১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রাজিলে হীরার খনি আবিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত দুনিয়ার সব হীরাই আসত ভারত থেকে। শুধু বোর্নিওর পার্বত্য অঞ্চলে কিছু কালো ডায়মন্ড ক্রিস্টাল পাওয়া যেত। এছাড়া সব হীরা ভারতের। প্রাচীনকালে দেশটির নদীর তীরে বালি বা পাথরকণার মধ্যে হীরার প্রাকৃতিক আকরিক পাওয়া যেত। এগুলো আসত মূল আকরিক কিম্বারলাইট ও ল্যাম্পরোয়ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে প্রাচীন মিসরে পলিশ ও কাটার হাতিয়ার হিসেবে ভারতীয় হীরা ব্যবহূত হতো। অন্যদিকে ভারতে হীরা শুধু ব্যবহার আর সৌন্দর্যের হাতিয়ার হিসেবে নয় সৌভাগ্যের অনুষঙ্গ হিসেবেও দেখা হতো। দুনিয়ায় রত্ন-বিষয়ক প্রথম নীতিমালা লেখা হয়েছিল প্রাচীন ভারতে। এসব নীতিমালায় রত্নের রঙ, বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে নানা ধরনের বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ আছে।
হীরার আলোচনায় যে নামটি দুনিয়াজুড়ে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তা নিঃসন্দেহে কোহিনূর। কোহিনূর ভারতবর্ষের সম্পদ, যদিও শতবর্ষের বেশি হতে চলল তা ব্রিটেনের রাজপরিবারের দখলে আছে। শুরুতে ইতিহাসের পাতা খুঁজে কোহিনূরের জন্মের ইতিহাসে একটু চোখ বোলানো যাক। অবশ্য এ পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ঠিক কবে এবং কোথায় কোহিনূরকে পাওয়া গিয়েছিল। তবে লিখিত বিবরণী থেকে এটা ধারণা করা হয় দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত বিজয়নগর সাম্রাজ্যেই প্রথম কোহিনূরের দেখা মেলে। পর্তুগিজ চিকিত্সক ও প্রাকৃতিক দার্শনিক গার্সিয়া দা ওরতো (১৫০১-৬৮) তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ভারতবর্ষের বৃহত্তম হীরা বিজয়নগরে সংরক্ষিত আছে। ওরতোর কথা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য, কারণ তিনি সেকালের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি ভারতবর্ষে ছাপা হওয়া তৃতীয় গ্রন্থটির লেখক। তার এই বই অর্থাৎ, ‘কোলোকুইজ অন দ্য সিম্পলস অ্যান্ড ড্রাগস অব ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয়েছিল গোয়ায়, ১৫৬১ সালে। ওরতো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অধ্যয়নে রত ছিলেন। এর পর যে লিখিত বিবরণী থেকে কোহিনূরের ধারণা পাওয়া যায় সেটা বিখ্যাত ‘বাবুরনামা’ ও সমসাময়িক কিছু রচনায়। বাবুর লিখেছিলেন যে, তার পুত্র হুমায়ুন গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের পরিবারকে গ্রেফতার করেছিলেন। তখন তারা হুমায়ুনকে কিছু রত্ন দিয়েছিল। বাবুর বলেছেন, প্রশংসাকারীরা বলেন এই রত্নের মধ্যে থাকা একটি হীরার মূল্য দিয়ে পুরো দুনিয়ার মানুষকে আড়াই দিন খাওয়ানো যাবে। বাবুরের বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয় তিনি কোহিনূর হীরার কথাই বলেছিলেন।
রাজ্য হারানোর পর হুমায়ুনের সঙ্গে একটি পুঁটলিতে কিছু রত্নপাথর ছিল, যার মধ্যে কোহিনূরও থাকার কথা। সে সময় এই পুঁটলি ছাড়া তার সম্পদ বলতে আর কিছুই ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তেও আমরা হুমায়ুনের বিস্ময়কর আত্মভোলা চরিত্রের নিদর্শন দেখতে পাই। ১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্য জুলাইয়ে পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট শাহর কাছে আশ্রয়ের নিতে যাওয়ার পথে এক নদীতে গোসল করার সময় বেখেয়ালে সেই রত্নের পুঁটলি নদীতীরে রেখে আসেন। জওহর নামের হুমায়ুনের দলের এক বালক ওই পুঁটলি দেখতে পেয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীকালে মোগল সম্রাট শাহজাহান তার বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনে কোহিনূর হীরাটি সংযোজন করেন। পরবর্তীতে পারস্যের নাদির শাহ মোগলদের কাছ থেকে এই কোহিনূর লুট করেন। ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহ নিহত হওয়ার পর কোহিনূর যায় তার এক জেনারেল আহমদ শাহ দুররানির হাতে। আহমদ শাহ পরে আফগানিস্তানের আমির হন। এর পর কোহিনূরের মালিক হন আহমদের এক বংশধর শাহ সুজা দুররানি। রুশ আধিপত্য রুখতে সুজা ইংরেজদের সঙ্গে ঐক্য গড়েন। কিন্তু সুজা আবার তার উত্তরসূরি মাহমুদ শাহ দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হন। তবে শাহ সুজা কোহিনূরকে সঙ্গে নিয়ে পালাতে পেরেছিলেন। তবে নিজের কিছু কর্মচারী তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে আটক করেন। শাহ সুজাকে কাশ্মীরের গভর্নর আতা মাহমুদ খানের অধীন সেখানে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। কোহিনূর অবশ্য তখন ছিল সুজার স্ত্রী ওয়াফা বেগমের কাছে। ওয়াফা তখন শিখদের আশ্রয়ে লাহোরে অবস্থান করছেন। আতা খান সুজার কাছে কোহিনূর চেয়েছিলেন। অন্যদিকে রাজা রণজিৎ সিংও কোহিনূরকে নিজের দখলে নিতে চাইছিলেন। ওয়াফা বেগম সুযোগ কাজে লাগান। ওয়াফা রণজিৎ সিংয়ের সঙ্গে সমঝোতায় আসেন, যদি তার স্বামীকে রণজিৎ সিং মুক্ত করে আনেন, তাহলে তিনি রণজিেক কোহিনূর দিয়ে দেবেন। ১৮১৩ সালের বসন্তে রণজিৎ সিংয়ের সেনাবাহিনী সুজাকে কাশ্মীর থেকে মুক্ত করে আনে। তাকে লাহোরে এনে গৃহবন্দি করা হয়। সুজার স্ত্রীর কাছে চুক্তি মোতাবেক কোহিনূর সমর্পণের দাবি জানানো হয়। সুজা অবশ্য তার রাজ্য উদ্ধার, কিছু অর্থসহ নতুন শর্ত জুড়ে দেন। নানা ঘটনার পর সুজা রণজিৎ সিংকে কোহিনূর উপহার দেন। মৃত্যুর আগে রাজা রণজিৎ সিং কোহিনূরকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ইংরেজরা সেই ইচ্ছা পূরণ করেনি। বরং পাঞ্জাব দখল করে রণজিৎ সিংয়ের ১১ বছর বয়সী পুত্র দুলীপ সিংয়ের কাছ থেকে কোহিনূর হস্তগত করে।
কোহিনূর ব্রিটেনের রানীর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব ছিল লর্ড ডালহৌসির। ১৮৫০ সালের ১২ জানুয়ারি ডালহৌসি কোহিনূরকে ব্রিটেনে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করেন। কয়েক মাস বাদে ৬ এপ্রিল কোহিনূরকে ব্রিটেনের রানীর জাহাজ মিডিয়ায় তোলা হয়। জাহাজটি ছিল ক্যাপ্টেন উইলিয়াম লকইয়ারের অধীন। ডালহৌসি তার ভাইপো ক্যাপ্টেন রামসিকেও মিডিয়ায় তুলে দেন কোহিনূরকে নিরাপদে পৌঁছে দিতে। যাত্রা শুরুর ১০ দিন পরেই জাহাজে কলেরার মহামারী দেখা দেয়। ১৩৫ জন ক্রু মারা যান। যাত্রার শেষদিকে জাহাজ পড়ে ভয়ানক ঝড়ের কবলে। অবশেষে ১৮৫০ সালের ৩০ জুন মিডিয়া প্লাইমাউথ বন্দরে নোঙর করে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র তখন কোহিনূরকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত ইতিহাস, অভিশাপ নিয়ে রসাল গল্প ছাপাতে শুরু করে। পরের বছর কোহিনূরসহ ভারত থেকে আনা অন্য রত্নসম্ভারের একটি প্রদর্শনী হয় লন্ডনে। কিন্তু কোহিনূরের কাটা খুব সুন্দর ছিল না। কিছু খুঁতও ছিল। দর্শকরা কোহিনূর দেখতে এসে হতাশ হলেন। প্রিন্স অ্যালবার্ট হীরার চমক বৃদ্ধির জন্য গ্যাস ল্যাম্প বসানোর নির্দেশ দিলেন। আয়নাও বসানো হলো কিন্তু তেমন লাভ হলো না। কোহিনূরের সৌন্দর্য বাড়াতে একে কাটা হলো। ডিম্বাকৃতি কোহিনূরের এক পাশ সমতল করা হলো। আকার বহুগুণ ছোট হয়ে গেল। ব্রিটেনে এসে সেই ক্ষুদ্রাকার কোহিনূর দেখে দুলীপ হাহাকার করে উঠেন। তিনি প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেন। সেই বালক বয়স থেকেই ইংরেজদের নানা ছলচাতুরির শিকার এই দুর্ভাগা ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।
দুলীপ সিংয়ের মৃত্যুর পর কোহিনূরের অভিশাপের গল্প আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯০১ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেলে ভারতের নতুন সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড কোহিনূর তার মাথায় পরেননি, পরেছিলেন তার স্ত্রী রানী আলেক্সান্দ্রা। যেকোনোভাবেই হোক একটি কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে নারীই শুধু কোহিনূর পরতে পারেন, কিন্তু কোনো পুরুষ এটি পরলে হীরাটি তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই কুসংস্কারের উত্স যা-ই হোক না কেন দুলীপ সিংয়ের পরিণতি দেখার পর কেউ আর এ কুসংস্কারকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস করেনি। ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি রানী আলেক্সান্দ্রার অভিষেকের দিন তার মুকুটে ছিল কোহিনূর। পরবর্তী কয়েক দশকে কোহিনূর আরো দুজন ব্রিটিশ রানীর অভিষেকের সাক্ষী হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির সরকার ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোহিনূর ফেরত চায়। একই সঙ্গে উড়িষ্যার কংগ্রেস সরকার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রতি মৃত্যুশয্যায় রাজা রণজিৎ সিংয়ের শপথের কথা উল্লেখ করে কোহিনূরকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তোলে। ব্রিটিশরা কৌশলী সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়, তাদের জবাব ছিল এ রকম যে, সে সময় হীরার প্রকৃত মালিক ছিল লাহোরের মহারাজা, সেটি তিনি রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দিয়েছিলেন। তাই ভারতের দাবির প্রতি তারা কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারবে না। এর পর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেকের পর ভারতের পক্ষ থেকে কোহিনূর ফিরিয়ে দেয়ার দাবি আবার তোলা হয়। ভারতের আশা ছিল নতুন রানী হয়তো এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন।
১৯৭৬ সালের গ্রীষ্ম ছিল ইংল্যান্ডের তখনো পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়। চারদিকে ভয়ানক পরিবেশ, হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল, মানুষের মৃত্যু বেড়ে গিয়েছিল ২০ শতাংশ। লেডিবার্ডের প্লেগ দেখা দিয়েছিল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিগ বেন ঘড়ি ভেঙে পড়ে। বিগ বেনের ঘণ্টা তিন সপ্তাহ বন্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে লন্ডনবাসীর মনে হচ্ছিল শহরের ওপর অশুভ কিছুর ছায়া পড়েছে। এ বছরের আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের আগে লন্ডনের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ডিগ্রিতে চড়ে বসল। এমন সময় পাকিস্তানের নবম প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কোহিনূর ফেরত চেয়ে লিখলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জেমস কালাহানকে। চিঠিতে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী কোহিনূরকে পাকিস্তানের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে দাবি করেন। ভুট্টো চিঠিতে আরো লিখেছিলেন, পাকিস্তানকে কোহিনূর ফেরত দিয়ে ব্রিটেন তাদের বিউপনিবেশীকরণ প্রক্রিয়াকে চালু করতে পারে এবং একই সঙ্গে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডের দায় থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভুট্টোর এই দাবি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এই চিঠি ব্রিটিশ সরকারের ঘাম ঝরাতে লাগল। জবাব দিতে কালাহান এক মাস সময় নিলেন। কিন্তু দিলেন সেই পুরনো জবাবই, দৃঢ়ভাবে কোহিনূর ফিরিয়ে দেয়ার দাবিকেই প্রত্যাখ্যান করলেন। কালাহান লিখলেন—
‘কোহিনূর হীরার বিভ্রান্তিকর অতীতের বিপরীতে এর ওপর ব্রিটিশ মালিকানা একেবারে পরিষ্কার। অন্যদিকে এর মালিকানা নিয়ে অনেকের দাবি আছে, এমন পরিস্থিতিতে আমি মহামান্য রানীকে কোনোভাবেই কোহিনূরকে অন্য কোনো দেশের কাছে সমর্পণের পরামর্শ দিতে পারি না।’
সেই চিঠি লেখার পরের বছর সামরিক অভ্যুত্থানে উত্খাত এবং পরবর্তীতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে না হলে ভুট্টো হয়তো কোহিনূর ইস্যুকে আরো সামনে নেয়ার চেষ্টা করতেন।
১৯৯০ সালে লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনার কুলদীপ নায়ার কোহিনূর ভারতে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করেন। নায়ার কোহিনূরকে ব্রিটিশ অধিকারে নেয়ার ঘটনাকে রাষ্ট্র পরিচালিত চুরি বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে তিনি আরো একটি বিষয়কে তুলে ধরেন যে কোহিনূরের ওপর ন্যায়সঙ্গত অধিকার শুধু ভারতেরই। পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নায়ার লিখেছিলেন:
‘যুক্তরাজ্যে আমার সংক্ষিপ্ত দায়িত্ব পালনকালে দেখেছি যখনই আমি তাদের সঙ্গে কোহিনূর বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছি, তখনই তারা বিব্রত-লজ্জিত বোধ করেছেন। পরিবারসহ আমি টাওয়ার অব লন্ডনে কোহিনূরসহ অন্য হীরার সংগ্রহ দেখতে গিয়েছিলাম। তখন যে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা আমাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন, তিনি বেশ অপরাধীর মতো মুখ করে রেখেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ‘‘হীরাগুলো আপনাকে দেখাতে লজ্জা লাগছে কারণ এগুলো আপনাদের দেশ থেকেই এসেছে।’’ হীরাগুলো দেখার পর আমাদের বয়স্ক চাকর মুরলি যে মন্তব্যটি করেছিলেন, সেটা আমার এখনো স্মরণ আছে, ‘‘আমরা যখন ভারতে ফিরব, তখন অবশ্যই কোহিনূর সঙ্গে নিয়ে যাব।’’ মুরলির এই কথা ভারতবাসীরই জনপ্রিয় দাবি।’
নায়ারের অনুরোধেও ব্রিটিশরা কোনো সাড়া দেয়নি। এর পর ২০০০ সালে নায়ার যখন ভারতের রাজ্যসভার সদস্য হন, তখন তিনি কোহিনূরের প্রসঙ্গটি আবার উত্থাপন করেন। কোহিনূর ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ৫০ জন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষরসহ একটি পিটিশন দাখিল করেন। এই পিটিশনের মাধ্যমে তিনি কোহিনূর ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে ভারত সরকারকে অনুরোধ করেন। সে সময়কার ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিং নায়ারকে জানান ব্রিটেনের কাছে দাবি জানানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, যশবন্ত কোহিনূরের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেননি।
প্রাচীন এই হীরকখণ্ড আধুনিককালে এক কূটনৈতিক যুদ্ধের উপলক্ষ হয়ে উঠল। ভুট্টো ও নায়ারের পরে ভারত বা পাকিস্তান কেউই কোহিনূর নিয়ে গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায়নি। কোহিনূরকে ভারত বা পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনার আর যত দাবি উঠেছে, তার সবগুলোই এসেছে সরকারের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। সাধারণ মানুষের এসব কাজ মাঝে মধ্যে দিল্লি ও ইসলামাবাদকে বিব্রত করেছে।
তবে ‘চুরি যাওয়া হীরা’ ফিরে পাওয়ার দাবি শুধু ভারত বা পাকিস্তানের নয়, ২০০০ সালের নভেম্বরে তালেবানরা তাদের কাছে কোহিনূর ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তোলে। তালেবানদের বিদেশনীতি-বিষয়ক মুখপাত্র ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ কোহিনূরকে আফগানিস্তানের ‘প্রাপ্য সম্পদ’ বলে দাবি করেন। তালেবান মুখপাত্র ঔপনিবেশিক আমলে আফগানিস্তান থেকে নিয়ে যাওয়া আরো বিভিন্ন জিনিস ব্রিটেনকে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। তারা এসব সম্পদ যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান পুনর্গঠনে কাজে লাগাবেন বলে জানান। ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘কোহিনূরের ইতিহাস বলে এটা আমাদের কাছ থেকে ভারতে নেয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে ব্রিটেনে গেছে। তাই ভারতের চেয়ে কোহিনূরের ওপর আমাদের দাবি বেশি।’ বলাই বাহুল্য তালেবানদের এই দাবির কোনো সমাধান হয়নি। এর পরে আফগান সরকারের পক্ষ থেকে কোহিনূর নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
তবে ভারতীয় বা পাকিস্তানিরা বসে থাকেনি। ২০০২ সালে কুইন এলিজাবেথ দ্য কুইন মাদার মারা যান। তার মুকুটেই কোহিনূর স্থাপিত এবং তার কফিনের ওপর এই মুকুটটি রাখা হয়েছিল। এবার চুরির মাল এভাবে প্রদর্শনের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখান ব্রিটেনে বসবাসরত শিখরা। শিখরা কোহিনূর অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তোলেন। শিখদের দাবি, কোহিনূর ছিল একজন শিখ মহারাজার সম্পত্তি এবং ভারত তখন কোনো রাষ্ট্র নয়। তাই এটি শিখদেরই সম্পত্তি।
২০১০ সালে তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এসে পাঞ্জাব গিয়েছিলেন। সেসময় সাংবাদিকরা তাকে কোহিনূর ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘এ রকম কোনো একটি দাবিকে যদি আমরা মেনে নিই, তাহলে কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে যে ব্রিটিশ জাদুঘর ফাঁকা হয়ে গেছে।’
তবে যতজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীই কোহিনূরের ব্যাপারে না বলুন না কেন, দাবি কিন্তু থেমে থাকেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বছর ছিল ২০১৫ সাল। ওই বছরের জুলাইয়ে ‘মাউন্টেইন অব লাইট’ নামের একটি ভারতীয় গ্রুপ কোহিনূর ফেরানোর জন্য ব্রিটিশ রাজকে আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত করার ঘোষণা দেয়। গ্রুপে ছিলেন ব্যবসায়ী ও বলিউড তারকারা। এই গ্রুপটি বলে, তারা অনধিকার চর্চা-সংক্রান্ত সাধারণ যে আইন প্রচলিত আছে, তার অধীনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কোহিনূর চুরির অভিযোগ তুলবে। দরকার হলে তারা বিষয়টি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে তুলবে। গ্রুপের সদস্য অভিনেত্রী ভূমিকা সিং বলেন, ‘কোহিনূর কেবল ১০৫ ক্যারেটের হীরাই নয়, বরং এটা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ এবং অতি অবশ্যই এটা ভারতকে ফেরত দেয়া উচিত।’ মাউন্টেইন অব লাইট গ্রুপটির প্রচারণাকে নিঃশর্ত সমর্থন দেন হাউজ অব কমন্সের সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান কিথ ভাজ। তিনি বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং ফলাফলশূন্য কিন্তু কোনো দামি বস্তু যেমন কোহিনূর হীরা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না।’
কিথ ভাজের এই মন্তব্য এসেছিল এমন এক সময়ে, যখন নরেন্দ্র মোদি ব্রিটেনে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিথ আরো বলেছিলেন যে, ফেরার সময় যদি নরেন্দ্র মোদি কোহিনূর ভারতে ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি পেতেন, সেটা একটা দারুণ ব্যাপার হতো। সেবার ২০১৫ সালের নভেম্বরে মোদি ব্রিটেন সফর করেন। কিন্তু মোদি কোহিনূর নিয়ে একটা কথাও তোলেননি। এর পরের মাসেই কোহিনূর নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। একজন পাকিস্তানি নাগরিক কোহিনূর তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য লাহোর হাইকোর্টের সহায়তা চান। নিজের পিটিশনে জাওয়াইদ ইকবাল জাফরি কোহিনূরকে ‘পাকিস্তান’-এর সম্পত্তি বলে দাবি করেন, যা ব্রিটেন অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। জাফরি পিটিশনে উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘কোহিনূর ফেরত চেয়ে তিনি ব্রিটেনের রানী এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের কাছে ৭৮৬টি চিঠি পাঠিয়েছেন এবং তার কোনো চিঠিরই প্রাপ্তি স্বীকার করা হয়নি, শুধু একবার রানীর প্রাইভেট সেক্রেটারি একটি চিঠি গ্রহণ করেছিলেন।’
গত বছরের এপ্রিলে অবশ্য ভারত সরকার বেশ ঝামেলায় পড়েছিল। একটি ভারতীয় এনজিও ভারত সরকারকে কোহিনূর ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেয়ার জন্য হাইকোর্টে পিটিশন দাখিল করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘কোহিনূর চুরি করা হয়নি বা জোরপূর্বক নেয়া হয়নি। বরং ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাবের শাসক রণজিৎ সিং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কোহিনূর উপহার দিয়েছিলেন।’ দুটি ভুল তথ্যসমৃদ্ধ এই সরল মন্তব্যটির মাধ্যমে তিনি অনেক পুরানো ক্ষতকে জাগিয়ে তোলেন। ক্ষমতাচ্যুত বালক রাজার (দুলীপ সিং) দুঃখভরা কাহিনী ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়। কোনোভাবেই কোহিনূরকে উপহার বলার সুযোগ নেই। দ্রুতই ভারত সরকারের টনক নড়ে। সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয় আইনজীবীর বক্তব্যটি কোনোভাবেই সরকারের কথা নয়। তারা আরো জানায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে কোহিনূর ফিরিয়ে আনার সব উদ্যোগই সরকার নেবে। মন্ত্রণালয় আরও বলে, কোহিনূর একটি মূল্যবান শিল্পকর্ম এবং ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। নরেন্দ্র মোদি কোহিনূর ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিতর্ক অব্যাহত থাকে। ভারত সরকার বলে যেকোনো উপায়ে হোক কোহিনূর ফেরানো হবে আর ব্রিটিশ সরকারও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে হীরাটি লন্ডনেই থাকবে। তাহলে কথিত এই হীরকখণ্ডের মালিকানা নিয়ে বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবে? অনেকে বলেন হীরাটি টুকরো করে মালিকানার দাবিদারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হোক।
কোহিনূর অভিশপ্ত কিনা, এটা একটা কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। এমনকি যুক্তির গর্বে গর্বিত ভিক্টোরিয়ান সমাজও এই অভিশাপ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। তবে এটা সত্য যে, কোহিনূরের মালিকদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য উভয় ধরনের পরিণতিই বরণ করতে হয়েছে। কোহিনূরের মালিক শাহ সুজা দুররানির করুণ পরিণতির কথা সবারই জানা। কোহিনূরের মালিকদের কারো চোখ অন্ধ করে দেয়া হয়েছে, কাউকে বিষ দেয়া হয়েছে, কেউ নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছে, তেলে পোড়ানো হয়েছে, কেউ পরিবার বা নিজের নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে নিহত হয়েছেন। কোহিনূরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জিনিসও নানা বিপদে পড়েছে। ভারত থেকে কোহিনূরকে ইংল্যান্ডে বয়ে এনেছিল মিডিয়া নামের জাহাজ। এই জাহাজ কলেরা ও ঝড়ের আক্রমণে পড়ে। ঝড়ে তো প্রায় ডুবে যাওয়ারই অবস্থা হয়েছিল।
একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, খোদ মোগলদের কাছে কোহিনূরই কিন্তু সবচেয়ে বড় হীরা ছিল না। কোহিনূরের সমান ওজনের আরো অনেক হীরা তাদের ছিল। এর পর প্রিন্স অ্যালবার্টের আমলে কাটার পর দুনিয়ায় এখন কোহিনূরের চেয়ে বড় অন্তত ৮৯টি হীরা আছে। তবে কোহিনূরের চেয়ে বড় বা নিখুঁত যা-ই হোক না কেন, অন্য কোনো হীরাই এর মতো খ্যাতি অর্জন করতে পারেনি। ঔপনিবেশিক আমলে আরো অনেক কিছু লুট হলেও সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে কোহিনূর ফিরিয়ে আনার দাবি।
কোহিনূর যে শুধু ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে তুলে আনে তাই নয়, বর্তমান অনেক বিষয়ও উঠে আসে এই হীরাকে কেন্দ্র করে। উপনিবেশ নিয়ে কথা উঠলে কোহিনূরের নামটিও আলোচনায় আসবে। টাওয়ার অব লন্ডনে থাকা কোহিনূর একটি প্রশ্ন করে: ‘সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের জবাব কী হওয়া উচিত?’
নাদির শাহ প্রায় ৩০০ বছর আগে দিল্লি থেকে কোহিনূর নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মোগল সাম্রাজ্যকে পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। এর ১৭০ বছর পর সেটা ব্রিটিশদের হাতে আসে। কোহিনূরের বিভক্তি বা মতের দ্বন্দ্ব তৈরি করার ক্ষমতা আজো শেষ হয়নি। কোহিনূর যার মালিকানায় ছিল বা যে স্থানে গেছে, তার বা তাদের জন্য বয়ে এনেছে মিশ্র ভাগ্য।
উইলিয়াম ড্যালির্যাম্পল ও অনিতা আনন্দ রচিত কোহিনূর: দ্য স্টোরি অব দি ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট ইনফেমাস ডায়মন্ড গ্রন্থ অবলম্বনে






