[২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে অর্জুন চতুর্বেদির সঙ্গে নগুগি ওয়া থিয়ং'ওর একটি কথোপকথন 'JACOBIN' ওয়েবপোর্টালে প্রকাশিত হয়। এ সাক্ষাৎকারে তিনি আলাপ করেছেন সে সময়ের 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনের রাজনীতির সঙ্গে তার লেখালেখির সম্পর্ক নিয়ে। কেনিয়ার বর্ণবাদ ও সহিংসতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক কাজকারবার এবং বর্তমান জমানার নাগরিক অসন্তোষকে মিলিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন কীভাবে উপনিবেশিক উত্তরাধিকার কেনিয়ার রাজনীতিকে আকার-প্রকার দিচ্ছে এবং কেন ভাষা এখনো রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দান হিসেবে রয়ে গেছে।]
নগুগি ওয়া থিয়ং'ওর সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ। সহুল আহমদ রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের সম্পাদনা পর্ষদের সদস্য।
উপন্যাস, থিয়েটার থেকে শুরু করে উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব পর্যন্ত বহু ঘরানায় আপনার কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। এমন বিভিন্ন ঘরানাজুড়ে লেখালেখি করার অনুপ্রেরণা কী?
আমি গল্প শুনে শুনে ও পরবর্তী সময়ে পড়ে পড়েই বেড়ে উঠেছি এবং পরে আমি গল্পগুলো বলতে চেয়েছি। লেখালেখি এটা করতে আমাকে সাহায্য করেছে। ফিকশন আমার সত্যিকারের ভালোবাসা। আমার প্রথম উপন্যাস উইপ নট, চাইল্ড এবং দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য রিভার বিটউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকে পড়ার সময়ে লিখেছি। আমি বিশ্বাস করি কলেজ থাকাকালীন লেখা এ বই এবং নাটকগুলো আমাকে আমার বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনায় সাহায্য করেছে। সুতরাং উপন্যাস, গল্প বলা ও লেখালেখিটাই আমার আগ্রহের জায়গা।
কিন্তু আমি থিয়েটারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলাম। আপনি জানেন, কমিউনিটি থিয়েটারের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার কারণে কেনিয়ার সরকার আমাকে ১৯৭৭-৭৮ সালে কারাগারে প্রেরণ করেছিল। আমি ইংরেজি ভাষান্তরে আই উইল মেরি হোয়েন আই ওয়ান্ট নামক একটি নাটক লিখতে সাহায্য করেছিলাম, কিন্তু আমি সেটা গিকুয়ু ভাষায় লিখে ফেলি। আপনি বলতে পারেন ফিকশন আমার প্রথম প্রেম, কিন্তু থিয়েটার আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে, কারণ থিয়েটার আমাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবলয়ের কারাগারে প্রেরণ করেছিল।
কারাগারে বসেই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে মাতৃভাষায় লেখা শুরু করব; আমার প্রথম তিনটা উপন্যাস ও নাটক ইংরেজি ভাষায় লেখা। মাতৃভাষায় লেখার দরুন আমাকে গারদে ভরার পর আমি আর কখনো ইংরেজিতে ফিকশন, নাটক ও কবিতা না লেখার সিদ্ধান্ত নিই। মাতৃভাষায় প্রথম যে উপন্যাস লিখি সেটার নাম হচ্ছে [ইংরেজিতে] ডেভিল অন দ্য ক্রস।
কেনিয়ায় ভাষার রাজনীতি নিয়ে আরো কিছু বলবেন?
আমি ব্যাখ্যা করেই বলি। কেনিয়ায় অনেক আফ্রিকান ভাষা রয়েছে, আমার মনে হয় ৪০টার মতো। অর্থাৎ, কেনিয়ার বিভিন্ন মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা রয়েছে, এমনকি কেনীয়-এশীয় সম্প্রদায়েরও। আমাদের এশীয় ভাষাও রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী ভাষা ও কেনিয়ার সরকারি ভাষা ছিল ইংরেজি, এখনো আছে। এটি ক্ষমতার ভাষা। এটি সংখ্যালঘুদের ভাষা, মানে যদিও কেনিয়াজুড়ে এ ভাষায় কথা বলা হয়, তবু কেনিয়ার জনগণের মাত্র ১০-১৫ শতাংশ লোক এ ভাষায় কথা বলে। বাকিরা নিজস্ব মাতৃভাষায় কথা বলে অথবা সোয়াহিলি ভাষায়। সুতরাং কেনিয়ায় জনগণ তিনটা ভাষায় কথা বলে: প্রথমে মাতৃভাষা, তারপর সোয়াহিলি, এরপর ইংরেজি।
আপনি যখন ইংরেজি থেকে গিকুয়ু ভাষার দিকে সরে গেলেন, তখন আপনার লেখা কীভাবে বদলে গেল?
এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সর্বাগ্রে আমি কেন গিকুয়ু’তে লেখার সিদ্ধান্ত নিলাম? আগেই যা বলছিলাম, আমি এ সিদ্ধান্ত নিই যখন একটি আফ্রিকান ভাষায় লেখার জন্য কেনিয়ার সরকার আমাকে গ্রেফতার করেছিল এবং গারদে ভরেছিল। খুবই অদ্ভুত! এটি আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল। আমি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করি। আমি ইংরেজিতে নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক বিষয়াদি লিখতে পারি, এতে কিছুই হয় না। কিন্তু যে মুহূর্তে একই বিষয় মাতৃভাষায় লিখলাম তখনই আমাকে গারদে ভরা হলো।
তখনই আমি কেনিয়াসহ ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা ও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের উপনিবেশ প্রক্রিয়ায় ভাষার রাজনীতির বিষয়ে চিন্তা করা শুরু করি। আমি এ বিষয়ে চিন্তা করা শুরু করলাম: এটা কীভাবে হলো? জেলের ১৬ নাম্বার সেলে বসেই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে ফিকশন, নাটক, কবিতা সব আমার মাতৃভাষায়ই লেখা হবে।
আমি আপনাকে বলতে পারি, ১৯৭৮ সাল থেকে আমার সব উপন্যাস, নাটক ও কবিতা গিকুয়ু ভাষায় লেখা। কেবল একাডেমিক বা স্মৃতিচারণগুলোই আমি ইংরেজিতে লিখেছি। আফ্রিকান ভাষায় লেখার সিদ্ধান্ত নেয়া আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল ছিল, কারণ এটা আমার কেনিয়ার পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করেছিল। এটা আমার নিজস্ব আলোকায়নের মুহূর্ত ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে, আবেগের দিক থেকে ও মানসিকভাবে সব দিক থেকে এটা ছিল আমার ব্যক্তিগত মুক্তির মুহূর্ত।
ফিকশনের পাশাপাশি আপনি বহু তত্ত্বীয় কাজ করেছেন। বিশেষত আমি ডিক্লনাইজিং দ্য মাইন্ড-এর কথা ভাবছি। একটু খোলাসা করে কি বলবেন কীভাবে বিউপনিবেশায়নের ধারণাগুলো চলমান ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত?
এটা একটু জটিল। কিন্তু এত জটিল না, কারণ আমি সাদা-শাসিত কেনিয়ায় বড় হয়েছি। ১৮৮৫-১৯৬৩ পর্যন্ত কেনিয়া ছিল সাদা সেটেলারদের উপনিবেশ। সম্পর্কের কাঠামো ক্ষমতার বর্ণগত ক্রমাধিকারতন্ত্রের বা হায়ারার্কির ওপর ভিত্তি করে ছিল, শীর্ষে সাদা সংখ্যালঘু, তারপর মাঝখানে এশীয় সম্প্রদায় ও নিচে আফ্রিকানরা।
আমি আমার স্মৃতিকথায় স্কুলে যাওয়ার কথা বলেছি, তখন এমনকি ট্রেনগুলোও পৃথক ছিল। প্রথম শ্রেণী ছিল কেবল সাদাদের এবং লেখাও থাকত ‘শুধু সাদাদের জন্য’। দ্বিতীয় শ্রেণী ছিল কেবল এশীয়দের। তৃতীয় শ্রেণী ছিল আফ্রিকানদের; এক্ষেত্রে তারা ‘শুধু’ শব্দটাও ব্যবহার করত না, কারণ ধরেই নেয়া হতো তৃতীয় শ্রেণীটা কালো আফ্রিকানদের জন্য।
আমি এমন ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছি, যেখানে কালোরা, তা তাদের সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তারা সর্বদাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীতে থাকত, বিপরীতে শীর্ষে সাদারা। নানা উপায়ে আমি ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের পুরো ধারণাটা বুঝতে পারি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত করতে পারি। আমি বলছি যে সাধারণত আপনি যখন বলেন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’, এর অর্থ এই নয় যে অন্যান্য জীবন ম্যাটার বা গুরুত্ববহন করে না। আইনি ব্যবস্থায় সাদাদের জীবন সবসময়ই ম্যাটার করত।
কিন্তু ঔপনিবেশিক স্মৃতির বিউপনিবেশায়নের পুরো ধারণার প্রতিও আমি আগ্রহী। এর দ্বারা আমি বিনির্মাণ (ডিকন্সট্রাকশন) বোঝাচ্ছি। আমাদের বোঝা দরকার ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেসব ব্যবস্থা গেছে, তা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আফ্রিকা বা এশিয়া যা-ই হোক না কেন, সবগুলোকেই মনের বিউপনিবেশায়নের মধ্য দিয়ে যাওয়া দরকার। এটা উপলদ্ধি করা খুব বেশি জরুরি যে উপনিবেশিক ব্যবস্থা প্রায় সবাইকে বিভিন্ন উপায়ে আক্রান্ত করে।
আপনি যদি স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখেন, তারা আমাদের ইতিহাস উদযাপন করে। এসবের কিছু স্মৃতিস্তম্ভ দাসত্বের ইতিহাস উদযাপন করে অথবা যারা দাসত্ব ও নিপীড়ন থেকে ফায়দা লুটেছেন তাদের গুণকীর্তন করে। আমরা যেটাকে স্বাভাবিক বলি সেটাকে এটি আক্রান্ত করতে পারে। অস্বাভাবিকতাই স্বাভাবিকতায় পরিণত হতে পারে। আমাদের বলতে হবে: না না না! এটা স্বাভাবিক না যে কালো লোকদের গ্রেফতার করে মেরে ফেলা হবে, এমনকি যখন তারা ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’ (I cannot breathe) বলে চিৎকার করছে তখনো। এগুলো স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড নয়, এসব কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না।
এটা কি বিউপনিবেশায়নের একটি রূপ?
আমার কাছে মনের বিউপনিবেশায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আনন্দিত, ১৯৮৪ সালে যা লিখেছিলাম সেটা বর্তমানে সাধারণ দাবিতে পরিণত হচ্ছে: মনের বিউপনিবেশায়ন ও প্রতিষ্ঠানের বিউপনিবেশায়ন। সামথিং টর্ন অ্যান্ড নিউ শিরোনামে আমার আরেকটা বই আছে। সেখানে আমি স্মৃতির রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছি। যখন কোনো একটা স্থানকে উপনিবেশ করা হয়, তখন পুরনো স্মৃতিকে কবর দিয়ে নতুন স্মৃতিকে রোপণ করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ নিউইয়র্কের কথা বলা যাক। সেখানে ইউরোপীয়রা বসতি গড়ার আগে দেশীয় আমেরিকানরা বসবাস করত। তাদের কাছে এ জায়গার একটা নাম ছিল। কিন্তু যখন ডাচরা এল তখন বলল, না না, এটাকে নিউ আমস্টারডাম নামেই ডাকা উচিত। কিন্তু যখন ইংরেজরা এল, তারা বলল, ‘না না, এটা নিউ আমস্টারডাম নয়, আগে যা ছিল এটা তাও নয়। এখন থেকে এটা নিউইয়র্ক।’ নতুন নাম পুরনো নামের সঙ্গে জড়িত স্মৃতিকে কবর দিয়ে দেয়।
আমাদের বোঝা জরুরি, এমনকি মূর্তি ও অন্যান্য জিনিস আসলে স্মৃতি বহন করে এবং স্থানের পুরনো স্মৃতিকে কবর দেয়। আমি আনন্দিত, মনের বিউপনিবেশায়ন ও প্রতিষ্ঠানের বিউপনিবেশায়নের প্রশ্নটা দুনিয়াজুড়েই উচ্চারিত হচ্ছে।
ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের পেছনে বর্ণবাদকে সমালোচনা করার লম্বা ইতিহাস আছে। এ ইতিহাস কীভাবে আপনার লেখালেখিকে প্রভাবিত করছে?
আমার মনে হয় এটা ড্রিমস ইন এ টাইম অফ ওয়ার তে আছে, যেখানে আমি সেই দিনের কথা বর্ণনা করেছি, যেদিন আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে যাচ্ছিলাম। সেদিন টহলরত ব্রিটিশ সেনাদের মুখোমুখি হই। একজন ব্রিটিশ সেনা আমার মুখে আঘাত করে এবং আমি পড়ে যাই। আমি শারীরিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারিনি। আপনি ভেতরে ভেতরে ক্রোধান্বিত হবেন, কিন্তু কিছুই করতে পারবেন না। সেনাটি আপাদমস্তক অস্ত্রসজ্জিত ছিল এবং তার সঙ্গে আরো সৈনিক ছিল। আমি তখন কেবল প্রাথমিক স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুলে উত্তীর্ণ হয়েছি এবং ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলাম।
ফলে আমি সেদিনের আঘাতটাকে মনে রেখেছি, কারণ আমার কান্না পাচ্ছিল কিন্তু নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম আমি কাঁদব না। আমি জোর করে কান্না আটকে রেখেছিলাম এবং আমি যতই কান্না আটকাচ্ছিলাম সে ততই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিল। ঔপনিবেশিক সমাজের যেকোনো বাসিন্দাই ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের সঙ্গে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারবেন এবং পারাটাও উচিত বটে।








