[শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি ১৯৭১-৭২ এ লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। তাঁর গ্রন্থ ইন্ডিয়া, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন অ্যান্ড পাকিস্তান ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ এই বিদেশী বন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়েছে। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পূর্বাহ্ন পর্যন্ত যুদ্ধকালীন অপরাধের প্রত্যক্ষ দায় যাদের, তারা কেমন করে নিরাপদ আশ্রয়ে পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করল, সে কাহিনীই লিখেছেন শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি।]
১৯৭১-এ পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পর ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল— মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা। বাংলাদেশী নেতার নিরাপদ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিনিময়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো (এবং আইএসআই) পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের (পিওডব্লিউ— প্রিজনার অব ওয়ার) মুক্তি আদায় করে নিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১৩ দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হয়। এর ৮ মাস পর ২ আগস্ট ১৯৭২-এ দুই দেশ সিমলা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির অধীন ভারত যুদ্ধের সময় আটককৃত ৯৩ হাজার পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর সবাইকে মুক্তি দিতে রাজি হয়। এটি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বলে প্রমাণ হয়েছে। বহু ভারতীয় প্রশ্ন রেখেছেন পাকিস্তানের সঙ্গে দরকষাকষি করার এবং ভারতীয় শর্তে কাশ্মীর সমস্য মিটিয়ে ফেলার এমন সুবর্ণ সুযোগ ইন্দিরা গান্ধী কেন হারালেন?
কোন কারণে মিসেস গান্ধী যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিতে উত্সাহিত হলেন? পর্দার পেছনে কোন খেলা চলছিল? কী ছিল সেই বাধ্যবাধকতা যে, এ খেলার কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশ হয়নি? যদি সে রকম কিছু থেকেই থাকে, তাহলে তা জনগণের জ্ঞাতার্থে ‘পাবলিক ডোমেইনে’ চলে আসা উচিত, যাতে আগামী প্রজন্ম ইতিহাসের শিক্ষা থেকে লাভবান হয়। যেহেতু আমি নিজেই এসব গোপনীয় ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িত ছিলাম, একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ হিসেবে আমি এখন সে গল্প বলতে পারি, যদিও এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ৪০ বছর পার হয়ে গেছে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১— পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ঢাকায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত কমান্ডের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করল। ভারত ও বাংলাদেশ— উভয় দেশের সামরিক ইতিহাসে এটা সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত— দেশ দুটোর একটি পুরনো, একটি নতুন। দু’দেশের সশস্ত্র বাহিনী যখন তাদের নির্মম নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিজয়ের উত্সব করছে ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অন্যান্য জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তা করছেন।
যুদ্ধের দানবীয় ব্যয়ভার মেটানো ছাড়াও পাকিস্তানি সেনাবাহীর ভয়ঙ্কর নৃশংসতাও নির্মমতায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আসা এক কোটি শরণার্থীর আর্থিক বোঝা সামাল দিতে হচ্ছে— এ নৃশংসতাই ১৯৭১-এর বাংলাদেশ জেনোসাইড।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল— কারণ এর সঙ্গে জড়িত ছিল জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিদেশনীতির ইস্যুগুলো। সঙ্গে তো বাজেটবহির্ভূত খাত থেকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি সৈন্যের দেখভালের খরচ সতর্কতার সঙ্গে নির্বাহ করার বিষয় তো রয়েছেই। জেনেভা কনভেনশনে বন্দি সৈন্যের যে সুযোগ-সুবিধা তালিকাভুক্ত আছে, ভারত পাকিস্তানি সৈন্যদের রাখতে চেয়েছে তার চেয়েও আরামে।
সে মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধীর সর্বোচ্চ উদ্বেগ বাংলাদেশী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কিভাবে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যায়। তাঁর জীবন রক্ষা করার জন্য তিনি যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এ ইচ্ছের কথা তিনি তাঁর ‘কিচেন ক্যাবিনেটে’র অন্তত একজন সদস্যের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। আর সেই মানুষটি হলেন ‘র’-এর প্রধান রাম নাথ কাও।
তিনি আসলে অবহিত ছিলেন যে, পাকিস্তানের সামরিক আদালত বিচার করে মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃতুদণ্ড দিয়েছে এবং সে রায় তাঁর কাছে হস্তান্তর করেছে। পাকিস্তানি সামরিক সদস্য হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত অপরিশীলিত উপায়ে তাদের দানবীয় উল্লাস প্রকাশে নিরস্ত থাকেনি। তাঁর (মুজিব) প্রিজন সেলের ভেতর সাড়ে ছয় ফুট লম্বা কবর খনন করে এর উপরের দিকে একটি দড়ি ঝুলিয়ে রেখেছিল— এটা হচ্ছে ওয়ার্নিং: যেকোনো সময় তার নির্মম মৃত্যু হতে পারে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি তাঁর মৃতুদণ্ড কার্যকর করে বাংলাদেশকে একটি এতিম রাষ্ট্রে পরিণত করত, তা হতো মিসেস গান্ধীর জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন। ভারত মনে-প্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে, তাই মুজিবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ভারতের জন্য অকল্পনীয় বিপর্যয়— একটি স্বপ্নভঙ্গ। কাজেই মুজিবের স্বার্থে, তার পরিবারের স্বার্থে, বাংলাদেশের স্বার্থে এবং নিজের স্বার্থে তাঁর জীবন রক্ষা করতে ভারত সম্ভাব্য সব চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
অন্যদিকে বরাবরের অনুমিত শত্রু ভারতের কাছে পরাজয় পাকিস্তানের জাতিসত্তার জন্য ভয়াবহ অপমান হিসেবে পরিচিহ্নিত হলো। কেবল পরাজয় নয়, তার চেয়েও মারাত্মক— এর অর্ধেক রাজত্ব চলে গেল বাংলাদেশের কাছে— পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার যে আদর্শগত তত্ত্ব, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব, তা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। এ ধ্বংসযজ্ঞের দহনে দগ্ধ সেনা একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খান আকস্মিক সিদ্ধান্তে নিজের ঘাড়ে জাতীয় বিপর্যয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে নেমে গেলেন। তিনি তখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত থাকা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দেশে ফিরতে বললেন। ভুট্টোকে জানানো হয় জেনারেল ইয়াহিয়া পদত্যাগ করেছেন এবং তাকে পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। তবে রাওয়ালপিন্ডির ফ্লাইট ধরার আগে তিনি যেন ওয়াশিংটন গিয়ে পাকিস্তানের মেন্টর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে দেখা করেন।
ভুট্টোর ওয়াশিংটন-রাওয়ালপিন্ডি ফ্লাইট রিফুয়েলিংয়ের জন্য লন্ডনে থামার কথা। ভুট্টোর দেশে ফেরার ভেতরের খবর পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী সাউথ ব্লকে তাঁর অফিসে যুদ্ধ ক্যাবিনেটের জরুরি বৈঠক ডাকলেন। তিনি চাইলেন অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে ভুট্টোর হিথরো উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে এমন কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করুক এবং একটি তথ্য জানুক: পাকিস্তানি সামরিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে তিনি কী করবেন?
বৈঠকে অংশ নেন দুর্গা প্রসাদ ধর (ডিপি ধর), বহিঃসম্পর্ক মন্ত্রণালয়ের পলিসি প্ল্যানিং বিভাগের প্রধান, র-প্রধান রাম নাথ কাও, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পিএন হাকসার এবং পররাষ্ট্র সচিব টিএন কাউল।
পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব মুজাফফর হোসেন, যিনি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত দায়িত্বরত ছিলেন এবং অতঃপর যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারতে এসেছেন। ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশানুসারে তাকে ভিআইপি হিসেবে ডিপি ধরের দাপ্তরিক বাংলোতে রাখা হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তার স্ত্রী লায়লা তখন লন্ডন সফর করছিলেন। তিনি যুদ্ধের কারণে দেশে ফিরতে পারেননি। লন্ডনে আটকা পড়ে যান। কূটনৈতিক চ্যানেলে স্বামী দিল্লিতে, স্ত্রী লন্ডনে— দুজনই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন। আমি ভিআইপি কুরিয়ারের একটি দায়িত্ব পেলাম। মুজাফফর হোসেন ও তার স্ত্রী লায়লা হোসেনের বার্তা চালাচালিতে সহযোগী হতে পারাটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমি শিগগিরই লায়লা হোসেনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হই।
একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে লন্ডনে অনেকবার আমার ডিপি ধরের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এ সময়টাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের। আমরা দুজন বন্ধু হয়ে উঠি। তিনি নিরাভিমান, পরিশুদ্ধ এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। উর্দু কবিতায় অসাধারণ পাণ্ডিত্য। হায়দ্রাবাদের উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠগ্রহণের সময় উর্দু কবিতার জন্য আমার যে ভালোবাসা জন্মে, তা-ই আমাদের বন্ধুত্বে ভূমিকা রাখে— তার সঙ্গে পদমর্যাদা ও বয়সের ফারাক এতটাই যে, বন্ধুত্ব হওয়ার কথা ছিল না। ডিপি ধর একজন ক্যাবিনেটমন্ত্রী আর আমি ছোট আমলা।
ভুট্টোর লন্ডন পৌঁছার ঠিক দুদিন আগে আমি ডিপি ধরের টেলিফোন পাই, তিনি দিল্লি থেকে ফোন করেছেন। তিনি চাইলেন আমি যেন লায়লা হোসেনকে এটা জানাই যে, জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটন থেকে ইসলামাবাদ যাচ্ছেন। তার উড়োজাহাজ রিফুয়েলিংয়ের জন্য হিথরোতে নামবে। আমার কাজ লায়লাকে ভুট্টোর সঙ্গে সাক্ষাতে প্রভাবিত করা— পুরনো সম্পর্কসূত্রে তিনি ভুট্টোকে জিজ্ঞেস করতে পারেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তিনি তার স্বামী মুজাফফর হোসেনকে দিল্লি থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করবেন কিনা?
লায়লা বেশ ভালো করেই জানেন, ভুট্টোর সঙ্গে তার পূর্ব পরিচিতি ও সম্পর্ক আমার অজানা নয়। আলোচনার কী অগ্রগতি হয়, তা জানা আমাদের দুজনের জন্যই বিপুল আগ্রহের বিষয়। ভারত কেবল একটি বিষয়ই জানতে চায়: রহমান সম্পর্কে ভুট্টোর ভাবনা কী— বাড়ি ফেরার জন্য তাকে মুক্তি দেবেন না সামরিক আদালতের রায় বাস্তবায়ন করবেন।
আমি দুজনের মধ্যে বৈঠক করিয়ে দিতে সমর্থ হই। দীর্ঘদিনের হারানো দুজন বন্ধু হিথরো এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জে দেখা করেন। সাক্ষাত্কারটি ছিল আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ, যতটা উল্লাসমুখর হওয়া সম্ভব— পুরোটাই। কোনো সন্দেহ নেই পেছন দরজার বৈঠকগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এক চমত্কার সত্যিকারের থ্রিলার— এ বর্ণনার যেন গ্র্যান্ড ফাইনাল।
ভুট্টো খুব দ্রুতই ধরে ফেললেন। ভারতীয় হেফাজতখানা থেকে স্বামীর মুক্তির জন্য লায়লার আবেগময় আবেদনে যেই তিনি সাড়া দিলেন, তিনি এটাও আঁচ করলেন ভদ্রমহিলা আসলে ভারত সরকারের হয়ে দরাদরি করছে না তো! পর মুহূর্তে ভুট্টো আলোচনার বিষয় বদলে ফেললেন।
তারপর লায়লাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘টপসিক্রেট’ একটি বার্তা ফিসফিস করে তাকে বললেন। লায়লার মুখের কথা আমি উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
‘লায়লা, আমি জানি আপনি কি চান। আমি অনুমান করতে পারি আপনি মিসেস গান্ধীর কাছ থেকে (একটি অনুরোধ) নিয়ে এসেছেন। আপনি এই বার্তাটি তাকে দিয়ে দেবেন যে আমি ফিরে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর শিঘ্রই মুজিবুর রহমানকে ছেড়ে দেব, যাতে তিনি বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। আর আমি কি চাই, ভিন্ন একটি চ্যানেলে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে জানাব। এখন আপনি যেতে পারেন।’
হিথরোর ভিআইপি লাউঞ্জে এ বৈঠকের ওপর লায়লা যখন আমাকে ব্রিফ করলেন, আমি আর মুহূর্ত অপচয় না করে লায়লার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য গোপনীয় বার্তা হিসেবে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পাঠিয়ে দিলাম।
যদিও অদাপ্তরিকভাবে পেছনের দরজা দিয়ে পাঠানো বার্তা ভুট্টোর এ ধনাত্মক সাড়ায় মিসেস গান্ধী যে খুশি হবেন, তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে ভুট্টোকে বিশ্বাস করা যায় কিনা, এ নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খুব সতর্ক আশাবাদী মানুষ ছিলেন ।
ভুট্টো কি ভারতকে ভুল পথে চালাতে চাচ্ছেন? তার অশুভ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একটি মিথ্যে ভোর সাজাতে চেষ্টা করছেন? লায়লার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে যে বার্তা তাকে পাঠানো হয়েছে, পাকিস্তানে অবস্থিত আমাদের কূটনৈতিক মিশনের কাছ থেকে তিনি তার নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। এর মধ্যে ইসলামাবাদ থেকে লায়লার রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করা হলো। এ পর্যায়ে মিসেস গান্ধী বিষয়টি নিজের হাতে নিয়ে নিলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি আমলাতান্ত্রিক চর্চা থেকে রাজনৈতিক পর্যায়ে তুলে আনলেন।
নিজস্ব সূত্রে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জানলেন রহমান প্রথম লন্ডন নামবেন, সেখান থেকে ঢাকায়, হয়তো দিল্লি হয়ে যেতে পারেন। তিনি এবার তার কিচেন ক্যাবিনেটের একজন সদস্যকে বললেন, রহমানের আসন্ন মুক্তির বিনিময়ে ভুট্টো কী চাচ্ছেন, তার নিশ্চিত খবর এখন তিনি জানেন।
প্রথমে রহমানকে মুক্তি দেয়া ছাড়া ভুট্টোর হাতে বিকল্প কিছু নেই, যুদ্ধবন্দিদের প্রসঙ্গটি আসবে পরে। স্পষ্টতই ভুট্টো গান্ধীর সদাচরণের ওপর নির্ভর করছিলেন, যেন তিনি তাকে ফাঁসিয়ে না দেন। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইন্দিরা গান্ধী তার মন ঠিক করে ফেলেছেন। যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির জন্য যদি ভুট্টো ব্যক্তিগতভাবে বলতেন, তিনি নির্দ্ধিধায় রাজি হতেন। একটি উদার আচরণের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হলে অনুরূপ আচরণই করতে হবে। তার চেয়ে কম কিছু নয়।
কৃত্রিম এক ভূরাজনৈতিক উদারতায় ভুট্টো তার হাতে তুলে দেয়া রাওয়ালপিন্ডির সামরিক আদালতের ফাঁসির রায় নাকচ করে দিলেন, ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিলেন। ফিরে এসে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মুজিব বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
বাংলাদেশের জাতির পিতা মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষার একান্ত কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করতে, তার মুক্তির ৮ মাস পর ভারত ২ আগস্ট ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তি অনুযায়ী ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিকে মুক্তি দেয়। যুদ্ধবন্দি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যে পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে ভারত যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে দিয়েছে, পৃথিবী এমনটি আগে কখনো দেখেনি।
তিন বছর আট মাস পর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ অ্যাবোটাবাদে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের একটি ব্যাচ, যারা তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জ্যেষ্ঠ পদ অধিকার করে রেখেছিল, নির্মমভাবে মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। মনে হলো, দেরিতে হলেও তারা আইএসআইয়ের অসমাপ্ত এজেন্ডা পূর্ণ করল। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ভেঙে দিতে তাঁর ভূমিকার জন্য আইএসআই তার কঠোর শাস্তি চেয়েছে। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ মিয়ানওয়ালি জেল থেকে তাঁর মুক্তি কেবল দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল ছিল মাত্র ।
ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে কাশ্মীর সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি; পাকিস্তান অবিরাম ‘অনুপস্থিত যুদ্ধ’ ৪৫ বছর ধরে লাগিয়েই রেখেছে এবং এখনো তা চালিয়ে যাচ্ছে।
হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। রক্ত কখনো শুকোয়নি, কান্নার ধারা কখনো থামেনি।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ করে কঠোর ভাষায় লেখা বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরীর, যিনি পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন; চিঠির কথা বলে উপসংহার টানতে চাই— তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে পশ্চিম রণাঙ্গনে এককভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তাতে বাংলাদেশ যুদ্ধের অর্ধেক কাজ কেবল শেষ হবে। তার চিঠির শেষ লাইনটি ছিল: আপনি যখন কোবরার লেজটা কেটে ফেলবেন, তখন তা দশ গুণ বিষধর হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে চিঠিটি বড্ড দেরিতেই পৌঁছে।






