টমাস কার্লাইলের কথায়, দুনিয়ার ইতিহাস মহান ব্যক্তিদের জীবনী ছাড়া আর কিছু নয়। কথাটির সত্যতা ভালোভাবেই টের পাওয়া যাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ করলে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হিসেবে অমর হয়ে থাকবে এ গ্রন্থ। তবে হ্যাঁ, আত্মজীবনীটি অসমাপ্ত। তাঁর জীবনের প্রথম ৩৫ বছরের ইতিহাস পাওয়া যাবে এ গ্রন্থে। তবে এ সময়কালেই তিনি কী বিপুল ঐতিহাসিক রাজনৈতিক তত্পরতায় যুক্ত ছিলেন তার সাক্ষ্য দিচ্ছে এ গ্রন্থ। হিন্দুস্তান টাইমসে বইটির রিভিউ করতে গিয়ে কলকাতাভিত্তিক লেখক সুমিত মিত্র লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম শাসক শেখ মুজিবুর রহমান দারুণ ঘটনাবহুল জীবন কাটিয়েছেন। এসব ঘটনার অনেকগুলোর স্রষ্টা তিনি নিজেই, যার মধ্যে আছে বাংলাদেশ সৃষ্টির সংগ্রামকে প্রায় একলা হাতে নেতৃত্ব দেয়া। তাই এ স্মৃতিকথা শুধু তাঁর দেশের মানুষের জন্য আগ্রহের বিষয় নয়, বরং উপনিবেশ-উত্তর দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসেরও মূল্যবান উত্স।’ আর দ্য সানডে ইন্ডিয়ান পত্রিকায় শৈবাল চ্যাটার্জির মূল্যায়ন এ রকম— ‘তাঁর জীবনের প্রতিটি বছরই ঘটনাবহুল। তবে তিনি শুধু মঞ্চের বাইরে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে এগিয়ে যেতে দেখেননি, বরং সেই ইতিহাসের অনেকটা অংশের নির্মাতা তিনি নিজেই।’

শৈবাল চ্যাটার্জি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে আরো লিখেছেন, ‘পাঠককে মাথায় রাখতে হবে যে, এটা একটা অসমাপ্ত আত্মজীবনী। বইয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে ঘটা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা-সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু এ বইয়ে যা আছে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মূল্যবান। সৃষ্টির ২৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তান কেন দুই ভাগ হয়ে গেল, তার বাস্তব প্রেক্ষিতের ওপর আলো ফেলেছে এ বই।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এখন পর্যন্ত গ্রন্থটি ইংরেজি, জাপানি ও চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া বইটির ফরাসি, আরবি, জার্মান ও হিন্দি ভাষায় অনুবাদও শিগগিরই প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। চীনা ভাষায় গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন ২০০৩-০৭ মেয়াদে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকারী চীনা রাষ্ট্রদূত চাই শি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ জাপানি ভাষায় প্রকাশ করেছে জাপানের বিশিষ্ট প্রকাশনা সংস্থা আশাহি শোতেন। অনুবাদ করেছেন কাজুহিরো ওয়াতানাবে। বইটির ইংরেজি অনুবাদ ভারতে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন বুকস ও পাকিস্তানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফকরুল আলম।

পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া তাদের ওয়েবসাইটে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ইংরেজি সংস্করণটি নিয়ে লিখেছে— ‘২০০৪ সালে যখন শেখ মুজিবুর রহমানের ডায়েরিগুলো খুঁজে পাওয়া গেল, তখন নিঃসন্দেহে সেটাই ছিল একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর কন্যা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নোটবুকগুলো হাতে পেলেন— পাতাগুলো জীর্ণ ও হলদেটে হয়ে গেছে, সতর্কতার সঙ্গে সেগুলোর প্রতিলিপি করা হলো এবং পরবর্তীতে বাংলা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হলো। ...এই অনন্য সাধারণ দলিলটি শুধু একটি দেশের জন্ম নেয়ার বিবরণ নয়, বরং এটা লিখেছেন সেই মানুষটি, যিনি ইতিহাসের গতিপথ বদলে তাঁর জনগণকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।’

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শৈবাল চ্যাটার্জি লিখেছেন, ‘বইয়ের পাতাগুলো ওল্টালে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে, মুজিব ছিলেন একজন দুর্দান্ত লেখক। তিনি নির্ভুলভাবে এবং বাহুল্যবর্জন করে লিখেছেন। ঘটনা বা ব্যক্তির বর্ণনায় কোনো রঙ ছড়াননি। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অসমাপ্ত আত্মজীবনী তথ্য ও বিশ্লেষণের অমূল্য উত্স। এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ আমরা যার কাছ থেকে পাচ্ছি, তিনি একজন সাধারণ ছাত্রনেতা থেকে পুরো একটি জাতির নেতা হয়ে ওঠার জন্য নিজের সবকিছু বাজি রেখেছিলেন।’

পাকিস্তানে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশিত হয়েছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য ডনের ‘বুকস অ্যান্ড অথর’ বিভাগের একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হয়েছিল বইটি নিয়ে, যার শিরোনাম ছিল ‘ফ্রম দ্য ফাউন্ডার অব বাংলাদেশ’। এ প্রতিবেদনের লেখক বাহজাদ আলম খান সাধারণ মানুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্ককে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘স্মৃতিকথা থেকে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। দলের নেতাদের চেয়ে তৃণমূলের মানুষের সঙ্গেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তিনি জনসমাবেশ আয়োজন করতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, পারদর্শী ছিলেন গ্রেফতার এড়ানোর কৌশলেও। তিনি ’৪৭-পূর্ব অবিভক্ত ভারতবর্ষের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতেন, যদিও তিনি বাংলার জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।’ আত্মজীবনীতে মুজিবের যে রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়, সেটাও উল্লেখ করেছেন বাহজাদ। ‘পূর্ব পাকিস্তানে গ্রেফতার এড়ানো যখন তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে উঠল, তখন তিনি লাহোরে চলে গেলেন। সেখানে তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সময় কাটান। আবার নিজেকে রাজনৈতিক কাজে জড়িয়ে ফেলেন, এবার পরিষ্কার হয়ে গেল যে পশ্চিম পাকিস্তান সরকারও তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে। মুজিব এবার সোহরাওয়ার্দীকে বিস্মিত করে বললেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাচ্ছেন। কারণটা একেবারে সাধারণ: খাবার!’ এবার বাহজাদ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে সে ঘটনাটি লেখকের জবানীতে উদ্ধৃত করেছেন, ‘প্রায় এক মাস হয়ে গেল, আর কত দিন আমি এখানে থাকবো? ঢাকায় মওলানা সাহেব, শামসুল হক সাহেব এবং সহকর্মীরা জেলে আছেন।’ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বললাম। তিনি বললেন, ‘ঢাকায় পৌঁছার সাথে সাথেই তারা তোমাকে গ্রেফতার করবে। লাহোরে গ্রেফতার নাও করতে পারে।’ আমি বললাম, ‘এখান থেকে গ্রেফতার করেও আমাকে ঢাকায় পাঠাতে পারে। কারণ লিয়াকত আলী সাহেবও ক্ষেপে আছেন। পূর্ব বাংলার সরকার নিশ্চয়ই চুপ করে বসে নাই। তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে খবর পাঠিয়েছে পাঞ্জাব সরকারকে হুকুম দিতে। সে খবর এসে পৌঁছাতেও পারে। এখানেও তো আমি চুপ করে নাই। তাই যা হবার পূর্ব বাংলায় হোক, পূর্ব বাংলার জেলে ভাত পাওয়া যাবে, পাঞ্জাবের রুটি খেলে আমি বাঁচতে পারব না। রুটি আর মাংস খেতে খেতে আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আর জেলে যদি যেতেই হবে, তাহলে আমার সহকর্মীদের সাথেই থাকব।’

পাকিস্তানের সাংবাদিক হামিদ মীর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে এক লেখায় লিখেছেন যে, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের জন্য এ বইটি ইতিহাস জানার একটি দারুণ উত্স।

বঙ্গবন্ধু প্রথম জেল খেটেছিলেন সেই স্কুলজীবনেই। এর পর তাঁর জীবনের বিরাট সময়ই কেটেছে কারাগারে। এই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও রচিত হয়েছে কারাগারে। ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে রাজবন্দি থাকা অবস্থায় তিনি এ আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন। কিন্তু সেটা আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি। হিন্দুস্তান টাইমসের রিভিউতে সুমিত মিত্র তাই লিখেছেন, ‘১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদ নির্বাচনের কিছু দিন পর বইটি হঠাত্ই শেষ হয়ে গেছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে।’ মিত্র আরো লিখেছেন, ‘বইতে যেমন অজস্র রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ আছে, তেমনি আছে কলকাতা ও ঢাকায় লেখকের কাটানো বন্ধুবত্সল জীবনের বিবরণ। কলকাতার মওলানা আজাদ কলেজে তিনি আরো লাখ লাখ মুসলমানের সঙ্গে ‘পাকিস্তান’ অর্জনের জন্য লড়েছিলেন। কিন্তু ঢাকার সেরা বর্ণনা তিনি দিয়েছেন দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে। তখন ঢাকার রাজনীতি একটি নতুন বাংলা অর্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, তখন তা নামে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একটি রাষ্ট্রের নির্মাণযজ্ঞ চলছিল।’

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের কিছু ছবি সংযুক্ত হয়েছে। এমন একটি ছবি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সুমিত মিত্রের। তাই তিনি তার রিভিউতে লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা বিচক্ষণতার সঙ্গে বেশকিছু পুরনো ছবি যুক্ত করে বইটিকে ঋদ্ধ করেছেন। একটি ছবিতে দেখা যায়, লেখক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এবং মহাত্মা (গান্ধী) বসে আছেন, তাঁর পাশে সোহরাওয়ার্দী। এ ছবিতে তাঁদের প্রত্যেকের মনের অভ্যন্তরীণ চিন্তা যেন প্রকাশিত হয়েছে— তরুণ মুজিবুর তাঁর ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ অর্জনে অবিচল, সোহরাওয়ার্দী দরকষাকষিতে প্রস্তুত আর মহাত্মা মুসলমানদের এই ভরসা দিতে আগ্রহী যে, তিনি থাকতে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ছবিটির সময়কাল: ১৯৪৭।’