মই বেয়ে লুনার মডিউল ঈগল থেকে চাঁদের বুকে নামতে নামতে নিল আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, ‘একজন মানুষের এই একটি পদক্ষেপ হবে মানবজাতির জন্য এক বিরাট অগ্রযাত্রা।’ সেই ছিল চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন আর মানবজাতির সেদিনের প্রমিথিউস ছিলেন নিল আর্মস্ট্রং। সেটা ছিল ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। চাঁদের বুকে নিলের পা ফেলার মাধ্যমে মানুষ চাঁদকে জয় করল। রূপকথার চাঁদ এল মানবের পদতলে। আর এই মাসেই পূর্ণ হচ্ছে এই চন্দ্র বিজয়ের ৫০ বছর। চন্দ্র বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে নাসা অ্যাপোলো মিশনের কন্ট্রোল সেন্টারটিকে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এই সেন্টার থেকেই অ্যাপোলো ১১-এর অভিযান নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালে এই সেন্টারটিকে নাসা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল। তার পর থেকে এখানে আর কোনো কাজ হয়নি। নাসার উদ্যোগে পাঁচ বছর ধরে এই সেন্টারটি সংস্কারের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই বছরের সংস্কার শেষে সাধারণ মানুষের জন্য সেন্টারটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এসব উপলক্ষে জনসন স্পেস সেন্টারের পরিচালক মার্ক গেয়ার বলেছেন, ‘৫০ বছর আগে আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষ চাঁদে যেতে পারে এবং নিরাপদে দুনিয়ায় ফিরতে পারে সেটা প্রমাণ করা আর এখন আমাদের লক্ষ্য বসবাসের জন্য চাঁদে ফিরে যাওয়া।’
অনেক কাল আগে থেকেই চাঁদ বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শক্তিশালী একটি প্রতীক হিসেবে বিরাজ করছে। পুরাণ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, তারিখ নির্ণয়, কৃষিকাজের জন্য বর্ষপঞ্জি তৈরিসহ চাঁদকে মানুষ বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সব প্রেক্ষিত থেকেই ব্যবহার করে আসছে। সেমিওটিকসে চাঁদের প্রতীকমূল্য আছে। ইতিহাসে চাঁদ প্রতীককে ব্যবহারের বিবর্তন দেখা যায়। এখনকার দুনিয়ায় অর্ধচন্দ্র দেখলেই মানুষ সেখানে ইসলামসংক্রান্ত বিষয় খুঁজতে চেষ্টা করে, বিশ শতকের শুরুর ভাগে চাঁদ-তারা ইসলামের প্রতীক হিসেবে দুনিয়াজুড়ে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল; আমেরিকান ভেষজ কসমেটিকস কোম্পানির নাম ‘মুন জুস’, ‘ফ্যাট অ্যান্ড দ্য মুন’ এমনকি তাদের অনেক প্রডাক্টের নাম ও ধারণাও চাঁদের সঙ্গে যুক্ত। সেমিওটিকস বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভেষজ প্রডাক্টের জন্য চাঁদের নাম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উদ্যোক্তারা প্রতীককে ব্যবহারের কার্যকর ভাবনার একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন।
চন্দ্র বিজয়েরও ছিল রাজনৈতিক মাজেজা—ঠাণ্ডা যুদ্ধের সেই কালে চাঁদের বুকে মার্কিন পতাকার ছবিটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রতীকীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে তাদের পতাকা উড়িয়ে জানান দিয়েছিল সামনের দিনগুলোতে শুধু দুনিয়া নয়, মহাশূন্যের নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে যাচ্ছে। চন্দ্র বিজয়ের পেছনের কারিগরদের অন্যতম নাসার প্রকৌশলী ক্রিস ক্রাফট বলেছিলেন, ‘১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি যখন আমাদের চাঁদকে জয় করার কথা বলেছিলেন, তখন সেটা ছিল একেবারে অসম্ভব। কিন্তু আমরা সেটা সম্ভব করেছি, যুক্তরাষ্ট্র সেটা সম্ভব করেছে।’
চাঁদের একটা ঘ্রাণ আছে। চাঁদের বাতাস নেই, কিন্তু সেখানে একটা ঘ্রাণ আছে। অ্যাপোলোর যাত্রীদের দুজন নেমেছিলেন চাঁদের মাটিতে। তারা তাদের লুনার মডিউলে নিয়ে এসেছিলেন চাঁদের ধুলো—গাঢ় ধূসর, সূক্ষ্ম আকারের এবং বেশ আঠালো প্রকৃতির। মডিউলে ফেরার পর নিজের হেলমেট খুলে নিল আর্মস্ট্রং বলে ওঠেন, ‘আমরা কেবিনে একটা নতুন ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম, পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারছিলাম, এটা আমাদের পোশাকে লেগে থাকা এবং নিয়ে আসা চাঁদের ধূলিকণার ঘ্রাণ।’ তার কথায় এটা ‘ভেজা ছাইয়ের গন্ধ’। আর তার কমরেড বাজ অলড্রিনের মনে হয়েছিল এটা ‘বাজি পোড়ানোর পর বাতাসে যে গন্ধ পাওয়া যায় সে রকম’।
পরবর্তী সময়ে যারা চাঁদে গেছেন, তারাও এই ঘ্রাণ পেয়েছেন। অ্যাপোলো ১৭-তে চাঁদে গিয়েছিলেন হ্যারিসন শমিট, তিনি তার দ্বিতীয় মুনওয়াকের পর বলেছিলেন, ‘গন্ধ থেকে মনে হচ্ছিল কে যেন কারবাইন দিয়ে গুলি ছুড়েছে।’ লুনার মডিউলের পাইলট জিম অরউইনকে কেউ এ বিষয়ে কিছু বলেনি। হ্যারিসন কেবিনে ঢুকে তার হেলমেট খোলার পর জিম বলে ওঠেন, ‘অদ্ভুত গন্ধ।’ অ্যাপোলো ১৫-এ তার ক্রুমেট ডেভ স্ক্রট বলেন, ‘হ্যাঁ, আমারও মনে হয় এটা চাঁদের ধুলার গন্ধ। এর আগে কখনো এ অভিজ্ঞতা হয়নি।’
চাঁদের ধুলা ছিল এক রহস্য, ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এ রহস্য নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিল। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিস্ট টমাস গোল্ড নাসাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে চাঁদে ধুলা বহুদিন অক্সিজেনের সংস্পর্শ পায়নি, তাই এ ধুলা রাসায়নিকভাবে দারুণ সক্রিয় থাকতে পারে। তাই বেশি ধুলা লুনার মডিউলের ভেতরে প্রবেশ করলে ভেতরের চাপে এবং অক্সিজেনের সংস্পর্শে আগুন জ্বলে উঠতে পারে, এমনকি বিস্ফোরণও হতে পারে। বলে রাখা ভালো, টমাস গোল্ড চাঁদের অভিযানের আগেই অনুমান করেছিলেন যে চাঁদের জমিন পাউডারের মতো ধুলা দিয়ে ঢাকা থাকবে। তিনি নাসাকে সতর্ক করেছিলেন যে চাঁদের জমিনে ধুলার স্তর এত পুরু হতে পারে যে তাতে লুনার মউিউল এবং নভোচারীরা ডুবে যেতে পারেন। চাঁদে রওনা হওয়ার আগে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনকে এ রকম হাজারো বিষয় নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। চাঁদের ধূলিকণা কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাতে পারে কিনা সেটা চাঁদে পা রেখেই পরীক্ষা করে দেখেছিলেন নিল আর্মস্ট্রং। সবারই জানা আছে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন নিল, পা রেখেই তিনি প্রথমে চাঁদের ধুলোর নমুনা স্পেসস্যুটের পকেটে ভরেন। এরপর লুনার মডিউলে ফিরে তিনি এবং অলড্রিন অ্যাশেন্ট ইঞ্জিনের ওপর সেই চাঁদের ধুলা ছড়িয়ে দেন। এরপর তারা কেবিনে চাপ বাড়াতে শুরু করেন এবং খেয়াল রাখেন সেই ধুলা থেকে কোনো রকম ধূম উদ্গিরণ হচ্ছে কিনা। ‘কোনো রকম ধোঁয়ার লক্ষণ দেখা গেলে আমরা চাপ বাড়ানো বন্ধ করে দিতাম। কিন্তু কিছুই ঘটেনি’—অলড্রিনের মুখ থেকেই এসব কথা জানা যায়। চাঁদের ধুলো এতটাই আঠালো আর বিরক্তিকর যে চাঁদে মাটিতে যে রাতটি আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন লুনার মডিউলে কাটিয়েছিলেন, সে রাতে তারা গ্লাভস ও হেলমেট পরেই ঘুমিয়েছিলেন। কারণ কেবিনে ছড়িয়ে থাকা চাঁদের ধুলো যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরের ভেতরে চলে না যায়।
অদ্ভুত ঘটনা হলো, চাঁদের এই ধুলা কিংবা পাথর পৃথিবীতে আনার পর তার নিজের ঘ্রাণ হারিয়ে ফেলে। দুনিয়ায় এসে চাঁদের ধুলোর এই গন্ধ হারিয়ে ফেলা এখনো এক রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। আর গানপাউডারের সঙ্গে রাসায়নিক গঠনে কোনো মিল না থাকলেও কেন এ রকম ঘ্রাণ, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। অ্যাপোলো ১২-এর কমান্ডার পিট কনরাড বলেছিলেন, ‘আমি কোনোদিন ভুলব না। জীবনে আর কখনো আমি এমন ঘ্রাণ পাইনি।’
১৯৯৯ সাল। বিশ শতকের শেষ বছর। নানা ক্ষেত্রেই এই ঘটনাবহুল শতককে ফিরে দেখার চেষ্টা চলছিল। ইতিহাসবিদ আর্থার শ্লেসেনজার জুনিয়রের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিশ শতকের মানুষের সেরা অর্জনগুলো কী। উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমি ডিএনএ, পেনিসিলিন, কম্পিউটার ও মাইক্রোচিপকে প্রথম দশে রাখব। কারণ এগুলো সভ্যতাকে বদলে দিয়েছে।’ তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরো ৫০০ বছর টিকে থাকে, তাহলে তার অনেক ইতিহাসই হারিয়ে যাবে, অনেকগুলোর রঙ ফিকে হয়ে আসবে। ‘পার্ল হারবার ওয়ার অব দ্য রোজেজের মতো দূরের হয়ে যাবে। এই শতককে আজ থেকে ৫০০ বছর পরও মানুষ স্মরণ করবে শুধু একটি কারণে: এই শতকেই মানুষ মহাকাশে অভিযান শুরু করে।’ আর্থার শ্লেসেনজার বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অ্যাপোলো ১১-এর চাঁদে অবতরণকে।
চাঁদে পা রাখার অভিযান মানুষের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কেন বিস্ময়কর এক অধ্যায় হয়ে থাকবে? সহজ কথায় বলা যায়, মানুষ তার চেষ্টায় রূপকথাকে জয় করে নজরুলের কথায় ‘অসম্ভবের সম্ভবের যুগ’কে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১৯৬১ সালের ২৫ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট চাঁদকে জয় করবে। জাতিকে তিনি কথা দিলেন। অথচ সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে না ছিল স্পেসস্যুট, না কোনো রকেট। ছিল না লঞ্চপ্যাড, কম্পিউটার কিংবা মাইক্রো গ্র্যাভিটি খাদ্য। চাঁদে যাওয়ার পথে স্পেশশিপের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোনো পদ্ধতিও তখন ছিল না। এখানে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, বিষয়টা এমন নয় যে কী দরকার তা নেই এবং চাইলে সেটা জোগাড় করা যাবে। বিষয়টা ছিল এমন যে চাঁদের মাটিতে পা রাখতে কী কী দরকার সেটাই তখন মানুষ জানত না। দরকারি জিনিসের কোনো তালিকা তখন আমেরিকার বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল না, দুনিয়ার কোনো মানুষের কাছেই ছিল না। এমনকি কীভাবে চাঁদের দিকে উড়াল দিতে হবে তাও মানুষের অজানা। চাঁদে পৌঁছতে কতটা পাড়ি দিতে হবে কে জানে তখন! আর সেই অজানা দেশে যদি পৌঁছাও যায় কোনোমতে, ফেরত আসা যাবে কি এই ধরিত্রী মায়ের বুকে? সেখানে নেমেই বা নভোচারীরা কোন পরিস্থিতিতে পড়বেন? দৈত্য-দানো থাকবে নাকি?
অনেক পদার্থবিদ ভাবছিলেন, মাইক্রো গ্র্যাভিটি পরিবেশে গিয়ে মানুষ চিন্তা করার ক্ষমতা হারাতে পারে। গণিতবিদরা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন, অরবিটে কীভাবে দুটি স্পেসক্রাফটকে এক জায়গায় আনা যাবে, সেটা তারা হিসাব করতে পারবেন না। একই সঙ্গে সেগুলোকে একসাথে ফিরিয়ে আনাটাও সম্ভব হবে না। ক্রিস ক্রাফটের কথায়, ‘১৯৬১ সালে যখন কেনেডি আমাদের চাঁদে যাওয়ার কথা বললেন, তখন সেটা ছিল একেবারে অসম্ভব। কিন্তু আমরা এ অভিযান সম্ভব করেছিলাম। আমরা যুক্তরাষ্ট্র এটা সম্ভব করেছিলাম।’
অনেকে বলেন, চাঁদে যাওয়ার আগে অন্তত ১০ হাজার সমস্যার সমাধান করতে হয়েছিল। সব সমস্যাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীদের সমাধান করতে হয়েছিল ১৯৬১ সালের মে থেকে ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ের মধ্যে। কয়েক হাজার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শ্রমিক মিলে একগাদা রহস্য-সমস্যার সমাধান করার পরই কেবল নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রাখতে পেরেছিলেন। এসব সমস্যার অনেকগুলোর ক্ষেত্রে কেমন সমাধান আসতে পারে, সেটাই তখন মানুষের জানা ছিল না।
অ্যাপোলা ১১-এর অভিযানের ফল ছিল বিস্ময়কর। অ্যাপোলো স্পেসক্রাফটের সঙ্গে তৈরি হয়েছিল সে সময়কার সবচেয়ে ছোট, দ্রুতগতির কম্পিউটার। এটি মহাশূন্যেও কাজ করতে পারত এবং নভোচারীদের তাদের শিপ পরিচালনা করতে সাহায্য করে। অবশ্য নভোচারীরা কাগজের নক্ষত্র চার্ট নিয়ে গিয়েছিলেন, যেন তারা সেক্সট্যান্ট ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করতে পারেন, যেমনটা করতেন আঠারো শতকে সাগরে অজানা পথে পা বাড়নো অভিযাত্রীরা। সঙ্গে ছিল কম্পিউটারের নেভিগেশনে মিলিয়ে দেখার সুযোগ। কম্পিউটারের সফটওয়্যারগুলো বিশেষ ধরনের মেশিনের মাধ্যমে নারীরা সেলাই করে দিয়েছিলেন। শুধু সুতার পরিবর্তে ব্যবহূত হয়েছিল তার। অ্যাপোলোর অনেক কাজই হয়েছিল হাতে। প্যারাশুটগুলো হাতে সেলাই করে হাতেই ভাঁজ করা হয়েছিল। অ্যাপোলোর জন্য প্যারাশুট ভাঁজ করা এবং সেগুলোকে ব্যাগে ভরার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স পেয়েছিলেন তিনজন। কাজটি করার জন্য দুনিয়ায় তখন এই তিনজন মানুষই ছিলেন। নাসা তাই তাদের নিয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছিল। তাদের তিনজনের এক গাড়িতে একসঙ্গে চলা নিষিদ্ধ ছিল, যেন দুর্ঘটনায় তারা সবাই একসঙ্গে আহত বা নিহত না হন।
খেয়াল করার বিষয় হলো, চন্দ্র বিজয় কেবল বৈজ্ঞানিক প্রেরণাজাত কোনো ঘটনা ছিল না। এটা ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধের রাজনীতির ফসল। যদিও অর্ধশতক কাটতে না কাটতেই সেসব ঘটনা আবছায়ায় ঢেকে গেছে। মানুষের প্রথম মহাকাশ যাত্রার ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। ভস্তকে-১-এ চেপে মহাকাশে ঘুরে এসেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউরি গ্যাগারিন। এই খাতে পিছিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাই শুরু হয়ে গেল সোভিয়েতকে পিছে ফেলার ভাবনা। একভাবে এটা বলা খুব ভুল হবে না হয়তো যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের এই প্রতিযোগিতাই মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে এর চেয়েও ভাবনা উদ্রেককারী ঘটনা হলো, এই চন্দ্রাভিযানকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এক দশকের রূপান্তর, বাধা, ট্র্যাজেডি পার করতে হয়েছে। এই চন্দ্রাভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষই দ্বিধাবিভক্ত ছিল। অ্যাপোলো-১১-এর যাত্রার আগে সিভিল রাইটস কর্মীরা রেভারেন্ড রালফ অ্যাবারনাথির নেতৃত্বে কেপ কেনেডিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন।
এই বিভক্তি অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাওয়ার মধ্যেই হয়তো আমেরিকান গ্রেট এম্পায়ারের রহস্য লুকিয়ে আছে। কেনেডির কথা ছিল অ্যাপোলো মিশন খুব কঠিন। তারপরও আমরা চাঁদে যেতে চাই। কারণ এটা কঠিন কাজ। এই অভিযান আমাদের শক্তি ও দক্ষতার মাত্রাকে পরীক্ষা করবে এবং সেগুলো সুসংহত হবে।’
চাঁদে মানুষের অবতরণ আমেরিকার আধুনিক পুরাণ। এই মিথের অংশ সিঁড়ি বেয়ে চাঁদের মাটিতে নামতে নামতে একটু দ্বিধাগ্রস্ত নিল আর্মস্ট্রংয়ের বলা একটি বাক্যের অস্পষ্ট অডিও ক্লিপ, দ্যাট’স ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, ওয়ান জায়ান্ট লিপ ফর ম্যানকাইন্ড।
এই জায়ান্ট লিপ ছিল অবিশ্বাস্য এক কর্মযজ্ঞের ফসল, যেমনটা মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি। পারমাণবিক বোমা বানানোর চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষ কাজ করেছিল অ্যাপোলো অভিযানকে বাস্তাবায়ন করতে। ১৯৬১ সালে কেনেডি যখন চাঁদে অভিযানের কথা ঘোষণা করেন, সে বছর নাসা এই অভিযানের প্রোগ্রামে খরচ করেছিল ১০ লাখ ডলার। এর পাঁচ বছর পর নাসা অ্যাপোলো অভিযানের জন্য প্রতিদিন প্রতি ৩ ঘণ্টায় খরচ করছিল ১০ লাখ ডলার। কর্মযজ্ঞের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে এখান থেকেই সহজে ধারণা করা যায়।
আমেরিকানরা খুব আগ্রহ নিয়ে নাসার চন্দ্রাভিযানকে সমর্থন করেননি। অর্ধেক আমেরিকানও চাঁদ জয় করা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। সেটা ছিল ষাটের দশক। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, শহরে দাঙ্গা, গুপ্তহত্যার মতো ঘটনায় আমেরিকার টালমাটাল অবস্থা। দেশটির নাগরিকদের অনেকের কথা ছিল দুনিয়াতেই আমেরিকা তার সমস্যা সামলাতে পারছে না, তো চাঁদে যেতে হবে কেন!
১৯৬৪ সালে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মহাকাশে রাশিয়ার যাত্রাকে অতিক্রম করে আমেরিকার চাঁদের পা রাখা উচিত কিনা। এতে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিয়েছিলেন মাত্র ২৬ শতাংশ মার্কিনি। ১৯৬৮ সালে বড়দিনের সময় অ্যাপোলো ক্যাপসুলে তিনজন নভোচারীকে নাসা চাঁদের উদ্দেশ্যে পাঠায়। এর নাম ছিল অ্যাপোলো ৮। তারা চাঁদের ভূমি থেকে মাত্র ৭০ মাইল উচ্চতায় প্রদক্ষিণ করতে পারে। তারা তাদের জানালা দিয়ে তোলা চাঁদের ভূমির ছবি পাঠায়। এরপর বিল অ্যান্ডারস, জিম লোভেল ও ফ্রাংক বোরম্যান বাইবেলের জেনেসিসের প্রথম ১০ স্তবক পাঠ করেন। এসব টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল এবং সে সময়কার ইতিহাসে সবেচেয়ে বেশি দর্শক টিভি সেটের সামনে জড়ো হয়। কক্ষপথ থেকে অ্যান্ডারস ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত একটি ছবি তুলেছিলেন। মহাশূন্যে চাঁদের ওপর ভেসে থাকা পৃথিবী। এটাই ছিল মহাশূন্য থেকে তোলো পৃথিবীর প্রথম রঙিন ছবি। ছবিটি আর্থরাইজ নামে দুনিয়াজুড়ে খ্যাত।
অ্যাপোলো ৮-এর এই সাফল্যের পরও মার্কিনিরা চাঁদের অভিযান নিয়ে ইতিবাচক ছিলেন না। অ্যাপোলো ৮-এর অভিযানের এক মাস পর চালানো জরিপে দেখা যায়, চাঁদে মানুষ পাঠানোর পক্ষে আছে মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষ আর স্পেস প্রোগ্রামে বছরে ৪০০ কোটি ডলার খরচের বিরোধিতা করেছিল ৫৫ শতাংশ আমেরিকান।
নাসার চাঁদের অভিযানের সমালোচনায় গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা শব্দ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল—মুনডোগল। এ সময় আমেরিকান গণমাধ্যমে মুনডোগল শব্দটি নিয়মিত ব্যবহূত হতো। ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে নাসার চাঁদে অভিযানের খরচ নিয়ে সমালোচনা করে। সেই সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘চাঁদে অভিযানের মোট খরচ দিয়ে হার্ভার্ডের সমান আকারের ৭৫ থেকে ১২০টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা যায় এবং তার পরও কিছু টাকা বেঁচে যাবে।’ সম্পাদকীয় কথার মূলভাবটি ছিল, চাঁদে অবতরণ নাকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাজ্যে একটি করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়?
১৯৬২ সালের শরত্কালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি চাঁদে অভিযানের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন। এ সময় কেনেডি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারা আপেক্ষা করতেন না, তারা বিশ্রাম নিতেন না। এই দেশ সেই মানুষরা জয় করেছিল, যারা সবসময় আগে বাড়েন এবং চাঁদও আমরা জয় করব।’ কিছুদিন পরই সাবেক প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের এক জমায়েতে কেনেডির জোর সমালোচনা করে বলেন, ‘যে মানুষ দেশের প্রতিপত্তি দেখাতে চাঁদে মানুষে পাঠানোর জন্য ৪ হাজার কোটি ডলার খরচ করে সে পাগল।’ ১৬০ জন রিপাবলিকান সদস্য আইজেনহাওয়ারের কথাকে সমর্থন জানান।
অ্যাপোলো ১১-এর চন্দ্রাভিযান মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি আরেকটি বিস্তৃত দিগন্তের উন্মোচন করেছিল। এই অভিযান ডিজিটাল দুনিয়ার ভিত গড়ে দিয়েছিল। নাসাই দুনিয়ায় প্রথম ইন্টিগ্রেটেড কম্পিউটার চিপ ব্যবহার করেছিল। অ্যাপোলো কমান্ড ও লুনার মডিউলের কম্পিউটারে এই চিপ ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী ছাড়া নাসাই ছিল ইন্টিগ্রেটেড চিপের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারকারী। ডিজিটাল দুনিয়ার অন্যতম ভিত্তি মাইক্রোচিপ। নাসার গরজে তৈরি হওয়া নিখুঁত মাইক্রোচিপের কারণেই পরের পাঁচ বছরের মধ্যে চিপের দাম দুনিয়ায় ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
নাসাই ইতিহাসের প্রথম কোনো সংগঠন যে কম্পিউটার চিপের হাতে মানুষের জীবনের দায়িত্ব সমর্পণ করেছিল। যে চিপ মানুষকে নিরাপদে চাঁদে নিয়ে যেতে পেরেছিল, সেটা যে কেমিক্যাল প্লান্ট চালাতে পারবে বা অনেক ডাটা বিশ্লেষণ করে দেবে সেটা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়েছিল।
চাঁদে মানুষের পা রাখার মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী নাসা সেটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছিল। অ্যাপোলো ১১ স্পেসক্রাফটটি ঘণ্টায় ২৪ হাজার মাইল বেগে চাঁদের দিকে ছুটছিল, তার মানে প্রতি সেকেন্ডে ৬ মাইল। অর্থাৎ কোনো হিসাব করার জন্য নভোচারীদের এক মুহূর্ত সময়ও অপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না। আর এত দ্রুত হিসাব করা মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে সম্ভব নয়। এসবই সম্ভব করেছিল নাসার তৈরি কম্পিউটার। অ্যাপোলো ১১: যে নভোযানে চড়ে মাইকেল কলিন্স, নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদে গিয়েছিলেন, সেটা আকারে ছিল বিরাট। কমান্ড ও সার্ভিস মউিউল ও লুনার মউিউল—সব মিলিয়ে মোট দৈর্ঘ ছিল ৫৩ ফুট। কলিন্স যখন কক্ষপথে নিয়ন্ত্রণ নিতে সর্ভিস মডিউলের ইঞ্জিনকে ফায়ার করেন, তখন বড় ইঞ্জিনটা চলেছিল ৩৫৭ দশমিক ৫ সেকেন্ড, উদ্দেশ্য ছিল শিপটাকে ধীর করে দেয়া। তখন চাঁদের কক্ষপথে আরেকটি স্পেসশিপ অপেক্ষা করছিল। এটা দুদিন আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল এবং এটা ছিল আমেরিকানদের প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পেসশিপ। সোভিয়েতের শিপটির নাম ছিল লুনা ১৫। এটা ছিল মানুষবিহীন রোবট নিয়ন্ত্রিত যান। আমেরিকানরা মনে করেন, এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। অ্যাপোলো ১১ দুনিয়া থেকে যাত্রা করেছিল ১৬ জুলাই আর লুনা ১৫ রওনা হয় তার আগেই ১৩ জুলাই। রুশদের কথা ছিল, চাঁদ এবং আশপাশে অনুসন্ধান চালাতে তারা লুনা ১৫-কে পাঠিয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ও নাসার কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল ভিন্ন—তারা অনুমান করছিলেন, এটা রাশিয়ার ‘স্কুপিং’ মিশন—লুনা ১৫-কে ডিজাইন করা হয়েছিল চাঁদে নেমে তার রোবটিক হাত দিয়ে কিছু ধুলো-পাথর তুলে নিয়ে সেগুলোসহ দুনিয়ায় ফিরে আসা এবং দুনিয়াকে দেখানো যে আমেরিকার আগেই আমরা চাঁদ থেকে নমুনা নিয়ে এসেছি।
অ্যাপোলো ১১ যাত্রা করেছিল ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই। চারদিন পর তারা চাঁদে পৌঁছেন। ঈগল নামের লুনার মডিউলে চেপে নিল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে নামেন। তবে কলিন্স কিন্তু কক্ষপথে থেকে ছবি তুলেছেন এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করেছেন।
নাসার উদ্বেগ ছিল, রাশিয়ার লুনা ১৫ অ্যাপোলো ১১-এর সঙ্গে যোগাযোগ কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আমেরিকার মিশন কন্ট্রোলপ্রধান ক্রিস ক্রাফট রাশিয়ার কাছে জানতে চান লুনা ১৫-এর অবস্থান সম্পর্কে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে হোয়াইট হাউজে ট্রেলিগ্রাম করে জানানো হয়, লুনা ১৫-এর অবস্থান পরিবর্তন করা হলে অবশ্যই তারা আমেরিকাকে অবহিত করবে। মানুষের মহাকাশ যাত্রা তখন ১২ বছরে পৌঁছেছিল এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহাকাশ যাত্রা নিয়ে দুটো দেশ নিজেদের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান করল। ক্রাফট সংবাদ সম্মেলন করে জানালেন, অ্যাপোলো ১১ ও লুনা ১৫ পরস্পরের কাছে আসবে না।
লুনা ১৫ যাত্রার পর থেকে অ্যাপোলো ১১-এর মতোই দুনিয়াজুড়ে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। শুরুতে নাসা কোনোভাবেই ঠাহর করতে পারছিল না, লুনা ১৫ কোন কাজে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে যা পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায়, অ্যাপোলো ১১-এর অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে দুনিয়ার সামনে চাঁদে নিজেদের অবস্থানকে দেখাতে লুনা ১৫-কে পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয় আসিফ সিদ্দিকী তার চ্যালেঞ্জ টু অ্যাপোলো গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আসিফ লিখেছেন চাঁদের ভূমির গঠন দেখে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা বিস্মিত হয়েছিলেন এবং শিপের অল্টিমিটার ঠিকঠাক রিডিং দিচ্ছিল না। তাই অবতরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। নিল আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন যখন চাঁদের পা রেখেছিলেন, তখনো লুনা ১৫ চাঁদের চারপাশে চক্কর কাটছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে বসে বিজ্ঞানীরা সেটাকে অবতরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষমেশ চেষ্টা করেও লুনা ১৫ সফল হতে পারেনি। অন্যদিকে আমেরিকার নভোচারী চাঁদের বুকে হেঁটে মার্কিন পতাকা উড়িয়ে দুনিয়ায় নিরাপদে ফিরে এসেছিলেন আর সঙ্গে এনেছিলেন রূপকথার চাঁদের ৪৭ দশমিক ৫ পাউন্ড ধূলিকণা আর পাথর। আর ফেরার আগে তারা চাঁদে মানুষের আগমনের বার্তাটি রেখে এসেছিলেন। তারা চাঁদে রেখে আসা স্মারকে লিখেছিলেন, ‘১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ে পৃথিবী গ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো মানুষ এখানে এসেছে। আমরা পুরো মানবজাতির জন্য শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছি।’
সূত্র: দ্য ফার্স্ট ম্যান অন দ্য মুন, ডেভিড হারল্যান্ড
স্মিথসোনিয়ান






