কিন্তু আমি এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত যে, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা শব্দ দুটি সমার্থক। একটা শরীরের সবই গুরুত্বপূর্ণ, যেমন একটা দাঁতের ব্যথাতেও আপনি অস্থির হয়ে যেতে পারেন। আবার দাঁত আপনি তুলে ফেলতে পারবেন, একটা হাতও কেটে ফেলা যায়, কিন্তু মাথা আর হূদয় ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? বঙ্গবন্ধু হলেন একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধের ইতিহাসের মাথা এবং হৃৎপিণ্ড

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখকে নিয়ে আমি একটা ডকু-ফিকশন লেখা শুরু করি। মালার বাইরে নানা ফুল থাকবে, সে তো দেখা যাবেই, ভেতরে থাকবে সুতা, আর সেই সুতাটা হলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের যোগ দেয়া; বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নামে প্রবাসী সরকার পরিচালনা করা, তার পর দুজনের মধ্যে দূরত্ব রচনা, তাজউদ্দীনের মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার পরও তার বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর গমন এবং পরিশেষে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাতীয় চার নেতার পুনর্মিলন। এটা ছিল অভিপ্রায়। কিন্তু লেখা শুরুর আগে আমাকে পড়তে শুরু করতে হয়। পড়তে গিয়ে এবং প্রবীণ সাংবাদিক যেমন এবিএম মূসার মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝতে পারলাম, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্য নেতাদের তুলনা করাটা ইতিহাসের সত্যের অবমাননা। যদিও উপন্যাসে নানা চরিত্র থাকবে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক, সম্পর্কের টানাপড়েনই তো উপন্যাস। কাজেই আমার উপন্যাসগুলো— যারা ভোর এনেছিল, তারপর ঊষার দুয়ারে এবং সর্বশেষ ‘জেনারেল ও নারীরা’ উপন্যাসেও বঙ্গবন্ধুর কথা, উপরে উল্লিখিত নেতাদের কথা এসেছে। এসেছে বেগম মুজিবের কথা। কিন্তু আমি এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত যে, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা শব্দ দুটি সমার্থক। একটা শরীরের সবই গুরুত্বপূর্ণ, যেমন একটা দাঁতের ব্যথাতেও আপনি অস্থির হয়ে যেতে পারেন। আবার দাঁত আপনি তুলে ফেলতে পারবেন, একটা হাতও কেটে ফেলা যায়, কিন্তু মাথা আর হূদয় ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? বঙ্গবন্ধু হলেন একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধের ইতিহাসের মাথা এবং হৃৎপিণ্ড।

বঙ্গবন্ধুর জন্মই হয়েছিল দেশটাকে স্বাধীন করবেন বলে। তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেনই মুসলিম লীগের অপশাসনের প্রতিবাদ করে বাঙালির অধিকার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করতে এবং অচিরেই তার মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধে ওঠে।

এ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তার দরকার হবে একটা শক্তিশালী সংগঠন। তাই তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ, সেখান থেকে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। দলের সংগঠন দাঁড় করানোর জন্য বাংলার জনপদে জনপদে যান। তিনি খুবই মান্য করতেন সোহরাওয়ার্দীকে। তার একাধিক লেখা আছে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বিশালতা, উদারতা বর্ণনা করে। কিন্তু ইতিহাসে অন্তত দুবার তিনি সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশ অমান্য করেন। এক. রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে। সোহরাওয়ার্দী মুজিবকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, পূর্ব বাংলার উচিত রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে মেনে নেয়া আর প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নেয়া। মুজিব এ নির্দেশ অমান্য করেন। তখনকার সরকারের গোয়েন্দাদের রিপোর্টে এটা পাওয়া যায়। আর ’৫৮ সালের সামরিক শাসনে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পরে যখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেয়া হয়, তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেন, সব রাজনৈতিক দল মিলে একটা ঐক্য মোর্চা করে কাজ শুরু করতে। শেখ মুজিব অস্বীকৃতি জানান। ’৫৪ সালের নির্বাচনের পরই তিনি বুঝে গেছেন, আদর্শহীন ঐক্য কোনো কাজে আসে না। দল বলতে লোকে আওয়ামী লীগকেই বোঝে। সেই আওয়ামী লীগকে নিয়েই এগোতে হবে। তিনি আওয়ামী লীগকেই পুনরুজ্জীবিত করেন। তার ফলটা আমরা পাই। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল বলেই দেশ স্বাধীন হতে পেরেছিল। যারা ভোর এনেছিল লিখছি। বিভিন্ন বই থেকে, ডকুমেন্ট থেকে, চিঠিপত্র থেকে সাহায্য নিচ্ছি। কিন্তু শুনছি যে, বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা আত্মজীবনী বের হবে।

আমার বইটা বেরোনোর পর বঙ্গবন্ধুর লেখা বই বেরোল। আমি আগ্রহ নিয়ে এবং ভয়ে ভয়ে ওই বইটা পড়লাম। আগ্রহ, কারণ বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা। ভয়, না জানি আমি কী কী ভুল লিখেছি। পড়ার পর দেখলাম, কোনো বড় ব্যত্যয় নেই। এর কারণ আমি তো বিভিন্ন চিঠিপত্র, গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট আর ডায়েরি থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলাম। কাজেই আমার বর্ণনা আর বঙ্গবন্ধুর বর্ণনার সন-তারিখ-স্থান অনেকটাই মিলে গেছে।

একটা জায়গায় স্থান-কালের পার্থক্য হয়েছে। কিন্তু মর্ম ঠিক আছে।

যারা ভোর এনেছিল বইয়ে আমি লিখেছিলাম:

‘মা বললেন, হাসু, আমরা গোপালগঞ্জ যাচ্ছি। তোমার আব্বার সাথে দেখা করতি।’

হাসুর মনের মধ্যে তখন গোপালগঞ্জের একটা কল্পনার ছবি আঁকা হয়ে যায়। এর আগেও সে গোপালগঞ্জ গেছে, সেবারও আব্বাকেই দেখতে; কিন্তু তখন সে ছিল খুব ছোট, তার কিচ্ছু মনে নেই। এবার তার মনে হয়েছিল, টুঙ্গিপাড়ার বাইগারখালের পাড়ে, একটা কঞ্চি হাতে নিয়ে যখন সে ছাগল-ছানাগুলোর পেছনে ছুটছিল, ছাগল-ছানার গলায় ঘুঙুর পরানো ছিল বলে ঝুমঝুম আওয়াজ হচ্ছিল, আর সেই আওয়াজ থেকে তার মনটাকে সরিয়ে নিল তার চোখ। একটা ঝলমলে হলদে-কালো প্রজাপতি ওই মধুর গাছের সাদা সাদা ছোট ফুলের ওপর ছটফটে পাখা মেলে ওড়াউড়ি করছে, হাসু তার পিছু নিল, সেখান থেকে তার চোখ পড়ল গিয়ে চোরকাঁটায় ভরা দূর্বা ছাওয়া মাঠটায়। তার বন্ধু, সমবয়সী রানু বলল, হাসু দেখ দেখ, এইখানে ফড়িংয়ের বাজার বসছে, এই বাজার গোপালগঞ্জ টাউনের বাজারের সমান— তখনই হাসুর মনে পড়ল, তারা গোপালগঞ্জ যাচ্ছে, আব্বাকে দেখতে। আর তার মনে হলো, গোপালগঞ্জের সবকিছু পোড়ামাটির তৈরি, তার বাড়িঘরগুলো পোড়ামাটির, রাস্তাঘাটগুলো পোড়ামাটির, যেমন পোড়ামাটিতে হয় কলসি, হাঁড়িকুড়ি, শানকি, তেমন। এটা মনে হওয়ার কারণ, গোপাল নামে একজন কুমার তাদের বাড়িতে বাঁক বয়ে নিয়ে আসত লাল লাল মাটির হাঁড়ি। নৌকায় করে টুঙ্গিপাড়া থেকে আসার পথে, খাল থেকে নদী পড়ার সময়ে শাপলার ফুল ধরে হাসু টান দিয়েছিল। দাদা লুত্ফর রহমান আঁতকে উঠেছিলেন, ‘হাসি, পইড়ে যাবি তো! মাঝখানে বস।’ মা হাসুকে টেনে কোলের কাছে নিয়েছিলেন। আর ছোট্ট কামাল, শাপলার সাদা দল দেখে মুগ্ধ। বারবার ওই দিকে আঙুল তুলে বলছে, ‘ফুল দেও, ফুল দেও।’ দাদি তাকে কোলে ধরে রেখেছেন। চঞ্চল ছেলে আবার পানিতে পড়ে না যায়।

দাদা-দাদি, মা, হাসু— সবাই মিলে তারা চলেছে গোপালগঞ্জে, আব্বাকে দেখতে।

গোপালগঞ্জে তাদের বাসা আছে, আদালতপাড়াতেই, কাজেই তাদের কোনো অসুবিধা হবে না।

আব্বা থানার মধ্যে একটা ঘরে বসে আছেন। বারান্দায় পুলিশ, ভিড় ঠেলে সামলাতে পারছে না। মুজিব ভাই এসেছে, আজকে তাঁর মামলার তারিখ পড়েছে, শুনেই কর্মীর দল আর সাধারণ মানুষ ভিড় করছে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য। মুজিবের বয়স ৩২-এর মতোন হবে। তিনি পরে আছেন ফুল হাতা শার্ট আর পায়জামা।

হাসুকে হাতে ধরে আর কামালকে কোলে নিয়ে হাসুর মা রেণু ঢোকেন ওই ঘরে। পুলিশ আর গোপালগঞ্জের আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতারা তাদের এগিয়ে দেন। পেছনে পেছনে মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে আসেন হাসুর দাদি। দাদা একটু পিছে পড়েছেন। ছেলে তার ছোটবেলায় খুব সল্টেড বিস্কুট খেতে পছন্দ করত, যখন সে ছিল এই গোপালগঞ্জে, আর পড়েছে মিশন স্কুলে, তখন তাকে অনেক দিন তিনি সল্টেড বিস্কুটের প্ল­াস্টিকের প্যাকেট কিনে দিয়েছেন। লুত্ফর রহমান দুটো বিস্কুটের প্যাকেট কিনে আনেন, ছেলেরা যে বড় হয়ে যায়, মা-বাবা অনেক সময় সেটা বুঝতেও পারেন না।

রেণু বলে, ‘এই যে দেখো তোমার কামাল, কত বড় হয়েছে। কত কথা বলে। নেও, কোলে নেও।’ কামালকে মুজিব কোলে নেন। চুমু দিয়ে গালটা নেড়ে বলেন, ‘কেমন আছ, বাবা।’ এর মধ্যে হাসু কাছে আসে, ‘বলে, আব্বা, এখানে গাছগুলোর নিচে সাদা কেন?’

মুজিব তখন হাসুর দিকে তাকান। ‘আরে, আমার মেয়েটা তো অনেক বড় হয়ে গেছে।’

আসলেই মুজিব অনেক দিন হাসুকে দেখেন না। প্রায় দুই বছর। এর মধ্যে হাসুর বয়স ডাবল হয়ে গেছে।

হাসু বলে, ‘আব্বা, আপনিও বড় হয়ে গেছেন।’

রেণু বলেন, ‘আম্মাও এসেছেন। কথা বলো। আম্মা ঘোমটাটা একটু সরান। আপনার ছেলে আপনার মুখ দেখবে না।’

‘মা কাছে আসো।’ মুজিব ডাকেন মাকে। এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন।

সায়রা খাতুন, মুজিবের মা, ছেলেকে হাতের মধ্যে পেয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেন না। একবার অস্ফুট কণ্ঠে তিনি বলতে পারলেন, ‘খোকা, ভালো আছিস বাবা?’

রেণু কিন্তু কাঁদবেন না। তিনি শক্ত হয়ে থাকবেন। মুজিবের সঙ্গে তাঁর এটাই চুক্তি। তিনি বলেছেন, ‘তুমি শুধু আমার জন্য ভাববা না, তুমি সারা দেশের জন্য ভাববা। মানুষের জন্য কাজ করবা।’

এখন চোখের জল ফেলে মুজিবকে সেই ব্রত থেকে সরাবেন না রেণু। তিনি শক্ত হয়ে থাকেন।

মুজিব বলেন, ‘রেণু, কেমন আছ?’

‘ভালো আছি আল্লাহর ইচ্ছায়। তোমার স্বাস্থ্য দেখি খুব খারাপ হয়ে গেছে।’

একটা কাশি দিয়ে মুজিব বলেন, ‘আরে না, একটু ঠাণ্ডা লেগেছে।’ মুজিব আসলে সত্য গোপন করছেন। তাঁর কাশিটা বেশ মারাত্মক। ব্রঙ্কাইটিসের মতো হয়েছে তাঁর। শুকনো কাশির সঙ্গে রক্তও পড়ছে। এসব কথা তিনি এখন বলবেন না। রেণু মন খারাপ করবে, মা আরো কাঁদবেন।

ভিড় বাড়ে। হাসু আর কামাল চলে যায় পাশের টিনে ছাওয়া ভবনটার বারান্দায়। কী বড় মাঠ। আর দীঘির জলটা কত শান্ত। দেখলেই শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আরে আশ্চর্য, সেই হলুদ-কালো প্রজাপতিটা টুঙ্গিপাড়া থেকে কী করে এল গোপালগঞ্জে।

আর হাসু অবাক হয়ে ভাবে, গোপালগঞ্জটা মোটেও তার কল্পনার মতো নয়। এখানে পোড়ামাটি দিয়ে বানানো ঘরদোর, রাস্তাঘাট নেই।

কামাল আর হাসু মিলে প্রজাপতির পেছনে পেছনে ছুটে বেড়ায়। নীলচে সবুজ কতগুলো কাঁটাগাছ। তার ডগায় হলুদ ফুল। প্রজাপতি একটা নয়, কয়েকটা। তারা ফুলের গায়ে বসছে, কিন্তু ধরতে গেলেই উড়ে যাচ্ছে।

থানার এ ভবনটার পিড়িলি ঘেঁষে পরাটার গাছ। ছোট ছোট পানপাতার মতো পাতা। আর পুঁতির মতো গোল গোল সবুজ তার ডগার দিকটা। ওই পাতায় চাপ দিলে তেলের মতো বেরোয়। তাই বাচ্চারা ওটাকে বলে পরাটার গাছ।

সেই গাছ থেকে পাতা তুলতে তুলতে হাসু বলে, ‘কামাল চল, রান্নাবাটি খেলি।’

তারা রান্নাবাটি খেলার জন্য নানা ধরনের ফুলপাতা, কলসির কানা, ইটের গুঁড়ো নিয়ে জমা করে বারান্দার লাল মেঝেতে।

পাশের দেয়াল বেয়ে সার বেঁধে যাচ্ছে কালো পিঁপড়ের দল।

‘আচ্ছা চল, কামাল, আবার আব্বাকে দেখে আসি।’

‘চলো।’

ওই সবুজ মাঠের মধ্যে দৌড়ে আবার তারা দুই ভাইবোন ওঠে সেই ঘরের বারান্দায়, যেখানে আব্বা আছেন।

হাসু বাবার কাছে যায়, ‘আব্বা আব্বা, আমরা রান্নাবাটি খেলি।’

কামালও বলে, ‘রান্নাবাটি খেলি।’

‘খেলো মা, যাও।’ মুজিব সালাম খান সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন। সালাম খানও এই মামলার আসামি। আবার তিনি অ্যাডভোকেটও।

হাসু আর কামাল ফের চলে আসে তাদের বিশাল খেলাঘরটার বারান্দায়। ‘যা কামাল, তুই নদীতে ডুব দিয়ে আয়, ওই সিঁড়িটা হলো নদী, সেখানে গিয়া বল হাপুস, এই তো একটা ডুব হলো... আমি রান্না করি, এইটা তো ভাত, ওইটাতে মাছ, এইটা, এই লাল ইটের টুকরা হলো গোশত...’

আরেকটু খেলে হাসু বলে, ‘কামাল, চল, আবার যাই আব্বাকে দেখে আসি।’

কামাল বলে, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকি...’

হাসু বিস্মিত হয় না। তার এই দু-আড়াই বছরের ভাইটা আব্বাকে তো কমই দেখেছে। আব্বাকে সে বাসায় কোনো দিনও পায়নি। আব্বা সবসময়ই জেলখানায়। আব্বাকে তো আব্বা বলে ডাকার সুযোগই পায়নি।’

আমার বইয়ের উত্স ছিল শেখ হাসিনার সাক্ষাত্কার, মঞ্জুরুল ইসলামের নেয়া। সময় প্রকাশনীর বই। আর বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা আব্বা বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দুজনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে ঝুলে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন ও আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।’

দুই বইয়ের স্থান-কাল ভিন্ন। কিন্তু মর্ম এক। তাহলো, কামাল তার আব্বাকে আপার আব্বা ভাবতেন। কারণ তিনি তার আব্বাকে জেলের বাইরে দেখেননি।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের ভাষায়, ‘সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ (অন্নদাশংকর রায়, ইতিহাসের মহানায়ক, প্রকাশক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২০১১)

আর ইতিহাসের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আমার শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে গেছে বেগম মুজিব সম্পর্কে।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। কী অসাধারণ এক নারীই না পেয়েছিলাম আমরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে! যাঁর কথা ইতিহাসে আসে না। কারণ নারী ও পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ আর অবদানের কথা থেকে যায় ইতিহাসের অন্তরালে। আমাদের ইতিহাসের দুটো খুব মাহেন্দ্রক্ষণে বেগম মুজিব নীরবে আমাদের ইতিহাসের গতি-প্রকৃতিকে ইতিবাচকভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একটা হলো ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময়। শেখ মুজিব তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি। ওই সময় একটা গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছিল। সারা দেশে প্রচণ্ড আন্দোলন হচ্ছে। আর এই সময় শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে যাবেন আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠক করতে! বেগম মুজিব তাড়াতাড়ি ডেকে পাঠালেন বড় মেয়ে হাসিনাকে। হাসিনার হাতে চিরকুট দিলেন। শেখ হাসিনাও সেই চিরকুটের বার্তাটা মুখস্থ করে নিলেন, যদি প্রহরীরা চিরকুট কেড়ে নেয়! বেগম মুজিবের বার্তাটা ছিল, সারা দেশের মানুষ তোমার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত, খবরদার তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না। যদি তুমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আসো, আমি তোমার বিরুদ্ধে পল্টনে সভা করব। (শেখ হাসিনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা, মঞ্জুরুল ইসলাম, সময় প্রকাশনী)

সেই বার্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ছাত্রী শেখ হাসিনা পৌঁছে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব সেদিন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গবন্ধু হিসেবে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এসেছিলেন।

একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় যোগ দিতে যাবেন বঙ্গবন্ধু। তিনি খুব অস্থির। একদিকে ছাত্র-জনতার প্রচণ্ড চাপ, আজই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে। অন্যদিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে ওই ভাষণটির দিকে। আমরা আজ জানি, এমনকি আমেরিকার কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার ক্ষমতাকেন্দ্রও নির্ঘুম অপেক্ষা করছিল শেখ মুজিব কী বলেন তা জানার জন্য। ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স যদি আসে, তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি মিলিটারি। এ অবস্থায় কী করবেন বঙ্গবন্ধু! নিজের ঘরে তিনি পায়চারি করছেন। বেগম মুজিব তাঁকে বললেন, তুমি এত অস্থির কেন। শুয়ে খানিকক্ষণ রেস্ট নাও। মুজিব শুয়ে পড়লেন। তাঁর মাথার কাছে মোড়া নিয়ে বসা শেখ হাসিনা, পায়ের কাছে বেগম মুজিব। বেগম মুজিব বললেন, তুমি তোমার নিজের বিবেকের কথা বলবা। তোমার সামনে লক্ষ মানুষের হাতে বাঁশের লাঠি, পেছনে বন্দুক। তুমি তা-ই বলবা, যা তোমার অন্তর বলতে চায়। শেখ মুজিব খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে উঠলেন। যাওয়ার আগে বেগম মুজিবের কপালে চুম্বন করলেন। খানিকটা দেরি করেই তিনি পৌঁছালেন সভামঞ্চে।

বেগম মুজিব কিন্তু মার্চের ওই সময়টাতেও বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ইয়াহিয়ার সঙ্গে যেন তিনি আপস না করেন।

জেনারেল ও নারীরা বইয়ে আমি লিখেছি:

রেণু মাত্র দুই দিন আগে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে নিজের ভাতের থালায় পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। ভাত খাননি। মুজিব যথারীতি তাঁর সঙ্গে খেতে বসেছিলেন।

রেণু জিগ্যেস করেছিলেন, ‘ইয়াহিয়ার সঙ্গে নাকি তোমার সমঝোতা হচ্ছে?’

মুজিব কিছু না বলে খেতে থাকেন।

‘সমঝোতা কোরো না।’ রেণু বলেন।

মুজিব রেগে গিয়ে বলেন, ‘আলোচনা হচ্ছে। এখনো কিছু হয় নাই।’

রেণু বলেন, ‘খবরদার, তুমি আপস করবে না। কিসের সমঝোতা ইয়াহিয়ার সঙ্গে? তুমি যদি সমঝোতা করো, দেশের মানুষ তোমার ওপর ক্ষুব্ধ হবে। তারা আর তোমার সঙ্গে থাকবে না। তখন যেকোনো সময় ইয়াহিয়া তোমাকে মেরে ফেলতে পারবে।’

মুজিব আরো রেগে গিয়ে বলেন, ‘আরে বললাম তো সমঝোতা হয় নাই। আলোচনা চলছে।’

রেণু নিজের ভাতের মধ্যে পানি ঢেলে দেন। সারা দিন তিনি আর ভাত খাননি। দুপুরে খাননি, রাতে খাননি।

শেষে মুজিব তাঁকে বললেন, ‘তুমি আমাকে এই চিনলা, আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য বাংলাদেশের মানুষের সাথে বেইমানি করব? আমার জীবন যেতে পারে, কিন্তু আমি দেশের মানুষের মুক্তি ছাড়া আর কিছু চাই না। ওঠো, ভাত খাও।’

বেগম মুজিব খাবার টেবিলে বসলেন। মুজিবও বসলেন। খাওয়ার পর তিনি তাঁর পানের বাটাটা নিয়ে খুব যত্ন করে পান বানালেন। একটা নিজের জন্য। একটা হাসুর আব্বার জন্য।

মুজিব পান চিবুতে চিবুতে ভাবলেন, এই ছোটখাটো মানুষটা রাজনীতির এমন জটিল সমীকরণ এত সহজ করে বোঝে কী করে। যেমন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোরের গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়ার আইয়ুব খানের প্রস্তাবে রেণু ‘না’ করে দিয়েছিলেন। তিনি হাসুকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বন্দি মুজিবকে, ‘খবরদার, তুমি প্যারোলে মুক্তি নেবে না। তোমাকে নিঃশর্তভাবে ছাড়তে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের ভাষা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এ ভাষা জসীমউদ্দীনের গদ্যের মতো, এ ভাষা হুমায়ূন আহমেদের মতোই, কিংবা তারও চেয়ে ভালো। তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন, যেমন— আব্বাসউদ্দীনের গান শুনে নদীর ঢেউও তন্ময় হয়ে যায়, কিংবা বন্দি অবস্থায় একটা বাংলোর সামনে মশার মধ্যে বসে তিনি রাতের সৌন্দর্যের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অপূর্ব। আর তার সেন্স অব হিউমার। তার সহবন্দি নেওয়াজের রোম ছিল বড় বড়, ছেলেরা তার শরীরে ছারপোকা ছেড়ে দিত, এই বর্ণনা পড়ে আমি খিলখিল করে হেসে উঠেছি।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তিওয়ালা মানুষ। জেলখানায় ষাটের দশকে বসে লিখছেন অনেক আগে দেখা দিল্লির বর্ণনা, তাজমহলের বর্ণনা। তার স্মৃতিশক্তি ছিল ক্যামেরার মতো। আর ছিল নিখাদ ভালোবাসা, দেশের জন্য, মানুষের জন্য।

তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছি ঊষার দুয়ারে বইয়ে। তিনি আমাদের দেশ দিয়েছেন, সেই ঋণই বা আমরা শোধ করব কী করে, আর তার বই থেকে যে অনেক কিছু নিয়েছি, সেই ঋণ স্বীকার করি বারবার, যদিও তাও শোধ হওয়ার নয়।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কবি