(ভূমিকা: ১৯৮৬ সালে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের বেলারুশ বা বিয়েলোরুশিয়া প্রদেশে চেরনোবিল পারমাণবিক স্টেশনে একটি পারমাণবিক চুল্লিতে সিরিজ বিস্ফোরণ ঘটায় ৩১ জন ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক এতে বিপর্যয়ের শিকার হয় এবং ১৮ বিলিয়ন রুবল সোভিয়েত সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছিল পরিস্থিতি মোকাবেলায়।
আমাদের মতো দেশে কোনো দুর্ঘটনায় ৩১ জনের মৃত্যু আমাদের কাছে তেমন কোনো বড় ঘটনা মনে হয় না। কিন্তু চেরনোবিলের প্রতিক্রিয়া বোঝা যায় ধীরে ধীরে।। ২০০৮ নাগাদ পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ায় ৬৪ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও চেরনোবিল ফোরামের মতে, একটা পর্যায়ে চড়া মাত্রার পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তায় মারা গেছে চার হাজার মানুষ। উদ্ধারকাজে কর্মরত দুই লাখ শ্রমিক এবং চেরনোবিল ও আশপাশের এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়া ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ (অনেকে সরকারি নির্দেশেও জায়গা ছেড়েছিলেন কিছু দিনের জন্য) এবং পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয়াগ্রস্ত এলাকায় থাকা ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ ধীরে ধীরে শিকার হয়েছেন বিষক্রিয়ার। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ৫০ জন শ্রমিক একিউট রেডিয়েশন সিনড্রোমে মারা গেছেন, নয়টি শিশু মারা গেছে থাইরয়েড ক্যান্সারে আর পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয়া-উদ্ভূত ক্যান্সার রোগ বিশেষ করে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেছে আরো ৩ হাজার ৯৪০ জন।
বেলারুশ সাংবাদিক সভেতলানা আলেক্সান্দ্রোভিচ চেরনোবিল দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫০০ জন ভিক্টিমের কথ্য ইতিহাসনির্ভর চেরনোবিল প্রেয়ার্স বইটি রুশ ভাষায় রচনা ও প্রকাশ করেন ১৯৯৭ সালে। বইটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে দুই ভিন্ন অনুবাদকের হাতে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। ২০০৫ সালে এ বইটির মার্কিনি ইংরেজি অনুবাদ (Voices from Chernobyl: The Oral History of a Neuclear Disaster)-এর জন্য অনুবাদক কিথ গেসেন পুরস্কৃত হন। আর গত বছর সভেতলানা নোবেল পুরস্কার পান। বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার পুনরুত্থানের জন্য বিচলিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত এই নোবেলের পেছনে আছে কিনা বা নন-ফিকশন সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা, এসব প্রশ্ন আরো অনেকের মতো আমিও ভেবেছি। সম্প্রতি নেটে এ বইটির কিছু অংশ পড়তে গিয়ে আমি বিস্ময় মানি। সোভিয়েত পদস্থ কর্মকর্তাদের ইন্টারভিউয়ের পাশাপাশি ইতিহাসে কণ্ঠ মুছে যায় যে অগণিত নামহীন মানুষের, তেমন অনেক অখ্যাত, অনামা মানুষের কথা এসেছে এ বইয়ে। সবচেয়ে কাব্যিক লেগেছে দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে যে সহজ-সরল, নিরীহ গ্রামবাসীকে উঠোনের আপেলগাছ বা পিতৃপুরুষের কবরখানা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বা আবার ফিরে আসার পর তাদের মানসিক অবস্থার বিবরণ। যে স্তন্যদাত্রী মায়ের দুধ তেজস্ক্রিয়তায় বিষাক্ত হয়ে গেছে বা উদ্ধারকাজে কর্মরত যে যুবক সৈনিককে নাচের আসরের কোনো তরুণী প্রত্যাখ্যান করে। কারণ যুবকের শরীরে ‘তেজস্ক্রিয়তা’ মিশে আছে। সে আর কোনো সুস্থ সন্তানের জন্মদান করতে পারবে না। এ বইটির অন্যতম দীর্ঘ ইন্টারভিউটি চেরনোবিল স্টেশনে দুর্ঘটনার শিকার এক ফোরম্যানের স্ত্রীর। পরিসর বিবেচেনায় সেটি অনুবাদে হাত দেয়া গেল না। গোটা বইটিই অনুবাদে একটি প্রবল আগ্রহ জন্মাচ্ছে)।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল রাত ১:২৩:৫৮-এ, চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রে একটির পর একটি সিরিজ বিস্ফোরণ হয়, যা ওই স্টেশনের ৪ নম্বর এনার্জি ব্লকে অবস্থিত পারমাণবিক চুল্লিটি ধ্বংস করে দেয়। চেরনোবিল দুর্ঘটনা ছিল বিশ শতকের বৃহত্তম কারিগরি দুর্যোগ... তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি ছোট্ট প্রদেশ বেলারুশ বা বিয়েলোরুশিয়ার জন্য এটি ছিল অবশ্যই একটি জাতীয় দুর্যোগ (বিয়েলোরুশিয়ার জনসংখ্যা তখন এক কোটি) ...আর আজ প্রতি পাঁচজন বিয়েলোরাশিয়ানের একজন সেই পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাস করে। প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ এর আওতায় আসে, যাদের ভেতর সাত লাখ শিশু রয়েছে। চেরনোবিল-কাণ্ডে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গোমেল ও মগিলেভ অঞ্চলে মৃত্যুর হার জন্ম হারের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।
: বেলারুশস্কায়া অন্টসিক্লোপেডিয়া, ১৯৯৬, ‘চেরনোবিল’ পৃষ্ঠা ২৪।
চেরনোবিলে পারমাণবিক চুল্লিতে বিস্ফোরণের তিনদিনের মাথায় ২৯ এপ্রিল ১৯৮৬ পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও
রোমানিয়ায় চড়া মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায়। ৩০ এপ্রিল সুইজারল্যান্ডে ও উত্তর ইতালিতে তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান মেলে। ১ ও ২ মে নাগাদ ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, গ্রেট ব্রিটেন ও উত্তর গ্রিসে ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ক্রিয়তা। ৩ মে ইসরাইল, কুয়েত ও তুরস্কে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায়। বায়ুবাহিত গ্যাসীয় উপাদান ত’ সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে সক্ষম। ২রা মে জাপানে, ৫ই মে ভারতে এবং ৫ই ও ৬ই মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে যায়।
‘বেলারুশে চেরনোবিল দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়া।’
: দ্য শাখারভ ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অন রেডিওইকোলজি, মিনস্ক, ১৯৯২।
মারাত ফিলিপ্পোভিচ কোখানভ, বেলারুশ বিজ্ঞান একাডেমির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী
দুর্ঘটনার এক মাসের মাথায় বা মে মাসের মাঝামাঝি নাগাদ আমরা মোট ৩০ কিলোমিটার চৌহদ্দির ভেতর নানা ধরনের দ্রব্য পরীক্ষা শুরু করি। এলাকাবাসী আমাদের কাছে গৃহপালিত এবং বন্য পশুর মাংস বা দুধ এনে দিচ্ছিল। প্রথম দফা পরীক্ষার পরই এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, মাংস বলে আপাতদৃষ্টে যা দেখা যাচ্ছে, সেটা আসলে মাংস নয়। পারমাণবিক বর্জ্য মিশ্রিত একটি বস্তুবিশেষ। দুধ পরীক্ষা করছিলাম। তবে সেটা দুধ তো নয়। এটাও ছিল পারমাণবিক বর্জ্যের উপাদান মিশ্রিত কোনো দ্রব্য।
চারপাশে চড়া তেজস্ক্রিয়তা। কয়েকটি গ্রামে আমরা বয়স্ক এবং শিশুদের থাইরয়েডের মাত্রা পরীক্ষা করলাম। শরীরে যতটুকু থাইরয়েড থাকলে কোনো ক্ষতি নেই, তার চেয়ে ১০০, কখনো কখনো ২০০ বা ৩০০ গুণ থাইরয়েডও অনেকের শরীরে পাওয়া যাচ্ছিল। ট্রাক্টর চলছিল, চাষীরা তাদের জমিতে চাষ করছিল। শিশুরা বালির বস্তায় বসে খেলছিল। বাড়ির পাশে বেঞ্চে বসে যে নারীকে দেখছি তার সন্তানকে স্তন্য পান করাতে— তার দুধে সিসিয়াম, সে আমাদের চেরনোবিল ম্যাডোনা।
আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা করতাম, ‘আমরা এখন কী করব? আমাদের কীভাবে কাজ করতে হবে?’ তাঁরা বলতেন, ‘আপনারা আপনাদের প্রস্তুতি নিন। টিভি দেখুন।’ টেলিভিশনে গর্বাচেভ জনতাকে শান্ত করছেন, ‘আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি।’ আমি এটা বিশ্বাস করতাম। ২০ বছর ধরে আমি একজন প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছি, পদার্থবিদ্যার সব নীতিসূত্রের সঙ্গে আমি ভালোই পরিচিত ছিলাম। আমি জানতাম যে, জীবিত সবার অন্তত কিছু দিনের জন্য এ এলাকা পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু সেটা না করে আমরা ‘প্রস্ততি’ নিতে এবং টিভি দেখতে থাকলাম। আমরা বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
নাদেজদা পেট্রোভনা ভিগোভস্কায়া: দুর্ঘটনার পর প্রিপিয়াত শহর থেকে পালিয়ে যাওয়া এক নারী
শুক্রবার গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছিল। সেই সকালে কেউ কিছু সন্দেহ করেনি। আমি আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠালাম, আমার বর গেল নাপিতের কাছে চুল কাটতে। দুপুরবেলা যখন খাবার বানাচ্ছি, আমার বর ফিরে এল। ‘আণবিক স্টেশনে আগুন লেগেছে। আমাদের বলা হচ্ছে সারাটা সময় রেডিও খোলা রাখতে।’ এ আগুন কোনো সাধারণ আগুন ছিল না, কেমন চকচকে দেখতে। বেশ সুন্দর। আমি কোনো সিনেমাতেও এত সুন্দর আগুন দেখিনি। সেদিন সন্ধ্যায় সবাই ব্যালকনিতে ভিড় জমাচ্ছে। যাদের বাসায় ব্যালকনি নেই তার! বন্ধুদের বাসায় যাচ্ছে। আমরা নবম তলায় থাকতাম। কাজেই সবকিছু সুন্দর দেখতে পেতাম। সবাই তাদের সন্তানদের নিয়ে বের হচ্ছিল, তাদের মাথার উপর তুলে বলছিল: ‘দ্যাখো! স্মরণে রেখো!’ এবং এ মানুষগুলো সবাই পারমাণবিক চুল্লিতে কাজ করেছে— প্রকৌশলী, শ্রমিক, পদার্থবিদ্যার নির্দেশদাতা। কালো ধুলার ভেতর দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল, শ্বাস নিচ্ছিল আর অবাক হয়ে দেখছিল সেই আগুন। চারপাশের সব জায়গা থেকে মানুষ তাদের গাড়িতে এবং নিদেনপক্ষে মোটরবাইকে চড়ে আসছিল ঘটনাটা দেখতে। আমরা জানতাম না যে মৃত্যু এত সুন্দর হতে পারে।
সারা রাত আমি ঘুমাইনি। সকাল ৮টায় সেনাবাহিনীর মানুষ রাস্তায় নামল গ্যাস মাস্ক পরে। আমরা যখন তাদের সেনাবাহিনীর নিজস্ব যানে চড়ে রাস্তায় ঘুরতে দেখলাম, তখন ভয় পাওয়ার বদলে বরং শান্ত বোধ করলাম। আমরা তখনো বুঝিনি যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া এই আপাত শান্ত পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা মানুষ হত্যা করতে পারে আর পদার্থবিদ্যার নীতিসূত্রের সামনে মানুষ কতটা অসহায়!
সারা দিন বেতারে সবাইকে এলাকা ছাড়ার কথা বলা হলো: কর্তৃপক্ষ আমাদের তিনদিনের জন্য নিয়ে যাবে আর এখানে সবকিছু ধুয়ে-মুছে তার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। সন্তানদের বলা হলো তারা যেন অবশ্যই তাদের স্কুলের বই সঙ্গে করে নিয়ে যায়। আমার বর তবু আমাদের সব নথিপত্র আর বিয়ের ছবিগুলো ব্রিফকেসে ভরে নিল। আমি আমার সঙ্গে নিলাম শুধু কয়েক গজ কাপড়ের একটি রুমাল, যা আবহাওয়া খারাপ হলে কাজে দেবে।
সেটেলারদের কোরাস: যারা ফিরেছেন
(লেখক এখানে চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়া সব পরিবারের কথ্য ইতিহাস সংগ্রহ করেছেন; বিশেষত যারা চলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন। তবে এখানে আলাদা করে কথকদের নাম দেয়া হয়নি)।
ওহ, সে কথা আমি মনে করতে চাই না। গোটা ঘটনাটাই ছিল খুব ভীতিকর। তারা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াল। সৈন্যরা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলল। সেনাবাহিনীর বড় যন্ত্র গড়াচ্ছে তখন। এক বৃদ্ধ ব্যক্তি পথে মৃত্যুযন্ত্রণায় ধুঁকছেন। কোথায় যাবেন তিনি? ‘আমি উঠব,’ তিনি কাঁদলেন, ‘এবং কবরখানায় যাব। আমি নিজেই এটা করব।’
চলে যাওয়ার আগে আমি মায়ের কবর থেকে কিছু মাটি নিয়ে একটি থলেতে পুরলাম। হাঁটু গেড়ে বসে বললাম, ‘তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য আমাদের ক্ষমা করো মা।’ সেই রাতেই চলে গেলাম আর তেমন ভয় বোধ করিনি। মানুষ ঘরের ওপর তাদের নাম লিখছিল। কাঠের ওপর। ঘরের বেড়ায়। আলকাতরার কালিতে।
এখানে শীতের সময় রাতগুলো খুব লম্বা হয়। আমরা কখনো কখনো বসব এবং গুনব: কে কে মারা গেল?
আমার বর দুই মাস হয় শয্যাশায়ী ছিল। সে কোনো কথা বলত না, আমার কথার উত্তর করত না। সে ছিল উন্মাদ। আমি উঠানে ঘুরেটুরে তাঁর কাছে ফিরে এসে বলতাম, ‘আজ কেমন লাগছে?’ কেউ যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তখন তার সামনে তোমার কাঁদা উচিত নয়। তার মৃত্যুকে তোমার ঠেকানো উচিত, তাকেও বাঁচার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কাজেই আমি কাঁদতাম না। শুধু একটি কথা রোজ বলতাম: ‘আমাদের মেয়ে আর আমার মাকে শুভেচ্ছা জানাও।’ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতাম যেন বুড়ো-বুড়ি একসঙ্গে মরতে পারি। ঈশ্বর এটা চাইলেই করতে পারতেন, কিন্তু তিনি আমাকে মরতে দিলেন না। আমি বেঁচে আছি...
ঘর ছাড়ার আগে আমি গোটা ঘর ধুলাম, স্টোভ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করলাম। টেবিলের ওপর রাখলাম খানিকটা রুটি, কিছুটা লবণ, একটি ছোট থালা ও তিনটি চামচ। বিয়েলোরুশিয়ায় আমাদের বিশ্বাস এই যে, ঘর ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সময়, ঘরে যে কয়টি জীবিত আত্মা আছে সেই কয়টি চামচ টেবিলে সাজিয়ে রাখতে হয়। যাতে সবাই একসঙ্গে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরতে পারে।
চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর পনির বানানো যাচ্ছিল না। একটি মাস আমরা পনির ছাড়া কাটিয়েছি। দুধ টক হতো না— তরল দুধ আণবিক তেজস্ক্রিয়তায় গুঁড়ো দুধ, সাদা গুঁড়োয় পরিণত হয়েছিল।
আমার বাগানে তেজস্ক্রিয়তা দেখা দিল। গোটা বাগানটা সাদা হয়ে গেল, এত সাদা যেন কোনো কিছু দিয়ে আবৃত। যেন বা এটি কোনো কিছুর একটি টুকরো। ভাবলাম হতে পারে কেউ অরণ্য থেকে এটি এনেছে।
এত কিছুর পরও আমাদের বাড়ি ছাড়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আমাদের পুরুষরা সব মদ খেয়ে মাতাল হচ্ছিল আর নিজেদের গাড়ির নিচে ছুড়ে ফেলছিল। পার্টির বড় নেতারা সবাই বাড়ি বাড়ি যাচ্ছিল আর মানুষজনকে মিনতি করছিল বাড়ি ছেড়ে দিতে। সেই সঙ্গে নির্দেশও ছিল বৈকি: ‘আপনাদের জিনিসপত্র সঙ্গে নেবেন না।’
আমাদের আর কেউ বোকা বানাতে পারবে না। আমরা কোথাও যাচ্ছি না। এখানে কোনো গুদামঘর নেই, কোনো হাসপাতালও নেই। আমরা কেরোসিন বাতির কাছে বসে আছি। চাঁদের আলোর নিচে। আর সেটাই করতে ভালো লাগছে। যেহেতু এখানেই আমাদের দীর্ঘদিনের বসতি।
পুলিশ সমানে চেঁচাচ্ছিল। তারা গাড়িতে করে আসবে আর আমরা জঙ্গলে পালাব। ঠিক যেমন জার্মানদের দেখলে পালাতাম। কখনো কখনো তারা উকিল সঙ্গে করে নিয়ে আসবে যে আমাদের ধারা-১০ শেখাবে আর হাঁফাতে হাঁফাতে বলবে: ‘তাদের আমায় এক বছরের জন্য জেলে পাঠাতে দাও। আমি কয়েদ খেটে এসে আবার এখানে ফিরব।’ আসলে পুলিশের কাজ হলো চেঁচানো আর আমাদের কাজ চুপ থাকা। আমার একটা পদক আছে— কোলখোজের সেরা কৃষক আমি। আর এ উকিল কিনা আমাকে ধারা-১০ শেখাতে চায়।
এক প্রতিবেদক বলল, আমরা দুর্ঘটনার পর পালিয়ে গিয়ে আবার যে ফিরে এসেছি এটা শুধু ঘরে ফেরা নয়। আমরা ১০০ বছর পেছনে চলে গিয়েছিলাম। আমরা এখন ফসল তুলতে হাতুড়ি আর জমি নিড়াতে কাস্তে ব্যবহার করি। আলকাতরার মতো ছাইয়ের ওপর গম মাড়াই করি।
আমরা আর বেতার শুনি না। নতুন কোনো খবর জানি না, তবে জীবন এখন শান্ত। মানুষজন আসে, তারা আমাদের গল্প বলে— সর্বত্র যুদ্ধ এবং সমাজতন্ত্র শেষ আর আমরা পুঁজিবাদের আওতায় বাস করছি। জার আবার ফিরবেন। এটা কি সত্যি?
প্রত্যেকে ফসল তোলার জন্য ফিরতে চাচ্ছে। সবাই দিনের শেষে যে যার পিঠ বাঁচাতে চায়।
চেরনোবিলের আশপাশে বাস করে এমন অধিবাসীদের ভেতর যাদের পুলিশ ফিরতে দেবে, তাদের নামের লিস্ট পুলিশের কাছে আছে। তবে ১৮-এর নিচে শিশুরা আসতে পারবে না। তাদের জন্য তেজস্ক্রিয়তা আরো খারাপ হবে। সবাই বাড়ি ফিরবে বা ফিরতে পারবে এই আনন্দে অধীর হয়ে উঠল। বাড়ির উঠানে আপেলগাছটার কাছে তারা দাঁড়াবে। প্রথমে তারা পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে কাঁদবে, তার পর যাবে নিজেদের উঠানে। সেখানেও তারা কাঁদবে আর প্রার্থনা করবে। মোমবাতি রাখবে কবরখানায়। কবরের বেড়া ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে অনেকক্ষণ। কখনো কখনো ঘরে তারা রাখবে একটি ফুলের তোড়া। আর দরজায় একটি সাদা তোয়ালে। এক বৃদ্ধা হয়তো প্রার্থনা পড়বেন: ‘ভাই ও বোনেরা! ধৈর্য রাখো!’
বাড়ি ফিরে মানুষজন সবাই ডিম, রোল আর যে যা খাবার পারে সেসব নিয়ে যাচ্ছে কবরখানায়। প্রত্যেকে পরিবারের সঙ্গে মিলে বসেছে আর কবরখানায় শায়িতদের বলছে, ‘বোন, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি। দুপুরের খাবার খাও।’ অথবা ‘মা, প্রিয় মা, বাবা, প্রিয় বাবা!’ যাদের কাছের মানুষরা এ বছর মারা গেছে তারা কাঁদল। যাদের প্রিয়জনরা আগের বছর মারা গেছে তারা কাঁদল না। সবাই কথা বলছে আর স্মরণ করছে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াদের। প্রত্যেকে প্রার্থনা করছে। যারা জানে না কীভাবে প্রার্থনা করে, তারাও করছে।
এখানে আমাদের সবকিছু আছে— কবরস্থান। সর্বত্র কবর। ময়লা গাদা করে ফেলার কবরগুলো কাজ করছে, বুলডোজারগুলো। ঘরগুলো পড়ো পড়ো। গোরখোদকরা দিন-রাত কাজ করছে। তারা স্কুলগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে মাটিতে। সেই একই পৃথিবী শুধু মানুষগুলো বদলে গেছে। একটা জিনিস জানি না, মানুষের কি আত্মা আছে? থাকলে সে আত্মা কেমন? তারা সবাই পরবর্তী জীবনে কি খাপ খাওয়াতে পারবে? আমার দাদু দুদিন হয় মারা গেছেন। আমি চুলার পেছনে লুকিয়ে অপেক্ষা করেছি: দাদুর শরীর থেকে আত্মাটা কীভাবে উড়ে যায়? তার পর গরুর দুধ দোয়াতে গেছি— ফিরে এসে তাঁকে ডাকতে গিয়ে দেখি তিনি শুয়ে আছেন আর নিথর চোখ দুটো খোলা। তাঁর আত্মা ইতোমধ্যে উড়ে গেছে। অথবা সত্যি কি কিছু ঘটেনি? তাহলে কীভাবে আমরা দেখা করব?
সৈন্যদের কোরাস
(এ পর্বে লেখক চেরনোবিল বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিশুদ্ধ করার কাজে পাঠানো সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতিক্রিয়া নথিবদ্ধ করছেন। তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে কোনো সৈন্য যেতে চাইছে না আবার কোনো কোনো সৈন্য বীরত্বের সঙ্গে পরিশুদ্ধি অভিযানে যেতে চাইছে)।
আমাদের রেজিমেন্টকে বিপদসংকেত দেয়া হলো। আমরা জানতাম না যে, আমাদের বিয়েলোরুশিয়ায় চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তাজনিত ক্ষয়ক্ষতি পরিষ্কার করতে যেতে হবে। আমরা যখন মস্কোয় বেলোরুশস্কায়া রেলস্টেশনে কর্তৃপক্ষের নির্দেশমতো পৌঁছলাম, কেবল তখনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানালেন যে, আমাদের চেরনোবিলের ওখানে যেতে হবে। একজন সৈন্য আমার ধারণা সে লেনিনগ্রাদ থেকে এসেছে, আণবিক তেজস্ক্রিয়াগ্রস্ত এলাকায় যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুরু করল। তখন তাকে বলা হলো যে, তাকে টেনেহিঁচড়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হবে। কমান্ডার গোটা বাহিনীর সামনে তাকে বললেন, ‘আপনাকে জেলে যেতে হবে অথবা গুলি করা হবে।’ তবে আমার আবার ওই ব্যক্তির মতো মনে হয়নি। আমি বীরত্বমূলক কিছু করতে চাচ্ছিলাম। বাচ্চাদের মতো। আমার মতো অন্যরাও সেখানে ছিল। একটু ভয় ভয় লাগছিল, তবে মজাও লাগছিল।
সুতরাং আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। আণবিক স্টেশনের কাছে। আমাদের সাদা পোশাক ও সাদা টুপি দেয়া হলো। আর গজ কাপড়ের সার্জিক্যাল পোশাক। আমরা গোটা এলাকা পরিষ্কার করলাম। আণবিক স্টেশনের রোবটগুলোকে দিয়ে কোনো কাজ হলো না। বিস্ফোরণের পর ওদের গোটা সিস্টেমে গোলমাল ধরা পড়ে। তবে আমরা সৈন্যরা খুব কাজ করলাম। সে কথা ভেবে গর্ব হয়।
আমরা সৈন্যরা যখন সবকিছু পরিষ্কার করছিলাম, তখন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ঘর ছেড়ে যাওয়া সবার অনেকগুলো পরিত্যক্ত বাড়ি। তেমন একটি বাড়ি আমরা দেখলাম বন্ধ। বাড়ির জানালায় একটি বিড়াল বসে আছে। একবার ভাবলাম: মাটির বিড়াল নাকি? কৌতূহল মেটাতে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। না, সত্যিকারের বিড়াল। বাড়ির সবগুলো ফুলও খেয়ে ফেলেছে। বিড়ালটা এখানে কী করে এল? নাকি বাড়ির সবাই ওকে রেখেই চলে গেছে?
দরজার উপরে রাখা একটি চিরকুটে লেখা: ‘প্রিয় সহূদয় ব্যক্তি, এ বাড়িতে কোনো দামি জিনিস খুঁজে পাবেন না। আমাদের তেমন কিছু ছিলও না। আপনাদের কোনো কিছু দরকার হলে ব্যবহার করবেন। শুধু বাড়িটি ময়লা করবেন না।’ অন্য নানা বাড়িতেও বাড়ির উপরে নানা রঙ্গে আঁকা লেখা দেখলাম— প্রিয় বাড়ি, আমাদের ক্ষমা করো! মানুষ তাদের বাড়িকে বিদায় দিচ্ছিল, যেন বাড়িগুলোও মানুষ। কোথাও আবার কেউ লিখে রেখেছে: ‘আমরা আজ সকালে চলে যাচ্ছি,’ অথবা ‘আমরা আজ রাতে চলে যাচ্ছি।’ স্কুল নোটবইয়ের কাগজে কোনো শিশু তার কাঁচা হাতের গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে: ‘আমাদের বিড়াল ঝুলকাকে মারবেন না। সে একটি অত্যন্ত ভালো বিড়াল।’
আমরা সৈন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছলাম। কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি পেলাম। ‘একটি দুর্ঘটনা,’ ক্যাপ্টেন বললেন, ‘বহু সময় আগে হয়েছে। তিন মাস আগে। এটা আর বিপজ্জনক নয়।’
‘ভালো,’ সার্জেন্ট বললেন, ‘খেতে বসার আগে হাতটা ভালো করে ধুয়ে নেবেন।’
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পর একদিন নাচতে গেলাম। একটি মেয়েকে বললাম, ‘চলো, একসঙ্গে নাচি। পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হই।’
‘কেন? তুমি এখন একজন চেরনোবিলাইট। তোমার সন্তান ধারণ করতে আমার ভয় লাগবে।’
রুশ থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর: কিথ গেসেন






