নীল নদের তীরবর্তী মিত আবুল কুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার সাদাত। শৈশব থেকেই গ্রামীণ পরিবেশ ও তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক এবং কর্মব্যস্ততার আনন্দচিত্র তাকে মাটির কাছাকাছি থাকার ও এ মাটির মানুষের কল্যাণে কিছু একটা করতে প্রেরণা দিত। এ প্রেরণাকে শান দিতেন দাদি। মিসরীয় বীরত্বের নানা গল্প শোনানোর মাধ্যমে শিশু সাদাতের মাঝে তিনি দেশপ্রেমের অনুভূতি সঞ্চার করাতেন। দাদির থেকে শোনা বীর জাহরানের বীরত্বের গল্প কখনই সাদাতের কাছে পুরনো হয়নি। এ গল্প যেন প্রতিবার রক্তে নয়া আন্দোলনের জোগান দিত। বীর জাহরানের ব্রিটিশদের মাথা নত না করা অতঃপর ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে যাওয়ার চিত্র তাকে প্রচণ্ড প্রভাবিত করে। ব্রিটিশদের না দেখেও ছোটবেলায় আনোয়ার সাদাত ব্রিটিশবিরোধী মুজাহিদ বনে যান। গ্রামে কোরআনের শিক্ষা সমাপ্ত করে কায়রোর আল কুব্বাতে চলে আসাটা জীবনের প্রথম বিচ্ছেদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার কাছে নাড়ির টান শহরের সব আলো আর চাকচিক্যের চেয়ে বেশি আনন্দের।

ইসলামিক বেনেভোলেন্ট সোসাইটি স্কুলসহ নানা প্রতিষ্ঠানে মিসরীয় সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের সিলেবাসে তিনি পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি কামাল আতাতুর্ক, অ্যাডলফ হিটলার ও মহাত্মা গান্ধী নিয়ে জানার সুযোগ পেয়েছিলেন, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

বাল্যকাল থেকেই দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তি তাকে এমনভাবে ভাবিয়েছে যে মনে হয় এ ভাবনা ছাড়া তার আর কোনো ভাবনা নেই। শহরের সব সুখ, সহপাঠীদের সব বিলাসিতাকে ছেয়ে যেত তার এ স্বদেশপ্রীতি। ব্রিটিশ আগ্রাসন থেকে নীল নদ ও তার সন্তানদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আনোয়ার সাদাতের জীবনের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়।

মুক্তির জন্য শুধু জ্ঞান নয় বরং শক্তিরও প্রয়োজন এ বোধ থেকে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার স্বপ্ন দেখেন। নানা রকম প্রশাসনিক প্রথার শেকল ভেঙে ১৯৩৬ সালে তিনি মিসরের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে পা দেন। এ একাডেমিতে যোগদান ছিল তার বৈপ্লবিক চেনতার পরিচর্যার এক মহান সুযোগ। এখানে মিসরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত যুবকদের আবাস। দু-একজনকে আলোচনা করার মাধ্যমে আনোয়ার সাদাত তার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতেন। একসময় এ আলোচনা একটা পরিষদে রূপ নেয়। মিসরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, বর্তমান মিসর ও আগামীর মিসর নিয়ে যুবকদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করতেন। তিনি সাধারণত আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত দিতেন না, অফিসারদের নানা প্রশ্নের উত্তরে তিনি তার সিদ্ধান্তকে ছড়িয়ে দিতেন। আলোচনা সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের এক পর্যায়ে আনোয়ার সাদাতের দেখা হয় আরেক ভুবনজয়ী নেতা জামাল আবদেল নাসেরের সঙ্গে। তারা সম্মিলিতভাবে দেশ ও জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনে মেহনত করেন। একই সময় আনোয়ার সাদাত ইখওয়ানুল মুসলিমের (মুসলিম ব্রাদারহুড) সভ্যদের সঙ্গে যোগাযোগ তৎপরতা শুরু করেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আলোচনায় অংশগ্রহণ বিশেষ করে নেতাদের আলোচনা সভায় তিনি উপস্থিত হতেন। একপর্যায়ে তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে নিজের মতাদর্শগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন। রাজনৈতিকভাবে একটি সাধারণ ক্ষেত্র থাকায় সাদাত তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান।

১৯৪২ সালে সাদাতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শাসন কর্তৃক একটি চক্রান্তের অভিযোগ আনা হয়। কারণ তিনি মিসরের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করছিলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। ফলে ব্রিটিশ সরকার তাকে আটক করে এবং কয়েক মাসের জন্য জেলে পাঠায়। জেলে থাকাকালীন নানা ভাষা শেখা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার জন্য পড়াশোনা করেন।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার সৈনিকদের কাছে ফিরে আসেন। আনোয়ার সাদাত মনে করতেন মিসরের বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য শুধু ব্রিটিশ আগ্রাসনই নয় বরং তৎকালীন সরকার, রাষ্ট্রের দুর্নীতি, দরিদ্রতা ও বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীলতাও সমানভাবে দায়ী।

তিনি সেনা অফিসারদের মাঝে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন। এক পর্যায়ে সাদাত ও অফিসারদের মনে রাষ্ট্রের ব্যাপারে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তারা একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী সরকার দরকার বলে মনে করতে থাকেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা আর্থিকভাবে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়। ফলে ব্রিটিশ তাঁবেদারি মিসরের সরকারের অবস্থানও খুব একটা শক্তিশালী ছিল না।

নানাবিধ কারণে ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সেনাবাহিনীর একাংশ দ্বারা গঠিত ‘ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট’ একটি গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এতে তৎকালীন রাজা ফারুক পলায়ন করেন এবং মিসরে রাজতন্ত্রের বিলোপ হয়।

সফল বিপ্লবের পর মিসরের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের লক্ষ্যে মিসরের রাজনৈতিক ইতিহাসের নায়ক জামাল আবদেল নাসের একটি বিশেষ কাউন্সিল গঠন করেন। নিয়মতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর স্বরূপ কেমন হবে এ ব্যাপারে আনোয়ার সাদাতসহ অনেকের সঙ্গে মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও জামাল আবদেল নাসের নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে কায়েম করতে কামিয়াব হন। ১৯৫৩ সালের ১৮ জুন মিসরের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইত্তিহাদিয়া প্যালেসের বাসিন্দা হন। ভূমি সংস্কার ও আরবীয় জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় তার সংলাপ যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল।

নাসেরের শাসনামলে আনোয়ার সাদাত সংসদ সদস্য, সামরিক উপদেষ্টাসহ নানা পদে নিযুক্ত ছিলেন। নীতি ও আদর্শগত জায়গা থেকে সে নিযুক্তি কখনই খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। মতাদর্শগত পার্থক্যে আনোয়ার সাদাত ও জামাল আবদেল নাসেরের সম্পর্কে তিক্ততা বেড়ে যায়। মূলত নাসেরের সমাজতান্ত্রিক নীতি ও আরব জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত ছিল। সাদাত মনে করতেন ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ ও সরকারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্বৈরাচারিতা সৃষ্টি করে।

নাসেরের একনায়কতন্ত্র আর সাদাতের গণতন্ত্রের বিশ্বাস যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে, এটা প্রায়ই ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিত। ১৯৫৪ সালে নাসেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে আনোয়ার সাদাতকে কারাবন্দি করে পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তি দেয়ার মতো ঘটনাও ইতিহাসে আছে। ১৯৬৬ সালে আনোয়ার সাদাতের রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সংশ্লিষ্টতা আছে, এমন অভিযোগ এনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে তিনি মুক্তি পান।

এমন নয় যে তিনি নাসের সরকারের সব কাজের বিরোধিতা করেছেন। দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি কাজে তিনি নাসের সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। যখনই সরকারের কোনো কাজে সততা আর দেশ প্রেম দেখেছেন, তখনই তিনি সেখানে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। আরব-ইসরায়েলের ছয়দিনের যুদ্ধে মিসরের পরাজয় মিসরীয় রাজনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। জনগণের মধ্যে দৃশ্যমান এ ক্ষোভ জামাল আবদেল নাসেরের ভেতর অস্বস্তির জন্ম দেয়। তিনি জনসম্মুখে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ব্যাপক জনসমর্থন ও রাজনৈতিক সভ্যদের অনুরোধে তিনি আবার স্বপদে ফিরে আসেন।

দেশের এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সার্বিক কল্যাণ বিবেচনায় সেনাপতির বেশে রাজনৈতিক ককপিটে হাজির হন বীর জাহরানরূপী আনোয়ার আল সাদাত। তিনি সংকটকালে মিসরের মানুষের মনোবল দৃঢ় রাখতে নাসেরের সঙ্গে কাজ করে যান। মিসরের সামরিক সক্ষমতা ও পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়নের নির্ভরতাও তিনি আলোচনায় তোলেন। নাসের সরকারের প্রতি অনুগত হওয়ার পাশাপাশি আনোয়ার সাদাত নিজেকে কৌশলগতভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন।

১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। জামাল আবদেল নাসের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। উপরাষ্ট্রপতি থাকা আনোয়ার সাদাতের উত্থানের জয়ধ্বনি বাজতে থাকে। মিত আবুল কুমের ছোট্ট সেই শিশু যে বীর যোদ্ধা জাহরান, কামাল আতাতুর্ক বা মহাত্মা গান্ধী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, এ দৃশ্যপটে সে এখন মিসরের রাষ্ট্রপতি।

ইমরান নাফিস: লেখক