১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের মারা গেলে তার উপরাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতকে অনেকেই অস্থায়ী বিকল্প ভেবেছিলেন। নাসের জনপ্রিয় নেতা হলেও সাদাতকে শুরুতে মিসরীয়রা অদক্ষ মনে করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ হিসেবে মিসরের উত্থানে সাদাতের প্রভাব ছিল ব্যাপক। তাকে শুধু রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চ্যালেঞ্জই নিতে হয়নি, পাশাপাশি নাসের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আরো সমস্যা নিয়েও কাজ করতে হয়েছিল।

সাদাতের সময়কার একটি প্রধান সমস্যা ছিল মিসরের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট। তিনি মিসরের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য বড় দায় চাপিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর। সাদাতের কমিউনিজমের প্রতি ভরসার অভাব প্রকাশ পায় যখন তিনি নাসেরের সময়ের দুই শক্তিশালী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও কারাবন্দি করেন। কর্মকর্তাদ্বয় ছিলেন শারাওয়ে গোমা (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) এবং সাদাতের আরেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলি সাবরি, যারা সোভিয়েতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

নতুন পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে সাদাত সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগ নেন। তার মতে, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পরাজয়ের পর পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের জন্য আরবদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং মিসরের প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। অর্থনৈতিক সংকট ছিল সেই সমস্যা থেকে উত্তরণের একটি দিক।

সাদাতের সামনে আরো এক বড় প্রতিবন্ধক ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে গোলান হাইটস ও সিনাই পেনিনসুলা দখল করে ইসরায়েল নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল। সাদাত এসব দিকে এগোনোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে ইসরায়েলকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাইছিলেন। ১৯৭২ সালের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রথম সোভিয়েত সফরের সময় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানানো হয়। সাদাত এ সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের কাছে এক ধরনের আত্মসমর্পণ হিসেবে ধরে নিয়ে এর বিরোধিতা করেন। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন, সিনাই পুনরুদ্ধার এবং মিসরের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যগুলো সম্পূর্ণ অর্জন করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গড়ে উঠবে তা সাদাত জানতেন।

ছয়দিনের যুদ্ধ বা তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে মিসরের বিমান বাহিনীর ৮৫ শতাংশ এবং স্থলবাহিনীর ৮০ শতাংশ ইসরায়েলের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই এ যুদ্ধের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের প্রশংসা করার সময় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অনুসরণ করা অ্যান্টন-হেনরি জমিনির (Antoine-Henri Jomini’s principles of war) যুদ্ধ কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ইসরায়েলকে হারাতে তাই মিসরের প্রয়োজন ছিল ভিন্ন কোনো কৌশল। তবে ১৯৭৩ সালের চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ও মিসরের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। তাই ১৯৭২ সালে সাদাত যখন পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তাব করেছিলেন তখন অনেক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করেছিলেন।

কিন্তু যুদ্ধে না জিতলেও ইসরায়েলের অপ্রতিরোধ্যতার মিথ তো ভাঙতে হবে। মিসরীয় বাহিনীর দুর্বলতার কথা ভেবে সাদাত একটি সীমিত আকারের যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন, যাতে ইসরায়েল পরাজিত না হলেও বেশ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে। তার আশা ছিল, ইসরায়েলি বাহিনীর ক্ষতি করার মাধ্যমে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করা যাবে। তিনি দক্ষিণে মিসরীয় বাহিনী এবং উত্তরে সিরিয়ার বাহিনীর মাধ্যমে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করেন। তার বিশ্বাস ছিল সিরিয়ার সঙ্গে জোট গড়ার মাধ্যমে ইসরায়েলকে শক্ত প্রতিরোধের মুখে ফেলা সম্ভব।

ভারী ক্ষয়ক্ষতি করার পাশাপাশি মিসরীয় বাহিনী সিনাই উপত্যকা যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে এমনটাও সাদাত ভেবেছিলেন। সাদাত বলেছিলেন, ‘যদি আমরা সিনাইয়ের ৪ ইঞ্চি অংশও (মানে এক পায়ের ছাপ পড়বে এমন অংশ) পুনরুদ্ধার করে শক্তভাবে ঘাঁটি গাড়তে পারি, তাহলে পুরো বিশ্বের পরিস্থিতি বদলে যাবে।’

নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলের তিনটি দুর্বলতা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। সেগুলো হলো গোয়েন্দা তথ্য, বিমান বাহিনী ও স্থলবাহিনী।

প্রথম লক্ষ্য ছিল গোয়েন্দা বাহিনীর দুর্বলতা খুঁজে বের করা

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল তাদের দুর্দান্ত গোয়েন্দা বাহিনীর কল্যাণে জয়ী হয়েছিল। গোয়েন্দা বিভাগ আরবদের পরিকল্পনা, সক্ষমতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে আগেই অনেক তথ্য জানতে পেরেছিল। এ সফলতা আইডিএফের মাঝে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ফলে তারা এক রকম নিশ্চিত ছিল যে পরবর্তী যেকোনো যুদ্ধের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আরবদের আক্রমণ সম্পর্কে জানা যাবে। এ ভুল ধারণা ১৯৭৩-এর যুদ্ধে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন তারা সময়মতো সেনা মোবিলাইজ করতে ব্যর্থ হয়।

সাদাত ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার জন্য নিজের আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি প্রথমে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা করেন যে মিসর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। এছাড়া ইউরোপীয় একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি জানান, তিনি অক্টোবর ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘে যাবেন। কারণ সাদাত জানতেন সেই মন্ত্রী ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে এ খবর পৌঁছে দেবেন। এর মাঝে মে মাসে আনোয়ার সাদাত মিসরের সেনাবাহিনী মোবিলাইজ করে ইসরায়েলকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, যদিও তখন কোনো যুদ্ধ হয়নি। তারপর আগস্টে সাদাত একই কাজ করলে ইসরায়েল আবারো বিভ্রান্ত হয় ও নিজেদের সেনা মোবিলাইজ করে। এরপর যখন সাদাত অক্টোবরে আবার একই পদক্ষেপ নেন, তখন ইসরায়েল সেনা মোবিলাইজ করেনি। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে দায়ান এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘সাদাত আমাকে দুবার এটি করতে বাধ্য করেছেন, প্রতিবার ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তাই যখন তৃতীয়বার এটি ঘটল আমি ভেবেছিলাম সে হয়তো সিরিয়াস নয়।’ ইসরায়েলের গোয়েন্দা বিভাগও তখন জানিয়েছিল যুদ্ধের সম্ভাবনা কম এবং সঠিক তারিখও তারা নিশ্চিত ছিল না।

১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েল সুয়েজ খালের পূর্ব পাশে বালির স্তূপ ও বার-লেভ নামের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা লাইন স্থাপন করেছিল। মিসরের গোয়েন্দা বিভাগ এ লাইন ভাঙতে চমকপ্রদ সমাধান খুঁজে বের করে, তা হলো পানির পাম্প। ৬০০ পাউন্ড বিস্ফোরক এবং একটি বুলডোজার দিয়ে ১ হাজার ৫০০ ঘনমিটার বালি পরিষ্কার করতে যেখানে ৫-৬ ঘণ্টা লাগত, সেখানে পানির পাম্পের সাহায্যে ২-৩ ঘণ্টায় সমপরিমাণ বালি সরিয়ে ফেলা যেত।

দ্বিতীয় বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল ইসরায়েলি বিমান বাহিনী

মিসরের বিপরীতে ইসরায়েলের যুদ্ধকৌশল ছিল আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার ওপর। তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের অর্ধেকের বেশি খরচ হতো বিমান বাহিনীর পেছনে। এ কারণে ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, মিসর বড় আক্রমণ চালাবে আকাশপথে শক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষত ১৯৬৭ সালের অভিজ্ঞতা থেকে তারা শিখেছিল, মরুভূমিতে আক্রমণ করা প্রায় আত্মহত্যার সমান। আকাশপথে ইসরায়েলকে চ্যালেঞ্জ করতে মিসর নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল SAM-2, SAM-3, SAM-6, SAM-7 এবং ZSU-23-4। দুজন কূটনীতিককে বহিষ্কার করার পরও সোভিয়েতদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে সাদাত বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন আগেই।

ইসরায়েলের স্থলবাহিনীর দুর্বলতা ছিল সাদাতের তৃতীয় লক্ষ্য

১৯৬৭ সালে জয়ের পর ইসরায়েল প্রধানত ট্যাংকভিত্তিক বাহিনী তৈরি করেছিল, যেখানে আর্মড ব্রিগেডগুলো ট্যাংক নিয়ে গঠিত ছিল। তাদের বাজেটের অনেকাংশই ট্যাংক ও আর্মারে ব্যয় করার পাশাপাশি তারা যুদ্ধকৌশলও পরিবর্তন করে ফেলে। একাধিক ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডকে ট্যাংক ইউনিটে পরিণত করা হয়। মিসর এ দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং সোভিয়েত অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল যেমন স্যাগার এবং RPG-7 ব্যবহার করে, যা ইসরায়েলের আর্মড ইউনিটগুলো প্রতিরোধে সক্ষম ছিল না।

১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর শুরু হয় চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। যুদ্ধটি ইয়ম কিপুরের যুদ্ধ নামেও পরিচিত। প্রায় ১৯ দিনব্যাপী এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভোর সাড়ে ৪টায় ইসরায়েলি গোয়েন্দারা আক্রমণের পূর্বাভাস দিয়ে জানান, ওইদিন বিকাল ৬টার দিকে মিসর আর সিরিয়া যৌথভাবে আক্রমণে যাচ্ছে। গোয়েন্দারা শুধু যে ৪৮ ঘণ্টা আগে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয় তা-ই নয়, তারা আক্রমণের সময়ও ভুল ধারণা করেছিল। আসল আক্রমণ শুরু হয় বেলা ২টায়। তখনো ইসরায়েলি রিজার্ভ বাহিনী ও সেনারা তৈরি হচ্ছিল এবং আক্রমণ ঠেকাতে তারা প্রস্তুত ছিল না।

sinai_war

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ছবি: স্ট্র্যাটেজি ব্রিজ

অন্যদিকে মিসরের পরিকল্পনার প্রায় প্রতিটি দিক ছিল সুচারু ও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত। সাদাত তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘ইসরায়েল ছয়দিনের যুদ্ধের কথা বলে বড়াই করত, এখন আমরা ৬ ঘণ্টার যুদ্ধের গল্প বলতে পারি।’ আক্রমণটি ইসরায়েল প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে হতবাক করে দেয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের প্রথম দুই-তিনদিন কেবল কিছু সাহসী তরুণ ছাড়া আমাদের এবং বিপর্যয়ের মাঝে কিছু ছিল না।’

ইহুদিদের পবিত্র ইয়ম কিপুরের দিন মিসর ও সিরিয়ার জোট সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা করে। এ সময় রমজান মাস চলছিল। মিসরীয় ও সিরিয়ান সেনারা যুদ্ধবিরতি রেখা ভেদ করে যথাক্রমে সিনাই উপদ্বীপ ও গোলান মালভূমিতে ঢুকে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই যুদ্ধে নিজ নিজ মিত্রদের সহায়তা করার ফলে দেশ দুটির মাঝে দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা ঘটে।

সাদাতের উদ্দেশ্য দ্বিতীয় দিনে বাস্তবায়ন হতে শুরু করে। ইসরায়েলের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি অনেক সেনাও হতাহত হয়। দ্বিতীয় দিন সকালে একটি ট্যাংক ব্রিগেড জানায়, তাদের ট্যাংকের সংখ্যা ১০০ থেকে ২৩-এ কমে গেছে। জেনারেল অ্যারিয়েল শ্যারন বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলি সেনাদের মুখাবয়বে ভয় নয় বরং বিস্ময়ের ছাপ দেখেছিলেন। মোশে দায়ান ৭ অক্টোবরকে তার রিপোর্টে ‘শেষ বিচারের দিন’ এবং ‘তৃতীয় কমনওয়েলথের পতন’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। যুদ্ধের তৃতীয় দিনে ইসরায়েলি পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর মিসরীয় ও সিরীয়দের কৌশলগত অর্জন সফলতার মুখে পৌঁছে যায়। অনেক ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক ১৯৭৩ সালের ৮ অক্টোবরকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ দিন হিসেবে বিবেচনা করেন।

যুদ্ধবিরতি রেখা অতিক্রমের পর মিসরীয় সেনারা সিনাই উপদ্বীপের দিকে যাত্রা করে। তিনদিন পর ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর অধিকাংশের চেষ্টায় মিসরীয় বাহিনীকে থামানো সম্ভব হয়। অন্যদিকে সিরীয়রা প্রথমদিকে ইসরায়েলি অধিকৃত অঞ্চলে সাফল্য লাভ করলেও তিনদিনের মধ্যে ইসরায়েলিরা সিরীয়দের আগের নির্ধারিত যুদ্ধবিরতি রেখার বাইরে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়। এরপর ইসরায়েল সিরিয়ার অভ্যন্তরে চারদিনব্যপী পাল্টা আক্রমণ চালায়। এক সপ্তাহের মধ্যে আইডিএফ দামেস্কের উপকণ্ঠে গোলাবর্ষণ শুরু করে। আনোয়ার সাদাত তখন সিনাইয়ের কিছু অংশ দখল করার লক্ষ্যে মিসরীয়দের পুনরায় আক্রমণের নির্দেশ দেন। তবে এ আক্রমণ ইসরায়েল শক্তভাবে প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ করে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে কায়রোর দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া শুরু করে।

২৪ অক্টোবর নাগাদ ইসরায়েল নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয় এবং মিসরের থার্ড আর্মি ও সুয়েজ শহর ঘিরে ফেলতে সক্ষম হয়। যুদ্ধের এ অবস্থায় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তাদের মধ্যস্থতায় ২৫ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে যুদ্ধ সমাপ্ত হয়।

চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ কিন্তু শুধু মিসরীয় বাহিনীর রণকৌশলের ফলে সমাপ্ত হয়নি। যতই প্রতিরোধ গড়ে তুলুক না কেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মিসরের ক্ষতিই বেশি হতো। যুদ্ধে ইসরায়েল সুয়েজ শহর ঘেরাও করার পাশাপাশি সিরিয়ার ২০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু সাদাত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির পুনর্গঠন করার উদ্দেশ্য অর্জনে সক্ষম হন। যুদ্ধে ২ হাজার ৮০০-এরও বেশি ইসরায়েলি মারা যায় এবং ৭ হাজার ৫০০ জন আহত হয়। ইসরায়েলের মতো স্বল্প জনসংখ্যার দেশের জন্য এ পরিসংখ্যান ছিল বিপুল, আনুপাতিক হিসাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনদের ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে যা প্রায় চার গুণ। এছাড়া ১৯৭৩ সালের আগে আইডিএফ সদস্যদের মাঝে যুদ্ধের ফলে হওয়া মানসিক রোগের সংখ্যা খুবই কম ছিল, যা পরে অনেকাংশে বেড়ে যায়।

সাদাত গোপনে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছিলেন। যুদ্ধের সময় সাদাত তাদের সমর্থন লাভ করেন, যার ফলে ১৭ অক্টোবর তেলের দাম ৭০ শতাংশ বেড়ে যায়। মিসরীয় ও সিরীয় সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আরব দেশগুলো একযোগে ঘোষণা করে, ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখল করা অঞ্চলগুলো ছেড়ে না দেয়া পর্যন্ত তারা প্রতি মাসে ৫ শতাংশ তেল উৎপাদন কমাবে। ১৯ অক্টোবর সৌদি আরব আরো এক ধাপ এগিয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তারা কারণ হিসেবে বলে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন কংগ্রেসের কাছে ইসরায়েলের জন্য ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চেয়েছেন।

এ অর্থনৈতিক চাপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে সাহায্য করে, যার ফলে ২২ অক্টোবর ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেয়া হয়।

সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত বিষয় ছিল সম্ভবত যুদ্ধের পর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। দেশটির নিয়মানুযায়ী সব নাগরিককেই সেনাবাহিনীর হয়ে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে সব ইসরায়েলি পরিবারই যুদ্ধের প্রভাব টের পায়। দেশজুড়ে ইসরায়েলের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহিতা চেয়ে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। জনতার দাবির মুখে সরকার তদন্তের উদ্যোগ নেয়, যার দায়িত্ব পায় আগ্রানাত কমিশন। তদন্তে যুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমানকে দায়ী করা হয়েছিল। গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন দায়িত্বশীলকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া কমিশন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীরও সমালোচনা করে কারণ তাদের কাছে সিরিয়া ও মিসরীয় বাহিনীর সামর্থ্য মোকাবেলা করার বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যেকোনো আকস্মিক আক্রমণে এ রকম পরিকল্পনাহীন বাহিনীর ব্যর্থতাই স্বাভাবিক।

অনেক সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে দায় দেয়া হলেও কমিশন রাজনীতিবিদদের অভিযুক্ত না করায় দেশজুড়ে জনরোষ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ইসরায়েলির মতে কমিশন এ বিশাল ভুলের জন্য ঢাল হিসেবে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করেছে, যেখানে দোষ ছিল মূলত গোল্ডা মেয়ার ও মোশে দায়ানের। এ অস্থিরতা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে এবং মেয়ারের লেবার পার্টি ১৯৭৩-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলেও সিনেটে আগের চেয়ে ছয়টি আসন কম লাভ করে। জনগণের ক্ষোভের কারণে মেয়ার ১৯৭৪ সালের ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৭ সালের পরবর্তী নির্বাচনে মেনাচেম বেগিন ও লিকুদ পার্টি জয়ী হয়। ফলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলে আসা লেবার পার্টির দীর্ঘ সময়ের শাসনামলের অবসান ঘটে।

ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর রাজনীতিতে আনোয়ার সাদাতের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলাফল ছিল দীর্ঘমেয়াদি। ইসরায়েল যুদ্ধক্ষেত্রে সফল হলেও তারা আর সামরিক শক্তি দিয়ে আরব দেশগুলোকে একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি তখন শান্তি চুক্তির দিকে অগ্রসর হয়। লিকুদ পার্টি ক্ষমতা লাভের পর ১৯৭৮ সালে ঐতিহাসিক ক্যাম্পডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ চুক্তির ফলে ইসরায়েল মিসরকে সিনাই উপদ্বীপ ফিরিয়ে দেয় এবং প্রথমবারের মতো কোনো আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদান করে। এছাড়া চুক্তির মাধ্যমে মিসর সোভিয়েত ইউনিয়নবলয়ের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসে।

ফাহাদ হৃদয়: প্রতিবেদক, বণিক বার্তা