস্টাব্দে—আনারকলির
মৃত্যুর এক
যুগ পর-ভারতে
আসেন। টেরি
আসেন তারও
পরে। ফিঞ্চ
মূলত প্রচলিত
কাহিনী থেকেই
উপাদান সংগ্রহ
করেছেন এবং
টেরি করেছেন
ফিঞ্চের প্রতিধ্বনি।
মোগল জৌলুশ,
সম্পদ থেকে
আরম্ভ করে
মোগল হারেম
সম্বন্ধে ইউরোপীয়রা
পরবর্তীকালে নানা
মিথ সৃষ্টি
করেছেন, সে
সম্বন্ধে ইতিহাস
আজ সচেতন।
মনে রাখা
প্রয়োজন মোগল
বাদশাহর হারেমে
বাদশাহ্ ব্যতীত
কারো প্রবেশাধিকার
ছিল না,
এমনকি তার
পুত্রেরও নয়—ইউরোপীয়
পর্যটক তো
দূর অস্ত।
যদিও পরবর্তীকালে
অনেক ইউরোপীয়
বণিক, চিকিৎসক
হিসেবে মোগল
অন্দরে প্রবেশ
করেছেন কিন্তু
হারেমে নয়।
এ কথা
গুরুত্বপূর্ণ, কেননা
সালিম আনারকলি
সম্বন্ধে পরবর্তীকালের
একটি কথিত
সংস্করণ হলো,
‘আকবর
যখন আনারকলির
সঙ্গে একান্ত
সময় যাপন
করছিলেন, সে
সময় সালিম
সে স্থানে
উপস্থিত হলে
আনারকলির সঙ্গে
সালিমের প্রেমময়
দৃষ্টি বিনিময়
লক্ষ করে
আকবর, আনারকলিকে
দেয়ালে গেঁথে
হত্যার নির্দেশ
দেন।’ গল্পটির
আবার কয়েকটি
উপশাখা রয়েছে
যার একটি
বলে, আনারকলির
এ দৃষ্টি
আকবর একটি
আয়নায় লক্ষ
করেছিলেন। আরেকটি
বলে, আনারকলি
আকবরের কাঁধ
মালিশ করছিলেন।
ভাবনার বিষয়
হলো ‘স্ত্রী’র
সঙ্গে এহেন
একান্ত সময়
হারেমে যাপনকালে
সে স্থানে
পুত্রের আগমন
মোগল কিংবা
প্রচলিত সামাজিক-পারিবারিক
রীতির পরিপন্থী।
দ্বিতীয়ত, দাসী
পর্যায়ের নারীর
সেবা গ্রহণের
সময় পুত্র
বা ঘনিষ্ঠ
সভাসদের উপস্থিতি
সম্ভব, কিন্তু
সেক্ষেত্রে এহেন
শাস্তি লঘুপাপে
গুরুদণ্ড বৈ
আর কিছু
নয়।
তবে কি
আনারকলি বলে
কেউ ছিলেন
না, কিংবা
সালিমের (পরবর্তীকালে
জাহাঙ্গীর) সঙ্গে
তার কোনো
সম্পর্ক ছিল
না? কথায়
বলে, যা
রটে তার
কিছু হলেও
বটে। হারেম
সম্বন্ধে ইউরোপীয়
কল্পনার ঘোড়া
লাগামহীন, তবে
বাস্তবে কঠোর
নিয়মের মধ্যে
হারেম চললেও
সে নিয়ম
ভঙ্গ করার
লোকেরও অভাব
হতো না,
অন্যদিকে জাহাঙ্গীরের
প্রাথমিক জীবন
লক্ষ করলে
সেখানে উচ্ছৃঙ্খলতা,
নিয়মভঙ্গের দৃষ্টান্ত
দেখা যায়।
সালিমকে নিয়ে
লোককথা তৈরি
হওয়ার সুযোগও
এখান থেকেই
তৈরি। প্রথমত,
হারেম সম্পর্কে
সাধারণ মানুষের
কল্পনার সঙ্গে
বাস্তবতা মিলে
একটি উপাখ্যান
তৈরি হয়েছে
এবং সেই
সঙ্গে পরবর্তীকালে
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ
এর পালে
হাওয়া দিয়ে
পুষ্ট করে।
কিন্তু লাহোরে
একটি সমাধির
অবস্থান পুনরায়
এ আলোচনার
মোড় ঘুরিয়ে
দেয়। পাঞ্জাব
সচিবালয়ের অভ্যন্তরে
আনারকলির সমাধিতে
‘মজনুন
সালিম আকবর’
উত্কীর্ণ দেখে
বিশ্বাস করতেই
হয় আনারকলি
নামে কেউ
অবশ্যই ছিলেন
এবং তার
সঙ্গে তত্কালীন
শাহজাদা সালিমের
একটি প্রেমের
সম্পর্কও ছিল।
কিন্তু সে
সম্পর্কের ইউরোপীয়
বয়ানে যৌন
তাড়না কিংবা
কেবল যৌনতাকেই
যেভাবে চিহ্নিত
করা হয়,
তা কষ্টকল্পনা।
ঔপনিবেশিক শাসনের
কৌশল সম্বন্ধে
আলোচনা করতে
গিয়ে পরবর্তী
সময়ে বহু
গবেষকই বলেছেন,
গুজব তৈরি
করা তাদের
ক্ষমতা দৃঢ়
করার অন্যতম
হাতিয়ার হয়েছিল।
এ নিবন্ধে যৌনতার প্রসঙ্গ সরাসরি উপস্থাপন করার কারণ আব্রাহাম এরালির মতো ইতিহাসবিদ পর্যন্ত তার The Last Spring: The Lives and Times of the Great Mughals-এ বলেছেন আকবর ও জাহাঙ্গীরের মধ্যে ‘ইদিপাল সংঘাত’ কাজ করেছে বলে মনে করা যায়। তার মতে, আনারকলি আর কেউ না বরং শাহজাদা দানিয়েলের মা। আবুল ফজল কর্তৃক উল্লিখিত একটি ঘটনা অনুসারে সালিমকে একদিন হারেমের পাহারাদাররা ধরে পিটিয়েছিল। যদিও এখানে বলা হয়েছে এক পাগল ব্যক্তি হারেমে প্রবেশের চেষ্টার সময় শাহজাদা সালিম তাকে পাকড়াও করেন কিন্তু ভুলবশত পরবর্তী সময়ে সালিমকেই অপরাধী সন্দেহে পিটুনি দেয়া হয়। এ ঘটনায় বোঝা যায় হারেমের জন্য সতর্ক পাহারাদারি ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সে প্রহরা এড়িয়ে কীভাবে এক পাগল প্রাসাদের এমন অন্দরে চলে এল তার ব্যাখ্যা মেলে না। আরো যা বিস্ময়কর তা হলো প্রহরীরা শাহজাদা সালিমকে চিনতে কেন পারলেন না। এখানে আব্রাহাম এরালি যে বিষয়টিতে জোর দিয়েছেন, এসব গুজব-গল্পগাছা হলেও এগুলোর অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় পিতা ও পুত্রের মধ্যে যৌনতা বিষয়ে টানাপোড়ন চলছিল। সেখান থেকেই গুজব বা রটনা ডালপালা মেলেছে। তবে এর বিরুদ্ধেও মত আছে, অনেক ইতিহাসবিদ বলেন মোগল পরিবারে মায়ের প্রতি (সৎ মায়ের জন্যও) এত সম্মান ছিল যে এমন ঘটনা জাহাঙ্গীরের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয়। তবে মানুষের অবচেতন মন নিয়ে যে রহস্য এখনো রয়ে গেছে তা থেকে এমন ঘটনা অসম্ভব বলার সুযোগ নেই।
দানিয়ালের মাতা
অবশ্য কেমন
সুন্দরী ছিলেন
তা আমাদের
জানা নেই।
তিনি তো
দূর অস্ত,
আনারকলির গুণ
সম্বন্ধেও ইতিহাস
নীরব। আবুল
ফজল লেখেননি।
লেখেননি সময়ের
অন্য কোনো
ইতিহাস লেখক।
এমনকি আকবরের
প্রখর সমালোচনাকারী
মোল্লা বাদায়ুনি
পর্যন্ত নীরব।
জাহাঙ্গীরও তার
আত্মজীবনীতে এ
সম্বন্ধে কিছু
লেখেননি। অন্যদিকে
ইতিহাস বলে,
দানিয়ালের মাতার
মৃত্যু হয়
১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে,
যা আনারকলির
সমাধিতে থাকা
মৃত্যু তারিখের
সঙ্গে বেমানান।
আত্মজীবনীতে বাদশাহ্
জাহাঙ্গীর কিছু
না লিখলেও
সমাধিতে তারই
নাম লেখা
হয়েছে। মূলত
জাহাঙ্গীরের কিছু
খামখেয়ালিপনার কারণে
সালিম এবং
আনারকলি সম্বন্ধে
লোককথা তৈরি
ও প্রচার
সম্ভব হয়।
এরালি যেমন
ইদিপাস কমপ্লেক্সের
কথা বলেছেন,
লোককথা থেকে
ইতিহাসবিদ পর্যন্ত
অনেকেরই ধারণা
আনারকলির সঙ্গে
প্রেমে বাধা
পেয়ে শাহজাদা
সালিম তার
পিতা আকবরের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
করেছিলেন। সাম্প্রতিক
সময়ে মাহমুদুর
রহমান তার
‘মোগলনামা:
প্রথম খণ্ড’-বইয়ে
লিখেছেন, সালিম
এবং আকবরের
মধ্যে একটি
চাপান উতোর
চলছিল, যা
সিংহাসনের অধিকারকে
কেন্দ্র করে
ঘনীভূত হয়।
মূলত আকবরের
প্রভূত ক্ষমতা
ও ক্ষমতার
প্রয়োগ সালিমের
হীনম্মন্যতার কারণ
হয়ে দাঁড়ায়
এবং এক
পর্যায়ে বিদ্রোহ
করে বসেন।
সাধারণ মানুষ
রাজনীতির তুলনায়
প্রেম নিয়ে
কথকতা তৈরি
করতেই বেশি
পছন্দ করে।
তাহলে এত
কথার পর
আনারকলি সংক্রান্ত
উপসংহার টানতে
কী বলা
যায়? Lahore: Past and Present বইয়ের
লেখক সৈয়দ
বাকির বলেন,
‘আনারকলি
মূলত একটি
বাগানের নাম
এবং সেখানে
থাকা সমাধিটি
তাই আনারকলির
সমাধি বলে
পরিচিতি পায়।’
কিন্তু বাকিরের
এ মত
গ্রহণ করলে
শবাধারে লেখা
সালিমের নামের
কোনো ব্যাখ্যা
পাওয়া যায়
না। কৌতূহলোদ্দীপক
বিষয় হলো
শাহ্জাদা দারাশুকো
তার ‘সাখিনাৎ-উল-আউলিয়া’
গ্রন্থেও লাহোরে
মিয়া মীরের
প্রিয় স্থানের
মধ্যে এ
আনারকলি বাগের
কথা বলেন
এবং সমাধির
উল্লেখ থাকলেও
সমাধিটি কার
সে সম্বন্ধে
তিনি কিছু
উল্লেখ করেননি।
মোগল আমল
হতেই এ
সমাধি এবং
খোদ আনারকলি
সম্বন্ধে লুকোছাপা
চলে এসেছে।
বিংশ শতাব্দীর
বিশের দশক
থেকে পুরনো
উপকথাকে আধুনিক
সাহিত্যে রূপান্তর
করা হয়।
১৯২২ সালে
ইমতিয়াজ আলী
তাজ রচিত
‘আনারকলি’
নাটক পরবর্তী
সময়ে বলিউডের
প্রযোজক পরিচালকদেরও
আকর্ষণ করে
এবং ‘আনারকলি’,
‘মুঘল-এ-আজম’-এর
মতো সিনেমা
তৈরি হয়।
আনারকলি ও
সালিমের প্রেমকথা
এখান থেকে
পুনরুজ্জীবন লাভ
করে। আনারকলি
সম্বন্ধে গল্পের
গরু এতটাই
গাছে ওঠে
যে কেউ
কেউ নূরজাহানকেই
আনারকলি বলে
বসে। কিন্তু
গিয়াস বেগের
কন্যা মেহেরুন্নিসাকে
আনারকলি বলা
বাতুলতা বৈ
কিছু নয়।
উপসংহার টানতে
গিয়ে আনারকলিকে
নিয়ে পাওয়া
তথ্য অনুসারে
তাকে শরীফ-উন-নিসা
বলে চিহ্নিত
করা যায়,
যিনি আকবরের
একজন উপপত্নী।
হারেমে তার
অবস্থানের কথাও
নিশ্চিত হওয়া
যায়, কেননা
ফিঞ্চের বয়ান
থেকে নূর
আহমেদ চিশতি
অবধি (তেহকিকাত-ই-চিশতিয়া;
১৮৬০) আনারকলিকে
আকবরের উপপত্নী
বলেই উল্লেখ
করেছেন। হারেমে
আগমন থেকে
সালিমের সঙ্গে
তার সম্পর্কের
কথাও সত্য
কিন্তু সে
সম্পর্কের গতিপ্রকৃতির
প্রচলিত বয়ান,
বাস্তবতা হতে
ভিন্ন। আনারকলির
সত্যতা যাচাই
করতে গিয়ে
আমরা বলতে
পারি, আনারকলির
অস্তিত্ব ছিল
কিন্তু তাকে
নিয়ে তৈরি
লোককথা, উপকথা,
গল্প ও
সিনেমার মধ্যে
ইতিহাসের আনারকলি
হারিয়ে গেছেন।
আসরার আবেদিন: লেখক





