‘ভাটার তীর থেকে কিছুই নয় উদ্ভাসিত কিছুই নয় স্ফুলিঙ্গময়,

ইউফ্রেটিস ও নাইলের মধ্যবর্তী প্রবাহে’

—নির্বাসনহীন আমি কে, মাহমুদ দারবীশ

(অনুবাদ তাপস গায়েন )

আমাদের দেশের কবিরাও নিজেদের কবিতায় স্থান দিয়েছেন ইউফ্রেটিসকে—

‘তাইগ্রিস ইউফ্রেটিস রক্তঝরা স্মৃতি

নদী বিনে মোদের জীবন দুখের পদ্যগীতি’

—আফজাল হোসেন আজম

শুধু কি কবিতা! গল্প, নাটক, সিনেমা, অভিযান, ধর্মীয় বিশ্বাস, বিখ্যাত পরিব্রাজকদের ভ্রমণ কথা— কী তৈরি হয়নি ইউফ্রেটিসকে ঘিরে। ইউফ্রেটিস নদীর নাম শুনেছি সেই কিশোর বয়সেই। বোধ করি আমাদের দেশের সবারই কিশোর বয়সে কম-বেশি একই রকম অভিজ্ঞতা ইউফ্রেটিস নদী নিয়ে নবম ও দশম শ্রেণীর বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা টেক্সট বইয়ের কল্যাণে।

প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর সব স্থানেই মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল সহজে পানি পাওয়াকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর চারটি প্রাচীন সভ্যতার কথা যদি ধরি তাহলে দেখা যায়, প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল নীল নদকে ঘিরে, সুমেরীয় বা ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে অবদান রয়েছে ইরাকের ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর, ইয়াংসি কিয়াং নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা, আমাদের এ উপমহাদেশে সিন্ধু নদের তীরে মহেঞ্জোদারো সভ্যতা।

বহু ভাষাবিদ, ইতিহাস গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বইয়ে পড়েছিলাম, অনেক ইতিহাসবিদ বাংলার প্রাচীন সভ্যতার কথা বলতে গিয়ে এ স্থানকে ব্রহ্মপুত্র সভ্যতা বলে অভিহিত করতে চেয়েছেন। বাংলার পূর্বাঞ্চলে উয়ারী-বটেশ্বর যে প্রাচীনতম সভ্যতার কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। এ প্রাচীন স্থানটি লৌহিত্য-ব্রহ্মপুত্র নদের একটি প্রবাহ কয়রা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল তাতে সন্দেহ নেই।

বিস্তৃত অর্থে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি হলো মেসোপটেমিয়া। এটি ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসের তীরের প্রথম শহর এবং প্রথম সংগঠিত সভ্যতা। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ইউফ্রেটিস নদীর পানির মূল উত্স তুরস্কের উঁচু ভূমিতে অবস্থিত মুরাত ও কারাসু নদী।

রাজ্য জয়ে ইউফ্রেটিস

ব্যাবিলন ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ নগরী। ১৭৭০ থেকে ৩২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সময়ে ব্যাবিলনই ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শহর। দুই লাখেরও বেশি জনসংখ্যার প্রথম নগরী বলে বিবেচনা করা হয় ব্যাবিলনকে। ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস, যিনি ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ নামেই বেশি পরিচিত, ব্যাবিলন আক্রমণ করে বসেন। ব্যাবিলনের শাসকরা চারদিকে প্রাচীর ঘেরা শহরের ভেতর বহমান ইউফ্রেটিস নদীর প্রবেশপথে দ্বার নির্মাণ করে রাখলেও এদিকে বাড়তি আর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখেনি তারা। পানির নিচে কেউ সেই গেট ভেঙে তাদের শহরে আক্রমণ চালাবে, এটা তারা ভাবতে পারেনি। ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ নদীর আশপাশে বিভিন্ন খাল ও অন্যান্য জলাশয় খনন করে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করলেন। ফলে নদীর পানির স্তর নিচে নেমে যায়। তখনই দেখা মেলে গেটগুলোর। এরপর এক রাতে গোপনে সাইরাসের সৈন্যরা সেখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে শহরে প্রবেশ করে এর মূল ফটকটি খুলে দেয়। এরপর মৌমাছির ঝাঁকের মতো শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে সাইরাসের বাহিনী।

স্বর্গের ইউফ্রেটিস


মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলে ফোরাত নদীকে সবসময়ই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিছু ভূগোলবিদ এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম নদ-নদীগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ কেউ পবিত্রতার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। মনে করা হয়, স্বর্গ থেকে চারটি নদী প্রবাহিত হয়ে এসেছিল—নীল নদ, সিরি দারিয়া, আমু দারিয়া ও ইউফ্রেটিস।

ইবনে বতুতা ফোরাত নদীর কথা আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পৌঁছে যাওয়া দুটি নদী হলো নীল নদ ও ইউফ্রেটিস।

বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলা যায় সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যখন দজলা-ফোরাত শুকিয়ে যাবে। কারণ Global water forum-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ফোরাত নদীর পানি খুব দ্রুত কমছে। বিভিন্ন সময়ে তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক সরকার ১২টি ছোটবড় বাঁধ নির্মাণ করার কারণে ১৯৯৯ সালের পর থেকে ফোরাত নদীর পানি আশংকাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। সভ্যতার প্রাচীন ভূমিতে পানি সরবরাহের জন্য নদীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক সেচকাজ ও পানিবিদ্যুত্ উত্পাদনে এ নদীর পানি ব্যবহার করে।

চলচ্চিত্রে ইউফ্রেটিস


নদী বহন করে চলেছে চিত্র ও গল্প—আরারাত পর্বত থেকে থেকে শাত আল-আরব পর্যন্ত মানুষকে ধারণ করে চলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সীমানা উপেক্ষা করে।

চলচ্চিত্রে ইউফ্রেটিসকে দেয়া যায় সোভিয়েত আর্মেনীয় পরিচালক হামো বেকনাজারিয়ানের নামুস (১৯২৬) ছবিতে। এই নির্বাক ছবিতে উনিশ শতকের শেষভাগে একটি ছোট শহরের প্রাত্যহিক জীবনচিত্র উঠে এসেছে। তুর্কি পরিচালক ইলমাজ গুনি এবং সেরিফ গেরেন ১৯৮২ সালে নির্মাণ করে ইওল বা দ্য রোড। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ইলমাজ, কিন্তু তিনি বন্দী থাকায় ছবিটি পরিচালনা করতে হয়েছে তার সহকারী সেরিফ গেরেনকে। বন্দী অবস্থা থেকে পালাতে সক্ষম হন ইলমাজ এবং ছবির নেগেটিভ সুইজারল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে ছবির কাজ করেন। ইওল বা দ্য রোড ১৯৮২ সালে কান উত্সবে পামডি’আর জিতে নিয়েছিল। সিরিয়ার পরিচালক ওমর আমিরালির ইউফ্রেটিসের তাবকা বাঁধের ওপর প্রামাণ্যচিত্রের ট্রিলজি তৈরি করেন— প্রথমটি ফিল্ম এসে অন দি ইউফ্রেটিস ড্যাম (১৯৭০), দ্বিতীয়টি এভরিডে লাইফ ইন আ সিরিয়ান ভিলেজ (১৯৭৪) এবং ট্রিলজি শেষ হয় আ ফ্লাড ইন বাথ কান্ট্রি (২০০৩) দিয়ে।

ইউফ্রেটিস অভিযানের স্মৃতিকথা

ইউফ্রেটিস নদীতে অভিযানের ওপর লেখা উইলিয়াম ফ্রান্সিস এন্সওয়ার্থের দুই খণ্ডে লেখা A personal narrative of the Euphrates Expedition এক ক্ল্যাসিক গ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৮ সালে। উইলিয়াম ফ্রান্সিস পেশায় ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সার্জন ও ভূবিজ্ঞানী। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীতে তার যাত্রা ছিল একটি দাপ্তরিক অভিযানের অংশ। দুই নদীর অববাহিকায় মেসোপটেমিয়া সভ্যতার নিদর্শনগুলোর জরিপ করা ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য। এ অভিযানে তার সঙ্গে ছিলেন অন্য সহকর্মী লে. কর্নেল এফএস চিজনি। বইয়ে ফ্রান্সিসের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে চিজনির নিজের বর্ণনাও জুড়ে দেয়া আছে। ফ্রান্সিসের A personal narrative of the Euphrates Expedition প্রকাশিত হওয়ার ৪০ বছর আগেই চিজনির Expedition for the Survey of the Rivers Euphrates and Tigris প্রকাশিত হয়েছে ।

ফ্রান্সিস ভূবিজ্ঞানী ও সার্জন ছিলেন, কিন্তু তার নেশা ছিল প্রত্নতত্ত্ব। বইয়ের বর্ণনায়ও তেমনটি জানা যায়। ইউফ্রেটিসের চেয়েও ফ্রান্সিসের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে মেসোপটেমিয়াসের প্রত্নতত্ত্ব। এ অভিযানে তিনি অংশ নিয়েছেন ১৮৩৫ সালে আর তার বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৮৮ সালে লন্ডন থেকে।

ফ্রান্সিস তার লেখনীতে উল্লেখ করেছেন, ‘প্রাচীন স্থানগুলোর অবস্থান, যোগাযোগ, সেচের জন্য ব্যবহূত বিভিন্ন খালের গতিপথ প্রাচীন সময়ে যা লিপিবদ্ধ আছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য আমি ব্যাবিলনিয়ার সমভূমিটিকে বিভিন্ন দিকে অতিক্রম এবং পুনরায় অতিক্রম করেছি।’

অভিযানের একপর্যায়ে চেসনি ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। প্রাচীন ইউফ্রেটিসের নেভিগেশন, চাআব আরবদের অঞ্চলটির পুনর্গঠন—প্রাচীন মেসিন সাইট ও আজিনিসের (এখন আহওয়াজ) ইক্ষুর বাগানের পরীক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে সিগ্রিফোনে টাইগ্রিসের চূড়ায় আরোহণ থেকে ক্লেসিফন, সেলুশিয়া ও বাগদাদ।

 

এলিজা বিনতে এলাহী:
পর্যটক ও শিক্ষক