আনোয়ার সাদাত ছিলেন মিসরের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি। তবে তাকে অনেকেই একনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেন। পৃথিবীর আরো অনেক একনায়কের মতোই পরিণতি হয়েছিল তার। ক্ষমতার চূড়ায় থেকে তিনিও হয়তো নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করে বসেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। তাকেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করা হয়। এদিন ছিল বার্ষিক বিজয় মিছিল। কায়রোয় অপারেশন বদর উদযাপন করার সময় তাকে হত্যা করে মিসরীয় ইসলামিক জিহাদপন্থীরা।

সাদাতের জীবন ফিকশনের মতোই। উত্থান, জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা ও তারপর পতন। অবশ্য পতনের আগেও অনেক কিছু ছিল। সাদাত ছিলেন একজন নেতা। তিনি দেশের মানুষকে প্রভাবিত করেছেন। সেই সঙ্গে আনোয়ারের ক্ষমতার বলয় প্রভাবিত করেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনকেও। ১৯৭৮ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। একা না, তার সঙ্গে পুরস্কৃত হয়েছিলেন ইসরায়েলেরে প্রধানমন্ত্রী মেনাহেন বেগিন। এর মধ্য থেকেই এসেছিল ১৯৭৯ সালের মিসর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি। সেখান থেকেই এক ধরনের প্রতিবাদ ও অসন্তোষের সূচনা।

মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের এ চুক্তি আরব বিশ্বে বিতর্ক তোলে। বিশেষত আরব লিগে এ নিয়ে সমালোচনা হয়। আনোয়ার সাদাতকে নিয়ে সে সময়ই আরব বিশ্বে তৈরি হয় নানা দ্বিমত। ধারণা করা হয়, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিই তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। আর হত্যাও করা হয় এক বিশেষ দিনে।

১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর। আট বছর আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিসরের সর্বশেষ যুদ্ধের বার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছিল কায়রোয়। সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের জন্য উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। দিনটির কথা স্পষ্ট স্মরণ করতে পারেন আনোয়ারের স্ত্রী জেহান সাদাত। বিবিসির লুই হিডালগোর সঙ্গে কথোপকথনে সেদিনের কথা বলেছিলেন জেহান।

জেহান সাদাত বলেন, ‘তার কাছে খুবই প্রিয় একটা দিন ছিল। দিনটিকে নিয়ে সে গর্ব করত। আমি সেদিন তাকে বুলেটপ্রুফ বর্ম পরতে বললাম। কিন্তু সে আমার কথা শুনল না। সে বলল, ‘‘বুলেট তো আমার মাথায়ও লাগতে পারে। তাহলে কি আমাকে মাথায়ও কিছু পরতে হবে?’’ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তার যেন কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। (নিরাপত্তার জন্য) কোনো কিছু না পরেই সে চলে গেল।’

আনোয়ার সাদাতের নিরাপত্তা নিয়ে জেহান সবসময়ই চিন্তিত ছিলেন। যেদিন ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেন সাদাত, সেদিন থেকেই স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল জেহান সাদাতের মধ্যে। মনের মধ্যে ক্যু গাইছিল যে তার স্বামীকে হত্যা করা হবে।

স্বাভাবিকভাবেই সেদিন ছিল সামরিক কুচকাওয়াজ। এর এক পর্যায়ে আকাশে বিমান বাহিনীর মহড়া শুরু হয়। সবার দৃষ্টি যখন সেদিকেই ছিল। তখনই মঞ্চের কাছে বিস্ফোরণ হয় দুটি গ্রেনেড। সঙ্গে সঙ্গে দুটি সামরিক যান থেকে একদল সৈনিক লাফ দিয়ে নামল। কালাশনিকভ অটোমেটিক রাইফেল থেকে গুলি করতে করতে তারা প্রেসিডেন্টের দিকে দৌড়ে গেল।

কোনো সিনেমার দৃশ্য না, একদম বাস্তব। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসে। একনায়কদের দিকে বন্দুক তাক করে এগিয়ে গেছে তারই দেশের সেনাবাহিনী। নিজের বাড়িতে বা সার্কিট হাউজে গুলিবিদ্ধ দেহ পড়ে থেকেছে তাদের।

আনোয়ার সাদাতের পাশাপাশি মারা যেতে পারতেন জেহানও। সে সময়টা স্মরণ করে জেহান বলেন, ‘আমার দেহরক্ষী আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। কারণ জানালা দিয়ে গুলি আসছিল। সে আসলে আমার জীবন বাঁচিয়েছিল।’

3333

আলেকজান্দ্রিয়ার বাসভবনে স্ত্রীর সঙ্গে আনোয়ার সাদাত ছবি: বিবিসি

জেহানের জন্য দিনটা সহজে ভোলার মতো না। কুচকাওয়াজের জবাব দেয়ার জন্য সাদাত যখন উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন, সেই শেষবার স্বামীকে দেখেন জেহান। তিনি বলেন, ‘কুচকাওয়াজের সময় সাদাত ভেবেছিলেন, সৈন্যরা তাকে স্যালুট জানাতে আসছে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলেন ওরা তাকে হত্যা করতে আসছে।’

মৃত্যুর সময় আনোয়ার সাদাতের বয়স ৬২ বছর। আর জেহান সাদাতের বয়স ছিল ৪৬ বছর।

জেহানের সঙ্গে আনোয়ারের দেখার বিষয়টিও আগ্রহজাগানিয়া। জেহান তার ১৫তম জন্মদিনে প্রথম আনোয়ার সাদাতকে দেখেন। আনোয়ার সাদাত তখন ছিলেন মিসর সেনাবাহিনীর এক তরুণ অফিসার। সহকর্মী বন্ধু জামাল আবদেল নাসেরের মতো তিনিও জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তারা।

ব্রিটিশবিরোধিতার কারণে জেলে যেতে হয়েছিল আনোয়ারকে। জেল থেকে বের হওয়ার পরই জেহানের সঙ্গে তার দেখা হয়। সে কথা স্মরণ করে জেহান বলেন, ‘জেল থেকে বেরিয়ে সে সোজা চলে এসেছিল এক চাচাতো বোনের স্বামীর বাসায়। তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তার সঙ্গে সেখানেই আমার প্রথম দেখা হয়। আমার ১৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সে যোগ দিয়েছিল।’

পুরনো সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে পড়ে আরো অনেক কিছু। আনোয়ারের সঙ্গে কী ধরনের কথা হয়েছিল তা নিয়ে জেহান বলেন, ‘(সাদাত) আমাকে বলছিল, ‘‘আমার কাছে কোনো টাকা নেই, দেয়ার মতো কোনো উপহার নেই। আমি শুধু তোমাকে একটা গান শোনাতে পারি।’’ এ কথা বলে সে গান গাইতে শুরু করল।’

আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে জেহানের বিয়ে হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৭০ সালে মারা যান মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের। নাসেরের মৃত্যুর পর আনোয়ার সাদাতই হন মিসরের প্রেসিডেন্ট।

বেশকিছু ঘটনা তখন একত্রে চলছিল। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব (মূলত পরাজয়) কাটিয়ে উঠতে পারেনি মিসর। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে আনোয়ার সাদাত আবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। যুদ্ধে মিসর জিততে পারেনি, তবে এতে তাদের পরাজয়ও হয়নি।

যুদ্ধের পর আনোয়ার সাদাতের জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর সাদাত নিজেই নিজের জনপ্রিয়তার বিপরীতে কাজ করেন। ১৯৭৭ সালে আনোয়ার সাদাত শুধু ইসরায়েলকেই স্বীকৃতি দিলেন না, তিনি ঘোষণা করলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার জন্য তিনি জেরুজালেমে যাবেন।

আজও মানুষ বিশ্বাস করে, এ কারণেই সবার বিরাগভাজন হন আনোয়ার এবং তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু আনোয়ার সাদাতের মাথায় কী ছিল বা তিনি কী ভাবছিলেন। সে সময়ের কথা স্মরণ করে জেহান বলেন, ‘তিনি যখন পার্লামেন্টে এ ঘোষণা দেন তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না। যখন ফিরলাম, দেখি আমার ছোট মেয়ে আমার জন্য বসে আছে। আমার মেয়ে বলল, ‘‘মা, মা, তুমি কি শুনেছ বাবা কী বলেছে? আমি তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।’’ আমি ওপরে গেলাম। দেখি সে (সাদাত) বসে আছে খুবই শান্ত ভঙ্গিতে। আমি বললাম, ‘‘আনোয়ার, তুমি কি বুঝতে পারছ, তুমি সব আরব নেতার সমর্থন হারাবে?’’ সে বলল, ‘‘হ্যাঁ, আমি জানি।’’ সে জানত এ সিদ্ধান্ত খুবই বিপজ্জনক। জানত, এটা একটা কঠিন সিদ্ধান্ত এবং এটা পুরো আরব বিশ্বের মানুষকে একটা বড় ধাক্কা দেবে। কিন্তু ওর ধারণা ছিল, একটা সময়ে গিয়ে মানুষ বুঝতে পারবে, সে কী করেছে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে চেয়েছিল আনোয়ার।’

আনোয়ার সাদাতের এ সিদ্ধান্তের পর পরই বিক্ষোভ শুরু হয়। সবাই মোটামুটি তার বিরুদ্ধেই ছিল। জেহানের ভাষায়, আমাদের চারপাশের সবাই, সব বন্ধুবান্ধব, সবাই তাকে বললেন, ‘আপনি এ কাজ করবেন না। এটা বিপদ ডেকে আনবে। অনেক সাংঘাতিক ঝুঁকি আছে এ কাজে। আপনি জীবন হারাতে পারেন।’

কিন্তু আনোয়ার সাদাত কাজটি করার ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কোনো বাধা মানতে চাননি। জেহানও বুঝেছিলেন তার স্বামী কাজটি করেই ছাড়বেন।

১৯৭৭ সালের নভেম্বরে আনোয়ার সাদাত ইসরায়েল সফরে যান। যাওয়ার আগে জেহানের সঙ্গে দারুণ সময় কাটিয়েছিলেন আনোয়ার। জেহান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ইসরায়েল রওনা হওয়ার আগে আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম। একসঙ্গে অনেক ছবি তুললাম। আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা যেন শেষবারের মতো একসঙ্গে ছবি তুলছি। তাকে নিয়ে হেলিকপ্টার যখন আকাশে উড়ল, আমি একেবারে ভেঙে পড়লাম। আমি, আমার ছেলেমেয়ে, আমরা সবাই কাঁদছিলাম। আমাদের মনে হচ্ছিল, তাকে আমরা আর ফিরে পাব না।’

কিন্তু আনোয়ার সাদাত ফিরেছিলেন। এর ১৮ মাস পর ১৯৭৯ সালের মার্চে মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি চুক্তিতে সই করেন তিনি। এর মাধ্যমে আনোয়ার হলেন ইসরায়েলের সঙ্গে এ রকম কোনো চুক্তি করা প্রথম আরব নেতা।

নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় আনোয়ারকে। কিন্তু শঙ্কা কেবল বাড়ছিল। জেহান বলেন, ‘প্রতিটা সময়, প্রতিটা দিন, প্রতিটা মিনিট যখন সে বাইরে যেত, কোনো কাজে, কোনো সভায়, আমার মনে হতো, সে বোধহয় আর ফিরে আসবে না।’

আনোয়ার সাদাত নিজেও তা জানতেন। মৃত্যুর এক মাস আগের কথা স্মরণ করেন জেহান। বলেন, ‘একদিন আমরা হাঁটছিলাম। তখন সে আমাকে বলছিল, ‘‌‘‌আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমার মনে হচ্ছে আমি আল্লাহর দেখা পাব।’’ আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমার স্বামী কোনোদিন এভাবে মৃত্যুর কথা বলেনি। আমি তাকে বললাম, ‘‘আনোয়ার, কখন তুমি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে, সেটা তো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।’’ ও জবাব দিল, আমি জানি জেহান, আমি জানি।’

ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তির বিনিময়ে আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলের কাছ থেকে মিসরের সিনাই উপত্যকা ফেরত পেয়েছিলেন। এজন্য তাকে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছিল। মিসরের অনেক মানুষই তা মেনে নিতে পারেনি। তারা মনে করছিল, সিনাই ফেরত পেতে আনোয়ার সাদাত অনেক চড়া মূল্য দিয়েছেন।

এরপর সব চলছিল পুরনো নিয়মে। মিসরে অস্থিরতা দেখা দেয়। সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। সে কারণে আনোয়ার সাদাতও নিয়েছিলেন কঠোর অবস্থান। তার শত শত বিরোধীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন।

সেদিনের কথা আরো স্পষ্ট উল্লেখ করা যায়। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর। সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের সময় একটা ট্রাক থেকে লাফ দিয়ে নামল চারজন সেনা অফিসার। প্রেসিডেন্টের দিকে তারা গুলি চালাল, গ্রেনেড ছুড়ে মারল। হামলায় গুরুতর আহত প্রেসিডেন্ট সাদাতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

পরবর্তী সময়ের প্রসঙ্গে জেহান বলেন, ‘আমি হাসপাতালে গেলাম। বহু মানুষ হাসপাতাল ভর্তি। আমি হাসপাতালের ওপরের তলায় গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘আপনি এখানে কেন? আপনি কেন আমার স্বামীর পাশে থাকছেন না।’’ উনি আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। আমি তখন বুঝে ফেললাম কী ঘটেছে।’

শেষটা টেনেছেন এভাবে—

আমার জন্য সেটা ছিল খুবই কঠিন একটা দিন। যাকে আমি সারা জীবন ভালোবেসেছি, শুধু সেই স্বামীকে হারিয়েছি বলে নয়। সে শুধু আমার স্বামী ছিল না, সে ছিল আমার সঙ্গী। সেদিন আমার অর্ধেক যেন আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। এরপর আমি কীভাবে এ পৃথিবীতে বাঁচব, আমি বুঝতে পারছিলাম না।

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক