২০ বছর আগে পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম জলাভূমিগুলো ছিল ইরাকে। বহু হাজার বছর ধরেই মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাংশে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদী পারস্য উপসাগরে মিশে যাওয়ার আগে একটি বিস্তৃত এলাকাজুড়ে এ জলাভূমিগুলো সৃষ্টি করেছে। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে মানববসতির নিদর্শন পাওয়া যায়। আর এর বর্তমান অধিবাসীরা মার্শ আরব, জলাভূমির আরব বা মা’দান নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এ জনগোষ্ঠী প্রাচীন সুমেরীয়দের উত্তরসূরি।
প্রাকৃতিক সম্পদ আর জীববৈচিত্র্যে অনন্য মেসোপটেমিয়ার এ জলাভূমিগুলোকে তিনটি প্রধান অংশে ভাগ করা যেতে পারে। টাইগ্রিসের পূর্বাঞ্চলীয় জলাভূমি, টাইগ্রিসের পশ্চিম আর ইউফ্রেটিসের উত্তরে কেন্দ্রীয় জলাভূমি, ইউফ্রেটিসের দক্ষিণে এবং শাত আল-আরব নদীর পশ্চিমে দক্ষিণাঞ্চলীয় জলাভূমি।
সত্তরের দশকে এ জলাভূমিগুলো ১৫-২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা ছিল দেশটির মূল ভূখণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ। তবে গত শতাব্দীর শেষ দশকগুলোয় (১৯৮০-১৯৯০-এর দশক) পরিকল্পিত একটি পদ্ধতিগত উপায়ে নদীর পানি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত এবং অপসারণ করার কারণে টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের এ জলাভূমির আকার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছিল। ২০০০ সাল নাগাদ শুধু উত্তরের জলাভূমির কিছু অংশ টিকে ছিল। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইরাকের তত্কালীন একনায়ক সাদ্দাম হোসেন এ জলাভূমি আর এ জলাভূমির আদি বাসিন্দাদের পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন। এখানকার বাসিন্দা, জলাভূমি আরব বা মা’দান জনগোষ্ঠীকে তিনি তার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত করেছিলেন।
ইউফ্রেটিস নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, এছাড়া আরো অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, যেন টাইগ্রিসের শাখা নদীগুলো এ জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে। একই সঙ্গে বিষাক্ত করে তোলা হয়েছিল পানি, অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। পরিণতিতে কয়েক বছরের মধ্যে একটি প্রাচীন সংস্কৃতি চিরকালের মতো ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। শুধু এক মাসেই (ডিসেম্বর ১৯৯১-জানুয়ারি ১৯৯২) স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় ৭০টি গ্রাম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, বাস্তুচ্যুত হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি জলাভূমির প্রাচীন বাসিন্দাদের তাদের পূর্বপুরুষদের বসতি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। জলাভূমির আরবরা কেউ কেউ স্থানীয় শহরগুলোয় জায়গা পেলেও অধিকাংশই বাধ্য হয়েছিল ইরানে শরণার্থী শিবিরে পালিয়ে যেতে। আর যারা সেখানে রয়ে গিয়েছিল, তাদের নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। মা’দানদের একসময়কার সমৃদ্ধ সমাজ, ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে যাদের জনসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ, সাদ্দাম হোসেন শাসনামলের শেষে তা মাত্র ২০ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু সাদ্দামের পতনের পর জলাভূমির প্রকৃতির সঙ্গে যাদের জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তারা ফিরে এসেছিল। ২০০৩ সালে জলাভূমি ক্রমেই আগের চেহারা ফিরে পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতায় আট দশকের মধ্যে ইরাক সবচেয়ে ভয়াবহ পানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল ২০১৮ সাল নাগাদ। এর কারণ মূলত ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়ায় তিনটি স্বতন্ত্র বাঁধ প্রকল্প। পানি সংকটের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবটি পড়েছে ইরাকের জলাভূমি এবং এর ওপর নির্ভর করে জীবন কাটানো জলাভূমির আরব জনগোষ্ঠীর উপরে। স্থানীয় সীমিত আকারের কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল এ সমাজগুলো বর্তমানে আরো বেশি হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে এখন, যা আবার তাদের নিজেদের গ্রাম ছেড়ে শহরে উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে বাধ্য করছে। পানির স্বল্পতায় যখন নলখাগড়ার উত্পাদন হ্রাস পায়, অথচ এ উদ্ভিদ জলাভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গরম বাতাসের বিরুদ্ধে একটি পর্দার মতো কাজ করে; এছাড়া শুষ্ক জলাভূমির তল থেকে উষ্ণ তাপমাত্রার কারণে সৃষ্ট ধুলো ঝড় জলাভূমির আরবদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব রাখছে।
ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের জলাভূমির প্রাচীন বাসিন্দা ছিল সুমেরীয়রা, যারা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে একটি নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। তাদের সমৃদ্ধ সভ্যতার চিহ্ন এখনো উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে জলাভূমির প্রান্তজুড়েই খুঁজে পাওয়া যায়, যেমন প্রাচীন সুমেরীয় শহর, লাগাশ আর উরুক, এরিডু আর লারসা। কিন্তু সুমেরীয় জনগোষ্ঠীর উত্পত্তি নিয়ে এখনো বিতর্কের অবসান হয়নি। এক্ষেত্রে দুটি প্রস্তাবনা রয়েছে—প্রথমটি দাবি করছে, মূল সুমেরীয়রা দক্ষিণ-পূর্ব থেকে (ভারত) এখানে এসে প্রথম বসতি গড়েছিল, তারা আরব উপসাগরের তীর ধরেই ইরাকের দক্ষিণে এসেছিল। দ্বিতীয় প্রস্তাবনাটি বলছে, সুমেরীয় সভ্যতার এ অগ্রগতির কারণ ছিল পার্বত্য উত্তর-পূর্ব মেসোপটেমিয়া থেকে দক্ষিণে ইরাকের জলাভূমিতে একটি জনগোষ্ঠীর অভিবাসন, পরবর্তী সময়ে যারা সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আত্তীকৃত হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বহু ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা জলাভূমির আরবদের বর্তমান এবং আদি জীবনাচরণের মধ্যে অসংখ্য সাদৃশ্য বর্ণনা করেছেন, যেমন বাড়ি নির্মাণ করার স্থাপত্য কৌশল (বিশেষভাবে খিলানসহ নলখাগড়া দিয়ে নির্মিত ঘর), খাদ্য সংগ্রহের উপায় (মহিষ পালন, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার, বর্শা দিয়ে মাছ ধরা, ধান চাষ ইত্যাদি), পরিবহনের মাধ্যম (সরু আলকাতরা দিয়ে লেপা নৌকা, যেগুলো ‘টারাডা’ নামে পরিচিত), যা এখনো এখানকার আদিবাসী আরবরা ব্যবহার করে আসছে। এ গ্রাম্য জীবনাচরণ, যা অপরিবর্তিত আছে প্রায় সাত হাজার বছর ধরে। আর অনেক গবেষকই এ কারণে প্রস্তাব করেছিলেন, বর্তমান সময়ের জলাভূমির এ আরব জনগোষ্ঠীদের সঙ্গে প্রাচীন সুমেরীয়দের একটি যোগসূত্র আছে। তবে লোকপ্রিয় বিশ্বাস দাবি করছে, এ আরবরা মূলত ভিনদেশী, এ এলাকায় মহিষ প্রতিপালনের আচারের সঙ্গে তারাও এখানে প্রবেশ করেছিল। আর প্রশ্নটির সমাধান করতে মার্শ আরবদের মধ্যে জিনগত প্রকরণ নিয়ে একটি গবেষণাও করা হয়, যেখানে একই সঙ্গে মায়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হওয়া মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) এবং ওয়াই (Y) ক্রোমোজমের পুরুষ নির্দিষ্ট এলাকাটির (MSY) জিনগত প্রকরণগুলো ইরাকের মূল আরব জনগোষ্ঠীর একটি নমুনার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হয়।
গবেষকরা দেখেছেন জলাভূমির এ আরব জনগোষ্ঠীর পুরুষ ও নারী—উভয় জিনপুলেই স্থানীয় মধ্যপ্রাচীয় অংশই মূলত বেশি প্রাধান্য বিস্তার করছে, এছাড়া গবেষকরা পশ্চিম এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু অবদানও সেখানে পেয়েছেন। এই গবেষকরা দাবি করছেন মহিষ প্রতিপালন এবং ধান চাষাবাদের কৌশল সম্ভবত এ এলাকায় প্রবেশ করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কিন্তু এ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জিনপুলে ভারতীয় উপমহাদেশীয় জিনের প্রবেশ করেছে খুবই সামান্য পরিমাণ। উপরন্তু দক্ষিণ ইরাকের আধুনিক জলাভূমির আরবদের জিনপুলে মধ্যপ্রাচীয় বংশঐতিহ্যের প্রাধান্য ইঙ্গিত করছে এরা প্রাচীন সুমেরীয়দেরই উত্তরসূরি। এবং একই সঙ্গে এটি প্রতিষ্ঠা করেছে সুমেরীয়রাও মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ভারতীয় কিংবা দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা পূর্বসূরিদের বংশধর নয়।
মা’দান আরবরা টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের মিলনস্থলে জলাভূমিতে বাস করা আংশিক-যাযাবর উপজাতীয় একটি জনগোষ্ঠী, যাদের বৈশিষ্ট্যসূচক একটি সংস্কৃতি আছে। মরুভূমির ‘বেদু’ যাযাবর (বেদুইন) সংস্কৃতি মূলত মা’দানদের সংস্কৃতির ভিত্তি, যারা নিজেদের জীবনকে জলাভূমির জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সাধারণভাবে মা’দানদের জীবনাচরণ গত হাজার বছরে খুব সামান্যই পরিবর্তিত হয়েছে। সাধারণ নলখাগড়ায় বোনা ছোট নৌকার নকশা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম হস্তান্তরিত হয়ে এসেছে। মাছ ধরার কৌশল, তাদের নির্মিত বাড়ির নলখাগড়ায় বোনা দেয়ালের জটিল নকশা বহু প্রজন্ম ধরেই টিকে আছে।
যে জলাভূমিতে মা’দানরা বসবাস করে, সেটি সৃষ্টি হয়েছিল টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর বার্ষিক প্লাবনের কারণে। জলাভূমি আচ্ছাদিত নলখাগড়া (রিড) আর ‘কাসাব’ নামের একটি বিশাল আকৃতির ঘাসজাতীয় উদ্ভিদে, যেটি দেখতে বাঁশের মতো, যা মূলত স্থায়ী জলাভূমির পুরোটাই আচ্ছাদিত করে রেখেছে। এটি লম্বায় প্রায় ২৫ ফুট দীর্ঘ হতে পারে। প্রাকৃতিক কিছু দ্বীপ, কিছু ভাসমান আর কিছু স্থির, জলাভূমির জলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করে। এ দ্বীপগুলোকে বলা হয়, ‘টুহুল’। এসবের মাটি দেখতে শক্ত মনে হলেও আসলেই খুব পানিপূর্ণ। বর্তমানে মা’দানদের জনসংখ্যা সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য নেই। বহু মাদানকেই মানব এবং পরে প্রাকৃতিক বৈরিতার মুখে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে, শিগগিরই হয়তো তাদের প্রাচীন সেই জীবনাচরণ চিরকালের মতোই হারিয়ে যাবে।
মাদানদের অনেকের নাম বেশ অদ্ভুত ধরনের, বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে যে রকম নাম দেখা যায় না। প্রায়ই তারা অনাকর্ষণীয় নাম দেয় শিশুদের ওপর অশুভ দৃষ্টি এড়াতে, বিশেষ করে ছেলেদের, যাদের ভাইরা অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেছে, যেমন শিলাইব (ছোট কুকুর), বাকুর (শূকরী), খানজির (শূকর), এছাড়া যেমন জাহাইশ (ছোট গাধা), জারাইজি (ছোট ইঁদুর), ধানুবা (হায়েনা) এমনকি বারুর (গোবর) ইত্যাদি।
মা’দানদের লোককাহিনীতে জিন, অশুভ আত্মার অস্তিত্ব আছে, যারা মানুষ কিংবা পশুর রূপ নিতে পারে। এছাড়া মা’দান উপকথায় জলাভূমির দুটি দানবের উল্লেখ আছে, ‘আনফিস’, লোমশ চামড়ার একটি দানবীয় সাপ এবং ‘আফা’, পাসহ একটি দানবীয় সাপ। বলা হয়ে থাকে, এই দুটিরই বাস জলাভূমির একেবারে কেন্দ্রে, আর দুটোই ভয়ঙ্কর। মা’দান লোককথায় একটি জায়গার নাম পাওয়া যায় ‘হুফাইধ’। এটি একটি দ্বীপ স্বর্গ, জলার দক্ষিণ পশ্চিম এলাকায় এটির অবস্থান, কিন্তু কেউ জানে না এটি কোথায়, জিনরা এটি মানুষের চোখ থেকে আড়াল করে রাখে। এ দ্বীপে প্রাসাদ, খেজুর গাছ, ডালিমের বাগান আছে, এছাড়া আছে বিশাল মহিষের পাল। বিশ্বাস করা হয়, যদি কেউ হুফাইধ দেখে সে জাদু দ্বারা সম্মোহিত হয়, সেই মানুষটি পরে যা কিছু বলে, সেটি কেউ আর বুঝতে পারে না।
ধর্মীয়ভাবে মা’দানরা মূলত শিয়া মুসলিম। তবে মুসলিম ধর্মীয় আচারগুলো তারা কঠোরভাবে পালন করে না। কারবালা আর নাজাফ তাদের জন্যও পবিত্র শহর। অধিকাংশ মা’দান ইসলামী অন্য আচার এবং উত্সব যেমন রমজান, ঈদ পালন করে, অল্প কয়েকজন হজও করেছেন কিন্তু মক্কার পরিবর্তে তারা মেশেদ শহরের তীর্থে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, যেখানে তাদের শ্রদ্ধেয় ইমাম আলী আর রিধার দরগা অবস্থিত। আর যারাই এই তীর্থে যায়, তাদেরকে ‘জাইর’ পদবি দেয়া হয়। সাধারণত কৌশলেই মা’দান ছেলেদের খতনা করার নিয়ম আছে। পরিবারে কারো মৃত্যু হলে শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা তাদের মাথায় জড়ানো কাপড়ে নীল রঙ করে, অন্যরা মাথায় ও কাপড়ে কাদা মাখে।
মা’দানরাও আরব ‘কোড অব অনার’ অনুসরণ করে, তবে তারা অন্য আরবদের মতো সেগুলো পালনে গোড়া নয়। মা’দানরা অতিথিপরায়ণ, প্রায় প্রতিটি গ্রামেই অতিথিদের থাকার জন্য বাড়ি আছে, যাকে বলা হয় মুধিফ। মা’দানদের বাড়িগুলো নির্মিত নলখাগড়া, নলখাগড়া দিয়ে বোনা মাদুর সেখানে মেঝে হিসেবে কাজ করে। আধুনিক কোনো সুবিধা যেমন বিদ্যুৎ, কলের পানি ইত্যাদি সেখানে নেই। পাশের জলাভূমি থেকেই সব পানি সংগ্রহ করা হয়। মা’দানদের খুব সামান্যই ব্যক্তিগত সম্পদ থাকে, সাধারণত অল্প কয়েকটি মহিষ, একটি বন্দুক, কিছু কম্বল, রান্না করার সামগ্রী এবং কাঠ কিংবা নলখাগড়া দিয়ে বানানো নৌকা, যার ওপর আলকাতরার একটি প্রলেপ থাকে।
তাদের বাড়িগুলো তৈরি করা হয় কৃত্রিমভাবে নির্মিত দ্বীপে, প্রায় ২০ ফুট উঁচু নলখাগড়ার বেষ্টনী দিয়ে তারা জলার একটি অংশকে প্রথমে পৃথক করে নেয়। তারপর স্থানীয় ঘাস আর নলখাগড়া এই বেষ্টনীর মধ্যে ঠেসে জড়ো করা হয়, এটাই তাদের বাড়ির ভিত্তি তৈরি করে। যদি মেঝে নিচে নেমে যায়, তাহলে পানি সেখানে প্রবেশ করে, সুতরাং আবার নলখাগড়া ফেলে মেঝেকে পানির চেয়ে ওপর স্তরে নিয়ে আসা হয়। এ ধরনের বাড়িগুলোকে বলে কিবাশা। তবে আরো স্থায়ী কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়, যখন জলার তল থেকে তুলে আনা কাদার একটি স্তর দিয়ে ভিত্তিটাকে ঢেকে দেয়া হয়, এ ধরনের বাসাগুলোকে বলে ডিবিন। যদি কোনো পরিবার এক বছরের বেশি সময় একটি ডিবিন অব্যবহূত রাখে, তারা সেখানে বসবাস করার অধিকার হারিয়ে ফেলে, যে কেউ সেটির দখল নিতে পারে। মা’দান ঘরে নিরাপদ পায়খানার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ স্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও বিস্ময়করভাবেই তারা সুস্থ জীবন কাটায়।
প্রতিটি পারিবারিক গোষ্ঠীর প্রধান হিসেবে একজন শেখ বা নেতা থাকেন। পিতা-মাতারাই মূলত তাদের সন্তানদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন, যদিও দম্পতিদের এ বিষয়ে নিজস্ব কিছু বলার থাকে না। চাচাতো ভাইয়ের প্রথম দাবি থাকে পরিবারের কোনো তরুণীকে তাদের স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করার। যোগ্য এমন চাচাতো ভাইয়ের বাবাকে (বা চাচাকে) অনুমতি দিতে হয়, যদি পরিবারের কোনো তরুণী অন্য কাউকে বিয়ে করতে চায়। একাধিক বিয়ে স্বীকৃত, তবে কদাচিৎ দেখা যায়। মা’দান নারী-পুরুষদের কর্মবিভাজন সুষ্পষ্ট, নারীরা রান্নার সব কাজ করে পানি সংগ্রহ করে। পুরুষরা শিকার করেন এবং মহিষ চরায়। মহিষ থেকে দুধ সংগ্রহ করে পুরুষরা, তবে পুরুষ শস্য মাড়াই অথবা জ্বালানির জন্য গোবর দিয়ে ঘুঁটে তৈরি করে না। মা’দান নারী-পুরুষরা সাধারণত একসঙ্গে বসে খায় না। আর সাধারণত বাইরে তারা পৃথক থাকে। নারী ও মেয়েরা নৌকায় ছেলেদের পেছনে বসে।
মা’দান পুরুষরা দীর্ঘ শার্ট সদৃশ একটি কাপড় পরে, যা প্রায় তাদের গোড়ালি স্পর্শ করে (সাধারণত সাদা রঙের)। এছাড়া আরবের ঐতিহ্যবাহী মাথার কাপড়ও পরে, তবে কোনো দড়ি ব্যবহার করে না সেটি জায়গামতো ধরে রাখতে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সবারই গোঁফ আছে। নারীরা গাড় রঙের আলখেল্লা পরে, যা তাদের সারা শরীর ঢেকে রাখে (সাধারণত কালো রঙের), মা’দান নারীরা সাধারণত বোরকা পরে না, তবে তারা একটি চাদর দিয়ে তাদের মাথা পেঁচিয়ে রাখে।
তাদের নিয়মিত খাদ্য মূলত মাছ ও মহিষের দুধের দই। কিছু মা’দান ধান চাষও করে এবং কেউ কেউ রুটিও বানায়। জলাভূমিতে কোনো স্কুল নেই, বহু মা’দান পিতা-মাতাই তাদের সন্তানদের জন্যে আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে চায়। তবে সবার পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। এবং অন্যদিকে যারা স্কুলে যায়, সেই অল্প বয়সীদের অভিজ্ঞতা জলাভূমিতে তাদের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট করে তোলে এবং তারা এ জলাভূমি ত্যাগ করে চলে যেতে চায়।
মা’দান সংস্কৃতি মূলত বেদু (বেদুইন, যাযাবর আরব গোষ্ঠী) সংস্কৃতির উত্তরসূরি। তারা কবিতা আবৃত্তি, গান ও নাচতে ভালোবাসে। বেশির ভাগ মা’দানই মাছ ধরে আর শিকার করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। এছাড়া তারা মহিষ পালে, মহিষের দুধ ব্যবহার করার জন্য। কেউ কেউ ধান চাষও করে। এছাড়া নলখাগড়া বা রিড দিয়ে বোনা নানা সামগ্রী নিকটবর্তী শহরের বাজারে বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। মাছ ধরার জন্য মূলত তারা পাঁচ শলাকা বর্শা ব্যবহার করে। ইদানীং বিষাক্ত টোপ ফেলে, তবে জাল নিয়ে মাছ ধরে শুধু পেশাগত জেলেরা, যাদের বলা হয় বেরবেরা। মহিষের জন্য ঘাস সংগ্রহ করা একটি দৈনন্দিন বড় কাজ, সাধারণ অল্পবয়সী ছেলেরাই এ কাজ করে।
তথ্যসূত্র:
Fulanain [pseud.]. The Marsh Arab, Haji Rikkan. Philadelphia, PA: J. B. Lippincott Co., 1928.
Hassig, Susan M. Cultures of the World: Iraq . New York: Marshall Cavendish Corp., 1993.
Thesiger, Wilfred. The Marsh Arabs . New York: E. P. Dutton & Co., 1964.
কাজী মাহবুব হাসান: অনুবাদক। বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ইতিহাসে আগ্রহী





