২১ জুলাই ১৯৬৯ যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ডেইলি নিউজ-এ প্রকাশিত মার্ক ব্লুমের প্রতিবেদনের অংশ দিয়ে শুরু করা যাক—
হিউস্টন, ২০ জুলাই
আজ দুজন চাঁদে অবতরণ করেছেন এবং ২ ঘণ্টার বেশি সময় এত দিনকার নিষিদ্ধ চাঁদের বুকে হাঁটাহাঁটি করেছেন। এলিয়েন বিশ্বে মানুষের প্রথম সশরীর অভিযান।
মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অভিযানে এ দুজন ঠাণ্ডা মাথায় মহাবিশ্বে পৃথিবীর প্রথম ফাঁড়ি (আউটপোস্ট) স্থাপন করেছেন, টেলিভিশনের অবাক দর্শকদের কাছে পাঠিয়েছেন ঠিক তখনকার চাঁদের নৈসর্গিক ছবি।
ঈগল নামের ল্যান্ডিং ক্রাফটের কেবিন থেকে নয় তাকের সিঁড়ি বেয়ে অ্যাপোলো ১১-এর কমান্ডার নিল আর্মস্ট্রং নেমে এলেন। তার ক্যামেরা আপন গ্রহের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য সব ছবি ধারণ করছে। তিনিই চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম মানুষ। তখন নিউইয়র্ক সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিট।
বিস্মিত আর্মস্ট্রং বললেন, মানুষের একটি ছোট পদক্ষেপ মানবজাতির একটি বিশাল লাফ।
১৯ মিনিট পর এডউইন ই অলড্রিন জুনিয়র চাঁদের পিঠে আর্মস্ট্রংয়ের সঙ্গে মিলিত হলেন এবং চিত্কার করে উঠলেন ‘সুন্দর সুন্দর সুন্দর, কী চমত্কার নির্জনতা!’
আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদের পিঠে পদক্ষেপ এবং দুজনের ল্যান্ডিং ক্রাফট ঈগলের কেবিনে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট গবেষণায় অতিবাহিত হয়েছে। এ গবেষণা হয়তো মহাবিশ্বের অনেক গোপন দরজার চাবি খুলে দিতে পারে এবং জানিয়ে দিতে পারে কেমন করে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে।
নভোচারী দুজন ৫০ পাউন্ড চাঁদের পাথর ও মাটি সঙ্গে নেয়ার জন্য সংগ্রহ করলেন। মানুষের আকাশ ভ্রমণের ইতিহাসে এটাই হবে সবচেয়ে মূল্যবান সামগ্রী। অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাসী করেন, যখন এ পাথর নিয়ে গবেষণা সম্পন্ন হবে, তারা সৌরজগতের সৃষ্টির কাহিনী হয়তো উন্মোচন করতে পারবেন।
নভোচারীরা চাঁদের পিঠে থাকা অবস্থায়ই দুটো স্বয়ংক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষণা সম্পন্ন করলেন। এ গবেষণা বহু বছরের পুরনো প্রশ্নের জবাব দেবে—চাঁদ কি পৃথিবীর মতো নিজের ভেতরে সক্রিয়, না পাথরের মতো শীতল, নিথর, নিষ্ক্রিয়?
দুজন চাঁদে আমেরিকার পতাকা পুঁতলেন। এটা চাঁদের সাম্রাজ্য দখলের প্রতীক হিসেবে না বরং কোন দেশ অর্থ ও শক্তি বিনিয়োগ করে অবিশ্বাস্য এ অভিযান পরিচালনা করেছে, তা জানাতে। ২ লাখ ৪০ হাজার মাইল দূরের পৃথিবী থেকে তারা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সনের উষ্ণ টেলিফোন কল পেলেন। তিনি বললেন, তাদের সাফল্য ‘পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের দ্বিগুণ অনুপ্রাণিত করবে।’
চাঁদে পৌঁছায় প্রথম পদক্ষেপে দশক ফুরোনোর আগে চাঁদে পৌঁছে জাতির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু তাদের অবশ্যই পৃথিবীতে ফিরে আসতে হবে; আগামীকাল বেলা ১টা ৫০ মিনিটের জটিল মুহূর্তটি যতই এগিয়ে আসবে, উত্তেজনা ততই বাড়বে। এ সময় ঈগলের ইঞ্জিন অবশ্যই চালু হতে হবে নতুবা অলড্রিন ও আর্মস্ট্রং চাঁদে পরিত্যক্ত হিসেবে রয়ে যাবেন।
সব যদি ঠিক থাকে ঈগল এসে মূল চন্দ্রযানের সঙ্গে মিলিত হবে, যার চালক মাইকেল কলিন্স। তারা মূল যানে প্রবেশ করবেন এবং পৃথিবীর দিকে তাদের যাত্রা শুরু হবে বৃহস্পতিবার অপরাহ্নে। হাওয়াই দ্বীপ থেকে ১ হাজার ২০০ মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরে অ্যাপোলো ১১ পতিত হবে। সেখান থেকে নভোচারীদের উদ্ধার করা হবে।
চাঁদের ধূলিময় পৃষ্ঠদেশ
ল্যান্ডিং ক্রাফট ঈগল থেকে সতর্কভাবে নামার পর আর্মস্ট্রং বললেন, ‘পৃষ্ঠদেশ সূক্ষ্ম ধূলিতে পূর্ণ, মনে হয় যেন কয়লার কণা আমার বুট ঢেকে দিয়েছে... এ ধূলির ওপর আমি আমার বুটের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি।’
লুনার মডিউল মহাকাশে নতুন করে আবর্তন শুরু করার ৬ ঘণ্টা পর আর্মস্ট্রং চাঁদে হাঁটতে শুরু করেন।
শেষ ৩০০ ফুট হাঁটার সময়ে যখন আর্মস্ট্রং দেখলেন কম্পিউটার চালিত ছোট মাকড়শার মতো যান পাথুরে এলাকার দিকে চলে যাচ্ছে, তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে নিলেন।
ঈগল ‘দ্য সি অব ট্র্যাংকুইলিটি’তে নিউইয়র্ক সময় বিকাল ৪টা ১৭ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে অবতরণ করে। পরবর্তী ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে আর্মস্ট্রং হিউস্টন বেসকে বার্তা পাঠালেন: ‘হিউস্টন, ট্র্যাংকুইলিটি বেস থেকে বলছি। ঈগল অবতরণ করেছে।’
রাত ১০টা ৫১ মিনিটে আর্মস্ট্রং ঈগলের কেবিন থেকে বারান্দায় এলেন। তিনি নয় তাকের সিঁড়ির সর্বোচ্চ তাকের কাছে।
আর্মস্ট্রং জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি ঠিক করছি তো?’
অলড্রিন বললেন, ‘চমত্কার। বেশ করছ।’
রাত ১১টা ১৫ মিনিটে আর্মস্ট্রং ধূলির বর্ণনা দিলেন এবং দুই পাউন্ড নমুনা সংগ্রহ করলেন।
সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় অলড্রিন বললেন, আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছি বাইরে থেকে এটাকে যেন আবার তালা না লাগিয়ে দেই।
আর্মস্ট্রং বললেন, ঠিক চিন্তা করেছ।
পৃষ্ঠদেশে পা রেখে বললেন,‘কেমন গুঁড়ো গুঁড়ো—পাউডারি।’
আর্মস্ট্রং বললেন, ‘মজার ব্যাপার।’
অলড্রিন বললেন, ‘পাথরগুলো পিছল?’
আর্মস্ট্রং বললেন, ‘ঘুরে বেড়াতে সমস্যা হবে না। আমরা সিমুলেশনের সময় যেমন করেছিলাম, তার চেয়ে সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে। এখানে হাঁটাহাঁটিতে কোনো সমস্যা হবে না।’
আর্মস্ট্রং লম্বা কদম ফেলে লুনার মডিউল ঈগলের পা ও পায়ের পাতা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করলেন, এখানে ল্যান্ড করাতে কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি।
অলড্রিন বললেন, ‘তুমি যে দিকটায় যাচ্ছ, সেদিকে কাত হওয়ার সময় সতর্ক হতে হবে। তোমার ভরকেন্দ্রের দিকে নজর রেখে পদক্ষেপ দিতে হবে।’
অলড্রিন বলতে থাকেন, ‘আমি তোমাকে বলিনি রক্তবর্ণ, আমি রক্তবর্ণ পাথরের দেখা পাব?’
আর্মস্ট্রং জিজ্ঞেস করেন, ‘পেয়েছ নাকি?’
অলড্রিনের জবাব, ‘হ্যাঁ।’
দুই পাউন্ড নমুনা পাথর সংগ্রহের সময় আর্মস্ট্রং বললেন, গুঁড়ো বালির নিচে শক্ত পৃষ্ঠদেশ রয়েছে বলে তার মনে হচ্ছে। আর যে পদার্থের পৃষ্ঠদেশ, তা ঘন সংলগ্ন।
তিনি মাটির বর্ণনা দিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মরুভূমির বালির মতো এ মাটির একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।
চন্দ্রপৃষ্ঠে পৌঁছার প্রায় আধঘণ্টা পর ১১টা ২৬ মিনিটে আর্মস্ট্রং তাদের চন্দ্র বিজয়ের স্মারক ফলক উন্মোচন করলেন। এ ফলকে তিন নভোচারী ও প্রেসিডেন্ট নিক্সনের স্বাক্ষর রয়েছে।
পতাকা গেঁথে, নমুনা সংগ্রহ করে দুই নভোচারীকে নিয়ে ঈগল যখন কমান্ড ক্রাফট কলম্বিয়ার দিকে রওনা হলো, তখন শুরু হলো আরেক অধ্যায়।
আর্মস্ট্রং বললেন, ঈগলের ডানা আছে।
আরো বললেন, ফুটবল মাঠের সমান একটি গর্তের পাশ দিয়ে ঈগল উড়ে গেছে, চারদিকে বড় বড় পাথর, সতর্ক না হলে সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
চাঁদে পা ফেলা ছিল শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ক্লাইমেক্স। হিউস্টন আর্থ কন্ট্রোল থেকে জানাল, এখন চাঁদ ছেড়ে আসতে হবে।
দীপ্তকণ্ঠে আর্মস্ট্রং বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি রজার।’
আর্থ কন্ট্রোল বলল, দুটি বাহনই (কমান্ড ক্রাফট কলম্বিয়া ও ল্যান্ডিং ক্রাফট ঈগল) চমত্কার অবস্থায় আছে।
নভোচারীরা গতকাল চাঁদের কক্ষপথে ঢোকার পর তখন পর্যন্ত অ্যাপোলো ১১ চাঁদের পেছন দিয়ে ১১ বার আবর্তন করছে। এখন দ্বাদশ আবর্তন শুরু হয়েছে।
চাঁদ ছেড়ে আসার পর বার্তা দিলেন ঈগল চাঁদের বন্দর ত্যাগ করেছে এবং সবকিছু ভালোই মনে হচ্ছে।
১টা ৪৭ মিনিটে বিচ্ছিন্ন হওয়া কলম্বিয়া ও ঈগল আবার মিলিত হতে যাচ্ছে।
প্রথম দিনে খবরের কাগজে সংবাদের এখানেই সমাপ্তি।
নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে শুরু করে ব্রিটেনের বিবিসি পর্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বলে এসেছে নভোচারীরা নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করতে পারলে তবেই অ্যাপোলো ১১ মিশন সফল হয়ে বলা যাবে।
অ্যাপোলো ১১ উেক্ষপণ ও প্রত্যাবর্তন
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের জমিনে তিন হাজার সাংবাদিক, সাত হাজার পদস্থ আমন্ত্রিত ব্যক্তি এবং চারদিকে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটক চোখ মেলে অপেক্ষা করছে। ১৯ জুলাই ১৯৬৯ সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে স্যাটার্ন ফাইভ রকেট অ্যাপোলো ১১ উেক্ষপণ করল। কমান্ড ও সার্ভিস মডিউল (কলম্বিয়ার) শীর্ষে লুনার মডিউল ঈগল সূক্ষ্মভাবে বসানো। তিনদিনের অবিরাম যাত্রার পর ১৯ জুলাই অপরাহ্ন ১টা ২৮ মিনিট (ইস্টার্ন ডেলাইট টাইম) অ্যাপোলো ১১ চাঁদের কক্ষে পৌঁছে। যথাসময়ে লুনার মডিউল কমান্ড মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হলো। ২০ জুলাই চাঁদের দেশে দ্য সি অব ট্র্যাংকুইলিটিতে অবতরণের বর্ণনা আগেই করা হয়েছে। চাঁদ থেকে ফেরা লুনার মডিউল ঈগল ২১ জুলাই কমান্ড মডিউলে সংযুক্ত হলে নভোচারীরা সংগৃহীত নমুনা ছবি ইত্যাদিসহ মূল যানে ফিরে এলেন। ঈগলকে ছেড়ে দেয়া হলো চাঁদের কক্ষপথে। মূল যান কলম্বিয়া পৃথিবীর পথে ছুটল। ২৪ জুলাই হাওয়াইয়ের দক্ষিণ পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করল।
দ্য গ্রেট মুন হোয়াক্স
১৯৬৯-এর জুলাইয়ে শেষ সপ্তাহে মানুষের চাঁদে যাওয়া নিয়ে যেসব গপ্পোসপ্পো ছড়িয়েছে, তাতে বাংলাদেশের বৃহত্তর নোয়াখালীর (তিন খণ্ড হয়েছে ১৯৮৩ সালে) বেশ সম্মানজনক একটি অবস্থান রয়েছে। চাঁদে ২ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করে নিল আর্মস্ট্রং এবং এডউইন অলড্রিন যখন খুব ক্লান্ত, হঠাৎ তাদের চোখে পড়ে একটি চা ও পানবিড়ির দোকান। দোকানদার বিনা পয়সায় তাদের চা ও বিড়ি খাওয়ান। আর্মস্ট্রংই তাকে বলেন, বুঝতে পেরেছি, ভাই সাহেব নোয়াখালী জেলার মানুষ।
অলড্রিন জিজ্ঞেস করেন, মঙ্গল গ্রহেও কি আপনাদের কেউ আছেন নাকি?
আমার জেঠা তবে তিনি মানুষ ভালো নন। সেখানে গেলে পয়সাকড়ি সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে থেকেই মুখে মুখে চালু ছিল যে জার্মান নভোচারীরা অত্যন্ত গোপনে চাঁদে পৌঁছেছেন, সেখানে একটি জার্মান কলোনি স্থাপন করেছেন। তারা রণকৌশল হিসেবে একটি টপ সিক্রেট ফ্যাসিলিটি সেন্টারও স্থাপন করেছেন। সেখানে একটি লুনার আন্ডার গ্রাউন্ড হাইডআউটও তৈরি করে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের মৃত্যু হয়েছে কিংবা সে সময় তিনি আত্মহত্যা করেছেন, এটা যারা বিশ্বাস করেন না, তারা নিশ্চিত ইভা ব্রাউনকে নিয়ে হিটলার চাঁদের হাইডআউটেই আছেন।
অ্যাপোলো ১১ চন্দ্র অভিযানের ১৪৫ বছর আগে জার্মান শল্য চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ ফন গ্রুথুসেন লিখিতভাবে পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের জানিয়েছেন, তার কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি টেলিস্কোপ রয়েছে। এ টেলিস্কোপে চাঁদের ঘূর্ণনের সঙ্গে সংগতি রেখে তাকালে ভেতরের সব কিছু দেখা যায়। চাঁদের কিছু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং একটি দুর্গও তিনি শনাক্ত করেছেন। (এটি জুল ভার্নের কল্পকাহিনী নয়, গ্রুথুসেনের বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ।)
তিনি চাঁদের অধিবাসীদের লুনারিয়ান অ্যাখ্যা দেন।
জার্মান বিজ্ঞানীর দুর্গ দর্শনের ১১ বছর পর ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সুরকার স্যার জন উইলিয়াম হার্শেল জানালেন, তিনি তার শক্তিশালী টেলিস্কোপে নিয়মিত চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তিনি স্পষ্টভাবেই দেখেছেন, চাঁদে একটি বড় ধরনের নির্মাণ প্রকল্পের কাজ হচ্ছে।
তিনি যেসব জীবজন্তু দেখেছেন, তার মধ্যে রয়েছে বাইসন, বড় ছাগল, ইউনিফর্ম, কিছু দ্বিপদ জন্তু (বাইপেডাল)। নিউইয়র্কের দ্য সান (লন্ডনের নয়) পত্রিকায় ২১ আগস্ট ১৮৩৫ সংবাদের শিরোনাম হয় ‘গ্রেট অ্যাস্ট্রনমিক্যাল ডিসকভারি মেইড বাই স্যার জন হার্শেল’। বিস্ময়কর আবিষ্কারের প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে ২৫ আগস্ট ১৮৩৫ থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে। প্রতিবেদক ছিলেন রিচার্ড অ্যাডাম লক।
পরবর্তী সময় বিতর্কিত আবিষ্কারটি যথার্থ নয় বলে প্রতীয়মান হয় এবং প্রতিবেদককে দোষারোপ করা হয়। এডগার অ্যালেন পো দাবি করেন, এসব কথিত আবিষ্কার তার ‘দি আনপ্যারালাল অ্যাডভেঞ্চার অব ওয়ান হ্যানস পিফাল’ থেকে চুরি করা। তার কাহিনীতে ব্যারোন হ্যানস পিফাল গরম বাতাসভর্তি বেলুনে করে চাঁদে যান এবং সেখানে পাঁচ বছর অবস্থান করেন।
জন হার্শেলের কথিত এ আবিষ্কারই ‘দ্য গ্রেট মুন হোয়াক্স’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
জুল ভার্নও তার উপন্যাসে চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছেন, তবে তারা পৌঁছতে পারেননি। মহাকাশের আবহাওয়া পাঠে কিছু ভ্রান্তি হওয়ায় তিনজন নভোচারী নিয়ে স্পেসশিপ কলম্বিয়াড চাঁদে নামতে না পেরে ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বর থেকে চাঁদের কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। কলম্বিয়াডের তিন নভোচারীর নাম মিশেল আরদা, ইম্মে বারবিকান ও ক্যাপ্টেন নিকোল।
আর্মস্ট্রংয়ের চিঠি
মানুষ তো আর প্রতিদিনই চাঁদে যেতে পারছে না। এত বিলিয়ন ডলার আসবেই বা কোত্থেকে? আর্মস্ট্রং আর অলড্রিন যখন সেখানে গেলেনই ঈগলের ল্যান্ডিং সিঁড়ি থেকে বড় জোর ১০০ গজ দূরে গিয়েছেন। কারণটা কী? খবরের কাগজে এ প্রশ্ন রাখেন মিস্টার ক্রুলউইচ। এর জবাব কে জানে?
প্রশ্নটি চাঁদের প্রথম মানুষ আর্মস্ট্রংয়ের চোখে পড়ে এবং বলেন, যারা অ্যাপোলো ১১-এর চন্দ্র অভিযান নিয়ে জানতে আগ্রহী, তাদের সবাই এটা জানতে পারবেন।
চাঁদের মাটিতে পা রাখার পর কী কী করতে হবে সেকেন্ড ও মিনিট ধরে তার পরিকল্পনার অনুলিপি বিতরণ করা হয়েছিল এবং ‘এমনকি নাসা জনসন স্পেস সেন্টারে আমরা প্রেস ও মিডিয়ার সামনে পুরোপুরি ড্রেস রিহার্সেলও করেছিলাম।’ তিনি ক্রুলউইচকে লেখা চিঠিতে আরো যা যা বলেছেন, তার একটি সার সংক্ষেপ—
১. এটা সত্যি আমাদের পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত সতর্ক
২. লুনার মডিউল সিস্টেম, আমাদের স্পেস-স্যুট এবং চাঁদের আবহাওয়ায় এসবের সমন্বয় নিয়ে অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল।
৩. চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর। এ উত্তাপের বিরুদ্ধে আমাদের সুরক্ষিত থাকতে হয়েছে।
৪. সেখানকার মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, এর সঙ্গে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৫. নাসা কর্মকর্তারা আমাদের হাঁটাহাঁটির সময় সীমিত করে দেন যেন হাইপারথার্মিয়ায় (শরীরে স্বাভাবিক উত্তাপ অত্যন্ত বেশি বেড়ে যাওয়া) আমাদের মৃত্যু না ঘটে।
৬. যখন বলা হয় আমরা তো সেখানে গিয়েছিই—এটা আমাকে ষোড়শ শতকের রাজাদের কথা মনে করিয়ে দেয়—আমাদের আর নিউ ওয়ার্ল্ডে যাওয়ার কি দরকার, সেখানে তো আমরা গিয়েছি, কিংবা ১৮০৩ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন যেমন বলেছেন, ‘মিসিসিপির পশ্চিমে আমাদের যাওয়ার দরকার নেই, লিইউস এবং ক্লার্ক-অভিযাত্রীরা তো সেখানে গিয়েছেনই। এটা সত্য আমরা সামান্যই দেখেছি। চাঁদের ১৪ মিলিয়ন বর্গমাইল এলাকা তো এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।’
অর্থাৎ বাকি কাজগুলো করবে আগামী দিনের অভিযাত্রীরা।
মানুষের চাঁদে অবতরণ: আপনি কি বিশ্বাস করেন?
১৯৬৯-এ টেলিভিশন কিনতে হলে ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেটই ছিল আদর্শ স্থান। টেলিভিশন মানে অবশ্যই সাদা-কালো। টেলিভিশনে চাঁদে অবতরণ লাইভ দেখা যাবে শুনে মধ্যবিত্তরা সঞ্চিত অর্থ নিয়ে টেলিভিশনের দোকানে ছোটে। সে সময় এ দূরদর্শন যন্ত্রটির হাহাকার পড়ে যায়।
আমার পিতৃস্থানীয় একজন ধর্মপ্রাণ অভিভাবক চন্দ্র অভিযানের পুরো বিষয়টিকে ধর্মবিরোধী এবং ইহুদি-নাসারা চক্রের একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করেছেন এবং আমাদের শুনিয়ে বলেছেন, এমন নাফরমানি কাজ সহ্য করা হবে না। চাঁদের ১০০ মাইলের ভেতর প্রবেশ করলেই অ্যাপোলো গায়েবি রশ্মিতে ভস্মীভূত হয়ে যাবে। চাঁদের পবিত্র মাটিতে মানুষের পা পড়ার প্রশ্নই আসে না।
তার পরও যখন জানা গেল আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন নামের দুজন চাঁদের মাটিতে হাঁটাহাঁটি করেছেন। আমার আত্মীয়কে আশ্বস্ত করি, তারা চাঁদের পবিত্র মাটিতে খালি পা রাখার সাহসই পাননি। স্পেস স্যু পরা ছিলেন। মাটিতে স্পেস স্যু’র ছোঁয়া লেগে থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীর মতো বলে উঠলেন, ‘বোগাস, সব বোগাস। কে বলেছে চাঁদে গিয়েছে। চাঁদে যাওয়া মানুষের কাজ নয়। মানুষকে ধোঁকা দিয়ে তারা ককেশাস পর্বতের ওপর নেমে সেখান থেকে পাথর তুলে নিয়ে এসেছে।’ আমি সেই প্রথম ককেশাস পর্বতের নাম শুনি, পরে জানতে পারি এ পর্বতমালার বড় অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে। সাদাকালো টেলিভিশনে যারা মানুষের চাঁদে অবতরণ দেখেছেন, তাদেরও কেউ কেউ বলেছেন, বোগাস, সব বোগাস।
আমার সেই বর্ষীয়ান আত্মীয়ের মতো খোদ আমেরিকার ধর্মপ্রাণ মানুষদেরও কেউ কেউ বলেছেন এটা ‘মুন ল্যান্ডিং হোয়াক্স’ অর্থাৎ চাঁদে অবতরণের ভাওতা।
২০১৯-এ চাঁদে অবতরণের ৫০ বছর পূর্তির উৎসব বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই হচ্ছে। ৩০ বছর পূর্তির সময় ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ যে চাঁদে গেছে, এটা শতকরা ৬ ভাগ উত্তরদাতা আদৌ বিশ্বাস করেন না। কিন্তু আরো প্রায় কুড়ি বছর পরের একটি সমীক্ষা জানিয়েছে উত্তরদাতা ব্রিটিশদের ২০ ভাগ, আমেরিকানদের ২০ ভাগ এবং রুশদের ৩০ ভাগ মনে করেন পুরো ব্যাপারটাই ফেক, বানোয়াট।
তাদের কেউ কেউ বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন— মহাকাশের ভ্যান এলেন রেডিয়েশন বেল্ট’ ভেদ করে যাওয়া কখনো সম্ভব নয়। স্পেসশিপের বাইরে অ্যালুমিনিয়ামের আস্তরণ থাকার পর বিকীর্ণ উত্তাপে নভোচারীরা একেবারে সিদ্ধ আলু হয়ে যাবেন।
যেখানে আমেরিকানদের কেউ কেউ চাঁদের মাটিতে পা রাখার তাদের দেশীয় সাফল্যকে সন্দেহের চোখে দেখছেন, আমার বাংলাদেশী বর্ষীয়ান আত্মীয় তো সন্দেহ প্রকাশ করবেনই।
অ্যাপোলো মিশন ১৯৬৩-১৯৭২
কল্পকাহিনীতে যা-ই থাকুক চাঁদ সৃষ্টির ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বছর পর অ্যাপোলো ১১ মিশন মানুষকে চন্দ্রপৃষ্ঠে নামাতে সক্ষম হয়। চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল।
অ্যাপোলো মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দশক ফুরোনোর আগেই মানুষকে চাঁদে পাঠিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। অ্যাপোলোর ছয়টি মিশন (অ্যাপোলো ১১, ১২, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭) লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়েছে। অ্যাপোলো ৭ থেকে ১০কে বলা যায় টেকনিক্যাল মিশন— চাঁদের কক্ষে প্রবেশ, ঘূর্ণন, কমান্ড ও লুনার মডিউল টেস্ট। যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়ায় অ্যাপোলো ১৩ চাঁদে অবতরণ করতে পারেনি।
দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অ্যাপোলো ১-এ। ২৭ জানুয়ারি ১৯৬৭ কেপ কেনেডি থেকে উেক্ষপণের সময়ই ভস্মীভূত হয়। তিনজন নভোচারীর তাত্ক্ষণিক মৃত্যু হয়।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭২ সর্বশেষ অ্যাপোলো ১৭ উেক্ষপণ করা হয়, ১১ ডিসেম্বর চাঁদে অবতরণ করে এবং ১৯ ডিসেম্বর পৃথিবীতে ফিরে আসে।
যে ১২ জন চাঁদে হেঁটেছেন
১. নিল অলডেন আর্মস্ট্রং (অ্যাপোলো ১১)
২. এডউইন ‘বাজ’ অলড্রিন (অ্যাপোলো ১১)
৩. চার্লস ‘পিট’ কনরাড (অ্যাপোলো ১২)
৪. এলান এল বিন (অ্যাপোলো ১২)
৫. এলান শেপার্ড (অ্যাপোলো ১৪)
৬. এডগার ডি মিচেল (অ্যাপোলো ১৪)
৭. ডেভিড র্যানডলফ স্কট (অ্যাপোলো ১৫)
৮. জেমস বি আরভিন (অ্যাপোলো ১৫)
৯. জন ওয়াটস ইয়ং (অ্যাপোলো ১৬)
১০. চার্লস এম ডিউক জুনিয়র (অ্যাপোলো ১৬)
১১. হ্যারিসন ‘জ্যাক’ স্মিথ (অ্যাপোলো ১৭)
১২. ইউজিন ই কারনান (অ্যাপোলো ১৭)
যে ১২ জন কাছে গিয়েও হাঁটতে পারেননি..
১২ জন নভোচারী চন্দ্রপৃষ্ঠে ০.০০১ লুনার ডিসটেন্সের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও চাঁদে হাঁটার সুযোগ পাননি। ছয়টি সফল অভিযানের মূল নভোযানে ছয়জন চালক, চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করা অ্যাপোলো ৮ ও অ্যাপোলো ১০ খেয়াযান।
১. ফ্রাংক বোরম্যান (অ্যাপোলো ৮)
২. জিম লোভেল (অ্যাপোলো ৮)
৩. বিল অ্যান্ডার্স (অ্যাপোলো ৮)
৪. টম স্ট্যাফোর্ড (অ্যাপোলো ১০)
৫. জন ইয়ং (অ্যাপোলো ১০)
৬. ইউজিন কারনান (অ্যাপোলো ১০)
৭. মাইকেল কলিন্স (অ্যাপোলো ১১)
৮. ডিক গর্ডন (অ্যাপোলো ১২)
৯. জিম লোভেল (অ্যাপোলো ১৩)
১০. জ্যাক সুইগার্ট (অ্যাপোলো ১৩)
১১. ফ্রেড হেইসি (অ্যাপোলো ১৩)
১২. স্টু রোসা (অ্যাপোলো ১৪)
১৩. আল অরডেন (অ্যাপোলো ১৪)
১৪. কেন মেটিং লি (অ্যাপোলো ১৬)
১৫. বন এভান্স (অ্যাপোলো ১৭)
(এখানে জিম লোভেলের নাম দুবার এসেছে এবং ইউজিন কারনান পরে চাঁদে অবতরণ করেছেন। সুতরাং খুব কাছাকাছি গিয়েও অবতরণ করা হয়নি ১২ জনের।)
২৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো ১ কেপ কেনেডি স্পেস স্টেশন থেকে উেক্ষপণের সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে যে তিনজন নভোচারী মৃত্যুবরণ করেন, তারা হচ্ছেন—
১. ভার্জিল গ্রিসম
২. এডওয়ার্ড এইচ হোয়াইট
৩. রোজার বি শাফি
অ্যাপোলো ১১ মিশনের চারটি পাদটীকা
১. নভোচারীরা বীমার পদ্ধতিগত কারণে জীবন বীমা করতে পারেননি। তারা তাদের ফটোগ্রাফ সই করে পরিবারের কাছে রেখে যান। দুর্ঘটনা ঘটলে ফটো নিলামে তুলে যেন কিছু অর্থ পাওয়া যায়।
২. যদি চাঁদে আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিনকে আত্মহত্যা করতে হতো, সেক্ষেত্রে তা অবহিত করার জন্য একটি বক্তৃতা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল।
৩. নভোচারীদের শুল্ক বিভাগের কাছে ঘোষণা দিতে হয় যে তারা চাঁদের পাথর এনেছেন।
৪. অ্যাপোলো ১১তে আনা চাঁদের পাথর চুরি হওয়ার পর যে বিছানায় রাখা হয়েছিল, সেখানে বান্ধবীর সঙ্গে যৌন সঙ্গমের অপরাধে নাসার ইন্টার্ন থাড রবার্টসের ছয় বছর কারাদণ্ড হয়।






