যে মুহূর্তে কোনো একজন রাগী মানুষ পাথর না ছুড়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছেন সে, ক্ষণকেই সিগমুন্ড ফ্রয়েড সভ্যতার সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এমন কোনো ঘটনা টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীসংলগ্ন উর্বর সমতল ভূমিতে হয়েছিল কিনা, তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘দুই নদীর (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস) মধ্যবর্তী অঞ্চল’ ছিল মেসোপটেমিয়া, যা অধুনা ইরাকের অধিকাংশ স্থানজুড়ে বিস্তৃত। এই মেসোপটেমিয়ায় প্রথম নগর, কৃষি ও আইনের বিকাশ ঘটে। একইভাবে এ দুই নদীর অববাহিকায় সুমেরীয়, উর, আক্কাদ, ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয় ও পারসিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে এবং সম্ভবত এডেনে জন্ম নেয়া ঝুলন্ত উদ্যানের গাছাপালায় পানি দেয়া হতো এ নদী থেকেই। অর্থাৎ এ দুই নদীর প্রবহমান ধমনীর তীরে গড়ে ওঠে বর্ধনশীল উর্বর ও টেকসই প্রাচীন বংশধারা, সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং অনেকগুলো সাম্রাজ্য।
ব্যাবিলনের আগে
সুমেরীয় সভ্যতার কর্ণধার দুই নদীর মাঝে অবস্থিত প্রাচীন নগরী লাগাশের শাসক ছিলেন গুডেয়া। তার একটি ভাস্কর্য সুমেরীয় সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২১৪৪ থেকে ২১২৪ অব্দের মধ্যে। মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণাংশের সবেচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয় এ নগরী। সুমেরীয় সভ্যতা প্রসার লাভ করেছিল খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে। সেমিটিকভাষী আক্কাদীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সুমেরীয় সভ্যতার সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক পুনর্জাগরণ ঘটে। গুডেয়ার ক্ষুদ্রাকৃতির ভাস্কর্যটি ব্যয়বহুল ডায়োরাইট পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। সম্ভবত এ পাথরের উত্স ছিল ওমানের ম্যাগান।
দুই নদী
পারস্যের ভূগোলবিদ আল ইসতাখরির তৈরি মানচিত্রে উত্তর মেসোপটেমিয়ার দুই নদীর (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস) অবস্থান দেখা যায়। মানচিত্রটি দশম শতাব্দীর। মানচিত্রে টাইগ্রিসের অবস্থান বাম দিকে, অংশটি ছিল খরস্রোতা এবং কিছুটা সংকীর্ণ, ১ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাপ্ত। এর নাম সুমেরীয়রা দিয়েছিল ইডিগনা, যার অর্থ ‘খরস্রোতা নদী’। অন্যদিকে ইউফ্রেটিস নদীর দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। সম্ভবত এর নামের অর্থ ‘বিস্তৃত জলরাশির প্রবাহ’ অথবা ‘দুরতিক্রম্য নদী’। ইউফ্রেটিস নদীর সমাপ্তি ঘটে পারস্য উপসাগরে। এ দুই নদীর উত্পত্তি তুরস্কে।
ব্যাবিলনের নদী
ব্যাবিলনের দুটি নিদর্শন থেকে নগরটির জন্য ইউফ্রেটিস নদীর গুরুত্ব বোঝা যায়। এর একটি ছিল মাটির ফলক। মাটির ফলকের নকশা থেকে দেখা যায় টোবা শহরতলিতে এ নদীর একটি শাখা ও দুটি প্রবেশদ্বার। অন্যটি ছিল কিউনিফর্ম। এটি সুমেরীয়দেরই আবিষ্কৃত লিখনপদ্ধতি। ব্যাবিলন মূলত একটি আক্কাদীয় শহর। এটি সে সময়ের সবচেয়ে বড় নগরী হিসেবে বিকশিত উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে দ্বিতীয় নেবুচাঁদনেজারের সময় শহরটি তার সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে। সে সময় মাটির তৈরি এসব ফলক বানানো হয়েছিল। হেরোডোটাস ব্যাবিলনকে নদীনির্ভর নগর বলেছেন। ব্যাবিলন অসংখ্য জলপথে বিভক্ত ছিল। এর সবচেয়ে গভীর অংশে জাহাজ নোঙর করতে পারত। জাহাজগুলো ইউফ্রেটিস থেকে টাইগ্রিসে ছুটে যেত।
ইস্ট অব এডেন
বাইবেলের বুক অব জেনেসিস-এ ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিসকে প্রথম এভাবে বর্ণনা করা হয়: ‘উদ্যান জলসিক্ত করতে একটি নদী এডেন থেকে প্রবাহিত হতো, সেখানে এটি ভাগ হয়ে যেত এবং চারটি নদীতে পরিণত হতো।’ পিশন ও জিহোন নদীর পরে তৃতীয় নদীটির নাম ছিল টাইগ্রিস। টাইগ্রিস পূর্ব অ্যাসিরিয়া থেকে প্রবাহিত হতো। চতুর্থ নদীটি ছিল ইউফ্রেটিস। বুক অব রেভেলেশনে ষষ্ঠ স্বর্গদূত চার স্বর্গদূতের মুক্তি দাবি করেন। তারা ইউফ্রেটিস নদীতে বন্দি ছিল। এক স্প্যানিশ পাণ্ডুলিপিতে দৃশ্যটি দেখা যায়।
রহস্য কোথায়?
উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায়—
‘Babylon
Learned and wise,
Hath perished utterly,
Nor leaves her Speech one word to aid the sigh
That would lament her.’
অষ্টাদশ শতাব্দীর এ কবিতায় ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এ উদ্যান নেবুচাঁদনেজার তার স্ত্রী এমিটিসের জন্য তৈরি করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান থেকে অন্যান্য সপ্তাশ্চর্যের পার্থক্য হলো স্থাপনার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যায়নি। কবিতায় যেমনটি বলা হয়েছে—no Babylonian text mentions them.
শামুকের খোল
আব্বাসীয় খলিফা আল মোতাওয়াক্কিলের শাসনামলে ৮৫১ সালে পবিত্র সামারা মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এটি টাইগ্রিস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ছিল। তখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল সামারা। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বেলেপাথরের তৈরি এ মসজিদের মিনার হালাকু খানের বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। মিনারটি ‘মালইয়া’ নামে পরিচিত শামুকের খোলসের মতো সর্পিল নকশায় তৈরি। মসজিদে আগতদের মিনারের ৫২ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় আরোহণ করার জায়গা ছিল। কিন্তু স্থাপনাটি নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল না। তবে স্থাপত্য হিসেবে এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ইসলামী নিদর্শন হিসেবে প্রভাবশালী।
প্রাচীন নৌকা
নাবিকদের দাঁড় টানা নৌকার দূরে রেখে ইঞ্জিনচালিত নৌকা টাইগ্রিসের বাগদাদে পৌঁছে যেত। অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে আব্বাসীয় খলিফা এখানে রাজধানী স্থাপন করেন, যা দশম শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহরে পরিণত হয়। এর মূলে ছিল টাইগ্রিসের পানির অবাধ চলাচল। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের বুকে কুফার নামে চার কোণাকৃতির নৌকার ব্যবহার হরহামেশাই হতো। হেরোডোটাস এমন ঢালের মতো গোলাকার নৌযান দেখে বেশ অভিভূত হয়েছিলেন।
বাগদাদের বন্যা
পানির এমন অবাধ চলাচলে দুঃখ বয়ে আনত। পারস্যের ক্ষুদ্রকায় এ বাগদাদে বন্যায় ভোগান্তি দেখা যেত। কেউ কেউ শুষ্ক স্থানে উঠে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করত। অন্যরা বন্যার মোকাবেলা করত। ১২৫৮ সালের দিকে এ শহর হোলেগু খানের দ্বারা পদদলিত হয়। খালবিল ও সেচ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরবর্তী সময়ে পুনঃসংস্কার হলেও শহরটি অরক্ষিত থেকে যায়। ২০১৫ সালের বন্যায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
অভিশপ্ত নগর
টাইগ্রিস নদী বয়ে গেছে ১২ হাজার বছর পুরনো হাসানকেফ শহরের মধ্য দিয়ে। এককালে এ নগর ছিল রোম ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের সীমান্ত। ইংরেজ পর্যটক ও কূটনীতিবিদ গারট্রুড বেল মেসোপটেমিয়া অঞ্চল সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানতেন। তার এ জ্ঞান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটাতেও সহায়ক হয়েছিল। এ নগর বর্তমানে তুরস্কের অংশ।
জলশক্তি
বহুবিদ্যায় পারদর্শী পারস্যের ইসলাম আর জাযারি তার Ingenious Mechanical Devices of 1206 বইয়ে ১০০টি আবিষ্কৃত মেশিনের বর্ণনা দিয়েছেন, যার অধিকাংশই ছিল পানি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ ও গিয়ারের যন্ত্র অন্যতম। দামেস্কে এর ব্যবহার হয়। বলতে গেলে বিশ্বের প্রথম পানি ব্যবস্থাপনার ওপর প্রথম যন্ত্র। জলবিদ্যুৎ তৈরিতে আল জাযারি গাধাকে ব্যবহার করে গিয়ারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় গেট তৈরির আসল পরিকল্পনা করেছিলেন।
রেইজ গ্রিফিথস: হিস্ট্রি টুডের লেখক
যে মুহূর্তে কোনো একজন রাগী মানুষ পাথর না ছুড়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেছেন সে, ক্ষণকেই সিগমুন্ড ফ্রয়েড সভ্যতার সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এমন কোনো ঘটনা টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীসংলগ্ন উর্বর সমতল ভূমিতে হয়েছিল কিনা, তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ‘দুই নদীর (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস) মধ্যবর্তী অঞ্চল’ ছিল মেসোপটেমিয়া, যা অধুনা ইরাকের অধিকাংশ স্থানজুড়ে বিস্তৃত।





