২০২১ সালে যদি
কাউকে জিজ্ঞেস
করা হয়
আনারকলি কে
ছিলেন তাহলে
বেশ কয়েকটি
ঘটনা ঘটতে
পারে—এক.
আনারকলি মানে
জুলিয়েটের মতো
কেউ, যিনি
প্রেমিকার প্রতিমূর্তি।
আবার জানা
থাকলে সরাসরিই
বলে দেবে,
ইনি ছিলেন
শাহজাদা সালিমের
প্রেমিকা যাকে
আকবর বাদশাহ
জীবন্ত কবর
দিতে দিয়েছিলেন।
এ তথ্যের
উৎস ধারণা
করা যায়
বেশির ভাগ
ক্ষেত্রেই ইতিহাসের
বই নয়,
বরং মধুবালা
ও দিলীপ
কুমারের ছবি
মুঘল-ই-আজম।
আনারকলির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব কিংবা পরিচয় নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু উপমহাদেশের জনমানসে তার উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ নেই। আনারকলি পোশাক ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এখনো জনপ্রিয়। আনারকলির ভূমিকাও সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে, কিন্তু তার উপস্থিতি হারাচ্ছে না। ২০১২ সালে বলিউডে মুক্তি পায় কমেডি ছবি হাউজফুল টু। আর তাতে একটি গানের কথা ছিল এমন—ছোড়ছাড় কে আপনি সালিম কি গালি, আনারকলি ডিসকো চলি—সহজ বাংলায় আনারকলি সালিমকে ছেড়ে এবার ডিসকোর দিকে চলল। নতুন সমাজের অনুষঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে আনারকলি।
ঐতিহাসিক ভিত্তি
নিয়ে বিতর্ক
থাকা সত্ত্বেও
আনারকলি উপমহাদেশের
মানচিত্রে স্থায়ী
আসনে করে
নিয়েছে। সাধারণ
মানুষের কাছে
এ চরিত্রের
অস্তিত্বের প্রামাণিক
কোনো বিবরণীরও
প্রয়োজন নেই।
মানুষের কালেক্টিভ
মেমরি আনারকলিকে
মনে রেখেছে।
মনোজগতে আনারকলি
যে অমর
প্রেমিকার প্রতিরূপ
হিসেবে আবির্ভূত
হয়েছেন তা
তৈরিতে সিনেমা
ও সাহিত্যের
ভূমিকা নেহাত
কম নয়।
ইতিহাসচর্চা এখানে
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠেনি। মধ্যযুগের
একটি অস্পষ্ট
চরিত্র কী
করে বিশ
শতকে আইকনিক
হয়ে উঠতে
পারে, তার
বড় উদাহরণ
আনারকলি। আবার
সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে রাজপ্রাসাদ
ছেড়ে ডিসকো
বারেও তার
যাত্রা।
অনেকে বলেন,
বলিউডের ইতিহাসে
অন্যতম আলোচিত
চরিত্র আনারকলি,
যার মহাকাব্যিক
প্রকাশ ঘটেছিল
মুঘল-ই-আজম
ছবিতে। ৪০০
বছর ধরে
চলে আসা
কুয়াশাঘেরা ইতিহাস
কিংবা মিথকে
প্রযুক্তির কল্যাণে
মানুষ দেখল
চোখের সামনে।
মধুবালাকেই আপন
করে নিল
আনারকলি হিসেবে।
তার পোশাক,
পর্দায় তার
ট্র্যাজেডি—সবকিছুই
উপমহাদেশের মানুষের
মনে অনপনেয়
ছাপ রেখে
যায় (পরবর্তী
সময়ে মধুবালার
ব্যক্তিজীবনের ট্র্যাজেডিও
কি তাকে
মানুষের চোখে
আনারকলি হয়ে
উঠতে আরেকটু
এগিয়ে দিয়েছিল?)।
উপমহাদেশের কালেক্টিভ
সাইকিতে প্রায়
৪০০ বছর
ধরে যে
আনারকলির অস্তিত্ব,
তা-ই
বাস্তব চেহারা
পায় মধুবালায়।
আনারকলির মৃত্যুর
১১ বছর
পর ভারতবর্ষে
আসেন ব্রিটিশ
পর্যটক উইলিয়াম
ফিঞ্চ। তিনি
লাহোরেও উপস্থিত
হয়েছিলেন। তিনি
তার লিখিত
ভ্রমণবৃত্তান্তে আনারকলি
ও তার
ট্র্যাজেডির কথা
উল্লেখ করে
গেছেন। কিন্তু
মোগল ইতিহাসের
সব রকম
বিবরণী থেকে
মুছে দেয়া
হয়েছে আনারকলির
নাম। প্রশ্ন
উঠতেই পারে,
এমনটা কেন?
পরিবারের ইতিহাসে
নারী ঘটিত
কোনো কলঙ্ক
তারা রাখতে
চাননি? প্রশ্ন
ওঠাটা অস্বাভাবিক
নয়।
আনারকলির জীবন
নিয়ে প্রথম
উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মটি
সম্ভবত উর্দু
নাট্যকার সৈয়দ
ইমতিয়াজ আলী
তাজের (১৯০০-১৯৭০)।
তিনি ১৯২২
সালে রচনা
করেন তার
বিখ্যাত নাটক
আনারকলি। নাটকটি
মঞ্চায়িত হতে
শুরু করে
এবং এর
প্রেরণায় সেলুলয়েডে
হাজির হয়
আনারকলি। ১৯২৮
সালে আর্দেশির
ইরানি নির্মাণ
করেন নির্বাক
চলচ্চিত্র আনারকলি।
এতে আনারকলির
ভূমিকায় অভিনয়
করেন সুলোচনাখ্যাত
ইহুদি অভিনেত্রী
রুবি মেয়ারস।
১৯৩৫ সালে
ছবিটির সবাক
রিমেকও হয়।
এসব গল্প,
ছবি আকর্ষণ
করেছিল প্রযোজক
শিরাজ আলী
হাকিম ও
তরুণ পরিচালক
কে আসিফ।
তাদের এ
ছবিই পরবর্তী
সময়ে বিখ্যাত
মুঘল-ই-আজম।
১৯৪৬ সালে
বোম্বে টকিজ
স্টুডিওতে ছবির
শুটিং শুরু
হয়। ইমতিয়াজ
আলী তাজ
একটি প্রশ্ন
তুলেছিলেন, এটা
কি আনারকলি
ও সালিমের
ট্র্যাজেডি, নাকি
আকবর দ্য
গ্রেটের?
১৯৬০ সালে মুঘল-ই-আজমের মুক্তির আগে আনারকলিকে কেন্দ্র করে আরো একটি ছবি মুক্তি পায়। ১৯৫৩ সালে নন্দলাল জসবন্তালের পরিচালনা ও নাসির হোসেইনের চিত্রনাট্যে নির্মিত হয়েছিল আনারকলি।
এখানেই শেষ
নয়। ১৯৮০-এর
দশকে পাকিস্তানে
আনারকলি শিরোনামে
একটি উর্দু
টেলিভিশন ধারাবাহিকও
প্রচারিত হয়।
১৯৭০-এর
দশকে পাকিস্তানে
উর্দু ভাষায়
নির্মিত হয়
আনারকলি নামের
চলচ্চিত্র। এসব
উপস্থাপনায় মূল
কাহিনী কাছাকাছি
থাকলেও পরিচালকরা
সমাপ্তি টেনেছেন
ভিন্ন ভিন্ন
প্রেক্ষিত থেকে।
আসিফ যেমন
তার ছবিতে
আনারকলিকে প্রাণে
মারেননি। ২০১৮
সালে ভারতের
কালারস টিভিতে
প্রচারিত হয়েছিল
সিরিজ দাস্তান-ই-মোহাব্বত: সালিম-আনারকলি।
এতে আনারকলি
নর্তকী, গরিবের
ঘরের মেয়ে,
আকবরের দাসী
কিংবা স্ত্রী
কোনোটাই নন।
বরং ভিনদেশের
অত্যাচারী শাসকের
হাত থেকে
বাঁচতে তারা
হিন্দুস্তানে পা
রাখেন। আকবরের
স্ত্রী জোধাবাঈ
তাকে আশ্রয়
দেন। এ
কিশোরী হয়ে
ওঠে সালিমের
খেলার সাথি।
আকবর তার
নাম রাখেন
আনারকলি। সালিম
আনারকলির প্রেমে
পড়ে যায়।
সামান্য আশ্রিতার
প্রেমে শাহজাদা—এ
দৃশ্য আকবরের
স্ত্রী রুকাইয়া
ও তার
মাকে অসন্তুষ্ট
করে। আকবর
ছেলেকে আনারকলির
কাছ থেকে
দূরে রাখতে
দূর প্রদেশের
দায়িত্বে পাঠান।
এভাবেই আনারকলি
সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে নানা
রূপে সামনে
এসেছেন, কিন্তু
পুরনো হননি।
মুঘল-ই-আজমে
আকবরের ভূমিকায়
অভিনয় করেন
পৃথ্বিরাজ কাপুর।
ছবিতে তার
একটি বিখ্যাত
সংলাপ এমন:
‘আনারকলি
আমি তোমাকে
বাঁচতে দেব
না, আর
সালিম তোমাকে
দেব না
মরতে।’ আনারকলি
বেঁচে আছেন।
আকবর তাকে
মারতে পারেননি।
ইমতিয়াজ আলী
তাজের আনারকলি
নাটকটি প্রথম
প্রকাশিত হয়
১৯২২ সালে।
কিন্তু ১৯৩১
সালে তিনি
আবার নাটকটি
পুনর্লিখন করেন।
প্রথম সংস্করণটি
প্রকাশের পর
সেটি পাঠক,
নাট্যজগৎ কিংবা
সমালোচকদের কাছে
ভালো সাড়া
পায়নি। ইমতিয়াজ
নিজে ছিলেন
লাহোরের বাসিন্দা
এবং তার
বাড়ি ছিল
আনারকলি সমাধির
কাছেই। কিশোর
বয়স থেকেই
তিনি মোগল
ইতিহাস নিয়ে
উৎসাহী ছিলেন।
নিজের বয়স
২০ পেরোতেই
লিখে ফেলেন
আনারকলি। নাটকের
ভূমিকায় তিনি
উল্লেখ করেছেন,
তার আনারকলি
নাটকের গল্প
কোনো প্রামাণিক
ঐতিহাসিক ঘটনাকে
কেন্দ্র করে
রচিত নয়।
সংস্কৃত ভাষায়ও
আনারকলি শিরোনামে
নাটক রচিত
হয়েছে। ১৯৭২
সালে মাদ্রাজ
থেকে প্রকাশিত
হয় ড.
ভি রাঘবনের
সংস্কৃত নাটক
আনারকলি। রাঘবন
এ ট্র্যাজেডিকে
কমেডিতে বদলে
দেন। এতে
আনারকলিকে দরবারের
এক দাসী
হিসেবে হাজির
করা হয়েছে।
এক পর্যায়ে
সালিম ও
আনারকলির প্রেম
শুরু হয়।
আর তাতে
ক্ষুব্ধ বাদশাহ
আকবর আনারকলিকে
কারাগারে পাঠান
এবং তাকে
মৃত্যুদণ্ড দেন।
কারাগারে বসে
আনারকলি আত্মহত্যার
চেষ্টা করেন।
ঘটনাক্রমে আকবর
তখন কারাগারে
এবং তিনি
আনারকলিকে আত্মহত্যা
করা থেকে
রক্ষা করেন।
পাষাণ গলে,
আকবর আনারকলিকে
মুক্তি দেন
এবং তার
সম্মতিতে সালিমের
সঙ্গে আনারকলির
বিয়ে হয়ে
যায়। মুসলিম
দরবারের কাহিনী
সংস্কৃত নাটকে
তুলে আনাটা
সহজ কাজ
নয়। এটা
বুঝতে বড়
পণ্ডিত হতে
হয় না।
তবে এ
কঠিন কাজে
ড. ভি
রাঘবন সফল
হয়েছিলেন বলে
সমালোচকরা মনে
করেন। এসব
উদাহরণ এটা
স্পষ্ট করে,
জুলিয়েটের মতো
আনারকলিও প্রেমিকা
হিসেবে অমর।
নানা ভাষা
ও মাধ্যমে
তার উপস্থিতি
জানান দেয়
আনারকলির প্রভাব।
ইতিহাস নিয়ে
যারা আগ্রহী
তাদের কাছেও
আনারকলি এক
দারুণ প্রশ্ন।
ঐতিহাসিক প্রমাণের
অভাব থাকলেও
একটি চরিত্র
কী করে
জনমানসে জীবন্ত
থাকে, তার
বড় উদাহরণ
আনারকলি। তিনি
কোনো রাজরক্তের
অধিকারী নন।
বরং প্রবল
প্রতাপশালী বাদশাহ
আকবরের চোখের
কাঁটা, কিন্তু
তার পরও
মানুষ আনারকলিকে
দূরে সরিয়ে
দেয়নি, বরং
আরো কাছে
টেনে নিয়েছে,
তার বেদনার
ভাগীদার হয়েছে।
এসএম রশিদ: লেখক





