জগদ্বিখ্যাত হীরা কোহিনূর নিয়ে নানা কাহিনী ইতিহাসের ভেক ধরে সত্য ঘটনা বলে দীর্ঘদিন প্রচলিত রয়েছে। হীরাটি ঘিরে সবচেয়ে চর্চিত জনপ্রিয় বিয়োগান্তক কাহিনীটি সবারই জানা। নাদির শাহ (১৬৮৮-১৭৪৭) দিল্লি লুণ্ঠনের সময় পরাজিত মোগল বাদশাহ মোহাম্মদ শাহের সঙ্গে পাগড়ি বিনিময়ের ছলে মোগল বাদশাহর পাগড়ির ভেতর লুকানো কোহিনূর হস্তগত করেন। সৌহার্দ্য ও মিত্রতার প্রতীক হিসেবে পাগড়ি বিনিময় বাদশাহি আমলের একটি সম্মানিত প্রথা। তবে পাগড়ি বিনিময় যথার্থ অর্থবোধক হয় তখনই, যখন উভয় পক্ষই সমশক্তিধর— কিন্তু এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেছিল কারণ, বাদশা মোহাম্মদ শাহ বিজিত আর নাদির শাহ বিজয়ী। দুই নৃপতির মর্যাদা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে বিস্তর ফারাক। এই পাগড়ি বিনিময় নেহাতই একটি মান্য প্রথার প্রতীকী অনুকরণ মাত্রা। আধুনিক ইতিহাসবিদরা ঘটনাটির সত্যতা নিয়ে নিঃশঙ্ক নন।
নাদির শাহ পরাজিত মোগল বাদশার রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ময়ূর সিংহাসন দেননি। যিনি ময়ূর সিংহাসন থেকে শুরু করে মোগল তোষাখানার হীরা-জহরত, স্বর্ণমুদ্রা, দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি, মোগল চিত্রীদের আঁকা নানা দুর্মূল্য ছবি অ্যালবাম, শাহি লাইব্রেরির মূল্যবান পুস্তক শত শত খচ্চরের পিঠে বিনা দ্বিধায় বা কোনো আড়াল-আবডালের ছুতো না রেখে নিজের দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার পক্ষে হীনবল পরাজিত মোগল বাদশার কাছ থেকে একটি বহুমূল্য হীরা নেয়ার জন্য পাগড়ি বিনিময়ের ছলচাতুরির কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। পরাজিত মোগল বাদশাহের মুখ রক্ষা করা বা তার আত্মমর্যাদার সামান্য যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তার রক্ষার করার তাগিদেই মোগল অমাত্যরা এই পাগড়ি বিনিময়ের তথা কোহিনূর হারানোর একটা সম্মানজনক কাহিনী উদ্ভাবন করেছিলেন বলে আধুনিক ঐতিহাসিকদের অভিমত।
সম্ভবত বাদশাহ শাহ মোহাম্মদ পাগড়ি বিনিময় করে সৌজন্য ও বশ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তবে আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন মোগল বাদশাহের পাগড়িতে কোহিনূর লুকানো ছিল না। পরাক্রমশালী নিষ্ঠুর ও বিজয়ী নাদির শাহের হাতে কোহিনূর আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। কারণ তিনিই হীরাটি দেখেই নাকি এর নামকরণ করেছিলেন ‘কোহ-ই-নূর’— জ্যোতির পর্বত। মোগল বাদশার পাগড়িতে আশ্রয় নেয়ার ভাগ্য আর কোহিনূরের কপালে জোটেনি কোনোদিন।
দীর্ঘদিন পর কোহিনূর উনিশ শতকের প্রথম ভাগে রাজ্যহারা কাঠুরে বাদশাহের সঙ্গে আবার উপমহাদেশে ফিরে এসেছিল— লাহোরে রণজিৎ সিংহের রাজ্যে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে। আশ্রয় মিলেছিল, তবে সেই আশ্রয়কালীন আতিথ্য বা বন্দিত্বের সময় কীভাবে রণজিতের খপ্পরে পড়ে হীরাটি দীর্ঘ ৩৭ বছর লাহোর তোষাখানায় কাটিয়েছিল, সেই কাহিনী বিবৃত করাই আমাদের আজকের উপজীব্য—
নাদির শাহ নিজ গোত্রের সরদারদের হাতে নিহত হন। হীরাটি নাদির শাহের ছেলে শাহরুখের কাছ থেকে উপঢৌকন পান আহমদ শাহ দুররানি, যিনি নাদিরের মৃত্যুর পর খোরাসান রাজ্যের অধিকারী হয়েছিলেন। এর পর কোহিনূর দীর্ঘদিন কাবুলের আফগান দুররানি শাসকদের অধিকারে ছিল।
কিন্তু এক জায়গায় থিতু হওয়ার অভ্যাস নেই কোহিনূর হীরার। দুররানির পর তার পুত্রদের যথা— তৈমুর, শাহ জামান ও শাহ সুজাউল মুলকের অধিকারে আসে কোহিনূর। কাবুলের আফগান বাদশাহ শাহ সুজা অচিরেই কাবুল থেকে বিতাড়িত হন দোস্ত মোহাম্মদের কাছে পরাজিত হয়ে। রাজ্যহারা শাহ সুজাউল মুলক কাবুল থেকে পালানোর সময় কোহিনূর ও অন্যান্য ধনরত্নসহ শিখ অধিপতি রণজিৎ সিংয়ের রাজ্যের রাজধানী লাহোরে আশ্রয় গ্রহণ করেন ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে।
রণজিৎ সিং হতভাগ্য আশ্রিত শাহ সুজাকে বাহ্যিক সৌজন্য ও সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেননি। তার মূল লক্ষ্য ছিল জগদ্বিখ্যাত কোহিনূর হস্তগত করা— প্রথমে আড়ে-ইঙ্গিতে তার অভিলাষ সুজাকে জানান। শাহ সুজা না বোঝার ভান করে সময় কাটিয়ে দেন। সৌজন্যের সব মুখোশ খুলে ফেলে শেষে অতিথি অথবা বন্দি বাদশাকে মহারাজ জানিয়ে দিলেন আতিথেয়তা ও আশ্রয়ের মূল্য হিসাবে বাদশাহ যেন কোহিনূর তার হাতে সমর্পণ করেন। শাহ সুজা অবশ্যই হীরাটি রণজিৎ সিংহের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি সব রকমের চেষ্টা করেছিলেন রণজিতের উদগ্র লোভের থাবা থেকে হীরাটিকে বাঁচাতে, কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
কোহিনূর কীভাবে পাঞ্জাব অধিপতি রণজিৎ সিংয়ের খপ্পরে চলে যায়, সে সম্পর্কে রয়েছে দুটি ভাষ্য। একটি ভাষ্য দিয়েছেন লাহোর কোষাগারের অধ্যক্ষ মিসির মেকরাজ, যিনি কোহিনূর রণজিতের হস্তগত হওয়ার পর লাহোরের তোষাখানায় হীরাটির একক দায়িত্বে ছিলেন। মিসির দীর্ঘদিন লাহোরে হীরাটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে লিখেছিলেন যে, কোহিনূর তার এবং তার পরিবারের অনেক সম্মানিত সদস্যদের জন্য মারাত্মক দুর্যোগ ডেকে এনেছিলেন। মিসির হীরাটির অশুভ প্রভাব কাটিয়ে তার কর্মজীবন শেষ করতে পারবেন, এমনটি কখনো ভাবতে পারেননি।
এবার শাহ সুজার প্রতি রণজিতের আতিথেয়তা ও সমর্থনের বাস্তব চিত্রটি দেখা যাক মিসির মেকরাজের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘রণজিৎ সিংহ যখন হীরাটি শাহ সুজার থেকে হাতিয়ে নেন, তখন শাহ সুজা ও তার পরিবারের সব সদস্য রণজিৎ সিংয়ের অতিথি নন আসলে বন্দিদশায় ছিলেন রণজিতের দেওয়ান নাকপুত রাইয়ের গৃহে।’
রণজিৎ একাধিকবার শাহ সুজাকে হীরাটি হস্তান্তর করার দাবি জানিয়ে তার কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছিলেন শাহ সুজার কাছে।
মিসির মেকরাজ এই জবরদস্তিমূলক প্রতিনিধি দল পাঠানো প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, একদিন এমনি একজন প্রতিনিধি পাঠালে শাহ সুজা একটি বড় রত্ন বা শাহ সুজা কোহিনূর হীরা বলে তাদের হাতে তুলে দেন। মিসির জানাচ্ছেন যে, এটি ছিল আসলে একটা বড় মূল্যবান হলুদ পোখরাজ। রণজিৎ আগেই তার প্রাসাদে একদল অভিজ্ঞ জহুরিকে এনে বসিয়ে রেখেছিলেন, যাতে কোহিনূর এনে পরীক্ষা করে তারা মতামত দেবেন এর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে। জহুরিরা সহজেই ধরে ফেললেন যে রত্নটি কোহিনূর তো দূরের কথা এমনকি এটি হীরাও নয়। একটি বহুমূল্য বৃহৎ হলুদ পোখরাজ মাত্র। শাহ সুজা চালাকি করে মহারাজকে ধোঁকা দিয়েছেন।
রণজিৎ সিং মনে মনে চটলেও মেজাজ হারালেন না, পোখরাজটি ফেরতও পাঠালেন না, রেখে দিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হুকুম দিলেন শাহ সুজাকে তার কক্ষের বাইরে যাওয়ার অনুমতি প্রত্যাহার করা হোক। শুধু এই নয়, তার খাওয়া-দাওয়া এবং পানীয় সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি আসল কোহিনূর সমর্পণ করেন। রণজিতের এই ব্যবহার ছিল মানবতাবিরোধী এবং সব ন্যায়নীতির পরিপন্থী। যুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ দুর্গের আত্মসমপর্ণের জন্যই শুধু এ ধরনের পন্থা অবলম্বন করা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে। কিন্তু রাজ্যহারা আশ্রিত নৃপতির প্রতি এহেন অমানবিক ব্যবহার দুঃখজনক ও সব ন্যায়নীতির পরিপন্থী বললে অত্যুক্তি হবে না।
শাহ সুজার আহার-পানীয় সরবরাহ সুদীর্ঘ ৮ ঘণ্টা যাবৎ একনাগাড়ে বন্ধ ছিল। শেষে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর ‘বন্দি অতিথি’ শাহ সুজা রণজিতের উকিল আজিমুদ্দিনের হাতে কোহিনূর তুলে দিতে বাধ্য হন। লাহোর দুর্গে সেদিন মহারাজা বৈকালিক দরবারের জন্য সুসজ্জিত হয়ে তার বিখ্যাত চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে তার প্রতিনিধিদের ফেরার প্রতীক্ষায় ছিলেন। রণজিৎ আগেই জহুরিদের তার কাছে বসিয়ে রেখেছিলেন হীরাটি যাচাই করার উদ্দেশ্যে। ফকির আজিমুদ্দিন হীরাটি পাওয়া মাত্র কালবিলম্ব না করে দরবারে ছুটে এলেন। হীরাটি সুদৃশ্য একটি লাল ভেলভেটের আস্তর দেয়া ছোট কাঠের বাক্সে ভরে রণজিতের দরবারে নিয়ে আসা হয়েছিল। এটি যে আসল কোহিনূর, তা জহুরিরা যাচাই করে নিশ্চিন্ত হওয়ার পরই হীরাটি মহারাজের কাছে পেশ করা হলো। বলাবাহুল্য সেই মুহূর্তে রণজিত সিংয়ের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে ভাগ্যলক্ষ্মী সেদিন মুচকি হেসেছিলেন। কারণ কোহিনূরের লাহোর থেকে হিন্দুস্তান ছেড়ে লন্ডন যাওয়ার পথ ইংরেজের কূটকৌশলে সুগম হয়ে গেল। হীরাটি হস্তগত হওয়ার পর রণজিৎ এর যথার্থ মূল্য জানার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিলেন।
দ্বিতীয় ভাষ্যটি পাওয়া গেছে লাহোরের ইংরেজ ডেপুটি কমিশনার মেজর ম্যাকগ্রেগরের লেখা লাহোরে অবস্থিত সেক্রেটারি টু দি বোর্ড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ফর দ্য অ্যাফেয়ার্স অব দি পাঞ্জাব, বি. মেলভিনকে লেখা একটি প্রতিবেদন থেকে। ২০ এপ্রিল ১৮৫০, দলিল নং ৪৬।
এই ভাষ্য দুটির মূল বক্তব্য এক হলেও বিস্তারিত বর্ণনার বেশ কিছুটা ফারাক দেখা যায়। মেজর ম্যাকগ্রেগরের প্রতিবেদনে শাহ সুজার প্রতি কোনো মানসিক বা দৈহিক চাপের উল্লেখ নেই। শাহ সুজা যেখানে ছিলেন, সেখানের ঠিকানার গরমিল হয়েছে। হতে পারে তাকে হয়তো একাধিক ভবনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি যে সেপাই-শান্ত্রী ঘেরা সতর্ক প্রহারাধীন ছিলেন, সে বিষয়ে মেজর ম্যাকগ্রেগরেরও বক্তব্য সুস্পষ্ট। এমনটি হতে পারে ইংরেজ মেজর শাহ সুজার বন্দিদশা নিয়ে যেসব দেশীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তারা সবাই সংযত ভাষা ব্যবহার করে মানসিক চাপ বা দানাপানি সরবরাহ বন্ধ করার প্রসঙ্গটি স্বেচ্ছায়ই এড়িয়ে গেছেন। উল্লেখ্য, মেজরের প্রতিবেদনটি লেখা হয়েছিল শাহ সুজার কোহিনূর সমর্পণের ৩৭ বত্সর পর— (কোহিনূর সমর্পিত হয় জুন ১৮১৩ সালে) এবার দেখা যাক মেজর সাহেব তার প্রতিবেদনে আর কী কী জানাচ্ছেন—
শাহ সুজা লাহোর নগরীতে লাহেরু গেটের কাছে সরদার সি ভাল সিং লালার বাড়িতে অতিথি ছিলেন। অন্যান্য বেগমসহ তার প্রধান মহিষী ওয়াফা বেগম থাকতেন দিল্লি গেটে— মোবারক হাভেলিতে। শাহ সুজার গৃহের চারপাশে প্রহরী মোতায়েন করা ছিল, শাহ সুজার তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুমতি ছিল না। প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে শাহ সুজাকে কোহিনূর হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে মহারাজ প্রায়ই তার বিশিষ্ট অমাত্য ভাই গুরুমুখ সিং এবং সরদার হুকুম সিং আতরওয়ালাকে পাঠিয়ে তাগাদা দিতে থাকেন। শাহ সুজার বুঝতে বাকি রইল না যে রণজিৎ সিংয়ের হীরাটির প্রতি উদগ্র লালসা কোহিনূর আদায় করার জন্য তার সঙ্গে যেকোনো নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরণ করতে এই শিখ ইতস্তত করবেন না। মিসির মেকরাজের বর্ণনায় যে ক্রুর এবং অমানবিক ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে, মেজর ম্যাকগ্রেগর সেই প্রসঙ্গটিই ইঙ্গিতে এবং ইংরেজের স্বভাবসুলভ আন্ডারস্টেটমেন্ট দিয়ে পরোক্ষভাবে তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। শাহ সুজার যখন নিশ্চিন্ত বিশ্বাস হলো যে, রণজিৎ সিং দাবি আদায়ে বদ্ধপরিকর, তখন তার কোহিনূর সমর্পণে রাজি হওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। তবে শর্ত রইল মহারাজাকে স্বয়ং শাহ সুজার হাত থেকে হীরাটি নিয়ে যেতে হবে। রণজিৎ সিং দ্রুত এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন।
১৮১৩ সালের জুনের প্রথম ভাগের কোনো একদিন মহারাজা তার লাহোর দুর্গের প্রাসাদ থেকে বেড়িয়ে শাহ সুজার গৃহের অভিমুখে রওনা দিলেন। সঙ্গে নিলেন হুকুম সিং আতরওয়ালা, জমিদার রোশন সিং, ভাই গুরুমুখ সিং, ফকির আজিমুদ্দিন, ভাই মাহু সিং এবং ২০০ অনুচর।
শাহ সুজা মহারাজকে তার গৃহের দোতলার একটি কক্ষে অভ্যর্থনা জানালেন। উভয়ই আসন পরিগ্রহ করে খানিকটা সময় অতিবাহিত করার পর শাহ তার বসার কুশনের নিচ থেকে কোহিনূর বের করে মহারাজের হাতে তুলে দিলেন। রণজিৎ সিং গভীর মনোযোগ দিয়ে হীরাটি দেখলেন। তার পর কোনো মন্তব্য না করে সরদার হুকুম সিংয়ের কাছে হীরাটি গচ্ছিত রেখে সঙ্গে সঙ্গে সেই গৃহ পরিত্যাগ করলেন।
রণজিৎ সিং চলে যাওয়ার পরপরই গৃহ থেকে সব প্রহরী প্রত্যাহার করা হলো এবং শাহর জন্য তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার বাধানিষেধ রদ করা হলো।
কাবুল নৃপতি শাহ সুজা এত দিন রাজ্যহারা ছিলেন, এবার হলেন ‘মণিহারা ফনী’। মণিহীন সাপকে কেইবা ভয় পায়। অতএব তাকে ঘিরে জারিকৃত সব অবমাননাকর বিধিনিষেধের অবসান হলো।
মেজর ম্যাকগ্রেগরের প্রতিবেদনে আরো কিছু তথ্য রয়েছে। মহারাজ প্রাসাদে ফিরেই দরবার ডাকলেন; দরবারে সমাগত সব সর্দার এবং অন্যদের উপস্থিতিতে কোহিনূরটি প্রদর্শন করা হলো, মহারাজের জয়ধ্বনিতে দরবার গম গম করে কেঁপে উঠল। ক্রমাগত অভিনন্দনের জোয়ারে সিক্ত হলেন মহারাজ, এ মহান মর্যাদাপূর্ণ কোহিনূর প্রাপ্তি উপলক্ষে। দরবারের সভার ভাবখানা রণজিৎ সিং যেন যুদ্ধ জয়ী হয়ে কোহিনূর নিয়ে প্রাসাদে ফিরেছেন। অথচ তিনি কোনো যুদ্ধই করেননি কোনো বিজিত নৃপতির কাছ থেকে বশ্যতার প্রতীক হিসেবেও কোহিনূর তার হাতে আসেনি। এক রাজ্যহারা আশ্রিত অসহায় সাবেক বাদশাহের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তিনি কোহিনূর ছিনিয়ে এনেছেন। ভাগ্যের কি পরিহাস, যে কোহিনূরের জন্য কত যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে, সেই কোহিনূর বিনাযুদ্ধে, বিনারক্তপাতে এক অসহায় সাবেক বাদশাহের কাছ থেকে হাতিয়ে আনার কৃতিত্বে সারা দরবার সেদিন উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। দুদিন পর মহারাজা যখন জহুরিদের মতামতের প্রেক্ষাপটে নিশ্চিন্ত হলেন যে এবার তিনি সত্যিকার কেহিনূরের অধিকারী, তখন শাহ সুজাকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দেয়ার হুকুম দিলেন। দেওয়ান মোকাম চাঁদ এই অর্থ শাহ সুজাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মহারাজ এবার অমৃতসরে রওনা দিলেন। মেজর ম্যাকগ্রেগর তার প্রতিবেদনে জানাচ্ছেন, মহারাজের সহযাত্রী রাজা তেজ সিংয়ের কাছ থেকে মেজর সাহেব এই সফরের নিম্নোক্ত তথ্য পেয়েছেন, যা রীতিমতো কৌতূহলোদ্দীপক—
রণজিৎ অমৃতসরে হাজির হয়েই সেখানকার নামিদামি জহুরিদের ডেকে পাঠালেন কোহিনূর হীরার সম্ভাব্য মূল্য কী হতে পারে, সে সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন জানানোর জন্য। হীরাটি পুঙ্খানুপঙ্খ রূপে যাচাই করে জহুরিরা জানালেন যে, এত বড় এবং এমন সুন্দর হীরার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সমস্ত হিসাব-নিকাশের আওতার বাইরে। মহারাজ তাদের হুকুম দিলেন হীরাটিকে যত্নের সঙ্গে সুচারু ও সুদৃশ্যভাবে সন্নিবেশিত করে দিতে, যাতে এটি তিনি অঙ্গে ধারণ করতে পারেন। জহুরিরা তার সম্মুখে এবং সর্বক্ষণ তার দৃষ্টির আওতায় বসে হীরাটি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ এই দুর্মূল্য রত্নটিকে তার চোখের আড়ালে, তার আয়ত্তের বাইরে জহুরিদের কাছে থাকুক, তা তিনি কিছুতেই চাননি।
হীরাটি জহুরিরা তার পাগড়ির সম্মুখভাবে লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার পর তিনি হাতির পিঠে চেপে পাত্র-মিত্রসহ অমৃতসরের প্রধান রাস্তাগুলোই কয়েকবার যাওয়া-আসা করেলন। সঙ্গে সৈন্য সামন্ত, কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে চলল। এই শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল তার প্রজারা যেন দেখতে পায় মোগলদের প্রতাপ ও রণবীর্যের প্রতীক বা জগদ্বিখ্যাত কোহিনূর এখন তাদের মহারাজের অধিকারে।
অমৃতসরে দুর্গের রাজপ্রাসাদে ফিরে এসে তিনি পানভোজনে মত্ত হয়ে পড়লেন, এমন আনন্দের মুহূর্তকে অফুরন্ত পানীয় দিয়ে উত্সব মুখরিত না করলে পুরো আনন্দটাই মাটি। মদিরার ফোয়ারা ছুটল। এবং একটু পরেই তিনি বুঝতে পারলেন তার ওপর মদের ক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। সেই সময় তিনি কোহিনূরের নিরাপত্তা নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন, কারণ অতীতে একবার তিনি পান উন্মত্ত হয়ে পড়লে তার একটি বহুমূল্য রত্ন খোয়া যায়। তার হুঁশ তখনো পুরোপুরি হারায়নি, মদ খাওয়ায় বিরতি দিয়ে তিনি তেজ সিংকে তলব করলেন এবং হীরাটি তার কোমরে বেঁধে অবিলম্বে গোবিন্দঘর দুর্গে গিয়ে মিসির ওয়াস্তীরামকে কোহিনূর বুঝিয়ে দিতে হুকুম দিলেন— ওয়াস্তীরাম রণজিত সিংয়ের বিশ্বস্ত কোষাধ্যক্ষ। তেজ সিং কালবিলম্ব না করে রণজিতের নিজস্ব হাতিতে চেপে পদাতিক এবং গোলন্দাজ বাহিনীসহ এই গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায় বের হয়ে পড়লেন। এবং কিছুক্ষণ পরই ওয়াস্তীরামের কাছ থেকে কোহিনূর প্রাপ্তির রসিদ সংগ্রহ করে মহারাজ্যের সমীপে পেশ করলেন। এবার মহারাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মদ্যপানে সাময়িক বিরতি থেকে মুক্ত হয়ে আবার পানে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সোত্সাহে।
দীপমালা, দশেরা এবং অন্যান্য প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উত্সবের সময় রণজিত কোহিনূর ধারণ করে তা সবাইকে প্রদর্শন করে অপরিসীম আনন্দ পেতেন। লাহোর সফররত সব মান্যবর অতিথিকে কোহিনূর অবশ্যই দেখানো হতো বিশেষ করে, তার দরবারে আগত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বেলায় এই প্রদর্শন তার দরবারিদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। রণজিৎ সিং যখন মুলতান, পেশোয়ার এবং অন্যান্য অঞ্চলে সফরে যেতেন, তখন কোহিনূরও তার সঙ্গে সঙ্গে যেত। বিলীরামের হেফাজতে হীরাটি একদল সশস্ত্র সৈন্যের প্রহরায় যেখানে মহারাজ যেতেন, সেখানে নেয়া হতো। রণজিতের ভ্রমণের সময় কোহিনূর একটি বড় ট্রাংকে ভরে উটের পিঠে চাপিয়ে নেয়া হতো। কাফেলার সবচেয়ে বলশালী এবং অগ্রবর্তী দ্রুতগামী উটের পিঠেই ট্রাংকটি বহন করা হতো, তবে এই তথ্য শুধুমাত্র তোষাখানার প্রধান কর্মকর্তারাই অবহিত ছিলেন। কাফেলাটি একশর মতো বাছাই করা উট দিয়ে সজানো, সশস্ত্র সৈন্যরা পাহারা দিয়ে উটের সঙ্গে সঙ্গে পথ চলত। পথে তাঁবু খাটানো হলে ট্রাংকটি আরো দুটি একই রকম দেখতে ট্রাংকের মাঝখানে রক্ষিত হতো। নিরাপত্তার কারণে বিলীরামের বিছানার খুব কাছে— তার খুটির পাশে ট্রাংকটির স্থান হতো। শুধু বিশ্বস্ত আত্মীয় বর্গ এবং প্রভুভক্ত ভৃত্যদেরই এই তাঁবুতে প্রবেশাধিকার ছিল।
প্রায় চার বছর রণজিত সিং হীরাটি তাগা হিসেবে হাতের বাজুতে পরিধান করেছেন। পরে মহারাজের পাগড়িতে শিরপ্যাচ হিসেবে আরো দুটি বড় হীরার সঙ্গে পাগড়িতে লাগানো হয়। শিরপ্যাচ হিসেবে বছরখানেক ব্যবহূত হয়েছিল পাগড়িতে। সব মিলিয়ে চার-পাঁচবার উত্সব উপলক্ষে এই কোহিনূর লাগানো পাগড়ি ধারণ করেছিলেন মহারাজ। পরে আবার কোহিনূর হীরার দুই পাশে আরো দুটি হীরা বসিয়ে একটি তাগা বানিয়ে ব্যবহার করা শুরু হয়। তাগা হিসেবে প্রায় দুই বছর এর ব্যবহার হয়েছিল। মেজর ম্যাকগ্রেগর তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে ফকির নুরুদ্দীন মেজরকে জানিয়েছেন, কোহিনূরের যথার্থ মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়ে রণজিৎ নুরুদ্দীনকে শাহ সুজার প্রধান বেগম ওয়াফা বেগমের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সম্ভব হলে তিনি যেন কোহিনূরের সঠিক মূল্য জেনে নেন। প্রশ্ন করলে বেগমের উত্তর ছিল বেশ মজার। তিনি জানালেন, যদি একজন বলবান পুরুষ চারটি পাথর উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম, এই চারদিকে নিক্ষেপ করে এবং পাথরের মধ্যবর্তী স্থানটি যদি স্বর্ণমুদ্রা এবং হীরা-জহরত দিয়ে আবৃত করে দেয়া হয়, তাহলে এর রত্নগুলো এবং স্বর্ণমুদ্রার মূল্য কোহিনূরের মূল্যের সমান হবে না।
রণজিৎ হাল ছাড়লেন না। তিনি প্রতিনিধি পাঠালেন বেগমের স্বামী শাহ সুজার কাছে কোহিনূরের মূল্য সম্পর্কে তার মতামত জানতে। শাহ সুজা নাকি এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, কোহিনূরের মূল্য হচ্ছে সৌভাগ্য। যিনি এই বহুমূল্য হীরার অধিকারী হয়েছেন, তিনি তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর বিজয়ী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। মহারাজ রণজিৎ সিং দূরদর্শী ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতেই হিন্দুস্তানের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, পুরো মানচিত্র লাল হয়ে যাবে (সব লাল হো যায়েগা) অর্থাৎ লাল কোর্তাধারী ব্রিটিশরা সারা দেশ দখল করে নেবে। রণজিৎ সিংয়ের এই ভবিষ্যদ্বাণী যে অচিরেই ফলে যাবে, তা হয়তো রণজিৎ সিং নিজেও ভাবতে পারেননি, যদিও এমন আশঙ্কা তার সব সময়ই ছিল। যদি এমনটি ঘটে, তবে কোহিনূরও ইংরেজদের দখলে চলে যাবে শুধু পাঞ্জাবের সিংহাসনই নয়। তিনি যে জোর করে কোহিনূর কেড়ে নিয়েছিলেন, তার অশ্রিত অতিথির কাছ থেকে, এ নিয়ে কখনো তার অনুশোচনা হয়েছিল কিনা, বলাবাহুল্য তা আমাদের অজানাই রয়ে গেছে।
রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর আগে বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে যায়। মৃত্যু আসন্ন দেখে শয্যার চারপাশে শিখপ্রধানরা সমবেত হলেন, এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কাউর খুরবক সিং ও তার পুত্র ধ্যান সিং, প্রধানমন্ত্রী খোশহান সিং, সেনাবাহিনীর প্রধান, রাই গোবিন্দরাম এবং প্রধান পণ্ডিত মুক সমদ্দীন ও গোবিন্দরাম তাকে সম্বোধন করে বলেছেন, মহারাজা, আপনি আমাদের প্রায়ই নির্দেশ দিতেন যে, কোহিনূর রত্ন জগন্নাথের মন্দিরে শ্রদ্ধার নির্দশন হিসেবে উত্সর্গ করতে। আমরা জানতে আগ্রহী আপনার অভিলাষ কী?
এখন কোহিনূর কি দান করে দেয়া হবে? মহারাজ কথা বলতে না পারলেও মাথা নেড়ে এবং হাতের ইঙ্গিতে তার সম্মতি জানিয়ে দিলেন।
ফলে সমবেত শিখ নেতারা কোষাধ্যক্ষ এবং কোহিনূরের তত্ত্বাবধায়ক মিসিরকে ডেকে পাঠালেন। তাকে হুকুম করা হলো তত্ক্ষণাৎ কোহিনূর নিয়ে চলে আসতে, যাতে হীরাটি জগন্নাথের মন্দিরে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব হয়। মিসির ইতস্তত করে জানালেন যে, হীরাটি মন্দিরে পাঠিয়ে দেওয়া তার ক্ষমতার বাইরে, কারণ এটি রাষ্ট্রের সম্পত্তি হওয়ার দরুন কাউর নওনেহাল সিং (রণজিৎ সিংহের পৌত্র— যিনি তখন পেশায়ারে অবস্থা করছিলেন) কোহিনূরকে দান করা হলে আমাকে দায়ী করবেন। শিখ নেতারা মিসিরকে ধমকধামক দিলেন, ভয় দেখালেন, কিন্তু মিসির অটল। তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো। এর কিছুক্ষণ পরই রণজিৎ সিং শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এবং কোহিনূর রাষ্ট্রের সম্পত্তি হিসেবে লাহোর দুর্গের তোষাখানায় আবার রক্ষিত হয়ে থাকল।
রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর মিসিরকে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক মাস পর অবশ্য মুক্ত হয়ে মহারাজ শের সিংয়ের সময় আবার তোষাখানার দায়িত্ব ফিরে পান। শের সিংয়ের মৃত্যুর পর হীরা সিংয়ের হুকুমে মিসির ও তার আত্মীয়স্বজন সবাই বন্দি হন। তবে হীরা সিংয়ের মৃত্যুর পর মিসির ও তার আত্মীয়রা আবার মুক্তি পান। এবং মিসির আবার কোহিনূর হেফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। মিসির কোনো বিরতি ছাড়াই ১৮৪৯ সালের ৩ মে পর্যন্ত তোষাখানায় কোহিনূর রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। ১৮৪৯ সালের ৩ মে ব্রিটিশ সরকার পাঞ্জাব দখল করে নিলে মিসির ড. জেএস লোগানের হাতে কোহিনূরসহ সব ধনরত্ন তুলে দিয়ে চিরতরে দায়িত্বমুক্ত হন।
লর্ড ডালহৌসি অত্যন্ত সঙ্গোপনে জাহাজে করে কোহিনূর লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের কাছে পাঠিয়ে দেন রানীকে উপহার হিসেবে। লন্ডনে পৌঁছার পর ভারতীয় জুয়েলারদের কোহিনূরের কাটা মানসম্মত মনে না হওয়ায় হীরাটি আমস্টারডামের বিখ্যাত হীরার কারিগরদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রায় আট মাস ধরে তারা হীরাটিকে ঘষেমেজে অপূর্ব করে তোলেন। এর কৌণিক দ্যুতি আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে— তবে কারিগরি করতে গিয়ে হীরাটির অনেক অংশ কেটে ফেলতে হয়েছিল ফলে এটি আকারে ছোট হয়ে যায়। কিন্তু সন্দেহ নেই আমস্টারডামের হীরা ব্যবসায়ীরা এর শ্রী বৃদ্ধিতে সফল হয়েছিলেন। আমাদের মোগল কোহিনূর তখন বিজ্ঞাপনের ভাষায় ‘New Improved Kohinoor.’
কোহিনূরের পথ পরিক্রমা দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। গোলকুণ্ডা থেকে শুরু করে আগ্রা-দিল্লি হয়ে নাদির শাহের পারস্যে কিছুকাল অবস্থান করার পর কাবুলে বেশ খানিকটা সময় কেটেছিল কোহিনূরের। তার পর কাবুল থেকে রাজ্যহারা হয়ে কোহিনূর আবার দীর্ঘ পার্বত্য পথ পাড়ি দিয়ে পাঞ্জাবের লাহোরে আশ্রয় নেয়। আর লাহোরেই রণজিৎ সিংয়ের খপ্পরে পড়ে লাহোরের তোষাখানায় বন্দি হয়ে থাকে দীর্ঘ ৩৭ বছর। এর পর লাহোর-পাঞ্জাব ইংরেজ দখল করে নিলে লাহোর তোষাখানা ছেড়ে কালাপানি পাড়ি দিয়ে কোহিনূর ১৮৫০-এ লন্ডন টাওয়ারে হাজির হয়। এবং এখনো সেখানেই রয়েছে। পথচলায় যেন হীরাটির ক্লান্তি নেই। আবারো কি কোহিনূর পথে বেরিয়ে পড়বে? এ প্রশ্নের জবাব কারো জানা নেই, শুধু ভবিষ্যৎই এর উত্তর দিতে সক্ষম।
লেখক: গবেষক, সাবেক রাষ্ট্রদূত






