জ্ঞনার্জন একটি সরল প্রক্রিয়া। আপনি যদি কোথাও ঘুরতে যেতে চান, আপনি এখন যে জায়গাটিতে আছেন, ঠিক সে জায়গা থেকেই আপনাকে যাত্রা শুরু করতে হবে। আপনি যদি নাইরোবিতে থাকেন, আর নাকুরু যেতে চান, তাহলে আপনাকে প্রথমে মোমবাসা গিয়ে নাকুরুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে হবে না। জ্ঞানার্জনের ব্যাপারটিও ঠিক এরকম। পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াটি আমাদের আপন শরীর সম্পর্কিত ধারণা থেকেই শুরু হয়।
মানুষের জ্ঞান ও উৎপাদনের প্রাথমিক পরিসর হলো তার শরীর। মানুষের পাঁচ আঙুলবিশিষ্ট হাতই নানাকিছু নির্মাণের প্রাকৃতিক হাতিয়ার, একটি প্রাকৃতিক প্রযুক্তি। জগতের বেশকিছু জটিল প্রযুক্তি মানুষের হাতেরই প্রতিরূপ। আবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচলের জন্য মানুষকে প্রাথমিক সামর্থ্য জোগায় তার পা। পরিবহনসংক্রান্ত প্রতিটি প্রযুক্তি—স্কেটবোর্ড, বাইসাইকেল ও মোটরগাড়ি থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ, রকেট ও নভোযান পর্যন্ত—কোনো না কোনোভাবে মানুষের পায়েরই এক একটি অভিক্ষেপ মাত্র। একইভাবে দৃষ্টিসংক্রান্ত যাবতীয় প্রযুক্তি চশমা ও আতশিকাচ থেকে শুরু করে সূক্ষ্মতম দূরবীনটি পর্যন্ত মানবচক্ষুরই সম্প্রসারিত প্রতিরূপ। শ্রবণের নানা প্রযুক্তিও মানুষের কানের ধারণা থেকে উদ্ভূত। মানবশরীরের সৃজনশীল উৎকর্ষের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো তার মগজ। মানুষের মগজ একটি প্রাকৃতিক কম্পিউটার, আমাদের কোমল ‘হার্ড ড্রাইভ’। তথ্য মজুদ করা, মজুদকৃত তথ্য স্মরণ করা ও যথাসময়ে সে স্মৃতিকে অন্যত্র সঞ্চালিত করার সামর্থ্যসংবলিত কম্পিউটার প্রযুক্তি আসলে মনুষ্যমগজের প্রাকৃতিক উপাদান ও বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনুসরণ করেই অগ্রসর হচ্ছে। তবে মানুষের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তার কল্পনা করার সামর্থ্য, যা প্রযুক্তি এখনো আত্মস্থ করতে পারেনি। আর এ ‘কল্পনা’ ছাড়া কোনো বিজ্ঞান, কোনো স্থাপত্য, কোনো প্রযুক্তি, কোনো আবিষ্কার, কোনো উদ্ভাবনই সম্ভব নয়। যেকোনো ‘প্রযুক্তি’ বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করার আগে তা মানুষের ‘কল্পনার’ ভেতর বিকশিত হয়। উইলিয়াম ব্লেইক তার দ্য ম্যারেজ অব হ্যাভেন অ্যান্ড হেল গ্রন্থে যথার্থই লিখেছিলেন, ‘এখন যা বাস্তব, একদা ছিল নিছক কল্পনা।’
যাবতীয় প্রাকৃতিক প্রযুক্তিসহ তার কল্পনাশক্তি দিয়েই গঠিত হয়েছে মানুষের অনন্যসাধারণ সত্তা, তার শরীর, যা দিয়ে সে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে—মাটি, জল, বায়ু, উদ্ভিদ, পশুপাখিসহ প্রকৃতির অপরাপর উপকরণ—মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নানা কিছু তৈরি করে। সে কারণেই ‘মানবশরীর’ কোনো জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক শক্তিগুলোর মধ্যে কিংবা বিবদমান বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভেতর লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
বহিরাগতদের জবরদখল আর উপনিবেশায়নের মধ্যে আমরা উপরোক্ত সত্যটিকে দেখতে পাই। আফ্রিকার প্রতি প্রথম আঘাতটি আসে তখন, যখন সে অঞ্চলের কালো শরীরকে শৃঙ্খলিত করে, অন্যের জন্য উৎপাদন করার জন্য অন্যত্র এক নতুন পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়। উপনিবেশায়ন ছিল তার ওপর প্রযুক্ত দ্বিতীয় আঘাত। সেক্ষেত্রে কালো শরীরকে তার নিজ দেশের সব প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ আপন পরিবেশ ও পরিমণ্ডলের মধ্যেই অন্যের জন্য কাজ করতে বাধ্য করা হয়। উপনিবেশিত তখন আবাদ করত, আর উপনিবেশক তুলত ফসল।
এ অবস্থায় উপনিবেশকরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর এমন বিশ্বাস সঞ্চারের চেষ্টা করত যে বহিরাগত অধিরাজবর্গই হলো তাবৎ জ্ঞান ও শক্তির উৎস, যেসবের গুণেই উপনিবেশিত অঞ্চলে [আধুনিক] উৎপাদন সম্ভব হয়ে চলেছে। স্পষ্টতই, এ ছিল প্রথমে কালো মানুষের শরীরকে ও পরে তার মনকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করার তাচ্ছিল্য প্রণোদিত এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আঘাত। এ পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর হীনম্মন্যতা সঞ্চার করা, তাদের শরীর ও মনের সুষম আন্তঃসম্পর্ককে বিপর্যস্ত করা, তাদের নানা সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের অন্তর্নিহিত সামর্থ্যকে ভুলিয়ে দেয়া। উপনিবেশিত জনগণের ভেতর আপন শরীর ও মনের সামর্থ্য সম্পর্কে জাগ্রত বিষণ্নতাবোধ, একই সঙ্গে উপনিবেশকদের ভেতর নিজেদের শরীর ও মনের সামর্থ্য সম্পর্কে উচ্চ ধারণা সঞ্চার করত। বহিরাগত এ অধিরাজবর্গ নিজেদের প্রযুক্তি আবিষ্কার ও উদ্ভাবনশক্তির প্রতিভূ হিসেবে তুলে ধরত—স্থানীয় বিজিত জনগোষ্ঠীকে বোঝানোর চেষ্টা করত যে বহিরাগত বিজেতার প্রযুক্তি ব্যতীত, খালি হাতে, বনের ফল আহরণ ও পশু শিকারের বাইরে তাদের পক্ষে কিছুই উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। আমার এখনো মনে পড়ে ঔপনিবেশিক স্কুলে আমার কোনো কোনো শিক্ষক বলতেন, আফ্রিকার মানুষ কখনই ‘চাকা’ আবিষ্কার করতে পারেনি।
আমাকে ভুল বুঝবেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেমন যুদ্ধবিগ্রহ, বহিরাগতদের অধিকারে নিশ্চয় নতুন প্রযুক্তি ছিল। স্থানীয়দের তীর-বর্শার চেয়ে উন্নত মানের অস্ত্র হলেও বহিরাগতদের আয়ত্তাধীন বারুদসংবলিত প্রাণঘাতী বন্দুকের তুলনায় কিছুই ছিল না। প্রযুক্তির বিকাশ ও বিস্তার বরাবরই বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য অনুসারে, পৃথিবীর নানা অঞ্চলে অসমমাত্রায় সংঘটিত হয়েছে, যা আবার একেক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের মানুষ থেকে হয় ধার কিংবা চুরি করে নিজেদের শক্তিমান করে তুলেছে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো জিনিস তৈরি বা উদ্ভাবনের সামর্থ্যে বিষয়টি পুরোপুরিই একটি সর্বজনীন মানবীয় ব্যাপার। কোনো নির্দিষ্ট জাতি, সভ্যতা বা সংস্কৃতির একচেটিয়া অধিকার বা সামর্থ্যের বিষয় নয়। আফ্রিকাও নিশ্চয় বনের পশু শিকারি আর ফলকুড়ানি কোনো স্থবির জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলমাত্র ছিল না। আফ্রিকার মানুষ চাষাবাদ করেছে, এমনকি বন্যপশুকেও পোষ মানিয়েছে।
উপনিবেশপূর্ব আফ্রিকায় স্থাপত্যকলার দুটো অনিবার্য অনুষঙ্গের একটি ছিল ‘গোয়ালঘর’ নির্মাণ, আর অন্যটি ‘গোলাঘর’। গরু-ছাগলের মতো প্রাণীকে রাতের বেলায় নিরাপদ রাখার জন্য গোয়ালঘর ব্যবহার হতো, আর নিরাপদে ফসল মজুদ রাখার জন্য ব্যবহার হতো গোলাঘর। গরু-ছাগল মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ ছাড়াও চামড়াজাত বস্ত্র ও অন্যান্য দ্রব্যাদির সরবরাহ নিশ্চিত করত। অন্যদিকে ফসলের গোলা পরিবারের জন্য সংবৎসর, অন্তত পরবর্তী ফসল ওঠা পর্যন্ত সময়ে খাদ্যের নির্বিঘ্ন জোগান নিশ্চিত করত। খাদ্য উৎপাদক সম্প্রদায়ের বাইরে যারা ছিল, তাদের অনেকে ছোট ছোট কারখানায় ধাতব দ্রব্যাদি তৈরি করত। আফ্রিকার গিকুইয়ো জনগোষ্ঠী এ ধরনের কারখানাকে বলত ইগানাডা, যেখানে তারা তীরের ধাতব মাথা, বর্শা, ছুরি ও কুঠার তৈরি করত, যেসব সরঞ্জাম প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রামে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী জনসম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহার হতো। তাছাড়া সেখানে মৃৎপাত্র তৈরির কারখানা ছিল, ছিল গাছের ছাল থেকে বস্ত্র তৈরির কারখানাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রাচীন মিসরের অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থাপত্যগুলো, আর মধ্যযুগের ‘মহান জিম্বাবুয়ে’ নগরীর অনবদ্য স্থাপনাগুলোও আফ্রিকার মানুষই নির্মাণ করেছিল। পশ্চিম আফ্রিকার মাটির তৈরি চমৎকার দালানকোঠা আর ইথিওপিয়ার শিলীভূত পাহাড় কেটেছেঁটে নির্মিত জাঁকালো গির্জা নির্মাণের বিস্ময়কর কীর্তিও তাদেরই।
যা-ই হোক, বহিরাগতরাই নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রবর্তা ধারণাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বিশেষত উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর কাছে ধারণাটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে প্রকৃত অতীত সম্পর্কে মানুষের স্মৃতিকে মুছে দিতে হয়েছিল। মিসরীয় ও ইথিওপীয় প্রযুক্তি যে আফ্রিকায় কালো মানুষের দেহের ভেতরেই উন্মেষ ঘটেছিল, উপনিবেশকরা তা ইতিহাসের বই থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। তারা ‘মহান জিম্বাবুয়ে’ স্থাপনা বা মিসরের পিরামিড নির্মাণের কৃতিত্ব কোনো অজানা দেশের কিছু অচেনা সাদা চামড়ার লোকদের ওপর আরোপ করে।
উপনিবেশবাদ ও দাসত্বায়নের বুদ্ধিবৃত্তিক স্থপতিরা তাদের ব্যাপক কলমবৃত্তি দিয়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আফ্রিকার অবদানকে ইতিহাসের বই থেকে মুছে ফেলে। ইউরোপের কথিত জ্ঞানালোকায়নের এক বিশিষ্ট পুরোহিত [ডেভিড] হিউমের কথা নিশ্চয় মনে আছে? তিনি তার দ্য ট্রিটিজ অন হিউম্যান নেচার গ্রন্থে লিখেছেন, চিন্তায় বা তৎপরতায় কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, এমন কাউকেই তিনি কালো মানুষের মধ্যে খুঁজে পাননি: ‘তাদের মধ্যে একজনও প্রতিভাবান উৎপাদক নেই, তাদের কোনো শিল্পকলা নেই, নেই কোনো বিজ্ঞান।’
ইম্যানুয়েল কান্ট ও জর্জ ভিল্হেল্ম হেগেলসহ ইউরোপের অপরাপর প্রখ্যাত ভাবুকদের মধ্যেও এ ধরনের চিন্তার হদিস মেলে। হেগেল তো জোরের সঙ্গেই দাবি করেছেন যে জ্ঞানালোকায়ন, যুক্তি ও বিজ্ঞানের মূর্তিমান অভিব্যক্তি হিসেবে বিকশিত ‘ইতিহাস’ আফ্রিকাকে এড়িয়ে গেছে, আফ্রিকা রাতের অন্ধকার চাদরেই আবৃত ছিল। উপনিবেশবাদী নানা ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠের ফসল হিসেবেই নিশ্চয় হেগেলের ভেতর এ ‘অন্ধকার আফ্রিকার’ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল।
আফ্রিকা সম্পর্কে হেগেল-সৃষ্ট ভাবমূর্তিটিই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউ ট্রেডর-রোপারের জাঁকালো মূর্খতামণ্ডিত চিন্তায় ‘সত্য’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ট্রেডর-রোপার ১৯৬০-এর দশকে দাবি করেন, ইউরোপীয়দের পদার্পণের পূর্ব পর্যন্ত আফ্রিকায় ‘অন্ধকার’ ছাড়া প্রদর্শনীযোগ্য কিছুই ছিল না। আর ‘অন্ধকার’ যেহেতু ইতিহাসের বিষয়বস্তু ছিল না, ইউরোপীয় উপনিবেশায়নের মাধ্যমেই অতএব আফ্রিকার ইতিহাস শুরু হয়।
দাসত্বায়ন ও উপনিবেশায়নের দ্বৈত প্রক্রিয়াটি শুধু আফ্রিকার ইতিহাস মুছে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। উপনিবেশকরা ওয়াল্টার রোডনি যেমন তার হাউ ইউরোপ আন্ডারডেভেলপড আফ্রিকা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, স্বাধীন উৎপাদক হিসেবে আফ্রিকার কারিগর শ্রেণীকেও ধ্বংস করেছিল।
উৎপাদক শ্রেণীর বিলোপের ঘটনাটি নানা ধরনের কুফল প্রসব করেছে। জ্ঞান, তথ্য ও তার ব্যাখ্যাগুলো সাধারণত এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে বয়ে চলে। প্রতিটি প্রজন্মই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ও নানা জিনিস তৈরির সহজাত চ্যালেঞ্জ থেকে, কিংবা নিজের তৈরি জিনিসপত্র ও সেসব তৈরির নানা পদ্ধতির সঙ্গে অন্যত্র তৈরি জিনিসপত্র ও সেসবের নির্মাণ পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধন করে চলে। অন্যদের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবন ধার করার বিষয়টি বরাবরই প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি মাধ্যম হিসেবে বিরাজিত থাকে। এভাবেই তারা উভয় পক্ষ মিলেই একটি ঐতিহ্য নির্মাণ করে। ফলে স্থানীয় কারিগর শ্রেণীর ধ্বংস সাধনের অর্থ হলো সমুদয় সক্রিয় শিক্ষকদের অপমৃত্যু, একটি ঐতিহ্যের অবসান এবং সম্ভাবনাপুষ্ট সৃজনশীল স্মৃতির বিলোপ সাধন।
আপনাদের কেউ কেউ হয়তো এমন কোনো কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশীকে চেনেন, যারা বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা কোনো বেদনাদায়ক ঘটনার অভিঘাতে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তারা জগতের কোনো কিছুকেই অন্য কিছুর সঙ্গে মেলাতে পারেন না। তারা এমনকি নিজেদের সন্তানসন্ততি ও আত্মীয়পরিজনকেও চিনতে পারেন না, তাদের সঙ্গে নিজেদের পুরনো আলাপচারিতার বিষয়টিও বিস্মৃত হয়ে যান। তাদের কোনো স্থির ‘নির্দেশক বিন্দু’ নেই। কোনো একটি পুরো জনগোষ্ঠীও সামষ্টিকভাবে এমন বিস্মৃতির কম-বেশি শিকারে পরিণত হতে পারে। আমি নিশ্চিত কেনিয়ার তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করেন না যে ‘কেনিয়াল্যান্ড’ ও ‘ফ্রিডম আর্মির’ সৈনিকরা যারা ‘মাউ মাউ’ নামেও পরিচিত ছিলেন, কখনো পাহাড়-পর্বতে গড়ে তোলা নিজেদের কারখানায় অস্ত্র তৈরি করতেন।
ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও তার চর্চার ধারা জনগণের ভেতর আফ্রিকা এবং তার প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন সম্পর্কে এক ধরনের সামষ্টিক স্মৃতিভ্রংশতা সঞ্চারের চেষ্টা করেছে। কখনো যদিবা কোনো স্থানীয় শিল্পকলার স্বীকৃতি মিলত যেমন বেনিন স্থাপত্যের বেলায় ঘটেছিল, যে স্থাপত্য পিকাসো ও ইউরোপের আধুনিকতাবাদী আন্দোলনকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল, সেই সৃজনশীলতাকে তখন প্রায়ই আবার শয়তানের কারসাজি হিসেবে নিন্দা করা হতো। যা-ই হোক, বহিঃশক্তির দ্বারা প্ররোচিত হোক বা না হোক, আফ্রিকার জনগণের সামষ্টিক স্মৃতিভ্রংশতার কারণে তাদের পক্ষে নিজেদের অতীত সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস ভুলে যাওয়া সম্ভব।
ঔপনিবেশিক শিক্ষার পরবর্তী স্বাভাবিক কুফল হলো বহিরাগতদের তাবৎ জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের একমাত্র উৎস হিসেবে বিশ্বাস করতে শেখা। ফলে কালো আফ্রিকাবাসীর মুখেই সাদাদের সম্পর্কে আপনি শুনে থাকেন বিস্ময়াপন্ন প্রশংসা বাণী: ‘শ্বেতাঙ্গরা সবকিছু পারে’। আমার একটি নাটকের ‘মাদার, সিং ফর মি’ কয়েকটি চরিত্র বারংবার ‘শ্বেতাঙ্গরা সবকিছু পারে’ জাতীয় উদ্ভট ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এ নাটকের কোনো ‘চরিত্র’ যখনই দেখাতে চায় যে আফ্রিকার মানুষ অনেক কিছু তৈরি করতে পারে যেমন বন্দুক, তখনই আবাদের ঔপনিবেশিক মালিকরা তাকে থামিয়ে দেয়, তার হাত কেটে ফেলে। নাটকটিতে দেখা যায় যে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আফ্রিকার কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানেই আবাদের কাজ সফলভাবে নিষ্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকরাও ফের প্রমাণ করে তাদের অস্ত্র তৈরির দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের ক্ষেত্রেও একই পরিণতি ঘটে: তাদের হাত কেটে দেয়া হয়, যাতে তারা আর কখনই অস্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করতে না পারে। তাদের জিহ্বাও কেটে দেয়া হয়, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তারা নিজেদের জ্ঞান পৌঁছে দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আফ্রিকার সহজাত সক্ষমতার চিত্র, আর সে সক্ষমতাকে কীভাবে সচেতনভাবে ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে, নাটকটিতে তা-ই যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। গিকুইয়ো ভাষায় রচিত নাটকটিকে ১৯৮২ সালে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
শ্বেতাঙ্গরা সবকিছু পারে প্রতিপাদ্যটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য বহিরাগতরা স্থানীয় ভাষাকে তাদের নিজেদের ভাষার অধীনস্থ করে ফেলে। কোনো একটি অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা ওই অঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যাপক জ্ঞান ধারণ করে। ফলে একটি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে ধ্বংস করা হলে সে ভাষার শব্দভাণ্ডারও, যার মাধ্যমে ওই জনগোষ্ঠী তার প্রকৃতি ও পরিবেশকে অনুধাবন করে, ধ্বংস হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপন প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে প্রাণবন্ত মিথস্ক্রিয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ওই জনগোষ্ঠীর ভেতর নানা তথ্যসমৃদ্ধ যে জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে ওঠে, তা-ও ধ্বংস হয়ে যায়।
এ অবস্থায় বহিরাগতের ভাষাটি ক্ষমতা ও স্বাভাবিকতার ভাষায় পরিণত হয়। দখলদার বহিরাগতগোষ্ঠী যে শব্দভাণ্ডারের মাধ্যমে অধিকৃত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বিচার করে, তাদের ইতিহাস ও উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনা করে, সে দৃষ্টিভঙ্গি বহিরাগতের নিজস্ব শব্দভাণ্ডার দিয়েই নির্ণীত হয়। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা অতএব স্থানীয় পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে বহিরাগতের বিশ্ববীক্ষার চাষাবাদ ছাড়া কিছু নয়। যারা ঔপনিবেশিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ছিলেন, তারা নিশ্চয় স্মরণ করতে পারেন যে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভূগোল ও ইতিহাসের পাঠ শুরু হতো ইউরোপের ভূগোল আর ইতিহাস দিয়ে।
আপন অঞ্চলকে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে সচেতন বা অবচেতনভাবে, দখলদার উপনিবেশকদের দৃষ্টিভঙ্গিটি আফ্রিকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীটির ভেতর হয়তো পূর্বাহ্নেই আত্মীয়করণ ঘটে যায়। ফলে উপনিবেশোত্তর আফ্রিকায় ইউরোপীয় ভাষায় শিক্ষিত আফ্রিকার এলিট সমাজ আপন মহাদেশকে বহিরাগতের দৃষ্টিতে বিচার করার পদ্ধতিটিকে এক স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত করে ফেলেছে, যার স্বাভাবিক পরিণতি হলো আফ্রিকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী আপন আপন দেশ ও ইতিহাসকে এমনভাবে বিচার করে, যেনবা তারা তাদের নিজ নিজ দেশ ও ইতিহাসের বাইরে থেকে বিকশিত হয়েছে। দুনিয়ার সব ঔপনিবেশিক শক্তি আফ্রিকার এলিট সমাজকে পশ্চিমের আদলে শিক্ষিত করার অর্থনৈতিক উপযোগিতা আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছিল। এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে আফ্রিকার তাবৎ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও উৎপাদন এখন ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। এ বাস্তবতার অর্থ হলো আমরা সবসময়ই বহিরাগতের ভাষা দিয়ে আফ্রিকাকে বিচার-বিশ্লেষণ করব।
দৃষ্টিভঙ্গির এ বহির্মুখিতা নানা কুফল প্রসব করে। বহিরাগত ঔপনিবেশিক শক্তির দৃষ্টিতে জ্ঞান বরাবরই বাইরে থেকে আসা একটি বস্তু। আফ্রিকার স্থানীয়দের মধ্যে যারা জ্ঞান সম্পর্কে এ ঔপনিবেশিক ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে পড়েছে, আফ্রিকাকে তারাও সে দৃষ্টিতেই বিচার করে থাকে: আফ্রিকা নিজে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের একটি প্রকৃত উৎস হতে পারে না। অথবা অন্য কথায় আফ্রিকার ভেতরে যা কিছু উৎপাদন হয়, তা আফ্রিকার বাইরে উৎপাদিত দ্রব্যাদির মতো উন্নত মানের নয়। ফলে তারা বিশ্বাস করে আফ্রিকার ভেতরে উৎপাদিত দ্রব্যাদির গুণগত মান সম্পর্কে সর্বাগ্রে ইউরোপ ও পশ্চিমের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আজ আফ্রিকার সে মানুষেরা কোথাও, যারা তাদের চারপাশের কাঁচামাল দিয়ে নানা কিছু উৎপাদন করে এবং উদ্বৃত্ত পণ্য স্থানীয়, জাতীয়, মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারে বিনিময় করে? আফ্রিকা প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ, হীরা, তামা, ইউরেনিয়াম ও তেল উৎপাদন করে। কিন্তু আপনি যদি এসব কাঁচামালসমৃদ্ধ আফ্রিকার বিভিন্ন রাজধানী শহরে যান, সেসব জায়গায় এসব খনিকেন্দ্রিক নানা শিল্পের রমরমা বিকাশের কোনো চিহ্ন আপনার চোখে পড়বে না। আমরা যদি আমাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে বিবেচনায় নিই, তাহলে এমন কী কারণ থাকতে পারে যে আমরা, কেনিয়াবাসী কিংবা আফ্রিকার অপরাপর জনগোষ্ঠী গোটা পৃথিবীর কারখানা হিসেবে চীন আজ যেভাবে নিজের সমৃদ্ধিসাধন করে চলেছে তা করতে পারি না? সেই তাম্রযুগে মানমন্দির হিসেবে ব্যবহৃত ইংল্যান্ডের স্টোনহেন্জ নির্মিত হওয়ারও আগে প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকাবাসী যদি পাথরের শিলা ব্যবহার করে গ্রহ-নক্ষত্রখচিত মহাবিশ্বে অনুসন্ধান চালাতে পারে, তাহলে সমকালীন আফ্রিকাবাসী মহাশূন্য গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে, কিংবা অন্ততপক্ষে মহাশূন্য গবেষণা ও আবিষ্কারে অন্যদের সমান অংশীদার হতে না পারার কী কারণ থাকতে পারে? কারণটি হলো আমাদের যে আপন প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সৃজনশীল মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা নিজেদের অন্ন জোগাতে পারি, বস্ত্রের ব্যবস্থা করতে পারি, গৃহ নির্মাণ করতে পারি, আর নিজেদের জন্য নতুন সব বিস্ময়কর জিনিস গড়ে তুলতে পারি—সেই প্রকৃতি ও পরিবেশকে উপনিবেশবাদ ও করপোরেট সাম্রাজ্যবাদ আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
বিদেশী উপনিবেশকদের চোখে নিজ দেশকে দেখার একটি ভয়ানক কুফল হলো নিজেদের ভেতর লুটেরা মানসিকতার বিকাশ। উপনিবেশের অর্থনীতি বিদেশী উপনিবেশকদের মূল অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় উপনিবেশে বসতি স্থাপনকারী বহিরাগতদের জন্য আফ্রিকা একটি লুটপাটের স্বর্গে পরিণত হয়েছিল। আর পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন ও আমলাতন্ত্র সমেত গোটা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রটি বহিরাগতদের লুটপাটের জন্য এক কার্যকর যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আফ্রিকার শিক্ষিত, ইউরোপীয় ভাষাভাষী, এলিট সমাজের মননে আফ্রিকা সম্পর্কে উপনিবেশক বহিরাগতদের দৃষ্টিভঙ্গিটি সঞ্চারিত হয়, আত্তীকরণ ঘটে, আর তার সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে অর্জন করে বহিরাগতদের লুটেরা মানসিকতা।
সোজা করে বললে কোনো মানুষ যখন নিজের দেশকে ‘আপন’ ভাবতে পারে না, তখন তার দেশের বিরাজিত নানা পরিস্থিতির জন্য সে সম্ভবত কোনো দায় বোধ করে না। মানুষ সাধারণত নিজের বাড়িতে ডাকাতি করে না, বরং নিজের সম্পদ আগলে রাখে—তার নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করে। কেনিয়া কিংবা গোটা আফ্রিকার জনগণের সম্পদ চুরি করা অপরাধ, আর বহিরাগতদের চোখে নিজের দেশকে বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গিই এ অপরাধের চালিকাশক্তি। এটাই ছিল ১৯৭৮ সালে ‘কামিতি ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি কারাগারে’ লিখিত আমার ডেভিল অন দ্য ক্রস উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু। উপন্যাসটিতে আমি সবচেয়ে ধুরন্ধর সাতজন ডাকাত খুঁজে বের করার জন্য শয়তান কর্তৃক আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতার বর্ণনা করেছিলাম। এরা কোনো সাধারণ ডাকাত নয়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতিযোগিতায় আগ্রহী ডাকাতদের প্রথমেই প্রমাণ করতে হয়েছে যে তারা এরই মধ্যে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। তারা হলো বৈশ্বিক মানের ডাকাত। তারা শুধু তাদের অতীতের বীরোচিত লুটপাটের প্রমাণই দাখিল করে না, ভবিষ্যৎ চুরির একটি রূপকল্পও উপস্থাপন করে। এ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে তৎকালীন ‘ন্যুয়র্ক-ভিত্তিক’ ‘অর্গানাইজেশন ফর মডার্ন থেপ্ট অ্যান্ড রবারি’র পক্ষ থেকে ‘চিফ অব রবার্স’ উপাধিতে ভূষিত করার কথা বলা হয়েছিল। যারা আফ্রিকার পুনরুজ্জীবন দেখতে আগ্রহী, তাদের আমি উপন্যাসটি পড়ার অনুরোধ জানাব।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে যে ব্যাপক দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে, আমাদের নিজ মহাদেশকে বহিরাগতদের চোখে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরই তার কারণ নিহিত রয়েছে। আমরা অবস্থাটি উল্টে দিতে পারি। আমি আগেই বলেছি, ১৯৮২ সালে আমার গিকুইয়ো ভাষায় রচিত নাটকটির ‘মাদার, সিং ফর মি’ মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি নাটকটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, ইতিপূর্বে যেমন সহলেখক হিসেবে রচিত আমার আই উইল ম্যারি হোয়েন আই ওয়ান্ট নাটকটির বেলায়ও ঘটেছিল, কারণ এ রচনাগুলো নিজস্ব শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক এক নতুন কেনিয়ার রূপকল্প হাজির করেছিল, এমন এক নতুন কেনিয়া, যা জনগণের আত্মশক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। নাটকটি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষিদ্ধ ছিল। প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা পুনঃসজ্জিত ‘জাতীয় নাট্যশালা’ উদ্বোধনের সময় ২০১৫ সালে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। এ নাটকের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাকে আমি একটি আশার প্রতীক হিসেবেই দেখেছি, যদিও তার জন্য একজন প্রেসিডেন্টকে এমন একটি নাটকের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রকাশ্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হয়েছিল, যে নাটকটি দীর্ঘ ৩৩ বছর আগে কেনিয়ার জনগণের প্রযুক্তিগত ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে উদযাপন করেছিল।
আমি বিশ্বাস করি, কেনিয়ায় আরো সম্প্রসারিত অর্থে, গোটা আফ্রিকায়, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি আধুনিক জাতি হিসেবে, মহাদেশ হিসেবে, আমাদের ভবিষ্যতের পথ উন্মোচন করতে পারে। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্য বিশ্বাস করতে হবে যে জ্ঞানের অভিযাত্রা স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু হয়। আমি এমন একটি জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলছি, যা ‘আমাদের দেশ থেকে বহির্বিশ্ব’—মোটেও তার উল্টোটি নয়—নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
প্রয়াত আউর অ্যানিউম্বা, তাবান লো লিয়ং ও আমি, ১৯৬৮ সালে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। আমাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর কারণ মোটেই এটা ছিল না যে আমরা ইংরেজি সাহিত্যকে অপছন্দ করি, কিংবা তার মহত্ত্বকে আমরা ছোট করে দেখি। আমাদের আপত্তি ছিল সাহিত্যের পাঠদানে ইংরেজি সাহিত্যের কেন্দ্রীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে। আমরা ব্রিটিশ সাহিত্যকেন্দ্রিক ‘ইংরেজি বিভাগের’ বিলোপ সাধন করে সেটিকে ইউরোপীয় সাহিত্যের পাশাপাশি যথাক্রমে আফ্রিকা, ক্যারিবিয়া, আফ্রিকা-আমেরিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্যচর্চার জন্য ‘সাহিত্য বিভাগ’ হিসেবে পুনর্গঠন করার আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমাদের এ বিতর্ক, সাহিত্যপাঠ পুনর্গঠনের প্রস্তাব ও তৎসম্পর্কিত নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষণা ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের উদ্বোধনে ভূমিকা রেখেছিল। আমরা সেদিন নাইরোবি থেকে বাকি বিশ্বের সঙ্গে কথোপকথন করেছিলাম।
আমি মনে করি, সূত্রটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও উদ্ভাবনার ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। সেক্ষেত্রে কেনিয়ার জনগণ হিসেবে আমাদের স্বকীয় শক্তি ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই কেবল আমাদের দেশকে আমরা পৃথিবীর অপরাপর জাতিগুলোর সামনের সারিতে পৌঁছে দিতে পারি। তার জন্য কেনিয়া ও আফ্রিকাকে লুটেরাদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে দেখার উপনিবেশিকতা-জাত মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে হবে। কেউ নিজের বাড়ি লুটপাট করে না। কেউ-ই অন্যকে ইচ্ছে করে নিজের বাড়ি লুটপাট করতে দিতে পারে না, অন্যদের সঙ্গে নিজের বাড়ি লুটপাটের সঙ্গী হওয়া তো দূরের কথা।
কেনিয়া থেকে পুরো পৃথিবী। কেনিয়া থেকে নক্ষত্রালোক। এটাই আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর স্লোগান হওয়া উচিত। নক্ষত্রালোকে পৌঁছাও। আরো ভালো নিজেই একটি নক্ষত্রে পরিণত হও। এভাবেই আমাদের দেশের, আমাদের জাতির, আফ্রিকার, এমনকি গোটা পৃথিবীর অগ্রগতির পথ আলোকিত কর।
[নগুগি ওয়া থিয়ং’ও (১৯৩৮-২০২৫) কেনিয়ার জগদ্বিখ্যাত উপনিবেশবাদবিরোধী বুদ্ধিজীবী। তিনি এ বছরের মে মাসে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমান প্রবন্ধটি—দ্য বডি অব নলেজ—তার জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থে—ডিকলোনাইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড আদার রেভল্যুশনারি আইডিয়াস—অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক ও ইতিহাস-গবেষক নূরুল কবীর]








