মিসরের ইতিহাসে আনোয়ার সাদাত ক্ষমতায় আসেন নাসের যুগের পরে। আপাতভাবে দুটি ধারাই একনায়কতান্ত্রিক হলেও দেশটির রাজনীতিতে মৌলিক কিছু পরিবর্তন দেখা যায় এ সময়ে। নাসেরের যুগেই একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছিল মিসরে। নবগঠিত এ শ্রেণী রাজনীতিতে তাদের হিস্যা নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠে ক্রমে। তাদের আগ্রহ ছিল সনাতন খোলসের বাইরে গিয়ে আধুনিক মিসর গঠনের। কিন্তু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশই ছিল সে সময়ের সনাতনপন্থীদের হাতে। দুটি ভিন্ন ধারার অভিজাতের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের মধ্যেই স্পষ্ট হতে থাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিমুখ।
মিসরের আধুনিকায়ন যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র সামনে আনে, তা নয়া সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। আকারে বেড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। নয়া এ শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজে ক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তারা ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে নিজেদের হিস্যা বুঝে নিতে সোচ্চার। তাদের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে গিয়ে সাদাত সরকার তাদের সুযোগ সম্প্রসারণ করে। যেকোনো দেশেই গড়ে ওঠা নয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিংবা নয়া অভিজাত শ্রেণীর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রে জায়গা দরকার। তবে মিসরে আনোয়ার সাদাতের আমলে অভিজাতদের মধ্যকার বিরোধ তাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। একদিকে নয়া অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হেঁটেছে উদারনৈতিকতার পথে। অন্যদিকে ছিল রক্ষণশীল ধারা। এ টানাপড়েন পরিস্থিতি মিসরের পরবর্তী ভাগ্য নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা।
আনোয়ার সাদাত নাসেরের থেকে ক্ষমতা পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শাসনের ধারা অব্যাহত রাখেন। ১৯৭১ সালে সাদাত আর আলি সাবরির মধ্যকার যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, তা যতটুকু ক্ষমতার জন্য, ততটাই নীতিগত। সাবরিকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত নাসেরের রেখে যাওয়া একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার নীতিকেই দীর্ঘ করেন। তবে বড় ধরনের বদল আনেন প্রেসিডেন্টের কাজের পরিসীমা ও ক্ষমতায়। সাদাতের চিন্তা ছিল মানুষ না, বিদ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা করা। সেদিক থেকে প্রাথমিকভাবে অভিজাত শ্রেণীর জন্য পলিসি নির্ধারণের পথ সুগম করে দেন। অভিজাতরা যে বিষয়টা বুঝতে পারেননি, তা না। এজন্য সাদাতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তারাও চুপ থেকে উপভোগ করেছে।
নাসেরের ক্ষমতা ছিল ব্যাপক। কিন্তু তিনি অভিজাত শ্রেণীকে অনেকটা চাপে রাখতেন। মূলত এটাই নাসেরের সঙ্গে সাদাতের বড় পার্থক্য। সাদাত মিসরের পরিবর্তন চেয়েছেন, সেটা অভিজাতদের স্বার্থকে কিছুটা বাড়তি জায়গা করে দিয়ে হলেও। যতক্ষণ না প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি অভিজাত শ্রেণীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তবে নিজেকে তুলে নিয়েছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বীর উচ্চতায়। এদিক থেকে তার শাসন ব্যবস্থা যেন হয়ে উঠেছিল প্রেসিডেন্সিয়াল মনার্কি। নাসের আমলে যারা নাসেরের সঙ্গে বিপ্লবের সহযোদ্ধা ছিলেন, সেসব অফিসার নিজস্ব লোক হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাদের মর্যাদা ছিল অন্য মাত্রার। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের একটা অধিকার থাকত। কিন্তু সাদাতের ক্ষেত্রে অভিজাতরা ছিল তার নিজের লোক। তার কোনো বিপ্লবী কমরেড ছিল না, যাদের সামনে আলোচনা করাটা অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া প্রেসিডেন্টের বাইরে কোনো ক্ষমতা কেন্দ্রও ছিল না। অভিজাতদের নিজের লোক মানলেও সাদাত তার সিদ্ধান্তের বড় অংশটাই নিতেন অভিজাতদের সঙ্গে পরামর্শ না করে। বিশেষ করে বিদেশ নীতিতে সাদাত কারো পরামর্শ নেয়ার চেয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতেই পছন্দ করতেন। ফলে তিনি সবার কাছে থেকেও দূরবর্তী নক্ষত্রের মতো ছিলেন। ছিলেন প্রেসিডেন্ট হয়েও সম্রাটের মতো। ১৯৭১ সালে সাবরির বিরুদ্ধে জয়লাভ আনোয়ার সাদাতের হাতে বিশেষ এক ক্ষমতা এনে দেয়। মূলত এর মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতাচর্চাও বৈধতা পায়। ইচ্ছা প্রয়োগ করার ক্ষমতা। সে জোর থেকেই সাদাত কিন্তু অভিজাতদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে নিয়েছিলেন ইনফিতাহ নীতি আর দুর্নীতির ক্ষেত্রেও ছিলেন কিছুটা সহনীয়। ফলে মিসরীয় অভিজাতরা দ্রুত এটা বুঝতে পারে যে তারা এমন সুবিধা আর কোনো নেতার থেকে পাবে না।

আনোয়ার সাদাত ও হোসনি মোবারকের সামনে শপথ পাঠ করছেন মাহের আবাজা ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
আনোয়ার সাদাত তার রাজনৈতিক অবস্থান প্রশ্নাতীত রাখার জন্য অভিজাতদের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করেছেন। যখন বামপন্থীরা প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতীয়মান হলো, তখন সাদাত পূর্ববর্তী নাসের অনুসারী ও সেনা কর্মকর্তাদের ব্যবহার করেছেন। বিষয়টা তাকে আলি সাবরির অনুসারীদের দমন করতেও সহযোগিতা করেছে। পরবর্তী সময়ে সেই একই সাদাত আবার নাসের অনুসারী ও সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমতা থেকে দূরে সরাতে থাকেন। ১৯৭৩ সালের পর সাদাত নতুন গড়ে ওঠা অভিজাতদের সহযোগিতা করতে থাকেন।
সাদাতের ক্ষমতাকাঠামোয় প্রধান পরিবর্তনটা এসেছিল মূলত শীর্ষ অভিজাতদের মধ্যে। শীর্ষ অভিজাত হিসেবে এতদিন ছিল অফিসারদের সংগঠন। ব্যক্তিগত উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রী কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে তারা একটা রাজকীয় দরবারের চেহারা দিয়েছিল মিসরীয় শাসনকাঠামোকে। আনোয়ার সাদাত ১৯৭১ সালের পর তাদের ক্রমে সরিয়ে দিতে থাকেন। বড় একটা অংশ অবসরে চলে যান। যারা পেশায় বসে থাকেন, তাদের দায়িত্ব হয় ক্ষমতাচর্চার জায়গা থেকে দূরে। সাদাতের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন চারজন ব্যক্তি। তাদের তিনজনের সঙ্গেই আবার তার আত্মীয়তার সম্পর্ক। প্রথমজন ওসমান আহমদ ওসমান তৎকালীন মিসরের সবচেয়ে বড় পুঁজিবাদী ও শিল্পপতি। তার পুত্রের সঙ্গে সাদাতের মেয়ের বিয়ে হয়। সাদাতের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রকল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক সিদ্ধান্তে ছিল তার প্রভাব। সাইয়িদ মারেই ও মাহমুদ আবু ওয়াফিয়া দুজনেই পারিবারিকভাবে সাদাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাইয়িদ প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন সাদাত সরকারের আমলে। তিনি ইনফিতাহ নীতির ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে আবু ওয়াফিয়া তার রাজনৈতিক উদারনৈতিক নীতিমালা গ্রহণে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছেন। এ তিনজনের বাইরে আরো একজন ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ, তিনি হোসনি মোবারক। তার ওপর সাদাতের আস্থা ছিল অনেক। এছাড়া শীর্ষ অভিজাতদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন। পেয়েছেন দলের শীর্ষ পদ, রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা কিংবা সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদ।
সাদাত সরকারের ক্ষমতাকাঠামোয় শীর্ষ অভিজাতের পরে অবস্থান করত মধ্যবর্তী অভিজাত শ্রেণী। মধ্যবর্তী অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। তারা তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে যথেষ্ট ক্ষমতাচর্চার সুযোগ পেতেন। এ শ্রেণীতে বড় একটা অংশ ছিল অরাজনৈতিক। তাদের মেয়াদও ছিল অল্প। ফলে এটা অনেকটা অসম্ভব ছিল যে তারা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো টুঁ শব্দ করবেন না। অভিজাতদের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণীটি ছিল বিভিন্ন প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকারি চাকরিজীবী, মিলিটারি কমান্ডার, সংবাদপত্রের সম্পাদক, ধর্মীয় নেতা ও কোনো সিন্ডিকেটের প্রধান। তারা কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে ন্যারেটিভ উৎপাদনেও ভূমিকা রেখেছেন।
অভিজাতদের আদর্শ সাদাতের আমলে একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অভিজাতরা নাসেরের শাসনে অতটা দায়বদ্ধ ছিল না। তবে যেহেতু নতুন অভিজাত শ্রেণী তৈরি হয়ে গিয়েছিল, তাদের পৃথক দাবি ও প্রত্যাশা ছিল। একদিকে ঐতিহ্য ও রক্ষণশীলতার প্রভাব; অন্যদিকে ছিল উদারনৈতিক ও পাশ্চাত্য ধারণা। যেন একটা মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল সময়টা। এত কিছুর পরও বড় অনুঘটক ছিল সামরিক বাহিনী। না হলে তার ক্ষমতা পড়ত ঝুঁকির মুখে। সাদাতের বড় সফলতাগুলোর মধ্যে এটাও একটা। সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ না হারিয়েও তিনি সেনাবাহিনীর অফিসারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে সরাতে পেরেছিলেন। এর আগে নাসের আমলে যেটা অনেকটাই অসম্ভব ছিল। নাসের আমলে প্রশাসনিক অভিজাতরা বাড়তি সুবিধা পেত। সেই প্রশাসনিক অভিজাতদের বড় অংশই ছিল মূলত শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। রাজনৈতিক দিক থেকে তারা খাপ খাইয়ে নিতে পারত। ষাটের দশকে নাসেরের আমলে তারা ছিল সমাজতন্ত্রী। যদিও নাসেরের ওপর তারা যে খুশি ছিল, এমনটা না। ফলে সাদাতের ক্ষমতায় আসার পর তাদের দিক থেকে সে অর্থে কোনো হুমকি আসেনি। সাদাতও নিজের শাসনের বৈধতা নেয়ার জন্য তাদের সমর্থন তালাশ করেছেন। যেহেতু সাদাতের গৃহীত নীতিমালা তাদের অনুকূলে ছিল, ফলে তারা বেশ আগ্রহের সঙ্গেই তা গ্রহণ করেছিলেন। ইনফিতাহের মধ্য দিয়ে তারা নানা ধরনের কর ও শুল্কের বাধা থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ ও প্রতিষ্ঠানের সুযোগ বৃদ্ধিও তাদের জন্য ইতিবাচক প্রমাণিত হয়।
এত কিছুর বাইরে যে চাপ ছিল না, তা না। সাদাতের সরকার দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে বেশি চাপে ছিল। তার ক্ষমতার বৈধতা মূলত অর্জিত হয় অক্টোবর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি আরো উদারনৈতিক পথে হাঁটতে শুরু করেন। আসলে নাসের-পরবর্তী মিসরে একনায়কতান্ত্রিক ধারা সাদাতের সময়েও অক্ষুণ্ন ছিল। তবে সাদাত পরিবর্তন এনেছিলেন ক্ষমতার বিন্যাসে। সাদাত-পূর্ববর্তী জাতীয়তাবাদীদের সরিয়ে নতুন অভিজাতদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে থাকেন। এমনকি এ সূত্র ধরে তিনি মিসরের বিদেশ নীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে পর্যালোচনা করার দিকে হাঁটেন। ভেতরে নানা দ্বন্দ্ব থাকার পরও তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মুখ ফেরালেন। সোভিয়েত সামরিক উপদেষ্টাকে বহিষ্কার করা হলো। মস্কোর সঙ্গে বাড়তে থাকল দূরত্ব; তার জায়গায় তিনি করলেন আমেরিকার সঙ্গে মৈত্রী। তার সামরিক কৌশল ও অর্থনৈতিক নীতিমালা ও সোভিয়েত পরিপন্থী নীতি, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তাকে অনেকের শত্রু বানিয়ে তোলে। ঘরে ও বাইরে নানামুখী প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করে। তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা হয়। সবকিছু শেষ পর্যন্ত সামাল দিতে পারেননি তিনি। তাকে জীবন খোয়াতে হয়। তার পরও এতদিন পরে অনেক রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিক স্বীকার করেন, সাদাত তার সময়ের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন।
আহমেদ দীন রুমি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা








