১৮৫৫ সালে ব্রিটিশরা বার্মার কিছু অংশ তাদের ভারতীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে। সে সময় একজন ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট হেনরি ইয়ুল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সফরের বিবরণী লিখেছিলেন। বার্মার রুদ্ধশ্বাস বিবরণে তিনি বার্মিজদের জাতিগত কৌলীন্যের মনোভাব তুলে ধরেছেন। তারা তাদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে নিজেদের এই কৌলীন্যে ভুগত: “বার্মিজদের ছিল এক অদ্ভুত ধরনের আত্মবিভ্রম, তারা অন্তত তত্ত্বগতভাবে হলেও নিজেদের শ্বেতাঙ্গ মনে করত। আরো অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, বাঙালিরা মনে হয় পরোক্ষভাবে এ দাবি মেনে নিত। আমাদের চাকররা তাদেরকে বার্মিজদের থেকে আলাদা বোঝাতে নিজেদের জন্য ‘কালা আদমি’ বা কালো মানুষ নির্দেশকটি ব্যবহার করত। বার্মিজরা বিদেশীকে বোঝাতে ‘কোলা’ শব্দটি ব্যবহার করত আর চাকররাও নিজেদের বিদেশী বোঝাতে বার্মিজদের শব্দটি গ্রহণ করে বলত, ‘কালা আদমি’।”
এটাই সম্ভবত বার্মিজদের বর্ণবাদী সম্বোধন ‘কালা’র প্রথম লিখিত নিদর্শন। পরবর্তীতে ব্রিটিশরাজ পুরো বার্মা অধিকার করে এবং ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এরপর এ অঞ্চলে ভারতীয়দের ঢল নামে। স্থানীয় বার্মিজরা এই ভারতীয়দের কালা বলে সম্বোধন করত।
আজকে মিয়ানমারে খুব সামান্য কয়েকজন ভারতীয় আছে, যাদের উত্স ব্রিটিশ ভারতের বার্মায়। কিন্তু কালা সম্বোধনটি এখনো টিকে আছে। এটা এখন জাতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। রোহিঙ্গারা মূলত মুসলমান সংখ্যালঘু, বার্মার পশ্চিম উপকূলে এদের বাস। রোহিঙ্গাদের দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু এই বর্ণবাদী সম্বোধনটি ছাড়াও রোহিঙ্গা ও ভারতীয়দের মধ্যে আরো অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। আজকে যেভাবে রোহিঙ্গারা বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তেমনি একসময় ভারতীয়রা হয়েছে। ১৯৩০ ও ১৯৬০-এর দশকে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়কে বার্মা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। প্রক্রিয়াটি এখনো চলমান। এখন রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক মিয়ানমার থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে। তাদেরকে দেশটিতে বিদেশী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বার্মায় বাদামি মানুষ
১৮২৬ সালে ব্রিটিশরা প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ জয় করে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশরাজ আজকের উত্তর-পূর্ব ভারতের বিপুল এলাকাসহ আধুনিক বার্মার বেশকিছু অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ পান। ফলে বার্মায় ভারতীয়দের গমন স্রোতের মতো বৃদ্ধি পায়। ১৮৮৫ সালে বার্মা পুরোপুরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এম্পায়ারে আন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর সেখানে ভারতীয়দের গমন আরো বৃদ্ধি পায়।
বার্মায় ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল এবং সেদিনের ব্রিটিশ ভারতের সেই প্রদেশের বাণিজ্যে তারা আধিপত্য কায়েম করেছিল। এ আধিপত্যকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল চেত্তিয়ার, মাড়োয়ারি ও গুজরাতি সম্প্রদায়। তারপর ছিলেন বাঙালি বাবুরা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা বাংলা ছেড়ে যেমন পশ্চিম দিকে এগিয়েছিলেন, তেমনি পূর্বদিকেও অগ্রসর হয়েছিলেন (মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলা বদ্বীপের সীমান্ত আছে)। বার্মিজ বাঙালির মধ্যে বিখ্যাতদের একজন হলেন দেবদাসের রচয়িতা শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি এই দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটিতে সরকারি কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। তৃতীয় যে ভারতীয় দলটি বার্মায় ছিল, তারা হলেন শ্রমিক এবং এরাই ছিলেন সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। এদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় কুলি, চাকর ও মিস্ত্রি।
জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস বার্মিজ ডেজে দেখা যায়, বার্মার মেমসাহেবরা খুব কমই বার্মিজ ভাষা জানাতেন; বরং তারা সবাই কমবেশি ‘রান্নাঘরের উর্দু’ জানতেন। এই উর্দু তাদের জানতেই হতো। কারণ তাদের বাসার চাকররা বেশির ভাগই ছিল ভারতীয়।
১৯৩১ নাগাদ ভারতীয়রা বার্মার জনসংখ্যার ৭ শতাংশ হয়ে ওঠে। তারা ছিল ধনী এবং দেশটির অর্থনীতির বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। ভারতীয়রা এত বেশি সম্পত্তির মালিক ছিল যে, ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের পৌরকরের ৫৫ শতাংশ পরিশোধ করত ভারতীয়রা। অন্যদিকে স্থানীয় বার্মিজরা পরিশোধ করত মাত্র ১১ শতাংশ।
এই একই অভিবাসন স্রোত রোহিঙ্গাদের অন্তত একটি অংশকে বাংলার সবচেয়ে পূর্বাঞ্চলীয় জেলা চট্টগ্রাম থেকে বার্মায় নিয়ে এসেছিল। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। কারণ এ ঘটনার উল্লেখ করে মিয়ানমারের প্রশাসন রোহিঙ্গাদের বাঙালি তথা অ-বর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের অযৌক্তিক নাগরিকত্ব আইনে নাগরিকত্ব নির্ধারণ হয় জাতির বিবেচনায়, জন্মের বিবেচনায় নয়। এবং তাই তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ভারতবিরোধী মনোভাব
যে জাতিবিদ্বেষ আজ রোহিঙ্গা নিধন করছে, তা প্রথম আছড়ে পড়েছিল ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ১৯৩০ সালে। শুরুটা হয়েছিল রেঙ্গুনে তেলেগু ও বার্মিজ ডকইয়ার্ড শ্রমিকদের সংঘর্ষ থেকে। এ থেকে ব্যাপক বিস্তৃত ভারতীয়বিরোধী সহিংসতা শুরু হয়। বার্মা ব্রিটিশ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক বছর পরে ১৯৩৮ সালে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে আরো বড় আকারে দাঙ্গা শুরু হয়। তবে বার্মা তখনো ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই ছিল। আজকের রোহিঙ্গাবিরোধী সহিংসতার মতো ১৯৩৮ সালের আক্রমণও ছিল একই সঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগত প্রেরণাজাত। সেদিন গৌতম বুদ্ধের সমালোচনা করে এক মুসলমানের লেখা বইকে কেন্দ্র করে সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু অনতিবিলম্বে সেই সহিংসতা বার্মায় বসবাসকারী সব ভারতীয়র বিরুদ্ধে জাতিগত সংঘাত হিসেবে পরিচালিত হয়।
১৯৪১ সালে আরো সহিংসতা হয়। কারণ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে এবং জাপান বার্মা আক্রমণ করেছে। জাপানিরা যত বার্মার অভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল, ব্রিটিশরা ততই পিছু হটছিল। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বার্মায় বসবাসকারী ভারতীয়রা জাপানি সেনা ও স্থানীয়দের— উভয়ের পক্ষ থেকে আক্রমণের আশঙ্কা করছিল। ফলে বার্মা থেকে ভারতীয়দের প্রথম বড় প্রস্থানযাত্রা শুরু হয়। বার্মা থেকে ভারতে গমনের দীর্ঘ যাত্রায় হাজারো ভারতীয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনেই মারা যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ
১৯৪৮ সালে বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর সেখানে ভারতীয়দের আরো বেশি জাতি-বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ এই নতুন রাষ্ট্র নিজেকে বর্ণবাদী ভাষায় পরিচিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বার্মায় ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ। ১৯৫০-এর দশকের মধ্যভাগে এ সংখ্যা হ্রাস পেয়ে হয় সাত লাখ। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত দেড় লাখ মানুষ বার্মার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু এর মধ্যে এক-পঞ্চমাংশের কম গৃহীত হয়।
১৯৬২ সালে বার্মায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। স্বৈরশাসক নে উইন আক্রমণাত্মক বর্ণবাদী নীতি গ্রহণ করেন। এ নীতিতে দেশটির সব সংখ্যালঘু জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়। ফলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ধনী ব্যক্তিরা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেশটিতে কর্মরত ভারতীয় কমকর্তাদের বিতাড়ন করা হয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে তিন লাখের বেশি ভারতীয়কে বার্মা থেকে বলপূর্বক বের করে দেয়া হয়।
১৯৮২ সালে বার্মা একটি নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করে, যেখানে দেশটির নাগরিকত্বের জন্য একটি কট্টর বর্ণবাদী সংজ্ঞা তৈরি করা হয়। এ আইন দেশটিতে বসবাসকারী রোহিঙ্গা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের রাষ্ট্রহীন করে দেয়। আজ গণহত্যার শিকার হওয়ায় রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দুনিয়ার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে এসব আইন মিয়ানমারে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের বড় রকমের বৈষম্যের মুখোমুখি করেছে। এক হিসাবে দেখা যায়, মিয়ানমারে বসবাসরত পাঁচ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাষ্ট্রহীন।
জোরপূর্বক বর্মীকরণ
সেই সময় থেকেই বার্মায় বসবাসরত ভারতীয়দের জন্য হবসন’স চয়েজ বা একটি সুযোগই খোলা রাখা হয়েছে। আর তা হলো, বর্মী হয়ে যাও। বিভিন্ন সরকারি নীতির লক্ষ্য হচ্ছে— স্থানীয় নয়, এমন সব জাতিকে বার্মার রীতি-প্রথা তথা ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি গ্রহণে বাধ্য করা; রাষ্ট্রের শত্রুতা থেকে বর্মী হয়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র পথ। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ব্যবহূত বিভিন্ন ভাষা বর্মী ভাষা দ্বারা প্রতিস্থাপন হয়েছে, এমনকি মানুষের নামও বর্মীকরণ হয়েছে। তবে তাতেও কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু ও মুসলমানরা তাদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রকাশ্যে উদযাপন করতে পারে না এবং প্রতিনিয়তই বর্ণবাদের শিকার হয়।
বার্মায় গোঁড়ামি ও বিতাড়নের শিকার নিজেদের ডায়াস্পোরাকে সহায়তা না করার জন্য ১৯৬০-এর দশকে ভারত সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অন্যদিকে চীনারা বার্মায় তাদের ডায়াস্পোরার সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। এই চীনা ডায়াস্পোরার মানুষও বার্মায় বর্ণবাদের শিকার হচ্ছিল।
সময় আজকেও বদলায়নি। ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা বার্মায় যে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের শিকার, তার ভুক্তভোগী আজ রোহিঙ্গারাও। রোহিঙ্গারা গত বছর অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। রাষ্ট্র ও রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সর্বশেষ সহিংসতায় মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ ছেড়ে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
রোহিঙ্গা বিতাড়নের ব্যাপারে কোনো কথা না বলে ভারত সরকার বরং তার দেশে আশ্রয় নেয়া অল্প কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। অথচ এই মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা গণহত্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
সূত্র: স্ক্রলইন






