কেন পার্দি। অনুবাদ: শওকত হোসেন

জেমস বন্ডের বইগুলো নেহাতই ষাটের ট্রেন্ড হয়েও থাকে যদি তো সেগুলো বহু ট্রেন্ডকে পিছে ফেলে আসা ট্রেন্ডই বটে। কোনো কাল্পনিক অ্যাডভেঞ্চার নায়কের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি থেকে শুরু করে দুনিয়াজোড়া লাখ লাখ পাঠককে (এবং পরে আরো কয়েক লাখ চলচ্চিত্রামোদি) আচ্ছন্ন করে রাখার ব্যাপারটা জেমস বন্ডের স্রষ্টাকে এমনি মৃদু ও যন্ত্রণাহীন দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে কারণ হিসেবে যথেষ্ট বলেই মনে হয়।

অবশ্য আরো কিছু কারণ এ সাক্ষাৎকারকে অনুরণন জুগিয়েছে। এটা ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জ্যামাইকার নিজ বাড়িতে এক অলস বিকালে রামের গেলাসে চুমুক দেয়ার সময় বর্ণনা দেয়া হারিয়ে যাওয়া এক জীবনযাত্রার—উপনিবেশবাদীর সূর্য তাদের রাজত্বে পুরোপুরি ডোবার আগে সুবিধাভোগী উপনিবেশবাদীর অবশেষ—পর্যালোচনাও। এটা পরবর্তী বছরগুলোয় আভিজাত্য এবং নৈপুণ্যের সঙ্গে অটোমোবাইলের ওপর লিখে প্লেবয় পাঠকদের ভীষণ প্রিয় হয়ে ওঠা কেন পার্দির নেয়া একমাত্র সাক্ষাৎকারও। সবশেষে ৫৬ বছর বয়সে হূদযন্ত্রের আক্রমণে ফ্লেমিংয়ের অকালমৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে এ সাক্ষাৎকারটি ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে বেরোনোর এবং সে কারণে অনেকটা শেষ জবানবন্দি বলে মনে হলে এটি এক ধরনের তীব্রতা পেয়ে যায়।

এডগার অ্যালান পো দ্য মার্ডার্স ইন দ্য রু মর্গ-এর মাধ্যমে আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনী আবিষ্কারের পর এ ধারার নিপুণ চর্চাকারীরা বিশাল পাঠকগোষ্ঠী এবং বিপুল বিত্তবৈভবের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। এ মিছিলে অতুলনীয় সিক্রেট এজেন্ট জেমস বন্ডের স্রষ্টা পরলোকগত ইয়ান ফ্লেমিং দীর্ঘকাল একটি জ্বলজ্বলে অবস্থান ধরে রাখবেন। তার প্রকাশকরা ১২ বছরে তার ১২টি বইয়ের ৩০ মিলিয়ন কপি (দু-এক মিলিয়ন এদিক-ওদিক হতে পারে) বিক্রি করেছেন। হংকং থেকে হেলসিংকি পর্যন্ত দুনিয়ার অল্প কিছু শিক্ষিত সমাজই আছে, যেখানে আজ তার রচনা পড়া হচ্ছে না। এমনকি যারা স্রেফ ইদ্দিশ বা সিয়ামিজ ভাষা পড়তে জানেন, তাদেরও তার সাহিত্যিক সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ নেই...। কিছুদিন ধরেই তার দীর্ঘ জীবনের ক্ষীণ সম্ভাবনার কথা তিনি জানতেন। তবু হার্ট অ্যাটাকের শুরু থেকে ক্যান্টারবারির এক হাসপাতালে মৃত্যুর মাঝের ৪ ঘণ্টায় তাকে আলাদা করে তোলা নাগরিক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে পেরেছিলেন: ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নেয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স অ্যাটেন্ডেন্টকে বলেছিলেন, ওদের ঝামেলায় ফেলে দেয়ায় তিনি দুঃখিত। তার শ্রেণীর বেশির ভাগ ইংরেজই বলতেন এমন কিছু, এক অর্থে বাঁধা বুলি, কিন্তু এটা আবার রীতিমতো জেমস বন্ডীয় কেতারও। কোনো সন্দেহ নেই যে তার নিজের চরিত্র এবং যে চরিত্রটি তিনি সৃষ্ট করেছেন, সেটি ফ্লেমিংয়ের মনে ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল।

তার বিশাল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও কিংবা সম্ভবত অংশত এ কারণেই সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান ফ্লেমিংয়ের জীবদ্দশায় তার দিকে তেমন নজর দেয়নি এবং মৃত্যুর পরও ততটা নয়। মোটামুটিভাবে তার গুরুত্বসংক্রান্ত তাদের রায় অপ্রতুল প্রমাণিত হতে পারে। কারণ এখনো হয়তো তার লেখা পড়া হচ্ছে, কিন্তু এ মুহূর্তে কিছুটা বনেদি ঔপন্যাসিকরা বিস্মৃত হয়ে গেছেন। মৌলিক দর্শন ছিল তার: তিনি একজন উদ্ভাবক ছিলেন। তার মূল উপকরণ, নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেয়া এবং কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য পটভূমিতে বিন্যস্ত ভীষণ অবিশ্বাস্য কাহিনী দারুণ উপভোগ্য ছিল এবং অনেকে তাকে অদ্ভুতভাবে স্থবির চরিত্র ভাবলেও তার ভয়ংকর, অটল এবং অজেয় নায়ক খুব সম্ভব এই শতকের সন্তান যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি আগামীর।

মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস আগেই ফ্লেমিং একটি বিশদ ও বিশেষ সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে আমাদের অনুরোধে সায় দিয়েছিলেন। আমাদের সাক্ষাৎকারগ্রহীতা তাদের দেখা হওয়া সম্পর্কে বলেছেন:

‘আমাকে তিনি তার ফ্লিট স্ট্রিট ও ইন্স অব কোর্টের মাঝের একটা গলি, বলা চলে ব্রিটিশ আইন ও সাংবাদিকতার জগতের মাঝামাঝি একটা জায়গা, মিট্রে কোর্টের অফিস থেকে দুপুরের খাবারের জন্য তুলে নিতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। রিসিপশন রুমে রাজত্ব করছিলেন একজন প্রীতিকর ও প্রশান্ত মহিলা, বন্ডের বইগুলোর এমের মিস মানিপেনির চেয়ে ভিন্ন নয় তার হাবভাব। আমাকে তার, মদলাল পর্দা আর কার্পেটে বিছানো প্রশান্তভাবে জাঁকালো ইনার অফিসে নিয়ে গেলেন তিনি: নিখুঁতভাবে স্তূপ করা গ্যালি প্রুফ ও গিল্ট করা ফ্রেমের আয়না, তামার পেনহোল্ডার, অ্যাশট্রে, সিগারেট লাইটার ও রক্তলাল লেটার বক্সে সাজানো একটা স্টাডি। দরজার পেছনের হুকে ঝুলছিল একটা কালো হোমবার্গ হ্যাট, একটা শক্ত করে আটকানো ছাতা ও গাঢ় নীল বারবারি রেইনকোট।

‘আমি ভেতরে ঢুকতেই আমাকে চেয়ারের কাছে নিয়ে যেতে একটা বিশাল চামড়ার গদিমোড়া ডেস্কের পেছন থেকে উঠে দাঁড়ান ফ্লেমিং—দীর্ঘদেহী, ছিপছিপে গড়নের মানুষ, প্রায় লালচে ভাব, একটা নেভি ব্লু রঙের লক্ষণীয় একমাত্র বৈচিত্র্যের টিপিক্যাল ব্রিটিশ ছাঁটের স্যুট পরেছেন: হাতার কাফগুলো; হালকা নীল শার্ট ও অবহেলাভরে চার্চিলীয় শিথিলতার সঙ্গে নট বাঁধা সাদা-কালো পলকা ডটের টাই। কুশল বিনিময় করলাম আমরা। তিনি ছিলেন সৌজন্যময়, আমোদিত ও ব্যঙ্গময়, কিন্তু তার উদারতা ঠিকই টের পাওয়া গেছে। অন্যদের চেয়ে বেশি করে ইংরেজ ভদ্রলোক তার হাবভাব, মনোভাব ও কথায় জীবনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং এসব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল যে কেউ ফ্লেমিংকে নিমেষে—এবং নির্ভুলভাবে—ইটন বা স্যান্ডহার্স্ট, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থ, সরকারি চাকরি, বিশ্ব ভ্রমণ, সামাজিক নিশ্চয়তার কাতারেই ফেলবেন। ৪৩ বছরের আগে তিনি বিয়ে করেননি; মিসেস ফ্লেমিং ছিলেন লর্ড ও’নিল ও লন্ডনের ডেইলি মেইলের মালিক লর্ড রদারমেয়ারের সাবেক স্ত্রী অ্যান জেরাল্ডিন চার্টারিস।

‘অল্প কয়েক মিনিটের আরাম শেষে তার অফিস থেকে বেরিয়ে পাশের ফ্লিট স্ট্রিটের একটা নামকরা মুদি দোকান এল ভিনোসে আবার একসঙ্গে হলাম আমরা; এখানে বোতলের বদলে কাঠের পেয়ালা থেকে পান করতে পারে কেউ। ভেবেছিলাম হুইস্কি আর পানি নেব, কিন্তু আমার সঙ্গীর খাবারের রুচির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমোন্তিলাদো নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। তার নিজস্ব পছন্দ অবশ্য আমাকে থতমত খাইয়ে দিয়েছে: ব্র্যান্ডি আর জিঞ্জার অ্যালে। এরপর লাঞ্চের জন্য লন্ডনের যথার্থভাবেই নামি রেস্তোরাঁ হোয়াইট টাওয়ারে গেলাম। এখানে অসাধারণ মদের সঙ্গে দুর্দান্ত খাবার খেলাম। সংকোচ কাটাতে মাথায় যা এসেছে, তা-ই নিয়ে কথা বলেছি; ৩টার দিকে আমরাই সবার শেষে ওখান থেকে বিদায় নিয়েছি। আমরা আমাদের যার যার সুবিধার কথা জানিয়ে ১০ দিন পর আবার মিট্রে কোর্টে দেখা করার দিন স্থির করলাম। ওখানেই আমাদের সাক্ষাৎকার শেষ করেছি।’

 &dquote;&dquote;

প্রশ্ন: কোনো কোনো মনোবিদের বিশ্বাস, সৃজনশীল প্রণোদনার জন্য বিকলন প্রয়োজন। সৃজনশীল লেখক হিসেবে আপনি একমত?

ফ্লেমিং: আমার মনে হয় কথাটা একদম ঠিক। আমার ধারণা, সৃজনশীল লেখক হতে হলে বা অন্য যেকোনো কিছুতে সৃজনশীল, আপনাকে পাগলাটে হতে হবে। অনেক দিক থেকে নিশ্চিতভাবে আমি তাই। কীভাবে সত্যিই নিশ্চিত নই, তবে আমি তাই। আমি বরং কিছুটা বিষাদগ্রস্ত এবং সম্ভবত কিঞ্চিৎ বাতিকগ্রস্তও। এটা কিঞ্চিৎ জটিল বিষয় এবং কথাটা আমার বেলায় খাটে, এটুকু উপলব্ধির চেয়ে বেশি গভীরে আমার আগ্রহ যায় না। সম্ভবত অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া ছেলেবেলাতেই এটা শুরু হয়েছিল।

প্রশ্ন: প্রকাশিত জীবনী মোতাবেক আপনাকে সামরিক বহিনীর সম্মানজনক পেশায় যুক্ত করার প্রবল ইচ্ছা ছিল আপনার সচ্ছল পরিবারের। আপনাকে ব্রিটেনের বিশেষ স্যান্ডহার্স্ট একাডেমিতে পড়ানোর পর কমিশন পেয়েই শেষ মুহূর্তে আপনার ‘ইস্তফা দেয়ার’ সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারে তারা। কী কারণে মত পাল্টেছিলেন?

ফ্লেমিং: ওরা হুট করে সেনাবাহিনীর যান্ত্রিকীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেই আমি স্যান্ডহার্স্টের পর কমিশন গ্রহণ করিনি এবং আমার অনেক বন্ধু ও আমি আমরা অভিজাত গ্যারেজের মিস্ত্রি হতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং ক্যাভালরি রেজিমেন্টের গৌরবময় সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে কিংবা অচিরেই চিরকালের মতো ফুরিয়ে যাবে। আর পোলো খেলা হবে না, আর পিগস্টিকিং আর জ্যাজ নয়। তো আমাদের অনেকেই কমিশন গ্রহণের পরই স্রেফ হাতছাড়া করেছি। আমার জন্ম ১৯০৮ সালে; এটা আনুমানিক ১৯২৫ সালের কথা হবে এবং এ ধরনের মোহমুক্তি—এবং এর চেয়ে মারাত্মক ধরনেরও—তখন মামুলি ছিল, আপনি জানেন। আমার মা ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। আমার বাবা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত হন, মা আমার ও আমার তিন ভাইয়ের ওপর শৃঙ্খলা আরোপ করাকে নিজের দায়িত্ব ভেবেছিলেন, তারা বেশ ভালোই করছিলেন তখন। আমাকে একটা কিছু, সম্মানজনক কিছু করতে হবে বলে জোর করছিলেন মা, তো আমি পররাষ্ট্র দপ্তর বেছে নিয়েছিলাম। ভাষা শিখতে বিদেশে গেছি। আমি ইউনিভার্সিটি অব জিনিভা ও ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখে পড়েছি। নিজেকে ভাষাবিদ ভাবি না, তবে খুব ভালো ফরাসি আর জার্মান জানি, কারণ পররাষ্ট্র পেশায় আগ্রহ থাকলে সেটা থাকতেই হবে। প্রথম শ্রেণীর ফরাসি ও জার্মান ভাষা জানা থাকতে হবে আপনার এবং কিছুটা অন্যান্য ভাষা, আমার বেলায় সেটা রুশ। আমার ভাষাগুলোই আদি শিক্ষার রয়ে যাওয়া অবশেষ।

প্রশ্ন: আপনার জেমস বন্ডের বইগুলোয় বিভিন্ন বিদেশী বুলি আর কথোপকথন ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে আপনাকে সক্ষম করে তোলা ছাড়া সেসব কি আপনার কাছে উপকারী প্রমাণিত হয়েছে?&dquote;&dquote;

ফ্লেমিং: সাধারণভাবে এগুলো কারো জীবনের এক ধরনের অনন্য সম্প্রসারণ, যেখানে আমার শেখা অন্য সবই—অ্যালজেবরা আর ত্রিকোণমিতি, ইত্যাদি—বেমালুম ভুলে গেছি এবং যতদূর জানি, ওগুলোর কোনোটাই কখনো আমার কোনো কাজে আসেনি। কিন্তু ভাষা জানা থাকাটা দারুণ কাজে এসেছে। ভাষা শিখতে হলে আপনাকে কম করে হলেও দুই বছর বিদেশে থাকতে হবে। দেশে ফিরে আমি পররাষ্ট্র দপ্তরের পরীক্ষায় অংশ নিই। কিন্তু সাত নম্বরে ছিলাম আমি, পদ ছিল মাত্র পাঁচটি, এই হলো ব্যাপার।

তো আমার মেধা আর যোগ্যতার সঙ্গে যায়, এমন কাজের খোঁজ করতে শুরু করি। তখন পর্যন্ত প্রচুর পড়াশোনা ছাড়া আর যেটা করেছিলাম, সেটা হলো বই জমানো। কিছুদিন প্রথম সংস্করণের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখার পর যেকোনো বিশেষ বিষয়ে বিশ্বের ইতিহাসে স্থায়ী মূল্য আছে, এমন বিশ্বচিন্তার ইতিবাচক ইঙ্গিতবহ বই জমানোর সিদ্ধান্ত নিই।

প্রশ্ন: বলছিলেন কাজের খোঁজ করছিলেন আপনি।

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, এবং শেষ পর্যন্ত কাজ একটা পেয়েছি। মায়ের এক বন্ধু রয়টার্সের চেয়ারম্যান স্যার রডেরিক জোন্স নামে মানুষটার কারণে। বিরাট আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সে হাজির হই আমি। তিন বছর ছিলাম ওদের সঙ্গে, আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর সময় কাটিয়েছি। কারণ তখনকার দিনে নিউজ এজেন্সির কাজ অনেকটা বিশাল ফুটবল ম্যাচের মতো ছিল। আমেরিকার রয়টার্স আর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অ্যালায়েড এজেন্সি গ্রুপের অংশ ছিল। ইউনাইটেড প্রেস ও ইন্টারন্যাশনাল নিউজের মতো ফ্রিবুটাররা ছিল, যারা সারা দুনিয়ায় আমাদের সীমানায় পা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। জার্মানি ও রাশিয়া এবং আরো কিছু জায়গায় দারুণ কিছু যুদ্ধ হয়েছে আমাদের, সবই ভীষণ উপভোগ্য ছিল। রয়টার্সেই আমি দ্রুত এবং সবচেয়ে বড় কথা নির্ভুলভাবে লিখতে শিখি। কারণ রয়টার্সে নির্ভুল না হলে আপনাকে বিদায় করে দেয়া হতো, ব্যস তাহলেই সব খতম।

প্রশ্ন: কোন জিনিসটা আপনাকে সাংবাদিকতা থেকে নেভাল ইন্টেলিজেন্সে নিয়ে গেল?

ফ্লেমিং: বেশ, আমি রয়টার্স ছাড়ার পর কিছু সময় ইংরেজ স্টকব্রোকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি রাওই অ্যান্ড পিটম্যান’সের অংশীদার হিসেবে দ্য সিটিতে (লন্ডনের ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র) কাটিয়েছি, চমৎকার মানুষজন। বেশ প্রীতিকর শহুরে ক্লাবের মতো ছিল—এখনো ওরা আমার বড় বন্ধু—কিন্তু কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, দ্য টাইমস তখন আমাকে এক বাণিজ্য সফরে মস্কোয় বিশেষ সংবাদদাতার কাজের প্রস্তাব দেয়। ১৯৩৯ সালের মার্চ বা এপ্রিলে ওই কাজ থেকে ফেরার পর হঠাৎ করেই আমাকে জড়িয়ে টুকটাক হাস্যকর সব প্রশ্ন উঠছে শুনতে পাই; আমার বন্ধুরা বলত কারা যেন আমি কোথায় ছিলাম, কী কী জানি ইত্যাদি জানতে চেয়েছে। সেটাই নেভাল ইন্টেলিজেন্সের কাজের চমৎকার একটা উসিলা প্রমাণিত হয়েছিল। তার কারণ এতজন থাকতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর এবং দ্য সিটির বেশ বড় মার্চেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ব্যারিং ব্রাদার্সের প্রধানকে আমার মতো বয়সী বিভিন্ন ভাষা জানা এবং দ্য সিটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কাউকে খুঁজে বের করতে বলা হয়েছিল, যেটা অবশ্যই আমার জানা ছিল না। যা-ই হোক, নেভাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক, আজো আমার বন্ধু, অ্যাডমিরাল জেএইচ গডফ্রে ও সাদা পোশাকে আরো বেশ কয়েকজন আজব লোকজনের সঙ্গে কার্লটন হোটেলে এক মধ্যাহ্নভোজের ভেতর দিয়ে এর অবসান ঘটে। হুট করেই নিজেকে রয়্যাল নেভাল ভলান্টিয়ার রিজার্ভের অবৈতনিক লেফটেন্যান্ট পদে অ্যাডমিরালটিতে আবিষ্কার করে বসি এবং আমাকে নেভাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টরের ব্যক্তিগত সহকারী বানিয়ে দেয়া হয়। যুদ্ধের গোটা সময় ওই কাজেই ছিলাম আমি।

প্রশ্ন: আপনার দায়িত্ব কী ছিল?&dquote;&dquote;

ফ্লেমিং: আমার কাজকর্ম আমাকে বলতে গেলে সব গোপনীয় বিষয়ের ভেতর পৌঁছে দিয়েছিল। সম্ভবত এর চেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বা উত্তেজনাকর যুদ্ধের নাগাল আমি পেতাম না। অবশ্যই নেভাল ইন্টেলিজেন্সে আমার অভিজ্ঞতা ও গোপন তত্পরতা সম্পর্কে যা কিছু শিখেছি, শেষ পর্যন্ত জেমস বন্ডকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে বেশ কাটছাঁট করে সেসব সম্পর্কে লেখার দিকেই নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন: যেমন শোনা যায়, আপনি কি সত্যিই জেমস বন্ড নামে একজনের লেখা পড়েই নামটা বেছে নিয়েছিলেন, নামটা আপনার কাছে ‘জুতসইভাবে সাদামাটা আর বর্ণহীন’ ঠেকেছিল বলে?

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, ঠিক তাই। বইটা ছিল জেমস বন্ডের বিখ্যাত পাখিবিষয়ক বই বার্ডস অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আমি চেয়েছিলাম আমার নায়কটি নামহীন অস্তিত্ব হোক, বইয়ের অ্যাকশনই ওকে সামনে নিয়ে যাবে। আমি বীরোচিত বুলডগ ড্রামন্প ধরনের নামে বিশ্বাস করিনি। মানে সাহিত্যে তাদের আর অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করিনি। মোটামুটিভাবে চেয়েছি এ লোকটি যেন রেমন্ড চ্যান্ডলার বা ড্যাশিয়েল হ্যামেটের নায়কদের ধরন অনুসরণ করে—বিশ্বাসযোগ্য মানুষ, বিশ্বাসযোগ্য নায়ক।

প্রশ্ন: বন্ড সম্পর্কে এক সমালোচক লিখেছেন, ‘প্রতিটি সুনাগরিকের অন্তরে ধিকিধিকি জ্বলা নষ্ট লোক।’ আপনি একমত?

ফ্লেমিং: ওকে আমি নিপাট ভালো বা নিরেট মন্দ লোক ভাবি না। কেই বা তা? ওর ত্রুটি আছে, আর দেশপ্রেম এবং দুঃসাহস ছাড়াও অল্প কিছু অনুভবযোগ্য গুণও আছে, যেগুলো সম্ভবত এমনিতে গুণ নয়। নিশ্চিতভাবেই রাজনীতিতে কিছুটা সংশ্লিষ্ট, কিন্তু আমার ভাবা উচিত ওর যতটুকু রাজনীতিতে আছে, সেটা কিছুটা কেন্দ্র থেকে বামঘেঁষা। এবং কিছুটা সংস্কৃতও। তত্পর মানুুষ, গলফ খেলার ওপর লেখা বই পড়ে, ইত্যাদি—যদি কিছু পড়ে আরকি। ও তেমন সামাজিকভাবে আকর্ষণীয় মানুষ নয়, আমি সম্পূর্ণ একমত। কিন্তু তবু আমি চাইনি ও সেভাবে পছন্দের কেউ হোক। ও সরকারের হাতে ভোঁতা একটা যন্ত্র, কেউ না।

প্রশ্ন: আপনাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে আপনি বন্ডকে পছন্দ করেন না। কথাটা কি ঠিক?

ফ্লেমিং: বেশ, আজ ১২ বছর ওর সঙ্গে বাস করছি, একসঙ্গে ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছি। তো ওর কপালে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা ভেবে ওর প্রতি কিছুটা সহানুভূতি গড়ে উঠেছে আমার ভেতর, সেটা যা-ই হোক না কেন।

প্রশ্ন: আপনার কি কখনো মনে হয় যে আপনিই বন্ড আর বন্ডই ফ্লেমিং?

ফ্লেমিং: না, বন্ড যে কারো ভীষণ রোমান্টিসাইজড ভাষ্য, কিন্তু অবশ্যই আমি নই এবং আমি নিশ্চিতভাবেই ওর সঙ্গে টেক্কা দিতে পারিনি; এমনকি ওর বয়সী হলেও পারতাম না; যেটা কিনা এখন এবং সবসময়ই মধ্য তিরিশেই থাকবে। ও অনেকটা বিশ শতকের ভাষা ব্যবহার করা বিশ শতকের পোশাকে রোমান্টিক কঠোর মানুষের মিশেল। আমার মনে হয় প্রাচীন থ্রিলারের কার্ডবোর্ড নায়কদের যে কারো তুলনায় ও অনেকটা আধুনিক নায়ক, গত যুদ্ধের কমান্ডো ইত্যাদি এবং আমার পরিচিত সিক্রেট সার্ভিসের কিছু লোকের মতো।

প্রশ্ন: আপনি কি ওর যৌনক্ষমতা ও মেয়েদের সঙ্গে নির্মম আচরণকে জীবনঘনিষ্ঠ মনে করেন, এমনকি কমান্ডো ও সিক্রেট সার্ভিসের লোকদের ভেতরও?

ফ্লেমিং: স্বভাবতই না। কিন্তু আমরা এক সহিংস যুগে বাস করছি। লক্ষণীয় মাত্রায় প্রলোভন প্রেমের জায়গা দখল করে নিয়েছে। প্রত্যক্ষ, বিরস প্রস্তাব ব্যতিক্রম নয়; এটাই দস্তুর। জেমস বন্ড মধ্য তিরিশের কোটার একজন স্বাস্থ্যবান, সহিংস, অবুদ্ধিজীবী ধরনের মানুষ এবং তার যুগের সৃষ্টি। আমি বলব না যে ও বিশেষ করে আমাদের কালের ধরনের, কিন্তু নিশ্চিত করেই ও আমাদের যুগের। বন্ড বিচ্ছিন্ন, বাঁধনহীন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য মানুষ ও, যাকে ঘিরে উত্তেজনা আর কল্পনার বিশাল জাল তৈরির চেষ্টা করেছি। অন্তত এখানে আমাদের মিল খুবই সামান্য। অবশ্যই মিল আছে, যেহেতু কেউ যা জানে কেবল সেটাই লেখে এবং বন্ডকে দেয়া আমার কিছু ধূর্তামি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমি অবগত। যেমন ওকে বিশেষ কোনো সিগারেট খাওয়ানোর কারণ আমি নিজেই সেটা খাই। এবং আমি জানি এসব কেমন, বিনা পয়সায় ওগুলোর প্রচারে আমার কোনো গ্লানি নেই।

প্রশ্ন: বলকানের সোনালি মোড়কের সিগারেট আর মরল্যান্ডের গ্রসভানোর স্ট্রিটের বন্ডের জন্য মেশানো ও টার্কিশ তামাকসহ?

ফ্লেমিং: নিশ্চয়ই। কেন নয়?&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: ধূমপানের বেলায় কোনো সিক্রেট এজেন্টের পক্ষে এটা কি একটু অন্যায় রকম নজরে পড়ে যাওয়ার মতো হয়ে যায় না?

ফ্লেমিং: অবশ্যই হয়। আত্মমর্যাদাশীল কোনো এজেন্টই এটা করবে না। প্লেয়ার্স বা চেস্টারফিল্ডস খাবে সে। কিন্তু পাঠকরা এ ধরনের বোকামি পছন্দ করেন এবং এসব মেনে নেন। কারণ এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে সময় নষ্ট করেন না তারা। আমার সিক্রেট এজেন্টের গোপনীয়তা বেশ পরিষ্কার, এমনকি এটা নিয়ে যদি চট করে ভাবতেও যান। কিন্তু গতি, বর্ণনার গতি এসব নোংরা জায়গা থেকে কাউকে সরিয়ে নেয়। এটা সোজাসাপ্টা অপারেশন। পাঠককে আচ্ছন্ন করে ফেলা। আপনি তাকে এমন গতিতে সঙ্গে নিয়ে এগোন, তার প্রতি এত গভীরভাবে কৌতূহলী হয়ে পড়েন, তখন আর এসব অসামঞ্জস্য দেখে ধাক্কা খান না। বোধ হয় আমি কাজটা পারি দেখাতেই এটা করি।

প্রশ্ন: আপনার বইতে খুঁটিনাটি বিষয়ে এত বেশি নজর দেন কেন?

ফ্লেমিং: মূল কারণ হলো এসব আমাকে আগ্রহী ও উত্তেজিত করে। আমি পর্যবেক্ষণ করি, ভাবি এবং রাস্তায় হাঁটার সময় বা কোনো কামরায় ঢুকলে বিভিন্ন জিনিস খেয়াল করি, নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারি। আমার বইয়ে আমার এ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ব্যবহার এবং একই সময়ে মানুষকে আমার প্রিয় জিনিস, প্রিয় খাবার, মদ আর সৌরভ ইত্যাদি জানাতে পারা আমাকে আমোদ জোগায়। ব্যক্তিগত একান্ত জীবনের বর্ণনা ও ব্যক্তিগত রুচি আমাকে দারুণ আগ্রহী করে। আমার মনে হয় সকালে কেউ কীভাবে শেভ করছে, সেটাও টুকে রাখার মতো ব্যাপার। কোনো চরিত্র ঘিরে আমরা যত বেশি এ ধরনের বিশদ বিবরণ বিছিয়ে দিই, ততই তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি।

আমি সারাক্ষণই এমনই বিস্তারিত জিনিসগুলো টুকে রাখি; আমি আমার চিন্তাভাবনা এবং বিভিন্ন মন্তব্য লিখে ফেলি, মেনু-জাতীয় জিনিসগুলো লিখে নিই। এই তো সবে সেদিন ইস্তাম্বুলে পাওয়া একটা কথা লিখে রেখেছি: ‘এখন আর মাথার ওপর ছায়া থাকল না।’ এটা একটা তুর্কি বুলি, মুস্তাফা কামালের মতো মহান সুলতানরা মারা গেলে ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষের হা-হুতাশ ছিল, ‘এখন আর মাথার ওপর কোনো ছায়া থাকল না,’ যেটা কিনা একজন মহান মানুষ চলে যাওয়ায় এখন আর আমাদের বাঁচানোর কেউ নেই বলারই বাঙ্ময় কায়দা। আমি এ ধরনের জিনিসগুলো লিখে রাখি এবং প্রায়ই আমার বইতে কাজে লাগাই।

প্রশ্ন: অবশ্যই, আপনার জন্য চালানো গবেষণাও আছে।

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, তবে সাধারণভাবে সেটা কেবল বই লিখে ফেলার পর। একটা বই শেষ করার পর মনে হয়, কোনো একটা প্রসঙ্গে আবছা থেকে গেছি, তখন উপযুক্ত মানুষের কাছে গিয়ে তার কাছ থেকে আসল কথা বের করার চেষ্টা করি, তারপর ওই বিশেষ বিষয়ের কথা নতুন করে লিখি।

প্রশ্ন: আপনি কি ব্যক্তিবিশেষজ্ঞের নৈপুণ্যে আগ্রহী? যেমন আপনি নিউইয়র্কের চিক গেলর্ডের সঙ্গে দেখা করার জন্য স্বভাবের বাইরে যাবেন, যিনি নিউইয়র্ক পুলিশ ও এফবিআইয়ের ফরমায়েশ মোতাবেক রিভলভার আর হোলস্টার বানান?

ফ্লেমিং: সত্যি বলতে কি, এসব ব্যাপারে বিশেষজ্ঞের গোটা প্রশ্নটাই আমাকে ক্লান্ত করে। গেলর্ডের হোলস্টার বার্নস মার্টিনের চেয়ে ভালো হলে অবশ্যই আমি এসব সম্পর্কে জানতে চাই, কিন্তু ওখানেই আমার আগ্রহ শেষ বলা যায়। তবে আমি কিন্তু খারাপ গুলি চালাই না। আসলে একসময় ওয়েস্ট পয়েন্টের বিরুদ্ধে স্যান্ডহার্স্টের হয়ে গুলি ছুড়েছি। আর স্রেফ আমার হাত খুব বেশি কাঁপছে না দেখার জন্যই মাঝে মধ্যেই টিনের কৌটা বা কোনো কিছুতে টিপ অনুশীলন করি।

প্রশ্ন: আগ্নেয়াস্ত্র প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বন্ডের—ওকে হত্যার লাইসেন্স দেয়া—অনুমতি সূচক ডাবল-ও উপসর্গের কাল্পনিক উপায়টি পাঠকদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে দেখে কি আমোদ পান, যেখানে বাস্তবে যেকোনো ইন্টেলিজেন্স এজেন্টই দায়িত্বের অংশ হিসেবে হত্যার প্রয়োজন বোধ করতে পারে এবং সেক্ষেত্রে সেটা করার অধিকারী বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ফ্লেমিং: বেশ, এটা বন্ডের বিশেষ দায়িত্বকে আরো কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলার একটা কাল্পনিক উপায় ছিল যদিও, ডাবল-ও উপসর্গ স্রেফ উদ্ভাবিত কিছু নয়। যুদ্ধের গোড়ার দিকে অ্যাডমিরালটিতে সব টপ সিক্রেট সিগনালই ডাবল-ও উপসর্গ দিয়ে শুরু হতো, সেখান থেকে এটা নিয়েছি। পরে স্বাভাবিক নিরাপত্তার কারণেই একে বদলে ফেলা হয়, তবে আমার মনে রয়ে গিয়েছিল এবং বন্ডের জন্য একে ধার করেছি এবং এটায় বাঁধা পড়ে গেছে ও।

প্রশ্ন: আপনার মতে প্রবাদবাক্যের নিখুঁত হত্যাকাণ্ড বলে কিছু আছে?

ফ্লেমিং: বেশ, আমার ধারণা কোনো কায়দাকেই আমেরিকায় মালিকদের কৌতুককরভাবে কোসা নস্ট্রা হিসেবে ডাকা বন্দুকবাজদের প্রয়োগ করা কায়দার চেয়ে মারাত্মক ও দক্ষ ভাবা ঠিক হবে না। ওখানে হয়তো একজন লোককে সেই ডেট্রয়েট থেকে নিউইয়র্কের কোনো বারে বসা কাউকে খুন করতে পাঠানো হতে পারে, তারপর সে তার সঙ্গে কোনো প্রদর্শনযোগ্য সম্পর্ক ছাড়াই হাওয়া হয়ে যেতে পারে। এটাই প্রায় নিখুঁত খুন—যে ধরনের হত্যাকাণ্ড সিক্রেট সার্ভিস, বিশেষ করে রুশরা করে থাকে। পশ্চিম জার্মানিতে এ ব্যাপারে ওরা বেশ নিপুণ ছিল। ওদের সবচেয়ে নতুন চমক সায়ানাইড পিস্তল, মোটামুটিভাবে তরল সায়ানাইড ভরা ওয়াটার পিস্তল, বিশেষভাবে ভালো স্টান্ট; ধরুন সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়ই কাউকে খুন করা যেতে পারে। তাকে মৃত অবস্থায় যখন পাওয়া যাবে, কোনো চিহ্ন না রেখে সায়ানাইড মিলিয়ে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে ধরে নেয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ধরনের কাজের জন্য আপনার ভীষণ শক্ত স্নায়ু থাকতে হবে, আর একজন ভালো ঘাতককে কাজ চালিয়ে যেতে যেটাই সক্ষম করে তুলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই যেন তাকে পরাস্ত করে। খুনির মনোবল কমতে থাকে, নিজের ভেতরই মৃত্যুর বীজ আবিষ্কার করে সে। আমার একটা বই ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ-এ যেমন লিখেছি, রুশরা যেমন কাজে লাগায় সেই ধরনের ভাড়াটে ঘাতক দলের সমস্যা হলো এরা পাঁচ বা ছয়জনকে হত্যার পর কিছুটা বিষণ্ন বোধ করতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত নরম হয়ে যায় বা হাল ছেড়ে দেয় বা মাদক-মদের আশ্রয় নেয়। ইতিহাসে কে সবচেয়ে বড় গুপ্তঘাতক জানার জন্য গবেষণা চালানো কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হবে—কে ছিল বা এখন কে। আমার মনে বিশেষ কোনো প্রার্থী নেই। তবে ওদের প্রত্যেকেই কিছুদিন গড়ানোর পরই মনের ভেতর এক ধরনের ছারপোকা লালন করতে শুরু করে।

প্রশ্ন: আপনার বইগুলোয় আপনি সহিংসতায় ‘আচ্ছন্ন’ থাকায় সমালোচিত হয়েছেন। আপনি এ অভিযোগ যৌক্তিক মনে করেন?

ফ্লেমিং: সহজ বাস্তবতা হলো অসাধারণ জনপ্রিয়তা পাওয়া আর সব কাল্পনিক নায়কের মতো বন্ডকে অবশ্যই তার সময়ের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আমরা একটা উত্তাল সময়ে বাস করছি, সম্ভবত মানুষের জানা সবচেয়ে ভয়ানক সময়। আমাদের বিগত যুদ্ধে ৩০ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ভেতর আনুমানিক ছয় মিলিয়নকে স্রেফ নিষ্ঠুরভাবে জবাই করা হয়েছে। শুনেছি, বলা হয়, আমি নাকি বন্ডের ওপর চালানো শয়তানসুলভ নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতন আবিষ্কার করেছি। কিন্তু গত যুদ্ধে বন্দি সিক্রেট এজেন্টদের বেলায় কী করা হয়েছে, আমার মতো যে জানে তেমন কেউই এটা বলবে না। আলজেরিয়ায় যা ঘটেছে, সেটা জানে এমন কেউ এটা বলবে না।

প্রশ্ন: একটু আগেই আপনি বললেন যে পেশাদার আততায়ীরা কিছুদিন গড়ানোর পরই মনের ভেতর এক ধরনের ছারপোকা লালন করতে শুরু করে। বন্ডও কি এখানে অন্তর্ভুক্ত?

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, মানুষ হত্যা বন্ডকে বিব্রত করে, যদিও এটা করে ও পার পেয়ে যাচ্ছে—ঠিক যেভাবে দর্শনীয় মোটরকার চালিয়ে পার পায় ও।

প্রশ্ন: সাম্প্রতিক বইতে ওকে দিয়ে একটা সুপারচার্জড বেন্টলি চালিয়েছেন আপনি। কেন এ বিশেষ গাড়িটাই ওর জন্য বেছে নিলেন?

ফ্লেমিং: আমি সুপারচার্জড বেন্টলি বেছে নিয়েছি তার কারণ সম্ভবত আর্মহার্স্ট ভিলিয়ার্স আমার বিরাট বন্ধু। ওর সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে ওটা সম্পর্কে কিছু জানতে পেরেছিলাম। বন্ডকে বেন্টলিতে বসিয়েছি, কারণ ও বেপরোয়া, কৌতূহলকর জিনিস ব্যবহার করুক এটা আমার পছন্দ।

প্রশ্ন: ওর বৈচিত্র্যময় গাড়ির রুচির সঙ্গে আপনার মেলে?

ফ্লেমিং: হ্যাঁ। আমার নিজের সুপারচার্জড বেন্টলি চাই, কিন্তু আজকাল—হাজার হোক আমার বয়স ৫৬—সারা রাত রাস্তায় ফেলে রাখা যাবে, এমন গাড়ি দরকার আমার, যেটা সকালে চট করে স্টার্ট নেবে, আপনার চাহিদামতো ১০০ মাইল দূরে যাবে, তার পরও মোটামুটি আরামদায়ক সফর দেবে আপনাকে। টিউনিং লাগবে কিংবা আমাকে রাজ্যের ঝামেলায় ফেলবে বা খরুচে কোনো গাড়ি নিয়ে মাথা ঘামাতে পারব না। আমার কাছে ছয় বছর একটা থান্ডারবার্ড ছিল, বেশ ভালোই কাজ দিয়েছে।

প্রশ্ন: বন্ডের বিপরীতে, বললেন বন্দুক আপনাকে একঘেয়েমিতে ফেলে এবং আপনি বৈচিত্র্যময় বিলাসী গাড়ি চালান না। আপনি কি অন্তত ক্যাসিনোয় ওর জুয়ার নেশার অংশীদার?

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, জুয়া খেলতে সত্যিই ভালো লাগে আমার। বলা চলে সিরিয়াস স্টেকেই ব্রিজ খেলি। আমি চেমিন দে ফের পছন্দ করি। এখানে লন্ডনে প্রাইভেট ক্লাবে খেলি। এবং হয়তো কন্টিনেন্টে লে তোকুয়েতের মতো জায়গায় যেতে চাইব। নিজেকে জুয়ার টেবিলে মোটামুটি যোগ্য ভাবতে পছন্দ করি—মনে হয় আমরা সবাই তাই ভাবি—কিন্তু তবু, হারার সমানই জিতি আমি কিংবা কিঞ্চিৎ বেশি। এটা আমার পছন্দ, এটা দেখায় যে আমি সত্যিকার অর্থে নেশাগ্রস্ত জুয়াড়ি নই, কারণ নেশাগ্রস্ত জুয়াড়ি জিতছে নাকি হারছে তার তোয়াক্কা করে না। মূলত সে ‘অ্যাকশনে’ আগ্রহী। একটা ঘটনার কথা মনে আছে, আমি ভীষণ জিততে চেয়েছিলাম। ন্যাভাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর অ্যাডমিরাল গডফ্রের সঙ্গে আমেরিকায় যাচ্ছি। পর্তুগালের এস্তোরিলে ছিলাম আমরা, গাড়ির অপেক্ষায় থাকার সময় ক্যাসিনোয় কিছু সময় কাটাই। ওখানে কয়েকজন জার্মান এজেন্টকে চিনতে পারি। তখন ভাবলাম, ওদের সঙ্গে খেলে ওদের টাকা-পয়সা হাতিয়ে ফতুর করে দিলে মন্দ হতো না। অবশ্যই তার বদলে ওরাই আমার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দারুণ বিব্রতকর। এ ঘটনাই আমার প্রথম বই ক্যাসিনো রয়্যাল-এ এসেছে, তবে অবশ্যই বন্ড হারেনি। আসলে প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি এবং নির্মমভাবে শেষ করে দিয়েছে ও।

প্রশ্ন: ক্যাসিনো রয়্যাল-এ এবং বন্ডের অন্য সব বইই জ্যামাইকায় আপনার বাড়িতে লেখা। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সৃজনশীল, নিরিবিলি জায়গা হিসেবে বাছলেন কীভাবে?

ফ্লেমিং: নেভাল ইন্টেলিজেন্সের একটা অ্যাসাইনমেন্টে নেভাল ইন্টেলিজেন্সের দপ্তরের আমেরিকান প্রতিপক্ষের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে ১৯৪২ সালের দিকে ক্যারিবিয়ানে ইউ-বোট ডোবানোর ব্যাপারে কিছু করা যায় কিনা দেখতে প্রথম জ্যামাইকা যাই। বেশ পুরনো মার্টাল ব্যাংক হোটেলে ছিলাম, রোজ বৃষ্টি হতো এবং প্রতিটি মিনিট আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। এর আগে কখনো ট্রপিকে যাইনি, যেকোনো স্কটের মতোই আমার কাছে অসাধারণ লেগেছিল। যুদ্ধের পর ফিরে এসে একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে যখনই পারি একটা বাড়ি বানাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। ঠিক সেভাবেই ঘটেছে ব্যাপারটা। ১৯৪৬ সালে আবার যখন ফিরে গেলাম, স্যার উইলিয়াম স্টিভেনসন নামে এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটা গাড়ি ধার করি, যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসে আমার চিফ ছিলেন তিনি। জ্যামাইকায় তার একটা বাড়ি ছিল, ঘুরতে ঘুরতে শেষে সাগর তীরের এ অব্যবহূত গাধার রেসকোর্সের দেখা পেয়ে যাই। রেসকোর্স কিনে নিয়ে যুদ্ধের সময় অ্যাডমিরালটিতে কাটানো তিন বছর সময় ভি-১ আর ভি-২-এর চেয়ে প্রীতিকর কিছুর অপেক্ষায় থেকে পরিকল্পনা করা নকশা অনুযায়ী একটা বাড়ি বানাই। প্রতি বছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের কিছুটা সময়ের জন্য ওখানে যাই, গোটা ব্যাপারটাই বিশাল সাফল্য ছিল। ওরাকাবেসা নামে একটা ব্যানানা পোর্টের পাশেই জায়গাটা, আর বাড়িটার নাম আমারই পছন্দ করা ‘গোল্ডেন আই’।

প্রশ্ন: কেন?

ফ্লেমিং: ঘটনাক্রমে কার্সন ম্যাককালার্সের রিফ্লেকশনস ইন আ গোল্ডেন আই পড়ছিলাম তখন, একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় স্প্যানিয়ার্ডরা হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধরে নিয়ে জিব্রাল্টারের প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত গোল্ডেন আই নামে একটা অপারেশনে জড়িত ছিলাম এবং তেমন কিছু ঘটলে পাল্টা ব্যবস্থার পরিকল্পনা নিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। যা-ই হোক, আমি আমার বাড়িকে গোল্ডেন আই বলি। বিকল্প পছন্দ ছিল লজ্জাবতী, একটা স্পর্শকাতর গাছের জ্যামাইকান নাম এটা, ছুঁলেই পাতা নেতিয়ে পড়ে এ গাছের। আমি ও আমার বন্ধু মিলে জায়গাটা জরিপ করার সময় ক্লিফের ওপর দিয়ে চোখ ফিরিয়েছিলাম, ঢেউয়ের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরী, নগ্ন, নিগ্রো নারীরা স্নান করছিল, তো ভেবেছিলাম লজ্জাবতী, তো ওটার জন্য লজ্জাবতীই সবচেয়ে জুতসই নাম হবে—পুরো ৩০ একর জায়গাই গাছে ঢাকা ছিল—কিন্তু একটু বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়ে যেত। যা-ই হোক, বাড়িটা বিরাট একটা সাফল্য হয়ে আছে। আপনি যেমন বললেন, আমার সব বই-ই ওখানে লিখেছি।

প্রশ্ন: ওখানে আপনি আপনার বেশির ভাগ সময় টাইপরাইটারেই কাটান?

ফ্লেমিং: মোটেই না। পাখির সঙ্গে জেগে উঠি, সেটা সাড়ে ৭টা, কারণ ওরা জাগিয়ে তুলবেই, তারপর নাশতার আগে সাগরে গোসল করতে যাই। ওখানে আমাদের সুইমস্যুট পরতে হয় না, এতটাই নিরিবিলি জায়গাটা; আমি আর আমার স্ত্রী গোসল করি। ১০০ গজের মতো সাঁতার কাটি, তারপর ফিরে এসে আমার হাউজকিপারের হাতে ভাজা অনন্য ডিম ভাজি দিয়ে নাশতা সারি, এ কাজে সত্যিই ভালো সে। তারপর বাগানে বসে ১০টা পর্যন্ত রোদ পোহাই। কেবল তারপরই কাজে যাই। শোয়ার ঘরে বসে একটানা ১ হাজার ৫০০ শব্দ টাইপ সেরে ফেলি, একদিন পেরোনোর আগে কী লিখেছি, সেদিকে নজর দিতে যাই না। কী লিখতে যাচ্ছি, সেটা মোটামুটিভাবে ভেবে নিয়েছি এবং যা-ই হোক, প্রচুর ভুলও যদি করি, মনে মনে ভাবি, বেশ, কি সমস্যা, বইটা লেখা হয়ে গেলে সবই বদলাতে পারব। আমার মনে হয় বর্ণনার গতির জন্য আসল ব্যাপার হলো দ্রুত ও টানা লিখতে পারা।

এরপর পৌনে ১২টার দিকে লেখা রেখে একটা স্নোরকেলিং করার জন্য বর্শা হাতে সাগরে নেমে যাই; পানির নিচে পাথরের ভেতর ঘুরে ঘুরে বাগদা চিংড়ি বা যেকোনো কিছু হোক খুঁজি, অনেক সময় কিছুই মেলে না, তারপর ফিরে আসি, গোটা দুই পেগ পিংক জিন নিই এবং আমরা দারুণ একটা লাঞ্চ করি, সাধারণ জ্যামাইকান খাবার এবং আনুমানিক আড়াইটা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিশ্রামে থাকি। তারপর আবার ঘণ্টাখানেক বাগানে বসি, আরেক দফা সাঁতার কাটি, তারপর ৬-৭টা পর্যন্ত—জ্যামাইকায় হুট করে গোধূলি নামে—আরো ৫০০ শব্দ লিখি। এরপর পৃষ্ঠা নম্বর দিই, ততক্ষণে মোটামুটি সাতটা পৃষ্ঠা হয়ে যায়, ওগুলো একটা ফোল্ডারে রেখে দিই, তারপর গোটা দুই কড়া ড্রিংক নিই। এরপর ডিনার, মাঝেসাঝে স্ত্রীর সঙ্গে স্ক্র্যাবল খেলা—নিজেকে ও এতে আমার চেয়ে অনেক ভালো মনে করলেও আমি জানি আমিই সেরা, এরপর সোজা বিছানায় গভীর ঘুমে।

প্রশ্ন: তারপর মার্চে সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি নিয়ে লন্ডনে ফিরে আসেন?

ফ্লেমিং: টুকটাক পরিমার্জনা বাদে, হ্যাঁ।

প্রশ্ন: বছরের অবশিষ্ট সময় কীভাবে কাটান?

ফ্লেমিং: লন্ডন—এখানে আমাদের খুবই সুন্দর ছোটখাটো একটা বাড়ি আছে—আর গ্রামে যাওয়া-আসা করে, স্যান্ডউইচের পেগওয়েল বেতে আমার একটা ছোট কিন্তু আরামদায়ক ফ্ল্যাট আছে; মানে কেন্টে পড়েছে। আমি ‘ফ্লেমিং দুদিনে সপ্তাহে’র কাজ করি, মানে অন্তত চারদিন আর পাঁচ রাত গ্রামে কাটানোর চেষ্টা করি আর দুই রাত লন্ডনে, কারণ বড় শহর আমার ভালো লাগে না। সাধারণত সোমবার রাতে ফিরে আসি আর ভাগ্য সহায় থাকলে বৃহস্পতিবার সকালে আবার স্যান্ডউইচে চলে যাই।

প্রশ্ন: গ্রামে আপনার সময় নিয়ে কী করেন?

ফ্লেমিং: বেশ বেলা করে, সাড়ে ৮টা কি ৯টার দিকে ঘুম থেকে উঠি। নাশতা করি, কফি আর সিদ্ধ ডিম—সাড়ে ৩ মিনিট, জেমস বন্ডের মতো পৌনে ৪ মিনিট নয়। খবরের কাগজ পড়ি, চিঠিপত্র সামাল দিই, তারপর গলফ কোর্সে চলে যাই; স্যান্ডউইচে—দ্য রয়্যাল সেন্ট জর্জ—এই খেলাটাই খেলি। বহু আমেরিকানের পরিচিত একটা কোর্স; ববি জোন্স ও বিখ্যাত সবাই এখানে খেলেছেন। জ্যাক নিকোলাস তিন কি চার বছর আগে ওই কোর্সেই গোল্ড ভাস জিতেছিলেন। এবং ওখানে কিছু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করি। দু-এক দফা ড্রিংক করি, লাঞ্চ সারি। তারপর মোটামুটি চড়া বাজিতে গলফ খেলতে যাই...আমরা প্রচুর ঠাট্টা-তামাশা করি, ব্যাপারটা বেশ মজার। তারপর বিকালে বাড়ি ফিরে বরফ দিয়ে বেশ কড়া বুরবোন আর পানি খাই, কিছু সময় পড়াশোনা করি, তারপর আমার স্ত্রী আমার জন্য যেটাই রান্না করার কথা স্থির করে থাকুক, সেটা খেয়ে সোজা বিছানায় চলে যাই।

প্রশ্ন: আর যখন লন্ডনে থাকেন?

ফ্লেমিং: যেমন বললাম, লন্ডনে আমার একটা খুবই সুন্দর ছোটখাটো বাড়ি আছে, কিন্তু ওটার চারপাশে কোনো গাছপালা নেই, আমার যেটা পছন্দ, আমি আরো উঁচু কোথাও, লন্ডনের মাথার উপরের উঁচু জায়গায় পাখি আর গাছপালা, আর সামান্য বাগান নিয়ে হ্যাম্পস্টিডের মতো কোথাও থাকতেই পছন্দ করব। কিন্তু আমার স্ত্রী, আপ্যায়ন করতে ভালোবাসে বলে মনে করে আমাদের বন্ধুদের আসার পক্ষে হাউজ অব কমন্স থেকে বড্ড দূর হয়ে যাবে আর অনেক বেশি শহরতলী। যা-ই হোক, গ্রামের মতো মোটামুটি একই সময় ঘুম থেকে উঠি, একই নাশতা করি এবং সাড়ে ১০টা নাগাদ ড্রাইভ করে অফিসে আসি, আমার সেক্রেটারি আমার চিঠিপত্র তৈরি রাখে, ওগুলো সামাল দিয়ে কয়েকটি চিঠি শ্রুতলিখন দিই। তারপর প্রুফ সংশোধন করি বা ওই মুহূর্তে যে কাজটা করছি, সেটা উল্টেপাল্টে দেখার পর কোনো বন্ধুর সঙ্গে লাঞ্চ করি—সবসময় পুরুষ বন্ধু। মেয়েদের সঙ্গে লাঞ্চ আমি পছন্দ করি না। বিকালে মোটামুটি প্রুফ দেখারই রুটিন থাকে আমার। বাড়ি ফিরে বড় দেখে ড্রিংক নিই, তারপর ডিনারের জন্য থেকে যাই অথবা লোকজনকে স্বাগত জানাই বা বাইরে যাই। তবে বেশির ভাগ সময়ই আমরা একসঙ্গে ডিনার করে ঘুমাতে যাই।

প্রশ্ন: আপনার বইগুলো প্রায়ই প্রেসিডেন্ট কেনেডির মতো মানুষের বিছানার ধারে বইয়ের সঙ্গে থাকে। কেনেডি উৎসাহী বন্ড ভক্ত। এমনকি বলা হয় তিনি বন্ডকে তার প্রিয় কাল্পনিক চরিত্র বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি কি কখনো আপনাকে কারণটা বলেছেন?

ফ্লেমিং: না, বলেননি। যা-ই হোক, বন্ড প্রেসিডেন্ট কেনেডির প্রিয় কাল্পনিক চরিত্র বলে আমার মনে হয়নি। আমার ধারণা সে তার প্রিয় অ্যাডভেঞ্চার চরিত্র। তবে আমার ধারণা বন্ডের অনেকটা দেশপ্রেমিকসুলভ সাহসিকতা প্রেসিডেন্ট কেনেডির চাপের মুখে সহনশীলতা, সাহস ও প্রশান্তির নিজস্ব ধারণার কাছাকাছি ছিল। অদ্ভুতভাবে বহু রাজনীতিকই আমার বই পছন্দ করেন। আমার ধারণা এর কারণ সম্ভবত রাজনীতিকরা শেষ পর্যন্ত সবকিছু গোছানো অবস্থায় সমাধান পছন্দ করেন। রাজনীতিকরা সবসময় সমধানের আশা করেন, কিন্তু খুবই বিরল ক্ষেত্রে সেটা তার পান।

প্রশ্ন: বিশ্বব্যক্তিত্বের ভেতর আরো কোনো প্রধান ব্যক্তি কি আপনার ভক্তদের মধ্যে আছেন?

ফ্লেমিং: আমি সত্যিই জানি না। একজনের কথা বলতে পারি, মিস্টার ক্রুশ্চেভকে আমার অন্যতম পাঠক বলে বিশ্বাস করি না, আর আমাদের সাক্ষাৎও হয়নি। আমার বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্নের ভেতর অবশ্য জোসেফ স্তালিনের কাছ থেকে আসা টাইপ করা একটা চিরকুট আছে, তার স্বাক্ষর করা এবং আমার ধারণা, তিনি নিজেই টাইপ করেছেন, বলেছেন তিনি দুঃখিত, কিন্তু তাকে সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই হবে।

প্রশ্ন: স্তালিনই গেস্টাপোর সোভিয়েত প্রতিপক্ষ স্মার্শ সংগঠিত করেছিলেন। আপনার বেশ কয়েকটি বইয়েই ওরা বন্ডের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু থান্ডারবলে কোন জিনিসটা আপনি যাদের স্পেকট্রে বলেন আদর্শিকভাবে ভ্রান্ত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রীদের দল দিয়ে একে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে?

ফ্লেমিং: ওই পুরনো সংগঠনের ভক্ত হলেও আমি স্মার্শ বাদ দিয়েছি; সবার আগে, ক্রুশ্চেভ সত্যিই স্বয়ং স্মার্শ ভেঙে দিয়েছিলেন, যদিও এর কাজকর্ম এখনো রাশিয়ান সিক্রেট সার্ভিস কেজিবির একটা উপবিভাগ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই বইয়ে—মনে হয় প্রস্তাবিত বৈঠকের সময় থান্ডারবলই লিখছিলাম— ভেবেছিলাম, বেশ, রুশদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলে এভাবে চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই। আমি ওদের জানতাম, ব্যক্তিগতভাবে ওদের চিনতাম, অন্য যে কারো মতো। চেনা থাকলে যে কেউ যেমন চীনাদের পছন্দ করত। আমি ভেবেছিলাম, আসলে এভাবে ওদের জ্বালাতে চাই না। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠন হিসেবে স্পেকট্রে অবিষ্কার করি, যেটা স্মার্শ, গেস্টাপো ও মাফিয়ার—সেই প্রীতিকর পুরনো কোসা নস্ট্রা—বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে—যেটা অবশ্যই স্মার্শের চেয়ে ঢের বেশি স্থিতিস্থাপক কাল্পনিক সংস্থা, কিন্তু বাস্তব বস্তু। কিন্তু ওটাই আসল কারণ ছিল; যেন রাশিয়ানদের বেশি ক্ষেপাতে না হয়। কিন্তু ওরা যদি মানুষের মুখের সামনে সায়ানাইড পিস্তলে ট্রিগার টানতেই থাকে, আমাকে হয়তো ওদের আবার কোসা মিয়া বানাতেই হবে।

প্রশ্ন: রহস্য লেখক রেমন্ড চ্যান্ডলার আপনার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের “সিরিয়াস ঔপন্যাসিকদের” চেয়ে ঢের বেশি শুদ্ধ, নিপাট, স্পষ্ট আর প্রাঞ্জলভাবে লেখেন।’ অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমালোচক অ্যান্টনি বাউচার বলেছেন, তার দৃৃষ্টিতে আপনি যারপরনাই বিশ্রীভাবে লেখেন। এ বিপরীতমুখী মূল্যায়ন সম্পর্কে আপনার কোনো মন্তব্য আছে?

ফ্লেমিং: রেমন্ড চ্যান্ডলার ও কথা বলতেও পারেন, কারণ তিনি আমার বন্ধু ছিলেন। আর অ্যান্টনি বাউচারের বেলায়, তিনি কখনই আমার বই পছন্দ করেননি এবং এটা দেখাচ্ছে তিনি কত ভালো সমালোচক যে এ কথা বলতে পেরেছেন। অন্যরা, সানন্দে—যেমন সিরিল কনোলি—ভিন্ন কথা ভাবেন। অবশ্য সন্দেহের কিছু নেই যে আমার—এবং এমনকি অ্যান্টনি বাউচারেরও—আরো ভালো লেখা উচিত। ভালো লেখার শেষ কোনো সীমা নেই। আমি স্পষ্ট, নিপাট ও সাবলীলভাবে লেখার চেষ্টা করি, কারণ আমি মনে করি, এটাই লেখার কায়দা, তবে এর একটা বড় অংশ এসেছে, আগেই যেমন বলেছি, দ্রুতগতি লেখা সাংবাদিকতার ট্রেনিংয়ের সুবাদে, যেখানে আপনাকে খুব ভালোভাবেই স্পষ্ট, শুদ্ধ ও নিপাট লেখা লিখতেই হবে। আমার ধারণা রয়টার্সের ট্রেনিং ইটন কিংবা জিনিভা বা অন্য কোথাও পড়া সব ইংরেজি সাহিত্য থেকে ঢের বেশি মূল্যবান ছিল আমার কাছে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন যে টাকার জন্য নির্লজ্জভাবে লিখেন। এটা কি ঠিক?

ফ্লেমিং: হ্যাঁ, ঠিক। আমি টাকার জন্যই লিখি—তবে আনন্দের জন্যও। লোকে যে আমার বই সম্পর্কে এসব কথা বলে, তাতে আমি খুবই খুশি। কারণ স্বাভাবিকভাবেই ওরা সেটা না বললে আমি টাকা কামাতে পারতাম না আর লেখালেখিতে এতটা আনন্দও পেতাম না। আমার মনে হয় বিনোদন বিলানো খুবই ভালো সাফল্য...কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি আমার সাধ্যের তুলনায় নিচু মানের লেখা লিখি—কিংবা আমার মনে হয় সম্ভবত করি এটা। আমি সত্যি সত্যি থ্রিলারের ভেতর ওয়ার অ্যান্ড পিস লেখার সিদ্ধান্ত নিলে, নিজেকে রুদ্ধ করে এটা করারই সিদ্ধান্ত নিলে, অন্য কিছু না, হয়তো পারতেও পারি, যদি সম্ভব হয়। সব মহান উপন্যাসেই প্রচুর সহিংসতা আর যৌনতা আছে, তো বলতে পারি, আমি আধুনিক ধারায় সেটা করার চেষ্টা করলে হয়তো বিশ্বাসযোগ্যভাবেই সফল হতাম।

কিন্তু আমি বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে অ্যাকশনে বেশি আগ্রহী এবং আমার মনে রাখা উচিত মহান ওয়ার অ্যান্ড পিস থ্রিলার গ্রাহাম গ্রিন বা জর্জ সিমেননের মতো মানুষের হাতেই লেখা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ওদেরই কেউ একজন আমি যতটা পারতাম তার চেয়ে বেশি সততার সঙ্গে নির্ভুলভাবে করতে পারতেন। আমি অতিরঞ্জন আর জীবনের চেয়ে বিরাট জিনিস পছন্দ করি। বিশাল ষাঁড়ের মতো মাথার ভিলেন পছন্দ করি। অথচ আপনি যেমন জানেন, ওরা সাধারণত ছোটখাটো মানুষ, যাদের বিশেষ আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না। তবুও এই কথিত থ্রিলারকে ধ্রুপদী হিসেবে উপস্থাপনের মতো যথেষ্ট গভীরতায় লেখার সাধ্য আমার হবে না বলেই ভাবা উচিত।

প্রশ্ন: কেন নয়?

ফ্লেমিং: আমি উপরিতলের বিষয়েই বেশি আগ্রহী এবং দ্রুতগতি বজায় রাখার বেলায়ও বেশি আগ্রহী। প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দর্শন বা ঐতিহাসিক পটভূমিতে বিচরণের মতো ধৈর্য আমার নেই। কিন্তু শেষ বিচার আমাকে বলতেই হবে, যেমন লিখছি, তাতেই আমি খুশি। অন্য লোকজন, বেশ মেধাবী মানুষ আমার বইগুলোকে মজাদার ও বিনোদনমূলক বলে জানেন, জানাটা আমি ভীষণ উপভোগ করি। কিন্তু আমি আসলেই বিস্মিত নই, কারণ ওগুলো আমাকেও আনন্দ দেয় আর আমোদিত করে।